Showing posts with label প্রবাস. Show all posts
Showing posts with label প্রবাস. Show all posts

Monday, July 13, 2009

জালাল ভাইকে নিয়ে প্রথম আলোতে একটি লেখা


অনেকেই হয়তো দেখে থাকবেন, শ্রদ্ধ্বেয় জালাল ভাইকে নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় একটি লেখা ছাপা হয়েছে। লেখাটি লিখেছেন সেলিম রেজা নূর।

সচলায়তন কিংবা আন্তর্জালে ঘুরে বেড়ানো অনেকের কাছে জালাল ভাইয়ের কীর্তি অচেনা নয়। একটি ছন্নছাড়া দেশের ভুলে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য ইতিহাস তিনি সংগ্রহ করেছেন পরম যত্নে। কোনো প্রকার পৃষ্ঠপোষকতা বা উৎসাহ ছাড়াই গড়ে তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নিজস্ব এক যাদুঘর।

ব্যাক্তিগত আলাপে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জালাল ভাইয়ের কাজের ধরন ও পরিধি জানার সুযোগ হয়েছে আমার। নিভৃতে, কোনো রকম সাধুবাদের তোয়াক্কা না করে আমাদের জালাল ভাই মাল-মশলা জুগিয়ে যাচ্ছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস প্রতিষ্ঠার জন্য।

জালাল ভাইয়ের এই নিরলস সাধনা ও অন্তহীন দেশপ্রেমের কথা আন্তর্জালে অনেকেই জানি আমরা। দুঃখজনক সত্য হলো, অনেক সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ-ব্যবসায়ী তাঁর তথ্য-ভাণ্ডার ব্যবহার করলেও তাঁর নামটি প্রচার করেন না। আন্তর্জালের বাইরের অনেকের কাছেই জালাল ভাইয়ের নামটি তাই অপরিচিত।

আচমকা এই লেখাটি দেখে অনেক আনন্দ জেগে উঠলো মনে। সচলায়তন নামটির সাথে জড়িতরা অন্তত জানুক জালাল ভাইয়ের কথা। সে-উদ্দেশ্যেই তুলে দিলাম লেখাটি।

মূল লেখার লিংকঃ http://www.prothom-alo.com/mcat.news.details.php?nid=MTY0MjIx&mid=NA http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=11&date=2009-07-08

উদ্ধৃতি


প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের তথ্যভাণ্ডার
- সেলিম রেজা নূর

টেলিফোনের শব্দে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। ‘কলার আইডি’ দেখে বুঝলাম আমার অগ্রজ ফাহীম ফোন করেছে। কোনো প্রয়োজন ছাড়া এত রাতে ওঁর ফোন করার কথা নয় ভেবেই ফোনটি কানে তুলে নিলাম। ও প্রান্ত থেকে জানতে চাইল, "তোর কাছে এমন কোনো তথ্য আছে, যা থেকে প্রমাণ হবে কবে আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়, আর এর সাথে মতিউর রহমান নিজামীর সংশ্লিষ্টতা"? জবাবে বললাম, এ মুহুর্তে আমার হাতে সে রকম কিছু না থাকলেও জোগাড় করে দেওয়া যাবে। ব্যস্ত হয়েই অগ্রজ জানতে চাইল, "কোথায় পাবি"? জানালাম, ডালাসের জালাল ভাইয়ের কাছে নিশ্চয়ই কিছু আছে। ওখান থেকে জোগাড় করা যাবে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত বিশ্বকোষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস-প্রবাসী মোহাম্মদ মাহ্বুবুর রহমান জালাল খাঁটি দেশপ্রেমের তাগিদেই নিজের অর্থ ও সময় ব্যয় করে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক তথ্য ও দলিলের এক অভুতপূর্ব সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে। যে সংগ্রহশালা গড়ে তোলার কথা ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়, সেটি বাংলাদেশে হয়নি। পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে স্বদেশের ইতিহাস বিকৃতির যে ধারা শুরু হয়, তারই পথ ধরে বিভিন্ন পাঠাগার ও প্রচারমাধ্যমে সংরক্ষিত আমাদের গৌরবগাথা মুক্তিযুদ্ধের তথ্য ও দলিলগুলো নষ্ট করা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সহজে শনাক্ত করা না যায়−গণহত্যার দোসর রাজাকার, আল-বদরদের আর চিহ্নিত করা না যায়, সেটাই ছিল লক্ষ্য। ফলে স্বদেশে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত দলিল ও প্রামাণ্য তথ্যগুলো আজ খুঁজে পাওয়া ভার! এসব তথ্যের জন্য আজ দেশের বাইরে খোঁজখবর করতে হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস-প্রবাসী এম এম আর জালাল প্রায় বিস্মৃতির অতলে ডুবে যাওয়া ইতিহাসের একেকটি অধ্যায় সিন্ধু সেচে মুক্তা আহরণের মতোই পরম যত্নে সংগ্রহ করছেন। করছেন প্রবাস-জীবনের চরম ব্যস্ততার মধ্যেও। আমার মতো শুধু প্রবাসীরাই নয়; বরং বাংলাদেশের বহু বরেণ্য ব্যক্তি, গবেষক ও প্রচারমাধ্যমের সংশ্লিষ্টরা প্রায়শই মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তথ্যের জন্য জনাব জালালের শরণাপন্ন হন। মাঝরাতে এম এম আর জালাল ঢাকার কোনো সাংবাদিকের ফোন পান, যাতে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কোনো বিশেষ তথ্য ও দলিলপ্রাপ্তির অনুরোধ থাকে। সাত্ তাড়াতাড়ি নিজের সময় ও অর্থ ব্যয় করে পরম আনন্দে বসে পড়েন সেসব তথ্য-দলিল পিডিএফ ফাইলে পরিবর্তিত করে ই-মেইলে সেই সাংবাদিকের কাছে পাঠানোর জন্য। প্রচারবিমুখ জনাব জালাল এই আত্মপ্রচারণার যুগে কখনোই এ তথ্য সরবরাহের বিনিময়ে নিজের নামজারি তথা খ্যাতি অর্জনের কোনো চিন্তাই করতে পারেন না। তাঁর তথ্যভান্ডার নিয়ে অন্যে নাম কামাচ্ছে, এমনকি বিনিময়ে সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকুও প্রকাশ করছে না। আর এটা যে অন্যায়, এ জাতীয় অনুযোগ নিকটজনদের কাছ থেকে বহুবার শুনলেও হূষ্টচিত্তে নির্বিকার জনাব জালাল "চাহিবামাত্রই পাওয়া যাইবে" নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস "কোনো স্বত্বাধিকার নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জাতীয় গৌরব ও সম্পদ"।

নিজ ব্যয়ে ও উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রামাণ্য তথ্যগুলো ইলেকট্রনিক সংস্করণে রূপান্তরিত করেছেন জনাব জালাল একে সহজলভ্য করার নিমিত্তে। নিউইয়র্ক-ভিত্তিক বাংলা অনলাইন পত্রিকা এনওয়াই বাংলা নিউজ-এ প্রতি সপ্তাহে বিষয়ভিত্তিক ও সময়ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দলিল ও তথ্য উপস্থাপনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্নকে অন্ধকার থেকে আলোর পথের যাত্রী হিসেবে গড়ে তুলছেন। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামসংক্রান্ত সমুদয় সংবাদ জনাব জালালের সংগ্রহে আছে, যা থেকে বেরিয়ে আসবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন ও এর গতিপ্রকৃতি এবং কখন কোথায় কে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন সেসব তথ্য। এ ছাড়া একাত্তরে মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে যে শুনানি (হেয়ারিং) হয়, তার বিশদ বর্ণনা সংরক্ষিত আছে। মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত পাঁচ শতাধিক বই আছে, যেগুলো ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় রচিত, যা জনাব জালালের সংগ্রহশালায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এসব সংগ্রহে বন্ধুবান্ধব ও বিশেষভাবে শ্বশুরকুলের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন সে কথা হূষ্টচিত্তেই স্নরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত ইতিহাস অবিকৃতভাবে তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য। তবে জনাব জালাল আরও বিশ্বাস করেন, এসবের মধ্য দিয়ে শুধু বীরত্বের কথা নয়; বরং যেটি বিশেষ করে জানার দরকার সেটি হলো, কারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, একাত্তরে কাদের প্রচ্ছন্ন মদদে শান্তি কমিটি, আলবদর, রাজাকার আল শামস বাহিনীগুলো গঠিত হয় এবং মানবতার বিরুদ্ধে কী জঘন্য অপরাধ করে এবং হানাদারদের দোসর জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের নেতারা সেদিন দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কী ভুমিকা নিয়েছিল, সেসব তথ্য আজকের আলো-আঁধারিতে ঘেরা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের বিশেষভাবে জানা দরকার। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্য কে শত্রু আর কে মিত্র, সে সম্পর্কে পরিষ্ককার ধারণা থাকাটা একান্ত জরুরি বলেই জনাব জালাল বিশ্বাস করেন। আর সেই তাগিদেই জাতীয় এই গুরুদায়িত্ব নিজের ক্ষুদ্র কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

তিনি চান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সবার নাগালের মধ্যে এনে দিতে। এসবের ডিজিটাল কপি ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। আর সেই লক্ষ্যে "সেন্টার ফর বাংলাদেশ জেনোসাইড রিসার্চ" নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাসংক্রান্ত যেকোনো বই, সিনেমা, ছবি, গান, পোস্টার, দেশি-বিদেশি দলিল, সংবাদপত্রের কাটিং তার সংগ্রহে চা-ই চাই। কিন্তু বিনা পয়সায়, বিনা শ্রমে তো এগুলো হয় না। প্রবাসের ব্যস্ত ও সীমাবদ্ধতার জীবনে তাই পরিবার ও ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের সঞ্চয় ভাঙিয়েই এ কাজ তাঁকে করতে হয়। তবুও এতে তাঁর ক্লান্তি নেই, আছে সীমাহীন গর্ব।

প্রবাসের কথোপকথন - ১৮

– বোর্ডিং পাস আর আইডি দেখাও।
: লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটা পঙ্গু, অথর্ব মানুষ আমি। এত জায়গায় আইডি দেখালাম, এখন প্লেনের দুয়ারে এসেও ঝামেলা করতে হবে, তাই না? কত যে ঘাঁটাতে পারো তোমরা!

– এই ছোকরা, ফেলে চলে যাবো কিন্তু তাহলে। আমি মানুষ খুব খারাপ।
: আচ্ছা দেখো, দেখো। হুঁ, আমি জানি সিট কোথায়। বেছে বেছে সামনের দিকের আইল সিট নিয়েছি। এখন এই নরাধমকে দেখতে দেখতে যেতে হবে তোমার।

– দেখা যাবে কী হয়। এ কী, লাঠি হাতে রেখেছো কেনো? ওটা কোথাও সরিয়ে রাখতে হবে। কষ্ট করে উপরে তুলবার দরকার নেই। আমি আমার কোট ক্লজেটে রাখছি। প্লেন থামলে এনে দেবো।
: তথাস্তু। এই নাও। তোমাদের প্লেনে তো সামনের দিকেও অনেক আওয়াজ দেখছি।

– ব্যাপার না। এই ব্রাউনিটা একটু চেখে দেখো তো। আজকের বিশেষ খাবার এটা। বয়ফ্রেন্ডের জন্য কিছু নিয়ে যাবো কিনা ভাবছি।
: ভুল মানুষকে দিলে। আমি চিনি বেশি খাই। এক কাপ চায়ে চার-পাঁচ চামচ পর্যন্ত নিয়ে ফেলি। অন্য কাউকে দাও।

– কেউ তো নিচ্ছে না দেখি। তা তুমি এমন বেজার মুখ করে বসে আছো কেনো? ঝামেলা হয়েছে কোনো?
: নাহ, তেমন কিছু না। ট্রাভেল কিট-এ আমার সবকিছু থাকে, তবুও কী সব নিয়মের জন্য একটা একটা করে বের করে জিপলক ব্যাগে ঢুকাতে হল। এবারে দেখলাম নেল-কাটার, সেফটি-রেজার, ইত্যাদি নিতে দিচ্ছে। আমার একটা ৭ আউন্সের কৌটায় কয়েক ফোঁটা আফটার-শেভ ছিলো, সেটা নিতে দিলো না। বলে, কৌটার ভেতরে যতটুকুই থাকুক, কৌটার আকার ৩ আউন্সের বেশি হতে পারবে না। যন্ত্রণার শেষ নেই।

– মন খারাপ কোর না। কী ড্রিংক নেবে তুমি? বাড়তি একটা কোক রেখো তাহলে। তোমার দুস্থ অবস্থার সম্মানে।
: চিয়ার্স টু অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন!

– কেনো, এমনিতে কি বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া যায় না? যাক, কাজে নামি আমি এবার।
: তা তো অবশ্যই। তোমার গৎবাঁধা কথাগুলো বলে নাও। আমি পালাচ্ছি না।

– উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি মেমফিস থেকে গ্রিন্সবোরো পর্যন্ত এই ফ্লাইটে। আমাদের আনুমানিক যাত্রাকাল সাড়ে ছয় ঘন্টা…
: সে কী? টিকেট তো বলছে দেড় ঘন্টা!

– গত ফ্লাইটের কথা ভুলে গেছো? মিসিসিপি’র উপর ঝড়-বাদলা হওয়ায় গত ফ্লাইটে আমাদের আকাশে চক্কর দিতে হয়েছে আড়াই ঘন্টা। এক ঘন্টার ফ্লাইটের জন্য আড়াই ঘন্টা বাড়তি দেরি হওয়ায় তোমরা সবাই বিরক্ত, তাই এবারে আমি একটু বেশি করে বলে দিলাম আর কি।
: গড ফরবিড। মনে হয় না এমনটা হবে এবার। এদিকের আকাশ পরিষ্কার দেখলাম রওনা দেওয়ার আগে।

– সিট বেল্ট ও ইমার্জেন্সি বিষয়ক খুঁটিনাটিগুলো মেনে চলার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমার পক্ষে যদি আপনাদের এই যাত্রা কোনভাবে আনন্দদায়ক করা সম্ভব হয়, তবে নিঃসংকোচে জানাবেন। আপনাদের মনোরঞ্জনের জন্য আমি যেকোন কিছু করতে প্রস্তুত। এনিথিং টু মেইক ইয়োর ফ্লাইট এনজয়েবল অ্যান্ড কমফোর্টেবল… উইদিন রিজন। আই ডোন্ট ডু ফুট মাসাজ; নট এনিমোর। সো, ডোন্ট অ্যাস্ক। একটু পর তোমাদের আমি কিছু খাবার দেবো। তারপর সময় করতে পারলে গল্প শোনাবো, আর সবশেষে থাকবে গান।
: বিমানবালা বেশ রসিক দেখছি। আপনি তো মনে হয় অনেক ঘুরে বেড়ান। সব সময়ই কি এমন?

– সব সময় না। তবে এই জন তো অনেক বেশিই খোশ মেজাজে আছে মনে হয়। বাকি পথ আরামে কাটলেই হয়। তুমি ছাত্র?
: জ্বী, আমি ভার্জিনিয়া টেকে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। তড়িৎকৌশলের ছাত্র। আপনিও কি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট?

– নো, বাট আই হ্যাভ আ বিয়ার্ড! আমি কর্নেল থেকে পাশ করেছিলাম। আমিও একই বিষয় নিয়ে পড়েছি। প্রায় বিশ বছর আগের কথা। আমার এখন নিজের ব্যবসা আছে একটা। বিছানা বানাই। ঐ যে, পার্টনার ফোন করেছে।
: কর্নেলে আমার খুব কাছের এক বন্ধু পড়ে, প্রশংসা শুনেছি খুব। কান তো বন্ধ রাখা যায় না, তাই তোমার ফোনের কথাবার্তা কিছুটা শুনে ফেলেছি বলে দুঃখিত। তোমার ব্যবসা ভালই চলছে মনে হলো। এই মন্দার মধ্যেও তো বেশ লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছো।

– আমি অসুস্থ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য বিছানা, হুইল-চেয়ার, ইত্যাদি বানাই। ব্যবসার ধরনটাই এমন যে এটার উপর মন্দা তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। আমরা মূলত ডিজাইনের কাজটুকু করি। প্রতি ইউনিটে বেশ ভালই লাভ থাকে।
: ভালই তাহলে। এবারেও কি বিজনেস ট্রিপ ছিলো?

– উহু, এটা ছিল এমনি বেড়াতে যাওয়া। এক সপ্তাহ ফ্লোরিডায় ছুটি কাটিয়ে এলাম।
: বেশ ভালোই তাহলে। প্লেন মনে হচ্ছে একটু পরেই ছাড়বে। আমাদের আগে যা লম্বা লাইন দেখতে পাচ্ছি! দেড় ঘন্টার ফ্লাইট হওয়ার কথা। এখন দেখি ছাড়তে ছাড়তেই দেড় ঘন্টার উপর হয়ে গেল ভিড়ের কারণে। বিমানবালা আসছে আবার, কিছু বলবে মনে হয়।

– জরুরি কোনো কাজে ব্যস্ত না থাকলে একটা প্রশ্ন করতাম আপনাকে।
: না, ব্যস্ত নই। বলে ফেলো। আমার লাঠি ফেরত দেবেন?

– না, তোমাকে না। তোমার পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করছিলাম।
: বলুন কী প্রয়োজন। কোনো সমস্যা হয়নি তো?

– আপনি কি আপনার স্ত্রী সহ এসেছেন?
: জ্বী, আমার স্ত্রীও এই প্লেনেই আছেন।

– আপনি চাইলে তাঁর সাথে বসতে পারেন। আমি সিট বদলে দিতে পারি আপনাদের সুবিধার্থে।
: সে-কষ্ট করতে হবে না। আমি বেশ আছি। ধন্যবাদ।

– ঠিক আছে তাহলে। আপনার স্ত্রী বলছিলেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। আমি অন্য দিকে যাই তবে। প্রয়োজন পড়লে জানাবেন…
: আপনার স্ত্রী ডাকলেন, তবু গেলেন না?

– আমার স্ত্রী আছে, তবে আমার ছেলে সহ। যে-ভদ্রমহিলার কথা বিমানবালা বলছিলো, তিনি আমার স্ত্রী নন। বিমানবালা ভুল করে আমাকে ডাকছিলো। ভদ্রমহিলা সুন্দরী বেশ। পাশে বসতে পারলে মন্দ হতো না, কী বলো?
: তাহলে তো মিস করে ফেললে। চলে যেতে। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলতে, বিমানবালার ভুল।

– স্ত্রীর সামনে এই কাজ করা যায় নাকি? বাসায় গেলে তো আমাকে নাইনটি ডে’স, নো ইন্টারেস্ট প্রোগ্রামে ফেলে দেবে। ক’দিন পরেই ২৫ বছর পূর্তি।
: হাহ হাহ, মনে হয় না এই বয়সে এসে এমন ব্যাপারে সুযোগ নেবে তুমি।

– তা আর বলতে। যাক, ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা বলে। আমার কার্ড রাখো, কখনও দেখা হবে আবার।
: না হলেই ভালো। তোমার কাজের যা ধরন, তাতে দেখা না হওয়াই সুলক্ষণ।

– আই’ল কাট ইউ আ ডিল, তবে আশা করি আসলেই দেখা হবে না আর।
: আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমাকে তো চিনবে না, তবু পারলে ওদিকটায় বেড়াতে যেয়ো, ভালো লাগবে। বিমানবালা এবারে কী বলে শুনে দেখি।

– আমাদের সাথে এই ফ্লাইটে থাকবার জন্য অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আমার আতিথেয়তা যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তবে মন খুলে উপহার দিতে পারেন। আই ওনলি এক্সেপ্ট ডায়মন্ড নেকলেস, গোল্ড ব্রেইসলেট, অ্যান্ড রুবি রিংস। তোমাদের গল্প বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম তার আগেই অনেকে ঘুমিয়ে গেছো। তাই সে-চেষ্টা আর করলাম না। আই ডিড সিং ফর ইউ, দো। আই স্যাং সোলো। পারহ্যাপ্স সো লো দ্যাট ইউ ডিড নট হিয়ার মি। শুভ হোক তোমাদের বাকি দিন।

প্রবাসের কথোপকথন - ১৭

– হে, ইশ! আর কতক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরার পর আমাকে চিনবে?
: খুবই দুঃখিত, ডন। একটু বেখেয়াল ছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ঠিক সাড়ে এগারোটায়ই আসবে। সেজন্য বাইরের দিকেই নজর ছিল। খেয়াল করি নি যে এসে বসে আছো।

– কোন ব্যাপার না। আমি মজা দেখছিলাম। আই ওয়াজ গোয়িং টু লেট ইউ ওয়ান্ডার অ্যাবাউট সাম মোর।
: দু’বছর পর আবার এলাম তো, এতদিনের চেনা লুই’স ক্যাফেও কেমন যেন অচেনা ঠেকছিল। শহরটা কত বদলে গেছে। এই সামনেই তো বিশাল একটা শপিং এরিয়া ছিল, এখন দেখি সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

– হ্যাঁ, গত দু’বছরে অনেক দালান-কোঠা হয়েছে। শহরটা খাপছাড়া রকম আধুনিক হয়ে গেল চোখের পলকে। কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। ক্যাটরিনার পর নিউ অর্লিয়েন্স তার সব জৌলুস হারালো, আর এদিকে ব্যাটন রুজে শুরু হল ঠিকাদারির ধুম।
: এটাই জগতের নিয়ম। তবে এবার দেখলাম গুস্তাভ অনেক গাছ-পালা ফেলে দিয়ে গেছে। আগে কত সবুজ ছিল ব্যাটন রুজ। কচু নামে একটা খাবার আছে আমাদের দেশে। লুইজিয়ানা বেড়াতে এলেই লোকে কচু তুলে নিয়ে যেতো। প্লেন থেকে তাকালে সবুজ সমুদ্র মনে হতো। এখন গাছ কমে গেছে অনেক। কিছু গেছে প্রকৃতির ঘূর্ণিঝড়ে, কিছু গেছে কংক্রিট মিক্সারের ঘূর্ণিতে।

– এটাই স্বাভাবিক। কোথাও কমতি হলে কোথাও বাড়তি হবেই। তুমি তো কিছুটা বদলেছো। শুকিয়ে গেছো আগের চেয়ে, লুকস-ও একটু ভিন্ন।
: ভেতরের পরিবর্তনের তুলনায় বাইরেরটুকু কিছুই না। এই দু’বছরে অনেক কিছু শিখলাম। অনেক নাইভ ছিলাম আগে। বিশ্বাস করে ঠকতে ঠকতে টনক নড়েছে।

– চিয়ার আপ। এটা কোন ব্যাপার না। ইউ আর নট ইভেন টুয়েন্টি ফাইভ।
: আই অ্যাম, অ্যাকচুয়ালি।

– সো ইউ জাস্ট টার্ন্ড টুয়েন্টি ফাইভ…
: মেক দ্যাট টুয়েন্টি সিক্স অ্যান্ড আ হাফ। এনিওয়ে, ইউ ওয়্যার সেইং…

– আমার এই শিক্ষাটা হয়েছিল ৪৭ বছর বয়সে। আমার অধীনস্থ লোকজন মিলে ভোট দিয়ে আমাকে বাদ দিয়ে দিলো। আমি তখন এলএসইউ-তে কাজ করি। কী এক কারণে টাকা কিছুটা কমে গেছে ডিপার্টমেন্টে। ওরা সবাই মিলে ঠিক করলো যে আমাকে বাদ দিয়ে আমার বেতনের টাকাটা সবাই মিলে ভাগ করে নেবে।
: এটা তো এমন ঘটনার জন্য খুবই বাজে সময়। ওই বয়সে মানুষ সংসার গুছিয়ে বসে, জীবনের শেষ অংশটার জন্য প্রস্তুতি নেয়।

– আমার দুই মেয়ের তখন ভার্সিটি শুরু করার সময়। আচমকা এক সকালে শুনি আমার চাকরি নেই। আমি আর আমার স্ত্রী তখন একেবারেই হতভম্ব। গতকাল বিকেলে যারা আমার সাথে এক সাথে বাজার করলো, লাঞ্চ খেলো, আমার মেয়েদের সাথে আহ্লাদ করলো, তারা আমাকে সকালে বলে যে আমার চাকরি নেই। উই আর স্যরি, ডন, বাট দেয়ার ইজ সামথিং উই গটা ডু।
: দুঃখজনক, খুবই দুঃখজনক। কী বলবো বুঝতে পারছি না।

– দুঃখের কিছু নেই। কিছু লোক খুব অমানবিক আচরণ করেছিল আমার সাথে। যা করেছে, শুধু তা নিয়েই রাগ ছিলো না। ওরা আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছিলো না পর্যন্ত। আই ওয়াজ অ্যাংরি, আই ওয়াজ ভেরি অ্যাংরি।
: তোমার রাগ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আড়াই বছর তোমার অধীনে কাজ করেছি, খুব একটা কম সময় তো না।

– আরে নাহ, তোমার সাথে তো আমি রাগ করিনি কোনদিন। অন্যদের উপর করেছি অবশ্য। তবে ঐ লোককে আমি একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারতাম। দেয়ার উড বি টু ব্লোজ। ওয়ান ইজ মে হিটিং হিম, দি আদার ইজ হিম হিটিং দ্য ফ্লোর।
: এই বয়সেও তোমার যা শরীর, তুমি অনায়াসেই পারতে, সে-নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

– আমি এখনও নিয়ম করে জিম-এ যাই। তাছাড়া জীবনভর পরিশ্রম তো আছেই। আমার শুরুটা কিন্তু খুব অনাড়ম্বর। ওকলাহোমার একটা পাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। বাবার সাথে কাজে হাত লাগাতে হতো। ছেলেবেলায় গরু চরিয়েছি, কাঠ কেটেছি। সেখান থেকে লেখাপড়া করে উঠে এসেছি এতদূর।
: আমার মত ফার্স্ট জেনারেশন ইমিগ্র্যান্টদের জন্য এই কাহিনীগুলো খুব প্রেরণাদায়ক। সবাই মনে করে এখানে ডলার গাছে ধরে, নয়তো যুদ্ধ করে এত উন্নতি হয়েছে। একটা দেশ গড়তে যে তোমার মত কত শত মানুষ প্রয়োজন, সেটা কেউ বোঝে না।

– সেই লোকগুলো এখন আর লুইজিয়ানায় নেই। একজন ওকলাহোমায়ই আছে বলে জানি। আমি তখন বলেছিলাম যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় খুব ভাল কিছু বন্ধু আছে। আমাকে বাদ দেবে দাও, আমি শুধু কিছু ফোন কল করবো এরপর। করেছিলামও। এই অন্যায়ের জন্য আমি এল-এস-ইউ’কে স্যু করতে পারতাম। আই কুড ওউন দ্য ম্যাসকট, কিন্তু আমারই এক কাছের বন্ধুকে পাঠালো আমার কাছে। অনুরোধ করলো যেন আমি আইনী পথে না যাই, ওরা ব্যাপারটা নিজের মত মীমাংসা করবে।
: তাহলে তো বেশ ভাল ভাবেই উৎরে গেলে শেষ পর্যন্ত। ঝামেলা আরও অনেক দূর গড়াতে পারতো।

– তা তো পারতো অবশ্যই। তুমি বলেছিলে যে তুমি অ্যাকাডেমিয়ায় থাকার চিন্তা করছিলে, তাই বললাম। দু’টা কথা মনে রাখবে সব সময়। প্রথমত, এমন কিছু পড়বে যাতে সত্যিই আগ্রহ পাও। আদারওয়াইজ ইউ ও’ন্ট হ্যাভ আ রিজন টু ওয়েইক আপ এভরি মর্নিং। দ্বিতীয়ত, অ্যাকাডেমিয়ায় কাউকে বিশ্বাস করবে না। আমরা আগে অনেক দান-খয়রাত করতাম। অথচ ১০ বছর পরও দেখি, পিপল ইউ আর হ্যাভিং কফি উইথ ও ইউ মানি! মানুষ খুবই বিচিত্র।
: দুটোই আমি খুব মূল্য দিয়ে শিখেছি। এই যে রিসেশন, চাকরির বাজারে খরা, এরপরও টিকে আছি নিজের আগ্রহের কিছু নিয়ে পড়েছি বলে। হয়তো এই লাইনে টাকা-পয়সা পাইনি, তবুও মনে শান্তি আছে। দেখি, পিএইচডি’টা ঠিক মত সারতে পারি কিনা। আর অ্যাকাডেমিয়া কেন, কোন কিছুতেই কাউকে আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করি না। আগে আগ বাড়িয়ে প্রতিটা মানুষের উপর কিছু বিশ্বাসের বিনিয়োগ করতাম, দেখতাম সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কীভাবে দেয়। কেউ মর্যাদা না দিলে তাকে আর কাছের মানুষ মনে করতাম না। এখন কেউ বিশ্বাস অর্জন করে নিতে পারলে নিক, আমি সেধে বিশ্বাস করে ঠকতে নারাজ। কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা খুব খারাপ।

– এত হতাশাবাদী হয়ে গেলে কবে তুমি? নাহয় কিছুটা সময় নিজের ইচ্ছে মত যায়নি, তাই বলে এভাবে দেখতে হবে কেন?
: এই যে গত দু’বছর কেমন এলেবেলে কাটলো। গ্র্যাজুয়েট স্কুলে গিয়ে যেন এতিমখানায় পড়লাম। অ্যাডভাইজার জুটলো যা-গরু-চড়ে-খা জাতীয়।

– এটা কোন ব্যাপার না। ইট ওয়াজ দেয়ার লস, নট ইওরস। সময় হলে দেখিয়ে দিও। শিক্ষা ব্যাপারটা এখন ব্যবসা হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। তুমি যেমন গুরু-শিষ্য সম্পর্ক আশা করছিলে, সে-ধরনের অ্যাপ্রেন্টিসশিপ আর নেই। শুধুমাত্র টিয়ার-থ্রি’র কিছু স্কুলে গেলে এমনটা পাবে। সেখানে কামড়া-কামড়ি করে ফান্ড আনার চেয়ে নিজের ভাইকে শেখানোটা জরুরি বেশি। তবে সেটা নিয়ে তো এত বিরক্ত হলে চলবে না। নিজের কাজ করে যেতে হবে।
: নট দ্যাট আই অ্যাম প্রাউড অফ ইট, কিন্তু এই সিনিজম’টা এখন অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।

– হোল্ড অন আ মিনিট। টাইম-আউট। মাসে কয় বেলা খাও তুমি?
: দিনে তিন বেলা করে ত্রিশ দিনে ৯০ বেলা বলতে পারো।

– টুকটাক স্ন্যাক খাও না?
: অবশ্যই, তা তো থাকেই কিছু না কিছু।

– তবুও কি তুমি কখনও না কখনও দিস ইজ দ্য ওয়ার্স্ট মিল অফ মাই লাইফ বলো নি?
: সে তো হরদমই বলি।

– ওয়ান মিল আউট অফ অ্যাবাউট আ হান্ড্রেড ইজ ব্যাড, অ্যান্ড ইউ আর স্টিল কমপ্লেইনিং! এটা কি ঠিক হল? শ’এ একটা তো ভালো-মন্দ হতেই পারে। তুমি ৯০ বছর বাঁচবে জীবনে। নাহয় সেই লম্বা জীবনের দু’টা বছর একটু খারাপই গেল। এটা তো জীবনেরই অংশ। এটাকে এভাবে দেখার কিছু নেই। বাকি ৮৮ বছরের মধ্যে থেকে সেরাটা বের করে আনো।
: ইউ শিওর নো হাউ টু লিফট আ ম্যান’স স্পিরিট, ডন। কথাটা মনে থাকবে। এভাবে ভাবিনি কখনও। তোমার নাতি-নাতনিরা কেমন আছে? অনেক বড় হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। মাত্রই দু’বছর পর এলাম, তবু কোনো পিচ্চিকে চিনতে পারি না আর। সবাই এক মাথা পরিমাণ বড় হয়ে গেছে।

– আমার নাতনি ইসাবেলা’র কথা তোমার সবচেয়ে বেশি মনে থাকার কথা। ওর বয়স এখন পাঁচ বছর। প্রি-ম্যাচিউর ছিল, তাই কোমড়ের হাড় বাড়েনি, জানোই তো। ডাক্তাররা ওর উপর অনেক গুলো অপারেশন করবে সামনে। হাড়গুলো জায়গা মত বসাবে।
: এতটুকু বয়সে কী কষ্ট। ভাবলেই গা শিউরে উঠে।

– ওর কিন্তু তেমন বিকার নেই। ও টাবের উপর আরাম করে বসে থাকে। দুই হাত মাথার পেছনে দিয়ে শুয়ে শুয়ে পা দুলায়। দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওর এত বড় সমস্যা আছে শরীরে। ওর বাবা খুবই ধারালো বুদ্ধি রাখে। ডাক্তারদের জেরা করে করে বের করেছে কী করতে যায়। একটা পর্যায়ে দেখে যে ডাক্তারের নিজেরই স্পষ্ট ধারণা নেই কী করবে, জটিলতা হলে কীভাবে সামলাবে, ইত্যাদি নিয়ে। হি ইজ ওয়েইটিং ফর অ্যানাদার ওপিনিয়ন নাউ।
: বোঝো কীভাবে এটা? এই যে, লোকজন কিছু না জেনেও মুখে মুখে হাতি-ঘোড়া মেরে ফেলে, এদের ধরো কীভাবে তুমি?

– যা বলছে, সেটার চেয়ে যা বলেনি সেটার উপর মনোযোগ দেবে বেশি। তোমার সাথে যখন কথা বলতে আসবে, তখন দে আর দ্য ওয়ানস ইন কন্ট্রোল অফ দ্য কনভার্সেশন। এই ব্যাপারটা থেকে বের হয়ে আসবে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবে কী বলছে, এরপর কিছু একটা উছিলা দিয়ে সরে যাবে। এক বেলা সময় নেবে। ভেবে দেখবে কী কী বলেনি তোমাকে। পরের বেলায় যখন কথা হবে, তখন ইউ উইল বি দ্য ওয়ান ইন কন্ট্রোল অফ দ্য কনভার্সেশন।
: রিডিং বিটউইন দ্য লাইনস। শিখতে পারলাম না জীবনে।

– অবশ্যই শিখবে। সময়ের সাথেই হবে। বয়স তো কম হলো না আমার। এখন এরকম কোন ফাঁক-ফোকর পেলেই আমি তার জন্য ফাঁদ পেতে বসে থাকি। একটা ‘উম’ দিয়ে বাক্য শুরু করলেই চেপে ধরি।
: এটা কেমন কথা আবার?

– ইফ ইউ স্টার্ট আ সেন্টেন্স উইথ ‘উম’, দেন ইদার ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ইউ আর টকিং অ্যাবাউট, অর ইউ আর জাস্ট লাইং।
: এটা খেয়াল রাখতে হবে। আমার তো বাক্যের শুরুতে উম-আম করার স্বভাব অনেক পুরনো।

– বিলটা এদিকে দিও। মাই সান ইজ স্টিল আ স্টুডেন্ট, হি কান্ট পে।
: আমি জীবনের একেবারে শেষে গিয়ে একটা বই লিখবো, বলেছিলাম তোমাকে? সেখানে আমার দেখা কিছু অসামান্য মানুষের কথা লেখা থাকবে। তোমার জন্য একটা চ্যাপ্টার থাকবে সেখানে।

– এভাবে ভাবার কোন দরকার নেই। আমি ১১৬ বছর বাঁচবো। তোমাকে যেন ঠিকঠাক দেখি ততদিন। আমি এখন লেখালেখি করছি কোস্টাল এরিয়াগুলো নিয়ে। আজ থেকে ৬০ বছর আগে এই সমুদ্রতীর কেমন ছিল তা নিয়ে সাক্ষাৎকার নিচ্ছি সবার। তাঁদের জীবদ্দশায় কী পরিবর্তনগুলো এসেছে, তা নথিবদ্ধ করছি। পাশাপাশি সবাইকে একটা বাড়তি প্রশ্ন করছি। হোয়াট ডিড ইওর গ্র্যান্ড ফাদার টেল ইউ হোয়েন ইউ ওয়্যার ইয়াং।
: অপেক্ষায় থাকলাম বই বের হওয়ার। ছবি তুলে রাখি তোমার সাথে একটা। স্মৃতিগুলো আকার পাবে।

– অবশ্যই। ঐ মেয়েটাকে বলি ছবি তুলে দিতে। ক্যান ইউ টেক আ পিকচার অফ আস, প্লিজ। ইউ গেট এক্সট্রা পয়েন্টস ফর ফিগারিং আউট হু ইজ দ্য ওল্ডেস্ট!

Wednesday, April 22, 2009

গানবন্দী জীবনঃ আমি বাংলায় গান গাই

৯. আমি বাংলায় গান গাই

হারানোর আগ পর্যন্ত নাকি মানুষ তার সবচেয়ে বড় সম্পদকে চেনে না। দেশপ্রেম তেমনই ব্যাপার। দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত খুব কম মানুষই নিজের দেশ, আলো-হাওয়া, মাটি, আর মানুষকে প্রাপ্য সম্মান ও ভালবাসা দিতে পারে। ইংরেজিতে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ যাকে বলে, তেমনই এক অনুভূতি কাজ করে সবার মাঝে দেশ নিয়ে। বাইরে এলে সবকিছু মেলে, শুধু আপনজনকে অবহেলা করার এই সুযোগটুকু বাদে। সারা পৃথিবীর সাথে ভদ্রতার প্রতিমূর্তি হলেও আমরা যেমন মায়ের কাছে দুর্বিনিত, আমাদের কাছে দেশও তেমনটাই অবহেলিত।

দেশ মানে স্রেফ একটি ভূখণ্ড না, দেশের অর্থ অনেক বড়। বাঙালিরা মুষ্টিমেয় সেই জাতিগুলোর একটি, যাদের স্বাধিকার আন্দোলন উৎসারিত হয়েছিল নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরবার মানস থেকে। বাঙালি সংস্কৃতি তাই আমাদের কাছে শুধু ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, পরিচয়ের উৎসও। ঠিক-ভুল যেমনটাই হোক না কেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে ধর্মের ভিত্তিতে দেশবিভাগের আন্দোলনও ছিল পরিচয়ের সাথে জড়িত। ফলশ্রুতিতে এই দুই পরিচয়ই কম-বেশি রয়ে গেছে আমাদের মাঝে।

দেশে থাকার সময়টুকুতে আমরা নিজের মন ও মতের মানুষের সাথে মিশে থাকি। নেতৃস্থানীয় কোন অবস্থায় আমরা থাকি না। হাওয়া যেদিকে বয়, সেদিকেই পাল তুলি। কোন বেলায় আশরাফুলের অল্প রানে আউট হওয়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন সংসদে হাসিনা-খালেদার ঝগড়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন হয়তো নতুন কোন নাটকে দেখানো কিম্ভূতকিমাকার ফ্যাশন নিয়ে। বাইরে এলে মূলধারার এই নির্বোধ স্বাভাবিকতা থাকে না। না চাইলেও নেতা গোছের কিছু হয়ে যেতে হয়।

প্রবাসে এলে আমাদের কাজকর্ম দিয়েই যার যার সংস্কৃতির স্বরূপ নিরূপিত হয়। বিশাল পৃথিবীতে আমরা প্রতিটি প্রবাসী যেন ডেকচি থেকে বের করে টিপেটুপে দেখা ভাত। অন্যের ভুলের জন্যও আধাসেদ্ধ থাকার সুযোগ নেই, কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই দোষ পড়বে বাঙালির, ভারতবর্ষের, কিংবা মুসলমানদের। নেতাকে যেমন নিজের আচরণ দিয়ে সবাইকে পথ দেখাতে হয়, তেমনি প্রতিটি প্রবাসীকেও দেশ-ভাষা-ধর্মের স্বার্থে সমঝে চলতে হয়।

এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা হয়েছিল দু’বার। প্রথমবার মাত্র আমেরিকা আসার পরপর, লুইজিয়ানায়। দুপুরে ক্লাস সেরে ঘরে বসে আছি। হঠাৎ ধপধপে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, আর হাতে বাইসাইকেল। নাম বলার পর জানতে চাইলো কোন ভাষার শব্দ। বাংলা বলতেই ধরিয়ে দিল প্রভু যীশুর বাণি – বাংলায়। আমার জন্য, আমার ভাষার জন্য আলাদা করে লেখা আসে সবকিছু। বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হতেই আমি স্বচ্ছন্দ বেশি, তাই এই শ্লাঘা অস্বাভাবিক ছিল না। তুলনায় দ্বিতীয় ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ বেশি।

রমজান এলেই বাঙালি সমাজ মসজিদ-ভিত্তিক হয়ে যায়। নেকির প্রশ্নে নির্মোহ হয়ে রোজা না রেখে থাকা যায়, কিন্তু বিনামূল্যে ইফতারের ব্যাপারে প্রশ্নে আপোষ নেই। বিকেল হলেই তাই ভিড় করি মসজিদে। মুসলমান ব্রাদারহুডের জয়জয়াকার চারিদিকে। সাধারণত স্টুডেন্ট ইউনিয়নে মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে ইফতার দেওয়া হয়। গত রোজায় সামনে পড়লো এমন এক ভ্রাতা। জানালেন, তিনি পাকিস্তানি। কথাপ্রসঙ্গে জানলেন, আমি বাংলাদেশের। চূড়ান্ত ধৃষ্টতা দেখিয়ে সেই লোক মিষ্টি হেসে বলে বললো, তুমিও তো তাহলে পাকিস্তানিই। উদ্দেশ্য, আমাকে ভারতীয়দের থেকে আলাদা করে তার সাচ্চা ব্রাদারের সম্মান দেওয়া। বিরক্ত হয়ে বললাম, যদি আমি পূর্বপরিচয়ের সূত্রেই পরিচিত হব, তবে ব্রিটিশ না হয়ে পাকিস্তানি কেন? তুমি মুড়ি দিয়ে ইফতার খাও, আমি গেলাম।

প্রবাসে এসে আচমকা সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়াটা একটি বিরাট ধাক্কা দেয় অনেককে। এই ধাক্কা সামলানোর জন্য মানুষ পরিচয় খোঁজে, নিজের একটি স্থান খোঁজে। আমিত্বের ধারণাটির পেছনে স্বকীয়তা যতটা, তার চেয়ে বেশি কাজ করে প্রশ্নাতীত অধিকার। পরিচয় খুঁজবার সময় এলে মানুষ তেমনই কিছু খোঁজে। ধর্ম ও সংস্কৃতি উভয়ই তেমন সুবিধা দেয় মানুষকে। আমি বাঙালি ও মুসলমান, আমার এই দু’টি পরিচয় নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না, কোন ধরনের সামাজিক বাস্তবতা আমার এই পরিচয়গুলোকে হেয় কিংবা খাটো করতে পারবে না।

এ-পর্যায়ে প্রশ্ন জাগে, সংস্কৃতি বা ভাষার পরিচয় বাদ দিয়ে মানুষ ধর্মের দিকে ঝোঁকে কেন। উত্তর খুব সহজ। প্রচার-প্রসারের তুলনামূলক সুবিধা। ভাষার ভিত্তিতে যে-পরিচয়, তা প্রদর্শন করতে হলে গান, আবৃত্তি, নাচ, কিংবা অন্য কোন ধরনের সুকুমারবৃত্তির অধিকারী হতে হবে। ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সহজতর। দু’-দশ মাইল পর পর মসজিদ আছে, সেখানে নিয়মিত জড়ো হওয়া মুসল্লি আছে, আছে হালাল দোকান ও দোয়ার আসর। পরিচয়ের আভিজাত্যও থাকে, পরকালের নিশ্চয়তাও বাড়ে।

প্রবাসের আলো-হাওয়ায় দিনাতিপাত করলেও কম-বেশি প্রত্যেকেই সে-দেশগুলোর সংস্কৃতিকে সমর্থন করেন না। সন্তানদের সবাই গড়ে তুলবার চেষ্টা করেন স্বদেশী রক্ষণশীলতা ও সংযমের সাথে। সে-ক্ষেত্রে সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়া অনেক দুষ্কর, তুলনায় ধর্ম অনেক সহজ। ধর্মের পথ বিস্তারিত ভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়াও এর পেছনে ভূমিকা পালন করে।

এভাবে ভাবার ভেতর ক্ষতির কিছু নেই। সাধারণ ভাবে বাইরে এলে সবাই একটি বেশি নামাযি হয়ে যাওয়াতেও ভ্রুকুটি করবার কিছু নেই। নিঃসহায় অবস্থায় মনকে স্থির ও শান্ত রাখতে ধর্মের উপযোগিতা অনস্বীকার্য। আমি আমার মুসলমান পরিচয় নিয়ে আর দশ জনের মতই গর্বিত। তবুও গোল বেধে যায় বাঙালি আর মুসলমান পরিচয় দু’টির মাঝে। আমার মায়ের মত ধর্মভীরু অনেকে খুব নির্বিষ ভাবেই মুসলমান পরিচয়কে বাঙালি পরিচয়ের আগে রাখেন। এভাবে ভাববার অসারতা আমার চোখে প্রকাশ পেয়েছিল উপরে উল্লেখকৃত দ্বিতীয় ঘটনার সময়। শুধু মুসলমান বলেই আমি কোন পাকিস্তানি বা রাজাকারের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে পারবো না। আমার বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয়গুলো কোথায় যেন পীড়া দেয় আমাকে মনের ভেতর। সেই মর্মবেদনা থেকেই আমি জানতে পারি আমার প্রথম পরিচয় কী।

পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বগুলো সাধারণত মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের মানুষ ও ভূমি থেকে বিচ্যুত হবার পর। এই ধারার বিপরীত একজন মানুষের সাথে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল অনেক বছর আগে। আমার প্রবাসে আসবার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন অনেক শ্রদ্ধার নাভেদ ভাই। বিতর্কসংশ্লিষ্ট সবাই তাঁকে এক নামে চেনেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক হিসেবে। ২০০৩ সালের কথা। নাভেদ ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলছি ভর্তির বিভিন্ন খুঁটিনাটি নিয়ে। এমন সময় ইটিভি’তে শুরু হল মাহমুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে বাংলার গান। নাভেদ ভাই বলে উঠলেন, ইশতি একটু ধরো, গানটা শুনে আসি; এই গান শুরু হলে আমি সব ফেলে রেখে একবার গানটা শুনি।

দেশটা ছেড়ে চলে যাবো কিছুদিন পর, এই বাস্তবতা মাথায় তখনই প্রথমবার আঘাত করে। সেই গানটির কারণেই পুরো একটি প্রজন্ম বাংলায় গান গায়, বাংলার গান গায়, বুঝে-শুনে গায়। শুধু আমি নই, কম-বেশি প্রতিটি মানুষেরই জীবন বন্দী হয়ে আছে এই গানের মধ্যে। প্রতুলের অসামান্য মূল গানটির চাইতে অনেকাংশে ভিন্ন হলেও বাবু’র গানটি যেন দাবানলের মত ঘিরে ফেলেছিল সবাইকে। এই গানটি না থাকলে পরিচয়ের যুদ্ধে বাংলা অনেকটাই পিছিয়ে যেত।

বাংলার গানে তাই শুধু জীবন নয়, আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্বই বন্দী।

প্রতুলের কণ্ঠে বাংলার গানঃ
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


মাহমুদুজ্জামান বাবু'র বাংলার গানঃ


ফুয়াদের ঝালমুড়ির কৌটায় বাংলার গানঃ

Ami Banglay Gaan Gai - Laboni - Fuad Featuring

Tuesday, March 31, 2009

গানবন্দী জীবনঃ রক ইউ লাইক আ হারিকেন

পরীক্ষিত ও প্রমাণিত কিছু মেয়েলিপনা আছে আমার। মুরুব্বিদের দেখে জেনেছি, নারীমন ভাল করে দেওয়ার অব্যর্থ উপায় হল বাজার করা। এই রোগ আমারও আছে। এমনিতে প্রতিটা পয়সার হিসেব টুকে রাখলেও মন খারাপ হলে কেমন যেন হয়ে যায় সব। যেই আমি কেউ কিছু চাইলে খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে জেনে নেই, কিছু কিনবার আগে তার যাবতীয় তত্ত্ব-তালাশ করি, সেই আমিই দুই হাতে খরচ করি, সবার ইচ্ছাপূরণ করে দেই বিনাপ্রশ্নে। এমনই এক দুর্বল মুহূর্তে জীবনের প্রথম সাউন্ড সিস্টেম কিনি। চিরকঞ্জুস আমার এই বিরাট খরচের পেছনের কারণ ছিল বিরাট এক অপমান।

আমেরিকা এসে প্রথম কাজ পেয়েছিলাম একটি খাবারের দোকানে। নাম শুনে হাসা নিষেধ – উইনারশ্নিটজেল। মালিক এক পাকিস্তানি লোক আর তার দূরপ্রাচ্যীয় (পড়ুন চিংকু) স্ত্রী। বেতন খুবই কম, ঘন্টায় মাত্র সোয়া পাঁচ ডলার। নগদে কাজ, তাই খাটনির মাত্রা ছিল অমানুষিক। ডেলিভারি ট্রাক থেকে মালপত্র নামিয়ে ফ্রিজারে সাজাতে হত, সকাল-বিকালে দোকানের ভেতর-বাহির ঝাড়তে হত, পার্কিং লট থেকে গুদাম পর্যন্ত সাফ করতে হত, আর খাবার তৈরি ও বিক্রি তো আছেই। লোকলজ্জায় বেসবল ক্যাপ দিয়ে প্রায় নাক পর্যন্ত ঢেকে নিঃশব্দে কাজ করে যেতাম।

জাত্যভিমান মানুষকে কতটা অন্ধ ও কট্টর করে তোলে, তা খুব চোখে পড়তো। একবার এক খদ্দের খাবার ফেরত দিয়ে গেলেন, আমার হাতে তৈরি দেখে। একই সাথে মুদ্রার অপর পিঠও সেখানেই দেখলাম। আমার সাথের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি চাকরির ঝুঁকি নিয়েও সেই খদ্দেরকে তাড়িয়ে দিল দোকান থেকে। আরেকবার এক খদ্দের “হেই” বলে সম্বোধনের পর সেই মেয়ে রুদ্রমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, “হেই ইজ ফর হর্সেস, অ্যাড্রেস প্রপারলি।” কৃষ্ণাঙ্গদের উচ্চারণ ঠিকমত বুঝে উঠিনি তখনও। একদিন খদ্দেরকে টাকা ফেরত দেওয়ার সময় এক সহকর্মিনী বলে উঠলো, “ডু ইউ হ্যাভ এনি পিনিস?” আমি স্রেফ বেকুব বনে গেলাম। আমতা আমতা করতে করতেই সেই মেয়ে বলে উঠলো, “দ্যাটস ওকে, আই গট ওয়ান।” এবার আমার আরও তব্দা খাওয়ার পালা। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি তার পকেট থেকে ছোট্ট-গোল এব্রাহাম লিংকন বের করার বুঝলাম পেনি চাইছিল।

সেই দোকানে যারা কাজ করতাম, তারা সবাই ছিলাম জীবন সংগ্রামে বিভিন্ন ভাবে বিপর্যস্ত মানুষ। কমিউনিটি কলেজে পড়ুয়া কিছু মেয়ে ছিল, কিছু ছিল হাইস্কুল ড্রপ-আউট। ম্যানেজারকে লুকিয়ে কাজের অবসরে লুকিয়ে তারা হোমওয়ার্ক করতো, কোনদিন টুকটাক অংক দেখিয়ে নিত। সেই সময়টায় সবাইকে আগলে রাখতেন বয়স্ক এক মহিলা। আফ্রিকার কোন এক দেশ থেকে আমেরিকা এসেছিলেন। স্বামীর সাথে। কিছুদিনের মধ্যেই সেই স্বামী পরের ঘরে চলে গেছে, ফেলে গেছে স্ত্রী আর তিন ছেলে-মেয়ে। সে-ভদ্রমহিলা সন্তানের স্নেহেই আমাদের দেখে রাখতেন। দিনের শেষে গ্রিজ জমে থাকা পাতিল নিজেই সাফ করতেন, আমাদের সুবিধার জন্য বেশিক্ষণ কাজ করতেন, ম্যানেজারকে লুকিয়ে প্যাকেটে ভরে খাবার দিয়ে দিতেন রাতের জন্য। হয়তো আজও তিনি “ইশ”কে মনে রেখেছেন, অথচ আমি তাঁর নাম ভুলে গেছি ঠিকই। কনভিনিয়েন্ট অ্যামনিশিয়া।

কাজ সেরে ফিরছিলাম এক রাতে। ২৫শে এপ্রিল, ২০০৪। রবিবার রাত সাড়ে এগারোটা। সপ্তাহান্তের ফুর্তি সেরে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেছে। ক্যাম্পাসের এক পাশ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ডর্মিটরির সামনেই মাঠ, মাঠের পাশে রাস্তা, রাস্তার একপাশে ছোট্ট মসজিদ। সামনে পড়লো তিনটি ছেলে। সৌজন্যবোধক ভাবে মাথা নাড়িয়ে হেঁটে চললাম। হঠাৎ শুরু হল গালাগালি। দ্রুত পা চালিয়ে কেটে পড়ার চেষ্টা করলাম। সাথে পেছনের পায়ের আওয়াজও দ্রুততর হল। সাথে বেড়ে গেল গালির তোড়। বাধ্য হয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। এতে কাজ হল কিছুটা। একজন একটু পৃথুল হওয়ায় বাকি দু’জন ক্ষান্ত দিল, তবে তাই বলে উৎপাত বন্ধ হল না। রাস্তার পাড়ের কাঁকড় তুলে ছুঁড়ে মারতে লাগলো। মাথায় জ্যাকেটের হুড তুলে দিয়ে রক্ষা পেলাম। প্রবাসে এসে মসজিদেরই সামনে হেনস্তা হলাম। দুঃখ, হতাশা, আর রাগ মিলিয়ে কেমন যেন এক অনুভূতি কাজ করছিল। সেই দুঃখ থেকেই অধমের অ্যালটেক লান্সিংয়ের ফাইভ-পয়েন্ট-ওয়ান সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম কেনা। সামনে পেয়ে মনে হয়েছিল, কী লাভ এত সঞ্চয়ী আর সুশৃঙ্খল থেকে? জীবন তো এমনিতেও কষ্টের, ওমনিতেও কষ্টের।

তখন চলছিল স্করপিয়নসের ক্রেজ। দেশ ছাড়ার আগে সবেমাত্র ডিভিডি কিনেছি কনসার্টের। বাইরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই অ্যাক্যুস্টিক ভার্সন যোগাড় করেছিলাম। ঠিক করলাম, রক ইউ লাইক আ হারিকেন দিয়েই উদ্বোধন করবো। তালে তালে ভুলে যাবো মাথায় তাল পড়ার কথা। সব ঠিকঠাক করে গান ছেড়ে দেখি তেমন কোন তফাৎ বুঝছি না। কিছুক্ষণ গুঁতাগুঁতি করে টের পেলাম, সাউন্ড কার্ডই কম্প্যাটিবল না। অতঃপর আবারও মন খারাপ, আবারও ধুম করে কিছু খরচ করে ফেলা। শেষতক সাউন্ড কার্ডও কেনা হল, এবং সেটার উদ্বোধন রক অই লাইক আ হারিকেন দিয়েই হল।

বড় বড় ব্যান্ডের কনসার্টে যাওয়ার শখ মিটবে, বৈশ্বিক ঘটনাবলির ঠিক মাঝখানে থাকবো, বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে বেড়াবো, অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ফুর্তি করবো, প্রশস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাবো, ফ্রেন্ডসের জোয়ি’র মত হাউ-ইউ-দুইং বলে বেড়াবো – এই ছিল দেশ ছাড়ার সময় বুকের ভেতর কুসুম কুসুম স্বপ্ন। হয়েও হল না।

খুব প্রিয় এই গানটা এভাবেই জড়িয়ে আছে জীবনের খুব অপমানজনক একটি অধ্যায় আর ভেঙে যাওয়া অনেক খুচরো স্বপ্নের সাথে।

আহা, বিদেশ!

দু'দিনের তুষারপাতে ব্ল্যাক্সবার্গ ঢেকে গেছে পুরো। স্কুলের ক্লাস বাতিল করে দেওয়া হয়েছে কিছু।

আহা, বিদেশ!

ফ্রিজের বাইরে বরফ দেখার শখ আমার অনেক দিনের। আমেরিকা এসেও ৪ বছর লুইজিয়ানায় থাকার বদৌলতে শীত কেটেছে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে! গত শীতে ভার্জিনিয়া এসে দেখলাম বরফ। স্লেজিং নামক কাজটা সেবারই জীবনে প্রথম করলাম। এই শীতে বরফ পড়েছে বেশি, কিন্তু জমলো এবারই প্রথম। মাঝে -২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটেও খটখটে শুকনো ছিল।

আমার কাছে বিদেশ মানেই বরফ। শিশুতোষ এক ধরণের রোমান্টিকতা কাজ করে আমার তুষারপাত দেখলে। এই যে একটু আগে ব্ল্যাক আইসে পিছলে পা মচকে আসলাম, শক্ত মাটি মনে করে পানির উপর জমে থাকা বরফে পা দিয়ে জুতা ভিজিয়ে ফেললাম, তবুও ভালই লাগছে। ঝকঝকে রোদ উঠলেও শীত কমেনি। বালু-ঝড়ের মত উড়ছে মিহি তুষারকণা। বাতাস কাঁপিয়ে যাচ্ছে, মুখে সুঁইয়ের মত বিঁধছে, তবু ভালই তো লাগছিলো।

আমার কম্পিউটারটা জানালার পাশে। এখানে বসে দিনরাত প্রকৃতির খেলা দেখি। দু'দিন যাবৎ একটানা তুষারপাত দেখছিলাম। পরশু বের হবার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দেখিনি। ক'দিন ধরে বৃষ্টি পড়ছিল, ভাবছিলাম তেমনটাই চলবে। ফতুয়া আর একটা জ্যাকেট পরে বেরিয়েছিলাম। চোখের সামনে বৃষ্টির পানি জমে ফ্লারি হয়ে গেল, তার দু'সেকেন্ড পরই পেঁজা তুলার মত তুষারপাত।

আহা, বিদেশ!

এক ফাঁকে পয়েন্ট-অ্যান্ড-ধ্যুৎ ক্যামেরাটা নিয়েই বের হলাম পার্কিং লটে। কিছু ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট।

সিড়ি দিয়ে নেমেই...


বায়ে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তা মাত্রই সাফ করা হয়েছে...


ডান দিকে তাকিয়ে দেখি এই দৃশ্য...


ভাবলাম এদিকেই দু'কদম এগোই...


আমার বাড়ি স্টেট হাইওয়ের একেবারেই পাশে। বেড়ার পাশ দিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে...


দুই বিল্ডিং-এর মাঝের এই ধাপগুলো আমার খুব প্রিয় একটা জায়গায় নিয়ে যায়...


পেছনের দিকে আমার খুব প্রিয় সেই বেঞ্চটা, যেখানে মন খারাপ হলেই একা বসে থাকি...


এত বরফ ডিঙিয়ে নিজেকে ততক্ষণে হিলারি-হিলারি মনে হচ্ছে। ক্লিনটনের শয্যাসঙ্গিনী না, হিমালয়-বিজয়ী হিলারি। মনে হল নিজের দাবিটুকু রেখে যাই...


যাবতীয় রোমাঞ্চ কেটে গেল এই গাছটা দেখে...


অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এই গাছগুলোর মতই আলো-হাওয়ার প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পরে আছি পরের দেশে। নিজের বলতে যেই পাতাগুলো, সেগুলো হারিয়ে গেছে। নুয়ে পড়া শরীরে শুধু ভার বইছি ভিন্‌দেশি বরফকণার।

ডাক পড়লো স্লেজিং-এ যাবার। কী মনে করে যেন মানা করে দিলাম। গরুর মাংস আর খিচুড়ি রাঁধবো। তুষারকে বর্ষা করে দেবো।

আহা, বিদেশ!

Friday, November 14, 2008

গানবন্দী জীবনঃ সে যে বসে আছে একা একা

০. ভূমিকা
জীবনের গতিময়তা, আকস্মিকতা, আর গভীরতার সাথে সবাই কমবেশি পরিচিত। বহুবার চেষ্টা করেও জীবনকে থামাতে বা ফেরাতে পারিনি। অথচ সেই জীবন যেন নিজে থেকে এসে আটকা পড়েছে কিছু গানের মাঝে। স্মৃতির স্ফটিক হয়ে যাওয়া জীবনের ভগ্নাংশগুলো খুব বেশি জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে সেই গানগুলোর সাথে সাথে। কিছু গান, আর তার মাঝে আটকা পড়া জীবন নিয়েই এই প্রলাপ-সিরিজ।

১. সে যে বসে আছে একা একা
সবেমাত্র নিজের একটা ঘর পেয়েছি তখন। আমেরিকা এসেছি প্রায় ৬ সপ্তাহ হয়ে গেছে। প্রথম ক'দিন খুব বাজে কেটেছিল। প্রথম যে-বাসায় উঠলাম, সেখান থেকে তিন দিনের মাথায় বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা ছিল সেই ক'দিন। জেটল্যাগে মারা যাচ্ছি এমন সময় সাত-সকালে উঠিয়ে দিয়ে বাড়ির মালিক বললেন, আমি বাইরে যাবো, তুমি বের হও বাসা থেকে। সেই দিনটা কাটলো পার্কের বেঞ্চে বসে। সে-বাসার একটা ঘর খালি ছিল, তবু সেখানে ঢোকা বা শোয়া বারণ। যাঁর ঘর, তিনি দূর থেকেই মানা করে দিয়েছেন ফোন করে। উঠেছিলাম অস্থায়ী ভাবে, তবু তিন দিনের মাথায় বলে দেওয়া হল লিভিং রুমে শাওয়ার কার্টেইন টাঙিয়ে থাকার কথা। শর্ত মানলে এক-তৃতীয়াংশ ভাড়া দিয়ে থেকে যাওয়া, না মানলে সে-রাতেই অন্যত্র জায়গা খোঁজা। বের হয়ে গিয়েছিলাম।

হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম পথে পথে। জানুয়ারির সকাল। কী প্রচণ্ড শীত। দু'হাতের গিঁটের চামড়া ফেটে রক্ত ঝরছে শীতের প্রকোপে। এরই মাঝে আরেক স্বদেশী উদ্ধার করলেন। নিয়ে গেলেন তাঁর বাসায়। থাকতে দিলেন দু'সপ্তাহ। সে-বাসায় শোওয়ার ঘর তিনটি, কিন্তু মানুষ থাকে মাত্র সাতজন। এক বাঙালি নিজের ঘরে, বাকি দুই ঘর মিলিয়ে ছয় নেপালি। একটা ঘরে বিশাল উঁচু এক বিছানা। পথে-ঘাটে যত ম্যাট্রেস ফেলে রাখা ছিল, তার সব কুড়িয়ে এনে স্তুপ করা হয়েছে সেই ঘরে। ফলাফল, প্রায় চার ফুট উঁচু বিছানা। সেই ঘরে থাকতো দুই জন।

অন্যঘরটি আয়তনে বড়, সাথে লাগোয়া বাথ, ড্রেসিং। সে-ঘরে থাকতো চারজন। কোন আসবাব নেই। এক কোণায় কিছু বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা। চাদর পেতে বিছানা বানানো। একজন ঘুমিয়ে উঠে গেলে আরেকজন এসে ঘুমায়। খুব একটা অর্থকষ্টের কারণে যে এই ব্যবস্থা, তাও না। তবু অবাক হয়ে ভাবছিলাম, দু'জন বাঙালিকে আজ পর্যন্ত এক ঘরে থাকতে দেখলাম না। নিজের একটা ঘরের মূল্য আমাদের কাছে অপরিমেয়। অথচ মুদ্রার অন্য পিঠে একই এলাকা থেকে উঠে আসা এই ছাত্রেরা।

চার সপ্তাহ পর এক অ্যাপার্টমেন্টে একটা ঘর খালি হল। উঠলাম সেখানে। নিজের ঘর। বিছানা হিসেবে ব্যবহারের জন্য আমিও একটা ম্যাট্রেস কুড়িয়ে নিলাম। সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম ৩৫০০ ডলার। স্কলারশিপের পরও নিজের পকেট থেকে হাজার তিনেক টাকা দিতে হত বিশ্ববিদ্যালয়কে। বাকি টাকা থেকে ৪০০ ডলার দিয়ে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনলাম। বাধ্য হয়েই কিনতে হল। ঠান্ডা বয়ে দু'মাইল হেঁটে লাইব্রেরিতে যেতে পারি না। সেই কম্পিউটার রাখবার জন্য টেবিলের প্রয়োজন। ওয়ালমার্ট থেকে বিশাল একটা টেবিল কিনলাম। অল-পার্পাস টেবিল হিসেবে ব্যবহারের জন্য। সেই দিন থেকে ৪ বছর ধরে লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়া, কাপড় ইস্ত্রি করা, ইত্যাদি সব কাজই করেছি ৫৮ ডলারে কেনা সেই টেবিলে। আজকে আমি ভার্জিনিয়া, লুইজিয়ানায় সেই টেবিল আজও আছে।

রাত জেগে নাট-বল্টু লাগাচ্ছিলাম সেই টেবিলের। শ্রান্ত হয়ে বিরতি নিয়েছিলাম একটু। এক বন্ধু বললো, নতুন একটা গান শুনে দেখতে। অর্ণবের "সে যে বসে আছে" সেই প্রথমবারের মত শুনলাম। কোথায় যেন একটা মোঁচড় লাগলো। একটা কোণায় গিয়ে পা ছড়িয়ে বসলাম। দেওয়ালে হেলান দিয়ে পুরো রাত কাটিয়ে দিলাম গানটা শুনতে শুনতে।

এইতো সেদিন ওয়াশিংটন ডিসি গিয়েছিলাম অর্ণবের কনসার্ট দেখতে। শেষদিকে যখন সবাই গলা মিলিয়ে গাইছে, তখন আমি আনমনে ফিরে গেছি আমার সেই প্রথম দিকের দিনগুলোয়। সেই দিনের প্রতিটা অনুভূতি যেন অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছিল গানটার সাথে। শত মানুষের মাঝেও যেন একা একা বসে ছিলাম, রঙিন স্বপ্ন বুনছিলাম, জানালার পাশে বসে মেঘ গুনছিলাম। ঘাড় ফেরালেই জীর্ণ বিছানা, হাত বাড়ালেই কোণায় পড়ে থাকা ওটমিল বিস্কুট।

Thursday, October 16, 2008

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও বাঙালি ভোট

১. আমেরিকায় বাঙালি ভোট ও রাজনৈতিক মানচিত্রে তার গুরুত্ব
বাঙালি স্বভাবগত ভাবেই রাজনীতিমগ্ন জাতি। আমেরিকায় বসবাসকারী বাঙালিরাও এর ব্যতিক্রম নন। আমেরিকার ইতিহাসে স্মরণকালের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই বাঙালিরাও অনেকাংশে নির্বাচন-জ্বরে আক্রান্ত। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রকম বিশ্লেষণ চলছে এই নির্বাচন গিরে। আমেরিকায় বসবাসকারী ভোটারদের নির্বাচন ভাবনার কিছু দিক সেই আলোচনায় উহ্য রয়ে যায়, এবং পৃথক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

অভিবাসীর দেশ আমেরিকায় আইরিশ, ইতালীয়, বা হিসপ্যানিকদের তুলনায় বাঙালিদের বসবাস অনেক কম সময় ধরে। সময়ের আবর্তে ইতালি, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, ভিয়েতনাম, বা মেক্সিকো থেকে আগত অভিবাসীরা মূলধারার মার্কিন সমাজে মিশে গেলেও বাঙালিরা কিছুটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পছন্দ করেন। সুযোগ পেলেই দেশি গান, খাবার, পোশাকে হারিয়ে যাওয়ার তাড়না বাঙালির যাবার নয়। অপরাপর জাতিগুলো এক শব্দে ‘আমেরিকান’ হলেও বাঙালিরা ততটা নয়। আমেরিকায় স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী বাঙালিদের রাজনৈতিক চেতনা তাই মূলধারার আমেরিকার সামাজিক ও আঞ্চলিক উপাদানগুলোর চেয়ে বৈশ্বিক উপাদান দিয়ে চালিত বেশি। এ-কারণে বাঙালিরা সংখ্যায় প্রচুর হলেও আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য কোন অংশ নয়।

ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা এদিক থেকে অনুকরণীয় রকম ভিন্ন। মাত্র ক’দিন আগেই আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ গভর্নর নির্বাচিত ববি জিন্ডাল ভারতীয় বংশোদ্ভূত। শুধু তাই নয়, তিনি নির্বাচিত হয়েছেন লুইজিয়ানার মত রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যে এবং রিপাবলিকান দলের সমর্থনপুষ্ট হয়ে। মুদ্রার অন্যপিঠে আছেন বাঙালিরা, যাঁরা প্রবাসে বসেও দেশের রাজনীতিরই লেজুড়বৃত্তি করেন। ইসরায়েলের পর তাই আমেরিকার অন্যতম মিত্র হিসেবে ভারত উঠে আসছে, ইহুদিদের পর সবচাইতে সুবিধাভোগী হিসেবে ভারতীয়রা জায়গা করে নিচ্ছেন, পেছনে পরে থাকছে বাঙালিরাই।

পরিহার্যতার পীড়াদায়ক বাস্তবতার কারণে বাঙালিরা মূলধারার তুলনায় ভিন্নতর প্রণোদনায় রাজনৈতিক ভাবে উদ্বুদ্ধ বোধ করে থাকে। আমেরিকার ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির উপাদানগুলোর মধ্যে সাস্থ্যসেবা বাঙালিদের কাছে মুখ্য বিবেচ্য। উচ্চমূল্যের কারণে চিকিৎসাবঞ্চিত থাকা থেকে বেরিয়ে আসতে চান তারা সবাই। সাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক নীতির কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টিই গড়পড়তা সব বাঙালির পছন্দ। এই ইস্যুগুলোর পাশাপাশি উদারপন্থা ও অভিবাসীদের প্রতি সহনশীলতার কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টি আমেরিকার অধিকাংশ অভিবাসীর ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। বাঙালিরা তাই প্রার্থী নির্বিশেষে ডেমোক্রেটিক পার্টির নিষ্ঠাবান ভোটিং ব্লক।

সাদা চোখে দেখলে বারাক ওবামা ও জন ম্যাকেইনের দ্বৈরথে বাঙালি ভোটারদের অবস্থান এটুকুতেই সমাপ্ত। মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাঙালিমাত্রেই নীল পতাকাধারী ডেমোক্রেটিক দলের গাধা মার্কায় ভোট দেবেন। প্রশ্ন হল, কতজন বাঙালি ভোট দেবেন, কেন ভোট দেবেন, কতটা উচ্ছ্বাসের সাথে ভোট দেবেন, এবং সেই ভোট কতটুকু মূল্য পাবে।

২. বাঙালি ভোট অবহেলিত হবার কারণ
আমেরিকায় বাঙালি ভোট তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ার একটি বড় কারণ অবস্থানগত। বাঙালিরা যেসব অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন, সেগুলো দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের কোন না কোনটির নির্ভরযোগ্য ঘাঁটি। নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, অরিগন, ম্যাসাচুসেটস, বা ওয়াশিংটনে বাঙালিরা নীলের সাগরে বিলীন। অন্যদিকে টেক্সাস, ওকলাহোমা, বা অ্যারিজোনায় বাঙালিরা রক্ষণশীলদের দুর্গে বন্দী।

এই প্রান্তিক পরিস্থিতির বিপরীত অবস্থানে আছে তথাকথিত ‘সুইং স্টেট’ গুলো। এই স্টেটগুলো তুলনামূলক ভাবে জনবৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়ায় এগুলো নির্দিষ্ট কোন দলের ঘাঁটি নয়। এই গোটা দশেক ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’-এই নির্ধারিত হয় মার্কিন নির্বাচন। নিউ জার্সি কিংবা ফ্লোরিডার মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে নির্বাচনের ফলাফল ঘুরে যেতে পারে বলে দুই দলই এসব এলাকায় ভোটারদের তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। নিউ জার্সির একাংশের শ’খানেক ‘ইহুদি’ ভোটার, ফ্লোরিডার ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ভোটার, বা ওহায়োর ‘ইভ্যাঞ্জেলিক্যাল’ ভোটারেরা তাই উভয় পক্ষ থেকেই ঈর্ষণীয় মনোযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে সংখ্যায় অনেক বেশি হয়েও অনেক এলাকায় ভোটারেরা নির্বাচনের দামামা তেমন একটা শুনতে পাচ্ছেন না।

বিশ্বস্ত ভোটার হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা ডেমোক্রেটিক দলের কাছ থেকেও তুলনামূলক ভাবে কম সমাদর লাভ করে থাকে। সংখ্যালঘু হলেই ডেমোক্রেটিক দলের পক্ষে ভোট দিতে হবে, এই রীতি থেকে বাঙালিরাও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে একটু একটু করে। এক্ষেত্রে ‘সুইং ভোটার’-এর মর্যাদা লাভের চেয়ে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতি অসম্মতির ভূমিকা বেশি। বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে একটি সমান্তরাল উদাহরণ এ-ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে।

অপেক্ষাকৃত সহনশীল ও মধ্যবামপন্থী দল হওয়ার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ধারাবাহিক ভাবে জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট পেয়ে এসেছে। অনায়াসে পেয়ে যাওয়ায় এই ভোট কখনই যথাযথ মূল্য পায়নি, ভোটারদের প্রয়োজনগুলো দল বা সরকারের কাছে প্রাধান্য পায়নি। এই নিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় ও জাতিগত ভাবে সংখ্যালঘুদের প্রতি মনোযোগী না হয়ে বরং তাদের ভুলে গেছে। অল্প কিছু উগ্র ধর্মান্ধ ও জাতীয়তাবাদীর ভোটের লোভে তাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরে আসতে পেরেছে অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে সরব ও অনড় অবস্থান থেকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্রেটিক দলের ব্যাপারে বাঙালিদের কিঞ্চিৎ আশাভঙ্গের কারণটিও অনুরূপ। রিপাবলিকান দলের নিরন্তর আক্রমণের মুখে ডেমোক্রেটিক দল নিজেদের শক্তিশালী ও দৃঢ় হিসেবে জাহির করবার প্রয়োজনে তাদের অনেক মৌলিক নীতির সাথে আপোষ করেছে। সেপ্টেম্বর ১১-র সন্ত্রাসী আক্রমণের পর এটি কিছুটা রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে করা, কিছুটা নেতৃত্বের ব্যর্থতা। তালেবান সরকারের পতন ঘটাতে আফগানিস্তান আক্রমণ বিশ্বের অনেকেই সমর্থন করলেও ইরাক যুদ্ধের পেছনে তেমন কোন কারণই ছিল না। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ একক ভাবে বিশ্বের চোখে খলনায়ক হলেও বাস্তব এটাই যে ডেমোক্রেটিক দলও সেই আক্রমণের সমর্থনে সিনেট ও কংগ্রেসে ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশের খেলাফত মজলিশের মত আমেরিকার‌ কট্টর ডানপন্থী ইভ্যাঞ্জেলিক্যালদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছে ডেমোক্রেটিক দল। এর সাথে আছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির প্রশ্নে ইসরায়েলের পক্ষে নিঃশর্ত সমর্থন, ইত্যাদি। নির্বাচন জয়ের জন্য অল্প কিছু ভোটের সন্ধানে ডেমোক্রেটিক দল এভাবেই পেছনে ফেলে গেছে তার অনেক পুরনো সমর্থকদের।

৩. ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থন – বিল ও হিলারি ক্লিনটন
ইংরেজ ধাঁচের গণতন্ত্রগুলোর সাথে আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। আভিজাত্যের প্রভাব আমেরিকায় নেই বললেই চলে। এদেশে উদয়াস্ত পরিশ্রম করলে যে-কেউ একটি সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ভাষার মানুষের মিশেল হওয়ায় এখানে সামাজিক সহনশীলতা ব্যাপক। আমেরিকার রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যাপারেও কথাগুলো সত্য। এখানে ইংরেজ ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর মত বহু বছর ধরে দলের হয়ে কাজ করে একটু একটু করে উঠে আসতে হয় না। মানুষকে আকর্ষণ ও আস্বস্ত করবার মত গুণাবলি থাকলে যে-কেউ দলের নেতৃস্থানীয় অবস্থানে উঠে আসতে পারেন খুব সহজেই। নির্বাচিত হওয়ার বছর খানেক আগেও তেমন কেউ জিমি কার্টার নামে জর্জিয়ার অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের নাম জানতেন না। তাঁকে হারিয়ে দুই দফার জন্য রাষ্ট্রপতি হওয়া রনাল্ড রেগান ছিলেন হলিউডের ডাকসাইটে নায়ক।

দ্রুত জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা অর্জনের পথটির কারণে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে অধীষ্ঠিতরা তাই প্রায়ই চুম্বক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। তাঁরা নির্বাচিত হবার পর নিজের নীতি ও বিশ্বাস প্রচার করে একটি সুনাম রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দলের সমর্থন ও প্রতিনিধি পরিষদের দলীয় সাংসদদের ভূমিকা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই মূল কৃতিত্বের ভাগিদার হন শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি। একই বাস্তবতা অজনপ্রিয় কাজের বেলায়ও প্রযোজ্য। সাম্প্রতিকতম দুই রাষ্ট্রপতির দিকে তাকালেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হবের ইরাক যুদ্ধ, দুর্বল অর্থনীতি, কট্টর ডানপন্থা, ইত্যাদির দায় মাথায় নিয়ে জর্জ বুশ পৃথিবীময় ঘৃণিত। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তি, আফ্রিকায় ত্রাণ সহায়তা, ও বর্ধনশীল অর্থনীতির কারণে বিল ক্লিনটন সবচেয়ে আদৃত নামগুলোর একটি।

এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালিরা মূলত বিল ও হিলারি ক্লিনটনের একান্ত অনুসারী। বয়োজ্যেষ্ঠ বাঙালিরা, যাঁরা বছর দশেকের বেশি সময় ধরে আমেরিকায় আছেন, তাঁরা অর্থনৈতিক স্বর্ণযুগের কারণে বিল ক্লিনটনকে স্মরণ করেন প্রতিদিন। বিল ক্লিনটনের প্রথম শাসনামলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করার জন্য হিলারি ক্লিনটনের প্রয়াসের কথাও তাঁরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। সেই সাথে হিলারি ক্লিনটন বাঙালিদের মুখ্য বসত নিউ ইয়র্কের সিনেটর, এক কালে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন, ডঃ ইউনুস সহ অনেক বাঙালির পরিচিত, বাংলাদেশের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন, বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় সহায়তা করেছেন। সব মিলিয়ে আমেরিকার রাজনীতিতে বাঙালিদের পছন্দের শীর্ষে আছেন বিল ও হিলারি ক্লিনটন।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রাইমারি নির্বাচনের সময় বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনের মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হয়। বিভিন্ন সময়ে তিক্ততার জন্ম দেওয়া সেই লড়াইয়ের পর আমেরিকা জুড়ে অনেক হিলারি-সমর্থকই বারাক ওবামাকে সমর্থন করা থেকে বিরত আছেন। কেউ কেউ রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাকেইনের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথাও বলছেন প্রকাশ্যে। বাঙালিদের মধ্যে তেমন প্রবণতা না থাকলেও প্রৌঢ়দের মধ্যে এক ধরণের নির্লিপ্ততা চোখে পড়বার মত। এঁদের অনেকেই প্রথম বারের মত ভোটার হয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার আশায়। বারাক ওবামার পক্ষে হয়তো তাঁরা তবু ভোট দেবেন, তবে দল বেঁধে বা উচ্ছ্বাসের সাথে নয়। তাঁরা ওবামার চৌকষ উপস্থাপনা ও স্থিতধী চিন্তায় মুগ্ধ হলেও মন থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না হিলারির বিপরীতে প্রাক-নির্বাচনী লড়াইয়ের সময়ের তিক্ততা।

৪. বাঙালির চোখে ব্যক্তি বারাক ওবামা
এব্রাহাম লিংকনের অঙ্গরাজ্য ইলিনয় থেকে নির্বাচিত সিনেটর বারাক ওবামা পুরো আমেরিকার কাছেই এক নতুন ব্যক্তিত্ব। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অন্যতম কনিষ্ঠ প্রার্থী, মাত্র দু’বছর আগে সিনেটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। এর আগে তিনি বছর সাতেক ইলিনয়ের স্টেট সিনেটে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বারাক ওবামার জাতিগত পরিচয় এখন অনেকেই জানেন। ওবামার বাবা ছিলেন কেনিয়া থেকে আগত, তাঁর মা শ্বেতাঙ্গ, তাঁর জন্ম হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে, তিনি শৈশবে কিছু বছর ইন্দোনেশিয়ায় কাটিয়েছেন। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রার্থী হিসেবে তিনি মূলধারার আমেরিকানদের কাছে সংশয়ের, আর বাঙালিদের কাছে ভয়ের। অনেক বাঙালিই ভয় পান ওবামা আসলেই নির্বাচিত হতে পারবেন কিনা, নির্বাচনে ভোট পেলেও কারচুপিতে হেরে যাবেন কিনা, ভোটে জিতলেও তাঁকে বেঁচে থাকতে দেওয়া হবে কিনা, ইত্যাদি ভয়ের কথা শোনা যায় বাঙালি আলোচনাগুলোয় কান পাতলে।

ওবামার ব্যাপারে প্রৌঢ় বাঙালিদের এই সংকোচের মধ্যে একটি প্রজন্মগত বৈশিষ্ট্যও লক্ষ করা যায়। হিলারি ক্লিনটন ও বারাক ওবামার প্রাইমারি নির্বাচনের সময় উভয়েই ১৮ মিলিয়নের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য দিক হল, হিলারি পুরনো ডেমোক্রেট ও বয়োজ্যেষ্ঠদের ভোট পেয়েছিলেন। এই ভোটে বখরা বসানোর চেষ্টা না করে ওবামা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত করেছেন নতুন ভোটারদের। সদ্য ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশ করা ছেলেমেয়েরা তাঁর হয়ে প্রাণান্ত খাটুনি করেছে। দেশ নিয়ে ভেবেছে, রাজনীতিতে জড়িত হয়েছে। এই ‘আর্মি অফ নিউ ভোটারস’ দিয়েই ওবামা হারিয়েছেন হিলারিকে। প্রৌঢ় বাঙালিদের হিলারির প্রতি সমর্থনের কারণ ও ধরণ মূলধারার আমেরিকান ভোটারদের সাথে মিলে যায় এক্ষেত্রে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ভোটারদের মাঝে ওবামার ব্যাপারে আমেরিকান তরুণ-তরুণীদের অনুরূপ উচ্ছ্বাস ও উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। এই দিক থেকে প্রজন্মগত পছন্দের বিভেদ অনেক প্রকট।

সবশেষে আছে ধর্মের প্রসঙ্গ। হাজার উদারতা সত্ত্বেও আমেরিকায় ধর্মীয় অনুভূতি অন্য যেকোন পশ্চিমা দেশের চেয়ে গভীর। দুই প্রান্তের দুই মহাসমুদ্রের তীরের অভিবাসী-অধ্যুষিত অংশগুলো বাদ দিলে এদেশ অত্যন্ত ধর্মভীরু ও কট্টর। দুঃখজনক বাস্তবতা এটাই যে এদেশে খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বি নন, এমন কারও জন্য রাষ্ট্রপতি পদের মত ক্ষমতাধর কোন অবস্থানে আরোহন দুষ্কর। বারাক ওবামার পুরো নাম বারাক হুসেইন ওবামা। ধর্মবিশ্বাস মতে খ্রীষ্টান হওয়া সত্ত্বেও পিতৃদত্ত এই মুসলিম নামটি তাঁকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। রিপাবলিকান দল ভোটারদের ভীত করার জন্য বারাক ওবামাকে মুসলিম বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে আসছে বহুদিন ধরে। এই মিথ্যা আক্রমণের বিপরীতে এক পর্যায়ে বারাক ওবামা সাংবাদিক সম্মেলনে নিজের ধর্মের কথা খোলামেলা ভাবে বলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি অনেক কালের মধ্যে প্রথম ডেমোক্রেটিক প্রার্থী যিনি গীর্জায় গিয়ে ইভ্যাঞ্জেলিকালদের সাথে দেখা করেছেন, মৌলিক বিভেদগুলো মেনে নিয়ে দেশের কারণে এক হতে বলেছেন। যেকোন ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর চেয়ে তিনি তাঁর ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে সরব। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মকর্ম নিয়ে কোন মাথা-ব্যাথা না থাকলেও গুজব প্রতিহত করতে গিয়ে ওবামার বলা কিছু কথা বাঙালি ও মুসলিম ভোটারেরা কিছুটা মনক্ষুন্ন। তাঁরা আশা করেছিলেন বারাক ওবামা সরাসরি প্রশ্ন করবেন তিনি মুসলিম হলেও কেন তা তাঁকে অযোগ্য করবে। ওবামা তেমনটা না করা রাজনৈতিক ভাবে সমীচিন হলেও এটি অনেকের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

৫. বাঙালির চোখে ব্যক্তি জন ম্যাকেইন
বারাক ওবামার প্রতিদ্বন্দ্বী জন ম্যাকেইন দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অ্যারিজোনা থেকে নির্বাচিত সিনেটর। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তাঁর যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে তিনি আরও অনেকের সাথে যুদ্ধবন্দী হন। জন ম্যাকেইনের পিতা সে-সময় নেভির অ্যাডমিরাল ছিলেন। বাবার ক্ষমতার সূত্রে তাঁর মুক্তির বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সহযোদ্ধাদের ফেলে একা যাবেন না বলে তিনি দীর্ঘ চার বছর থেকে গিয়েছিলেন যুদ্ধবন্দীদের ক্যাম্পে। সে-সময় ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম শাস্তি পেতে হয়েছিল তাঁকে। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি যোগ দেন রাজনীতিতে।

নীতির প্রশ্নে আপোষহীন থাকার একটি সুনাম জন ম্যাকেইনের অনেক দিনের। রিপাবলিকান দলের সমর্থক নন, এমন সবার মাঝেও তাঁর ভাবমূর্তি একজন নিপাট ভদ্রলোকের। আমেরিকার শাসনব্যবস্থায় নিম্নকক্ষ বা কংগ্রেসের হাতে যাবতীয় ব্যয়ভারের দায়িত্ব অর্পণ করা আছে। বাজেট থেকে শুরু করে ছোট ছোট ‘স্পেন্ডিং বিল’ গুলোও কংগ্রেসের হাত ঘুরে আসতে হয়। জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের এলাকার উন্নয়নের জন্য এসব বিলের মধ্যে অনেক রকম প্রকল্প ঢুকিয়ে দেন। রাজনীতির পরিভাষায় এগুলোকে ‘ইয়ারমার্ক’ বলা হয়, আর অপচয়ের কারণে কথ্য ভাষায় বলা হয় ‘পর্ক-ব্যারেল’ (শূকরের মাংস আর মদের ব্যারেল নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠার জন্য বাড়তি টাকা বোঝাতে)। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জন ম্যাকেইন এ-ধরণের অপচয়ের বিরুদ্ধে অনেক শক্ত অবস্থান নেওয়ার কারণে বিখ্যাত।

রিপাবলিকান দলের নেতা হলেও জন ম্যাকেইন মূলত অর্থনৈতিকভাবে রক্ষণশীল। গর্ভপাত বা সমকামিতার ব্যাপারে সামাজিক ভাবে রক্ষণশীল হলেও তিনি জর্জ বুশ বা মিট রমনি বা মাইক হাকাবি-র মত কট্টর নন। অ্যারিজোনা অন্যতম ‘বর্ডার স্টেট’ হওয়ায় তিনি অবৈধ অভিবাসন নিয়েও কাজ করেছেন। অত্যধিক ব্যয়, অভিবাসন নীতি, ইত্যাদি বিষয়ে নিজের দলের বিপক্ষে তিনি অপ্রিয় অবস্থান নিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। এতে করে বহু বছর ধরে জন ম্যাকেইন একজন প্রথাবিরোধী বা ম্যাভরিক হিসেবে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন।

বর্ণিল ক্যারিয়ার ও চারিত্রিক গুণাবলির কারণে জন ম্যাকেইন বাঙালিদের চোখেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ২০০০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী অ্যাল গোর তাঁর ‘রানিং মেট’ হিসেবে বাছাই করেছিলেন জো লিবারম্যানকে। ইসরায়েল ও ইহুদি অধিকার প্রসঙ্গে আমেরিকার অন্যতম কট্টর এই ব্যক্তিকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ায় বাঙালি সহ অনেক মুসলমানের ভোটই হারিয়েছিলেন অ্যাল গোর। সেই বছরও রিপাবলিকান দলের মনোনয়নের জন্য প্রতিযোগিতা করেছিলেন জন ম্যাকেইন। প্রথম দিকের কিছু নির্বাচনে তিনিই জিতেছিলেন, জর্জ বুশ নন। দক্ষিণা অঙ্গরাজ্য সাউথ ক্যারোলিনার প্রাইমারি নির্বাচনের আগে গুজব রটানো হয়েছিল যে জন ম্যাকেইনের একটি জারজ সন্তান আছে। বাস্তবে সেই কন্যা সন্তানটি বাংলাদেশ থেকে দত্তক নেওয়া ব্রিজিট ম্যাকেইন। জর্জ বুশ ও কার্ল রোভের নোংরা কৌশল ও চরিত্রহননের হাতে ধরাশায়ী হলেন জন ম্যাকেইন।

রাজনীতির প্রয়োজনে জন ম্যাকেইন এরপর দিনে দিনে আরো বেশি ডানপন্থী হতে থাকেন। বিভিন্ন রকম ইস্যুতে তিনি নিরলস সমর্থন দিয়ে গেছেন রিপাবলিকান প্রশাসনকে। বাঙালি ও অন্যান্য অভিবাসীদের মধ্যে জন ম্যাকেইনের যেই শক্ত অবস্থান ছিল, তা সেই সময়টা থেকেই লোপ থেকে থাকে। ইরাক যুদ্ধের পক্ষে থাকা, দলত্যাগী জো লিবারম্যানকে সাথে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করা, প্রচারনার কাজে জর্জ বুশের আমলের ব্যক্তি ও কৌশল নিয়োগ, আপোষহীনতার নীতি থেকে সরে আসা, এবং মোটা দাগে একজন রিপাবলিকান হওয়ার কারণে জন ম্যাকেইন শুধু বাঙালি নয়, সবার কাছেই কম-বেশি অসমর্থনের পাত্র।

৬. কেমন যাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এই মুহূর্তে বারাক ওবামা জনপ্রিয়তায় বেশ খানিকটাই এগিয়ে। আমেরিকার ভোটাররা সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তার চিন্তা করলে রিপাবলিকানদের ভোট দেন, আর অর্থনীতির চিন্তা করলে ডেমোক্রেটদের। সেই সাথে যোগ হয়েছে গত আট বছরের দুঃশাসনের ফলে রিপাবলিকানদের প্রতি জমে ওঠা বিদ্বেষ। সব রকম নির্দেশক ডেমোক্রেটদের পক্ষে হওয়া সত্ত্বেও ওবামা বনাম ম্যাকেইন প্রতিযোগিতা বেশ কাছাকাছি ছিল কিছুদিন আগ পর্যন্ত। ওবামা কৃষ্ণাঙ্গ, তরুণ, ও স্বল্পপরিচিত হবার ফলে এরকমটা হয়েছে বলে অধিকাংশ বিশ্লেষক মত ব্যক্ত করতেন।

আমেরিকার নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের কিছু ‘ইলেক্টোরাল ভোট’ থাকে তার জনসংখ্যা অনুযায়ী। সে-কারণেই আকারে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও মন্টানার ভোট সংখ্যা ৩ এবং নিউ জার্সির ভোট সংখ্যা ১৫। ৫০টি অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে ইলেক্টোরাল ভোট ৫৩৮টি। ২০০৪ সালের নির্বাচনে জর্জ বুশ জিতেছিলেন ২৮৬-২৫১ ব্যবধানে। ভোর পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে ছিল ওহায়োর ২০টি ইলেক্টোরাল ভোটের উপর। ঠিক যেমন ২০০০ সালে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ফ্লোরিডার ২৭টি ভোটে।

এবছর এখনও পর্যন্ত বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক দলের ঘাঁটিগুলো ধরে রেখেছেন। স্পষ্ট ব্যবধানে যেসব অঙ্গরাজ্যে এগিয়ে আছেন, তাতে তাঁর পক্ষে ২৬৪ ভোট মোটামুটি নিশ্চিত। বিজয়ের জন্য দরকার আর ৬ টি ভোট, জিততে হবে ৭টি অঙ্গরাজ্যের যেকোন একটি। এগুলোর সবই ২০০৪ সালে জর্জ বুশের পক্ষে গিয়েছিল। একমাত্র ইন্ডিয়ানা বাদে বাকি ৬টিতেই (ফ্লোরিডা, ওহায়ো, কলোরাডো, নেভাডা, ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা) ওবামা এগিয়ে আছেন। শেষ তিন সপ্তাহ এই অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে তিনি স্মরণকালের ব্যাপকতম ব্যবধানে জিততে পারেন। তবে এক্ষেত্রে গলার কাঁটা হয়ে আছে ‘ব্র্যাডলি এফেক্ট’ বলে একটি ঘটনা।

১৯৮২ সালে টম ব্র্যাডলি নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের আগে সব জরিপে তিনি বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন, অথচ নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরাজিত হন। পরবর্তীতে দেখা যায়, প্রাক-নির্বাচন জরিপের সময় ব্র্যাডলিকে ভোট দেবার কথা বললেও কৃষ্ণাঙ্গ বলে অনেকেই তাঁকে ভোট দেননি। এই ঘটনা এবারেও ঘটতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। শেষ মুহূর্তে ভোটিং বুথে ঢুকে অনেকে হয়তো বারাক ওবামাকে তাঁর বর্ণের কারণে ভোট না দিতে পারেন। অন্যদিকে অনেকে ‘রিভার্স-ব্র্যাডলি এফেক্ট’ এর কথাও বলছেন, আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে অনেকে হয়তো ভোটিং বুথে গিয়ে ওবামাকেই ভোট দেবেন, শুধু মুখে বলছেন না আগে থেকেই। এছাড়া আছে সময়ের আগেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যাবার ভয়। বারাক ওবামার সামনের পথটুকু কেমন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজের হাতেই।

Wednesday, June 11, 2008

নীড়ে ফেরাঃ উড়াল পর্ব

আই ডোন্ট ড্রাইভ ফাস্ট, আই জাস্ট ফ্লাই লো। বছর খানেকের মধ্যেই রেকলেস ড্রাইভিং এর জন্য তিন তিনটা টিকেট খাওয়া আজমীরের উক্তি এটা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই টিকেটগুলোর একটা রীতিমত এরোপ্লেন থেকে তাড়া করে, রাস্তা ব্যারিকেড করে, গাড়ি থামিয়ে দেওয়া! আমাদের সফরের একটা অনেক বড় অংশ কেটেছিল পথে পথে, উড়ে উড়ে। মাত্র পাঁচ দিনে ২৬০০ মাইলের বেশি ঘুরে বেড়ানো ট্রিপের এক পর্যায়ে এই উক্তিই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। স্পিডিং কাহাকে বলে, উহা কত প্রকার, ও তার শাশুড়ির নাম কী, তা জানা হয়ে গিয়েছিল যাত্রাপথে।

আমার জন্য সাউথের সিধা, সরল, সিরাতুল মুস্তাকিমের মত পথঘাটে ফিরতে পারা ছিল বিশাল ব্যাপার। ভার্জিনিয়া এসে অবধি পাহাড়ে পাহাড়ে আঁকাবাঁকা পথে ড্রাইভ করে কেটেছে। পুরো আমেরিকায় ট্রাফিক আইন নিয়ে ভার্জিনিয়ায় কড়াকড়ি সবচেয়ে বেশি। এরা পারলে কফ-থুথু ফেললেও শ’পাঁচেক টাকা জরিমানা করে। স্পিডিং মানে তো কম করে হলেও হাজার খানেক টাকা। সর্বোচ্চ গতিসীমা মাত্র ৬৫ মাইল, রেডারের পাশাপাশি হেলিকপ্টার দিয়েও নজরদারি করা হয়। তার ওপর আমি নিজে স্পিডিং এর দায়ে ছয় মাসের প্রোবেশনে থাকায় জুত মত গাড়ি চালাতে পারছিলাম না আগের মাসগুলোয়। শেষতক গুরু মার্ক নফলারের পরামর্শ অনুযায়ী থ্রোয়িং-কশন-টু-দ্য-উইন্ড করে আমি আর আজমীর স্রেফ দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম এক্সিলারেটরের উপর। এরই চূড়ান্ত নিদর্শন ছিল দুই ড্রাইভারের মধ্যে একাধিকবার হাতবদলের পরও ব্যাটন রুজ থেকে অবার্ন পর্যন্ত ৪২০ মাইল মাত্র ৪ ঘন্টায় পাড়ি দেওয়া। আরো দ্রুত আসতে না পারার সম্পূর্ণ দায় ভাড়া করা পন্টিয়্যাক গ্রাঁ প্রি টার। নামেই স্পোর্টি গাড়ি, কাজের বেলায় ১০৮ মাইলের বেশি স্পিড ওঠেই না! তার উপর শক্ত সিটে টানা বসে থেকে সপ্তাহ খানেক বিব্রতকর সব জায়গায় ঠান্ডা-গরম মালিশ করতে হয়েছে ফিরে এসে।

জগতের আর সব কুকাজের মত স্পিডিং এরও কিছু গ্রামার আছে। অনেকেই পুরো সময় নিয়ম মেনে চালিয়ে মুহূর্তের উত্তেজনায় ১০-১২ মাইল স্পিডিং করে টিকেট খেয়ে বসেন। পুরোটাই গ্রামার না মেনে স্পিডিং এর ফল। স্পিডিং এর তিলমাত্র ইচ্ছে থেকে থাকলে প্রথম কাজ হল সেই এলাকার পুলিশের গাড়ির রঙ চিনে নেওয়া। স্টেট পুলিশ, শেরিফ, হাইওয়ে পেট্রল, ইত্যাদি একেক ধরনের পুলিশের গাড়ির রঙ একেক রকম। বলা বাহুল্য, যেসব স্টেটে পুলিশের গাড়ি কালো, সেগুলোয় একটু সতর্ক থাকতে হয়।

দ্বিতীয় কাজ হল পুলিশের গাড়ির মেক ও মডেল চিনে নেওয়া। প্রায় সব স্টেটেই পুলিশ ফোর্ড টরাস গাড়ি ব্যবহার করে ফ্লিট ভেহিকল হিসেবে। এছাড়া শেভি ইম্পালা ও ডজ চার্জার পুলিশের গাড়ি হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। মোটের উপর পুলিশ আর রেন্টাল কার মানেই আমেরিকান গাড়ি। তবে সমস্যা হয়ে যায় অ্যাটলান্টা বা নর্দার্ন ভার্জিনিয়া বা টেক্সাস রেঞ্জারদের গাড়ি নিয়ে। নিসান মুরানো, টয়োটা ক্যামরি, বা হোন্ডার ট্রাকও দেখা যায় এসব জায়গার পুলিশকে ব্যবহার করতে। শুনেছিলাম ক্যালিফোর্নিয়ায় নাকি ল্যাম্বর্গিনির আধিপত্যের কারণে পুলিশকে করভেট দেওয়া হয়েছে।

নিয়মের তালিকায় এরপর আসে ঢাল বা বাঁকে সমঝে চালানো। পুলিশমাত্রই দৃষ্টির অন্তরাল থেকে উঁকি-ঝুঁকে দিতে পছন্দ করে। এইতো সেদিনই ফ্লোরিডার এক পুলিশ বরখাস্ত হল ড্যাশবোর্ডের ক্যামেরায় জুম করে বেড়ার ফাঁক দিয়ে স্নানরত বালিকা দেখতে গিয়ে। এদেশের হাইওয়েগুলোর এক্সিট প্রায়ই প্রধান হাইওয়ের উপর দিয়ে অন্য পাশে নিয়ে যায় রেস্ট এরিয়ায়। এরকম কালভার্ট-সদৃশ যেকোন সারফেস রোডের নিচ হল ‘মামু’দের খুব প্রিয় জায়গা। কপাল খুব ভাল হলে দু’টি গাড়ি উলটো দিকে মুখ করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকবে। এই অবস্থায় মামুরা প্রায়ই নিজ নিজ ল্যাপটপে দুষ্ট ছবি দেখে থাকে বলে দুর্মুখেরা বলে থাকেন।

চতুর্থ নিয়মটা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাসিং (সোজা বাংলায় আমরা যাকে ওভারটেক করা বলি) করার প্রয়োজন না হলে বামের লেনে উঠতে নেই। স্পিডগান বামের লেনেই আগে তাক করা হয়। শুধু তাই নয়, আগে-পিছে গাড়ি থাকলে দূর থেকে দেখতে পাওয়া কষ্টসাধ্য। নিউ জার্সির দিকে গেলে সমস্যা অন্য। ওখানে রেডার দিয়ে এক পুলিশ ডিটেক্ট করে, আর সামনে থেকে আরেকজন এসে থামায়। কোথাও কোথাও তো কিছুটা দূরত্বে দু’জন বসে থাকে, স্রেফ কেউ প্রথম জনকে পেরিয়েই খুশি মনে স্পিড বাড়ালে ধরবার জন্য।

আমেরিকার অনেক শহরের মুখ্য আয় ট্রাফিক টিকেট থেকে আসে। এই শহরগুলোর কাছে এলেই আচমকা স্পিড লিমিট ১০-১৫ মাইল কমে যায়। আদর করে এগুলোকে টিকেট সিটি ডাকি আমি। এগুলো, কিংবা বড় কোন শহরের আউটস্কার্টে এলেই পুলিশের উৎপাত বেড়ে যায়। এদেশে স্টেট পুলিশদের এক্তিয়ার নেই অন্য কোন স্টেটে যাওয়ার। তবুও স্টেট বর্ডারগুলো স্পিডিং এর জন্য খুব বিপজ্জনক।

সবশেষে দরকার ভাল একজন ওস্তাদ ও অনুগত এক বা একাধিক সাগরেদ। জেট প্লেনের মত উড়ে আসা কোন গাড়ি দেখলেই এক পাশে সরে যান, এবং তার আধা মাইল দূরত্বে থেকে মনের সুখে স্পিড করে যান। এরকম সময় পেছনেও আরো কিছু দ্রুতগামী গাড়ি পেলে তো কথাই নেই। দ্রতগামী গাড়িটি যদি মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিঊ হয়, তাহলে তাকে একবার ওভারটেক করুন। এই গাড়িগুলোর মালিকের বোধহয় ইগো অনেক বেশি হয়। দুই-একবার উৎপাত করলেই এরা মোটামুটি শ'খানেক মাইলে গাড়ি চালানো শুরু করে দেয়। এখানে অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও আছে। লাক্সারি গাড়ি হলেও লেক্সাস, জ্যাগুয়ার, কিংবা মাস্ট্যাং, স্পোর্টি বিএমডব্লিঊকে উষ্কে লাভ নেই। এগুলোর মালিক সাধারণত খুব শীতল রক্তের হয়।

যাক, এগুলো ও আরো কিছু গ্রামারের মেনে চলার প্রত্যক্ষ সুফল ছিল ঝড়ের ভয়ে ঝড়ের বেগে ব্যাটন রুজ থেকে অবার্ন চলে আসা। মজার ব্যাপার হল, এই উড়াল পর্বের পরও সবার মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও। পাশ থেকে সাই-সাই করে সরে যাওয়া গাছ বা গাড়ি নয়, গাড়ির ভেতরের মানুষগুলো আর তাদের জীবনই ছিল মুখ্য।

ব্যক্তিজীবনে মানুষমাত্রই পলায়নপর। কোন কিছু লুকানোর সবচেয়ে ভাল উপায় নাকি চোখের সামনে রেখে দেওয়া। আমি অন্তত নিজেকে সেভাবেই লুকাই। ঢাকে বাড়ি পড়ার আগেই নাচুনে বুড়ির মত কিছু তিড়িং-বিড়িং করে এসে নিভৃতে নিজের দুঃখগুলোয় ডুবে থাকি। একই রকম আড়ালে অধিকাংশ মানুষই লুকিয়ে থাকেন। বড় কোন ভ্রমণে বের হওয়ার সমস্যা হল, এই এস্কেপ গুলো সহসা পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন একই সাথে থাকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তাই সহযাত্রীর অনেক গোমর ফাঁস হয়ে যায় লম্বা সফরে।

যাত্রা শুরুর আগে কেউ প্রকৃতির কাছে দেহের কোন অংশ গচ্ছিত রাখতে ভুলে গেলে তা প্রচন্ড দুর্গন্ধের সাথে প্রতীয়মান হয়ে যায় আধা ঘন্টা নাগাদ। কারো বিড়ি-সিগারেট খাবার অভ্যাস থাকলে সেটা দেড় ঘন্টার মধ্যে বের হয়ে আসতে বাধ্য। কারো পা ঘামার ব্যামো থাকলে দু’ঘন্টা। ভোজনরসিক কেউ থাকলে প্রতি তিন ঘন্টা অন্তর বড়সড় একটা বিরতি দরকার পড়ে। দ্বিতীয় দিনে জানা যায় কার হজমশক্তি কেমন। দ্বিতীয় রাত নাগাদ ষড়রিপুর অন্তত দুটির উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তৃতীয় দিনে ত্রুটি আড়ালের অভিনয়দক্ষতা জানা যায়। চতুর্থ দিনে দেখা যায় নীরব থেকে পৃথিবীকে উপেক্ষা করার সামর্থ্য। পঞ্চম দিনে প্রতিটি মানুষের জীবন খোলা বইয়ের মত হয়ে যায় আশেপাশের মানুষের কাছে। ব্যাটন রুজ থেকে অবার্নের পথটুকু ছিল আত্মগোপনের অক্ষম অপচেষ্টার যাত্রা। আমরা পাঁচ ভাই কাতর ছিলাম যার যার ব্যক্তিগত বেদনায়। পালাক্রমে দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে বের হয়ে আসছিল গোপনতম কষ্টগুলো।

কারো আদরের ‘প্রতীক্ষিতা’ তাকে ব্যবহৃত ডায়াপারের মত ফেলে রেখে চলে গেছে আর কারো কাছে। ছন্নছাড়া, নিরামিষ জীবন নিয়ে সেই কূলে শুধুই হুতাশ। দুনিয়াটা সকালে তেতো তো রাতে অসীম।

কেউ একেবারেই উলটো। সুশৃঙ্খল, নামাযী, হাসিখুশি। মাত্রই ক’রাত আগে বান্ধবী মায়ের বকা-ঝকায় ভয় পেয়ে ছেড়ে চলে গেছে তাকে। এই কূলে শুধুই হাসি। আর কিছুক্ষণ পরপর একটাই কথা। আমি ঠিক আছি, ভাল হয়েছে, সব ঠিক আছে।

কারো এক দশক আগে হারানো প্রেয়সী আজ অন্য কারো ঘরণী। মাঠ-ঘাট পেরিয়ে প্রায়ই ছুটে যায় দূর থেকে এক পলক দেখে আসতে। মানুষ থেকে মানুষে শুধু খুঁজে বেড়ায় চিরচেনা কোন মুখের ছায়া।

কেউ ভাবে সেই সব দিনের কথা, যখন পেট বাঁচাতে ধর্ম ছাড়তে হয়েছিল। প্রবাসে নিঃস্ব, ক্ষুধার্ত অবস্থায় কোন এক কালে পড়শী মেয়ের দেওয়া শূকরের মাংস খেয়ে জীবন বাচাঁতে হয়েছে। আজ অর্থ ও খাদ্য আছে প্রচুর, মাঝখান থেকে স্রষ্টা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।

কেউ বা একের পর এক বিপত্তি হাসিমুখে বরণ করে নেয়, এক যুগ পুরনো এক প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখাতে। এই প্রতিশ্রুতিটুকুই ক্যান্সারের কাছে হারানো প্রিয়াকে নিজের মাঝে অনুভব করার একমাত্র নৈমিত্তিক উপায়।

মাত্র পাঁচ দিন। ২৬০০ মাইল। ভেবেছিলাম বেড়াচ্ছি। বাস্তব হল, জীবন থেকে পালাচ্ছিলাম আমরা সবাই।

Tuesday, June 03, 2008

প্রবাসের কথোপকথন - ১৫

“তোমার গা থেকে ফুলের সুবাস আসছে আজকে। খুব সুন্দর গন্ধ, এত চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না কীসের গন্ধ এটা। ইউ লুক ভেরি ফ্রেশ অ্যাজ ওয়েল।”
ফুল ঠিক মাই কাপ অফ টি না। আমার দৌঁড় গোলাপ পর্যন্ত। তবে ল্যাভেন্ডার খুব প্রিয়। ছোটবেলায় নানাকে দেখতাম ইয়ার্ডলি ব্যবহার করতে। ওদের ল্যাভেন্ডারটা অসাধারণ লাগতো। আমিও তোমার পারফিউমের গন্ধটা চিনতে পারছি না। সকাল বেলা বাসে যাবার সময় এরকম তাজা সুবাস পাই, কিন্তু মেয়েলি ব্যাপারে ধারনা কম দেখে চিনতে পারি না। ওদিকে আবার জিজ্ঞেসও করতে পারি না চড় খাবার ভয়ে।

“উহু, তবুও কিছু একটা ভিন্ন আজকে। কিছু একটা করেছো যা আগের বার করনি।”
আজকে গোসল করে, শেভ করে এসেছি। নাহলে আমার ঘাম-ময়লা-দুর্গন্ধ তোমার হাতে চলে যেত। সেটা হতে পারে। আফটার শেভটার জন্য এরকম লাগছে হয়তো। আন্দাজ করতে পারো কিনা দেখি তো। উহু, জিলেট না। ওল্ড স্পাইসও না। ব্রুট।

“গন্ধটা পছন্দ হয়েছে আমার। আগে তেমন কাউকে দেখিনি এটা ব্যবহার করতে।”
না দেখারই কথা। এটার বদনাম আছে বুড়াদের ব্র্যান্ড হিসেবে। তবে আমার বেশ লাগে। কেমন যেন শান্ত একটা গন্ধ। জ্বলে খুব, এটাই সমস্যা।

“তোমার চুলগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। দেখে তো মনে হচ্ছে না চুল পড়ার সমস্যা আছে, বরং বেশ ঘন আর সিল্কি।”
বলে যাও, শুনে সুখ পাই। আমার অত খুঁতখুঁতে ভাব নেই। শুধু কান আর ঘাড়ে চুল লাগলেই অস্বস্তি লাগে।

“ট্রিমারে কয় নম্বর সাইজ ব্যবহার করো তুমি চুল কাটানোর সময়? সে কী, এত বছর ধরে চুল কাটিয়েও তুমি জানো না কোন সাইজ? ঠিক আছে, কত ইঞ্চি বললেও চলবে।”
এসব ব্যাপারে আমার কোনই ধারনা নেই। সাইজের আন্দাজ বলতে পারবো না। আমি চুল কাটাতে গেলে শুধু বলি, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু ফিল মাই ইয়ারস। এরপর নাপিত যা করার করে। এই যে এখন যেমন চুলের ভারে এলোমেলো অবস্থা। মেয়েদের মত কানের উপর থেকে চুল সরাতে সরাতে ক্লান্ত।

“মেয়েদের মত হলেই খারাপ, তাই না? খুব খারাপ। রাগ করার কিছু নেই, ঠাট্টা করছিলাম। সাইজ না জানলে তো একটু ঝামেলা হয়ে গেল। এত্ত কম জানলে কি চলে এই যুগে? লম্বা চুল রাখলে যখন খারাপ লাগে, তাহলে যেমন আছে তেমনটাই রেখে শুধু ছোট করে কাটাতে পারো তাহলে।”
সেটাই ভালই হয়। সেই যে ছোটবেলায় বাবা চুল আঁচড়ে দিতো, এরপর থেকে তো সাহসে কুলায়নি কোনদিন কিছু করতে। তোমার মাথায় কিছু খেললে বল। লেট ইওর ইমাজিনেশন রান ওয়াইল্ড। তুমি যা বলবা, তাই হবে। একটা ঝুলঝাড়ুর চুল কাটলেও আপত্তি করতে পারে, আমি করবো না। তোমার হাতেই আমার মাথা সঁপে দিলাম, যাও। অবশ্যই, বল তো ন্যাড়া হতেও আপত্তি নেই। আই ওয়োন্ট হোল্ড এনিথিং এগেইন্সট ইউ, আই প্রমিস। আমার এই খোমা প্রসাধনের ঊর্ধ্বে, তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। বছরের পর বছর ধরে সাত-সকালে উঠে নিজের মুখ দেখতে দেখতে এখন দুঃস্বপ্ন দেখেও ভয় লাগে না। এই রকম চেহারা নার্ভের জন্য ভালো।

“অনেক হল, ঠাট্টা রাখো এবার। তুমি কোন দেশ থেকে যেন? ও হ্যাঁ, বাংলাদেশ। আমি লেবানন থেকে এসেছি। আমি আরেকটু বেশিদিন হয় দেশে যাই না। প্রায় ১৩ বছর। যেতে মন চায়, যাবো যাবো করি, আমার মা ওখানেই, কিন্তু গোলাগুলি আর যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য যাওয়া হয় না।”
খুব খারাপ লাগার কথা অবশ্যই। বাকি ভাই-বোন সহ এখানেই থাকো, না? ওহ, আমি তো ভাবলাম তুমি এখানে পড়াশোনা কর। আমি আছি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙ্গে। আরে ধুর, ফালতু কথা ওসব। স্মার্ট না ছাই। বাপ-মা ধরে-বেঁধে পড়ালো দেখে পড়ছি। আমার হাতে ছেড়ে দিলে অর্থনীতি নয়তো ইতিহাস নিয়ে পড়তাম। এই যে, এখন বুড়া বয়সে এসে আর ভাল লাগে না পড়তে, তার কারণ ঐ জোর করে পড়ানোই।

“এটা কোন কথা হল না। লেগে থাকো, হয়ে যাবে। লাইফ ইজন্‌’ট ফেয়ার, অ্যান্ড নো ওয়ান এভার সেড ইট ইজ। ম্যান আপ, ডুড।”
ঠিক হল না কিন্তু। মারলা তো মারলা, একদম বেল্টের নিচেই মারলা। নাহ, এই জন্যই মেয়েদের সাথে কথা বলতে ভয় লাগে আমার। প্রথম দিকের আধো-আধো কথা ভুলে নিজের ডিফেন্স লোয়ার করি, আর তারপর ধুম করে এরকম কিছু একটা বলে বসে সবাই।

“নারী আর পুরুষ কখনও সমান হতে পারে না, এটা আমরাও বুঝি। তবে ছেলেরা দুর্বল লিঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা তাদের ঠিকই সহ্য করে এসেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।”
ঐ যে আবার শুরু হল কোমড়ের নিচে মারামারি। এমন একটা সময় বলছো এসব, যখন আমি পুরোপুরিই তোমার মর্জির কাছে জিম্মি। এই মুহূর্তে তোমার সাথে একমত না হলে আমাকে যাচ্ছেতাই একটা মো-হক নিয়ে ঘুরতে হবে এক মাস।

“ভয় নাই। চুলও ছিড়বো না, বকাও দিবো না। গরমের এত ভয় তোমার, মাথায় এত গরম লাগে, তবু আজকের মত দিনে তুমি সুইমিং পুলে না কেন?”
চুল, চুল। এই জঙ্গলটা সাফ করে নেই আজকে, তারপর কালকে থেকে নাহয় যাবো আবার। সপ্তাহ খানেকের একটা বড় ট্রিপ দিয়ে আসলাম। বাড়ি থেকে সাতশ' মাইল দূরে গিয়ে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। সেই গাড়ি ঠিক করতে করতে আমরা আরো ঘুরে বেড়ালাম। না না, বন্ধুর গাড়ি। আমার না।

“আমার একটা হোন্ডা আছে। ১০ বছর পুরনো। আমি যখন ১৮ বছরের ছিলাম, তখন কিনেছিলাম।”
ভাল সার্ভিস দেওয়া উচিত। হোন্ডা খুব রিলায়েবল গাড়ি। তবে আওয়াজ বেশি করে, এটাই সমস্যা। ইদানিং সেগুলো ঠিক করে ফেলেছে অবশ্য।

“আমি চালাই খুব কম। ১০ বছরে মনে হয় মাত্র এক লাখ মাইলে চলেছে গাড়ি। আই বট অ্যান অ্যাকর্ড।”
এক মালিকের হাতে চলা গাড়ি, বিক্রি করলে দাম পাবা ভালো। হোন্ডার প্রাইস রিটেনশন সবচেয়ে ভাল। আমেরিকান আর কোরিয়ান গাড়ির দাম সবচেয়ে কমে।

“আমার বাবা বলেছিল তাকে বিক্রি করে দিতে। তেলের দাম বেশি দেখে তার ট্রাকটা বের করতে চায় না।”
কেনার সময় খেয়াল রাখা দরকার ছিল। এই ভুল করেই ডেট্রয়েট ডুবলো। তেল একটা সীমিত সম্পদ, এর দাম কখনো না কখনো বাড়বে। এই সহজ সত্যটা ভুলে গিয়ে আজকে আমেরিকার বেহাল দশা। বেশি বেশি লাভের লোভে ট্রাক আর এসইউভি বিক্রি করতে থাকলো। আজকে অর্থনীতির বেহাল দশা হত না সময় থাকতে সচেতন হলে।

“আমি এই জন্যই কোন খোঁজ রাখি না। সবাই শেয়ার মার্কেট নিয়ে চিন্তা করে, আমি কিচ্ছু করি না। স্রেফ নিজের মত থাকি।”
কে যেন বলেছিল, হ্যাপিনেস ইজ আ চয়েস। সুতরাং যা করছো, ঠিকই হয়তো। অযথা খাল কেটে ডিপ্রেশন ডেকে আনার মানে নেই কোন। তবে তেলের দাম হিসেবে রাখতেই হয়। আমি চার বছর আগে ওয়ান এইটি ফাইভে কিনেছিলাম, এবার কিনলাম ফোর টুয়েন্টিতে। জাপানি গাড়ি কিনেছিলা বলে রক্ষা, নয়তো অনেক টাকা যেত তেল কিনে।

“আমার ইচ্ছা একটা লেক্সাস কেনার। ইএস। ইউ নো হোয়াট আই অ্যাম টকিং এবাউট, রাইট?”
আই শিওর ডু। আমার রুমি একটা লেক্সাস চালায়। আর এবার ঘুরে আসলাম ভলভোয়। বেশ লাগলো চড়ে। আমার শখ বিএমডব্লিউ কেনার। সারা জীবনের শখ আমার।

“শোন, থ্রি-এইটথ্‌ ইঞ্চ কাটি তোমার চুল। আর সামনে কিছুটা বড় রাখি। স্পাইকিং জেল লাগিয়ে দেই। খারাপ লাগবে না দেখতে।”
অ্যাজ ইউ লাইক ইট। আমার কাছে সব সমান। পেছনে যেমন খুশি করতে পারো। স্কোয়্যার আর রাউন্ডের তফাৎ নেই আমার কাছে। দ্যাট্‌স পারহ্যাপস দি ওনলি পার্ট অফ মাই বডি হুইচ আই ক্যান্ট সি নো ম্যাটার হাউ মাচ আই ট্রাই। ওয়েল, হয়তো আরো দুই-একটা জায়গা আছে, তবে সেদিকে নাহয় না যাই। আপাতত স্কোয়্যারই করে দাও। তো এই গাড়ি বিক্রি করলে কি লেক্সাস কিনবে? মিন্ট কন্ডিশনে আপত্তি না থাকলে বছর পাঁচেকের পুরনো লাক্সারি মডেলের গাড়ি কিনতে পারো। দে কাম ফুললি লোডেড টু।

“আমার এই স্বপ্নটা সত্যি হবে বলে মনে হয় না। ঐ যে আয়নার নিচে ছবিটা দেখতে পারছো? ঐটা আমার মেয়ের ছবি। ওর জন্মের পর আমার এক্স-হাসব্যান্ড খুব অবাক হয়েছিল আমার দেওয়া নাম শুনে। আই নেমড হার অ্যালেক্সিস, বিকজ আই ওয়ান্টেড আ লেক্সাস অল মাই লাইফ।”
আইডিয়াটা খুব পছন্দ হয়েছে আমার। আমার ছেলে হলে তাহলে নাম রাখতে হবে বিমার।

“বিমার ফ্রম বিএমডব্লিউ, রাইট? শুনতে খারাপ না। নাও, হয়ে গেছে তোমার চুল কাটা। ইট্‌স টুয়েলভ নাইনটি ফাইভ।”