Wednesday, May 06, 2009

প্রবাসের কথোপকথন - ১৬

– কালকে কোরবানির মাংস নিয়ে যেও।
: হু, আমাকে না দিলে কিন্তু গরীবের হক আদায় হবে না।

– থাপ্পড় খাবি। আত্মীয়ের ভাগ হতে পারে না? ফালতু কথা শুধু।
: ঐ হল। এবার কোথায় দিলেন কোরবানি?

– ঘন্টা দুয়েকের পথ হবে এখান থেকে। যাওয়া-আসা একটা ঝক্কি। একবার গরু বাছাই করতে যাও, একবার টাকা দিতে যাও, একবার মাংস আনতে যাও। কোরবানির মাংস, তাই প্রত্যেকেরই যেতে হল।
: কেষ্ট পেতে একটু তো কষ্ট করতেই হবে, কিন্তু তাই বলে সবার যেতে হবে কেন?

– মাস্লা আছে কী যেন একটা। কোরবানির মাংস নাকি যারটা তার আনতে হবে। নাহলে তো একজন গিয়েই সব নিয়ে আসতে পারতো।
: ব্যাপার না। আমার কাছে সব সমান। খাওয়া পেলেই হল। কারো মাফ নেই, সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসবো নে।

– এবারে বলেছি কিছু মাংস আলাদা করে রাখতে। সবার ভাগ থেকে একটু একটু করে। সেই মাংস দিয়েই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।
: বুদ্ধি খারাপ না। আপনাদের ভাগেই তো রান্না পড়বে। আফসোস অন্য জায়গায়। শুধু তরতাজা রান্না খাচ্ছি। দেশের মত শুকনো, ঝুরঝুরা মাংস খাওয়া হয় না আজকে ঠিক ছয় বছর হয়।

– হ্যাঁ, এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোই প্রবাস জীবনকে কষ্টকর করে দেয়। পত্রিকায় দেখলাম, এই দুর্মূল্যের বাজারেও লোকে অনেকগুলো করে গরু কোরবানি দিচ্ছে। কারও কারও গরু তো উটের সমান বড়। অথচ গ্রামে গিয়ে দেখেছিলাম, গরু নেই দেখে মানুষে হাল টানছে।
: এটাই তো সমস্যা। ল’ আর স্পিরিট অফ ল’-এর মধ্যে পার্থক্যটুকু আমরা বুঝি না। আমরা ধর্মকে একেবারে আক্ষরিক ভাবে নেই, কেউ ধর্মের নির্যাসটুকু বুঝতে চাই না। ওহির মর্ম ঠিক মত বুঝলে কোরবানির গরু কিনে মানুষ গ্রামের গরীব কৃষকদের দিতো। বদলি হজ্জ হয়, বদলি কোরবানি কেন হতে পারবে না?

– সবার মনে শুধু আক্ষরিক চিন্তা, বুঝলে? সীমিত কিছু অক্ষর লেখা আছে, সেগুলো মুখস্ত করে বসে আছে অর্ধশিক্ষিত কিছু মোল্লা। আমরা শিক্ষিত লোকেরাও তাদেরই কাছে যাই উপদেশ নিতে।
: এখানেই সমস্যা। ইসলাম ধর্ম নিয়ে আমরা গর্ব করে বলি যে এটা সবচেয়ে আধুনিক ধর্ম। সেই ৫ম শতাব্দিতে যেই ইসলাম নাজিল হয়েছিল, সেটা শিক্ষা আর অনুশাসনের দিক থেকে ১৫শ সালের জন্যও আধুনিক ছিল। দাসত্বের যুগে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সব রকম ধর্মমতের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে আমাদের উচিত ছিল এই আধুনিকতা, এই অধিকারবোধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

– বলা হয় ইসলাম একটা পরিপূর্ণ জীবনবিধি। এখানেই ঝামেলাটা। এই সুবিধা নিয়ে নিজের মত করে সবাই ধর্মের ব্যাখ্যা করে, নিজের জীবনধারা চাপিয়ে দেয় অন্যের উপর। শুধু তাই না, খুব তীব্র এক ধরণের চরমপন্থা ঢুকে যায় মনের মধ্যে। আমিই ঠিক, আমার মত অনুসরণ করলেই স্বর্গে যাওয়া যাবে, অন্যথায় নরকবাস – এমন একটা চিন্তা মানুষের মনে স্থান করে নেয়।
: পরিপূর্ণ জীবনচরিত বলে প্রচার করাটাই সমস্যা। ধর্মে তো ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী কালের আলোকে নতুন বিধি তৈরির সুযোগও আছে। এই দিকটায় ফতোয়াবাজদের একচ্ছত্র আধিপত্য হয়ে গেছে। কেউ বলে না যে ধর্মের অনুসারী হিসেবে, সমাজের অংশ হিসেবে আমাদেরও অধিকার আছে ধর্মের আধুনিকায়নে।

– আরেকটা ঝামেলা হল রাজনীতি ঢুকে যাওয়া। নিজের ধর্মকে ভালবাসা মানেই অন্য ধর্মকে ঘৃণা করা নয়। এটা ভুলে যাই আমরা। রাজনীতির স্বার্থে এটা অনেক ভাবে অপব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের বেলায় এই আবেগ কাজ করে বেশি। আমরা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করি না কেন, বাস্তব এটাই যে আমাদের সংস্কৃতিতে মিল আছে। ধর্মের অজুহাতে আমরা সংস্কৃতিকে আঘাত করি।
: কথাটা প্রায়ই বলি, বাঙালি স্বর্গে যাওয়ার জন্য আরবি ভাষায় নাম রাখে। অন্য দেশের মুসলমানেরাও ইসলামিক নাম রাখে, কিন্তু অন্তত নিজের ভাষা-সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নেয় কোন ভাবে। আমাদের তো ওসবের বালাই নেই।

– একেবারে ওভাবেও দেখার কিছু নেই। ধর্ম অনেকের কাছে একটা সংস্কৃতি, সেটাও মনে রাখতে হবে।
: ধর্ম হল ধর্ম। বিশ্বাস, পরকাল, পাপ-পুণ্য, এগুলোর ভেতর সংস্কৃতি ঢোকানো ঠিক না।

– সংস্কৃতি কী তাহলে? আমরা যেভাবে খাই, ঘুমাই, চিন্তা করি, কথা বলি, সেগুলোই তো? সেখানে কি ধর্মের প্রভাব নেই? ধর্মকে কেউ সংস্কৃতি হিসেবে নিতেই তো পারে, কারণ ধর্মেও নির্দিষ্ট কিছু ধরন-ধারণ আছে এগুলো নিয়ে।
: চাইলেই করতে পারে, কিন্তু করতে হবে কেন? নিজের শেকড়ের সাথে সম্পর্ক নেই, এমন কিছু কখনও স্থিতিশীল, কার্যকর হতে পারে না।

– সোশাল ডারউইনিজম হয়ে গেল না? একই রকম তো চিন্তা হিটলার করেছিল। তাকে দোষ দেওয়া যায় কীভাবে তাহলে? সব সংস্কৃতির সমান অধিকার দেওয়া হলে, এবং মানুষকে স্বাধীন ভাবে নির্বাচন ও অনুসরণের অধিকার দিলে কিন্তু ধর্মের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কেউ স্বাধীন ভাবে ধর্মের পথে যেতে চাইলে, তাকে সংস্কৃতি হিসেবে নিতে চাইলে দিতে হবে।
: ডারউইনিজম আসে অস্তিত্বের সংকটের প্রশ্ন এলে। নিজের দেশ, নিজের ভাষাকে সবাই শ্রেষ্ঠ ভাবে। নিজের মতাদর্শ সবাই প্রচার করতে চায়। এতে দোষের কিছুই নেই। এতে হারাবার বা হারিয়ে যাবারও কিছু নেই। কিন্তু ধর্মকে এর ভেতর ঢুকিয়ে ফেললে এলিমেন্ট অফ ফিয়ার ঢুকে যায়। শাস্তির ভয় চলে আসে। সংস্কৃতি তো ভালবাসার অভ্যস্ততা, ভয়ে ত্রস্ততা না।

– তুমি কি অস্তিত্ব হারানোর ভয়েই সংস্কৃতির কথা বলছো না? বাংলাকে ছড়িয়ে দেওয়ার আর্জির পেছনে কি হারানোর ভয় নেই?
: আছে, তবে সেটা অস্তিত্ব হারানোর ভয় না। আমিত্ব হারানোর ভয়ে আমি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার কথা বলছি। স্বাধীন ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ নিশ্চিত না করলে কোন সংস্কৃতি কালোত্তীর্ণ হয় না। সেজন্যই সীমানা রুদ্ধ করে ভিন্ভাষা দূরে রাখার চেয়ে নিজের ভাষাকে শক্তিশালী করা জরুরী। ধর্ম তো এই সুযোগ দেয় না। এখানে মানলে বেহেশত, না মানলে দোযখ।

– তবে কি ধর্ম অচল?
: মোটেই না। আমার ভাবতে ভাল লাগে যে আমাকে তৈরি করা হয়েছে কোন একটি মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। দুর্বল মুহূর্তে আমার ভাবতে ভাল লাগে যে আমার একটি আশ্রয় আছে। ভাবতে ভাল লাগে যে আমার অনুচ্চারিত আর্তিগুলো কেউ শুনছে অন্তরাল থেকে। ধর্ম না থাকলে এই শান্তিটুকু পেতাম না। তবে এটা আমার বিশ্বাস, আমার সংস্কৃতি না। আমার সংস্কৃতি ধর্ম দিয়ে প্রভাবিত হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। এর পেছনে বড় কারণ হল, ধর্ম নিজেই তো আজকে আর স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে নেই!

– একটা ব্যাপার জানো, আমরা মুসলমানেরাও কিন্তু পৌত্তলিক। এই দিক থেকে ভণ্ডামিটা খুব কষ্ট দেয় আমাকে।
: হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়া কি পৌত্তলিকতার পর্যায়ে পড়ে? অবশ্য, চাইলে সেভাবে দেখা যেতেও পারে।

– না, আমি সেই অর্থে বলছি না। আমরা বলি যে খোদা নিরাকার, সর্বময়। তাঁর কোন অঙ্গ নেই, চাহিদা নেই। আমরা বলি যে আমাদের খোদা কোন মূর্তির গণ্ডিতে আবদ্ধ না। অথচ তাঁকে আমরা ঠিকই আটকে ফেলি বিশেষণের গণ্ডিতে।
: বিশেষণ তো বর্ণনার জন্য, এর ভেতর বন্দিত্ব আসবে কেন?

– ভেবে দেখো, আমরা বলি যে খোদা দয়ালু, ন্যায়বান, সর্বদ্রষ্টা, ইত্যাদি। এভাবে কিন্তু মানবসৃষ্ট বিশেষণের মধ্যেই তাঁকে বন্দী করে ফেলছি আমরা। গণেশের মত শুড় নেই হয়তো, কিন্তু তাই বলে আমাদের খোদাও খুব একটা মুক্ত না। একটি শিশু কি তার চেনা বিশেষণের বাইরে খোদাকে কল্পনা করতে পারবে? খোদার সর্বময়তা কি সে কোনদিন উপলব্ধি করতে পারবে?
: ভেবে দেখার মত। অবয়ব না দিয়েও উপাসনা হয়ে যাচ্ছে ঠিকই। হয়তো একারণেই ধর্মের বক্তব্যটুকু হারিয়ে যায় এত সহজে।

– এই সীমিত সংজ্ঞায়নের পাকে পড়েই কিন্তু আমরা ভয় থেকে স্রষ্টার আরাধনা করি। অথচ উচিত ছিল হিতাহিত জ্ঞান থেকে আরাধনা করা। এটা মনকে অনেক মুক্ত করতো, সহনশীল করতো।
: ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। আমরা খোদাকে অনেক কিছুই বলি। লিঙ্গ নেই বলেও তাঁকে পুরুষ হিসেবেই সম্বোধন করি, আবার ম্যারাডোনার গোলকে আলঙ্করিক ভাবে ঈশ্বরের হাত বললে এর মধ্যে বিধর্মিতা খুঁজি। মোনাফেকির ভয়ে বলি খোদার নামের সাথে জড়িয়ে কোন প্রকার ভৌত কথা বলতে না। সবকিছুই করি আমরা, শুধু খোদাকে বুদ্ধিমান বলি না। এত জটিল পৃথিবী যিনি বানালেন, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, হি মাস্ট বি ড্যাম স্মার্ট। আমরা শিক্ষিত লোকেরা ভুলে যাই যে স্রষ্টা আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমান। তাঁকে তাই ডাকা উচিত বুদ্ধি ব্যবহার করেই। উলটো আমরা বিশ্বাসের গতি-জড়তায় ভেসে গিয়ে নির্বোধের মত কিছু মুখস্ত ইবাদত করি।

– কাইনেটিক ইনারশিয়া অফ ফেইথ… নিউটন, ব্রুনো, ডারউইনরা কিন্তু স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা নিজের ক্ষুদ্রতা দিয়ে ঈশ্বরের মহত্ব প্রকাশ করতেন। দেয়ার ইজ আ রিজন হোয়াই দে আর গ্রেট, অ্যান্ড আই জাস্ট ড্রাইভ আ কার।

Wednesday, April 22, 2009

গানবন্দী জীবনঃ আমি বাংলায় গান গাই

৯. আমি বাংলায় গান গাই

হারানোর আগ পর্যন্ত নাকি মানুষ তার সবচেয়ে বড় সম্পদকে চেনে না। দেশপ্রেম তেমনই ব্যাপার। দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত খুব কম মানুষই নিজের দেশ, আলো-হাওয়া, মাটি, আর মানুষকে প্রাপ্য সম্মান ও ভালবাসা দিতে পারে। ইংরেজিতে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ যাকে বলে, তেমনই এক অনুভূতি কাজ করে সবার মাঝে দেশ নিয়ে। বাইরে এলে সবকিছু মেলে, শুধু আপনজনকে অবহেলা করার এই সুযোগটুকু বাদে। সারা পৃথিবীর সাথে ভদ্রতার প্রতিমূর্তি হলেও আমরা যেমন মায়ের কাছে দুর্বিনিত, আমাদের কাছে দেশও তেমনটাই অবহেলিত।

দেশ মানে স্রেফ একটি ভূখণ্ড না, দেশের অর্থ অনেক বড়। বাঙালিরা মুষ্টিমেয় সেই জাতিগুলোর একটি, যাদের স্বাধিকার আন্দোলন উৎসারিত হয়েছিল নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরবার মানস থেকে। বাঙালি সংস্কৃতি তাই আমাদের কাছে শুধু ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, পরিচয়ের উৎসও। ঠিক-ভুল যেমনটাই হোক না কেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে ধর্মের ভিত্তিতে দেশবিভাগের আন্দোলনও ছিল পরিচয়ের সাথে জড়িত। ফলশ্রুতিতে এই দুই পরিচয়ই কম-বেশি রয়ে গেছে আমাদের মাঝে।

দেশে থাকার সময়টুকুতে আমরা নিজের মন ও মতের মানুষের সাথে মিশে থাকি। নেতৃস্থানীয় কোন অবস্থায় আমরা থাকি না। হাওয়া যেদিকে বয়, সেদিকেই পাল তুলি। কোন বেলায় আশরাফুলের অল্প রানে আউট হওয়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন সংসদে হাসিনা-খালেদার ঝগড়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন হয়তো নতুন কোন নাটকে দেখানো কিম্ভূতকিমাকার ফ্যাশন নিয়ে। বাইরে এলে মূলধারার এই নির্বোধ স্বাভাবিকতা থাকে না। না চাইলেও নেতা গোছের কিছু হয়ে যেতে হয়।

প্রবাসে এলে আমাদের কাজকর্ম দিয়েই যার যার সংস্কৃতির স্বরূপ নিরূপিত হয়। বিশাল পৃথিবীতে আমরা প্রতিটি প্রবাসী যেন ডেকচি থেকে বের করে টিপেটুপে দেখা ভাত। অন্যের ভুলের জন্যও আধাসেদ্ধ থাকার সুযোগ নেই, কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই দোষ পড়বে বাঙালির, ভারতবর্ষের, কিংবা মুসলমানদের। নেতাকে যেমন নিজের আচরণ দিয়ে সবাইকে পথ দেখাতে হয়, তেমনি প্রতিটি প্রবাসীকেও দেশ-ভাষা-ধর্মের স্বার্থে সমঝে চলতে হয়।

এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা হয়েছিল দু’বার। প্রথমবার মাত্র আমেরিকা আসার পরপর, লুইজিয়ানায়। দুপুরে ক্লাস সেরে ঘরে বসে আছি। হঠাৎ ধপধপে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, আর হাতে বাইসাইকেল। নাম বলার পর জানতে চাইলো কোন ভাষার শব্দ। বাংলা বলতেই ধরিয়ে দিল প্রভু যীশুর বাণি – বাংলায়। আমার জন্য, আমার ভাষার জন্য আলাদা করে লেখা আসে সবকিছু। বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হতেই আমি স্বচ্ছন্দ বেশি, তাই এই শ্লাঘা অস্বাভাবিক ছিল না। তুলনায় দ্বিতীয় ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ বেশি।

রমজান এলেই বাঙালি সমাজ মসজিদ-ভিত্তিক হয়ে যায়। নেকির প্রশ্নে নির্মোহ হয়ে রোজা না রেখে থাকা যায়, কিন্তু বিনামূল্যে ইফতারের ব্যাপারে প্রশ্নে আপোষ নেই। বিকেল হলেই তাই ভিড় করি মসজিদে। মুসলমান ব্রাদারহুডের জয়জয়াকার চারিদিকে। সাধারণত স্টুডেন্ট ইউনিয়নে মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে ইফতার দেওয়া হয়। গত রোজায় সামনে পড়লো এমন এক ভ্রাতা। জানালেন, তিনি পাকিস্তানি। কথাপ্রসঙ্গে জানলেন, আমি বাংলাদেশের। চূড়ান্ত ধৃষ্টতা দেখিয়ে সেই লোক মিষ্টি হেসে বলে বললো, তুমিও তো তাহলে পাকিস্তানিই। উদ্দেশ্য, আমাকে ভারতীয়দের থেকে আলাদা করে তার সাচ্চা ব্রাদারের সম্মান দেওয়া। বিরক্ত হয়ে বললাম, যদি আমি পূর্বপরিচয়ের সূত্রেই পরিচিত হব, তবে ব্রিটিশ না হয়ে পাকিস্তানি কেন? তুমি মুড়ি দিয়ে ইফতার খাও, আমি গেলাম।

প্রবাসে এসে আচমকা সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়াটা একটি বিরাট ধাক্কা দেয় অনেককে। এই ধাক্কা সামলানোর জন্য মানুষ পরিচয় খোঁজে, নিজের একটি স্থান খোঁজে। আমিত্বের ধারণাটির পেছনে স্বকীয়তা যতটা, তার চেয়ে বেশি কাজ করে প্রশ্নাতীত অধিকার। পরিচয় খুঁজবার সময় এলে মানুষ তেমনই কিছু খোঁজে। ধর্ম ও সংস্কৃতি উভয়ই তেমন সুবিধা দেয় মানুষকে। আমি বাঙালি ও মুসলমান, আমার এই দু’টি পরিচয় নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না, কোন ধরনের সামাজিক বাস্তবতা আমার এই পরিচয়গুলোকে হেয় কিংবা খাটো করতে পারবে না।

এ-পর্যায়ে প্রশ্ন জাগে, সংস্কৃতি বা ভাষার পরিচয় বাদ দিয়ে মানুষ ধর্মের দিকে ঝোঁকে কেন। উত্তর খুব সহজ। প্রচার-প্রসারের তুলনামূলক সুবিধা। ভাষার ভিত্তিতে যে-পরিচয়, তা প্রদর্শন করতে হলে গান, আবৃত্তি, নাচ, কিংবা অন্য কোন ধরনের সুকুমারবৃত্তির অধিকারী হতে হবে। ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সহজতর। দু’-দশ মাইল পর পর মসজিদ আছে, সেখানে নিয়মিত জড়ো হওয়া মুসল্লি আছে, আছে হালাল দোকান ও দোয়ার আসর। পরিচয়ের আভিজাত্যও থাকে, পরকালের নিশ্চয়তাও বাড়ে।

প্রবাসের আলো-হাওয়ায় দিনাতিপাত করলেও কম-বেশি প্রত্যেকেই সে-দেশগুলোর সংস্কৃতিকে সমর্থন করেন না। সন্তানদের সবাই গড়ে তুলবার চেষ্টা করেন স্বদেশী রক্ষণশীলতা ও সংযমের সাথে। সে-ক্ষেত্রে সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়া অনেক দুষ্কর, তুলনায় ধর্ম অনেক সহজ। ধর্মের পথ বিস্তারিত ভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়াও এর পেছনে ভূমিকা পালন করে।

এভাবে ভাবার ভেতর ক্ষতির কিছু নেই। সাধারণ ভাবে বাইরে এলে সবাই একটি বেশি নামাযি হয়ে যাওয়াতেও ভ্রুকুটি করবার কিছু নেই। নিঃসহায় অবস্থায় মনকে স্থির ও শান্ত রাখতে ধর্মের উপযোগিতা অনস্বীকার্য। আমি আমার মুসলমান পরিচয় নিয়ে আর দশ জনের মতই গর্বিত। তবুও গোল বেধে যায় বাঙালি আর মুসলমান পরিচয় দু’টির মাঝে। আমার মায়ের মত ধর্মভীরু অনেকে খুব নির্বিষ ভাবেই মুসলমান পরিচয়কে বাঙালি পরিচয়ের আগে রাখেন। এভাবে ভাববার অসারতা আমার চোখে প্রকাশ পেয়েছিল উপরে উল্লেখকৃত দ্বিতীয় ঘটনার সময়। শুধু মুসলমান বলেই আমি কোন পাকিস্তানি বা রাজাকারের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে পারবো না। আমার বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয়গুলো কোথায় যেন পীড়া দেয় আমাকে মনের ভেতর। সেই মর্মবেদনা থেকেই আমি জানতে পারি আমার প্রথম পরিচয় কী।

পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বগুলো সাধারণত মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের মানুষ ও ভূমি থেকে বিচ্যুত হবার পর। এই ধারার বিপরীত একজন মানুষের সাথে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল অনেক বছর আগে। আমার প্রবাসে আসবার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন অনেক শ্রদ্ধার নাভেদ ভাই। বিতর্কসংশ্লিষ্ট সবাই তাঁকে এক নামে চেনেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক হিসেবে। ২০০৩ সালের কথা। নাভেদ ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলছি ভর্তির বিভিন্ন খুঁটিনাটি নিয়ে। এমন সময় ইটিভি’তে শুরু হল মাহমুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে বাংলার গান। নাভেদ ভাই বলে উঠলেন, ইশতি একটু ধরো, গানটা শুনে আসি; এই গান শুরু হলে আমি সব ফেলে রেখে একবার গানটা শুনি।

দেশটা ছেড়ে চলে যাবো কিছুদিন পর, এই বাস্তবতা মাথায় তখনই প্রথমবার আঘাত করে। সেই গানটির কারণেই পুরো একটি প্রজন্ম বাংলায় গান গায়, বাংলার গান গায়, বুঝে-শুনে গায়। শুধু আমি নই, কম-বেশি প্রতিটি মানুষেরই জীবন বন্দী হয়ে আছে এই গানের মধ্যে। প্রতুলের অসামান্য মূল গানটির চাইতে অনেকাংশে ভিন্ন হলেও বাবু’র গানটি যেন দাবানলের মত ঘিরে ফেলেছিল সবাইকে। এই গানটি না থাকলে পরিচয়ের যুদ্ধে বাংলা অনেকটাই পিছিয়ে যেত।

বাংলার গানে তাই শুধু জীবন নয়, আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্বই বন্দী।

প্রতুলের কণ্ঠে বাংলার গানঃ
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


মাহমুদুজ্জামান বাবু'র বাংলার গানঃ


ফুয়াদের ঝালমুড়ির কৌটায় বাংলার গানঃ

Ami Banglay Gaan Gai - Laboni - Fuad Featuring

Friday, April 10, 2009

"কেউ কথা রাখেনি"

প্রবাসে বসবাসের সুবাদে অনেক রকম ভাষা ও বচনের সাথে পরিচয় হয়েছে এই ক'বছরে। দেখেছি ভিন্‌ভাষায় কথা বলার সময় মানুষের উৎস কীভাবে অজান্তে প্রকাশ পেয়ে যায়। এই দলে আছি আমরা কিছু ভেতো বাঙাল, যারা ইংরেজিতেও বাংলার সোঁদা টান দিয়ে ফেলি।

আবার মুদ্রার অপর পিঠেই আছেন অনেক আধুনিক মানুষ, যাঁরা নিজভাষা বাংলাতেই কথা বলেন ইংরেজির মত করে। এই দুরাত্মাদের প্রকোপে বাংলা প্রায় হারালো বলে।

এমনই সময় মেসেনজারে খোঁজ পেলাম এই অসামান্য ভিডিওটির। এর নেপথ্যের মানুষটিকে VT ও TAMU-র যেকেউ এক নামে চেনেন -- [url=http://www.youtube.com/user/ridwanq]রিদওয়ান কাইয়ুম[/url] (নামের বানান ভুল হলে দুঃখিত, ভ্রাতঃ)। জাতশিল্পী এই রিদওয়ানের বদৌলতে পেলাম এই ভিডিওটি, যেখানে ইংরেজির বদলে আরবি ঢঙে বাংলা বলে দেখা হচ্ছে কেমন শোনায়।

সকলের সাথে ভাগ করে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।

সুনীলের "কেউ কথা রাখেনি"

Tuesday, March 31, 2009

গানবন্দী জীবনঃ রক ইউ লাইক আ হারিকেন

পরীক্ষিত ও প্রমাণিত কিছু মেয়েলিপনা আছে আমার। মুরুব্বিদের দেখে জেনেছি, নারীমন ভাল করে দেওয়ার অব্যর্থ উপায় হল বাজার করা। এই রোগ আমারও আছে। এমনিতে প্রতিটা পয়সার হিসেব টুকে রাখলেও মন খারাপ হলে কেমন যেন হয়ে যায় সব। যেই আমি কেউ কিছু চাইলে খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে জেনে নেই, কিছু কিনবার আগে তার যাবতীয় তত্ত্ব-তালাশ করি, সেই আমিই দুই হাতে খরচ করি, সবার ইচ্ছাপূরণ করে দেই বিনাপ্রশ্নে। এমনই এক দুর্বল মুহূর্তে জীবনের প্রথম সাউন্ড সিস্টেম কিনি। চিরকঞ্জুস আমার এই বিরাট খরচের পেছনের কারণ ছিল বিরাট এক অপমান।

আমেরিকা এসে প্রথম কাজ পেয়েছিলাম একটি খাবারের দোকানে। নাম শুনে হাসা নিষেধ – উইনারশ্নিটজেল। মালিক এক পাকিস্তানি লোক আর তার দূরপ্রাচ্যীয় (পড়ুন চিংকু) স্ত্রী। বেতন খুবই কম, ঘন্টায় মাত্র সোয়া পাঁচ ডলার। নগদে কাজ, তাই খাটনির মাত্রা ছিল অমানুষিক। ডেলিভারি ট্রাক থেকে মালপত্র নামিয়ে ফ্রিজারে সাজাতে হত, সকাল-বিকালে দোকানের ভেতর-বাহির ঝাড়তে হত, পার্কিং লট থেকে গুদাম পর্যন্ত সাফ করতে হত, আর খাবার তৈরি ও বিক্রি তো আছেই। লোকলজ্জায় বেসবল ক্যাপ দিয়ে প্রায় নাক পর্যন্ত ঢেকে নিঃশব্দে কাজ করে যেতাম।

জাত্যভিমান মানুষকে কতটা অন্ধ ও কট্টর করে তোলে, তা খুব চোখে পড়তো। একবার এক খদ্দের খাবার ফেরত দিয়ে গেলেন, আমার হাতে তৈরি দেখে। একই সাথে মুদ্রার অপর পিঠও সেখানেই দেখলাম। আমার সাথের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি চাকরির ঝুঁকি নিয়েও সেই খদ্দেরকে তাড়িয়ে দিল দোকান থেকে। আরেকবার এক খদ্দের “হেই” বলে সম্বোধনের পর সেই মেয়ে রুদ্রমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, “হেই ইজ ফর হর্সেস, অ্যাড্রেস প্রপারলি।” কৃষ্ণাঙ্গদের উচ্চারণ ঠিকমত বুঝে উঠিনি তখনও। একদিন খদ্দেরকে টাকা ফেরত দেওয়ার সময় এক সহকর্মিনী বলে উঠলো, “ডু ইউ হ্যাভ এনি পিনিস?” আমি স্রেফ বেকুব বনে গেলাম। আমতা আমতা করতে করতেই সেই মেয়ে বলে উঠলো, “দ্যাটস ওকে, আই গট ওয়ান।” এবার আমার আরও তব্দা খাওয়ার পালা। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি তার পকেট থেকে ছোট্ট-গোল এব্রাহাম লিংকন বের করার বুঝলাম পেনি চাইছিল।

সেই দোকানে যারা কাজ করতাম, তারা সবাই ছিলাম জীবন সংগ্রামে বিভিন্ন ভাবে বিপর্যস্ত মানুষ। কমিউনিটি কলেজে পড়ুয়া কিছু মেয়ে ছিল, কিছু ছিল হাইস্কুল ড্রপ-আউট। ম্যানেজারকে লুকিয়ে কাজের অবসরে লুকিয়ে তারা হোমওয়ার্ক করতো, কোনদিন টুকটাক অংক দেখিয়ে নিত। সেই সময়টায় সবাইকে আগলে রাখতেন বয়স্ক এক মহিলা। আফ্রিকার কোন এক দেশ থেকে আমেরিকা এসেছিলেন। স্বামীর সাথে। কিছুদিনের মধ্যেই সেই স্বামী পরের ঘরে চলে গেছে, ফেলে গেছে স্ত্রী আর তিন ছেলে-মেয়ে। সে-ভদ্রমহিলা সন্তানের স্নেহেই আমাদের দেখে রাখতেন। দিনের শেষে গ্রিজ জমে থাকা পাতিল নিজেই সাফ করতেন, আমাদের সুবিধার জন্য বেশিক্ষণ কাজ করতেন, ম্যানেজারকে লুকিয়ে প্যাকেটে ভরে খাবার দিয়ে দিতেন রাতের জন্য। হয়তো আজও তিনি “ইশ”কে মনে রেখেছেন, অথচ আমি তাঁর নাম ভুলে গেছি ঠিকই। কনভিনিয়েন্ট অ্যামনিশিয়া।

কাজ সেরে ফিরছিলাম এক রাতে। ২৫শে এপ্রিল, ২০০৪। রবিবার রাত সাড়ে এগারোটা। সপ্তাহান্তের ফুর্তি সেরে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেছে। ক্যাম্পাসের এক পাশ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ডর্মিটরির সামনেই মাঠ, মাঠের পাশে রাস্তা, রাস্তার একপাশে ছোট্ট মসজিদ। সামনে পড়লো তিনটি ছেলে। সৌজন্যবোধক ভাবে মাথা নাড়িয়ে হেঁটে চললাম। হঠাৎ শুরু হল গালাগালি। দ্রুত পা চালিয়ে কেটে পড়ার চেষ্টা করলাম। সাথে পেছনের পায়ের আওয়াজও দ্রুততর হল। সাথে বেড়ে গেল গালির তোড়। বাধ্য হয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। এতে কাজ হল কিছুটা। একজন একটু পৃথুল হওয়ায় বাকি দু’জন ক্ষান্ত দিল, তবে তাই বলে উৎপাত বন্ধ হল না। রাস্তার পাড়ের কাঁকড় তুলে ছুঁড়ে মারতে লাগলো। মাথায় জ্যাকেটের হুড তুলে দিয়ে রক্ষা পেলাম। প্রবাসে এসে মসজিদেরই সামনে হেনস্তা হলাম। দুঃখ, হতাশা, আর রাগ মিলিয়ে কেমন যেন এক অনুভূতি কাজ করছিল। সেই দুঃখ থেকেই অধমের অ্যালটেক লান্সিংয়ের ফাইভ-পয়েন্ট-ওয়ান সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম কেনা। সামনে পেয়ে মনে হয়েছিল, কী লাভ এত সঞ্চয়ী আর সুশৃঙ্খল থেকে? জীবন তো এমনিতেও কষ্টের, ওমনিতেও কষ্টের।

তখন চলছিল স্করপিয়নসের ক্রেজ। দেশ ছাড়ার আগে সবেমাত্র ডিভিডি কিনেছি কনসার্টের। বাইরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই অ্যাক্যুস্টিক ভার্সন যোগাড় করেছিলাম। ঠিক করলাম, রক ইউ লাইক আ হারিকেন দিয়েই উদ্বোধন করবো। তালে তালে ভুলে যাবো মাথায় তাল পড়ার কথা। সব ঠিকঠাক করে গান ছেড়ে দেখি তেমন কোন তফাৎ বুঝছি না। কিছুক্ষণ গুঁতাগুঁতি করে টের পেলাম, সাউন্ড কার্ডই কম্প্যাটিবল না। অতঃপর আবারও মন খারাপ, আবারও ধুম করে কিছু খরচ করে ফেলা। শেষতক সাউন্ড কার্ডও কেনা হল, এবং সেটার উদ্বোধন রক অই লাইক আ হারিকেন দিয়েই হল।

বড় বড় ব্যান্ডের কনসার্টে যাওয়ার শখ মিটবে, বৈশ্বিক ঘটনাবলির ঠিক মাঝখানে থাকবো, বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে বেড়াবো, অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ফুর্তি করবো, প্রশস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাবো, ফ্রেন্ডসের জোয়ি’র মত হাউ-ইউ-দুইং বলে বেড়াবো – এই ছিল দেশ ছাড়ার সময় বুকের ভেতর কুসুম কুসুম স্বপ্ন। হয়েও হল না।

খুব প্রিয় এই গানটা এভাবেই জড়িয়ে আছে জীবনের খুব অপমানজনক একটি অধ্যায় আর ভেঙে যাওয়া অনেক খুচরো স্বপ্নের সাথে।

বিছা

‘বললাম তো যাবো না, তবু এত গুঁতানোর কী হল?’ বয়সভারে ন্যুব্জ বিছরুখের গরম জবাব। বিছনাজ তাই বলে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী না। এই লেজভোঁতা সঙ্গীটার আস্ফালন দেখছে বহু বছর ধরে। বছরে কিছুদিন থাকে এমন। এই দিনগুলোয় বুড়োকে একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। আকাজ করে বসে কিছু না কিছু একটা।

গেলবার এই দিনে রাগের মাথায় জামার বুকের কাছটা খেয়ে ফেলেছিল বিছরুখ। পাশের বাড়ির বিচ্ছুকে বিশেষ ভাবে খুশি করে সে-কেলেংকারি সামাল দিয়েছিল বিছনাজ। দুর্বল মুহূর্তে কামড়ে ওর জামার কিছু অংশ ছিড়ে নিয়েছিল। বলেছিল, ‘আমার জান্টু একটু অন্যরকম না হলে হয়? আজ থেকে এটাই নতুন ধারা।’ শুনে বিচ্ছুও খুশি। ষণ্ডাটার দেখাদেখি আশপাশের দু’কলোনিতে সেই রীতি চালু হয়ে গেল। লোকেও আর বিছরুখের ছেঁড়া জামা আর আলুথালু চোখ-মুখ নিয়ে কোন কথা বললো না।

তার আগের বছর চলছিল বিছরুখের আধ্যাত্মিক সময়। তখনও বিচ্ছুটা আসেনি পাশের বাড়িতে, বিছনাজের মনেও বসন্তের পৌনঃপুনিকতা শুরু হয়নি। উত্তরপাড়ার খটখটঞ্জ থেকে বিছা ভাই বেড়াতে এসেছিলেন ওদের বাড়ি। যেমন তাঁর সফেদ আলখাল্লা, তেমন তাঁর নুরানি লেজের আগা। একহারা গড়নের পুষ্ট, নধর দেহটা দেখেই বিছনাজ বিশ্বাসী হয়ে গিয়েছিল। অতিলৌকিক কোন সত্বা না থাকলে এক দেহে এত আশীর্বাদ জমা হতে পারে না বলে তার বদ্ধমূল ধারনা হল। ধরে-বেঁধে বিছরুখকেও সে বিছা ভাইয়ের আন্তরিক মুরিদ করে দিল। বিছনাজের মত অতটা না, তবে বেশ অনেকটাই আন্তরিক।

বিছা ভাইয়ের একাগ্র ছাত্র-ছাত্রী হয়ে গেল ওরা দু’জন। দুপুর হলে বিছা ভাই বিছরুখকে স্নেহের সাথে কাছে ডেকে নিতেন। বিভিন্ন রকম তালিম দিতেন।

‘বিছার বিষ থাকে লেজের আগায়, বুঝলা? এই লেজ সুরসুর করে বলেই আমরা বিছা। তা লেজের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে আমার ছোট্ট একটা ম্যানুয়েল আছে। তোর বাড়ি আসার আসমানি নির্দেশ পাওয়ার আগে আমি খটখটগঞ্জের মেম্বারের বাড়িতে ছিলাম কিছুদিন। তখন কিছু তরিকা শিখেছিলাম; সেগুলোর লেখ্য রূপ। হাদিয়া মাত্র ১০ টাকা।’

হাদিয়ার কথা শুনেই বিছরুখ হাউ-মাউ করে উঠলো। জীবনের পদে পদে বঞ্চনার শিকার হয়ে কত কষ্টে সাজানো সংসার তার। এক বিছনাজ ছাড়া তার ফুটো কড়িটুকুও নেই। কেঁদে-কেটে সে-কষ্টের কথা বলা শুরু করতেই বিছা ভাই কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তোকে কিছু দিতে হবে না, তোর জন্য বিনামূল্যে সব। তোকে আজ নতুন কিছু শেখাবো, তুই শুধু রাত-ভোর এই তরিকা কাজে লাগাবি।’

খুশির বদলে আরো বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে বিছরুখ। আবারও কেঁদে বলে, ‘পুরনো তরিকা শেখার টাকাই নেই, বেশি দামী নতুন তরিকা কীভাবে নেবো?’

বিছরুখের কান্না উপেক্ষা করে বিছা ভাই বলে চলে, ‘এই তরিকার জন্য শহর থেকেও লোক এসেছে। কত বড় বড় লোক আমার পায়ের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দিয়েছে। বলে কিনা আমাকে নশ্বর দেহে দেখবার সাহসও নেই। আমি নাকি দেবতা, শুধু বিনয় করে দেহে ঠাঁই নিয়েছি।’

বলা বাহুল্য, বিছরুখের কান্না বেড়েই চলে। এ-সময়ই স্মিত হেসে তাকে উদ্ধার করে বিছা ভাই।

‘যাক সে-কথা, এদের এই বিষ ছাড়ানো খুব জরুরী। আমি কালরাতে স্বপ্নে নতুন এক সমাধান পেয়েছি। উলটা করে ঝুলিয়ে রাখলে অবিশ্বাস ও অতিপ্রশ্নের রোগ ভাল হয়ে যায়। এক রাত ঝুলিয়ে রাখলেই সব বিষ মুখ দিয়ে বের হয়ে আসবে। তুই যা, এই তরিকা কাজে লাগা। তোকে কিছু দিতে হবে না।’

আনন্দে ডগমগ করতে করতে বিছরুখ চলে গেল নিজের কাজে। সাঁঝের আঁধারে ঘরে থাকা উত্তম বিধায় বিছা ভাই ধীরে ধীরে হাঁটা দিলেন অন্দরমহলের দিকে। হঠাৎ চমকে দিয়ে গলায় কে যেন ফাঁস পরিয়ে দিল। বিছনাজ খ্যানখ্যান করে হেসে বলে, ‘আজ আর গামছা না, দড়ি দিয়ে বাঁধবো। আপনাকে উলটা করে বেঁধে তাংফাং করার মজাই অন্যরকম। আজকে দুগনা মজা হবে!’ বিছাভাই অবোধ্য কী সব যেন বিড়বিড় করতে লাগলেন।

ভালই চলছিল এভাবে। অপারেশন দড়িবান্ধা শেষ হয়ে গেল অল্পদিনের মধ্যেই। নতুন তরিকার খোঁজে অস্থির বিছরুখকে কিছু একটা বলে শান্ত করা দরকার। কোন কুক্ষণে বিছা ভাই মুখে এনেছিলেন সহজে মাকড়সা মারার তরিকা। মাকড়সার নাম শুনেই ক্ষেপে উঠলো বিছরুখ। অবাক বিছা ভাই কিছু বোঝার আগেই বিছরুখ তাঁর দাঁড়ির একাংশ খাবলে ছিড়ে ফেললো। আরেক দফা আক্রমণ করতে উদ্যত হতেই বিছনাজ এসে তাকে নিবৃত্ত করলো।

‘আপনাকে না কাল রাতেই বললাম, বিছরুখের সামনে মাকড়সার নাম নেবেন না? এই নাম শুনলেই ও আর স্থির থাকতে পারে না।’

মাকড়সা শব্দটি আরেকবার উচ্চারিত হতে শুনেই বিছরুখ ক্ষেপে উঠলো। সেই সংহারমূর্তি দেখেই বিছা ভাই দৌঁড়ে ভাগলেন। ক’দিন পর দেখা গেল আশে-পাশের চার গ্রাম ধরে সবাই ছিলা দাঁড়ি নিয়ে ঘুরছে। সবারটা দেখেই মনে হচ্ছে যেন কেউ সামনে থেকে খাবলে নিয়েছে। বিছনাজের বুঝতে দেরি হল না, এটা বিছা ভাইয়ের মুখরক্ষার ফিকির।

পরপর দুই ঝক্কির পর বিছরুখকে নিয়ে আর ভরসা পায় না বিছনাজ। তাই এখন এই দিনটা এলেই ওকে ঘরে বাইরে নিয়ে যায়। এ-বছর ওদের শাহী হওয়ার একটা সুযোগ আছে। ক’দিন আগেই বিছাগঞ্জ থেকে শাহী এক ভদ্রলোক এসেছেন। বিছনাজ প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে দুই শাহী রক্তের মিলন ঘটিয়ে জাতে উঠতে। বিছরুখকে নিত্য তালিম দেওয়া হচ্ছে শাহী কায়দায় কথাবার্তা বলার। মেলবন্ধনের বাকি দায়িত্ব বিছনাজ নিজের উপর নিয়েছে। ভয় একটাই, এই শাহী বংশের আবার মাকড়সাদের সাথে উঠা-বসা। কিছু হলেই বিশাল একটা আঁঠালো জাল বানিয়ে কাচ্চা-বাচ্চা সহ সেখানে আড্ডা জমিয়ে দেয়।

যত রাগারাগিই করুক না কেন, আজকে ওকে ঘর থেকে বের করতেই হবে; প্রয়োজনে বিছিলার নাচের টোপ দিয়ে হলেও। বেকুবটা যে আজও কেন ভুলতে পারে না সেই মাকড়ানির কথা। খান্দানি মাকড়ানির সাথে ফস্টি-নস্টির এক ফাঁকে কামড়টা বিছরুখই দিয়েছিল, কিন্তু বেকুব পিটার পার্কারটা ঘুরে তাকিয়ে দেখলো মাকড়ানিকে। সেই থেকে বিছম্যান না হয়ে স্পাইডারম্যান হয়ে গেল ব্যাটা।

বিছনাজ কত কষ্ট করে উপরে ওঠার সিড়িটা নিজের দখলে আনে প্রতিবার। প্রতিবারই বিছরুখটার এই খেয়ালের জন্য সব ভেস্তে যায়। আর কতকাল এভাবে চলে?

আহা, বিদেশ!

দু'দিনের তুষারপাতে ব্ল্যাক্সবার্গ ঢেকে গেছে পুরো। স্কুলের ক্লাস বাতিল করে দেওয়া হয়েছে কিছু।

আহা, বিদেশ!

ফ্রিজের বাইরে বরফ দেখার শখ আমার অনেক দিনের। আমেরিকা এসেও ৪ বছর লুইজিয়ানায় থাকার বদৌলতে শীত কেটেছে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে! গত শীতে ভার্জিনিয়া এসে দেখলাম বরফ। স্লেজিং নামক কাজটা সেবারই জীবনে প্রথম করলাম। এই শীতে বরফ পড়েছে বেশি, কিন্তু জমলো এবারই প্রথম। মাঝে -২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটেও খটখটে শুকনো ছিল।

আমার কাছে বিদেশ মানেই বরফ। শিশুতোষ এক ধরণের রোমান্টিকতা কাজ করে আমার তুষারপাত দেখলে। এই যে একটু আগে ব্ল্যাক আইসে পিছলে পা মচকে আসলাম, শক্ত মাটি মনে করে পানির উপর জমে থাকা বরফে পা দিয়ে জুতা ভিজিয়ে ফেললাম, তবুও ভালই লাগছে। ঝকঝকে রোদ উঠলেও শীত কমেনি। বালু-ঝড়ের মত উড়ছে মিহি তুষারকণা। বাতাস কাঁপিয়ে যাচ্ছে, মুখে সুঁইয়ের মত বিঁধছে, তবু ভালই তো লাগছিলো।

আমার কম্পিউটারটা জানালার পাশে। এখানে বসে দিনরাত প্রকৃতির খেলা দেখি। দু'দিন যাবৎ একটানা তুষারপাত দেখছিলাম। পরশু বের হবার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দেখিনি। ক'দিন ধরে বৃষ্টি পড়ছিল, ভাবছিলাম তেমনটাই চলবে। ফতুয়া আর একটা জ্যাকেট পরে বেরিয়েছিলাম। চোখের সামনে বৃষ্টির পানি জমে ফ্লারি হয়ে গেল, তার দু'সেকেন্ড পরই পেঁজা তুলার মত তুষারপাত।

আহা, বিদেশ!

এক ফাঁকে পয়েন্ট-অ্যান্ড-ধ্যুৎ ক্যামেরাটা নিয়েই বের হলাম পার্কিং লটে। কিছু ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট।

সিড়ি দিয়ে নেমেই...


বায়ে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তা মাত্রই সাফ করা হয়েছে...


ডান দিকে তাকিয়ে দেখি এই দৃশ্য...


ভাবলাম এদিকেই দু'কদম এগোই...


আমার বাড়ি স্টেট হাইওয়ের একেবারেই পাশে। বেড়ার পাশ দিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে...


দুই বিল্ডিং-এর মাঝের এই ধাপগুলো আমার খুব প্রিয় একটা জায়গায় নিয়ে যায়...


পেছনের দিকে আমার খুব প্রিয় সেই বেঞ্চটা, যেখানে মন খারাপ হলেই একা বসে থাকি...


এত বরফ ডিঙিয়ে নিজেকে ততক্ষণে হিলারি-হিলারি মনে হচ্ছে। ক্লিনটনের শয্যাসঙ্গিনী না, হিমালয়-বিজয়ী হিলারি। মনে হল নিজের দাবিটুকু রেখে যাই...


যাবতীয় রোমাঞ্চ কেটে গেল এই গাছটা দেখে...


অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এই গাছগুলোর মতই আলো-হাওয়ার প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পরে আছি পরের দেশে। নিজের বলতে যেই পাতাগুলো, সেগুলো হারিয়ে গেছে। নুয়ে পড়া শরীরে শুধু ভার বইছি ভিন্‌দেশি বরফকণার।

ডাক পড়লো স্লেজিং-এ যাবার। কী মনে করে যেন মানা করে দিলাম। গরুর মাংস আর খিচুড়ি রাঁধবো। তুষারকে বর্ষা করে দেবো।

আহা, বিদেশ!

একুশের নাটিকাঃ সূচনা

মহান ভাষা দিবস উপলক্ষে ভার্জিনিয়া টেকের বাঙালি ছাত্রদের ক্ষুদ্র প্রয়াস একটি নাটিকা -- সূচনা। পরীক্ষা আর ক্লাসের দৌঁড়াদৌঁড়ির মাঝে তৈরি করা এই নাটিকার ইউটিউব ভিডিও জুড়ে দিলাম। রচনা ও পরিচালনায় ছিল মাহমুদ হারুন।

আনাড়ি কাজ, ভুল-চুক হলে ক্ষমা করবেন। যেকোন প্রকার আদেশ-নির্দেশ-সমালোচনা-উপদেশ স্বাগতম। আমরা প্রত্যেকেই বেহায়া হিসেবে সুবিদিত। হাসি


সীমানা পেরিয়ে

গতকাল (২৫শে ফেব্রুয়ারি) বিডিআর-এর বিদ্রোহ নিয়ে নানান জনের অনেক রকম মত ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার নিজের মত অনেকের সাথেই মিলছে না। সেগুলো নিচে দেওয়ার চেষ্টা করছি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সহ। আমার দৃষ্টিভঙ্গি অমানবিক মনে হয়ে থাকলে দুঃখিত। আমার বিবেচনায়, ব্যাপারটা নিয়ে খুব দ্রুত আবেগপ্রবণ না হয়ে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর সম্ভাব্য ফলাফল দেখা উচিত। কখনও সময়ের অভাবে, কখনও পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে গিয়ে অনেক কিছু বলা যায় না। তবু চেষ্টা করছি খোলামেলা ভাবেই বলতে।

স্পেশাল কেস
জীবন-কলমের কালি অমোচনীয়। এতে একবার যা-লেখা হয়, তা মুছবার অবকাশ নেই। ভবিষ্যতে হয়তো টীকা জুড়ে দেওয়া যায়, চাই কি কেটে আবার লেখা যায়, কিন্তু মুছে নতুন করে লিখবার কোন অবকাশ নেই। সেই সাথে আরও সত্য, জীবন-খাতার পাতা উলটে বারবার পেছনে যাওয়া যত কমানো যায়, ততই ভাল। জীবন চলার অংশ হিসেবেই এই শিক্ষাটুকু আমরা ধারণ করি। কথাগুলো রাষ্ট্রের বেলায়ও সত্য। এই বিবেচনায় আমি “স্পেশাল কেস”-এর বিপরীতে।

এখানে “স্পেশাল কেস” হল আইনের স্বাভাবিক গতিকে রহিত বা প্রভাবিত করা। কোন অপরাধের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করা এমনই একটি স্পেশাল কেস। প্রতিটি স্পেশাল কেস একটা রাষ্ট্রকে ঐ সময়টায় আটকে রাখে। আমরা পঁচাত্তরের স্পেশাল কেসে ফিরে যাই আজও বারবার। দেরিতে হলেও আমরা উপলব্ধি করেছি যে অপরাধমাত্রেই তা শাস্তিযোগ্য, উদ্দেশ্য যেমনটাই হোক না কেন।

সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার দ্রুততা
বিডিআর-এর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিতে শুরু করেছেন বলে খবরে প্রকাশ। এর বাইরে তাদের হাতে কোন উপায় ছিল না। ঘেরাও অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকতে পারতেন না তারা। অনেকে দ্বিমত পোষন করলেও আমি এত দ্রুত সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার বিপক্ষে ছিলাম, আছি এখনও। সেই বিচারই শ্রেষ্ঠ, যার পর বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। বিডিআর-এর দাবিগুলো ন্যায্য, কিন্তু সেই যৌক্তিকতা তাদের মানুষ হত্যার অধিকার দেয় না, দেশ ও সরকারকে জিম্মি করার অধিকার দেয় না। দাবি মেনে নেওয়া উচিত, তবে সেই সাথে বিচারেরও সম্মুখীন করা উচিত। তাহলেই সকল পক্ষের প্রতি সমান থাকা হবে। তাছাড়া, অপরাধের মাত্রা ও কারণ না জেনেই ব্ল্যাঙ্কেট ইমিউনিটি দেওয়া খুব বড় একটি কৌশলগত ভুল। এখন বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে অনেক রকম অপকর্মের কথা। এগুলো না জেনেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা ঠিক ছিল বলে মনে করি না আমি।

আনুপাতিক প্রতিবাদ
এরপরের প্রসঙ্গ ছিল অনুপাতের। সেন্স-অফ-প্রোপোরশন অতিক্রম করে যাওয়া যেকোন কিছুই অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য। চুরি, দুর্নীতি বন্ধ করা সবার দাবি, ন্যায্য দাবি। তাই বলে এই দাবি আদায়ের জন্য সহিংস হওয়া ন্যায্য না। যেই দাবিগুলো করা হয়েছে, সেই একই দাবি সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা করে থাকেন। আলোচনা, কর্মবিরতি, বা অবরোধের মাধ্যমে আদায়ও করেন। তারা বিডিআর-এর জওয়ানদের চেয়ে শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থানে খুব উন্নত নন। একবার এমন কোন জিম্মি অবস্থায় মাথা নত করে ফেললে তা চিরকালের জন্য সরকারকে দুর্বল করে দেবে।

প্রাণহানি হ্রাস বনাম প্রাণের মর্যাদা
যেকোন সশস্ত্র বিদ্রোহ চলাকালে প্রথম বিবেচ্য অবশ্যই প্রাণহানি হ্রাস। তবে এসময় অনেক রকম হিসাব ও সমীকরণ মাথায় রাখতে হয়। অনেক রকম আলোচ্য ও বিবেচ্য বিষয় থাকে। এর কিছু থাকে অবস্থা-নির্ভর, আবার কিছু থাকে সার্বজনীন। প্রাণহানি সর্বোচ্চ অপরাধ। এর বিনিময়ে যদি কারও দু’দিনের জেলও না হয়, তাহলে আইনের দরকার কী? প্রাণহানি হ্রাস যেমন প্রয়োজন, তেমনি হারিয়ে যাওয়া প্রাণের মর্যাদা দানের প্রশ্নও থেকে যায়।

নেগোসিয়েশন
কোন প্রকার সমঝোতা ততক্ষণই এগিয়ে যায়, যতক্ষণ উভয় পক্ষের কিছু চাইবার থাকে। প্রতিপক্ষের সব চাওয়া একবারেই পূরণ করে ফেললে তাদের মর্জির মুখাপেক্ষী হয়ে যেতে হয়। অতিদ্রুত সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করায় তা-ই হয়েছে। সাধারণ ক্ষমা হল সরকারের হাতের তুরুপের তাস। এটি শুরুতেই খেলে ফেলা মানে প্রতিপক্ষকে হাই-গ্রাউন্ড দিয়ে দেওয়া। এটি চূড়ান্ত মার্জনা, এবং তা পাবার জন্য অপরাধীকে চূড়ান্ত ভাবেই কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত হতে হবে। একজন প্রধানমন্ত্রী সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করতেই পারেন। এটি রাজনৈতিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত, তবে এটি আসবে একেবারে শেষে। অতি দ্রুত সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করায় বিডিআর-এর সদস্যরা আরও দাবি করেছেন, অস্ত্র জমা দিতে গরিমসি করেছেন। এ-ধরণের ঘটনায় একজন প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান এবং কর্তৃত্ব প্রচণ্ডভাবে দুর্বল হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল নিম্নবিধ পালটা প্রস্তাব দেওয়াঃ
- প্রথমে অস্ত্র নামিয়ে রাখতে হবে
- নারী, শিশু, ও বেসামরিক ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতে হবে
- সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে
- আত্মসমর্পণের পর অভিযুক্তদের যথাযথ নিরাপত্তার বিধান করা হবে
- সকল অপরাধের বিচার হবে
- বিচারের পর আদালত উপযুক্ত শাস্তির বিধান করবেন
- এই আইনী প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সাথে সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়া বিবেচনা করবেন

এই পন্থা বিডিআর-এর কেউ স্বেচ্ছায় মেনে নিতে না চাওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু এর বিপরীতে তাদের মনে করিয়ে দেওয়া ছিল দু’টি বিষয়। প্রথমত, একটি সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে তারা প্রধানমন্ত্রীর আদেশ মানতে দায়বদ্ধ। ক্ষমা করবার পূর্বে তাদের দিক থেকেও প্রমাণ রাখা প্রয়োজন যে তারা ব্যারাকে ফিরে একটি অনুগত ও সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে কাজে যোগ দেবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ক্ষমা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তা গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তুত হলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভাল চিন্তা করলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরী। দেশের কথা ভেবেই প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে তাদের। খুনের অপরাধ মাফ হয়ে যাওয়া অনেক বড় ব্যাপার, এবং এই সুবিধাটি তাদের অর্জন করে নিতে হবে।

আইনের শাসন
পরের প্রসঙ্গ আইনের শাসনের। আইন প্রণয়নের সময় তা একদিনের জন্য তৈরি করা হয় না। আইনের কোন বিবেক নেই, আইনের কোন বুদ্ধি নেই। দুইয়ে দুইয়ে যেমন প্রতিবার চার হয়, তেমনি আইনের বিবেচনায় কোন অপরাধের শাস্তি প্রতিবার একই হয়। এই নৈর্ব্যক্তিকতার কারণেই আইন সার্বজনীন। আইনের লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্রের দুর্বলতম নাগরিকের সকল নাগরিক অধিকার সর্বোচ্চ প্রতিকূলতার মুখেও রক্ষা করা। এ-কারণেই আইনে স্পেশাল কেস থাকতে নেই। এই সাধারণ ক্ষমা এটাই প্রতিষ্ঠিত করে গেল যে সাধারণ, নিয়মানুবর্তী নাগরিকের চেয়ে বিশৃঙ্খল বন্দুকধারীর ক্ষমতা বেশি। সব অপরাধের আইন আগে থেকেই তৈরি থাকে না। সেক্ষেত্রে বিবেচনার ভিত্তিতে অপরাধের প্রতিবিধান নির্ণীত হয়। এই ঘটনায় খুব খারাপ একটি প্রিসিডেন্স তৈরি করে গেল। এরপর যে-কেউ নিজের মত আইন হাতে তুলে নেবেন।

ক্ষমা বনাম সাধারণ ক্ষমা
সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার আগে পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটু সবিস্তারে জেনে নেওয়া উচিত ছিল। সব ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য না জেনেই এই ক্ষমা ঘোষনা করা হয়েছে। একটু একটু করে অনেক খবর বেরিয়ে আসছে এখন। বিডিআর-এর জওয়ানদের হাতে সার্বক্ষণিক অস্ত্র থাকার কথা না। তারা কীভাবে সুসজ্জিত হয়েই তৈরি ছিলেন? ঊর্ধ্বতন অফিসারদের বিভিন্ন ভাবে অপদস্ত করা হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। তাদের দিয়ে শারীরিক কসরত করানো হয়েছে। এটি কি দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন, না “হেইট ক্রাইম”? সেনাবাহিনীর কর্নেলদের খুন করে ড্রেনে লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছে। যত অপরাধীই হোন না কেন, পদস্থ অফিসারদের এভাবে অপমান করা কি ঠিক? ড্রেন থেকে তুলে আনা লাশে শুধু গুলি নয়, মুখে বেয়নেটের খোঁচার দাগও দেখা গেছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। এই অভব্যতা কি ক্ষমার্হ?

সাধারণ ক্ষমা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর, কিন্তু ক্ষমা করবার আগে জেনে নেওয়া উচিত কী কী অপরাধ ক্ষমা করা হচ্ছে। সে-ব্যাপারে স্পষ্টভাবে আলোচনা হওয়া উচিত। এই অপরাধ সংঘটনের পর বিডিআর-এর সদস্যরা কি আবারও পুনর্বহাল হবেন পূর্বপদে? একটি রাষ্ট্রের জন্য কি খুব সুখকর পরিস্থিতি এটি? সে-কারণেই অপরাধ, প্রতিবাদ, বিশৃঙ্খলা, এবং বাড়াবাড়ির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত ছিল।

কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য
একটা সময় মানুষ বর্বর ছিল। সে-আমলে আলফা-মেল বলে একটা ব্যাপার ছিল। এ-কালেও গরিলাদের মধ্যে এমনটা দেখা যায়। সোজা বাংলায় একে “জোর যার, মুল্লুক তার” বলা হয়। সে-আমলে দ্বৈরথে জয়ীরাই হতেন নেতা, তাদের কথায়ই চলতো সবকিছু। আমরা সে-যুগ পেরিয়ে এসেছি। এখন বুদ্ধির শাসনের যুগ। পেশি চালিত হয় বুদ্ধি দিয়ে। সে-কারণেই পেশি বা নিশানা নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করলে কোন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। নিয়ম মানতে কারোই ভাল লাগে না, কিন্তু তবুও নিয়মানুবর্তীতার চর্চা করতে হয় বৃহত্তর স্বার্থেই। খেলার মাঠে আন্ডারডগদের সমর্থন করা এক জিনিস, কোন অর্গানগ্রামের নিম্নপদস্থ কাউকে সমর্থন করা আরেক।

উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হয় যেখানে অধঃস্তনদের দাবি-দাওয়া শুনা ও মানা হয়। সেক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তারা কোন দাবি না মানলে সেটি যুক্তিযুক্ত হতে পারে। সময় সময় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, এবং তা অস্বাভাবিক সমাধানের দাবি রাখে। আমি মনে করি না যে বিডিআর-এর অবস্থা অতটা নাজুক ছিল। যদি হয়েও থাকে, তবুও তা নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের ধাপগুলো অতিক্রম করে এই পর্যায়ে আসা উচিত ছিল। আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা “সাধারণ কৃষকের ছেলে” বলে কেউ নিয়মের বাইরে বলে দাবি করাটা তাকে প্রকারান্তে অযোগ্য বলে অপমান করা বলে আমি মনে করি।

বিডিআর সদস্যরা সাধারণ মানুষের আবেগের কাছে আহ্বান করেছেন। সেই আবেগ আমাকেও ছুঁয়েছে, তাদের দুর্দশায় আমারও মন কেঁদেছে, কিন্তু তাই বলে আমি তাদের অপরাধটুকু ভুলে যেতে পারছি না। শুধুই আবেগের বশবর্তী না হয়ে তাই একটু দূরপ্রসারী প্রভাবগুলো ভেবে দেখা প্রয়োজন।

সেনাবাহিনী বনাম বাংলাদেশ
এভাবে সাধারণীকরণ করতে আমি নিজে খুব অপছন্দ করি, তবু মন থেকে প্রশ্নটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারছি না। এই সংঘাতে সেনাবাহিনীর বিপরীতে মানুষের অবস্থান কি পূর্বের রাগের ফল নয়? মনে রাখা প্রয়োজন যে “বিগত দু’বছরের সেনাবাহিনী” আর “বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী” এক নয়। সীমান্ত প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীর অধীনস্ত। এই বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা অন্য কারও বিরুদ্ধে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হত। রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ-ধরণের প্রতিক্রিয়া দূষণীয় ও পরিত্যাজ্য।

নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক দিক থেকে দেখলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে এই বিদ্রোহ ছিল সেনাবাহিনীর গালে একটি চড় কষে দেওয়া। একই ভাবে, বিনা বিচারে বিডিআর-কে ক্ষমা করে দেওয়া সেই অপমানকেই আরও ঘনীভূত করবে। বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য এটি অনেক বড় আঘাত। তাদের কর্তৃত্ব অনেক বেশি কমিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা এটি। সাম্প্রতিক কালে সেনাবাহিনীর দৌরাত্ম্যে বিরক্ত হয়ে এই ঘটনায় খুশিতে বাজনা বাজানো খুব সহজ। ভুলে যাওয়া সহজ যে এই বাহিনীর ঐতিহ্য এবং অহংকারের সাথে আমাদের দেশের নিরাপত্তা ও সম্মান জড়িত। সেনাবাহিনীর অন্যায়গুলো শুধু বিডিআর-এ হয়নি বা শুধু এই ক’মাসে হয়নি। অনেক আগে থেকেই ঘটা আসা এই অনাচার আমরা চলতে দিয়েছি। সেই দায়বদ্ধতা মাথায় রেখি সমালোচনা করা উচিত, সেনাবাহিনী কোন ভাবে অপদস্থ হলে তাতে খুশি হওয়া উচিত নয়।

নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিডিআর হেড কোয়ার্টারে যাওয়া ছিল অনেক বড় ঝুঁকি। এই সিদ্ধান্ত সহ পুরো ব্যাপারে কৌশলের চেয়ে আবেগ কাজ করেছে বেশি। সরকার থেকে নাগরিক পর্যন্ত সকল পর্যায়ে আবেগের এই আতিশয্য খুব খারাপ লক্ষণ। এই সরকারকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে, সেনাবাহিনীর গ্রাস থেকে রাজনীতিকে বের করতে হবে, নিজের দলের দস্যুবৃত্তি ঠেকাতে হবে। এতটা আবেগপ্রবণ হলে এর প্রতিটিই অর্জন করা দুষ্কর।

ঘটনা যেভাবে গেল (বা যেতে দেওয়া হল), তাতে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষের সম্ভাবনা থেকে যায়। এই বিবেচনায় বিডিআর-এর ভালর জন্যই হয়তো তাদের জেল-হাজতে যাওয়া উচিত ছিল। ডিজিএফআই ঘটনার আগে ঘাস খেলেও ঘটনার পর শোধ তুলতে ছাড়বে না। কত নালা-নর্দমায় বিডিআর জওয়ানদের লাশ পড়ে থাকবে, তা কে বলতে পারে? পাশাপাশি আইনের শাসনের প্রসঙ্গটি তো আছেই। সেনাবাহিনীর একটি অংশ লোভ এবং দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। তারা তাদের এই অবস্থান এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না। এ-ধরণের লোক অনেক বেশি বেপরোয়া হয়। সরকার শুধু বিডিআর নয়, সেনাবাহিনীরও অভিভাবক। তাদের এভাবে অপদস্থ হতে দেওয়ায় নিয়মনিষ্ঠদের দলে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়ে গেল।

শুদ্ধস্বর
সেনাবাহিনীর ভ্রষ্ট সংস্কৃতি শুদ্ধ করতে এবং রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর এক রকম দখলদারিত্ব রোধ করতে সরকারকে খুব দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। যে-সরকার এক দিকে সামান্য বিডিআর-কে (কিংবা ছাত্রলীগকে!) সামলাতে পারে না, এবং অন্য দিকে সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা কীভাবে আস্থা পাবে সেনাবাহিনীর? এই শুদ্ধির জন্য যেই দৃঢ় স্বর প্রয়োজন, তা এখনও সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অনেক কথা বেরিয়ে এসেছে। এমনকি কিছু ব্যাপারে সেনাপ্রধানের নামও শোনা গেছে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত ছিল এমন পথে আগানো যাতে উভয় তরফ থেকেই কিছু মধ্যপন্থী মানুষ তাদের সমর্থন করে। বিডিআর-এর হত্যাযজ্ঞ সকাল নাগাদই হয়ে গিয়েছিল। তাদের ঘিরে ফেলা হয়েছিল, কোণঠাসা করা হয়েছিল। আর কিছুক্ষণ সময় দিলে, এবং সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য ক্ষমা ঘোষনা করলে একটু পরে তারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে পড়তো। শুভবুদ্ধির মানুষেরা সামনে এগিয়ে আসতে পারতো। একই সাথে, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের উপর আক্রমণ করে কেউ সাধারণ ক্ষমা পেয়ে যাওয়াটাও ভাল ভাবে নেওয়ার কোন কারণ নেই।

খুনের অপরাধেরও ক্ষমা হয়, তবে তা বিচারকার্যের নিষ্পত্তি এবং অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার পর। এক্ষেত্রেও সেটি করা যেত বলে আমার মত। সেই সাথে এটি আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে এই দেশে ভাংচুর করলে সব দাবি মেনে নেওয়া হয়। শাস্তি প্রদান কিংবা নিদেনপক্ষে বিচারকার্য হলে এটি প্রতিষ্ঠিত হত যে ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া হবে, তবে অন্যায্য পন্থা সহ্য করা হবে না।