Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts

Monday, July 13, 2009

প্রবাসের কথোপকথন - ১৮

– বোর্ডিং পাস আর আইডি দেখাও।
: লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটা পঙ্গু, অথর্ব মানুষ আমি। এত জায়গায় আইডি দেখালাম, এখন প্লেনের দুয়ারে এসেও ঝামেলা করতে হবে, তাই না? কত যে ঘাঁটাতে পারো তোমরা!

– এই ছোকরা, ফেলে চলে যাবো কিন্তু তাহলে। আমি মানুষ খুব খারাপ।
: আচ্ছা দেখো, দেখো। হুঁ, আমি জানি সিট কোথায়। বেছে বেছে সামনের দিকের আইল সিট নিয়েছি। এখন এই নরাধমকে দেখতে দেখতে যেতে হবে তোমার।

– দেখা যাবে কী হয়। এ কী, লাঠি হাতে রেখেছো কেনো? ওটা কোথাও সরিয়ে রাখতে হবে। কষ্ট করে উপরে তুলবার দরকার নেই। আমি আমার কোট ক্লজেটে রাখছি। প্লেন থামলে এনে দেবো।
: তথাস্তু। এই নাও। তোমাদের প্লেনে তো সামনের দিকেও অনেক আওয়াজ দেখছি।

– ব্যাপার না। এই ব্রাউনিটা একটু চেখে দেখো তো। আজকের বিশেষ খাবার এটা। বয়ফ্রেন্ডের জন্য কিছু নিয়ে যাবো কিনা ভাবছি।
: ভুল মানুষকে দিলে। আমি চিনি বেশি খাই। এক কাপ চায়ে চার-পাঁচ চামচ পর্যন্ত নিয়ে ফেলি। অন্য কাউকে দাও।

– কেউ তো নিচ্ছে না দেখি। তা তুমি এমন বেজার মুখ করে বসে আছো কেনো? ঝামেলা হয়েছে কোনো?
: নাহ, তেমন কিছু না। ট্রাভেল কিট-এ আমার সবকিছু থাকে, তবুও কী সব নিয়মের জন্য একটা একটা করে বের করে জিপলক ব্যাগে ঢুকাতে হল। এবারে দেখলাম নেল-কাটার, সেফটি-রেজার, ইত্যাদি নিতে দিচ্ছে। আমার একটা ৭ আউন্সের কৌটায় কয়েক ফোঁটা আফটার-শেভ ছিলো, সেটা নিতে দিলো না। বলে, কৌটার ভেতরে যতটুকুই থাকুক, কৌটার আকার ৩ আউন্সের বেশি হতে পারবে না। যন্ত্রণার শেষ নেই।

– মন খারাপ কোর না। কী ড্রিংক নেবে তুমি? বাড়তি একটা কোক রেখো তাহলে। তোমার দুস্থ অবস্থার সম্মানে।
: চিয়ার্স টু অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন!

– কেনো, এমনিতে কি বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া যায় না? যাক, কাজে নামি আমি এবার।
: তা তো অবশ্যই। তোমার গৎবাঁধা কথাগুলো বলে নাও। আমি পালাচ্ছি না।

– উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি মেমফিস থেকে গ্রিন্সবোরো পর্যন্ত এই ফ্লাইটে। আমাদের আনুমানিক যাত্রাকাল সাড়ে ছয় ঘন্টা…
: সে কী? টিকেট তো বলছে দেড় ঘন্টা!

– গত ফ্লাইটের কথা ভুলে গেছো? মিসিসিপি’র উপর ঝড়-বাদলা হওয়ায় গত ফ্লাইটে আমাদের আকাশে চক্কর দিতে হয়েছে আড়াই ঘন্টা। এক ঘন্টার ফ্লাইটের জন্য আড়াই ঘন্টা বাড়তি দেরি হওয়ায় তোমরা সবাই বিরক্ত, তাই এবারে আমি একটু বেশি করে বলে দিলাম আর কি।
: গড ফরবিড। মনে হয় না এমনটা হবে এবার। এদিকের আকাশ পরিষ্কার দেখলাম রওনা দেওয়ার আগে।

– সিট বেল্ট ও ইমার্জেন্সি বিষয়ক খুঁটিনাটিগুলো মেনে চলার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমার পক্ষে যদি আপনাদের এই যাত্রা কোনভাবে আনন্দদায়ক করা সম্ভব হয়, তবে নিঃসংকোচে জানাবেন। আপনাদের মনোরঞ্জনের জন্য আমি যেকোন কিছু করতে প্রস্তুত। এনিথিং টু মেইক ইয়োর ফ্লাইট এনজয়েবল অ্যান্ড কমফোর্টেবল… উইদিন রিজন। আই ডোন্ট ডু ফুট মাসাজ; নট এনিমোর। সো, ডোন্ট অ্যাস্ক। একটু পর তোমাদের আমি কিছু খাবার দেবো। তারপর সময় করতে পারলে গল্প শোনাবো, আর সবশেষে থাকবে গান।
: বিমানবালা বেশ রসিক দেখছি। আপনি তো মনে হয় অনেক ঘুরে বেড়ান। সব সময়ই কি এমন?

– সব সময় না। তবে এই জন তো অনেক বেশিই খোশ মেজাজে আছে মনে হয়। বাকি পথ আরামে কাটলেই হয়। তুমি ছাত্র?
: জ্বী, আমি ভার্জিনিয়া টেকে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। তড়িৎকৌশলের ছাত্র। আপনিও কি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট?

– নো, বাট আই হ্যাভ আ বিয়ার্ড! আমি কর্নেল থেকে পাশ করেছিলাম। আমিও একই বিষয় নিয়ে পড়েছি। প্রায় বিশ বছর আগের কথা। আমার এখন নিজের ব্যবসা আছে একটা। বিছানা বানাই। ঐ যে, পার্টনার ফোন করেছে।
: কর্নেলে আমার খুব কাছের এক বন্ধু পড়ে, প্রশংসা শুনেছি খুব। কান তো বন্ধ রাখা যায় না, তাই তোমার ফোনের কথাবার্তা কিছুটা শুনে ফেলেছি বলে দুঃখিত। তোমার ব্যবসা ভালই চলছে মনে হলো। এই মন্দার মধ্যেও তো বেশ লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছো।

– আমি অসুস্থ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য বিছানা, হুইল-চেয়ার, ইত্যাদি বানাই। ব্যবসার ধরনটাই এমন যে এটার উপর মন্দা তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। আমরা মূলত ডিজাইনের কাজটুকু করি। প্রতি ইউনিটে বেশ ভালই লাভ থাকে।
: ভালই তাহলে। এবারেও কি বিজনেস ট্রিপ ছিলো?

– উহু, এটা ছিল এমনি বেড়াতে যাওয়া। এক সপ্তাহ ফ্লোরিডায় ছুটি কাটিয়ে এলাম।
: বেশ ভালোই তাহলে। প্লেন মনে হচ্ছে একটু পরেই ছাড়বে। আমাদের আগে যা লম্বা লাইন দেখতে পাচ্ছি! দেড় ঘন্টার ফ্লাইট হওয়ার কথা। এখন দেখি ছাড়তে ছাড়তেই দেড় ঘন্টার উপর হয়ে গেল ভিড়ের কারণে। বিমানবালা আসছে আবার, কিছু বলবে মনে হয়।

– জরুরি কোনো কাজে ব্যস্ত না থাকলে একটা প্রশ্ন করতাম আপনাকে।
: না, ব্যস্ত নই। বলে ফেলো। আমার লাঠি ফেরত দেবেন?

– না, তোমাকে না। তোমার পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করছিলাম।
: বলুন কী প্রয়োজন। কোনো সমস্যা হয়নি তো?

– আপনি কি আপনার স্ত্রী সহ এসেছেন?
: জ্বী, আমার স্ত্রীও এই প্লেনেই আছেন।

– আপনি চাইলে তাঁর সাথে বসতে পারেন। আমি সিট বদলে দিতে পারি আপনাদের সুবিধার্থে।
: সে-কষ্ট করতে হবে না। আমি বেশ আছি। ধন্যবাদ।

– ঠিক আছে তাহলে। আপনার স্ত্রী বলছিলেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। আমি অন্য দিকে যাই তবে। প্রয়োজন পড়লে জানাবেন…
: আপনার স্ত্রী ডাকলেন, তবু গেলেন না?

– আমার স্ত্রী আছে, তবে আমার ছেলে সহ। যে-ভদ্রমহিলার কথা বিমানবালা বলছিলো, তিনি আমার স্ত্রী নন। বিমানবালা ভুল করে আমাকে ডাকছিলো। ভদ্রমহিলা সুন্দরী বেশ। পাশে বসতে পারলে মন্দ হতো না, কী বলো?
: তাহলে তো মিস করে ফেললে। চলে যেতে। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলতে, বিমানবালার ভুল।

– স্ত্রীর সামনে এই কাজ করা যায় নাকি? বাসায় গেলে তো আমাকে নাইনটি ডে’স, নো ইন্টারেস্ট প্রোগ্রামে ফেলে দেবে। ক’দিন পরেই ২৫ বছর পূর্তি।
: হাহ হাহ, মনে হয় না এই বয়সে এসে এমন ব্যাপারে সুযোগ নেবে তুমি।

– তা আর বলতে। যাক, ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা বলে। আমার কার্ড রাখো, কখনও দেখা হবে আবার।
: না হলেই ভালো। তোমার কাজের যা ধরন, তাতে দেখা না হওয়াই সুলক্ষণ।

– আই’ল কাট ইউ আ ডিল, তবে আশা করি আসলেই দেখা হবে না আর।
: আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমাকে তো চিনবে না, তবু পারলে ওদিকটায় বেড়াতে যেয়ো, ভালো লাগবে। বিমানবালা এবারে কী বলে শুনে দেখি।

– আমাদের সাথে এই ফ্লাইটে থাকবার জন্য অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আমার আতিথেয়তা যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তবে মন খুলে উপহার দিতে পারেন। আই ওনলি এক্সেপ্ট ডায়মন্ড নেকলেস, গোল্ড ব্রেইসলেট, অ্যান্ড রুবি রিংস। তোমাদের গল্প বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম তার আগেই অনেকে ঘুমিয়ে গেছো। তাই সে-চেষ্টা আর করলাম না। আই ডিড সিং ফর ইউ, দো। আই স্যাং সোলো। পারহ্যাপ্স সো লো দ্যাট ইউ ডিড নট হিয়ার মি। শুভ হোক তোমাদের বাকি দিন।

Tuesday, March 31, 2009

আহা, বিদেশ!

দু'দিনের তুষারপাতে ব্ল্যাক্সবার্গ ঢেকে গেছে পুরো। স্কুলের ক্লাস বাতিল করে দেওয়া হয়েছে কিছু।

আহা, বিদেশ!

ফ্রিজের বাইরে বরফ দেখার শখ আমার অনেক দিনের। আমেরিকা এসেও ৪ বছর লুইজিয়ানায় থাকার বদৌলতে শীত কেটেছে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে! গত শীতে ভার্জিনিয়া এসে দেখলাম বরফ। স্লেজিং নামক কাজটা সেবারই জীবনে প্রথম করলাম। এই শীতে বরফ পড়েছে বেশি, কিন্তু জমলো এবারই প্রথম। মাঝে -২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটেও খটখটে শুকনো ছিল।

আমার কাছে বিদেশ মানেই বরফ। শিশুতোষ এক ধরণের রোমান্টিকতা কাজ করে আমার তুষারপাত দেখলে। এই যে একটু আগে ব্ল্যাক আইসে পিছলে পা মচকে আসলাম, শক্ত মাটি মনে করে পানির উপর জমে থাকা বরফে পা দিয়ে জুতা ভিজিয়ে ফেললাম, তবুও ভালই লাগছে। ঝকঝকে রোদ উঠলেও শীত কমেনি। বালু-ঝড়ের মত উড়ছে মিহি তুষারকণা। বাতাস কাঁপিয়ে যাচ্ছে, মুখে সুঁইয়ের মত বিঁধছে, তবু ভালই তো লাগছিলো।

আমার কম্পিউটারটা জানালার পাশে। এখানে বসে দিনরাত প্রকৃতির খেলা দেখি। দু'দিন যাবৎ একটানা তুষারপাত দেখছিলাম। পরশু বের হবার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দেখিনি। ক'দিন ধরে বৃষ্টি পড়ছিল, ভাবছিলাম তেমনটাই চলবে। ফতুয়া আর একটা জ্যাকেট পরে বেরিয়েছিলাম। চোখের সামনে বৃষ্টির পানি জমে ফ্লারি হয়ে গেল, তার দু'সেকেন্ড পরই পেঁজা তুলার মত তুষারপাত।

আহা, বিদেশ!

এক ফাঁকে পয়েন্ট-অ্যান্ড-ধ্যুৎ ক্যামেরাটা নিয়েই বের হলাম পার্কিং লটে। কিছু ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট।

সিড়ি দিয়ে নেমেই...


বায়ে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তা মাত্রই সাফ করা হয়েছে...


ডান দিকে তাকিয়ে দেখি এই দৃশ্য...


ভাবলাম এদিকেই দু'কদম এগোই...


আমার বাড়ি স্টেট হাইওয়ের একেবারেই পাশে। বেড়ার পাশ দিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে...


দুই বিল্ডিং-এর মাঝের এই ধাপগুলো আমার খুব প্রিয় একটা জায়গায় নিয়ে যায়...


পেছনের দিকে আমার খুব প্রিয় সেই বেঞ্চটা, যেখানে মন খারাপ হলেই একা বসে থাকি...


এত বরফ ডিঙিয়ে নিজেকে ততক্ষণে হিলারি-হিলারি মনে হচ্ছে। ক্লিনটনের শয্যাসঙ্গিনী না, হিমালয়-বিজয়ী হিলারি। মনে হল নিজের দাবিটুকু রেখে যাই...


যাবতীয় রোমাঞ্চ কেটে গেল এই গাছটা দেখে...


অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এই গাছগুলোর মতই আলো-হাওয়ার প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পরে আছি পরের দেশে। নিজের বলতে যেই পাতাগুলো, সেগুলো হারিয়ে গেছে। নুয়ে পড়া শরীরে শুধু ভার বইছি ভিন্‌দেশি বরফকণার।

ডাক পড়লো স্লেজিং-এ যাবার। কী মনে করে যেন মানা করে দিলাম। গরুর মাংস আর খিচুড়ি রাঁধবো। তুষারকে বর্ষা করে দেবো।

আহা, বিদেশ!

Wednesday, June 11, 2008

নীড়ে ফেরাঃ উড়াল পর্ব

আই ডোন্ট ড্রাইভ ফাস্ট, আই জাস্ট ফ্লাই লো। বছর খানেকের মধ্যেই রেকলেস ড্রাইভিং এর জন্য তিন তিনটা টিকেট খাওয়া আজমীরের উক্তি এটা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই টিকেটগুলোর একটা রীতিমত এরোপ্লেন থেকে তাড়া করে, রাস্তা ব্যারিকেড করে, গাড়ি থামিয়ে দেওয়া! আমাদের সফরের একটা অনেক বড় অংশ কেটেছিল পথে পথে, উড়ে উড়ে। মাত্র পাঁচ দিনে ২৬০০ মাইলের বেশি ঘুরে বেড়ানো ট্রিপের এক পর্যায়ে এই উক্তিই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। স্পিডিং কাহাকে বলে, উহা কত প্রকার, ও তার শাশুড়ির নাম কী, তা জানা হয়ে গিয়েছিল যাত্রাপথে।

আমার জন্য সাউথের সিধা, সরল, সিরাতুল মুস্তাকিমের মত পথঘাটে ফিরতে পারা ছিল বিশাল ব্যাপার। ভার্জিনিয়া এসে অবধি পাহাড়ে পাহাড়ে আঁকাবাঁকা পথে ড্রাইভ করে কেটেছে। পুরো আমেরিকায় ট্রাফিক আইন নিয়ে ভার্জিনিয়ায় কড়াকড়ি সবচেয়ে বেশি। এরা পারলে কফ-থুথু ফেললেও শপাঁচেক টাকা জরিমানা করে। স্পিডিং মানে তো কম করে হলেও হাজার খানেক টাকা। সর্বোচ্চ গতিসীমা মাত্র ৬৫ মাইল, রেডারের পাশাপাশি হেলিকপ্টার দিয়েও নজরদারি করা হয়। তার ওপর আমি নিজে স্পিডিং এর দায়ে ছয় মাসের প্রোবেশনে থাকায় জুত মত গাড়ি চালাতে পারছিলাম না আগের মাসগুলোয়। শেষতক গুরু মার্ক নফলারের পরামর্শ অনুযায়ী থ্রোয়িং-কশন-টু-দ্য-উইন্ড করে আমি আর আজমীর স্রেফ দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম এক্সিলারেটরের উপর। এরই চূড়ান্ত নিদর্শন ছিল দুই ড্রাইভারের মধ্যে একাধিকবার হাতবদলের পরও ব্যাটন রুজ থেকে অবার্ন পর্যন্ত ৪২০ মাইল মাত্র ৪ ঘন্টায় পাড়ি দেওয়া। আরো দ্রুত আসতে না পারার সম্পূর্ণ দায় ভাড়া করা পন্টিয়্যাক গ্রাঁ প্রি টার। নামেই স্পোর্টি গাড়ি, কাজের বেলায় ১০৮ মাইলের বেশি স্পিড ওঠেই না! তার উপর শক্ত সিটে টানা বসে থেকে সপ্তাহ খানেক বিব্রতকর সব জায়গায় ঠান্ডা-গরম মালিশ করতে হয়েছে ফিরে এসে।

জগতের আর সব কুকাজের মত স্পিডিং এরও কিছু গ্রামার আছে। অনেকেই পুরো সময় নিয়ম মেনে চালিয়ে মুহূর্তের উত্তেজনায় ১০-১২ মাইল স্পিডিং করে টিকেট খেয়ে বসেন। পুরোটাই গ্রামার না মেনে স্পিডিং এর ফল। স্পিডিং এর তিলমাত্র ইচ্ছে থেকে থাকলে প্রথম কাজ হল সেই এলাকার পুলিশের গাড়ির রঙ চিনে নেওয়া। স্টেট পুলিশ, শেরিফ, হাইওয়ে পেট্রল, ইত্যাদি একেক ধরনের পুলিশের গাড়ির রঙ একেক রকম। বলা বাহুল্য, যেসব স্টেটে পুলিশের গাড়ি কালো, সেগুলোয় একটু সতর্ক থাকতে হয়।

দ্বিতীয় কাজ হল পুলিশের গাড়ির মেক ও মডেল চিনে নেওয়া। প্রায় সব স্টেটেই পুলিশ ফোর্ড টরাস গাড়ি ব্যবহার করে ফ্লিট ভেহিকল হিসেবে। এছাড়া শেভি ইম্পালা ও ডজ চার্জার পুলিশের গাড়ি হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। মোটের উপর পুলিশ আর রেন্টাল কার মানেই আমেরিকান গাড়ি। তবে সমস্যা হয়ে যায় অ্যাটলান্টা বা নর্দার্ন ভার্জিনিয়া বা টেক্সাস রেঞ্জারদের গাড়ি নিয়ে। নিসান মুরানো, টয়োটা ক্যামরি, বা হোন্ডার ট্রাকও দেখা যায় এসব জায়গার পুলিশকে ব্যবহার করতে। শুনেছিলাম ক্যালিফোর্নিয়ায় নাকি ল্যাম্বর্গিনির আধিপত্যের কারণে পুলিশকে করভেট দেওয়া হয়েছে।

নিয়মের তালিকায় এরপর আসে ঢাল বা বাঁকে সমঝে চালানো। পুলিশমাত্রই দৃষ্টির অন্তরাল থেকে উঁকি-ঝুঁকে দিতে পছন্দ করে। এইতো সেদিনই ফ্লোরিডার এক পুলিশ বরখাস্ত হল ড্যাশবোর্ডের ক্যামেরায় জুম করে বেড়ার ফাঁক দিয়ে স্নানরত বালিকা দেখতে গিয়ে। এদেশের হাইওয়েগুলোর এক্সিট প্রায়ই প্রধান হাইওয়ের উপর দিয়ে অন্য পাশে নিয়ে যায় রেস্ট এরিয়ায়। এরকম কালভার্ট-সদৃশ যেকোন সারফেস রোডের নিচ হল মামুদের খুব প্রিয় জায়গা। কপাল খুব ভাল হলে দুটি গাড়ি উলটো দিকে মুখ করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকবে। এই অবস্থায় মামুরা প্রায়ই নিজ নিজ ল্যাপটপে দুষ্ট ছবি দেখে থাকে বলে দুর্মুখেরা বলে থাকেন।

চতুর্থ নিয়মটা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাসিং (সোজা বাংলায় আমরা যাকে ওভারটেক করা বলি) করার প্রয়োজন না হলে বামের লেনে উঠতে নেই। স্পিডগান বামের লেনেই আগে তাক করা হয়। শুধু তাই নয়, আগে-পিছে গাড়ি থাকলে দূর থেকে দেখতে পাওয়া কষ্টসাধ্য। নিউ জার্সির দিকে গেলে সমস্যা অন্য। ওখানে রেডার দিয়ে এক পুলিশ ডিটেক্ট করে, আর সামনে থেকে আরেকজন এসে থামায়। কোথাও কোথাও তো কিছুটা দূরত্বে দুজন বসে থাকে, স্রেফ কেউ প্রথম জনকে পেরিয়েই খুশি মনে স্পিড বাড়ালে ধরবার জন্য।

আমেরিকার অনেক শহরের মুখ্য আয় ট্রাফিক টিকেট থেকে আসে। এই শহরগুলোর কাছে এলেই আচমকা স্পিড লিমিট ১০-১৫ মাইল কমে যায়। আদর করে এগুলোকে টিকেট সিটি ডাকি আমি। এগুলো, কিংবা বড় কোন শহরের আউটস্কার্টে এলেই পুলিশের উৎপাত বেড়ে যায়। এদেশে স্টেট পুলিশদের এক্তিয়ার নেই অন্য কোন স্টেটে যাওয়ার। তবুও স্টেট বর্ডারগুলো স্পিডিং এর জন্য খুব বিপজ্জনক।

সবশেষে দরকার ভাল একজন ওস্তাদ ও অনুগত এক বা একাধিক সাগরেদ। জেট প্লেনের মত উড়ে আসা কোন গাড়ি দেখলেই এক পাশে সরে যান, এবং তার আধা মাইল দূরত্বে থেকে মনের সুখে স্পিড করে যান। এরকম সময় পেছনেও আরো কিছু দ্রুতগামী গাড়ি পেলে তো কথাই নেই। দ্রতগামী গাড়িটি যদি মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিঊ হয়, তাহলে তাকে একবার ওভারটেক করুন। এই গাড়িগুলোর মালিকের বোধহয় ইগো অনেক বেশি হয়। দুই-একবার উৎপাত করলেই এরা মোটামুটি শ'খানেক মাইলে গাড়ি চালানো শুরু করে দেয়। এখানে অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও আছে। লাক্সারি গাড়ি হলেও লেক্সাস, জ্যাগুয়ার, কিংবা মাস্ট্যাং, স্পোর্টি বিএমডব্লিঊকে উষ্কে লাভ নেই। এগুলোর মালিক সাধারণত খুব শীতল রক্তের হয়।

যাক, এগুলো ও আরো কিছু গ্রামারের মেনে চলার প্রত্যক্ষ সুফল ছিল ঝড়ের ভয়ে ঝড়ের বেগে ব্যাটন রুজ থেকে অবার্ন চলে আসা। মজার ব্যাপার হল, এই উড়াল পর্বের পরও সবার মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও। পাশ থেকে সাই-সাই করে সরে যাওয়া গাছ বা গাড়ি নয়, গাড়ির ভেতরের মানুষগুলো আর তাদের জীবনই ছিল মুখ্য।

ব্যক্তিজীবনে মানুষমাত্রই পলায়নপর। কোন কিছু লুকানোর সবচেয়ে ভাল উপায় নাকি চোখের সামনে রেখে দেওয়া। আমি অন্তত নিজেকে সেভাবেই লুকাই। ঢাকে বাড়ি পড়ার আগেই নাচুনে বুড়ির মত কিছু তিড়িং-বিড়িং করে এসে নিভৃতে নিজের দুঃখগুলোয় ডুবে থাকি। একই রকম আড়ালে অধিকাংশ মানুষই লুকিয়ে থাকেন। বড় কোন ভ্রমণে বের হওয়ার সমস্যা হল, এই এস্কেপ গুলো সহসা পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন একই সাথে থাকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তাই সহযাত্রীর অনেক গোমর ফাঁস হয়ে যায় লম্বা সফরে।

যাত্রা শুরুর আগে কেউ প্রকৃতির কাছে দেহের কোন অংশ গচ্ছিত রাখতে ভুলে গেলে তা প্রচন্ড দুর্গন্ধের সাথে প্রতীয়মান হয়ে যায় আধা ঘন্টা নাগাদ। কারো বিড়ি-সিগারেট খাবার অভ্যাস থাকলে সেটা দেড় ঘন্টার মধ্যে বের হয়ে আসতে বাধ্য। কারো পা ঘামার ব্যামো থাকলে দুঘন্টা। ভোজনরসিক কেউ থাকলে প্রতি তিন ঘন্টা অন্তর বড়সড় একটা বিরতি দরকার পড়ে। দ্বিতীয় দিনে জানা যায় কার হজমশক্তি কেমন। দ্বিতীয় রাত নাগাদ ষড়রিপুর অন্তত দুটির উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তৃতীয় দিনে ত্রুটি আড়ালের অভিনয়দক্ষতা জানা যায়। চতুর্থ দিনে দেখা যায় নীরব থেকে পৃথিবীকে উপেক্ষা করার সামর্থ্য। পঞ্চম দিনে প্রতিটি মানুষের জীবন খোলা বইয়ের মত হয়ে যায় আশেপাশের মানুষের কাছে। ব্যাটন রুজ থেকে অবার্নের পথটুকু ছিল আত্মগোপনের অক্ষম অপচেষ্টার যাত্রা। আমরা পাঁচ ভাই কাতর ছিলাম যার যার ব্যক্তিগত বেদনায়। পালাক্রমে দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে বের হয়ে আসছিল গোপনতম কষ্টগুলো।

কারো আদরের প্রতীক্ষিতা তাকে ব্যবহৃত ডায়াপারের মত ফেলে রেখে চলে গেছে আর কারো কাছে। ছন্নছাড়া, নিরামিষ জীবন নিয়ে সেই কূলে শুধুই হুতাশ। দুনিয়াটা সকালে তেতো তো রাতে অসীম।

কেউ একেবারেই উলটো। সুশৃঙ্খল, নামাযী, হাসিখুশি। মাত্রই করাত আগে বান্ধবী মায়ের বকা-ঝকায় ভয় পেয়ে ছেড়ে চলে গেছে তাকে। এই কূলে শুধুই হাসি। আর কিছুক্ষণ পরপর একটাই কথা। আমি ঠিক আছি, ভাল হয়েছে, সব ঠিক আছে।

কারো এক দশক আগে হারানো প্রেয়সী আজ অন্য কারো ঘরণী। মাঠ-ঘাট পেরিয়ে প্রায়ই ছুটে যায় দূর থেকে এক পলক দেখে আসতে। মানুষ থেকে মানুষে শুধু খুঁজে বেড়ায় চিরচেনা কোন মুখের ছায়া।

কেউ ভাবে সেই সব দিনের কথা, যখন পেট বাঁচাতে ধর্ম ছাড়তে হয়েছিল। প্রবাসে নিঃস্ব, ক্ষুধার্ত অবস্থায় কোন এক কালে পড়শী মেয়ের দেওয়া শূকরের মাংস খেয়ে জীবন বাচাঁতে হয়েছে। আজ অর্থ ও খাদ্য আছে প্রচুর, মাঝখান থেকে স্রষ্টা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।

কেউ বা একের পর এক বিপত্তি হাসিমুখে বরণ করে নেয়, এক যুগ পুরনো এক প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখাতে। এই প্রতিশ্রুতিটুকুই ক্যান্সারের কাছে হারানো প্রিয়াকে নিজের মাঝে অনুভব করার একমাত্র নৈমিত্তিক উপায়।

মাত্র পাঁচ দিন। ২৬০০ মাইল। ভেবেছিলাম বেড়াচ্ছি। বাস্তব হল, জীবন থেকে পালাচ্ছিলাম আমরা সবাই।

Tuesday, March 11, 2008

নীড়ে ফেরাঃ গর্ভধারিণী পর্ব

প্রতীক্ষার প্রহর অনেক দিনের চাইলেই আবেগগুলোর বল্গা ছেড়ে দেওয়া যেত মুখোমুখি হতেই তবু দেওয়ালগুলো দাঁড়িয়ে গেল কীভাবে যেন কথাটা আমার মাকে বলা ভুললো না দূরত্বের ছলে আমিও চিরচেনা বড় ছেলের মত করেই আলাদা হয়ে গেলাম, চোখ সরিয়ে নিলাম, গাড়ির বুট থেকে মালপত্র নামাতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম এভাবেই শুরু চার দিনের এক ঝটিকা সফরের গর্ভধারিণী পর্ব দুষ্টুমিভরা বাঁকা হাসি মুখে নিয়ে বললাম, পঞ্চাশ হওয়ার আগেই আশি হয়ে গেলে দেখছি মাথাটা আলতো করে ঝাঁকিয়ে, একটু পেছনে হেলিয়ে, মুচকি হেসে এসে জড়িয়ে ধরলো, মাথায় হাত বুলালো

লুইজিয়ানা ছেড়েছি ঠিক সাত মাস আগে স্প্রিং-ব্রেকে অনেকটা ধুম করেই বেড়াতে চলে আসা মা অসুস্থ, মাঝে কিছু সময় হাসপাতালে ছিল ছোট ভাইটা ক্লাস আর কাজের ভাঁজে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থার মাঝেও যেটুকু পেরেছে করেছে পুরুজিত তো বন্ধুর মাকে নিজের মায়ের মত করে আগলে রাখছে অনেক দিন ধরেই একই দেশে আমি দূরে বসে কোন বেলায় মুড়ি-চানাচুর খাই, তো কোন বেলায় বসে বসে স্পেলবাইন্ডার দেখি চোখের আড়াল হতে পারলে জীবন কী সহজ, অনাবিল পড়তে ভাল লাগুক চাই না লাগুক, হোমওয়ার্ক শেষ হোক বা না-হোক, লেখাপড়াকে দায়িত্ব এড়ানোর উছিলা হিসেবে কী সহজে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় পড়শি বাঙালিরা কেউ খাবার দিয়ে গেছেন, কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন, কেউ দিনে কয়েক দফা করে খোঁজ নিয়ে গেছেন

এক বেডরুমের ছোট্ট বাসাটায় ঢুকতেই স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরলো যেন নাতিদীর্ঘ প্রবাসজীবনে একবার দেশে গিয়েছিলাম নস্টালজিয়া তেমন একটা কাবু করেনি শুধু কেমন যেন একটা অন্য রকম লাগা ছিল এবার লুইজিয়ানা ফিরে বুঝলাম, নীড় মানে নিজের দেশ, ঘর, আলো, বা বাতাস না মা যেখানে, নীড় সেখানেই; সর্বংসহা গর্ভধারিণীর স্মিত হাসি যেখানে, সেখানেই জীবন গুড়ি গুড়ি তেলাপোকাগুলো দেখে কত্ত দিনের চেনা মনে হচ্ছিল ফেলে যাওয়া শেভিং ক্রিমের কৌটায় তেলাপোকার ডিম, রংচটা কার্পেটে মশলার গন্ধ, পানির কলের বিকট আওয়াজ মনে হচ্ছিল যেন এই গতকালই এখানে ছিলাম আমি

হার্ভার্ড ব্র্যান্ডের আফটার শেভ’টা চোখে পড়ে গেলো দেশ ছাড়ার আগে বাবার দেওয়া ছেলে গায়ে-গতরে বেড়ে ওঠার প্রথম স্বীকৃতি ছিল সেটা সংসারের দায়িত্বের পালাবদল হতে হতে আজকের অবস্থা অনেক ভিন্ন আমার এককালের জাঁদরেল বাবা আজকে ফোন করে বলে মাকে দেখে রাখতে, মায়ের সাথে ঝগড়া করে দুই তরফ থেকেই ফোন করে অনুযোগ করে এমনতর কথা ভাবতে ভাবতে বসে পড়লাম ৩৫ ডলারে কেনা রিক্লাইনারটায় মাত্র একটা বছর আগে এখানেই একা বসে কাটিয়েছি জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময়টুকু পুরো দিন ঘুরে আমার প্রতীক্ষিতার জন্য বিয়ের আংটি কিনে এনে এই রিক্লাইনারে বসেই ফোন করে অঞ্জনের সুরে বলেছিলাম, আর মাত্র কয়েকটা মাস, ব্যাস্‌ এইতো সামনেই মা জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে বসেছিল এখানে বসেই জবাবে শুনেছিলাম, তোমাকে বলা হয়নি, আমি আমার এক ক্লাসমেটের সাথে আছি এখন, বিদায় সেই মুহূর্তটার আগ পর্যন্ত জানতাম আমাকে দিয়ে কোনদিন অভিনয় সম্ভব না হায় রে জীবন সেই দিনটায় সামান্য এক কৌটা ঝাঁঝালো সুগন্ধী পেয়েই কী খুশি হয়ে গিয়েছিলাম

আমার মাকে নিয়ে আমি কখনো লিখি না শুধুমাত্র কোথায় শুরু করবো জানি না দেখেই নানা পিএইচডি করার সময়টায় আমার মাকে গ্রামে থাকতে হয়েছে পাঁচ বছর লেখাপড়ার সেই ছেদ উত্তরণ করে অনার্স সেরেও মাস্টার্স করতে পারেনি আমি পেটে চলে আসায় মা-বাবা-ভাই বছর তিনেক আগে ডিভি পেয়ে আমেরিকা চলে এসেছে মা সেই থেকে আমাদের দুই ভাইয়ের পড়ার খরচ যোগাচ্ছে হাড়কেপ্পন এক চাইনিজ রেস্তোরাঁয় অহর্নিশ কাজ করে বকলে শুনে না, বারণ করলে মানে না বাসা ভাড়া, প্লেনের টিকেট, হরেক রকম বিল, ভার্সিটির টিউশন, ইত্যাদির সবকিছু আমরা দেই আমার মায়ের মাংস বেঁচে

বাবা দেশে আটকে আছে সরকারী চাকরি আর পেনশনের দুশ্চিন্তা নিয়ে মায়ের শরীরের ভাঙনটা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল শুকিয়ে আধখানা হয়ে যাওয়া আমার মাকে দেখে মনে পড়ছিল প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা হিসপ্যানিক ম্যানেজার এক বেলায় ষোল থেকে কুড়ি বালতি বরফ টানাতো, আমি কাউন্টারের ওপাশে বসে দেখতাম ইংরেজি বলতে সংকোচের সুযোগ নিয়ে দাসের মত খাটাতো আমার মাও নিঃশব্দে শ্রম দিয়ে যেতো, স্বামী-সন্তানের স্বাচ্ছন্দ্যের স্বপ্ন নিয়ে রিৎজ্‌ কোম্পানির বিস্কুট ওয়ালমার্টগামী মাত্রই চেনেন স্যাম্‌স ক্লাব থেকে রিৎজের প্যাকেট নিয়ে আসতাম মা আমার সকাল-সন্ধ্যা কামলা খাটতো সেই বিস্কুট খেয়ে ভিড়ের দোহাই দিয়ে ম্যানেজার লাঞ্চ ব্রেক দিতো না, দোকানের খাবার খেলেও টাকা নিতো, মেপে মেপে ড্রিংক দিতো পকেটে লুকানো বিস্কুটগুলোই ছিল ভরসা আমরা দুই ভাই প্রেম আর বন্ধু নিয়ে মেতে থেকে জগৎ উদ্ধার করতাম লন্ড্রি থেকে কাপড় এনে রাগ হতাম মায়ের উপর, পকেট থেকে বিস্কুট বের করতে ভুলে গেছে দেখে ছোট ছোট প্যাকেটে ছোট্ট, গোল বিস্কুটগুলো আমার সেই মা’টা কেমন ছোট্ট, শুকনো আজকে

বহুদিন পর সামনে পেয়ে আলাপচারিতাগুলোও যেন কেমন হয়ে গেল

- না, বাবা তেমন কষ্ট হয় নাই এমনিই মাথা ঘুরাচ্ছিল খুব তোমার লোপা আন্টি এসে বললো, এভাবে বসে থাকার মানে নেই ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেল ওরা দেখে হাই-প্রেশার, ফ্লু ব্রেইনে স্ক্যান করে দেখলো সাইনাস ইন্‌ফেকশন ভর্তি করে রেখে দিলো কাজে যেতে পারলাম না সেদিন আর সাথে অ্যান্টিবায়োটিক এরপর কী একটা ওষুধ দিলো, শুধু ঘুমালাম কয়দিন

- হুম, ভাল হয়েছে দরকার ছিল বিশ্রামটা আমাদের কথা তো শুনবা না, এভাবেই ঘুম দরকার ছিল তোমার তো চিরকাল লো-প্রেশার ছিল, হঠাৎ উল্টাযাত্রা কেনো?

- আমি কী জানি! আমিও তো শুনে অবাক চোখের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে সামনে আমার একটা চোখ নাকি সরে যাচ্ছে, অপারেশন করতে হবে ঠিক রাখতে দৃষ্টিশক্তি তেমন একটা ভাল হবে না আর থাক, কী দরকার এখন এসব করে টাকা নষ্ট করার?

- দেখা যাক আর কয়টা দিন সময় দাও, দেখি কী করা যায় আহা, মানা করলাম তো এটা নিয়ে কথা বলতে হাতের এই অবস্থা কীভাবে হল? রক্ত নিতে গিয়ে হাত এভাবে মোরব্বা বানানোর মানে কী? ধমকও দিতে পারলা না একটা মুখচোরাই থেকে গেলা আজীবন নিজের কথা মুখ ফুঁটে বলার সাহস কবে হবে তোমার?

- নতুন একটা নার্স, বলে ভেইন খুঁজে পায় না অযথা ওদের উপর রাগ কোর না ওরা অনেক যত্ন নিয়েছে আমার বিনাপয়সায় এরচেয়ে ভাল চিকিৎসা আশা করা ঠিক না

- কী করতে যে আমেরিকা আসলাম পেলাম তো না-ই কিছু, বরং হারালাম সবকিছু দেশের জীবন কত গোছানো ছিল কোন ভূতের কামড়ে যে আমি আমেরিকা আসলাম আমি না আসলে তুমিও সুরসুর করে এসে পড়তা না যৎসামান্য যা-কিছু ছিল, তাও গেলো

- এভাবে ভাবতে নাই আর সবার মত ভাবতে পারো না? ঐ এক দুঃখ বুকে নিয়ে নিজের জীবনটা নষ্ট করে দিবা এভাবে?

- আমি কিন্তু কোন পুরানো কথা তুলি নাই, মা আমি ভালই আছি

- আমার কাছে লুকানোর চেষ্টা করছো? একটা মেয়ের জন্য এভাবে সব ছেড়ে দিচ্ছো? দেখিয়ে দেওয়ার জেদ কাজ করে না বুকের মধ্যে? মনে হয় না, কোন একদিন যেন ভুল বুঝতে পারে?

- আমি তো প্রতিশোধ-তাড়িত মানুষ না! আমাকে দিয়ে এরকম চিন্তা আসে না আমার কষ্টটা শুধু আমি একা বুঝি আমার মত করে ছেড়ে দাও, প্লিজ আমি আমার জগৎটা একটু একটু করে আবার তৈরি করছি

- মাত্র দু-তিন বছর ধরে চেনা একটা মেয়ের জন্য এত কিছু ছেড়ে দিচ্ছো, একবার এই মা’র কথা মনে পড়ে না? আমি যে পঁচিশ বছর ধরে তোমাকে একটু একটু করে বড় করলাম, সেটার কী হবে? আমি যে সেই চার বছর বয়স থেকে সাথে সাথে ঘুরে তোমাকে লেখাপড়া করালাম, তার কী হবে? তোমার উপর ঐ মেয়ের দাবি আছে, আমার দাবি নেই?

সেই সে রিক্লাইনারে বসে জীবনের দ্বিতীয় ঝাঁকিটা খেলাম আমার মা আমার সামনে দাঁড়িয়ে তার পাওনাটুকু দাবি করছে, করতে হচ্ছে আর কীই বা করবে? ভাল রেজাল্ট চাইতো, পেতো অথচ কুসন্তান এই আমি তো কোনদিন মা-বাবাকে খুশি করার মানসে লেখাপড়া করিনি, করেছি ছেলেভুলানো এক সুন্দরীকে ঘরে তোলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে এভাবে কেটে গেল প্রথম রাত

পরদিন ব্লাড টেস্ট করাতে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে অপেক্ষা করতে করতে এক কাল্লুমামার কায়কারবার দেখছিলাম গাম চিবাচ্ছে, গাম বিলাচ্ছে, সবার কুশল জানতে চাচ্ছে, সবার সাথে হাত মেলাচ্ছে নাহ, আমেরিকার সাউথ আসলেই আলাদা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলাম, বললো ভয় পায় না আর যাবার পথে মা বলছিলো গাড়ি চালানোর কথা

- আজকে আমি চালাই, তুমি দেখো তো আমার চালানোটা কেমন এখন আমি মাঝেমধ্যে একটু-আধটু শিখেছি

- নাহ, হাতটা ঠিকমত ঘুরানো শিখবা না তুমি কোনদিন এ কী, খালি পায়ে চালাচ্ছো কেন? পায়ে গরম লাগবে তো

- আমার এভাবেই সুবিধা আমাকে আমার মত একটু চালাতে দিয়েই দেখো না আহারে, আজমীরের ঐ গাড়িটা আর নাই, না? খুব মনে পড়ে ওটার কথা ওটায় করে আমাকে নিউ ইয়র্ক থেকে নিয়ে গিয়েছিল তোমাদের ওখানে

- আর বোল না ঐ পাগলের কথা আমারো খুব মন পড়ে ঐ গাড়িটার জন্য

- আচ্ছা, এবার যে তুমি আমাকে তেমন বকা-ঝকা করছো না?

- দেই নাই, তবে দিতে কতক্ষণ? রাস্তার দিকে চোখ রাখো আরেকটু জোরে চালাতে পারো, স্পিড লিমিট ৩৫ এখানে ওহ, আজকে বিকেলে তোমাকে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে যাবো কিন্তু

- জানো, সেদিন তোমার মঞ্জু আঙ্কেল একটা কথা বলছিল মানুষ তো মিড্‌ল-ইস্ট থেকে কত কত দিনার পাঠায়, তবু সবাই আমেরিকা আসতে চায় দামী জিনিসপত্র সব দেশ থেকেই যায়, তবু লোকে আমেরিকা আসতে চায় সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে, ঘুরে বেড়ানোর গল্প শুনে ছবি দেখে দেশের লোক শুধু সমুদ্রের পাড়টাই জানবে, ভিতরের কষ্টগুলোকে জানবে না এর জন্য আমরাই দায়ী

চলছিলো এভাবেই আমাদের সেই টয়োটা ক্যামরি – আমার দ্বিতীয় বৌ, আমার আদরের আদমজী জুট মিল মা বলছিলো কুকুরের ডাক শুনে ভয় পেয়ে গাড়িটার রিয়ারভিউ মিররে ব্যাথা পাবার কথা আমি আফসোস করছিলাম কাল্লুদের হাতে হেনস্তা হবার দিনে গাড়িটা না থাকা নিয়ে হাঁটার সময় মা আর পিছিয়ে পড়ছিল না, হয়তো আমি তার তালে হাঁটার কারণেই একসাথে বাজার সারলাম শেষ বেলাটা কেটে গেল ঘরোয়া আলাপ করে

- ঘরে শানের শিক কাবাব মশলা আছে? না থাকলে নিয়ে রাখো কিছু গরুর মাংসে দিয়ো, কষানোর সময় অন্যরকম মজা

- বাসায় স্যামন ম্যারিনেট করে রেখেছি তোমাদের জন্য শরীর ভাল না দেখে তেমন কিছু করতে পারলাম না এবার, বাবা তোমার ছোট খালুর কাছ থেকে শিখেছি টেলিফোনে লেমন-পেপার আর মধু দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখা আছে ঘরে গিয়ে বেক করবো

- না করে ভাল করেছো আমি তো এবার এসেছি তোমাকে খাওয়াতে এত এত লোক আমার রাঁধা বিরিয়ানি খেয়ে যায়, অথচ তুমিই বাদ থেকে গেলে শর্টকাট শিখেছি একটা তন্দুরী মশলা দিয়ে মুরগি ওভেনে বসিয়ে দিবা, আর রাইস কুকারে সিন্ধি মশলা দিয়ে বিরিয়ানি ৪৫ মিনিটে মামলা খতম গন্ধ বা নোংরার বালাই নেই

কোনদিন কি ভেবেছি এরকম ‘মেয়েলি’ আলাপ করবো আমি মায়ের সাথে? সাথে সাথেই মনে হল, অনুভূতিশূন্য হওয়ার মধ্যে আদতে কোন পৌরুষ নেই পেছনের দিকে তাকালে আফসোস হয় আড়ালে থাকার দিনগুলো মনে করে খেতে বসে মনে হচ্ছিল, কতদিন পর তিনজন একসাথে, কতদিন আব্বুসহ চারজন একসাথে খাই না মা চোখে পানি এনে বললো যেন দারুর দুনিয়া থেকে দূরে থাকি না, চেখে দেখার জন্যও না ১% অ্যালকোহল থাকলেও না অন্য সময় হলে আলাদা কথা ছিল, এখন তোমার মনে অনেক কষ্ট, এখন এটা নেশা হয়ে যাবে কী আশ্চর্য যুক্তিবাদী হয়ে গেছে আমার আবেগপ্রবণ মা, কত বড় হয়ে গেছে আমার ছোট ভাইটা

নীড়ে ফেরা বোধহয় একেই বলে

(প্রায় শেষ)

নীড়ে ফেরাঃ দ্বিচল সম্মেলন পর্ব

অ্যালাবামার অবার্নে যাবার সৌভাগ্য হলে একবার কদম ফেলে যাবেন সহ-সচল দ্রোহীর বাসায়। যেকোন দিন, যেকোন সময় দ্রোহীর দরজায় টাক্‌-টাক্‌ করে বলবেন, চাটনি আছে তো? কথাটা ঠাট্টা ভেবে উড়িয়ে দিলে নিজেই ঠকবেন।

স্প্রিং ব্রেকে লুইজিয়ানা যাবার পরিকল্পনা হাতে নিয়েই আমাদের সবার মাথায় হাত। যাত্রাপথ একেক দিকে এক হাজার মাইল করে। গুগুলের হিসেবে প্রায় ১৬ ঘন্টার মামলা। গাড়ি নাহয় ভাড়া করা গেল, কিন্তু এতগুলো গরুকে একরাত আশ্রয় দেবার মত গোয়াল কোথায় পাই? শুরু হয়ে গেল বিভিন্ন নেটওয়ার্কে পাত্তা লাগানো। সচলায়তনের সদস্যদের প্রোফাইল ঘেঁটে বের হল, দ্রোহীর বাস অবার্নে। আদর্শ বিশ্রামস্থল। ঠিক সাড়ে আট ঘন্টার দূরত্ব। ওদিকে আরেক বড় আপুও মিলে গেল। দ্রোহী তবু আধা-চেনা, দ্রোহীনি ভাবি তো একেবারেই অচেনা। প্রথম রাতে তাই তাঁদের জ্বালাতন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ঘুম-জড়ানো চোখে আপু আমাদের জন্য দরজা খুলে দিলেন ভোর সাড়ে চারটার দিকে। মধ্যাহ্নভোজের জন্য দ্রোহীর দরজায় হাজির হলাম পরদিন বেলা দেড়টার দিকে।

অধম ছিলাম চালকের আসনে। একে একে যে-ই নামছিলো, সবাইকে বলে দিচ্ছিলাম নিজেকে ইশতিয়াক বলে পরিচয় দিতে। কাজ হল না। সুজন চৌধুরীর অসামান্য স্কেচের বদৌলতে দ্রোহী আমার কুলার মত কানগুলোর ব্যাপারে বিশেষ ওয়াকিবহাল। কান দেখে চিনে ফেললেন। দ্রোহীর প্রতি আমার প্রথম কথা, আপনি তো অতটা ওবামার মত না। সশব্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রোহী ইঙ্গিত করলেন দেওয়ালে ঝুলানো বিয়ের ছবির দিকে। বলতে বলতেই ভাবি হাজির। ভাবির প্রতি আমার প্রথম কথা, আপনিই দ্রোহীর সেই বউ!

আবজাবের বদৌলতে দ্রোহীর খান্ডারনি বৌয়ের গল্প সবাই জানেন। আসা-যাওয়ার পথে ভাবির সাথে দুই রাতে বেশ ক’ঘন্টা তুমুল আড্ডার পর বুঝলাম, দ্রোহী আসলে তোপসে নন, জটায়ু! সদাসহাস্য, প্রাণময়, পঁচানিস্ট ভাবির সাথে প্রথম কিছুক্ষণ কথা কম হচ্ছিল। দ্রোহীর সাথেই চলছিল আলাপ-সালাপ। বলছিলেন, তিনি খুবই সংগ্রামী মানুষ। জীবন গেছে ইধার-উধার ইতি-উতি করেই। অধমের সাথে মিলে গেল অনেক কিছুই। জেনে খুবই অবাক হলাম যে সেই বছর দু-তিন আগে বাতায়ন নিয়ে আমার আর হিমু ভাইয়ের নিরীক্ষার সময়েই তিনি অধমকে চিনেছেন। বাংলা ব্লগিং নিয়ে কথা হচ্ছিল। বাংলায় লিখতে পারার আনন্দ নিয়ে কথা হচ্ছিল। হিমু নামক এক হাঁটুপানির জলদস্যুর দুর্ধর্ষ ব্লগিঙের তোড়ে লিখতে বসলেই বিচিত্র সব অনুভূতির কথা হচ্ছিল। সাথে ছিল আবহাওয়া, রাজনীতি, স্কুল-কলেজের জীবন, দেশ, আর গাড়ি। একেবারেই নৈমিত্তিক পুরুষালি বাতচিত। ভাবির সম্মানে শুধু নারীপ্রসঙ্গ বাদ ছিল।

ঝড়ের পূর্বাভাষ ছিল, কিন্তু তাই বলে শিলাবৃষ্টি হবে ভাবিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হল খাদ্যবর্ষন। ভদ্রতা করে ভাবিকে বলেছিলাম যে আমরা চুলা থেকেই নিয়ে নিতে পারবো। ভাবি কপট হাসি দিয়ে বললেন, ছেলেমানুষের খাবলাখাবলিতে খাবার পড়ে ওনার ঘর নোংরা হবে, সেই ভয়েই টেবিলে দেওয়া। আত্মা কেঁপে উঠলো। জানতে চাইলেন কেউ বিশ্রামাগারে ঢুঁ মারতে চাই কিনা। পেট বেঁধে, কাষ্ঠ হেসে না বললাম। এবার হালকার উপর ঝাপসা ঝাড়ির ছলেই বললেন, গেলে ওনার সামনে দিয়েই যেতে এবং আসতে হবে, অতএব লজ্জার কিছু নেই। এবার আত্মা নীরবে চিৎকার দিয়ে উঠলো।

ভাবি এরপর শুরু করলেন গরমাগরম খাবারের ঢাকনা ওঠানো। মুরগি খেয়ে অভ্যস্ত, তাই মুরগি আছে। মুরগি খেয়ে বিরক্ত, তাই মাছ আছে। কাবাব আছে। সবজি আছে। সালাদ আছে। রাইস কুকারের আশীর্বাদে পেটে ভাতের চর পড়ে গেছে, তাই খিচুড়ি আছে। সাথে আছে চাটনি। এত কিছু দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ভাবি নিশ্চয় রান্নাবান্না খুব এনজয় করেন। মুহূর্তে খসে পড়লো সব পর্দা। হাসির বন্যায় ভেসে গিয়ে ভাবি বললেন, আই লাভ কুকিং! পরক্ষণেই আবার রাগত চেহারা করে হুকুম দিলেন, সব শেষ করে যেতে হবে, তাঁকে যেন বাসি খাবার খেতে বাধ্য করা না হয়। মমতায় নাকি খাবারের স্বাদ বাড়ে। টের পেলাম। অনেকটা পথ বাকি, তাই খেয়েই উঠে পড়তে হল। তিনজন চালক ছিলাম আমরা। পাল্লা দিয়ে ভাবিকে শাপ-শাপান্ত করেছি তিনজনেই বাকিটা পথ। খাবারের আরামে চোখ বুঁজে আসছিল ঘুমে। পাছে মুখ থেকে স্বাদ চলে যায়, এই ভয়ে প্রথম অনেকক্ষণ কেউ কফিও ছুঁয়ে দেখিনি।

ফিরতি পথেও যথারীতি অনেক রাত হয়ে গেল। পরদিন তাঁর মিডটার্ম পরীক্ষা, সহপাঠীদের সাথে রাতভোর ফাইট দেবার কথা, তবু দ্রোহীর কড়া হুকুম, রাতে তাঁর বাড়িতেই খেতে হবে। আগের দফায় ভাবি বলছিলেন, চাটনিটা ডালের সাথে খেলে মজা লাগতো। পাশ থেকে ওয়াসেফ ফরমায়েশ করে ফেলেছিল পরের বার ডাল রাঁধতে। এবারেও খাবারের বন্যা, তবে একেবারেই নতুন সব আইটেম। মাছ, ভর্তা, বড়ইয়ের আচার, চাটনি, ডাল, সবজি, আরো অনেক কিছু। জেনেবুঝেই ইলাস্টিকের কোমড়বিশিষ্ট প্যান্ট পড়ে এসেছিলাম এইবার। এবারে বলে দিতে হয়নি যে ভাবির রান্নায় লবণ কম, ঝাল বেশি। আমরা যে পশুরই উত্তরপ্রজন্ম, তার নিদর্শন রেখে রীতিমত যুদ্ধ করে খেলাম সবাই। হাত ধুতে গিয়ে দেখি গোলাপির রাজত্বে চলে এসেছি। বেরিয়ে এসে ভাবিকে বললাম, সচলায়তনে আপনার কথা লিখলে গোলাপি ভাবি নামে লিখবো। ভাবি হেসে বললেন, তাঁর প্রিয় রঙ অন্য, গোলাপি কোন কিছুই তাঁর কেনা না। মুরুব্বি তখন হামলে পড়লেন প্রতি বিন্দু গোলাপি রঙ কীভাবে সম্প্রদানের হাইওয়ে ধরে এথায় পৌঁছেছে তা ব্যাখ্যা করতে। আমিও ব্যাপক মনোযোগের সাথে ঠাকুর ঘরের কলার বয়ান শুনে গেলাম।

এরপর শুরু হল আড্ডা, এবং দ্রোহীর গোলাপি থেকে কমলা হয়ে লাল হওয়া। যাবার সময় তাড়াহুড়ার কারণে অনেকটা আচমকাই আড্ডা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। সেবার আজমীরকে দেখে দ্রোহী বলছিলেন, চেনা চেনা লাগে। ভাবিকে দেখে আজমীর বলছিলো, চেনা চেনা লাগে। কিয়ৎকাল পর কথাবার্তা ঘুরে গিয়েছিল এক কোণায় পড়ে থাকা কিছু ডাম্বেল, দক্ষিণের উষ্ণ আবহাওয়া, অসামান্য সুন্দরী মেয়েদের ছড়াছড়ি, আর কে বা কারা দেখতে চামচিকার পাছার মত হওয়ায়। এক ফাঁকে দ্রোহী ভাবিকে টিটকারি মেরে বলে বসলেন, সাত-সকালে তিনি রেয়াজ করার সময় নাকি পাশের বাড়ির বাঙ্গালি পড়শি দেওয়াল পিটিয়ে বলেন, বৌকে আর মারিস না! সেবার ভাবি শুধু ধরিয়ে দিয়েছিলেন যে সব রকম প্রাণির পশ্চাৎদেশের প্রতি দ্রোহীর বিশেষ মনোযোগ আছে। ওস্তাদের মার যদি শেষ রাতে হয়ে থাকে, তাহলে ওস্তাদের বৌয়ের মার ফজর ওয়াক্তে।

অভিব্যক্তিতে অসামান্য পারদর্শী গোলাপি/চাটনি ভাবি একের পর এক বলে চলছিলেন আমাদের প্রিয় দ্রোহীর যাপিত জীবনের বিবিধ কৌতূহল-উদ্দীপক ঘটনা। চুম্বক অংশে ছিল বিয়ের পর নতুন মানুষকে কাছ থেকে চেনার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা। দ্রোহী বলছিলেন, ছেলেবেলা থেকে একা ঘুমিয়ে অভ্যাস। রাতে কারো গায়ে হাত লাগলেই নাকি সজোরে হাত চালিয়ে দিতেন। কোন এক কালে ঘুমের মধ্যে এক বড় বোনের গলা টিপে ধরেছিলেন! জানা গেল, রান্নাবান্নার হাতা/নাড়ানি যথাযথ ভাবে ব্যবহার করলে এহেন দুরন্ত পতিকেও শুধরে দেওয়া যায়। সমস্যা হল, হাত চালানো বন্ধ করা গেলেও আলাপচারিতা বন্ধ করা যায়নি অদ্যাবধি। এমনই এক গল্প দিয়ে শেষ করছি দ্বিচল সম্মেলন পর্ব।

ভাবি বলছিলেন ঘুমের মাঝে দ্রোহীর কথা শুনে প্রথমবার জেগে যাবার কথা। নিশিরাত। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। ডাকাডাকি শেষে ঝিঁঝিঁ থেকে কুকুর পর্যন্ত সবাই ক্লান্ত। এমন সময় নীরবতা খান্‌খান্‌ করে দ্রোহী বলে উঠলেন, বিলাইয়া দিয়ো! ধরফরিয়ে উঠে ভাবি জানতে চাইলে কী বিলাতে হবে। অচেতন দ্রোহীর সচেতন জবাব, ঐ যে ঝুলতেসে, যেটা পছন্দ, রেখে বিলায় দিয়ো! বোঝা গেল, বিয়ের উপহারের স্বপ্ন কথা বলছে। কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে ভাবি আবার শুলেন। এবার ঘুমন্ত দ্রোহীর সহাস্য চিৎকার, অনেক গুলা বৌ, হাঁটাহাঁটি করতেসে! বেচারি ভাবি আবারো উঠলেন, তবে এবার কৌশলে জানতে চাইলেন, তোমার বৌ কোনটা? লজ্জায় লাল হয়ে দ্রোহী বললেন, এই যে এইটা! অচেতন এই প্রেমের কাহানি শুনে আনন্দিত ও মুগ্ধ হয়েছিলাম সবাই।

নাহ, আরো দুয়েকটা বলে যাই। আরেক রাতে নাকি দ্রোহী ঘুমের ঘোরে বলছিলেন, আমি লাইব্রেরিতে! উপরে উঠি! কাগজ কাটি! আরেক রাতে বলে বসলেন, সিচুয়েশন বুঝতে হবে তো! অনেক অনেক ডাটা! বাকি গল্পগুলো নাহয় দ্রোহী ও তাঁর আবজাব সিরিজের জন্যই রেখে দেই।

ভাবি একের পর এক গল্প বলে যাবার সময় দ্রোহী শুধু মাথা নেড়ে বলছিলেন, ইজ্জত মেরে দিলো। হয়তো তা-ই। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে গিয়েছিল অসামান্য প্রাণচঞ্চল ও অতিথিবৎসল দ্রোহী দম্পতির ছোট ছোট খুনসুটিগুলো। একজন বলেন আমার মত পাবা না, তো আরেক জন বলেন তোমার চেয়ে ভাল পাবো খুঁজলে। পঁচানোর প্রতিযোগিতার ফাঁকে ফাঁকেই চোখে পড়ে যাচ্ছিল অসামান্য মমতার চিহ্নগুলো। একদিন বেলা সাড়ে বারোটায় ফোন না আসলেই ভাবির অস্থির হয়ে পথে নামা, সুপার-গ্লু দিয়ে ভাবির দুই ঠোঁট লেগে যাবার ভয়ে দ্রোহীর টেনশনে অজ্ঞান হবার দশা, এমন অনেক খুচরো মুক্তায় ভরা ছিল আড্ডাটা।

ভাবির অনবরত হাসি দেখেই বুঝেছি দ্রোহী তাঁকে আনন্দে রেখেছেন। অন্যদিকে সুখী মানুষের নিদর্শন স্বরূপ দ্রোহী নাকি ঘুমের ঘোরে ইদানিং কথা ছেড়ে গান ধরেছেন। সমস্যা একটাই, গানের কথা শুধু বিটিভি-র মত একই ফ্রিকোয়েন্সির একটা পুউউ আওয়াজ।

(চলবে)