Showing posts with label কথোপকথন. Show all posts
Showing posts with label কথোপকথন. Show all posts

Monday, July 13, 2009

প্রবাসের কথোপকথন - ১৮

– বোর্ডিং পাস আর আইডি দেখাও।
: লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটা পঙ্গু, অথর্ব মানুষ আমি। এত জায়গায় আইডি দেখালাম, এখন প্লেনের দুয়ারে এসেও ঝামেলা করতে হবে, তাই না? কত যে ঘাঁটাতে পারো তোমরা!

– এই ছোকরা, ফেলে চলে যাবো কিন্তু তাহলে। আমি মানুষ খুব খারাপ।
: আচ্ছা দেখো, দেখো। হুঁ, আমি জানি সিট কোথায়। বেছে বেছে সামনের দিকের আইল সিট নিয়েছি। এখন এই নরাধমকে দেখতে দেখতে যেতে হবে তোমার।

– দেখা যাবে কী হয়। এ কী, লাঠি হাতে রেখেছো কেনো? ওটা কোথাও সরিয়ে রাখতে হবে। কষ্ট করে উপরে তুলবার দরকার নেই। আমি আমার কোট ক্লজেটে রাখছি। প্লেন থামলে এনে দেবো।
: তথাস্তু। এই নাও। তোমাদের প্লেনে তো সামনের দিকেও অনেক আওয়াজ দেখছি।

– ব্যাপার না। এই ব্রাউনিটা একটু চেখে দেখো তো। আজকের বিশেষ খাবার এটা। বয়ফ্রেন্ডের জন্য কিছু নিয়ে যাবো কিনা ভাবছি।
: ভুল মানুষকে দিলে। আমি চিনি বেশি খাই। এক কাপ চায়ে চার-পাঁচ চামচ পর্যন্ত নিয়ে ফেলি। অন্য কাউকে দাও।

– কেউ তো নিচ্ছে না দেখি। তা তুমি এমন বেজার মুখ করে বসে আছো কেনো? ঝামেলা হয়েছে কোনো?
: নাহ, তেমন কিছু না। ট্রাভেল কিট-এ আমার সবকিছু থাকে, তবুও কী সব নিয়মের জন্য একটা একটা করে বের করে জিপলক ব্যাগে ঢুকাতে হল। এবারে দেখলাম নেল-কাটার, সেফটি-রেজার, ইত্যাদি নিতে দিচ্ছে। আমার একটা ৭ আউন্সের কৌটায় কয়েক ফোঁটা আফটার-শেভ ছিলো, সেটা নিতে দিলো না। বলে, কৌটার ভেতরে যতটুকুই থাকুক, কৌটার আকার ৩ আউন্সের বেশি হতে পারবে না। যন্ত্রণার শেষ নেই।

– মন খারাপ কোর না। কী ড্রিংক নেবে তুমি? বাড়তি একটা কোক রেখো তাহলে। তোমার দুস্থ অবস্থার সম্মানে।
: চিয়ার্স টু অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন!

– কেনো, এমনিতে কি বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া যায় না? যাক, কাজে নামি আমি এবার।
: তা তো অবশ্যই। তোমার গৎবাঁধা কথাগুলো বলে নাও। আমি পালাচ্ছি না।

– উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি মেমফিস থেকে গ্রিন্সবোরো পর্যন্ত এই ফ্লাইটে। আমাদের আনুমানিক যাত্রাকাল সাড়ে ছয় ঘন্টা…
: সে কী? টিকেট তো বলছে দেড় ঘন্টা!

– গত ফ্লাইটের কথা ভুলে গেছো? মিসিসিপি’র উপর ঝড়-বাদলা হওয়ায় গত ফ্লাইটে আমাদের আকাশে চক্কর দিতে হয়েছে আড়াই ঘন্টা। এক ঘন্টার ফ্লাইটের জন্য আড়াই ঘন্টা বাড়তি দেরি হওয়ায় তোমরা সবাই বিরক্ত, তাই এবারে আমি একটু বেশি করে বলে দিলাম আর কি।
: গড ফরবিড। মনে হয় না এমনটা হবে এবার। এদিকের আকাশ পরিষ্কার দেখলাম রওনা দেওয়ার আগে।

– সিট বেল্ট ও ইমার্জেন্সি বিষয়ক খুঁটিনাটিগুলো মেনে চলার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমার পক্ষে যদি আপনাদের এই যাত্রা কোনভাবে আনন্দদায়ক করা সম্ভব হয়, তবে নিঃসংকোচে জানাবেন। আপনাদের মনোরঞ্জনের জন্য আমি যেকোন কিছু করতে প্রস্তুত। এনিথিং টু মেইক ইয়োর ফ্লাইট এনজয়েবল অ্যান্ড কমফোর্টেবল… উইদিন রিজন। আই ডোন্ট ডু ফুট মাসাজ; নট এনিমোর। সো, ডোন্ট অ্যাস্ক। একটু পর তোমাদের আমি কিছু খাবার দেবো। তারপর সময় করতে পারলে গল্প শোনাবো, আর সবশেষে থাকবে গান।
: বিমানবালা বেশ রসিক দেখছি। আপনি তো মনে হয় অনেক ঘুরে বেড়ান। সব সময়ই কি এমন?

– সব সময় না। তবে এই জন তো অনেক বেশিই খোশ মেজাজে আছে মনে হয়। বাকি পথ আরামে কাটলেই হয়। তুমি ছাত্র?
: জ্বী, আমি ভার্জিনিয়া টেকে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। তড়িৎকৌশলের ছাত্র। আপনিও কি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট?

– নো, বাট আই হ্যাভ আ বিয়ার্ড! আমি কর্নেল থেকে পাশ করেছিলাম। আমিও একই বিষয় নিয়ে পড়েছি। প্রায় বিশ বছর আগের কথা। আমার এখন নিজের ব্যবসা আছে একটা। বিছানা বানাই। ঐ যে, পার্টনার ফোন করেছে।
: কর্নেলে আমার খুব কাছের এক বন্ধু পড়ে, প্রশংসা শুনেছি খুব। কান তো বন্ধ রাখা যায় না, তাই তোমার ফোনের কথাবার্তা কিছুটা শুনে ফেলেছি বলে দুঃখিত। তোমার ব্যবসা ভালই চলছে মনে হলো। এই মন্দার মধ্যেও তো বেশ লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছো।

– আমি অসুস্থ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য বিছানা, হুইল-চেয়ার, ইত্যাদি বানাই। ব্যবসার ধরনটাই এমন যে এটার উপর মন্দা তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। আমরা মূলত ডিজাইনের কাজটুকু করি। প্রতি ইউনিটে বেশ ভালই লাভ থাকে।
: ভালই তাহলে। এবারেও কি বিজনেস ট্রিপ ছিলো?

– উহু, এটা ছিল এমনি বেড়াতে যাওয়া। এক সপ্তাহ ফ্লোরিডায় ছুটি কাটিয়ে এলাম।
: বেশ ভালোই তাহলে। প্লেন মনে হচ্ছে একটু পরেই ছাড়বে। আমাদের আগে যা লম্বা লাইন দেখতে পাচ্ছি! দেড় ঘন্টার ফ্লাইট হওয়ার কথা। এখন দেখি ছাড়তে ছাড়তেই দেড় ঘন্টার উপর হয়ে গেল ভিড়ের কারণে। বিমানবালা আসছে আবার, কিছু বলবে মনে হয়।

– জরুরি কোনো কাজে ব্যস্ত না থাকলে একটা প্রশ্ন করতাম আপনাকে।
: না, ব্যস্ত নই। বলে ফেলো। আমার লাঠি ফেরত দেবেন?

– না, তোমাকে না। তোমার পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করছিলাম।
: বলুন কী প্রয়োজন। কোনো সমস্যা হয়নি তো?

– আপনি কি আপনার স্ত্রী সহ এসেছেন?
: জ্বী, আমার স্ত্রীও এই প্লেনেই আছেন।

– আপনি চাইলে তাঁর সাথে বসতে পারেন। আমি সিট বদলে দিতে পারি আপনাদের সুবিধার্থে।
: সে-কষ্ট করতে হবে না। আমি বেশ আছি। ধন্যবাদ।

– ঠিক আছে তাহলে। আপনার স্ত্রী বলছিলেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। আমি অন্য দিকে যাই তবে। প্রয়োজন পড়লে জানাবেন…
: আপনার স্ত্রী ডাকলেন, তবু গেলেন না?

– আমার স্ত্রী আছে, তবে আমার ছেলে সহ। যে-ভদ্রমহিলার কথা বিমানবালা বলছিলো, তিনি আমার স্ত্রী নন। বিমানবালা ভুল করে আমাকে ডাকছিলো। ভদ্রমহিলা সুন্দরী বেশ। পাশে বসতে পারলে মন্দ হতো না, কী বলো?
: তাহলে তো মিস করে ফেললে। চলে যেতে। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলতে, বিমানবালার ভুল।

– স্ত্রীর সামনে এই কাজ করা যায় নাকি? বাসায় গেলে তো আমাকে নাইনটি ডে’স, নো ইন্টারেস্ট প্রোগ্রামে ফেলে দেবে। ক’দিন পরেই ২৫ বছর পূর্তি।
: হাহ হাহ, মনে হয় না এই বয়সে এসে এমন ব্যাপারে সুযোগ নেবে তুমি।

– তা আর বলতে। যাক, ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা বলে। আমার কার্ড রাখো, কখনও দেখা হবে আবার।
: না হলেই ভালো। তোমার কাজের যা ধরন, তাতে দেখা না হওয়াই সুলক্ষণ।

– আই’ল কাট ইউ আ ডিল, তবে আশা করি আসলেই দেখা হবে না আর।
: আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমাকে তো চিনবে না, তবু পারলে ওদিকটায় বেড়াতে যেয়ো, ভালো লাগবে। বিমানবালা এবারে কী বলে শুনে দেখি।

– আমাদের সাথে এই ফ্লাইটে থাকবার জন্য অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আমার আতিথেয়তা যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তবে মন খুলে উপহার দিতে পারেন। আই ওনলি এক্সেপ্ট ডায়মন্ড নেকলেস, গোল্ড ব্রেইসলেট, অ্যান্ড রুবি রিংস। তোমাদের গল্প বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম তার আগেই অনেকে ঘুমিয়ে গেছো। তাই সে-চেষ্টা আর করলাম না। আই ডিড সিং ফর ইউ, দো। আই স্যাং সোলো। পারহ্যাপ্স সো লো দ্যাট ইউ ডিড নট হিয়ার মি। শুভ হোক তোমাদের বাকি দিন।

প্রবাসের কথোপকথন - ১৭

– হে, ইশ! আর কতক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরার পর আমাকে চিনবে?
: খুবই দুঃখিত, ডন। একটু বেখেয়াল ছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ঠিক সাড়ে এগারোটায়ই আসবে। সেজন্য বাইরের দিকেই নজর ছিল। খেয়াল করি নি যে এসে বসে আছো।

– কোন ব্যাপার না। আমি মজা দেখছিলাম। আই ওয়াজ গোয়িং টু লেট ইউ ওয়ান্ডার অ্যাবাউট সাম মোর।
: দু’বছর পর আবার এলাম তো, এতদিনের চেনা লুই’স ক্যাফেও কেমন যেন অচেনা ঠেকছিল। শহরটা কত বদলে গেছে। এই সামনেই তো বিশাল একটা শপিং এরিয়া ছিল, এখন দেখি সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

– হ্যাঁ, গত দু’বছরে অনেক দালান-কোঠা হয়েছে। শহরটা খাপছাড়া রকম আধুনিক হয়ে গেল চোখের পলকে। কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। ক্যাটরিনার পর নিউ অর্লিয়েন্স তার সব জৌলুস হারালো, আর এদিকে ব্যাটন রুজে শুরু হল ঠিকাদারির ধুম।
: এটাই জগতের নিয়ম। তবে এবার দেখলাম গুস্তাভ অনেক গাছ-পালা ফেলে দিয়ে গেছে। আগে কত সবুজ ছিল ব্যাটন রুজ। কচু নামে একটা খাবার আছে আমাদের দেশে। লুইজিয়ানা বেড়াতে এলেই লোকে কচু তুলে নিয়ে যেতো। প্লেন থেকে তাকালে সবুজ সমুদ্র মনে হতো। এখন গাছ কমে গেছে অনেক। কিছু গেছে প্রকৃতির ঘূর্ণিঝড়ে, কিছু গেছে কংক্রিট মিক্সারের ঘূর্ণিতে।

– এটাই স্বাভাবিক। কোথাও কমতি হলে কোথাও বাড়তি হবেই। তুমি তো কিছুটা বদলেছো। শুকিয়ে গেছো আগের চেয়ে, লুকস-ও একটু ভিন্ন।
: ভেতরের পরিবর্তনের তুলনায় বাইরেরটুকু কিছুই না। এই দু’বছরে অনেক কিছু শিখলাম। অনেক নাইভ ছিলাম আগে। বিশ্বাস করে ঠকতে ঠকতে টনক নড়েছে।

– চিয়ার আপ। এটা কোন ব্যাপার না। ইউ আর নট ইভেন টুয়েন্টি ফাইভ।
: আই অ্যাম, অ্যাকচুয়ালি।

– সো ইউ জাস্ট টার্ন্ড টুয়েন্টি ফাইভ…
: মেক দ্যাট টুয়েন্টি সিক্স অ্যান্ড আ হাফ। এনিওয়ে, ইউ ওয়্যার সেইং…

– আমার এই শিক্ষাটা হয়েছিল ৪৭ বছর বয়সে। আমার অধীনস্থ লোকজন মিলে ভোট দিয়ে আমাকে বাদ দিয়ে দিলো। আমি তখন এলএসইউ-তে কাজ করি। কী এক কারণে টাকা কিছুটা কমে গেছে ডিপার্টমেন্টে। ওরা সবাই মিলে ঠিক করলো যে আমাকে বাদ দিয়ে আমার বেতনের টাকাটা সবাই মিলে ভাগ করে নেবে।
: এটা তো এমন ঘটনার জন্য খুবই বাজে সময়। ওই বয়সে মানুষ সংসার গুছিয়ে বসে, জীবনের শেষ অংশটার জন্য প্রস্তুতি নেয়।

– আমার দুই মেয়ের তখন ভার্সিটি শুরু করার সময়। আচমকা এক সকালে শুনি আমার চাকরি নেই। আমি আর আমার স্ত্রী তখন একেবারেই হতভম্ব। গতকাল বিকেলে যারা আমার সাথে এক সাথে বাজার করলো, লাঞ্চ খেলো, আমার মেয়েদের সাথে আহ্লাদ করলো, তারা আমাকে সকালে বলে যে আমার চাকরি নেই। উই আর স্যরি, ডন, বাট দেয়ার ইজ সামথিং উই গটা ডু।
: দুঃখজনক, খুবই দুঃখজনক। কী বলবো বুঝতে পারছি না।

– দুঃখের কিছু নেই। কিছু লোক খুব অমানবিক আচরণ করেছিল আমার সাথে। যা করেছে, শুধু তা নিয়েই রাগ ছিলো না। ওরা আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছিলো না পর্যন্ত। আই ওয়াজ অ্যাংরি, আই ওয়াজ ভেরি অ্যাংরি।
: তোমার রাগ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আড়াই বছর তোমার অধীনে কাজ করেছি, খুব একটা কম সময় তো না।

– আরে নাহ, তোমার সাথে তো আমি রাগ করিনি কোনদিন। অন্যদের উপর করেছি অবশ্য। তবে ঐ লোককে আমি একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারতাম। দেয়ার উড বি টু ব্লোজ। ওয়ান ইজ মে হিটিং হিম, দি আদার ইজ হিম হিটিং দ্য ফ্লোর।
: এই বয়সেও তোমার যা শরীর, তুমি অনায়াসেই পারতে, সে-নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

– আমি এখনও নিয়ম করে জিম-এ যাই। তাছাড়া জীবনভর পরিশ্রম তো আছেই। আমার শুরুটা কিন্তু খুব অনাড়ম্বর। ওকলাহোমার একটা পাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। বাবার সাথে কাজে হাত লাগাতে হতো। ছেলেবেলায় গরু চরিয়েছি, কাঠ কেটেছি। সেখান থেকে লেখাপড়া করে উঠে এসেছি এতদূর।
: আমার মত ফার্স্ট জেনারেশন ইমিগ্র্যান্টদের জন্য এই কাহিনীগুলো খুব প্রেরণাদায়ক। সবাই মনে করে এখানে ডলার গাছে ধরে, নয়তো যুদ্ধ করে এত উন্নতি হয়েছে। একটা দেশ গড়তে যে তোমার মত কত শত মানুষ প্রয়োজন, সেটা কেউ বোঝে না।

– সেই লোকগুলো এখন আর লুইজিয়ানায় নেই। একজন ওকলাহোমায়ই আছে বলে জানি। আমি তখন বলেছিলাম যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় খুব ভাল কিছু বন্ধু আছে। আমাকে বাদ দেবে দাও, আমি শুধু কিছু ফোন কল করবো এরপর। করেছিলামও। এই অন্যায়ের জন্য আমি এল-এস-ইউ’কে স্যু করতে পারতাম। আই কুড ওউন দ্য ম্যাসকট, কিন্তু আমারই এক কাছের বন্ধুকে পাঠালো আমার কাছে। অনুরোধ করলো যেন আমি আইনী পথে না যাই, ওরা ব্যাপারটা নিজের মত মীমাংসা করবে।
: তাহলে তো বেশ ভাল ভাবেই উৎরে গেলে শেষ পর্যন্ত। ঝামেলা আরও অনেক দূর গড়াতে পারতো।

– তা তো পারতো অবশ্যই। তুমি বলেছিলে যে তুমি অ্যাকাডেমিয়ায় থাকার চিন্তা করছিলে, তাই বললাম। দু’টা কথা মনে রাখবে সব সময়। প্রথমত, এমন কিছু পড়বে যাতে সত্যিই আগ্রহ পাও। আদারওয়াইজ ইউ ও’ন্ট হ্যাভ আ রিজন টু ওয়েইক আপ এভরি মর্নিং। দ্বিতীয়ত, অ্যাকাডেমিয়ায় কাউকে বিশ্বাস করবে না। আমরা আগে অনেক দান-খয়রাত করতাম। অথচ ১০ বছর পরও দেখি, পিপল ইউ আর হ্যাভিং কফি উইথ ও ইউ মানি! মানুষ খুবই বিচিত্র।
: দুটোই আমি খুব মূল্য দিয়ে শিখেছি। এই যে রিসেশন, চাকরির বাজারে খরা, এরপরও টিকে আছি নিজের আগ্রহের কিছু নিয়ে পড়েছি বলে। হয়তো এই লাইনে টাকা-পয়সা পাইনি, তবুও মনে শান্তি আছে। দেখি, পিএইচডি’টা ঠিক মত সারতে পারি কিনা। আর অ্যাকাডেমিয়া কেন, কোন কিছুতেই কাউকে আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করি না। আগে আগ বাড়িয়ে প্রতিটা মানুষের উপর কিছু বিশ্বাসের বিনিয়োগ করতাম, দেখতাম সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কীভাবে দেয়। কেউ মর্যাদা না দিলে তাকে আর কাছের মানুষ মনে করতাম না। এখন কেউ বিশ্বাস অর্জন করে নিতে পারলে নিক, আমি সেধে বিশ্বাস করে ঠকতে নারাজ। কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা খুব খারাপ।

– এত হতাশাবাদী হয়ে গেলে কবে তুমি? নাহয় কিছুটা সময় নিজের ইচ্ছে মত যায়নি, তাই বলে এভাবে দেখতে হবে কেন?
: এই যে গত দু’বছর কেমন এলেবেলে কাটলো। গ্র্যাজুয়েট স্কুলে গিয়ে যেন এতিমখানায় পড়লাম। অ্যাডভাইজার জুটলো যা-গরু-চড়ে-খা জাতীয়।

– এটা কোন ব্যাপার না। ইট ওয়াজ দেয়ার লস, নট ইওরস। সময় হলে দেখিয়ে দিও। শিক্ষা ব্যাপারটা এখন ব্যবসা হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। তুমি যেমন গুরু-শিষ্য সম্পর্ক আশা করছিলে, সে-ধরনের অ্যাপ্রেন্টিসশিপ আর নেই। শুধুমাত্র টিয়ার-থ্রি’র কিছু স্কুলে গেলে এমনটা পাবে। সেখানে কামড়া-কামড়ি করে ফান্ড আনার চেয়ে নিজের ভাইকে শেখানোটা জরুরি বেশি। তবে সেটা নিয়ে তো এত বিরক্ত হলে চলবে না। নিজের কাজ করে যেতে হবে।
: নট দ্যাট আই অ্যাম প্রাউড অফ ইট, কিন্তু এই সিনিজম’টা এখন অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।

– হোল্ড অন আ মিনিট। টাইম-আউট। মাসে কয় বেলা খাও তুমি?
: দিনে তিন বেলা করে ত্রিশ দিনে ৯০ বেলা বলতে পারো।

– টুকটাক স্ন্যাক খাও না?
: অবশ্যই, তা তো থাকেই কিছু না কিছু।

– তবুও কি তুমি কখনও না কখনও দিস ইজ দ্য ওয়ার্স্ট মিল অফ মাই লাইফ বলো নি?
: সে তো হরদমই বলি।

– ওয়ান মিল আউট অফ অ্যাবাউট আ হান্ড্রেড ইজ ব্যাড, অ্যান্ড ইউ আর স্টিল কমপ্লেইনিং! এটা কি ঠিক হল? শ’এ একটা তো ভালো-মন্দ হতেই পারে। তুমি ৯০ বছর বাঁচবে জীবনে। নাহয় সেই লম্বা জীবনের দু’টা বছর একটু খারাপই গেল। এটা তো জীবনেরই অংশ। এটাকে এভাবে দেখার কিছু নেই। বাকি ৮৮ বছরের মধ্যে থেকে সেরাটা বের করে আনো।
: ইউ শিওর নো হাউ টু লিফট আ ম্যান’স স্পিরিট, ডন। কথাটা মনে থাকবে। এভাবে ভাবিনি কখনও। তোমার নাতি-নাতনিরা কেমন আছে? অনেক বড় হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। মাত্রই দু’বছর পর এলাম, তবু কোনো পিচ্চিকে চিনতে পারি না আর। সবাই এক মাথা পরিমাণ বড় হয়ে গেছে।

– আমার নাতনি ইসাবেলা’র কথা তোমার সবচেয়ে বেশি মনে থাকার কথা। ওর বয়স এখন পাঁচ বছর। প্রি-ম্যাচিউর ছিল, তাই কোমড়ের হাড় বাড়েনি, জানোই তো। ডাক্তাররা ওর উপর অনেক গুলো অপারেশন করবে সামনে। হাড়গুলো জায়গা মত বসাবে।
: এতটুকু বয়সে কী কষ্ট। ভাবলেই গা শিউরে উঠে।

– ওর কিন্তু তেমন বিকার নেই। ও টাবের উপর আরাম করে বসে থাকে। দুই হাত মাথার পেছনে দিয়ে শুয়ে শুয়ে পা দুলায়। দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওর এত বড় সমস্যা আছে শরীরে। ওর বাবা খুবই ধারালো বুদ্ধি রাখে। ডাক্তারদের জেরা করে করে বের করেছে কী করতে যায়। একটা পর্যায়ে দেখে যে ডাক্তারের নিজেরই স্পষ্ট ধারণা নেই কী করবে, জটিলতা হলে কীভাবে সামলাবে, ইত্যাদি নিয়ে। হি ইজ ওয়েইটিং ফর অ্যানাদার ওপিনিয়ন নাউ।
: বোঝো কীভাবে এটা? এই যে, লোকজন কিছু না জেনেও মুখে মুখে হাতি-ঘোড়া মেরে ফেলে, এদের ধরো কীভাবে তুমি?

– যা বলছে, সেটার চেয়ে যা বলেনি সেটার উপর মনোযোগ দেবে বেশি। তোমার সাথে যখন কথা বলতে আসবে, তখন দে আর দ্য ওয়ানস ইন কন্ট্রোল অফ দ্য কনভার্সেশন। এই ব্যাপারটা থেকে বের হয়ে আসবে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবে কী বলছে, এরপর কিছু একটা উছিলা দিয়ে সরে যাবে। এক বেলা সময় নেবে। ভেবে দেখবে কী কী বলেনি তোমাকে। পরের বেলায় যখন কথা হবে, তখন ইউ উইল বি দ্য ওয়ান ইন কন্ট্রোল অফ দ্য কনভার্সেশন।
: রিডিং বিটউইন দ্য লাইনস। শিখতে পারলাম না জীবনে।

– অবশ্যই শিখবে। সময়ের সাথেই হবে। বয়স তো কম হলো না আমার। এখন এরকম কোন ফাঁক-ফোকর পেলেই আমি তার জন্য ফাঁদ পেতে বসে থাকি। একটা ‘উম’ দিয়ে বাক্য শুরু করলেই চেপে ধরি।
: এটা কেমন কথা আবার?

– ইফ ইউ স্টার্ট আ সেন্টেন্স উইথ ‘উম’, দেন ইদার ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ইউ আর টকিং অ্যাবাউট, অর ইউ আর জাস্ট লাইং।
: এটা খেয়াল রাখতে হবে। আমার তো বাক্যের শুরুতে উম-আম করার স্বভাব অনেক পুরনো।

– বিলটা এদিকে দিও। মাই সান ইজ স্টিল আ স্টুডেন্ট, হি কান্ট পে।
: আমি জীবনের একেবারে শেষে গিয়ে একটা বই লিখবো, বলেছিলাম তোমাকে? সেখানে আমার দেখা কিছু অসামান্য মানুষের কথা লেখা থাকবে। তোমার জন্য একটা চ্যাপ্টার থাকবে সেখানে।

– এভাবে ভাবার কোন দরকার নেই। আমি ১১৬ বছর বাঁচবো। তোমাকে যেন ঠিকঠাক দেখি ততদিন। আমি এখন লেখালেখি করছি কোস্টাল এরিয়াগুলো নিয়ে। আজ থেকে ৬০ বছর আগে এই সমুদ্রতীর কেমন ছিল তা নিয়ে সাক্ষাৎকার নিচ্ছি সবার। তাঁদের জীবদ্দশায় কী পরিবর্তনগুলো এসেছে, তা নথিবদ্ধ করছি। পাশাপাশি সবাইকে একটা বাড়তি প্রশ্ন করছি। হোয়াট ডিড ইওর গ্র্যান্ড ফাদার টেল ইউ হোয়েন ইউ ওয়্যার ইয়াং।
: অপেক্ষায় থাকলাম বই বের হওয়ার। ছবি তুলে রাখি তোমার সাথে একটা। স্মৃতিগুলো আকার পাবে।

– অবশ্যই। ঐ মেয়েটাকে বলি ছবি তুলে দিতে। ক্যান ইউ টেক আ পিকচার অফ আস, প্লিজ। ইউ গেট এক্সট্রা পয়েন্টস ফর ফিগারিং আউট হু ইজ দ্য ওল্ডেস্ট!

Wednesday, May 06, 2009

প্রবাসের কথোপকথন - ১৬

– কালকে কোরবানির মাংস নিয়ে যেও।
: হু, আমাকে না দিলে কিন্তু গরীবের হক আদায় হবে না।

– থাপ্পড় খাবি। আত্মীয়ের ভাগ হতে পারে না? ফালতু কথা শুধু।
: ঐ হল। এবার কোথায় দিলেন কোরবানি?

– ঘন্টা দুয়েকের পথ হবে এখান থেকে। যাওয়া-আসা একটা ঝক্কি। একবার গরু বাছাই করতে যাও, একবার টাকা দিতে যাও, একবার মাংস আনতে যাও। কোরবানির মাংস, তাই প্রত্যেকেরই যেতে হল।
: কেষ্ট পেতে একটু তো কষ্ট করতেই হবে, কিন্তু তাই বলে সবার যেতে হবে কেন?

– মাস্লা আছে কী যেন একটা। কোরবানির মাংস নাকি যারটা তার আনতে হবে। নাহলে তো একজন গিয়েই সব নিয়ে আসতে পারতো।
: ব্যাপার না। আমার কাছে সব সমান। খাওয়া পেলেই হল। কারো মাফ নেই, সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসবো নে।

– এবারে বলেছি কিছু মাংস আলাদা করে রাখতে। সবার ভাগ থেকে একটু একটু করে। সেই মাংস দিয়েই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।
: বুদ্ধি খারাপ না। আপনাদের ভাগেই তো রান্না পড়বে। আফসোস অন্য জায়গায়। শুধু তরতাজা রান্না খাচ্ছি। দেশের মত শুকনো, ঝুরঝুরা মাংস খাওয়া হয় না আজকে ঠিক ছয় বছর হয়।

– হ্যাঁ, এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোই প্রবাস জীবনকে কষ্টকর করে দেয়। পত্রিকায় দেখলাম, এই দুর্মূল্যের বাজারেও লোকে অনেকগুলো করে গরু কোরবানি দিচ্ছে। কারও কারও গরু তো উটের সমান বড়। অথচ গ্রামে গিয়ে দেখেছিলাম, গরু নেই দেখে মানুষে হাল টানছে।
: এটাই তো সমস্যা। ল’ আর স্পিরিট অফ ল’-এর মধ্যে পার্থক্যটুকু আমরা বুঝি না। আমরা ধর্মকে একেবারে আক্ষরিক ভাবে নেই, কেউ ধর্মের নির্যাসটুকু বুঝতে চাই না। ওহির মর্ম ঠিক মত বুঝলে কোরবানির গরু কিনে মানুষ গ্রামের গরীব কৃষকদের দিতো। বদলি হজ্জ হয়, বদলি কোরবানি কেন হতে পারবে না?

– সবার মনে শুধু আক্ষরিক চিন্তা, বুঝলে? সীমিত কিছু অক্ষর লেখা আছে, সেগুলো মুখস্ত করে বসে আছে অর্ধশিক্ষিত কিছু মোল্লা। আমরা শিক্ষিত লোকেরাও তাদেরই কাছে যাই উপদেশ নিতে।
: এখানেই সমস্যা। ইসলাম ধর্ম নিয়ে আমরা গর্ব করে বলি যে এটা সবচেয়ে আধুনিক ধর্ম। সেই ৫ম শতাব্দিতে যেই ইসলাম নাজিল হয়েছিল, সেটা শিক্ষা আর অনুশাসনের দিক থেকে ১৫শ সালের জন্যও আধুনিক ছিল। দাসত্বের যুগে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সব রকম ধর্মমতের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে আমাদের উচিত ছিল এই আধুনিকতা, এই অধিকারবোধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

– বলা হয় ইসলাম একটা পরিপূর্ণ জীবনবিধি। এখানেই ঝামেলাটা। এই সুবিধা নিয়ে নিজের মত করে সবাই ধর্মের ব্যাখ্যা করে, নিজের জীবনধারা চাপিয়ে দেয় অন্যের উপর। শুধু তাই না, খুব তীব্র এক ধরণের চরমপন্থা ঢুকে যায় মনের মধ্যে। আমিই ঠিক, আমার মত অনুসরণ করলেই স্বর্গে যাওয়া যাবে, অন্যথায় নরকবাস – এমন একটা চিন্তা মানুষের মনে স্থান করে নেয়।
: পরিপূর্ণ জীবনচরিত বলে প্রচার করাটাই সমস্যা। ধর্মে তো ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী কালের আলোকে নতুন বিধি তৈরির সুযোগও আছে। এই দিকটায় ফতোয়াবাজদের একচ্ছত্র আধিপত্য হয়ে গেছে। কেউ বলে না যে ধর্মের অনুসারী হিসেবে, সমাজের অংশ হিসেবে আমাদেরও অধিকার আছে ধর্মের আধুনিকায়নে।

– আরেকটা ঝামেলা হল রাজনীতি ঢুকে যাওয়া। নিজের ধর্মকে ভালবাসা মানেই অন্য ধর্মকে ঘৃণা করা নয়। এটা ভুলে যাই আমরা। রাজনীতির স্বার্থে এটা অনেক ভাবে অপব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের বেলায় এই আবেগ কাজ করে বেশি। আমরা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করি না কেন, বাস্তব এটাই যে আমাদের সংস্কৃতিতে মিল আছে। ধর্মের অজুহাতে আমরা সংস্কৃতিকে আঘাত করি।
: কথাটা প্রায়ই বলি, বাঙালি স্বর্গে যাওয়ার জন্য আরবি ভাষায় নাম রাখে। অন্য দেশের মুসলমানেরাও ইসলামিক নাম রাখে, কিন্তু অন্তত নিজের ভাষা-সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নেয় কোন ভাবে। আমাদের তো ওসবের বালাই নেই।

– একেবারে ওভাবেও দেখার কিছু নেই। ধর্ম অনেকের কাছে একটা সংস্কৃতি, সেটাও মনে রাখতে হবে।
: ধর্ম হল ধর্ম। বিশ্বাস, পরকাল, পাপ-পুণ্য, এগুলোর ভেতর সংস্কৃতি ঢোকানো ঠিক না।

– সংস্কৃতি কী তাহলে? আমরা যেভাবে খাই, ঘুমাই, চিন্তা করি, কথা বলি, সেগুলোই তো? সেখানে কি ধর্মের প্রভাব নেই? ধর্মকে কেউ সংস্কৃতি হিসেবে নিতেই তো পারে, কারণ ধর্মেও নির্দিষ্ট কিছু ধরন-ধারণ আছে এগুলো নিয়ে।
: চাইলেই করতে পারে, কিন্তু করতে হবে কেন? নিজের শেকড়ের সাথে সম্পর্ক নেই, এমন কিছু কখনও স্থিতিশীল, কার্যকর হতে পারে না।

– সোশাল ডারউইনিজম হয়ে গেল না? একই রকম তো চিন্তা হিটলার করেছিল। তাকে দোষ দেওয়া যায় কীভাবে তাহলে? সব সংস্কৃতির সমান অধিকার দেওয়া হলে, এবং মানুষকে স্বাধীন ভাবে নির্বাচন ও অনুসরণের অধিকার দিলে কিন্তু ধর্মের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কেউ স্বাধীন ভাবে ধর্মের পথে যেতে চাইলে, তাকে সংস্কৃতি হিসেবে নিতে চাইলে দিতে হবে।
: ডারউইনিজম আসে অস্তিত্বের সংকটের প্রশ্ন এলে। নিজের দেশ, নিজের ভাষাকে সবাই শ্রেষ্ঠ ভাবে। নিজের মতাদর্শ সবাই প্রচার করতে চায়। এতে দোষের কিছুই নেই। এতে হারাবার বা হারিয়ে যাবারও কিছু নেই। কিন্তু ধর্মকে এর ভেতর ঢুকিয়ে ফেললে এলিমেন্ট অফ ফিয়ার ঢুকে যায়। শাস্তির ভয় চলে আসে। সংস্কৃতি তো ভালবাসার অভ্যস্ততা, ভয়ে ত্রস্ততা না।

– তুমি কি অস্তিত্ব হারানোর ভয়েই সংস্কৃতির কথা বলছো না? বাংলাকে ছড়িয়ে দেওয়ার আর্জির পেছনে কি হারানোর ভয় নেই?
: আছে, তবে সেটা অস্তিত্ব হারানোর ভয় না। আমিত্ব হারানোর ভয়ে আমি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার কথা বলছি। স্বাধীন ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ নিশ্চিত না করলে কোন সংস্কৃতি কালোত্তীর্ণ হয় না। সেজন্যই সীমানা রুদ্ধ করে ভিন্ভাষা দূরে রাখার চেয়ে নিজের ভাষাকে শক্তিশালী করা জরুরী। ধর্ম তো এই সুযোগ দেয় না। এখানে মানলে বেহেশত, না মানলে দোযখ।

– তবে কি ধর্ম অচল?
: মোটেই না। আমার ভাবতে ভাল লাগে যে আমাকে তৈরি করা হয়েছে কোন একটি মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। দুর্বল মুহূর্তে আমার ভাবতে ভাল লাগে যে আমার একটি আশ্রয় আছে। ভাবতে ভাল লাগে যে আমার অনুচ্চারিত আর্তিগুলো কেউ শুনছে অন্তরাল থেকে। ধর্ম না থাকলে এই শান্তিটুকু পেতাম না। তবে এটা আমার বিশ্বাস, আমার সংস্কৃতি না। আমার সংস্কৃতি ধর্ম দিয়ে প্রভাবিত হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। এর পেছনে বড় কারণ হল, ধর্ম নিজেই তো আজকে আর স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে নেই!

– একটা ব্যাপার জানো, আমরা মুসলমানেরাও কিন্তু পৌত্তলিক। এই দিক থেকে ভণ্ডামিটা খুব কষ্ট দেয় আমাকে।
: হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়া কি পৌত্তলিকতার পর্যায়ে পড়ে? অবশ্য, চাইলে সেভাবে দেখা যেতেও পারে।

– না, আমি সেই অর্থে বলছি না। আমরা বলি যে খোদা নিরাকার, সর্বময়। তাঁর কোন অঙ্গ নেই, চাহিদা নেই। আমরা বলি যে আমাদের খোদা কোন মূর্তির গণ্ডিতে আবদ্ধ না। অথচ তাঁকে আমরা ঠিকই আটকে ফেলি বিশেষণের গণ্ডিতে।
: বিশেষণ তো বর্ণনার জন্য, এর ভেতর বন্দিত্ব আসবে কেন?

– ভেবে দেখো, আমরা বলি যে খোদা দয়ালু, ন্যায়বান, সর্বদ্রষ্টা, ইত্যাদি। এভাবে কিন্তু মানবসৃষ্ট বিশেষণের মধ্যেই তাঁকে বন্দী করে ফেলছি আমরা। গণেশের মত শুড় নেই হয়তো, কিন্তু তাই বলে আমাদের খোদাও খুব একটা মুক্ত না। একটি শিশু কি তার চেনা বিশেষণের বাইরে খোদাকে কল্পনা করতে পারবে? খোদার সর্বময়তা কি সে কোনদিন উপলব্ধি করতে পারবে?
: ভেবে দেখার মত। অবয়ব না দিয়েও উপাসনা হয়ে যাচ্ছে ঠিকই। হয়তো একারণেই ধর্মের বক্তব্যটুকু হারিয়ে যায় এত সহজে।

– এই সীমিত সংজ্ঞায়নের পাকে পড়েই কিন্তু আমরা ভয় থেকে স্রষ্টার আরাধনা করি। অথচ উচিত ছিল হিতাহিত জ্ঞান থেকে আরাধনা করা। এটা মনকে অনেক মুক্ত করতো, সহনশীল করতো।
: ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। আমরা খোদাকে অনেক কিছুই বলি। লিঙ্গ নেই বলেও তাঁকে পুরুষ হিসেবেই সম্বোধন করি, আবার ম্যারাডোনার গোলকে আলঙ্করিক ভাবে ঈশ্বরের হাত বললে এর মধ্যে বিধর্মিতা খুঁজি। মোনাফেকির ভয়ে বলি খোদার নামের সাথে জড়িয়ে কোন প্রকার ভৌত কথা বলতে না। সবকিছুই করি আমরা, শুধু খোদাকে বুদ্ধিমান বলি না। এত জটিল পৃথিবী যিনি বানালেন, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, হি মাস্ট বি ড্যাম স্মার্ট। আমরা শিক্ষিত লোকেরা ভুলে যাই যে স্রষ্টা আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমান। তাঁকে তাই ডাকা উচিত বুদ্ধি ব্যবহার করেই। উলটো আমরা বিশ্বাসের গতি-জড়তায় ভেসে গিয়ে নির্বোধের মত কিছু মুখস্ত ইবাদত করি।

– কাইনেটিক ইনারশিয়া অফ ফেইথ… নিউটন, ব্রুনো, ডারউইনরা কিন্তু স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা নিজের ক্ষুদ্রতা দিয়ে ঈশ্বরের মহত্ব প্রকাশ করতেন। দেয়ার ইজ আ রিজন হোয়াই দে আর গ্রেট, অ্যান্ড আই জাস্ট ড্রাইভ আ কার।

Tuesday, June 03, 2008

প্রবাসের কথোপকথন - ১৫

তোমার গা থেকে ফুলের সুবাস আসছে আজকে। খুব সুন্দর গন্ধ, এত চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না কীসের গন্ধ এটা। ইউ লুক ভেরি ফ্রেশ অ্যাজ ওয়েল।
ফুল ঠিক মাই কাপ অফ টি না। আমার দৌঁড় গোলাপ পর্যন্ত। তবে ল্যাভেন্ডার খুব প্রিয়। ছোটবেলায় নানাকে দেখতাম ইয়ার্ডলি ব্যবহার করতে। ওদের ল্যাভেন্ডারটা অসাধারণ লাগতো। আমিও তোমার পারফিউমের গন্ধটা চিনতে পারছি না। সকাল বেলা বাসে যাবার সময় এরকম তাজা সুবাস পাই, কিন্তু মেয়েলি ব্যাপারে ধারনা কম দেখে চিনতে পারি না। ওদিকে আবার জিজ্ঞেসও করতে পারি না চড় খাবার ভয়ে।

উহু, তবুও কিছু একটা ভিন্ন আজকে। কিছু একটা করেছো যা আগের বার করনি।
আজকে গোসল করে, শেভ করে এসেছি। নাহলে আমার ঘাম-ময়লা-দুর্গন্ধ তোমার হাতে চলে যেত। সেটা হতে পারে। আফটার শেভটার জন্য এরকম লাগছে হয়তো। আন্দাজ করতে পারো কিনা দেখি তো। উহু, জিলেট না। ওল্ড স্পাইসও না। ব্রুট।

গন্ধটা পছন্দ হয়েছে আমার। আগে তেমন কাউকে দেখিনি এটা ব্যবহার করতে।
না দেখারই কথা। এটার বদনাম আছে বুড়াদের ব্র্যান্ড হিসেবে। তবে আমার বেশ লাগে। কেমন যেন শান্ত একটা গন্ধ। জ্বলে খুব, এটাই সমস্যা।

তোমার চুলগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। দেখে তো মনে হচ্ছে না চুল পড়ার সমস্যা আছে, বরং বেশ ঘন আর সিল্কি।
বলে যাও, শুনে সুখ পাই। আমার অত খুঁতখুঁতে ভাব নেই। শুধু কান আর ঘাড়ে চুল লাগলেই অস্বস্তি লাগে।

ট্রিমারে কয় নম্বর সাইজ ব্যবহার করো তুমি চুল কাটানোর সময়? সে কী, এত বছর ধরে চুল কাটিয়েও তুমি জানো না কোন সাইজ? ঠিক আছে, কত ইঞ্চি বললেও চলবে।
এসব ব্যাপারে আমার কোনই ধারনা নেই। সাইজের আন্দাজ বলতে পারবো না। আমি চুল কাটাতে গেলে শুধু বলি, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু ফিল মাই ইয়ারস। এরপর নাপিত যা করার করে। এই যে এখন যেমন চুলের ভারে এলোমেলো অবস্থা। মেয়েদের মত কানের উপর থেকে চুল সরাতে সরাতে ক্লান্ত।

মেয়েদের মত হলেই খারাপ, তাই না? খুব খারাপ। রাগ করার কিছু নেই, ঠাট্টা করছিলাম। সাইজ না জানলে তো একটু ঝামেলা হয়ে গেল। এত্ত কম জানলে কি চলে এই যুগে? লম্বা চুল রাখলে যখন খারাপ লাগে, তাহলে যেমন আছে তেমনটাই রেখে শুধু ছোট করে কাটাতে পারো তাহলে।
সেটাই ভালই হয়। সেই যে ছোটবেলায় বাবা চুল আঁচড়ে দিতো, এরপর থেকে তো সাহসে কুলায়নি কোনদিন কিছু করতে। তোমার মাথায় কিছু খেললে বল। লেট ইওর ইমাজিনেশন রান ওয়াইল্ড। তুমি যা বলবা, তাই হবে। একটা ঝুলঝাড়ুর চুল কাটলেও আপত্তি করতে পারে, আমি করবো না। তোমার হাতেই আমার মাথা সঁপে দিলাম, যাও। অবশ্যই, বল তো ন্যাড়া হতেও আপত্তি নেই। আই ওয়োন্ট হোল্ড এনিথিং এগেইন্সট ইউ, আই প্রমিস। আমার এই খোমা প্রসাধনের ঊর্ধ্বে, তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। বছরের পর বছর ধরে সাত-সকালে উঠে নিজের মুখ দেখতে দেখতে এখন দুঃস্বপ্ন দেখেও ভয় লাগে না। এই রকম চেহারা নার্ভের জন্য ভালো।

অনেক হল, ঠাট্টা রাখো এবার। তুমি কোন দেশ থেকে যেন? ও হ্যাঁ, বাংলাদেশ। আমি লেবানন থেকে এসেছি। আমি আরেকটু বেশিদিন হয় দেশে যাই না। প্রায় ১৩ বছর। যেতে মন চায়, যাবো যাবো করি, আমার মা ওখানেই, কিন্তু গোলাগুলি আর যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য যাওয়া হয় না।
খুব খারাপ লাগার কথা অবশ্যই। বাকি ভাই-বোন সহ এখানেই থাকো, না? ওহ, আমি তো ভাবলাম তুমি এখানে পড়াশোনা কর। আমি আছি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙ্গে। আরে ধুর, ফালতু কথা ওসব। স্মার্ট না ছাই। বাপ-মা ধরে-বেঁধে পড়ালো দেখে পড়ছি। আমার হাতে ছেড়ে দিলে অর্থনীতি নয়তো ইতিহাস নিয়ে পড়তাম। এই যে, এখন বুড়া বয়সে এসে আর ভাল লাগে না পড়তে, তার কারণ ঐ জোর করে পড়ানোই।

এটা কোন কথা হল না। লেগে থাকো, হয়ে যাবে। লাইফ ইজন্‌’ট ফেয়ার, অ্যান্ড নো ওয়ান এভার সেড ইট ইজ। ম্যান আপ, ডুড।
ঠিক হল না কিন্তু। মারলা তো মারলা, একদম বেল্টের নিচেই মারলা। নাহ, এই জন্যই মেয়েদের সাথে কথা বলতে ভয় লাগে আমার। প্রথম দিকের আধো-আধো কথা ভুলে নিজের ডিফেন্স লোয়ার করি, আর তারপর ধুম করে এরকম কিছু একটা বলে বসে সবাই।

নারী আর পুরুষ কখনও সমান হতে পারে না, এটা আমরাও বুঝি। তবে ছেলেরা দুর্বল লিঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা তাদের ঠিকই সহ্য করে এসেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।
ঐ যে আবার শুরু হল কোমড়ের নিচে মারামারি। এমন একটা সময় বলছো এসব, যখন আমি পুরোপুরিই তোমার মর্জির কাছে জিম্মি। এই মুহূর্তে তোমার সাথে একমত না হলে আমাকে যাচ্ছেতাই একটা মো-হক নিয়ে ঘুরতে হবে এক মাস।

ভয় নাই। চুলও ছিড়বো না, বকাও দিবো না। গরমের এত ভয় তোমার, মাথায় এত গরম লাগে, তবু আজকের মত দিনে তুমি সুইমিং পুলে না কেন?
চুল, চুল। এই জঙ্গলটা সাফ করে নেই আজকে, তারপর কালকে থেকে নাহয় যাবো আবার। সপ্তাহ খানেকের একটা বড় ট্রিপ দিয়ে আসলাম। বাড়ি থেকে সাতশ' মাইল দূরে গিয়ে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। সেই গাড়ি ঠিক করতে করতে আমরা আরো ঘুরে বেড়ালাম। না না, বন্ধুর গাড়ি। আমার না।

আমার একটা হোন্ডা আছে। ১০ বছর পুরনো। আমি যখন ১৮ বছরের ছিলাম, তখন কিনেছিলাম।
ভাল সার্ভিস দেওয়া উচিত। হোন্ডা খুব রিলায়েবল গাড়ি। তবে আওয়াজ বেশি করে, এটাই সমস্যা। ইদানিং সেগুলো ঠিক করে ফেলেছে অবশ্য।

আমি চালাই খুব কম। ১০ বছরে মনে হয় মাত্র এক লাখ মাইলে চলেছে গাড়ি। আই বট অ্যান অ্যাকর্ড।
এক মালিকের হাতে চলা গাড়ি, বিক্রি করলে দাম পাবা ভালো। হোন্ডার প্রাইস রিটেনশন সবচেয়ে ভাল। আমেরিকান আর কোরিয়ান গাড়ির দাম সবচেয়ে কমে।

আমার বাবা বলেছিল তাকে বিক্রি করে দিতে। তেলের দাম বেশি দেখে তার ট্রাকটা বের করতে চায় না।
কেনার সময় খেয়াল রাখা দরকার ছিল। এই ভুল করেই ডেট্রয়েট ডুবলো। তেল একটা সীমিত সম্পদ, এর দাম কখনো না কখনো বাড়বে। এই সহজ সত্যটা ভুলে গিয়ে আজকে আমেরিকার বেহাল দশা। বেশি বেশি লাভের লোভে ট্রাক আর এসইউভি বিক্রি করতে থাকলো। আজকে অর্থনীতির বেহাল দশা হত না সময় থাকতে সচেতন হলে।

আমি এই জন্যই কোন খোঁজ রাখি না। সবাই শেয়ার মার্কেট নিয়ে চিন্তা করে, আমি কিচ্ছু করি না। স্রেফ নিজের মত থাকি।
কে যেন বলেছিল, হ্যাপিনেস ইজ আ চয়েস। সুতরাং যা করছো, ঠিকই হয়তো। অযথা খাল কেটে ডিপ্রেশন ডেকে আনার মানে নেই কোন। তবে তেলের দাম হিসেবে রাখতেই হয়। আমি চার বছর আগে ওয়ান এইটি ফাইভে কিনেছিলাম, এবার কিনলাম ফোর টুয়েন্টিতে। জাপানি গাড়ি কিনেছিলা বলে রক্ষা, নয়তো অনেক টাকা যেত তেল কিনে।

আমার ইচ্ছা একটা লেক্সাস কেনার। ইএস। ইউ নো হোয়াট আই অ্যাম টকিং এবাউট, রাইট?
আই শিওর ডু। আমার রুমি একটা লেক্সাস চালায়। আর এবার ঘুরে আসলাম ভলভোয়। বেশ লাগলো চড়ে। আমার শখ বিএমডব্লিউ কেনার। সারা জীবনের শখ আমার।

শোন, থ্রি-এইটথ্‌ ইঞ্চ কাটি তোমার চুল। আর সামনে কিছুটা বড় রাখি। স্পাইকিং জেল লাগিয়ে দেই। খারাপ লাগবে না দেখতে।
অ্যাজ ইউ লাইক ইট। আমার কাছে সব সমান। পেছনে যেমন খুশি করতে পারো। স্কোয়্যার আর রাউন্ডের তফাৎ নেই আমার কাছে। দ্যাট্‌স পারহ্যাপস দি ওনলি পার্ট অফ মাই বডি হুইচ আই ক্যান্ট সি নো ম্যাটার হাউ মাচ আই ট্রাই। ওয়েল, হয়তো আরো দুই-একটা জায়গা আছে, তবে সেদিকে নাহয় না যাই। আপাতত স্কোয়্যারই করে দাও। তো এই গাড়ি বিক্রি করলে কি লেক্সাস কিনবে? মিন্ট কন্ডিশনে আপত্তি না থাকলে বছর পাঁচেকের পুরনো লাক্সারি মডেলের গাড়ি কিনতে পারো। দে কাম ফুললি লোডেড টু।

আমার এই স্বপ্নটা সত্যি হবে বলে মনে হয় না। ঐ যে আয়নার নিচে ছবিটা দেখতে পারছো? ঐটা আমার মেয়ের ছবি। ওর জন্মের পর আমার এক্স-হাসব্যান্ড খুব অবাক হয়েছিল আমার দেওয়া নাম শুনে। আই নেমড হার অ্যালেক্সিস, বিকজ আই ওয়ান্টেড আ লেক্সাস অল মাই লাইফ।
আইডিয়াটা খুব পছন্দ হয়েছে আমার। আমার ছেলে হলে তাহলে নাম রাখতে হবে বিমার।

বিমার ফ্রম বিএমডব্লিউ, রাইট? শুনতে খারাপ না। নাও, হয়ে গেছে তোমার চুল কাটা। ইট্‌স টুয়েলভ নাইনটি ফাইভ।

প্রবাসের কথোপকথন - ১৪

এই রাস্তাই তো? দেখো তো আবার, ম্যাপের সাথে কিন্তু মিলে না। ম্যাপে যেখানে বললো, সেখানে কিছুই নাই।

এই রাস্তাই নিয়ে যাবে। আগের বার ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে এই রাস্তা দিয়েই এসেছিলাম। আসার পথে বুঝি নাই, তবে যাওয়ার সময় তো একটা রাস্তা একদম সোজা এসে ইন্টারস্টেটে মিশেছিল পারডু ক্যাম্পাস থেকে। গুগুলের দেখানো রাস্তাটা যেন কেমন বদখদ ছিল।


ঐ তো, এক্সিট দেখা যায়। লেখা আছে পারডু ইউনিভার্সিটির রাস্তা।

এটাই হবে। নিয়ে নেন। আমি এই রাস্তা দিয়ে ফিরি নাই অবশ্য। ইলিনয় থেকে এসেছিলাম। অন্য রাস্তা ছিল সেটা। খুবই বীভৎস অভিজ্ঞতা অবশ্য। ওয়াবাশ নদীর পরে বামে যেতে হত। আমি বেকুবের মত আগের রাস্তা নিয়ে ফেলেছিলাম। কোথায় যে গিয়ে হাজির হলাম এরপর! ফিরতি রাস্তা খুঁজে না পেয়ে ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম গুগুল ম্যাপ দেখে উদ্ধার করতে। ওকে পাশের রাস্তার নাম বললাম, বলে যে গুগুলে নাকি ঐ জায়গার কোন ইনফরমেশন নাই। চারদিকে তো শুধু ভূট্টা ক্ষেত। এর মধ্যে আমি সত্তর মাইল বেগে টানলাম গাড়ি। মিনিট দশেক চলার পর একটা রাস্তার নাম পাওয়া গেল গুগুলে। সেই থেকে আমি চেনা রাস্তার বাইরে চালাই না আমেরিকান মিডওয়েস্টে।


এই কথা আগে বলবা না? তাহলে তো ভোর চারটার সময় পারডু ক্যাম্পাস দেখতে আসি না।

ব্যাপার না। কী আছে দুনিয়ায়! এই দেশে গাড়ি, ফোন, আর ক্রেডিট কার্ড সাথে থাকলে কিছু লাগে না। হারালেও ভয় নাই। আর এই এলাকায় হারানোর হলে ভরদুপুরেও হারানো যায়।


ক্ষুধা লাগসে, কিছু খাওয়া দরকার। সামনে কোন ম্যাকডোনাল্ডস দেখলে বলো তো।

রাস্তায় তো রাস্তার নামই দেখছি না, খাবার দোকান দূরের কথা। আচ্ছা, ম্যাপে বলছে যে স্টেট রাউট ২৮ নিতে হবে। দেখছি না কোন দিকে। ডানে ওয়ানওয়ে, বামে ডেড এন্ড, সোজাই চলেন। ঐ যে একটা হাসপাতাল আছে। ওখানে জিজ্ঞেস করি গিয়ে। আপনি থাকেন, আমি জেনে আসি।


কাজ হল?

নাহ, অযথা দরজা ধাক্কায় চলে আসলাম। কাউকে দেখলাম না ভিতরে। মনে হয় অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া দরজা খুলবে না। আজিব জায়গায় আসলাম।


ঐ যে একটা হোয়াইট ক্যাসল দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আট-দশটা বার্গার খেয়ে ফেলি গিয়ে।

বলেন কী? আট-দশটা বার্গার? গাড়ির জানালা খুলে চালাতে হবে তাহলে অযথা। বাদ দেওয়া যায় না? ম্যাকডোনাল্ডসই মেরে দেই আরেকটু কষ্ট করে। সাইজে ছোট হলেই বেশি খেতে হবে এমন কথা নাই তো। সে যাকগে, আমার পেটের ইঁদুরটা নাচতে নাচতে ঘুমায় গেছে। ওখান থেকে রাস্তার ব্যাপারেও জেনে নেওয়া যাবে।


কী খাবেন? রাত তো অনেক হল, বেড়াতে বেরিয়েছেন বুঝি? কতগুলো বার্গার দেবো?

ঢালতে থাকেন খাবার। আমরা চারজন আছি। আপাতত জনপ্রতি চারটা করে বার্গার দেন। লাগলে পরে আবার নেবো নাহয়। কোক নেই তো পেপসিই দেন। ইয়েস, অ্যান্ড বিওয়্যার অফ দ্য এলিফ্যান্ট দ্যাটস উইথ আস। আরে আরে তেড়ে আসার কী হল? তুমি একটু স্বাস্থবান দেখেই তো আমি ইয়ার্কি করি। ইটস ওকে, হি প্রমিসড হি উড লিভ দ্য কিচেন অ্যালোন।


তুমি তো খুব মিন। কাম হিয়ার সুইটি। এসো আদর করে দেই তোমাকে।

ইয়া, আইম শিওর হি কুড ইউজ সাম লাভ, ইট ওয়াজন্ট দ্য বেস্ট অফ এক্সপিরিয়েন্সেস ফর হিম টু রাইড উইথ মি। লাভ নাই চোখ রাঙায়। যাও গিয়ে মোটির আদর খাও। এত সহজে ছেড়ে দিবো ভাবসিলা? আসল পরিকল্পনা তো এটাই ছিল। খাওয়া নিয়ে ক্ষেপানো তো পুরনো হয়ে গেছে।


ইজ দেয়ার এনিথিং এলস আই ক্যান হেল্প ইউ উইথ হোয়াইল শি টেকস দ্য অর্ডার?

হু, পারেন। বিশাল সাহায্য দরকার একটা। আমরা রাস্তা হারিয়ে এখানে এসে পড়েছি। এসেছি ভার্জিনিয়া টেক থেকে। হ্যাঁ, ঐ গোলাগুলির ইউনিভার্সিটি। সবাই ভাল আছে এখন, থ্যাঙ্ক ইউ। যাচ্ছিলাম শিকাগো। কনসার্ট দেখতে। পথে ভাবলাম পারডু ইউনিভার্সিটি দেখে যাই। মাঝপথে প্ল্যান তো, তাই ম্যাপ নিয়ে বের হইনি। এই ভোররাতে তাই অন্ধের মত পথ হাতড়াচ্ছি ভূট্টা ক্ষেতের মাঝে।


তোমাদের তো দেখি হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমারের মত অবস্থা।

বলতে পারো। গোয়িং টু হোয়াইট ক্যাসল। আমিও বুঝতে পারছি না পুরোটা। জাস্ট প্লে অ্যালং। বুঝার ভান কর। আমি নিজেও মুভিটা দেখি নাই এখনও, তবে জানি যে একটা ইন্ডিয়ান আর একটা চাইনিজ কী সব যেন করে। এটাও না চিনতে আরও বেকুবের মত দেখাবে। হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার, অফিস স্পেস, নেপোলিয়ন ডায়নামাইট, ন্যাশনাল ল্যাম্পুন, ইত্যাদি হল এই দেশের কাল্ট ফেভারিট। প্রতিটাতেই কিছু না কিছু বাঁদরামো করে বেড়ায় কিছু পোলাপান। এখানে এগুলো নিয়ে না জানা খুবই খেতু ব্যাপার। বুঝো আর না বুঝো, বুঝদারের মত একটা হাসি ধরে রাখো মুখে।


এখান থেকে বের হয়ে স্টেট রোড ২৬ পাবে, তারপর সাউথ স্ট্রিট। যেতে যেতে ইউএস ৫২ পার করবে, একটা হাসপাতাল পার করবে, মেইন স্ট্রিটের উপর একটা লিকার স্টোর পার করবে। ঠিক পথে থাকলে এগুলো পরপর পাবে সব।

ঠিক আছে। মদের দোকান পর্যন্ত যেতে পারবো। হাসপাতালটা তো চোখে পড়েছেই। আচ্ছা, তারপর কলাম্বিয়া স্ট্রিট আর কোর্ট হাউসও পার করবো। এরপর?


এরপর হাতের ডানে ট্রিপল এক্স পড়বে। ওটাকে ফেলে কিছুদূর এগোলেই তোমার চেনা রাস্তা পাবে।

হু, এরপর হয়তো ওয়াবাশ খুঁজে পাবো। ঐ দিকটা কিছু কিছু মনে আছে এখনও। একটু আপহিল রাস্তা, পুরনো বাড়ি, চার্চ। সব মিলিয়ে পুরনো ঘরানার বেশ ছিমছাম জায়গা। বার্গারগুলো শেষ করেই রওনা দিচ্ছি। বাই দ্য ওয়ে, ট্রিপল এক্স কি একটা অ্যাডাল্ট বুকস্টোর?


নো, ইটস আ বার্গার জয়েন্ট। থ্যাঙ্কস ফর কামিং। ওহ ইউ আর সো লাইক হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার।

ইয়ে, মানে, আচ্ছা ঠিক আছে। চলেন ভাই তাড়াতাড়ি, বেইজ্জতি প্রশ্ন করে ফেলেছি। এই বামে দিয়ে বের হন। সামনের গাড়িটার লাইসেন্স প্লেটে লেখা আছে, ইন গড উই ট্রাস্ট। আমেরিকা তো না, যেন জেরুজালেমে আছি। ২০০৪ এর ইলেকশনের পর একটা কার্টুন দেখেছিলাম। সেটায় নিউ ইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়াকে ক্যানাডার সাথে যোগ করে লেখা, ইউনাইটেড স্টেটস অফ ক্যানাডা। বাদবাকি স্টেটগুলোকে লাল রং করে বড় করে লেখা, জেরুজাল্যান্ড।


এই গানটার ভলিউম একটু বাড়িয়ে দে তো রে। এটার বেজ অসাধারণ।

বাজনা ভাল, কিন্তু কানে লাগে খুব। আমি এককালে বেজ সহ্য করতে পারতাম না। কেমন যেন লাগতো। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে ধরে-বেঁধে আমাকে সেট দ্য কন্ট্রোলস ফর দ্য হার্ট অফ দ্য সান শুনানো হয়েছিল। ওটা শুনে বুঝেছিলাম বেজ কী জিনিস।


শোন, বেজ হল মা-বাপের মত। না থাকলে বুঝা যায় কী জিনিস।

দামী কথা রে, বহুত দামী কথা। যাক, কালকে রাতটা কোন রকমে পার করা গেল তবু। আবার ক্ষুধা লেগে গেছে। এই বেলায়ও কি ফাস্ট ফুড খাবেন, নাকি ভাল কোথাও বসবেন?


ভাল কোথাও বসি। একটু লিকার খেতে পারলে ভাল হত। ঐ যে সামনে একটা রেস্তোরাঁ আছে। জোস বার অ্যান্ড গ্রিল। চল ওখানেই যাই।

আমি কোক নিবো। জীবনে তো অ্যালকোহল ছুঁইনি এখনও। অবশ্য, জীবনের অনেক কিছুই তো ঠিক মত যায়নি। যা হয় হবে, নিয়েই ফেলি একটা। নিয়ম কী খাওয়ার? আমি তো জানি না তেমন কিছু একটা।


মদ খেলে সব সময় নিচের থেকে উপরে উঠবা। আগে বিয়ার, পরে ককটেল বা ওয়াইন। উলটা করতে নাই। তাহলে মাথা ধরবে। একটা লং আইল্যান্ড আইসড টি নিতে পারো। আমার বেশ ভাল লাগে ওটা। বেশি জোরে টেনো না শুরুতেই। একটু চেখে দেখো কেমন লাগে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

Tuesday, March 11, 2008

প্রবাসের কথোপকথন ১৩

“একুশে নিয়ে কী করতে চাও বলো, সময় হলে সাহায্য করবো।”
নাটক করা যায় একটা? আমরা সবাই মিলে চেষ্টা-চরিত্র করলে কিছু একটা দাঁড় করানো যায়। এই, তোর না কী আইডিয়া আছে বলছিলি।

“তেমন কিছু না। এবিসিডি কালচার, দেশকে ভুলে যাওয়া, এগুলা নিয়ে কিছু করার চিন্তা ছিল। সময় নেই হাতে একদম, এটাই ঝামেলা। রিসার্চের কাজ নিয়ে দৌঁড়ের উপর আছি একদম।”
তুই শুধু আইডিয়াটুকু বল। সেটাকে রিফাইন করে নাটক বানানোর দায়িত্ব আমরা ভাগ করে নেবো।

“নাটক করতে চাও তোমরা? সেটার জন্য তো অনেক প্রস্তুতি দরকার। মুনীর চৌধুরীর কবর করতে পারো। আমার কাছে তো কোন কিছু তৈরি নেই। তোমরা কবর যোগাড় করতে পারলে সেটা করতে পারতে ছেলেরা মিলে।”
খুঁজে দেখেছি, কিন্তু ইন্টারনেটে পেলাম না। দেশ থেকে আনাতে পারি, তবে সময় লাগবে অনেক। এমনই সাহিত্যজ্ঞান আমার, অন্য কোন নাটকও চিনি না যেটা একুশের সাথে যায়।

“সব ভাবী, বৌদিদের বল একটা করে গান গাইতে। ছেলেদের মধ্যে কেউ কবিতা, বা একুশে নিয়ে কিছু বলতে পারে কিনা দেখো। সময় কম, এটা মাথায় রেখো শুধু।”
সমস্যা অন্য জায়গায়। এবার একুশে পড়েছে বৃহস্পতিবারে। কাউকে পাওয়া যাবে না ঐ দিনে। মিডটার্মও চলছে এখনি। ধুর, একুশে যদি মার্চের ৩ তারিখে হত, তাহলে ঝামেলা হত না কোন। স্প্রিং ব্রেকে সময় নিয়ে কিছু করা যেত। আগে কী করা হত এখানে? লুইজিয়ানা থাকতে একুশেতে কিছু করা হত না, তবে স্বাধীনতা দিবস আর পহেলা বৈশাখ মিলিয়ে একটা অনুষ্ঠান করা হত বেশ জাঁকজমক করে।

“আমরা একুশে ফেব্রুয়ারিটা ঠিক মত করি। এছাড়া এপ্রিলের দিকে স্ট্রিট ফেয়ারে দেশী খাবার বিক্রি করে ফান্ড জমাই। এই টাকা দিয়েই দেশের আমরা পরে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। একুশের দিনে আমরা স্টুডেন্ট সেন্টারের শো-কেইসে একটা শহীদ মিনার সাজাই। ওখানে বাংলা লেখা থাকে, আর একুশের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা থাকে।”
হ্যাঁ, দেখেছিলাম। এবারেও শো-কেস ভাড়া করা হয়েছে এক সপ্তাহের জন্য। ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন আছে একটা। কতটুকু লেখা হয় সাধারণত? মানে, পাকিস্তানিরা কিছু বলে না?

“মিথ্যা তো না, লিখতে কী? করার সময় খেয়াল ছিল না? আর, এটা তো এখন সারা দুনিয়ায় স্বীকৃত ইতিহাস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।”
তাও কথা। যাক, দেখে নিবো নে আগের বছরের লেখাগুলো। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সপ্তাহের মাঝখানে এভাবে কিছু একটা আয়োজন করা সম্ভব না। করলে পরের উইকএন্ডে করতে হবে। এত লোকের জমায়েত হলে একটু পরেই খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটা হুলস্থূল শুরু হয়ে যাবে। বুঝতে পারছি না কী করবো।

“কোন ধরনের খাওয়া-দাওয়ার কিছু করার দরকার নাই। অকারণে একটা হৈ-চৈ হবে। হালকা খাবার রাখবা। বিরিয়ানি রান্না করে তো একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা যায় না। হালকা চিপ্‌স রাখতে পারো কিছু। সাথে চা। সব তুলে রাখবা অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত। কাউকে ধরতে দেওয়া যাবে না।”
এখানেই তো সমস্যা। অনুষ্ঠান হোক আর না হোক, মুডটা হালকা করে দেওয়ার মত অনেক কিছুই আছে। খাবার থাকলে দেখা যাবে ছাত্রদের মধ্যেই কেউ ওগুলা বের করে ফেললো, অথবা বাচ্চার বাপ-মা এসে বলবে তাদের ছেলে-মেয়েকে কিছু দিতে। মশাল পার্টি চলে যাবে একটু পর পর বিড়ি ফুকতে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের পাশেই টেনিস কোর্ট। লাভের মধ্যে দেখা যাবে একুশেতে নীরবতা পালন করে সবাই মিলে ক্রিকেট খেলছি।

“না, এসব কিছু করতে দিও না। অনুষ্ঠান শেষ হলে যে যার বাড়ি চলে যাবে, কোন লাফালাফি নাই।”
আচ্ছা, আরেকটা সমস্যা। একুশেতে চিপ্‌স দিবো? কেমন হয়ে যায় না? কুড়মুড়ে খাবার যায় না মনে হয় ভাষা দিবসের সাথে।

“ঠিকই। তাহলে নুডুল্‌স দিতে পারো।”
এইটাও তো কেমন কেমন হয়ে যায়। যাক, তবু এটা আপাতত থাকুক। তবে আর যা-ই হোক না কেন, পটলাক্‌ করা হবে না। রান্না ভাগ-বাটোয়ারার ব্যাপার নাই কোন এখানে। সোডার বদলে অন্য কিছু দেওয়া যায়?

“মনে হয় না। সোডাই থাকুক। খাবারের ব্যবস্থা না থাকলে সময়ের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি করতে হবে। বলে দিতে হবে যে ঠিক বিকেল ৫ টায় আসবো এবং সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে চলে যাবো। এর বেশি দেরি হলেই লোকে খাবার আশা করবে। সবাই একত্র হয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করবো। যারা গান জানেন, তারা দুইটা করে গান গাইলেই হয়ে যায়।”
যোগাযোগ করে দেখলাম এর মধ্যেই। অনেকেই ব্যস্ত। একেকজনের একেক রকম ঝক্কি। কাউকে জোরও করতে পারছি না। তবু বলে রেখেছি। কোন জায়গাও রিজার্ভ করতে পারছি না। বাসায় করলেই খাবার দেওয়ার ভদ্রতা করতে হবে।

“দেখো কী করতে পারো এই ব্যাপারে। যারা গান গাইবে, তাদের কিন্তু অনুষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্য মাথায় রেখে গান তুলতে বল। কেউ আধুনিক গান ধরে বসলে সমস্যা।”
অবশ্যই। ফাস্ট বিটের দেশাত্মবোধক হলেও সমস্যা। কেউ একুশেতে ও মাঝি নাও ছাইড়া দে ধরে বসলে কেলেংকারি হয়ে যাবে।

“আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে ভাল মত করা যেতো। একটা নাটক যোগাড় করতে পারলে হত। ডিসেম্বরের আগে বললে দেশ থেকে কেউ নিয়ে আসতে পারতো।”
গতস্য শোচনা নাস্তি। আপাতত এই দফা ড্যামেজ কন্ট্রোল করে নেই। আমারো ইচ্ছা ছিল রেডিও নাটক জাতীয় কিছু করার। স্ক্রিনিঙ্গের ঝামেলা থাকতো না, সহজে শেখানোও যেতো সবাইকে।

“আমার এক বন্ধু খুব ভাল গান গায়। সাংস্কৃতিক ব্যাপারে খুবই নাম। তবে মহা চাল্লু ছেলে। এসেছিলো জে-১ ভিসায়। কীভাবে যেন কায়দা করে থেকে গেছে।”
এটা কীভাবে সম্ভব? এক্সচেঞ্জ ভিসায় আসলে তো দুই বছর পর দেশে ফেরা বাধ্যতামূলক।

“উহু, ভুল জানিস তুই। একটা ফাঁক আছে। উনি মনে হয় ঐটাই কাজে লাগিয়েছেন। যেই লাইনে পড়াশুনা করেছেন, সেই লাইনে যদি নিজের দেশে কাজ না থাকে, তাহলে আমেরিকায় থেকে যাওয়া যায়।”
উনি না বললেন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছেন? চালু মাল আসলেই।

“এখন তাকে হান্ড্রেড এইটি পে করে বছরে।”
বলেন কী? তার মানে মাসে কত করে পড়ে? নব্বই দুগুণে একশো আশি, পাঁচ আঠেরোং নব্বই, ছয় পনেরোং নব্বই, পনেরো হাজার কর মাসে!

“আজকে ক্যারিয়ার ফেয়ারে এই পোলা হাভাইত্যার মত জিনিস টোকাইসে পুরা।”
কী করবো? চাকরি তো দিবে না কেউ আমাকে। জিপিএর যা করুণ দশা, এই সিমেস্টার শেষ না হলে কিছু আশা করতে পারছি না। আপাতত সামার ধরে থিসিস লিখে ডিসেম্বরে মাস্টার্স করার চিন্তায় আছি। এরাও আমাকে চাকরি দিবে না, আমিও এদের কাছে চাকরি চাইছি না। চারটা ব্যাগ আর গোটা দশেক তাসের প্যাকেট এনেছি।

“এই বেকুব, ভিতরে না দেখেই এতগুলা প্যাকেট আনলি কেন? তাসের মধ্যে কোন ফোটা-ফাটি নাই। টুয়েন্টি-নাইন খেলতেও ব্রিজের মত কাগজ-কলম নেওয়া লাগবে। স্কোরিং করার কিছু নাই।”
শিট!

Friday, February 01, 2008

প্রবাসের কথোপকথন ১২

“মেয়ের জ্বর কমে নাই এখনো? ডাক্তার দেখান। ভাবীকে দুইটা দিন ছুটি নিতে বলেন। নতুন কাজ নিলে ছুটি পেতে সমস্যা হবেই এরকম। কী আর করবেন ছুটি না পেলে, আল্লাহ আল্লাহ করেন, ঠিক মত ওষুধ দেন, দেখে রাখেন।”

“ডঃ ইউনুস সাক্ষাৎকার দিসে, দেখসেন নাকি? কয় বিজ্ঞাপন দিয়েও নাকি গরীব পাওয়া যাবে না বাংলাদেশে। হায়রে গ্রামীন ব্যাংক। ৮০ বছরের বুড়িরেও রেহাই দেয় না টিনের চালের জন্য, আবার বড় বড় কথা।”

“এই কয়দিন ধরে ব্যবসায় এত মন্দা অবস্থা যে বলার না। জমার টাকাই তুলতে পারি না। মন খারাপ করে কালকে গাড়ি বেরই করি নাই। ঘর থেকে টাকা নিয়ে জমার টাকা পুরাতে হয়, এমন বাজে অবস্থা। অর্থনীতি একদম গেছে। আগে কী রমরমা ছিল!”

“আজকের ঠিকানা দেখেছেন? তারেক রহমানকে নাকি রিমান্ডে টর্চার করা হয়েছে। এই কাজটা কেন করতে গেল? এত্ত সাহস বেড়ে গেছে সরকারের? যত যাই হোক, শহীদ জিয়ার ছেলে। তাকে এই ভাবে চোখ বেঁধে অত্যাচার করার কী মানে আছে? এইটার আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া দরকার।”

“আর তারেক যে পাঁচ বছর ধরে এত লুটপাট করলো, সেটার কী হবে? তখন আইন কই ছিল? কথা বের হয় নাই কেন তখন আপনাদের মুখ দিয়ে? আরে আমার মামা বুক চাপড়ায় বলসিলো, আমারে ঠিক মত বিয়াটা করতে দে। তারেক লোকজন সহ তারে বিয়ার আসর থেকে তুইলা নিয়া গিয়া পিটাইসে। আজকে স্রেফ চোখ বানসে আর এত কান্নাকাটি লাগায় দিসেন! মহিউদ্দীন খান আলমগীরকে যে চোখ বেন্ধে পিটাইসে, যাতে কে মারসে দেখতে না পারে? আদালতে বলসিলো যে তার পায়খানার রাস্তা দিয়ে গরম ডিম ঢুকায় দিসে, যাতে কাউকে দেখাতে না পারে।”

“রাবেয়া আপা, আমার মামাতো ভাই এইটা। বড় মামার ছেলে। ওরে দুইটা পিঠা দেন। এই নাও ভাইয়া, তোমাদের ভার্জিনিয়ায় তো ভাপা পিঠা পাও না। এই, তোর ছেলেকে এই পিঠাটা দে।”

“পিঠার ইংরেজি জানি না, বাবা। সাদাটাই মজা তো। এটায় নারিকেল আছে। থাক, ভাল না লাগলে গুড়টা খাও শুধু। বার্গার আরেকদিন খাবো। হ্যাঁ হ্যাঁ, মা বাসায় গেলে বিরিয়ানি রান্না করে দিবে তোমাকে।”

“আরে তারেকের হাড্ডি ভাঙে ভাঙুক, আপনি নিজে সৎ হন। আপনি কখনো চুরি করেন নাই? এত বছর ধরে নিউ ইয়র্ক আছেন, কোন অন্যায় করেন নাই? দেশে যে এনজিও খুলতে মাসে মাসে টাকা পাঠান, ঐটা এমনি এমনি হয়ে যাচ্ছে?”

“না, কোন অন্যায় করি নাই। আমাকে বলসে এনজিও খুলতে ৫০ লাখ টাকা লাগবে। ৩০ লাখ মত জোগাড় করে পাঠায় দিসি। আরেক কিস্তি সামনে পাঠাবো। এই টাকা এখানেই জোগাড় করা। এর মধ্যে চুরি নাই কোন।”

“একটা ফর্ম জমা দিতে হয় প্রথমে, মনে পড়ে? জ্বী, ঐ যে ১০ জনের সিগনেচার সহ একটা কাগজ জমা দিতে হয়। ঐটায় কার কার নাম ছিল? ঐ ১০ জনের কেউ কি আদৌ অংশীদার? সাজানো নাম ছিল না সব? জ্বী, এই খানেই চুরিটা করছেন। আমার এক চাচা একই কাজ করসে। আমাকে বলতে আইসেন না যে এনজিও খুলসেন কিন্তু চুরি করেন নাই। নিজে সৎ হন, তাহলেই সব ঠিক। অযথা তারেকের জন্য কেঁদে লাভ নাই।”

“চেনা চেনা লাগে, তবু অচেনা, ভালবাসো যদি, কাছে এসো না...”

“আহারে কী সুন্দর সব সিনেমা ছিল। জোনাকি সিনেমা হলে প্রতি সপ্তাহে যেতাম সিনেমা দেখতে। এখন কী সব নাখাস্তা সিনেমা বানায়।”

“আচ্ছা, আমি একটা কথা বুঝি না। মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে ধরে না কেন? এই চোর দেখি সেদিন টিভিতে সাক্ষাৎকার দেয়। আমার তো রাগে গা জ্বালা করছে এখনো।”

“আরে এরা বেছে বেছে নিজের মত লোক ধরছে। নাইলে মান্নান ভূঁইয়া কীভাবে বাইরে থাকে এখনো? সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হয়েও ব্যাটা এখন আরামে ঘুরে বেড়ায়। ঐদিকে আওয়ামী লীগে আমুর মত চোরকে ধরার নাম নাই। সবই এক। নিজেরটা ছাড়া কেউ কিছু বুঝে না।”

“মেয়র মহিউদ্দীন প্রতি বছর ২৫ জন হাজ্বীকে হজ্জ্ব করার পয়সা দেয়। একবার গরমের জন্য ২৪ টা এসি কিনে দিসে নিজের টাকায়। একে জেলে ভরসে, কিন্তু সাদেক হোসেন খোকা বাইরে।”

“আরে মহিউদ্দীনকে ধরসে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর খোলা রাখতে। তবে ধরুক। সব কয়টাকে ধরুন। এগুলার একটাও নির্দোষ না। বাইন্ধা পিসা দিয়া বাইরানোর কাম এগুলারে।”

“হবে, বাবা। তুমিও একদিন স্টুডেন্ট অফ দ্য মান্থ হবে। মাথাটা খারাপ করে ফেললো, বুঝলা? সবাই স্টুডেন্ট অফ দ্য মান্থ হয়, আমি কেন হই না? এত বলি যে তুমি মাত্র এসেছো, ইংরেজি বুঝতে সমস্যা হবে তোমার। পড়াশুনার দিকে আগ্রহটা আছে। ইচ্ছা আছে ভাল একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর, কিন্তু নিউ ইয়র্কে থেকে টাকা জমানো সম্ভব না। সাইথে যাবো গিয়ে ভাবি প্রায়ই। আমরা দুই জন মিলে কাজ করলে এর অর্ধেক টাকায়ও ভাল চলে যাবে।”

“আরে মঈন ইউ তো নোয়াখালির লোক। বরকতুল্লাহ বুলুর আত্মীয়। ওর দৌড় জানা আছে। কিছুই করবে না বিএনপির লোকজনের।”

“আরে আরও আছে। জেনারেল মতিন তো ৭১’এর সেই চার আল বদরের একটার আত্মীয়। যেইটা শহীদুল্লাহ কায়সারের বাসায় এসে তাকে চিনিয়ে দিলো। পান্না কায়সার নাকি টান দিয়ে মুখের উপর থেকে মাফলার খুলে চেহারা দেখে ফেলেছিলো। বিবিসি থেকে ডকুমেন্টারি করার সময় সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলো, দরজা খুলে নাই। খুব নাকি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটির।”

“খোকাকে কেন ধরে না জানেনে? খোকা এক সময় ব্যারিস্টার মইনুলের উকিল ছিল। এদের অনেক আগে থেকেই কানেকশন। মইন তো জামাতের সমাবেশেও যাওয়া-আসা করতো।”

“এই লোকটা অতিরিক্ত কথা বলে, বুঝলেন? এর একলার জন্য সরকারের ভাবমূর্তির ১২টা বাজলো পুরা। হাসিনার পিছনে যেভাবে উঠে-পড়ে লাগলো। অথচ কয়দিন আগেই নিজের ছেলের জন্য নমিনেশন চাইতে হাসিনার কাছে ঘুরে আসলো। হাসিনা দেয় নাই দেখে শোধ তুলছে এখন।”

“আরে আর্মিও তো মানুষ। দেশে এখন শুনি ঘুষের রেট বেড়ে গেছে, তবু ঘুষ আছেই। রিস্ক বেশি, তাই রেট বেশি। আসল লোকগুলোকে তো ধরে না। এরা আছে দুই দিন পরপর মাইনাস-টু নিয়ে লাফালাফিতে। হাসিনাকে আজম চৌধুরীর মত একটা বাটপারের মামলা দিয়ে আটকায় রাখলো। এত কিছু থাকতে নাজমুল হুদাকে গ্রেফতার করলো ঘরে মদ-বিয়ার রাখার জন্য। তামাশা নাকি রে ভাই এগুলা?”

“এদের আসলে সমাজ থেকেই বর্জন করা উচিত। মিডিয়াও তো এদের নিয়েই লাফায়। আদালতে নেওয়ার সময় শ’খানেক ক্যামেরাম্যান সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, আর এরা ভিক্টরি সাইন দেখায়। আরে ব্যাটা জেলে যাওয়ার সময় এসব কী? সেই দিন আর নাই যে জেলে গেলে বড় নেতা হয়ে বের হবে। বাঙালি এত গাধা না। মিডিয়ার উচিত এদের কোন ছবিই না দেখানো। পত্রিকাগুলার উচিত শুধু হাতে-পায়ে বেড়ি পড়ানো ছবি ছাপানো।”

“ম্যারিয়ন জোন্সের স্বর্নপদক কেড়ে নিসে দেখসেন? মজা দেখেন, যে সেকেন্ড প্লেসে ছিল, তাকেও দিবে না। আজব কথাবার্তা।”

“সেইদিন একটা নাটক দেখলাম নতুন। ফোর-টুয়েন্টি। হেব্বি জোস। দুই ঠগ গ্রাম থেকে শহরে এসে বড়লোক হয়ে যায়, সেই কাহিনী। ১০ পর্ব দেখলাম। আজকে রাতে আবার আছে।”

“হ্যাঁ, এইটাই বাকি ছিল। বাংলাদেশের যেই অর্ধেক মানুষ ফোর-টুয়েন্টি ছিল না, এখন সেগুলাও বাটপার হবে এই নাটক দেখে।”

“ঐ যে দেখেন, ভাগলো আমার চেহারা দেখেই। আমার আগের রুমমেটের কাছ থেকে ব্যবসার নাম করে ২২ হাজার ডলার হাতায় নিয়ে ভাগসে শালা। অল্প অল্প টাকা নিয়ে ফেরত দিয়ে দিতো তাড়াতাড়ি করে। এই ভাবে বিশ্বস্ততা দেখায় একবার পুরা ২২ হাজার ডলার নিয়ে ভেগে গেছে।”

“দেখেন, দেখেন। দুদক থেকে বলে, দুর্নীতি না হলে নাকি বছরে ১২ হাজার প্রাইমারি স্কুল বানানো যেতো। শালা বাঞ্চোতের দল, দেখা দেখি এক বছরে কয়টা স্কুল বানালি! উলটা ঢাকা ইউনিভার্সিটির স্যারেগো নিয়া রিমান্ডের ভরসোস।”