– কালকে কোরবানির মাংস নিয়ে যেও।
: হু, আমাকে না দিলে কিন্তু গরীবের হক আদায় হবে না।
– থাপ্পড় খাবি। আত্মীয়ের ভাগ হতে পারে না? ফালতু কথা শুধু।
: ঐ হল। এবার কোথায় দিলেন কোরবানি?
– ঘন্টা দুয়েকের পথ হবে এখান থেকে। যাওয়া-আসা একটা ঝক্কি। একবার গরু বাছাই করতে যাও, একবার টাকা দিতে যাও, একবার মাংস আনতে যাও। কোরবানির মাংস, তাই প্রত্যেকেরই যেতে হল।
: কেষ্ট পেতে একটু তো কষ্ট করতেই হবে, কিন্তু তাই বলে সবার যেতে হবে কেন?
– মাস্লা আছে কী যেন একটা। কোরবানির মাংস নাকি যারটা তার আনতে হবে। নাহলে তো একজন গিয়েই সব নিয়ে আসতে পারতো।
: ব্যাপার না। আমার কাছে সব সমান। খাওয়া পেলেই হল। কারো মাফ নেই, সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসবো নে।
– এবারে বলেছি কিছু মাংস আলাদা করে রাখতে। সবার ভাগ থেকে একটু একটু করে। সেই মাংস দিয়েই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।
: বুদ্ধি খারাপ না। আপনাদের ভাগেই তো রান্না পড়বে। আফসোস অন্য জায়গায়। শুধু তরতাজা রান্না খাচ্ছি। দেশের মত শুকনো, ঝুরঝুরা মাংস খাওয়া হয় না আজকে ঠিক ছয় বছর হয়।
– হ্যাঁ, এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোই প্রবাস জীবনকে কষ্টকর করে দেয়। পত্রিকায় দেখলাম, এই দুর্মূল্যের বাজারেও লোকে অনেকগুলো করে গরু কোরবানি দিচ্ছে। কারও কারও গরু তো উটের সমান বড়। অথচ গ্রামে গিয়ে দেখেছিলাম, গরু নেই দেখে মানুষে হাল টানছে।
: এটাই তো সমস্যা। ল’ আর স্পিরিট অফ ল’-এর মধ্যে পার্থক্যটুকু আমরা বুঝি না। আমরা ধর্মকে একেবারে আক্ষরিক ভাবে নেই, কেউ ধর্মের নির্যাসটুকু বুঝতে চাই না। ওহির মর্ম ঠিক মত বুঝলে কোরবানির গরু কিনে মানুষ গ্রামের গরীব কৃষকদের দিতো। বদলি হজ্জ হয়, বদলি কোরবানি কেন হতে পারবে না?
– সবার মনে শুধু আক্ষরিক চিন্তা, বুঝলে? সীমিত কিছু অক্ষর লেখা আছে, সেগুলো মুখস্ত করে বসে আছে অর্ধশিক্ষিত কিছু মোল্লা। আমরা শিক্ষিত লোকেরাও তাদেরই কাছে যাই উপদেশ নিতে।
: এখানেই সমস্যা। ইসলাম ধর্ম নিয়ে আমরা গর্ব করে বলি যে এটা সবচেয়ে আধুনিক ধর্ম। সেই ৫ম শতাব্দিতে যেই ইসলাম নাজিল হয়েছিল, সেটা শিক্ষা আর অনুশাসনের দিক থেকে ১৫শ সালের জন্যও আধুনিক ছিল। দাসত্বের যুগে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সব রকম ধর্মমতের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে আমাদের উচিত ছিল এই আধুনিকতা, এই অধিকারবোধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
– বলা হয় ইসলাম একটা পরিপূর্ণ জীবনবিধি। এখানেই ঝামেলাটা। এই সুবিধা নিয়ে নিজের মত করে সবাই ধর্মের ব্যাখ্যা করে, নিজের জীবনধারা চাপিয়ে দেয় অন্যের উপর। শুধু তাই না, খুব তীব্র এক ধরণের চরমপন্থা ঢুকে যায় মনের মধ্যে। আমিই ঠিক, আমার মত অনুসরণ করলেই স্বর্গে যাওয়া যাবে, অন্যথায় নরকবাস – এমন একটা চিন্তা মানুষের মনে স্থান করে নেয়।
: পরিপূর্ণ জীবনচরিত বলে প্রচার করাটাই সমস্যা। ধর্মে তো ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী কালের আলোকে নতুন বিধি তৈরির সুযোগও আছে। এই দিকটায় ফতোয়াবাজদের একচ্ছত্র আধিপত্য হয়ে গেছে। কেউ বলে না যে ধর্মের অনুসারী হিসেবে, সমাজের অংশ হিসেবে আমাদেরও অধিকার আছে ধর্মের আধুনিকায়নে।
– আরেকটা ঝামেলা হল রাজনীতি ঢুকে যাওয়া। নিজের ধর্মকে ভালবাসা মানেই অন্য ধর্মকে ঘৃণা করা নয়। এটা ভুলে যাই আমরা। রাজনীতির স্বার্থে এটা অনেক ভাবে অপব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের বেলায় এই আবেগ কাজ করে বেশি। আমরা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করি না কেন, বাস্তব এটাই যে আমাদের সংস্কৃতিতে মিল আছে। ধর্মের অজুহাতে আমরা সংস্কৃতিকে আঘাত করি।
: কথাটা প্রায়ই বলি, বাঙালি স্বর্গে যাওয়ার জন্য আরবি ভাষায় নাম রাখে। অন্য দেশের মুসলমানেরাও ইসলামিক নাম রাখে, কিন্তু অন্তত নিজের ভাষা-সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নেয় কোন ভাবে। আমাদের তো ওসবের বালাই নেই।
– একেবারে ওভাবেও দেখার কিছু নেই। ধর্ম অনেকের কাছে একটা সংস্কৃতি, সেটাও মনে রাখতে হবে।
: ধর্ম হল ধর্ম। বিশ্বাস, পরকাল, পাপ-পুণ্য, এগুলোর ভেতর সংস্কৃতি ঢোকানো ঠিক না।
– সংস্কৃতি কী তাহলে? আমরা যেভাবে খাই, ঘুমাই, চিন্তা করি, কথা বলি, সেগুলোই তো? সেখানে কি ধর্মের প্রভাব নেই? ধর্মকে কেউ সংস্কৃতি হিসেবে নিতেই তো পারে, কারণ ধর্মেও নির্দিষ্ট কিছু ধরন-ধারণ আছে এগুলো নিয়ে।
: চাইলেই করতে পারে, কিন্তু করতে হবে কেন? নিজের শেকড়ের সাথে সম্পর্ক নেই, এমন কিছু কখনও স্থিতিশীল, কার্যকর হতে পারে না।
– সোশাল ডারউইনিজম হয়ে গেল না? একই রকম তো চিন্তা হিটলার করেছিল। তাকে দোষ দেওয়া যায় কীভাবে তাহলে? সব সংস্কৃতির সমান অধিকার দেওয়া হলে, এবং মানুষকে স্বাধীন ভাবে নির্বাচন ও অনুসরণের অধিকার দিলে কিন্তু ধর্মের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কেউ স্বাধীন ভাবে ধর্মের পথে যেতে চাইলে, তাকে সংস্কৃতি হিসেবে নিতে চাইলে দিতে হবে।
: ডারউইনিজম আসে অস্তিত্বের সংকটের প্রশ্ন এলে। নিজের দেশ, নিজের ভাষাকে সবাই শ্রেষ্ঠ ভাবে। নিজের মতাদর্শ সবাই প্রচার করতে চায়। এতে দোষের কিছুই নেই। এতে হারাবার বা হারিয়ে যাবারও কিছু নেই। কিন্তু ধর্মকে এর ভেতর ঢুকিয়ে ফেললে এলিমেন্ট অফ ফিয়ার ঢুকে যায়। শাস্তির ভয় চলে আসে। সংস্কৃতি তো ভালবাসার অভ্যস্ততা, ভয়ে ত্রস্ততা না।
– তুমি কি অস্তিত্ব হারানোর ভয়েই সংস্কৃতির কথা বলছো না? বাংলাকে ছড়িয়ে দেওয়ার আর্জির পেছনে কি হারানোর ভয় নেই?
: আছে, তবে সেটা অস্তিত্ব হারানোর ভয় না। আমিত্ব হারানোর ভয়ে আমি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার কথা বলছি। স্বাধীন ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ নিশ্চিত না করলে কোন সংস্কৃতি কালোত্তীর্ণ হয় না। সেজন্যই সীমানা রুদ্ধ করে ভিন্ভাষা দূরে রাখার চেয়ে নিজের ভাষাকে শক্তিশালী করা জরুরী। ধর্ম তো এই সুযোগ দেয় না। এখানে মানলে বেহেশত, না মানলে দোযখ।
– তবে কি ধর্ম অচল?
: মোটেই না। আমার ভাবতে ভাল লাগে যে আমাকে তৈরি করা হয়েছে কোন একটি মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। দুর্বল মুহূর্তে আমার ভাবতে ভাল লাগে যে আমার একটি আশ্রয় আছে। ভাবতে ভাল লাগে যে আমার অনুচ্চারিত আর্তিগুলো কেউ শুনছে অন্তরাল থেকে। ধর্ম না থাকলে এই শান্তিটুকু পেতাম না। তবে এটা আমার বিশ্বাস, আমার সংস্কৃতি না। আমার সংস্কৃতি ধর্ম দিয়ে প্রভাবিত হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। এর পেছনে বড় কারণ হল, ধর্ম নিজেই তো আজকে আর স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে নেই!
– একটা ব্যাপার জানো, আমরা মুসলমানেরাও কিন্তু পৌত্তলিক। এই দিক থেকে ভণ্ডামিটা খুব কষ্ট দেয় আমাকে।
: হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়া কি পৌত্তলিকতার পর্যায়ে পড়ে? অবশ্য, চাইলে সেভাবে দেখা যেতেও পারে।
– না, আমি সেই অর্থে বলছি না। আমরা বলি যে খোদা নিরাকার, সর্বময়। তাঁর কোন অঙ্গ নেই, চাহিদা নেই। আমরা বলি যে আমাদের খোদা কোন মূর্তির গণ্ডিতে আবদ্ধ না। অথচ তাঁকে আমরা ঠিকই আটকে ফেলি বিশেষণের গণ্ডিতে।
: বিশেষণ তো বর্ণনার জন্য, এর ভেতর বন্দিত্ব আসবে কেন?
– ভেবে দেখো, আমরা বলি যে খোদা দয়ালু, ন্যায়বান, সর্বদ্রষ্টা, ইত্যাদি। এভাবে কিন্তু মানবসৃষ্ট বিশেষণের মধ্যেই তাঁকে বন্দী করে ফেলছি আমরা। গণেশের মত শুড় নেই হয়তো, কিন্তু তাই বলে আমাদের খোদাও খুব একটা মুক্ত না। একটি শিশু কি তার চেনা বিশেষণের বাইরে খোদাকে কল্পনা করতে পারবে? খোদার সর্বময়তা কি সে কোনদিন উপলব্ধি করতে পারবে?
: ভেবে দেখার মত। অবয়ব না দিয়েও উপাসনা হয়ে যাচ্ছে ঠিকই। হয়তো একারণেই ধর্মের বক্তব্যটুকু হারিয়ে যায় এত সহজে।
– এই সীমিত সংজ্ঞায়নের পাকে পড়েই কিন্তু আমরা ভয় থেকে স্রষ্টার আরাধনা করি। অথচ উচিত ছিল হিতাহিত জ্ঞান থেকে আরাধনা করা। এটা মনকে অনেক মুক্ত করতো, সহনশীল করতো।
: ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। আমরা খোদাকে অনেক কিছুই বলি। লিঙ্গ নেই বলেও তাঁকে পুরুষ হিসেবেই সম্বোধন করি, আবার ম্যারাডোনার গোলকে আলঙ্করিক ভাবে ঈশ্বরের হাত বললে এর মধ্যে বিধর্মিতা খুঁজি। মোনাফেকির ভয়ে বলি খোদার নামের সাথে জড়িয়ে কোন প্রকার ভৌত কথা বলতে না। সবকিছুই করি আমরা, শুধু খোদাকে বুদ্ধিমান বলি না। এত জটিল পৃথিবী যিনি বানালেন, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, হি মাস্ট বি ড্যাম স্মার্ট। আমরা শিক্ষিত লোকেরা ভুলে যাই যে স্রষ্টা আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমান। তাঁকে তাই ডাকা উচিত বুদ্ধি ব্যবহার করেই। উলটো আমরা বিশ্বাসের গতি-জড়তায় ভেসে গিয়ে নির্বোধের মত কিছু মুখস্ত ইবাদত করি।
– কাইনেটিক ইনারশিয়া অফ ফেইথ… নিউটন, ব্রুনো, ডারউইনরা কিন্তু স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা নিজের ক্ষুদ্রতা দিয়ে ঈশ্বরের মহত্ব প্রকাশ করতেন। দেয়ার ইজ আ রিজন হোয়াই দে আর গ্রেট, অ্যান্ড আই জাস্ট ড্রাইভ আ কার।
Showing posts with label ধর্ম. Show all posts
Showing posts with label ধর্ম. Show all posts
Wednesday, May 06, 2009
Wednesday, April 22, 2009
গানবন্দী জীবনঃ আমি বাংলায় গান গাই
৯. আমি বাংলায় গান গাই
হারানোর আগ পর্যন্ত নাকি মানুষ তার সবচেয়ে বড় সম্পদকে চেনে না। দেশপ্রেম তেমনই ব্যাপার। দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত খুব কম মানুষই নিজের দেশ, আলো-হাওয়া, মাটি, আর মানুষকে প্রাপ্য সম্মান ও ভালবাসা দিতে পারে। ইংরেজিতে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ যাকে বলে, তেমনই এক অনুভূতি কাজ করে সবার মাঝে দেশ নিয়ে। বাইরে এলে সবকিছু মেলে, শুধু আপনজনকে অবহেলা করার এই সুযোগটুকু বাদে। সারা পৃথিবীর সাথে ভদ্রতার প্রতিমূর্তি হলেও আমরা যেমন মায়ের কাছে দুর্বিনিত, আমাদের কাছে দেশও তেমনটাই অবহেলিত।
দেশ মানে স্রেফ একটি ভূখণ্ড না, দেশের অর্থ অনেক বড়। বাঙালিরা মুষ্টিমেয় সেই জাতিগুলোর একটি, যাদের স্বাধিকার আন্দোলন উৎসারিত হয়েছিল নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরবার মানস থেকে। বাঙালি সংস্কৃতি তাই আমাদের কাছে শুধু ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, পরিচয়ের উৎসও। ঠিক-ভুল যেমনটাই হোক না কেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে ধর্মের ভিত্তিতে দেশবিভাগের আন্দোলনও ছিল পরিচয়ের সাথে জড়িত। ফলশ্রুতিতে এই দুই পরিচয়ই কম-বেশি রয়ে গেছে আমাদের মাঝে।
দেশে থাকার সময়টুকুতে আমরা নিজের মন ও মতের মানুষের সাথে মিশে থাকি। নেতৃস্থানীয় কোন অবস্থায় আমরা থাকি না। হাওয়া যেদিকে বয়, সেদিকেই পাল তুলি। কোন বেলায় আশরাফুলের অল্প রানে আউট হওয়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন সংসদে হাসিনা-খালেদার ঝগড়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন হয়তো নতুন কোন নাটকে দেখানো কিম্ভূতকিমাকার ফ্যাশন নিয়ে। বাইরে এলে মূলধারার এই নির্বোধ স্বাভাবিকতা থাকে না। না চাইলেও নেতা গোছের কিছু হয়ে যেতে হয়।
প্রবাসে এলে আমাদের কাজকর্ম দিয়েই যার যার সংস্কৃতির স্বরূপ নিরূপিত হয়। বিশাল পৃথিবীতে আমরা প্রতিটি প্রবাসী যেন ডেকচি থেকে বের করে টিপেটুপে দেখা ভাত। অন্যের ভুলের জন্যও আধাসেদ্ধ থাকার সুযোগ নেই, কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই দোষ পড়বে বাঙালির, ভারতবর্ষের, কিংবা মুসলমানদের। নেতাকে যেমন নিজের আচরণ দিয়ে সবাইকে পথ দেখাতে হয়, তেমনি প্রতিটি প্রবাসীকেও দেশ-ভাষা-ধর্মের স্বার্থে সমঝে চলতে হয়।
এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা হয়েছিল দু’বার। প্রথমবার মাত্র আমেরিকা আসার পরপর, লুইজিয়ানায়। দুপুরে ক্লাস সেরে ঘরে বসে আছি। হঠাৎ ধপধপে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, আর হাতে বাইসাইকেল। নাম বলার পর জানতে চাইলো কোন ভাষার শব্দ। বাংলা বলতেই ধরিয়ে দিল প্রভু যীশুর বাণি – বাংলায়। আমার জন্য, আমার ভাষার জন্য আলাদা করে লেখা আসে সবকিছু। বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হতেই আমি স্বচ্ছন্দ বেশি, তাই এই শ্লাঘা অস্বাভাবিক ছিল না। তুলনায় দ্বিতীয় ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ বেশি।
রমজান এলেই বাঙালি সমাজ মসজিদ-ভিত্তিক হয়ে যায়। নেকির প্রশ্নে নির্মোহ হয়ে রোজা না রেখে থাকা যায়, কিন্তু বিনামূল্যে ইফতারের ব্যাপারে প্রশ্নে আপোষ নেই। বিকেল হলেই তাই ভিড় করি মসজিদে। মুসলমান ব্রাদারহুডের জয়জয়াকার চারিদিকে। সাধারণত স্টুডেন্ট ইউনিয়নে মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে ইফতার দেওয়া হয়। গত রোজায় সামনে পড়লো এমন এক ভ্রাতা। জানালেন, তিনি পাকিস্তানি। কথাপ্রসঙ্গে জানলেন, আমি বাংলাদেশের। চূড়ান্ত ধৃষ্টতা দেখিয়ে সেই লোক মিষ্টি হেসে বলে বললো, তুমিও তো তাহলে পাকিস্তানিই। উদ্দেশ্য, আমাকে ভারতীয়দের থেকে আলাদা করে তার সাচ্চা ব্রাদারের সম্মান দেওয়া। বিরক্ত হয়ে বললাম, যদি আমি পূর্বপরিচয়ের সূত্রেই পরিচিত হব, তবে ব্রিটিশ না হয়ে পাকিস্তানি কেন? তুমি মুড়ি দিয়ে ইফতার খাও, আমি গেলাম।
প্রবাসে এসে আচমকা সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়াটা একটি বিরাট ধাক্কা দেয় অনেককে। এই ধাক্কা সামলানোর জন্য মানুষ পরিচয় খোঁজে, নিজের একটি স্থান খোঁজে। আমিত্বের ধারণাটির পেছনে স্বকীয়তা যতটা, তার চেয়ে বেশি কাজ করে প্রশ্নাতীত অধিকার। পরিচয় খুঁজবার সময় এলে মানুষ তেমনই কিছু খোঁজে। ধর্ম ও সংস্কৃতি উভয়ই তেমন সুবিধা দেয় মানুষকে। আমি বাঙালি ও মুসলমান, আমার এই দু’টি পরিচয় নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না, কোন ধরনের সামাজিক বাস্তবতা আমার এই পরিচয়গুলোকে হেয় কিংবা খাটো করতে পারবে না।
এ-পর্যায়ে প্রশ্ন জাগে, সংস্কৃতি বা ভাষার পরিচয় বাদ দিয়ে মানুষ ধর্মের দিকে ঝোঁকে কেন। উত্তর খুব সহজ। প্রচার-প্রসারের তুলনামূলক সুবিধা। ভাষার ভিত্তিতে যে-পরিচয়, তা প্রদর্শন করতে হলে গান, আবৃত্তি, নাচ, কিংবা অন্য কোন ধরনের সুকুমারবৃত্তির অধিকারী হতে হবে। ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সহজতর। দু’-দশ মাইল পর পর মসজিদ আছে, সেখানে নিয়মিত জড়ো হওয়া মুসল্লি আছে, আছে হালাল দোকান ও দোয়ার আসর। পরিচয়ের আভিজাত্যও থাকে, পরকালের নিশ্চয়তাও বাড়ে।
প্রবাসের আলো-হাওয়ায় দিনাতিপাত করলেও কম-বেশি প্রত্যেকেই সে-দেশগুলোর সংস্কৃতিকে সমর্থন করেন না। সন্তানদের সবাই গড়ে তুলবার চেষ্টা করেন স্বদেশী রক্ষণশীলতা ও সংযমের সাথে। সে-ক্ষেত্রে সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়া অনেক দুষ্কর, তুলনায় ধর্ম অনেক সহজ। ধর্মের পথ বিস্তারিত ভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়াও এর পেছনে ভূমিকা পালন করে।
এভাবে ভাবার ভেতর ক্ষতির কিছু নেই। সাধারণ ভাবে বাইরে এলে সবাই একটি বেশি নামাযি হয়ে যাওয়াতেও ভ্রুকুটি করবার কিছু নেই। নিঃসহায় অবস্থায় মনকে স্থির ও শান্ত রাখতে ধর্মের উপযোগিতা অনস্বীকার্য। আমি আমার মুসলমান পরিচয় নিয়ে আর দশ জনের মতই গর্বিত। তবুও গোল বেধে যায় বাঙালি আর মুসলমান পরিচয় দু’টির মাঝে। আমার মায়ের মত ধর্মভীরু অনেকে খুব নির্বিষ ভাবেই মুসলমান পরিচয়কে বাঙালি পরিচয়ের আগে রাখেন। এভাবে ভাববার অসারতা আমার চোখে প্রকাশ পেয়েছিল উপরে উল্লেখকৃত দ্বিতীয় ঘটনার সময়। শুধু মুসলমান বলেই আমি কোন পাকিস্তানি বা রাজাকারের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে পারবো না। আমার বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয়গুলো কোথায় যেন পীড়া দেয় আমাকে মনের ভেতর। সেই মর্মবেদনা থেকেই আমি জানতে পারি আমার প্রথম পরিচয় কী।
পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বগুলো সাধারণত মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের মানুষ ও ভূমি থেকে বিচ্যুত হবার পর। এই ধারার বিপরীত একজন মানুষের সাথে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল অনেক বছর আগে। আমার প্রবাসে আসবার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন অনেক শ্রদ্ধার নাভেদ ভাই। বিতর্কসংশ্লিষ্ট সবাই তাঁকে এক নামে চেনেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক হিসেবে। ২০০৩ সালের কথা। নাভেদ ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলছি ভর্তির বিভিন্ন খুঁটিনাটি নিয়ে। এমন সময় ইটিভি’তে শুরু হল মাহমুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে বাংলার গান। নাভেদ ভাই বলে উঠলেন, ইশতি একটু ধরো, গানটা শুনে আসি; এই গান শুরু হলে আমি সব ফেলে রেখে একবার গানটা শুনি।
দেশটা ছেড়ে চলে যাবো কিছুদিন পর, এই বাস্তবতা মাথায় তখনই প্রথমবার আঘাত করে। সেই গানটির কারণেই পুরো একটি প্রজন্ম বাংলায় গান গায়, বাংলার গান গায়, বুঝে-শুনে গায়। শুধু আমি নই, কম-বেশি প্রতিটি মানুষেরই জীবন বন্দী হয়ে আছে এই গানের মধ্যে। প্রতুলের অসামান্য মূল গানটির চাইতে অনেকাংশে ভিন্ন হলেও বাবু’র গানটি যেন দাবানলের মত ঘিরে ফেলেছিল সবাইকে। এই গানটি না থাকলে পরিচয়ের যুদ্ধে বাংলা অনেকটাই পিছিয়ে যেত।
বাংলার গানে তাই শুধু জীবন নয়, আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্বই বন্দী।
প্রতুলের কণ্ঠে বাংলার গানঃ
মাহমুদুজ্জামান বাবু'র বাংলার গানঃ
ফুয়াদের ঝালমুড়ির কৌটায় বাংলার গানঃ
Ami Banglay Gaan Gai - Laboni - Fuad Featuring
হারানোর আগ পর্যন্ত নাকি মানুষ তার সবচেয়ে বড় সম্পদকে চেনে না। দেশপ্রেম তেমনই ব্যাপার। দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত খুব কম মানুষই নিজের দেশ, আলো-হাওয়া, মাটি, আর মানুষকে প্রাপ্য সম্মান ও ভালবাসা দিতে পারে। ইংরেজিতে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ যাকে বলে, তেমনই এক অনুভূতি কাজ করে সবার মাঝে দেশ নিয়ে। বাইরে এলে সবকিছু মেলে, শুধু আপনজনকে অবহেলা করার এই সুযোগটুকু বাদে। সারা পৃথিবীর সাথে ভদ্রতার প্রতিমূর্তি হলেও আমরা যেমন মায়ের কাছে দুর্বিনিত, আমাদের কাছে দেশও তেমনটাই অবহেলিত।
দেশ মানে স্রেফ একটি ভূখণ্ড না, দেশের অর্থ অনেক বড়। বাঙালিরা মুষ্টিমেয় সেই জাতিগুলোর একটি, যাদের স্বাধিকার আন্দোলন উৎসারিত হয়েছিল নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরবার মানস থেকে। বাঙালি সংস্কৃতি তাই আমাদের কাছে শুধু ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, পরিচয়ের উৎসও। ঠিক-ভুল যেমনটাই হোক না কেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে ধর্মের ভিত্তিতে দেশবিভাগের আন্দোলনও ছিল পরিচয়ের সাথে জড়িত। ফলশ্রুতিতে এই দুই পরিচয়ই কম-বেশি রয়ে গেছে আমাদের মাঝে।
দেশে থাকার সময়টুকুতে আমরা নিজের মন ও মতের মানুষের সাথে মিশে থাকি। নেতৃস্থানীয় কোন অবস্থায় আমরা থাকি না। হাওয়া যেদিকে বয়, সেদিকেই পাল তুলি। কোন বেলায় আশরাফুলের অল্প রানে আউট হওয়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন সংসদে হাসিনা-খালেদার ঝগড়া নিয়ে কথা বলি, কোনদিন হয়তো নতুন কোন নাটকে দেখানো কিম্ভূতকিমাকার ফ্যাশন নিয়ে। বাইরে এলে মূলধারার এই নির্বোধ স্বাভাবিকতা থাকে না। না চাইলেও নেতা গোছের কিছু হয়ে যেতে হয়।
প্রবাসে এলে আমাদের কাজকর্ম দিয়েই যার যার সংস্কৃতির স্বরূপ নিরূপিত হয়। বিশাল পৃথিবীতে আমরা প্রতিটি প্রবাসী যেন ডেকচি থেকে বের করে টিপেটুপে দেখা ভাত। অন্যের ভুলের জন্যও আধাসেদ্ধ থাকার সুযোগ নেই, কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই দোষ পড়বে বাঙালির, ভারতবর্ষের, কিংবা মুসলমানদের। নেতাকে যেমন নিজের আচরণ দিয়ে সবাইকে পথ দেখাতে হয়, তেমনি প্রতিটি প্রবাসীকেও দেশ-ভাষা-ধর্মের স্বার্থে সমঝে চলতে হয়।
এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা হয়েছিল দু’বার। প্রথমবার মাত্র আমেরিকা আসার পরপর, লুইজিয়ানায়। দুপুরে ক্লাস সেরে ঘরে বসে আছি। হঠাৎ ধপধপে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, আর হাতে বাইসাইকেল। নাম বলার পর জানতে চাইলো কোন ভাষার শব্দ। বাংলা বলতেই ধরিয়ে দিল প্রভু যীশুর বাণি – বাংলায়। আমার জন্য, আমার ভাষার জন্য আলাদা করে লেখা আসে সবকিছু। বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হতেই আমি স্বচ্ছন্দ বেশি, তাই এই শ্লাঘা অস্বাভাবিক ছিল না। তুলনায় দ্বিতীয় ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ বেশি।
রমজান এলেই বাঙালি সমাজ মসজিদ-ভিত্তিক হয়ে যায়। নেকির প্রশ্নে নির্মোহ হয়ে রোজা না রেখে থাকা যায়, কিন্তু বিনামূল্যে ইফতারের ব্যাপারে প্রশ্নে আপোষ নেই। বিকেল হলেই তাই ভিড় করি মসজিদে। মুসলমান ব্রাদারহুডের জয়জয়াকার চারিদিকে। সাধারণত স্টুডেন্ট ইউনিয়নে মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে ইফতার দেওয়া হয়। গত রোজায় সামনে পড়লো এমন এক ভ্রাতা। জানালেন, তিনি পাকিস্তানি। কথাপ্রসঙ্গে জানলেন, আমি বাংলাদেশের। চূড়ান্ত ধৃষ্টতা দেখিয়ে সেই লোক মিষ্টি হেসে বলে বললো, তুমিও তো তাহলে পাকিস্তানিই। উদ্দেশ্য, আমাকে ভারতীয়দের থেকে আলাদা করে তার সাচ্চা ব্রাদারের সম্মান দেওয়া। বিরক্ত হয়ে বললাম, যদি আমি পূর্বপরিচয়ের সূত্রেই পরিচিত হব, তবে ব্রিটিশ না হয়ে পাকিস্তানি কেন? তুমি মুড়ি দিয়ে ইফতার খাও, আমি গেলাম।
প্রবাসে এসে আচমকা সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়াটা একটি বিরাট ধাক্কা দেয় অনেককে। এই ধাক্কা সামলানোর জন্য মানুষ পরিচয় খোঁজে, নিজের একটি স্থান খোঁজে। আমিত্বের ধারণাটির পেছনে স্বকীয়তা যতটা, তার চেয়ে বেশি কাজ করে প্রশ্নাতীত অধিকার। পরিচয় খুঁজবার সময় এলে মানুষ তেমনই কিছু খোঁজে। ধর্ম ও সংস্কৃতি উভয়ই তেমন সুবিধা দেয় মানুষকে। আমি বাঙালি ও মুসলমান, আমার এই দু’টি পরিচয় নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না, কোন ধরনের সামাজিক বাস্তবতা আমার এই পরিচয়গুলোকে হেয় কিংবা খাটো করতে পারবে না।
এ-পর্যায়ে প্রশ্ন জাগে, সংস্কৃতি বা ভাষার পরিচয় বাদ দিয়ে মানুষ ধর্মের দিকে ঝোঁকে কেন। উত্তর খুব সহজ। প্রচার-প্রসারের তুলনামূলক সুবিধা। ভাষার ভিত্তিতে যে-পরিচয়, তা প্রদর্শন করতে হলে গান, আবৃত্তি, নাচ, কিংবা অন্য কোন ধরনের সুকুমারবৃত্তির অধিকারী হতে হবে। ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সহজতর। দু’-দশ মাইল পর পর মসজিদ আছে, সেখানে নিয়মিত জড়ো হওয়া মুসল্লি আছে, আছে হালাল দোকান ও দোয়ার আসর। পরিচয়ের আভিজাত্যও থাকে, পরকালের নিশ্চয়তাও বাড়ে।
প্রবাসের আলো-হাওয়ায় দিনাতিপাত করলেও কম-বেশি প্রত্যেকেই সে-দেশগুলোর সংস্কৃতিকে সমর্থন করেন না। সন্তানদের সবাই গড়ে তুলবার চেষ্টা করেন স্বদেশী রক্ষণশীলতা ও সংযমের সাথে। সে-ক্ষেত্রে সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়া অনেক দুষ্কর, তুলনায় ধর্ম অনেক সহজ। ধর্মের পথ বিস্তারিত ভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়াও এর পেছনে ভূমিকা পালন করে।
এভাবে ভাবার ভেতর ক্ষতির কিছু নেই। সাধারণ ভাবে বাইরে এলে সবাই একটি বেশি নামাযি হয়ে যাওয়াতেও ভ্রুকুটি করবার কিছু নেই। নিঃসহায় অবস্থায় মনকে স্থির ও শান্ত রাখতে ধর্মের উপযোগিতা অনস্বীকার্য। আমি আমার মুসলমান পরিচয় নিয়ে আর দশ জনের মতই গর্বিত। তবুও গোল বেধে যায় বাঙালি আর মুসলমান পরিচয় দু’টির মাঝে। আমার মায়ের মত ধর্মভীরু অনেকে খুব নির্বিষ ভাবেই মুসলমান পরিচয়কে বাঙালি পরিচয়ের আগে রাখেন। এভাবে ভাববার অসারতা আমার চোখে প্রকাশ পেয়েছিল উপরে উল্লেখকৃত দ্বিতীয় ঘটনার সময়। শুধু মুসলমান বলেই আমি কোন পাকিস্তানি বা রাজাকারের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে পারবো না। আমার বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয়গুলো কোথায় যেন পীড়া দেয় আমাকে মনের ভেতর। সেই মর্মবেদনা থেকেই আমি জানতে পারি আমার প্রথম পরিচয় কী।
পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বগুলো সাধারণত মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের মানুষ ও ভূমি থেকে বিচ্যুত হবার পর। এই ধারার বিপরীত একজন মানুষের সাথে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল অনেক বছর আগে। আমার প্রবাসে আসবার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন অনেক শ্রদ্ধার নাভেদ ভাই। বিতর্কসংশ্লিষ্ট সবাই তাঁকে এক নামে চেনেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক হিসেবে। ২০০৩ সালের কথা। নাভেদ ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলছি ভর্তির বিভিন্ন খুঁটিনাটি নিয়ে। এমন সময় ইটিভি’তে শুরু হল মাহমুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে বাংলার গান। নাভেদ ভাই বলে উঠলেন, ইশতি একটু ধরো, গানটা শুনে আসি; এই গান শুরু হলে আমি সব ফেলে রেখে একবার গানটা শুনি।
দেশটা ছেড়ে চলে যাবো কিছুদিন পর, এই বাস্তবতা মাথায় তখনই প্রথমবার আঘাত করে। সেই গানটির কারণেই পুরো একটি প্রজন্ম বাংলায় গান গায়, বাংলার গান গায়, বুঝে-শুনে গায়। শুধু আমি নই, কম-বেশি প্রতিটি মানুষেরই জীবন বন্দী হয়ে আছে এই গানের মধ্যে। প্রতুলের অসামান্য মূল গানটির চাইতে অনেকাংশে ভিন্ন হলেও বাবু’র গানটি যেন দাবানলের মত ঘিরে ফেলেছিল সবাইকে। এই গানটি না থাকলে পরিচয়ের যুদ্ধে বাংলা অনেকটাই পিছিয়ে যেত।
বাংলার গানে তাই শুধু জীবন নয়, আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্বই বন্দী।
প্রতুলের কণ্ঠে বাংলার গানঃ
|
মাহমুদুজ্জামান বাবু'র বাংলার গানঃ
ফুয়াদের ঝালমুড়ির কৌটায় বাংলার গানঃ
Ami Banglay Gaan Gai - Laboni - Fuad Featuring
Friday, February 20, 2009
গল্পঃ ৭৫ নম্বর বাড়ি
এক
“এবার থামবি, না কষে দু’ঘা লাগাবো?”
হুমকিতেও নিলয়ের হাসি থামে না। রাগ হয়ে অর্ণব হাঁটা দেয়। নিলয় তাতে কোন বিকার দেখায় না। রাস্তার ধারেই পেট চেপে বসে হাসতে থাকে। খুব ভাল মতই জানে, তাকে ফেলে রেখে বন্ধুটি যাবে না। হলও তাই।
“খবরদার এই বিটকেল হাসি দিবি না। ওঠ এবার। জায়গাটা ভাল না, নয়তো ঠিকই রেখে চলে যেতাম। শালা বদমায়েশ একটা।”
“আমার বোনকে বিয়ে করবি তুই? পুরুত ডাকবো? তুই করলে আমি দুই বালতি গহনা যৌতুক দেবো।” বলেই আবার দমকা হাসিতে লুটিয়ে পড়ে নিলয়।
“ওঠ না রে বাপ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। জায়গাটা ভাল না। কোন মানুষ থাকে না এখানে।” রাগ, লজ্জা, আর অদ্ভুত এক অস্বস্তি ঘিরে ধরছিল যেন অর্ণবকে।
সুযোগ মত পালটা খোঁচা দিতে ছাড়লো না নিলয়। “আমি তো আসার আগেই বলেছিলাম। তখন তো খুব বাজনা বাজাচ্ছিলি।”
অর্ণব বন্ধুর পাশে বসে পড়ে এবার। প্রাইমারি পেরিয়ে সেকেন্ডারিতে উঠেই নিলয়ের সাথে পরিচয়। সেই থেকে এক সাথে থাকা, খাওয়া, খেলা, ঝগড়া। রাতটা শুধু যে যার বাসায় ঘুমাতো। দু’জনেরই একটা করে বোন আছে। ভাই বলতে সাথের এই বন্ধুটি। এতগুলো বছরে মারামারি বাদে এই প্রথম বন্ধুর কাঁছে হাত রাখলো অর্ণব।
“মাফ করে দে রে। সবাই তো এক রকম না। তবু আমরা এত নির্জীব বলেই হয়তো ওরা এত দুঃসাহসী।”
চিরকালের নির্বিকার, নিশ্চিন্ত নিলয় চেনা সুরে ফোড়ন কেটে বললো, “চল সুন্দরী, তোমার মেকআপ তুলতে হবে।”
আজ আর পালটা জবাব না দিয়ে সাথে সাথে হাঁটা দিল অর্ণব। মাথায় ঘুরছিল রমিজের চায়ের দোকানের ঘটনাটা।
দুই
দুই বন্ধু আড্ডা দিতে বসেছিল এখানে।রাস্তার ধারের ছোট্ট দোকানটায় চায়ের কাপ মাত্র দু’টো। ওদের আড্ডার মাঝেই প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক এলেন। আচারে নম্র, ব্যবহারে ভদ্র। ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জেনে খুশি হয়ে দু’চার কথা চলছিল।
ভদ্রলোক চা খাবেন শুনে অর্ণব তার কাপটি দ্রুত শেষ করে এগিয়ে দেয়। কথা-প্রসঙ্গে ওর নাম শুনেই যেন ঘোর কাটলো তাঁর। দোকানদার রমিজ আলিকে বললেন চায়ের বদলে কলা দিতে, এ-বেলা নাকি চায়ের তিয়াশ কম।
কিছুক্ষণ পর নিলয়ের কাপটি খালি হতেই ভদ্রলোক চা নিলেন। অর্ণবের রক্তচক্ষু দেখে সেই যে নিলয়ের হাসি শুরু হল, তা এখনও পর্যন্ত চলছে। পাশাপাশি চলছে অর্ণবের গজরানো, “আনকালচারড যত্তসব। এখনও সতের শ সালে পড়ে আছে। থাবড়া মেরে সোজা করে দেওয়া উচিত এদের।”
এবার নিলয় গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করে, “তাতে লাভ?”
অর্ণব ক্ষিপ্ত স্বরে বলে, “লাভ-ক্ষতি বুঝি না, এদের লাঠি-পেটা করা উচিত।”
“দেহটাকে নাহয় শাস্তি দিলি, কিন্তু তাতে করে কি মনের বিষ আরও ঘন হবে না? দু’ঘা জুতার বাড়ি খেয়ে কি ও হিন্দুর মুখের পানি খেত? এই ক্রোধ কি কোন মুসলমানকে হিন্দু বাড়ির মিষ্টি খাওয়াতে পারবে? আমি আজ এক হাটে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করলেও কি কেউ আমি স্রেফ হিন্দু বলে আমাকে কঞ্জুস ডাকা বন্ধ করবে?”
রাগে ছটফট করতে লাগলো তবু অর্ণব। মনের একটা অংশ বাবা-মায়ের উপর রাগ হচ্ছিল, হিন্দুয়ানি নাম রাখার জন্য। যেন নামটা অর্ণব না হয়ে আব্দুল করিম সওদাগর হলেই এভাবে অপদস্থ হতে হত না। বাস্তবতা থেকে আরও কিছুটা সময় আড়ালে থাকা যেত।
মনের অন্য অংশ সাথে সাথেই শুধরে দিল। পলায়নপর এই মানসিকতাই তো সমস্যা। মনে পড়ে, স্কুলে থাকতে পাঠ্যে পড়েছিল, বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বি। অর্ণব তো চেনে শুধু এক নিলয়কেই। ওর চেনা প্রতি ১০০ জনে বাকি ১৪ জন কোথায়? তারা নেই, নাকি অর্ণবের মত অবস্থানে কেউ নেই? নাকি দু’টাই?
তিন
“চলে যা রে,” ঠান্ডা গলায় বলে অর্ণব, “এখানে থাকার কোন অর্থ নেই।”
মৃদু হেসে নিলয় বলে, “তুইও বললি?”
এবার অর্ণবের অবাক হওয়ার পালা। ফিরতি পথের নীরবতাটা খুব বেশি অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। এ-অবস্থায় বলবার মত কোন কথা নেই, এটুকু জেনেও সজ্ঞানে মুখ খুলেছিল। হয়তো অপরাধবোধ থেকে। যেন নিলয় চলে গেলে সেই বিচ্ছেদই হবে অর্ণবের প্রাপ্য শাস্তি।
নিলয় বলতে শুরু করে নন্দিনীদি’র গল্প। “সেই ঈদের কথা মনে পড়ে? যেবার একটা ছাত্র কোরবানি দিলাম?”
“ফাজলামো করতে হয় কেন সব কিছুতেই? ছাত্র কোরবানি দেব কেন? কোরবানির টাকা জমা করে একজন ছাত্রের পড়ার খরচ যোগানো একটা ভাল কাজ। কত মানুষ এল, কত প্রশংসা করলো সবাই। মনে থাকবে না কেন সেই ঈদের কথা? নন্দিনীদি আর অপর্ণা যেবার সাথে গেল। স্কুলের বার্ষিকীতে অপর্ণা একটা লেখা দিয়েছিল এ-নিয়ে। পরে সেটা পত্রিকায়ও ছাপা হল। ঐ ঈদ ভুলবো কীভাবে?”
“দিদি কাজে ফেরার পর প্রথম প্রশ্ন – ইন্ডিয়া কেমন ঘুরলেন?”
“স্রেফ ঠাট্টা এসব। এগুলো গায়ে মাখলে চলে? কেউ না কেউ তো বলবেই এগুলো।”
“গায়ে না মাখলেও মনে লেগে থাকে কথাগুলো। বারবার বললে কার না খারাপ লাগে? দিদি যখন সেই ঈদের কথা বললো, তখন জবাব এল – জানি, জানি। যান ঠিকই, বলবে না আর কি। সব টাকা-পয়সা তো ঐ পাড়েই পাঠান। ক’বছর পর দেখবো সব বিক্রি করে ওখানেই চলে গেছেন।”
দায়িত্ববোধ খুব বিলম্বিত অনুভূতি। কিছু না হারালে কিংবা কোন ভয় মনে না ঠুকলে দায়িত্বের পরিচয় দেওয়া খুব দুষ্কর। অর্ণবের মনে যেন সেই বন্ধ দরজাই খুলে গেল অবশেষে। পরিপার্শ্ব বিচারে অনেক দিন আগেই করা উচিত ছিল, এমন একটি প্রশ্ন অবশেষে বেরিয়ে এল। “আর কী কী বলিস নি তুই আমাকে?”
বন্ধুর এই অনভ্যস্ততা টের পেতে নিলয়ের সময় লাগলো না। বিব্রত বন্ধুকে স্বাভাবিক করার জন্য কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলো, কাজ হল না।
“গেল বছর বাসায় একটা নতুন সেলাই মেশিন এসেছে, দেখেছিস?”
“হ্যাঁ, কাকীমা যেটা দিয়ে আমার জন্য জামা বানিয়ে দিলেন একটা।”
“ওটা ঋণের টাকায় কেনা ছিল। সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প থেকে দেওয়া ঋণ। প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল ওরা একটা। দ্রুততম সময়ে শ্রেষ্ঠ সদ্ব্যাবহারের জন্য পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল।”
“কথা ছিল মানে?”
“মা টাকা ফেরত দিয়েছিল সবার আগে। লাভও হয়েছিল বেশ ভালই। প্রথম পুরস্কার জিতেছিল। পুরস্কার ঘোষনার ক’দিন আগে জানলাম যে অনুষ্ঠানে আমাদের যেতে হবে না।”
“এটা কেমন কথা? যাবি না কেন? পুরস্কার কে নেবে তাহলে?”
“পুরস্কারের খাতা থেকে মা’র নাম কেটে দেওয়া হয়েছিল, তাই।”
“নাম কাটলো কেন? এমপি’র কোন আত্মীয়কে দেওয়ার জন্য?”
“হিন্দু, তাই। জিজ্ঞেস করেছিলাম। বললো এত বড় আয়োজনের প্রথম পুরস্কারে একটা হিন্দু নাম কেমন দেখায়, তাই বাদ। আগামী বার কষ্ট করে আবেদনপত্র জমা দিতেও মানা করলো।”
“অভিযোগ করিস নি কেন?”
বাঁকা হাসি হেসে নিলয় পালটা প্রশ্ন করলো, “যে-অন্যায় চোখের সামনে ঘটবার সময় কেউ থামায় না, সে-অন্যায়ের প্রকাশ্য প্রতিবাদ করে সেই কষ্ট দ্বিতীয়বার অনুভব করার অর্থ কী? মুখের পানি খেলে ধর্ম যায়, কিন্তু ইলেকশনের পর ঠাপানোর সময় ধর্ম যায় না।”
আবারও অস্বস্তিকর সেই নীরবতা নেমে এল দুই বন্ধুর মাঝে। এবার আর অর্ণব জোর করে কোন কথোপকথন শুরুর চেষ্টা করলো না।
চার
দুই বন্ধু বাসার মোড়ে আসতেই দেখলো নন্দিনী দি রিক্সা থেকে নামছে। বন্ধুর বড় বোন হলেও দিদি অর্ণব-অপর্ণার কাছে সহোদরের চেয়েও আপন। অর্ণবের মা স্কুলের পর দেরি করে বাড়ি ফেরা পছন্দ করতেন না। কোন খেলা বা অনুষ্ঠান থাকলে দিদি সাথে করে বাসায় দিয়ে আসতো, যাতে অর্ণবকে বকা খেতে না হয়। দিদি না থাকলে অপর্ণার স্কুল থেকে বনভোজনে যাওয়া হত না কোনদিন। সংকোচের বয়সে কথা বলার জন্য দিদি না থাকলে জীবনের নোংরা নতুনত্বের ধাক্কাটা হয়তো অনেক জোরে লাগতো ওদের দু’ভাইবোনের গায়ে।
যে-মানুষটার গন্ধ দু’মাইল দূর থেকেও চিনতে পারতো, আজ সেই মানুষটাকেই যেন অনেক অচেনা লাগছিল। হয়তো সে-কুণ্ঠা অজান্তেই অভিব্যক্তি পেয়ে গিয়েছিল। দুই ভাইকে দু’হাতে কাছে টেনে নন্দিনী প্রশ্ন করলো, “কী রে, আজ এত গোমরা কেন? আবার ঝগড়া করেছিস?”
“নাহ, ঝগড়া হয়নি। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। আজকে ধকলটা একটু বেশি গেছে।”
অর্ণবের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে নন্দিনী বললো, “ঘরে আয়, সরবত বানিয়ে দেই।”
“আজ থাক, আরেকদিন খাবো। আজ বিকেলটা মাকে সময় দেওয়ার কথা। ঘরের কিছু কাজ আছে।”
অস্বস্তি এড়াতে দিদিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাঁটা শুরু করলো অর্ণব। নেবার ভাগী হওয়ার সময় পুরোটাই নিয়েছে, দেবার বেলায় পারলো না। ঘটনাগুলো আগে জানলে কিছু করতে পারতো কিনা সে-প্রশ্ন অবান্তর। অজ্ঞানতার জন্য আদৌ নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিল না অর্ণব।
দৃশ্যত বিব্রত বন্ধুকে সঙ্গ দিতে নিলয় গেট পর্যন্ত এগিয়ে এল। “এসব মাথায় নিস না। সমাজ কখনও এক ধাক্কায় বদলায় না। সংশয় আর সংকীর্ণতাগুলো রাতারাতি আসেনি, রাতারাতি যাবেও না। নিজের জায়গায় ভাল থাক, সময়েই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“হবে না রে। সময় তো কম গেল না। এতগুলো বছরেও অবিশ্বাসগুলো ঝেড়ে ফেলতে পারিনি আমরা। এটা তো স্পষ্ট যে এই নিষ্ক্রিয়তা কাজে আসছে না। সরব হতে হবে, এদের মুখোমুখি হতে হবে। নইলে…”
মাঝপথে থামিয়ে দিল নিলয়। “কাগুজে বিপ্লব বাদ দিয়ে বাড়ি যা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এ-নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আমি যাই দিদির সাথে আড্ডা মারি গিয়ে।”
“তোরা দিদির ব্যাংকের কাছাকাছি কোথাও বাসা ভাড়া নিস না কেন? দিন দু’বার দিদিকে এতটা পথ আসা-যাওয়া দিতে হয় না তাহলে। ওদিকে একটা বাসার কথা বলেছিলাম তোকে। ঐ যে, ৭৫ নম্বর বাড়িটা। যাব-যাচ্ছি আর খোঁজ নিলি না তো তুই আলসেমি করে।”
“খোঁজ অনেক আগেই নিয়েছি। ভাড়া দেবে না।”
“ভাড়া দেবে না কে বললো? আমি তো গতকালও টু-লেট লেখা সাইন ঝুলতে দেখলাম।”
জবাবে নিলয় শুধু মুচকি হাসে।
“এবার থামবি, না কষে দু’ঘা লাগাবো?”
হুমকিতেও নিলয়ের হাসি থামে না। রাগ হয়ে অর্ণব হাঁটা দেয়। নিলয় তাতে কোন বিকার দেখায় না। রাস্তার ধারেই পেট চেপে বসে হাসতে থাকে। খুব ভাল মতই জানে, তাকে ফেলে রেখে বন্ধুটি যাবে না। হলও তাই।
“খবরদার এই বিটকেল হাসি দিবি না। ওঠ এবার। জায়গাটা ভাল না, নয়তো ঠিকই রেখে চলে যেতাম। শালা বদমায়েশ একটা।”
“আমার বোনকে বিয়ে করবি তুই? পুরুত ডাকবো? তুই করলে আমি দুই বালতি গহনা যৌতুক দেবো।” বলেই আবার দমকা হাসিতে লুটিয়ে পড়ে নিলয়।
“ওঠ না রে বাপ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। জায়গাটা ভাল না। কোন মানুষ থাকে না এখানে।” রাগ, লজ্জা, আর অদ্ভুত এক অস্বস্তি ঘিরে ধরছিল যেন অর্ণবকে।
সুযোগ মত পালটা খোঁচা দিতে ছাড়লো না নিলয়। “আমি তো আসার আগেই বলেছিলাম। তখন তো খুব বাজনা বাজাচ্ছিলি।”
অর্ণব বন্ধুর পাশে বসে পড়ে এবার। প্রাইমারি পেরিয়ে সেকেন্ডারিতে উঠেই নিলয়ের সাথে পরিচয়। সেই থেকে এক সাথে থাকা, খাওয়া, খেলা, ঝগড়া। রাতটা শুধু যে যার বাসায় ঘুমাতো। দু’জনেরই একটা করে বোন আছে। ভাই বলতে সাথের এই বন্ধুটি। এতগুলো বছরে মারামারি বাদে এই প্রথম বন্ধুর কাঁছে হাত রাখলো অর্ণব।
“মাফ করে দে রে। সবাই তো এক রকম না। তবু আমরা এত নির্জীব বলেই হয়তো ওরা এত দুঃসাহসী।”
চিরকালের নির্বিকার, নিশ্চিন্ত নিলয় চেনা সুরে ফোড়ন কেটে বললো, “চল সুন্দরী, তোমার মেকআপ তুলতে হবে।”
আজ আর পালটা জবাব না দিয়ে সাথে সাথে হাঁটা দিল অর্ণব। মাথায় ঘুরছিল রমিজের চায়ের দোকানের ঘটনাটা।
দুই
দুই বন্ধু আড্ডা দিতে বসেছিল এখানে।রাস্তার ধারের ছোট্ট দোকানটায় চায়ের কাপ মাত্র দু’টো। ওদের আড্ডার মাঝেই প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক এলেন। আচারে নম্র, ব্যবহারে ভদ্র। ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জেনে খুশি হয়ে দু’চার কথা চলছিল।
ভদ্রলোক চা খাবেন শুনে অর্ণব তার কাপটি দ্রুত শেষ করে এগিয়ে দেয়। কথা-প্রসঙ্গে ওর নাম শুনেই যেন ঘোর কাটলো তাঁর। দোকানদার রমিজ আলিকে বললেন চায়ের বদলে কলা দিতে, এ-বেলা নাকি চায়ের তিয়াশ কম।
কিছুক্ষণ পর নিলয়ের কাপটি খালি হতেই ভদ্রলোক চা নিলেন। অর্ণবের রক্তচক্ষু দেখে সেই যে নিলয়ের হাসি শুরু হল, তা এখনও পর্যন্ত চলছে। পাশাপাশি চলছে অর্ণবের গজরানো, “আনকালচারড যত্তসব। এখনও সতের শ সালে পড়ে আছে। থাবড়া মেরে সোজা করে দেওয়া উচিত এদের।”
এবার নিলয় গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করে, “তাতে লাভ?”
অর্ণব ক্ষিপ্ত স্বরে বলে, “লাভ-ক্ষতি বুঝি না, এদের লাঠি-পেটা করা উচিত।”
“দেহটাকে নাহয় শাস্তি দিলি, কিন্তু তাতে করে কি মনের বিষ আরও ঘন হবে না? দু’ঘা জুতার বাড়ি খেয়ে কি ও হিন্দুর মুখের পানি খেত? এই ক্রোধ কি কোন মুসলমানকে হিন্দু বাড়ির মিষ্টি খাওয়াতে পারবে? আমি আজ এক হাটে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করলেও কি কেউ আমি স্রেফ হিন্দু বলে আমাকে কঞ্জুস ডাকা বন্ধ করবে?”
রাগে ছটফট করতে লাগলো তবু অর্ণব। মনের একটা অংশ বাবা-মায়ের উপর রাগ হচ্ছিল, হিন্দুয়ানি নাম রাখার জন্য। যেন নামটা অর্ণব না হয়ে আব্দুল করিম সওদাগর হলেই এভাবে অপদস্থ হতে হত না। বাস্তবতা থেকে আরও কিছুটা সময় আড়ালে থাকা যেত।
মনের অন্য অংশ সাথে সাথেই শুধরে দিল। পলায়নপর এই মানসিকতাই তো সমস্যা। মনে পড়ে, স্কুলে থাকতে পাঠ্যে পড়েছিল, বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বি। অর্ণব তো চেনে শুধু এক নিলয়কেই। ওর চেনা প্রতি ১০০ জনে বাকি ১৪ জন কোথায়? তারা নেই, নাকি অর্ণবের মত অবস্থানে কেউ নেই? নাকি দু’টাই?
তিন
“চলে যা রে,” ঠান্ডা গলায় বলে অর্ণব, “এখানে থাকার কোন অর্থ নেই।”
মৃদু হেসে নিলয় বলে, “তুইও বললি?”
এবার অর্ণবের অবাক হওয়ার পালা। ফিরতি পথের নীরবতাটা খুব বেশি অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। এ-অবস্থায় বলবার মত কোন কথা নেই, এটুকু জেনেও সজ্ঞানে মুখ খুলেছিল। হয়তো অপরাধবোধ থেকে। যেন নিলয় চলে গেলে সেই বিচ্ছেদই হবে অর্ণবের প্রাপ্য শাস্তি।
নিলয় বলতে শুরু করে নন্দিনীদি’র গল্প। “সেই ঈদের কথা মনে পড়ে? যেবার একটা ছাত্র কোরবানি দিলাম?”
“ফাজলামো করতে হয় কেন সব কিছুতেই? ছাত্র কোরবানি দেব কেন? কোরবানির টাকা জমা করে একজন ছাত্রের পড়ার খরচ যোগানো একটা ভাল কাজ। কত মানুষ এল, কত প্রশংসা করলো সবাই। মনে থাকবে না কেন সেই ঈদের কথা? নন্দিনীদি আর অপর্ণা যেবার সাথে গেল। স্কুলের বার্ষিকীতে অপর্ণা একটা লেখা দিয়েছিল এ-নিয়ে। পরে সেটা পত্রিকায়ও ছাপা হল। ঐ ঈদ ভুলবো কীভাবে?”
“দিদি কাজে ফেরার পর প্রথম প্রশ্ন – ইন্ডিয়া কেমন ঘুরলেন?”
“স্রেফ ঠাট্টা এসব। এগুলো গায়ে মাখলে চলে? কেউ না কেউ তো বলবেই এগুলো।”
“গায়ে না মাখলেও মনে লেগে থাকে কথাগুলো। বারবার বললে কার না খারাপ লাগে? দিদি যখন সেই ঈদের কথা বললো, তখন জবাব এল – জানি, জানি। যান ঠিকই, বলবে না আর কি। সব টাকা-পয়সা তো ঐ পাড়েই পাঠান। ক’বছর পর দেখবো সব বিক্রি করে ওখানেই চলে গেছেন।”
দায়িত্ববোধ খুব বিলম্বিত অনুভূতি। কিছু না হারালে কিংবা কোন ভয় মনে না ঠুকলে দায়িত্বের পরিচয় দেওয়া খুব দুষ্কর। অর্ণবের মনে যেন সেই বন্ধ দরজাই খুলে গেল অবশেষে। পরিপার্শ্ব বিচারে অনেক দিন আগেই করা উচিত ছিল, এমন একটি প্রশ্ন অবশেষে বেরিয়ে এল। “আর কী কী বলিস নি তুই আমাকে?”
বন্ধুর এই অনভ্যস্ততা টের পেতে নিলয়ের সময় লাগলো না। বিব্রত বন্ধুকে স্বাভাবিক করার জন্য কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলো, কাজ হল না।
“গেল বছর বাসায় একটা নতুন সেলাই মেশিন এসেছে, দেখেছিস?”
“হ্যাঁ, কাকীমা যেটা দিয়ে আমার জন্য জামা বানিয়ে দিলেন একটা।”
“ওটা ঋণের টাকায় কেনা ছিল। সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প থেকে দেওয়া ঋণ। প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল ওরা একটা। দ্রুততম সময়ে শ্রেষ্ঠ সদ্ব্যাবহারের জন্য পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল।”
“কথা ছিল মানে?”
“মা টাকা ফেরত দিয়েছিল সবার আগে। লাভও হয়েছিল বেশ ভালই। প্রথম পুরস্কার জিতেছিল। পুরস্কার ঘোষনার ক’দিন আগে জানলাম যে অনুষ্ঠানে আমাদের যেতে হবে না।”
“এটা কেমন কথা? যাবি না কেন? পুরস্কার কে নেবে তাহলে?”
“পুরস্কারের খাতা থেকে মা’র নাম কেটে দেওয়া হয়েছিল, তাই।”
“নাম কাটলো কেন? এমপি’র কোন আত্মীয়কে দেওয়ার জন্য?”
“হিন্দু, তাই। জিজ্ঞেস করেছিলাম। বললো এত বড় আয়োজনের প্রথম পুরস্কারে একটা হিন্দু নাম কেমন দেখায়, তাই বাদ। আগামী বার কষ্ট করে আবেদনপত্র জমা দিতেও মানা করলো।”
“অভিযোগ করিস নি কেন?”
বাঁকা হাসি হেসে নিলয় পালটা প্রশ্ন করলো, “যে-অন্যায় চোখের সামনে ঘটবার সময় কেউ থামায় না, সে-অন্যায়ের প্রকাশ্য প্রতিবাদ করে সেই কষ্ট দ্বিতীয়বার অনুভব করার অর্থ কী? মুখের পানি খেলে ধর্ম যায়, কিন্তু ইলেকশনের পর ঠাপানোর সময় ধর্ম যায় না।”
আবারও অস্বস্তিকর সেই নীরবতা নেমে এল দুই বন্ধুর মাঝে। এবার আর অর্ণব জোর করে কোন কথোপকথন শুরুর চেষ্টা করলো না।
চার
দুই বন্ধু বাসার মোড়ে আসতেই দেখলো নন্দিনী দি রিক্সা থেকে নামছে। বন্ধুর বড় বোন হলেও দিদি অর্ণব-অপর্ণার কাছে সহোদরের চেয়েও আপন। অর্ণবের মা স্কুলের পর দেরি করে বাড়ি ফেরা পছন্দ করতেন না। কোন খেলা বা অনুষ্ঠান থাকলে দিদি সাথে করে বাসায় দিয়ে আসতো, যাতে অর্ণবকে বকা খেতে না হয়। দিদি না থাকলে অপর্ণার স্কুল থেকে বনভোজনে যাওয়া হত না কোনদিন। সংকোচের বয়সে কথা বলার জন্য দিদি না থাকলে জীবনের নোংরা নতুনত্বের ধাক্কাটা হয়তো অনেক জোরে লাগতো ওদের দু’ভাইবোনের গায়ে।
যে-মানুষটার গন্ধ দু’মাইল দূর থেকেও চিনতে পারতো, আজ সেই মানুষটাকেই যেন অনেক অচেনা লাগছিল। হয়তো সে-কুণ্ঠা অজান্তেই অভিব্যক্তি পেয়ে গিয়েছিল। দুই ভাইকে দু’হাতে কাছে টেনে নন্দিনী প্রশ্ন করলো, “কী রে, আজ এত গোমরা কেন? আবার ঝগড়া করেছিস?”
“নাহ, ঝগড়া হয়নি। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। আজকে ধকলটা একটু বেশি গেছে।”
অর্ণবের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে নন্দিনী বললো, “ঘরে আয়, সরবত বানিয়ে দেই।”
“আজ থাক, আরেকদিন খাবো। আজ বিকেলটা মাকে সময় দেওয়ার কথা। ঘরের কিছু কাজ আছে।”
অস্বস্তি এড়াতে দিদিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাঁটা শুরু করলো অর্ণব। নেবার ভাগী হওয়ার সময় পুরোটাই নিয়েছে, দেবার বেলায় পারলো না। ঘটনাগুলো আগে জানলে কিছু করতে পারতো কিনা সে-প্রশ্ন অবান্তর। অজ্ঞানতার জন্য আদৌ নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিল না অর্ণব।
দৃশ্যত বিব্রত বন্ধুকে সঙ্গ দিতে নিলয় গেট পর্যন্ত এগিয়ে এল। “এসব মাথায় নিস না। সমাজ কখনও এক ধাক্কায় বদলায় না। সংশয় আর সংকীর্ণতাগুলো রাতারাতি আসেনি, রাতারাতি যাবেও না। নিজের জায়গায় ভাল থাক, সময়েই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“হবে না রে। সময় তো কম গেল না। এতগুলো বছরেও অবিশ্বাসগুলো ঝেড়ে ফেলতে পারিনি আমরা। এটা তো স্পষ্ট যে এই নিষ্ক্রিয়তা কাজে আসছে না। সরব হতে হবে, এদের মুখোমুখি হতে হবে। নইলে…”
মাঝপথে থামিয়ে দিল নিলয়। “কাগুজে বিপ্লব বাদ দিয়ে বাড়ি যা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এ-নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আমি যাই দিদির সাথে আড্ডা মারি গিয়ে।”
“তোরা দিদির ব্যাংকের কাছাকাছি কোথাও বাসা ভাড়া নিস না কেন? দিন দু’বার দিদিকে এতটা পথ আসা-যাওয়া দিতে হয় না তাহলে। ওদিকে একটা বাসার কথা বলেছিলাম তোকে। ঐ যে, ৭৫ নম্বর বাড়িটা। যাব-যাচ্ছি আর খোঁজ নিলি না তো তুই আলসেমি করে।”
“খোঁজ অনেক আগেই নিয়েছি। ভাড়া দেবে না।”
“ভাড়া দেবে না কে বললো? আমি তো গতকালও টু-লেট লেখা সাইন ঝুলতে দেখলাম।”
জবাবে নিলয় শুধু মুচকি হাসে।
Subscribe to:
Posts (Atom)