Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts
Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts

Tuesday, August 04, 2009

ডিজিটাল বাংলাদেশঃ ২ [জাতীয় পরিচয়পত্র]


জাতীয় পরিচয়পত্র ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট

ভাবতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্য যে ডিজিটাল দেশ গড়ার প্রথম শর্ত হলো প্রতিটি নাগরিককে একটি নম্বরে বন্দী করা। দ্বিতীয় কাজ হলো এই নম্বরটিকে যথাসম্ভব নিরাপদ করা। তৃতীয় কাজ হলো প্রতিটি নম্বরের মালিককে যথাসম্ভব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া। বহু বছরের চেষ্টা শেষে গত নির্বাচনের আগে এই প্রথম ধাপটি অতিক্রম করলো বাংলাদেশ। রাজা থেকে উজির পর্যন্ত প্রত্যেকেরই একটি পরিচয়পত্র আছে। এতে ছবি আছে, আছে শনাক্তকরণের জন্য কিছু তথ্য। এই নম্বর বর্তমানে পাসপোর্ট থেকে নির্বাচন পর্যন্ত সর্বত্র ব্যবহার হচ্ছে।

দুর্বৃত্তের কবল থেকে বর্তমান ধাঁচের পরিচয়পত্র খুব বেশিদিন নিরাপদ রাখা যাবে না। পৃথিবীময় তাই অনেক রকম প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এই নম্বর বা পরিচয়পত্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। দিন দিন যুক্ত হচ্ছে অনেক রকম ইলেকট্রনিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম। যে-দেশে গলাকাটা পাসপোর্টের প্রতুলতাই রোধ করার উপায় নেই, সে-দেশে স্রেফ ছবি দেখে শনাক্তকরণের উপর ভরসা রাখা দুষ্কর।

পরিচয়পত্র নিরীক্ষার বর্তমান পদ্ধতি শুধুমাত্র ছবি মিলিয়ে দেখা। সরকারের কাছে একটি ছবি থাকে, আর ব্যবহারকারীর কাছে থাকে কার্ড। চোখের দেখায় ছবি মিলিয়ে রহিমকে রহিম বলে শনাক্ত করা হয়, করিমকে করিম বলে। এক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রধানত দু’রকম হতে পারে।

যেখানে কেন্দ্রীয় ভাবে সংরক্ষিত ছবির সাথে মিলিয়ে দেখা হয় – যেমন নির্বাচন কমিশন – সেখানে রহিমের মূল ছবিটি বদলে করিমের একটি ছবি রেখে দেওয়া দুষ্কর কিছু নয়। এরপর রহিমের অজান্তেই তার পরিচয়ে জীবন চালাতে পারে করিম।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো নিজের ছবি তুলে একটি পরিচয়পত্র তৈরি করে ফেলা। এটি ব্যবহার হতে পারে এমন স্থানে যেখানে ছবি ব্যবহার হলেও কেন্দ্রীয় ভাবে সংরক্ষিত ছবির সাথে মিলিয়ে দেখা হয় না – যেমন, বাজার-ঘাটে পরিচয় দেওয়া, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সময় পরিচয়পত্র দেখানো, ইত্যাদি।

এই দুর্বলতা নিরসনে ভবিষ্যতে এমন কার্ড দরকার যা তার চুম্বক-স্মৃতিতে কিছু মৌলিক তথ্য সংরক্ষণ করবে। এটি হতে হবে এমন তথ্য যা শুধু সেই পরিচয়পত্রের প্রকৃত মালিক জানবেন। ধরা যাক রহিম ও করিমের একজনের গুপ্ত সংকেত ১২৩, অন্য জনের ৪৫৬। শুধু এটুকু তথ্য থাকলে তা খুব সহজেই জেনে যাওয়া সম্ভব। প্রয়োজন তাই আরেকটু কঠিন কিছু।

একটি পদ্ধতি হলো কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত ছবির সাথে স্বয়ংক্রিয় ভাবে মিলিয়ে নেওয়া। একটি স্ট্যাম্প-সাইজ ছবিতে প্রায় ৮০৪ পিক্সেল পরিমাণ তথ্য থাকে। এই পরিমাণ তথ্য ও আনুষাঙ্গিক প্রক্রিয়াকরণ দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে কেন্দ্রীয় ভাবে যাচাই করার প্রয়াস সুতার উপর ট্রাক চালানোর মতো ব্যাপার। তুলনায় অনেক কার্যকর পদ্ধতি হলো আঙ্গুলের ছাপ মিলিয়ে নেওয়া। এটি বর্তমানে বহুল-ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর একটি।

প্রতিটি মানুষের হাতের ছাপ ভিন্ন। এমনকি যমজ ভাই-বোনের হাতের ছাপও ভিন্ন হয়। এটি প্রতিটি মানুষেরই আছে, এবং এটি কোন পাসওয়ার্ডের মতো কষ্ট করে মুখস্তও রাখতে হবে না। কম্পিউটারে এই ভিন্নতাকে ধারণ করা হয় কো-অর্ডিনেট সিস্টেমের মাধ্যমে। পাঠক নিজের ডান হাতের তর্জনীর দিকে তাকালে দেখবেন, কোনো কোনো স্থানে হাতের দাগগুলো ভাগ হয়ে গেছে কাটা চামচের মতো (ফর্ক), কোথাও কোথাও দাগের সমাপ্তি ঘটেছে (টারমিনেশন), আর কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে পাহাড়চূড়া (মিনুশা পয়েন্ট)। মূলত এই তিনটি বিশেষত্বের অবস্থান দিয়েই গঠিত হয় একজন মানুষের ‘পরিচয়’।

এই তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি সাধারণ মেট্রিক্স যথেষ্ট। প্রান্তিক ভাবে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় সার্ভারেও নামের বিপরীতে একটি হাতের ছাপ সংরক্ষণ করা সহজতর। কেন্দ্র ও প্রান্ত উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহার করে পদ্ধতিটি শক্তিশালী করা সম্ভব। এই সামগ্রিক পরিবর্তন কোন ভাবেই তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াটি প্রভাবিত করবে না। পক্ষান্তরে, একটি ছবি কেন্দ্রীয় ভাবে যাচাই করার জন্য অনেক বেশি পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান করতে হয়। সাথে রয়েছে চেহারার বিভিন্ন অংশ খুঁজে বের করা, সেগুলোর আইগেন ভ্যালু নেওয়া, ইত্যাদি জটিলতা।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, যান্ত্রিক ভাবে যাচাইকৃত ছবির ব্যর্থতার হার ২০ থেকে ৪০ ভাগ। তুলনায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করলে ব্যর্থতার হার কমে ২.৫% -এ নেমে আসে। এখনও পর্যন্ত জানা পদ্ধতির মধ্যে শুধুমাত্র ডিএনএ পরীক্ষা করেই এর চেয়ে সফল ভাবে পরিচয় যাচাই করা সম্ভব।

খুব সহসা না হলেও ২০২১ নাগাদ এই পদ্ধতি খুব সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব বাংলাদেশে। জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির প্রাথমিক ধাপেই এ-ধরনের দিক-নির্দেশনা দেওয়া থাকলে সকল নাগরিকের হাতের ছাপ সংরক্ষিত থাকবে, যা ভবিষ্যতে অপরাধ দমনেও সাহায্য করবে ব্যাপক ভাবে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ক্রেডিট কার্ড কিংবা পাসওয়ার্ডের ধারণার সাথে পরিচিত নয়। ব্যবহারকারীকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে শনাক্ত করা তাই অনেক দুষ্কর। ফিঙ্গারপ্রিন্ট-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহারের অন্যতম সুবিধা হলো নিরক্ষর মানুষের প্রতিও এটি প্রযুক্তিবান্ধব। যুগ যুগ ধরে চলে আসা টিপসই প্রথার সাথে সবাই পরিচিত। স্রেফ আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে মানুষকে শনাক্ত করা গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিভিন্ন রকম সুযোগসুবিধা দেওয়া সহজ হবে। নিরক্ষর কেউও খুব সহজে নিজের চাহিদার কথা জানাতে পারবেন।

প্রযুক্তির সুফল প্রান্তিক নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে তিনটি ধাপ প্রয়োজন – পরিচয়, শনাক্তকরণ, এবং সেবা। সেবা খাত আগে থেকেই আছে, তবে তা মূলত শহরকেন্দ্রিক। পরিচয় তৈরি করা হচ্ছে নির্বাচনের প্রয়োজনে। শনাক্তকরণের সেতুটি গড়ে দিলেই মানুষ সহজে বিদ্যমান সেবা পেতে পারে। তবে এর সবচেয়ে বড় সুফল হলো ভোক্তাকে চেনার সুবিধা, তাঁর (অনেক ক্ষেত্রেই সহজ ও সীমিত) চাহিদা সম্পর্কে অবগত হওয়া। এই সুফল পেলে সেবা খাতও অনেক এগিয়ে যাবে।

উদাহরণ হিসেবে সদ্য পাশ করা একজন কম্পিউটার/তড়িৎকৌশল প্রকৌশলীর দিকে তাকানো যায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় এই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ভবিষ্যৎ বলতে আছে বিদেশে চলে যাওয়া, মোবাইল কোম্পানিতে কাজ (এবং পাশাপাশি আইবিএ-তে এমবিএ) করা, নয়তো হাতে-গোনা কিছু আউটসোর্সিং কোম্পানিতে যোগ দিয়ে টুকটাক প্রোগ্রামিং করা। এঁদের যোগ্যতা ও সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু এঁদের কাছে চাহিদা এটুকুই। এঁদের মাঝে মুষ্টিমেয় ক’জন মেটাচ্ছেন খুব উঁচু পর্যায়ের ভোক্তা/ক্রেতার দুরূহ কিছু চাহিদা। যদি এঁদের সবার কাছে কৃষক-মজুর-মুটেদের চাহিদা পৌঁছে দেওয়ার একটি পথ খুলে দেওয়া যায়, তবে তাঁরা খুব সহজেই তা পূরণ করতে পারেন। প্রকৌশলী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সবাইই তখন উচ্চতর অবস্থান অর্জন করবেন। এভাবেই প্রথমত ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে একটি বিশ্বস্ত শনাক্তকরণ পদ্ধতি তৈরি করা যায়, এবং তা বিবিধ ভাবে কাজে লাগিয়ে আধুনিকায়ন করা যায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ-ধরনের বায়োমেট্রিক তথ্যসমৃদ্ধ চিপ ব্যবহার করেই ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট তৈরি হয়। এই আধুনিক পাসপোর্টে একটি ডিজিটাল ছবি জুড়ে দেওয়া হয়। আগামী কিছু বছরের মধ্যে উন্নত বিশ্বে যাতায়াতের জন্য ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট আবশ্যক হতে যাচ্ছে। অতএব, কোনো না কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশের অনেক মানুষকেই নতুন করে পাসপোর্ট গ্রহণ করতে হবে। দেশব্যাপী কোনো প্রকল্প হাতে না নিলেও অন্তত এই নতুন পাসপোর্ট ইস্যুর সময় নিজস্ব একটি বায়োমেট্রিক ডেটাবেজ তৈরির দিকে নজর দেওয়া উচিত। অতঃপর সীমিত পরিসরে হলেও এর ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। এভাবেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে কিছু বছরের মধ্যে একটি ব্যাপক তথ্যভাণ্ডার গড়ে উঠবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশঃ ১ [ভিশন ২০২১]


ভিশন ২০২১

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রত্যাশা পূরণের কথা উঠলে দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশিত এই চমকের কথাই জোর দিয়ে বলছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। ইশতেহারে পরিবেশিত 'ভিশন ২০২১'-এ লিপিবদ্ধ কথাগুলো বাংলাদেশকে কতটুকু "ডিজিটাল" করতে পারবে, এবং সত্যিকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা সময়েরই দাবি।

বহুল প্রচারিত এই ‘ভিশন ২০২১’ এর ব্যাপারে ইশতেহারে (বাংলায় আছে, ইংরেজিতে নেই) মাত্র সাত লাইনে যা বলা আছে, তার নির্যাস হলোঃ

১. প্রতিভাবান তরুণ ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে সফটওয়্যার শিল্প ও আইটি সার্ভিসের বিকাশ সাধন করা হবে,
২. ২০১৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে এবং ২০২১ সালে প্রাথমিক স্তরে আইটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে,
তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক টাস্কফোর্স সক্রিয় ও কার্যকর করা হবে,
৩. বিভিন্ন স্থানে হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইসিটি ইনক্যুবেটর, এবং কম্পিউটার ভিলেজ স্থাপন করা হবে।

খুব একটা বিস্তারিত কিছু নয়, বলা বাহুল্য। এই গোটা পঞ্চাশেক শব্দ বারংবার উচ্চারিত হচ্ছে আগামী দিনে দেশ গড়ার মূল লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে, মানুষও তাতেই বিশ্বাস স্থাপন করছে। যাঁরা ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে আরেকটু সবিস্তারে স্বপ্ন দেখতে চান, তাঁদের জন্য কিছু চিন্তার-খোরাক যোগানো যাক।

উন্নয়নের জন্য প্রকৌশল

উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার দু’টি পথ আছে।

একটি পথটি অনুকরণ-ভিত্তিক। অন্যের যা আছে, তা আমারও চাই।

ভারতের অজস্র লোকাল ট্রেন আছে, আমাদেরও চাই। জাপান বা ইউরোপে বুলেট ট্রেন আছে, আমাদেরও চাই। নিউ ইউর্ক বা লন্ডনের মতো মেট্রোপলিটন শহরে পাতাল রেল আছে, আমাদেরও চাই। ব্রাজিলের সাও পাওলোতে পাতাল রেল না থাকলেও অনেক অনেক বাস এবং তার জন্য আলাদা লেন আছে, আমাদেরও এমন ‘ট্রেন অফ বাসেস’ চাই। উন্নত বিশ্বে ক্রেডিট কার্ড আছে, আমাদেরও এমন ‘প্লাস্টিক মানি’ চাই। আমেরিকার ডিজিটাল পাসপোর্ট আছে, আমাদেরও চাই। সিঙ্গাপুর বা ওয়াশিংটন ডিসি’র প্রতিটি কোণে ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা আছে, আমাদের চাই। বাকি পৃথিবীর হাইস্পিড ইন্টারনেট আছে, আমাদেরও চাই। এমনি অনেক অনেক ব্যাপার।

চোখ-কান খোলা রেখে চললে এমন অনেক কিছুই দেখা-জানা যায় প্রবাস থেকে। এ-ধরনের কিছু চাহিদার একটি সংকলন তৈরি কষ্টের কিছু নয়। তুলনায় অনেক কঠিন হলো এর পেছনের কারিগরী অবকাঠামো দাঁড় করানো। সদিচ্ছা থাকলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর প্রযুক্তি কেনাবেচা করে এই ঘাটতির অনেকটাই খুব সহজে পূরণ সম্ভব।

দ্বিতীয় পথটি একটু কঠিন। মুখস্ত বা চোথামারা পদ্ধতি দিয়ে এই পথে সমাধান মেলে না। এর জন্য দরকার নিজের দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার, দেশজ মেধা ও শ্রম কাজে লাগানো, দেশের কথা মনে রেখে দেশের মতো করে তৈরি প্রকল্প হাতে নেওয়া।

এ-ধরনের পরিকল্পণা হাতে নেওয়ার আগে অনেক চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন, দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সব রকম মানবসম্পদের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। জোট সরকারের পাঁচ বছর ধরে সবাই ব্যস্ত ছিল প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নিয়ে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলোরই কোন অস্তিত্ব ছিল না। ফলাফল, ক্ষমতার ব্যপ্তি থাকলেও পরিকল্পনার গভীরতা নেই।

সর্বশেষ নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয়ের পর অনেক বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই দাবিগুলোর মধ্যে নৈমিত্তিক কাজে প্রশাসনিক দুর্নীতি কমানো ছাড়া তেমন বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই নিরাশার অন্যতম কারণ হলো, আমাদের বৌদ্ধিক পরিকল্পনাগুলো এটুকুতেই সীমিত। আজও আমরা চুরি এবং দুর্নীতিকে সমার্থক বলে জানি।

যতদিন না ডিজিটাল বাংলাদেশের চাহিদাটুকু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসছে, ততদিন এর জন্য সত্যিকার কাজ হবে না। সে-উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্পগুলোর পেছনের কারিগরী শৈলী যথাসম্ভব সহজভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই প্রয়াসের লক্ষ্য একটাই – সাধারণ মানুষ প্রযুক্তিবিদের মতো ভাবতে শিখুক। তার এই ভাবনাই কালক্রমে চাহিদায় রূপান্তরিত হয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্যথায় সুবর্ণ জয়ন্তীতে প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার সুবর্ণ একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য প্রকৌশল

প্রকৌশল মানেই বাস্তববাদিতা। বিজ্ঞানীর মতো দার্শনিক ও নতুন চিন্তার বিলাসিতা প্রকৌশলীদের নেই। সহজ ভাষায়, প্রকৌশলীরা নিউটনের চেয়ে ম্যাকগাইভার বেশি। প্রকল্পের আগে তাই অনেক রকম হিসেব কষতে হয় প্রকৌশলীদের। বিজ্ঞানীর কাছে দাবিটি বিজ্ঞানের অগ্রগতির, নতুন দিগন্ত খুঁজে বের করার। বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য তাই সাধারণ ভাবে অর্থের যোগান দেওয়া হয় অনেক লম্বা সময়ের জন্য।

পক্ষান্তরে, প্রকৌশলীর কাছে দাবিটি সাধারণ মানুষের। প্রান্তিক ভোক্তার খুব সাধারণ চাহিদাগুলোর সমাধানই প্রকৌশলীর কাজ। প্রকৌশলের জন্য অর্থের যোগান সে-কারণেই সময়ের সীমায় সীমিত থাকে। যে-দেশে যেমন শিল্প গড়ে ওঠে, সে-দেশে তেমন প্রকৌশলই শক্তিমান অবস্থানে থাকে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রায়শ উপেক্ষিত একটি দিক হলো মূলনীতি ও দিকনির্দেশনা। সরকারের কাজ গবেষণা করা নয়, গবেষণার দিকনির্দেশনা দেওয়া। সরকার মানুষের সব প্রয়োজন মেটাবে না, মানুষের প্রয়োজনগুলোর স্বীকৃতি দিয়ে তা যোগাতে সহায়তা করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যাতায়াত ব্যবস্থার কথা। প্রতিটি মানুষকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পরিবহনের কাজ সরকার করবে না, বরং সরকার এই বিষয়টি দৃষ্টিগোচর করবে যে এই দুই মেট্রোপলিটান শহরের মধ্যে সুলভ যোগাযোগ নিশ্চিত করা উচিত। অতঃপর, সরকার এ-কাজে ন্যূনতম দিকনির্দেশনা দেবে শুধু। এরপর কালক্রমে প্রযুক্তি আসবে, আসবে বিস্তারিত নীতিমালা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন প্রকল্পে হাত দেওয়ার আগের প্রথম যে প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে হবে তার মধ্যে আছেঃ

১. কার জন্য তৈরি করা হবে?
২. হাতে কী কী সম্পদ আছে?
৩. পূর্বপ্রস্তুত সমাধান আছে কিনা, থাকলে তা কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
৪. কত কম খরচে কত বেশি লাভ করা যায়, এবং শেষ দিন পর্যন্ত নিংড়ে কতটুকু বাড়তি আয় বের করা যায়?

সহজ, সাধারণ এই প্রশ্নগুলোর উপর মূলনীতি দাঁড় করানোর কারণ একটাই – প্রযুক্তির ব্যাপারে আপাত-অজ্ঞ মানুষও যেন ভাল-মন্দ বিচার করতে পারেন। শিক্ষা বা পেশা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে কম-বেশি প্রযুক্তি-সচেতন না করলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ও প্রগতি নিশ্চিত করানোর জন্য প্রান্তিক নাগরিকদের পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সূত্র জানার প্রয়োজন নেই, শুধু প্রয়োজন একটি প্রযুক্তির উপযোগিতা বিচার-বিবেচনা করতে জানা।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর, দেশের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের জন্য। সুবিধাভোগীদের জন্য প্রযুক্তির প্রসার খুব সহজ। তুলনায় কঠিনতর হলো এমন কোন উন্নয়ন যা প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে। টাকার অংকে বললে বুঝতে সহজতর হবে। একজন শিল্পপতির আয় এক কোটি টাকা বৃদ্ধির চেয়ে এক কোটি রিকশাওয়ালার আয় এক টাকা করে বৃদ্ধি করা অনেক বেশি কষ্টের। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনেই কোন না কোন ভাবে প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে।

সম্পদের বিভিন্ন প্রকরণের মধ্যে শুধু মানবসম্পদই বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে আছে। অদক্ষ শ্রমিক ছড়িয়ে আছে দেশময়, আর প্রবাসে আছেন অনেক দক্ষ শ্রমিক। মাঝামাঝি স্তরের মোটামুটি শিক্ষিত তরুণও আছেন অনেক। তুলনায় প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে। শুধু মানুষ দিয়ে প্রযুক্তি হয় না, কিছু না কিছু কাঁচামাল লাগে। প্রযুক্তির যুগে কাঁচামালগুলো আর স্রেফ লোহা বা তামা নয়। রূপান্তরিত যে-কাঁচামাল প্রযুক্তির জন্য ব্যবহার করা হয়, তা খুব কম মূল্যে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশের আপেক্ষিকে সেই কাঁচামালের ব্যবহারই সর্বাধিক উপযুক্ত সমাধান।

যে-কোন কিছুরই নির্দিষ্ট আয়ু আছে, তবে সবকিছুই ওয়ান-টাইম-ইউজ নয়। ইটের বাড়ি ভেঙে সেই ইট যেমন নতুন বাড়ি বানানোর কাজে লাগানো যায়, তেমনি বিদ্যমান প্রযুক্তি ও অবকাঠামোও পুনর্ব্যবহার করে খরচ সীমিত রাখা যায়। অতএব, খরচের কথা মাথায় রেখেই নতুন প্রযুক্তি গড়ে তুলতে হবে। এ-কারণে বিগত শতাব্দিতে গড়ে তোলা সব রকম শিল্প কারখানা সম্পর্কে পূর্ণ ও বাস্তবসম্মত জ্ঞান প্রয়োজন।

সাধারণত ত্যানা প্যাঁচানো কিংবা অতিরিক্ত কচলে তিতারস বের করাকে নেতিবাচক ভাবে দেখা হলেও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটাই মূল লক্ষ্য। প্রযুক্তি টেকসই হওয়ার পেছনে এটি অনেক বড় উপাদান। উদাহরণ হিসেবে জাপানে নির্মিত গাড়ি ও আমেরিকায় নির্মিত গাড়ির পার্থক্যের দিকে তাকানো যায়। দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহারোপযোগী করে তোলার চেষ্টা থাকে বলে টয়োটা বা হোন্ডার তৈরি গাড়ি বিশ্বজয় করছে। পক্ষান্তরে, স্বল্পকালীন ব্যবসা মাথায় রেখে তৈরি হওয়ায় আমেরিকায় নির্মিত গাড়ি বাজার হারাচ্ছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের বইয়ে আছে, ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন যে তালেবানরা পাহাড়-পর্বতে শুধু টয়োটার গাড়ির উপরেই ভরসা করে, অন্য কিছু নয়। বাংলাদেশের মতো সীমিত আয়ের দেশকে ডিজিটাইজ করতে হলে মূলনীতি হতে হবে এভাবে বিদ্যমান প্রযুক্তির মধ্য থেকে ‘এক্সট্রা মাইল’ বের করে আনা এবং নতুন প্রযুক্তিকে কালোত্তীর্ণ করা।

এই সাধারণ প্রশ্নগুলোর ভিত্তিতেই সাধারণ কিছু চিন্তা, কল্পনা, ও দর্শন মিশিয়ে এবার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়া যাক।

ছবিঃ "স্টেপ-আউট", শোভন নাজমুস

Tuesday, March 31, 2009

বিছা

‘বললাম তো যাবো না, তবু এত গুঁতানোর কী হল?’ বয়সভারে ন্যুব্জ বিছরুখের গরম জবাব। বিছনাজ তাই বলে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী না। এই লেজভোঁতা সঙ্গীটার আস্ফালন দেখছে বহু বছর ধরে। বছরে কিছুদিন থাকে এমন। এই দিনগুলোয় বুড়োকে একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। আকাজ করে বসে কিছু না কিছু একটা।

গেলবার এই দিনে রাগের মাথায় জামার বুকের কাছটা খেয়ে ফেলেছিল বিছরুখ। পাশের বাড়ির বিচ্ছুকে বিশেষ ভাবে খুশি করে সে-কেলেংকারি সামাল দিয়েছিল বিছনাজ। দুর্বল মুহূর্তে কামড়ে ওর জামার কিছু অংশ ছিড়ে নিয়েছিল। বলেছিল, ‘আমার জান্টু একটু অন্যরকম না হলে হয়? আজ থেকে এটাই নতুন ধারা।’ শুনে বিচ্ছুও খুশি। ষণ্ডাটার দেখাদেখি আশপাশের দু’কলোনিতে সেই রীতি চালু হয়ে গেল। লোকেও আর বিছরুখের ছেঁড়া জামা আর আলুথালু চোখ-মুখ নিয়ে কোন কথা বললো না।

তার আগের বছর চলছিল বিছরুখের আধ্যাত্মিক সময়। তখনও বিচ্ছুটা আসেনি পাশের বাড়িতে, বিছনাজের মনেও বসন্তের পৌনঃপুনিকতা শুরু হয়নি। উত্তরপাড়ার খটখটঞ্জ থেকে বিছা ভাই বেড়াতে এসেছিলেন ওদের বাড়ি। যেমন তাঁর সফেদ আলখাল্লা, তেমন তাঁর নুরানি লেজের আগা। একহারা গড়নের পুষ্ট, নধর দেহটা দেখেই বিছনাজ বিশ্বাসী হয়ে গিয়েছিল। অতিলৌকিক কোন সত্বা না থাকলে এক দেহে এত আশীর্বাদ জমা হতে পারে না বলে তার বদ্ধমূল ধারনা হল। ধরে-বেঁধে বিছরুখকেও সে বিছা ভাইয়ের আন্তরিক মুরিদ করে দিল। বিছনাজের মত অতটা না, তবে বেশ অনেকটাই আন্তরিক।

বিছা ভাইয়ের একাগ্র ছাত্র-ছাত্রী হয়ে গেল ওরা দু’জন। দুপুর হলে বিছা ভাই বিছরুখকে স্নেহের সাথে কাছে ডেকে নিতেন। বিভিন্ন রকম তালিম দিতেন।

‘বিছার বিষ থাকে লেজের আগায়, বুঝলা? এই লেজ সুরসুর করে বলেই আমরা বিছা। তা লেজের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে আমার ছোট্ট একটা ম্যানুয়েল আছে। তোর বাড়ি আসার আসমানি নির্দেশ পাওয়ার আগে আমি খটখটগঞ্জের মেম্বারের বাড়িতে ছিলাম কিছুদিন। তখন কিছু তরিকা শিখেছিলাম; সেগুলোর লেখ্য রূপ। হাদিয়া মাত্র ১০ টাকা।’

হাদিয়ার কথা শুনেই বিছরুখ হাউ-মাউ করে উঠলো। জীবনের পদে পদে বঞ্চনার শিকার হয়ে কত কষ্টে সাজানো সংসার তার। এক বিছনাজ ছাড়া তার ফুটো কড়িটুকুও নেই। কেঁদে-কেটে সে-কষ্টের কথা বলা শুরু করতেই বিছা ভাই কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তোকে কিছু দিতে হবে না, তোর জন্য বিনামূল্যে সব। তোকে আজ নতুন কিছু শেখাবো, তুই শুধু রাত-ভোর এই তরিকা কাজে লাগাবি।’

খুশির বদলে আরো বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে বিছরুখ। আবারও কেঁদে বলে, ‘পুরনো তরিকা শেখার টাকাই নেই, বেশি দামী নতুন তরিকা কীভাবে নেবো?’

বিছরুখের কান্না উপেক্ষা করে বিছা ভাই বলে চলে, ‘এই তরিকার জন্য শহর থেকেও লোক এসেছে। কত বড় বড় লোক আমার পায়ের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দিয়েছে। বলে কিনা আমাকে নশ্বর দেহে দেখবার সাহসও নেই। আমি নাকি দেবতা, শুধু বিনয় করে দেহে ঠাঁই নিয়েছি।’

বলা বাহুল্য, বিছরুখের কান্না বেড়েই চলে। এ-সময়ই স্মিত হেসে তাকে উদ্ধার করে বিছা ভাই।

‘যাক সে-কথা, এদের এই বিষ ছাড়ানো খুব জরুরী। আমি কালরাতে স্বপ্নে নতুন এক সমাধান পেয়েছি। উলটা করে ঝুলিয়ে রাখলে অবিশ্বাস ও অতিপ্রশ্নের রোগ ভাল হয়ে যায়। এক রাত ঝুলিয়ে রাখলেই সব বিষ মুখ দিয়ে বের হয়ে আসবে। তুই যা, এই তরিকা কাজে লাগা। তোকে কিছু দিতে হবে না।’

আনন্দে ডগমগ করতে করতে বিছরুখ চলে গেল নিজের কাজে। সাঁঝের আঁধারে ঘরে থাকা উত্তম বিধায় বিছা ভাই ধীরে ধীরে হাঁটা দিলেন অন্দরমহলের দিকে। হঠাৎ চমকে দিয়ে গলায় কে যেন ফাঁস পরিয়ে দিল। বিছনাজ খ্যানখ্যান করে হেসে বলে, ‘আজ আর গামছা না, দড়ি দিয়ে বাঁধবো। আপনাকে উলটা করে বেঁধে তাংফাং করার মজাই অন্যরকম। আজকে দুগনা মজা হবে!’ বিছাভাই অবোধ্য কী সব যেন বিড়বিড় করতে লাগলেন।

ভালই চলছিল এভাবে। অপারেশন দড়িবান্ধা শেষ হয়ে গেল অল্পদিনের মধ্যেই। নতুন তরিকার খোঁজে অস্থির বিছরুখকে কিছু একটা বলে শান্ত করা দরকার। কোন কুক্ষণে বিছা ভাই মুখে এনেছিলেন সহজে মাকড়সা মারার তরিকা। মাকড়সার নাম শুনেই ক্ষেপে উঠলো বিছরুখ। অবাক বিছা ভাই কিছু বোঝার আগেই বিছরুখ তাঁর দাঁড়ির একাংশ খাবলে ছিড়ে ফেললো। আরেক দফা আক্রমণ করতে উদ্যত হতেই বিছনাজ এসে তাকে নিবৃত্ত করলো।

‘আপনাকে না কাল রাতেই বললাম, বিছরুখের সামনে মাকড়সার নাম নেবেন না? এই নাম শুনলেই ও আর স্থির থাকতে পারে না।’

মাকড়সা শব্দটি আরেকবার উচ্চারিত হতে শুনেই বিছরুখ ক্ষেপে উঠলো। সেই সংহারমূর্তি দেখেই বিছা ভাই দৌঁড়ে ভাগলেন। ক’দিন পর দেখা গেল আশে-পাশের চার গ্রাম ধরে সবাই ছিলা দাঁড়ি নিয়ে ঘুরছে। সবারটা দেখেই মনে হচ্ছে যেন কেউ সামনে থেকে খাবলে নিয়েছে। বিছনাজের বুঝতে দেরি হল না, এটা বিছা ভাইয়ের মুখরক্ষার ফিকির।

পরপর দুই ঝক্কির পর বিছরুখকে নিয়ে আর ভরসা পায় না বিছনাজ। তাই এখন এই দিনটা এলেই ওকে ঘরে বাইরে নিয়ে যায়। এ-বছর ওদের শাহী হওয়ার একটা সুযোগ আছে। ক’দিন আগেই বিছাগঞ্জ থেকে শাহী এক ভদ্রলোক এসেছেন। বিছনাজ প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে দুই শাহী রক্তের মিলন ঘটিয়ে জাতে উঠতে। বিছরুখকে নিত্য তালিম দেওয়া হচ্ছে শাহী কায়দায় কথাবার্তা বলার। মেলবন্ধনের বাকি দায়িত্ব বিছনাজ নিজের উপর নিয়েছে। ভয় একটাই, এই শাহী বংশের আবার মাকড়সাদের সাথে উঠা-বসা। কিছু হলেই বিশাল একটা আঁঠালো জাল বানিয়ে কাচ্চা-বাচ্চা সহ সেখানে আড্ডা জমিয়ে দেয়।

যত রাগারাগিই করুক না কেন, আজকে ওকে ঘর থেকে বের করতেই হবে; প্রয়োজনে বিছিলার নাচের টোপ দিয়ে হলেও। বেকুবটা যে আজও কেন ভুলতে পারে না সেই মাকড়ানির কথা। খান্দানি মাকড়ানির সাথে ফস্টি-নস্টির এক ফাঁকে কামড়টা বিছরুখই দিয়েছিল, কিন্তু বেকুব পিটার পার্কারটা ঘুরে তাকিয়ে দেখলো মাকড়ানিকে। সেই থেকে বিছম্যান না হয়ে স্পাইডারম্যান হয়ে গেল ব্যাটা।

বিছনাজ কত কষ্ট করে উপরে ওঠার সিড়িটা নিজের দখলে আনে প্রতিবার। প্রতিবারই বিছরুখটার এই খেয়ালের জন্য সব ভেস্তে যায়। আর কতকাল এভাবে চলে?

একুশের নাটিকাঃ সূচনা

মহান ভাষা দিবস উপলক্ষে ভার্জিনিয়া টেকের বাঙালি ছাত্রদের ক্ষুদ্র প্রয়াস একটি নাটিকা -- সূচনা। পরীক্ষা আর ক্লাসের দৌঁড়াদৌঁড়ির মাঝে তৈরি করা এই নাটিকার ইউটিউব ভিডিও জুড়ে দিলাম। রচনা ও পরিচালনায় ছিল মাহমুদ হারুন।

আনাড়ি কাজ, ভুল-চুক হলে ক্ষমা করবেন। যেকোন প্রকার আদেশ-নির্দেশ-সমালোচনা-উপদেশ স্বাগতম। আমরা প্রত্যেকেই বেহায়া হিসেবে সুবিদিত। হাসি


সীমানা পেরিয়ে

গতকাল (২৫শে ফেব্রুয়ারি) বিডিআর-এর বিদ্রোহ নিয়ে নানান জনের অনেক রকম মত ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার নিজের মত অনেকের সাথেই মিলছে না। সেগুলো নিচে দেওয়ার চেষ্টা করছি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সহ। আমার দৃষ্টিভঙ্গি অমানবিক মনে হয়ে থাকলে দুঃখিত। আমার বিবেচনায়, ব্যাপারটা নিয়ে খুব দ্রুত আবেগপ্রবণ না হয়ে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর সম্ভাব্য ফলাফল দেখা উচিত। কখনও সময়ের অভাবে, কখনও পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে গিয়ে অনেক কিছু বলা যায় না। তবু চেষ্টা করছি খোলামেলা ভাবেই বলতে।

স্পেশাল কেস
জীবন-কলমের কালি অমোচনীয়। এতে একবার যা-লেখা হয়, তা মুছবার অবকাশ নেই। ভবিষ্যতে হয়তো টীকা জুড়ে দেওয়া যায়, চাই কি কেটে আবার লেখা যায়, কিন্তু মুছে নতুন করে লিখবার কোন অবকাশ নেই। সেই সাথে আরও সত্য, জীবন-খাতার পাতা উলটে বারবার পেছনে যাওয়া যত কমানো যায়, ততই ভাল। জীবন চলার অংশ হিসেবেই এই শিক্ষাটুকু আমরা ধারণ করি। কথাগুলো রাষ্ট্রের বেলায়ও সত্য। এই বিবেচনায় আমি “স্পেশাল কেস”-এর বিপরীতে।

এখানে “স্পেশাল কেস” হল আইনের স্বাভাবিক গতিকে রহিত বা প্রভাবিত করা। কোন অপরাধের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করা এমনই একটি স্পেশাল কেস। প্রতিটি স্পেশাল কেস একটা রাষ্ট্রকে ঐ সময়টায় আটকে রাখে। আমরা পঁচাত্তরের স্পেশাল কেসে ফিরে যাই আজও বারবার। দেরিতে হলেও আমরা উপলব্ধি করেছি যে অপরাধমাত্রেই তা শাস্তিযোগ্য, উদ্দেশ্য যেমনটাই হোক না কেন।

সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার দ্রুততা
বিডিআর-এর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিতে শুরু করেছেন বলে খবরে প্রকাশ। এর বাইরে তাদের হাতে কোন উপায় ছিল না। ঘেরাও অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকতে পারতেন না তারা। অনেকে দ্বিমত পোষন করলেও আমি এত দ্রুত সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার বিপক্ষে ছিলাম, আছি এখনও। সেই বিচারই শ্রেষ্ঠ, যার পর বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। বিডিআর-এর দাবিগুলো ন্যায্য, কিন্তু সেই যৌক্তিকতা তাদের মানুষ হত্যার অধিকার দেয় না, দেশ ও সরকারকে জিম্মি করার অধিকার দেয় না। দাবি মেনে নেওয়া উচিত, তবে সেই সাথে বিচারেরও সম্মুখীন করা উচিত। তাহলেই সকল পক্ষের প্রতি সমান থাকা হবে। তাছাড়া, অপরাধের মাত্রা ও কারণ না জেনেই ব্ল্যাঙ্কেট ইমিউনিটি দেওয়া খুব বড় একটি কৌশলগত ভুল। এখন বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে অনেক রকম অপকর্মের কথা। এগুলো না জেনেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা ঠিক ছিল বলে মনে করি না আমি।

আনুপাতিক প্রতিবাদ
এরপরের প্রসঙ্গ ছিল অনুপাতের। সেন্স-অফ-প্রোপোরশন অতিক্রম করে যাওয়া যেকোন কিছুই অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য। চুরি, দুর্নীতি বন্ধ করা সবার দাবি, ন্যায্য দাবি। তাই বলে এই দাবি আদায়ের জন্য সহিংস হওয়া ন্যায্য না। যেই দাবিগুলো করা হয়েছে, সেই একই দাবি সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা করে থাকেন। আলোচনা, কর্মবিরতি, বা অবরোধের মাধ্যমে আদায়ও করেন। তারা বিডিআর-এর জওয়ানদের চেয়ে শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থানে খুব উন্নত নন। একবার এমন কোন জিম্মি অবস্থায় মাথা নত করে ফেললে তা চিরকালের জন্য সরকারকে দুর্বল করে দেবে।

প্রাণহানি হ্রাস বনাম প্রাণের মর্যাদা
যেকোন সশস্ত্র বিদ্রোহ চলাকালে প্রথম বিবেচ্য অবশ্যই প্রাণহানি হ্রাস। তবে এসময় অনেক রকম হিসাব ও সমীকরণ মাথায় রাখতে হয়। অনেক রকম আলোচ্য ও বিবেচ্য বিষয় থাকে। এর কিছু থাকে অবস্থা-নির্ভর, আবার কিছু থাকে সার্বজনীন। প্রাণহানি সর্বোচ্চ অপরাধ। এর বিনিময়ে যদি কারও দু’দিনের জেলও না হয়, তাহলে আইনের দরকার কী? প্রাণহানি হ্রাস যেমন প্রয়োজন, তেমনি হারিয়ে যাওয়া প্রাণের মর্যাদা দানের প্রশ্নও থেকে যায়।

নেগোসিয়েশন
কোন প্রকার সমঝোতা ততক্ষণই এগিয়ে যায়, যতক্ষণ উভয় পক্ষের কিছু চাইবার থাকে। প্রতিপক্ষের সব চাওয়া একবারেই পূরণ করে ফেললে তাদের মর্জির মুখাপেক্ষী হয়ে যেতে হয়। অতিদ্রুত সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করায় তা-ই হয়েছে। সাধারণ ক্ষমা হল সরকারের হাতের তুরুপের তাস। এটি শুরুতেই খেলে ফেলা মানে প্রতিপক্ষকে হাই-গ্রাউন্ড দিয়ে দেওয়া। এটি চূড়ান্ত মার্জনা, এবং তা পাবার জন্য অপরাধীকে চূড়ান্ত ভাবেই কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত হতে হবে। একজন প্রধানমন্ত্রী সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করতেই পারেন। এটি রাজনৈতিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত, তবে এটি আসবে একেবারে শেষে। অতি দ্রুত সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করায় বিডিআর-এর সদস্যরা আরও দাবি করেছেন, অস্ত্র জমা দিতে গরিমসি করেছেন। এ-ধরণের ঘটনায় একজন প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান এবং কর্তৃত্ব প্রচণ্ডভাবে দুর্বল হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল নিম্নবিধ পালটা প্রস্তাব দেওয়াঃ
- প্রথমে অস্ত্র নামিয়ে রাখতে হবে
- নারী, শিশু, ও বেসামরিক ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতে হবে
- সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে
- আত্মসমর্পণের পর অভিযুক্তদের যথাযথ নিরাপত্তার বিধান করা হবে
- সকল অপরাধের বিচার হবে
- বিচারের পর আদালত উপযুক্ত শাস্তির বিধান করবেন
- এই আইনী প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সাথে সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়া বিবেচনা করবেন

এই পন্থা বিডিআর-এর কেউ স্বেচ্ছায় মেনে নিতে না চাওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু এর বিপরীতে তাদের মনে করিয়ে দেওয়া ছিল দু’টি বিষয়। প্রথমত, একটি সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে তারা প্রধানমন্ত্রীর আদেশ মানতে দায়বদ্ধ। ক্ষমা করবার পূর্বে তাদের দিক থেকেও প্রমাণ রাখা প্রয়োজন যে তারা ব্যারাকে ফিরে একটি অনুগত ও সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে কাজে যোগ দেবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ক্ষমা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তা গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তুত হলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভাল চিন্তা করলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরী। দেশের কথা ভেবেই প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে তাদের। খুনের অপরাধ মাফ হয়ে যাওয়া অনেক বড় ব্যাপার, এবং এই সুবিধাটি তাদের অর্জন করে নিতে হবে।

আইনের শাসন
পরের প্রসঙ্গ আইনের শাসনের। আইন প্রণয়নের সময় তা একদিনের জন্য তৈরি করা হয় না। আইনের কোন বিবেক নেই, আইনের কোন বুদ্ধি নেই। দুইয়ে দুইয়ে যেমন প্রতিবার চার হয়, তেমনি আইনের বিবেচনায় কোন অপরাধের শাস্তি প্রতিবার একই হয়। এই নৈর্ব্যক্তিকতার কারণেই আইন সার্বজনীন। আইনের লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্রের দুর্বলতম নাগরিকের সকল নাগরিক অধিকার সর্বোচ্চ প্রতিকূলতার মুখেও রক্ষা করা। এ-কারণেই আইনে স্পেশাল কেস থাকতে নেই। এই সাধারণ ক্ষমা এটাই প্রতিষ্ঠিত করে গেল যে সাধারণ, নিয়মানুবর্তী নাগরিকের চেয়ে বিশৃঙ্খল বন্দুকধারীর ক্ষমতা বেশি। সব অপরাধের আইন আগে থেকেই তৈরি থাকে না। সেক্ষেত্রে বিবেচনার ভিত্তিতে অপরাধের প্রতিবিধান নির্ণীত হয়। এই ঘটনায় খুব খারাপ একটি প্রিসিডেন্স তৈরি করে গেল। এরপর যে-কেউ নিজের মত আইন হাতে তুলে নেবেন।

ক্ষমা বনাম সাধারণ ক্ষমা
সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার আগে পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটু সবিস্তারে জেনে নেওয়া উচিত ছিল। সব ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য না জেনেই এই ক্ষমা ঘোষনা করা হয়েছে। একটু একটু করে অনেক খবর বেরিয়ে আসছে এখন। বিডিআর-এর জওয়ানদের হাতে সার্বক্ষণিক অস্ত্র থাকার কথা না। তারা কীভাবে সুসজ্জিত হয়েই তৈরি ছিলেন? ঊর্ধ্বতন অফিসারদের বিভিন্ন ভাবে অপদস্ত করা হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। তাদের দিয়ে শারীরিক কসরত করানো হয়েছে। এটি কি দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন, না “হেইট ক্রাইম”? সেনাবাহিনীর কর্নেলদের খুন করে ড্রেনে লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছে। যত অপরাধীই হোন না কেন, পদস্থ অফিসারদের এভাবে অপমান করা কি ঠিক? ড্রেন থেকে তুলে আনা লাশে শুধু গুলি নয়, মুখে বেয়নেটের খোঁচার দাগও দেখা গেছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। এই অভব্যতা কি ক্ষমার্হ?

সাধারণ ক্ষমা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর, কিন্তু ক্ষমা করবার আগে জেনে নেওয়া উচিত কী কী অপরাধ ক্ষমা করা হচ্ছে। সে-ব্যাপারে স্পষ্টভাবে আলোচনা হওয়া উচিত। এই অপরাধ সংঘটনের পর বিডিআর-এর সদস্যরা কি আবারও পুনর্বহাল হবেন পূর্বপদে? একটি রাষ্ট্রের জন্য কি খুব সুখকর পরিস্থিতি এটি? সে-কারণেই অপরাধ, প্রতিবাদ, বিশৃঙ্খলা, এবং বাড়াবাড়ির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত ছিল।

কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য
একটা সময় মানুষ বর্বর ছিল। সে-আমলে আলফা-মেল বলে একটা ব্যাপার ছিল। এ-কালেও গরিলাদের মধ্যে এমনটা দেখা যায়। সোজা বাংলায় একে “জোর যার, মুল্লুক তার” বলা হয়। সে-আমলে দ্বৈরথে জয়ীরাই হতেন নেতা, তাদের কথায়ই চলতো সবকিছু। আমরা সে-যুগ পেরিয়ে এসেছি। এখন বুদ্ধির শাসনের যুগ। পেশি চালিত হয় বুদ্ধি দিয়ে। সে-কারণেই পেশি বা নিশানা নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করলে কোন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। নিয়ম মানতে কারোই ভাল লাগে না, কিন্তু তবুও নিয়মানুবর্তীতার চর্চা করতে হয় বৃহত্তর স্বার্থেই। খেলার মাঠে আন্ডারডগদের সমর্থন করা এক জিনিস, কোন অর্গানগ্রামের নিম্নপদস্থ কাউকে সমর্থন করা আরেক।

উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হয় যেখানে অধঃস্তনদের দাবি-দাওয়া শুনা ও মানা হয়। সেক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তারা কোন দাবি না মানলে সেটি যুক্তিযুক্ত হতে পারে। সময় সময় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, এবং তা অস্বাভাবিক সমাধানের দাবি রাখে। আমি মনে করি না যে বিডিআর-এর অবস্থা অতটা নাজুক ছিল। যদি হয়েও থাকে, তবুও তা নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের ধাপগুলো অতিক্রম করে এই পর্যায়ে আসা উচিত ছিল। আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা “সাধারণ কৃষকের ছেলে” বলে কেউ নিয়মের বাইরে বলে দাবি করাটা তাকে প্রকারান্তে অযোগ্য বলে অপমান করা বলে আমি মনে করি।

বিডিআর সদস্যরা সাধারণ মানুষের আবেগের কাছে আহ্বান করেছেন। সেই আবেগ আমাকেও ছুঁয়েছে, তাদের দুর্দশায় আমারও মন কেঁদেছে, কিন্তু তাই বলে আমি তাদের অপরাধটুকু ভুলে যেতে পারছি না। শুধুই আবেগের বশবর্তী না হয়ে তাই একটু দূরপ্রসারী প্রভাবগুলো ভেবে দেখা প্রয়োজন।

সেনাবাহিনী বনাম বাংলাদেশ
এভাবে সাধারণীকরণ করতে আমি নিজে খুব অপছন্দ করি, তবু মন থেকে প্রশ্নটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারছি না। এই সংঘাতে সেনাবাহিনীর বিপরীতে মানুষের অবস্থান কি পূর্বের রাগের ফল নয়? মনে রাখা প্রয়োজন যে “বিগত দু’বছরের সেনাবাহিনী” আর “বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী” এক নয়। সীমান্ত প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীর অধীনস্ত। এই বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা অন্য কারও বিরুদ্ধে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হত। রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ-ধরণের প্রতিক্রিয়া দূষণীয় ও পরিত্যাজ্য।

নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক দিক থেকে দেখলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে এই বিদ্রোহ ছিল সেনাবাহিনীর গালে একটি চড় কষে দেওয়া। একই ভাবে, বিনা বিচারে বিডিআর-কে ক্ষমা করে দেওয়া সেই অপমানকেই আরও ঘনীভূত করবে। বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য এটি অনেক বড় আঘাত। তাদের কর্তৃত্ব অনেক বেশি কমিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা এটি। সাম্প্রতিক কালে সেনাবাহিনীর দৌরাত্ম্যে বিরক্ত হয়ে এই ঘটনায় খুশিতে বাজনা বাজানো খুব সহজ। ভুলে যাওয়া সহজ যে এই বাহিনীর ঐতিহ্য এবং অহংকারের সাথে আমাদের দেশের নিরাপত্তা ও সম্মান জড়িত। সেনাবাহিনীর অন্যায়গুলো শুধু বিডিআর-এ হয়নি বা শুধু এই ক’মাসে হয়নি। অনেক আগে থেকেই ঘটা আসা এই অনাচার আমরা চলতে দিয়েছি। সেই দায়বদ্ধতা মাথায় রেখি সমালোচনা করা উচিত, সেনাবাহিনী কোন ভাবে অপদস্থ হলে তাতে খুশি হওয়া উচিত নয়।

নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিডিআর হেড কোয়ার্টারে যাওয়া ছিল অনেক বড় ঝুঁকি। এই সিদ্ধান্ত সহ পুরো ব্যাপারে কৌশলের চেয়ে আবেগ কাজ করেছে বেশি। সরকার থেকে নাগরিক পর্যন্ত সকল পর্যায়ে আবেগের এই আতিশয্য খুব খারাপ লক্ষণ। এই সরকারকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে, সেনাবাহিনীর গ্রাস থেকে রাজনীতিকে বের করতে হবে, নিজের দলের দস্যুবৃত্তি ঠেকাতে হবে। এতটা আবেগপ্রবণ হলে এর প্রতিটিই অর্জন করা দুষ্কর।

ঘটনা যেভাবে গেল (বা যেতে দেওয়া হল), তাতে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষের সম্ভাবনা থেকে যায়। এই বিবেচনায় বিডিআর-এর ভালর জন্যই হয়তো তাদের জেল-হাজতে যাওয়া উচিত ছিল। ডিজিএফআই ঘটনার আগে ঘাস খেলেও ঘটনার পর শোধ তুলতে ছাড়বে না। কত নালা-নর্দমায় বিডিআর জওয়ানদের লাশ পড়ে থাকবে, তা কে বলতে পারে? পাশাপাশি আইনের শাসনের প্রসঙ্গটি তো আছেই। সেনাবাহিনীর একটি অংশ লোভ এবং দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। তারা তাদের এই অবস্থান এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না। এ-ধরণের লোক অনেক বেশি বেপরোয়া হয়। সরকার শুধু বিডিআর নয়, সেনাবাহিনীরও অভিভাবক। তাদের এভাবে অপদস্থ হতে দেওয়ায় নিয়মনিষ্ঠদের দলে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়ে গেল।

শুদ্ধস্বর
সেনাবাহিনীর ভ্রষ্ট সংস্কৃতি শুদ্ধ করতে এবং রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর এক রকম দখলদারিত্ব রোধ করতে সরকারকে খুব দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। যে-সরকার এক দিকে সামান্য বিডিআর-কে (কিংবা ছাত্রলীগকে!) সামলাতে পারে না, এবং অন্য দিকে সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা কীভাবে আস্থা পাবে সেনাবাহিনীর? এই শুদ্ধির জন্য যেই দৃঢ় স্বর প্রয়োজন, তা এখনও সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অনেক কথা বেরিয়ে এসেছে। এমনকি কিছু ব্যাপারে সেনাপ্রধানের নামও শোনা গেছে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত ছিল এমন পথে আগানো যাতে উভয় তরফ থেকেই কিছু মধ্যপন্থী মানুষ তাদের সমর্থন করে। বিডিআর-এর হত্যাযজ্ঞ সকাল নাগাদই হয়ে গিয়েছিল। তাদের ঘিরে ফেলা হয়েছিল, কোণঠাসা করা হয়েছিল। আর কিছুক্ষণ সময় দিলে, এবং সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য ক্ষমা ঘোষনা করলে একটু পরে তারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে পড়তো। শুভবুদ্ধির মানুষেরা সামনে এগিয়ে আসতে পারতো। একই সাথে, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের উপর আক্রমণ করে কেউ সাধারণ ক্ষমা পেয়ে যাওয়াটাও ভাল ভাবে নেওয়ার কোন কারণ নেই।

খুনের অপরাধেরও ক্ষমা হয়, তবে তা বিচারকার্যের নিষ্পত্তি এবং অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার পর। এক্ষেত্রেও সেটি করা যেত বলে আমার মত। সেই সাথে এটি আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে এই দেশে ভাংচুর করলে সব দাবি মেনে নেওয়া হয়। শাস্তি প্রদান কিংবা নিদেনপক্ষে বিচারকার্য হলে এটি প্রতিষ্ঠিত হত যে ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া হবে, তবে অন্যায্য পন্থা সহ্য করা হবে না।

Tuesday, December 30, 2008

ময়ূরপংখী রাজনীতি

১. কালের স্থিরচিত্র
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪-দলীয় মহাজোট বিপুল বিজয় অর্জন করেছে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে। ফলাফল বলছে, দেশে এখন কার্যত কোন বিরোধী দল রইলো না। ইতিহাসের পরিহাস সবসময় নির্মম হয় না। এক কালে অনেক দুর্নাম কামিয়ে আওয়ামী লীগ 'বাকশাল' তৈরি করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, নাশকতা, দুর্ভিক্ষ সহ অনেক রকম কারণ হয়তো ছিল, কিন্তু তবু এই পদক্ষেপ চিরকালের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগকে। ২০০৮ সালে কার্যত আরেকটি 'বাকশাল' স্থাপিত হল। পার্থক্য হল, এবারে এটি জনগণের মত ও সমর্থনেই ঘটছে। গোড়া সমর্থকেরা সেই চোখেই দেখবেন বলে ভয় হচ্ছে। স্রেফ মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বলা, এটি কালের স্থিরচিত্র ছাড়া আর কিছু নয়। ভোটের হিসাব অনেক আনন্দের হলেও বাস্তবতা কিছু সচেতনতা দাবি করে।

২. অস্বাভাবিক ঐক্যঃ
সময়ের প্রয়োজনে অনেক রকম অস্বাভাবিক ঐক্য হয়। এ-ধরণের কৌশলগত বা শর্তসাপেক্ষ ঐক্য দীর্ঘমেয়াদে ফাটলেই পরিণত হয়। দৃশ্য শত্রুর গতিবিধি জানা যায়, তার ব্যাপারে পরিকল্পণা করা যায়। অজানা, অদৃশ্য শত্রুর বেলায় এই সুবিধা নেই। আওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে এমনই একটি ঐক্যের সুফল ভোগ করছে। জয় মহাজোটের হলেও শাসন করবে কার্যত আওয়ামী লীগ। যে-দলগুলো নিয়ে মহাজোট গঠিত, তারা কেউই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক নয়। বিশ্বস্ত ভোটার বাদে যাঁরা মহাজোটকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের বৈশিষ্ট্য দেখা যাক।

1. তরুণ ভোটঃ এবারে প্রায় দেড় কোটি নতুন ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন নির্বাচনে। এরা নতুন যুগের মানুষ, এরা নিত্য-নতুন সুযোগের মধ্যে বড় হয়েছে, এরা বাইরের দেশের অনুকরনে অভ্যস্ত, এরা বাইরের রাজনীতির সাথে দেশের তুলনা করে। এরা সাফল্যের পরিমাপ করবে বহির্বিশ্বের সাথে। তরুণ ভোটের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এরা খুব বেশি অস্থির। যুদ্ধাপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে আগামী নির্বাচনে এরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না, এই ভোট আওয়ামী লীগের পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব না। এই কাজটি করার অন্য দিক হল, আওয়ামী লীগ আর কখনও মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত বেঁচে রাজনীতি করতে পারবে না।

2. জাতীয় পার্টিঃ লেজে অব হোমো এরশাদ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে পল্টিবাজ ও সুবিধাবাদী রাজনীতিক। বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী এত বড় গর্ত খুড়েছিল নিজের জন্য, যে যে-কেউ এই নির্বাচনে জয়লাভ করতো। হুমকি-ধামকি দিলেও এরশাদ মহাজোট ছেড়ে যাননি এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেই। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি একই কাতারের দল হওয়ার পূর্ণ সুবিধা নেবার ক্ষেত্র প্রস্তুত এখন তার জন্য। এই ভোটগুলোও আওয়ামী লীগ আর কখনও পাবে না।

সিলেট বা ঢাকায় সকল আসন জেতার মত জনপ্রিয় দল আওয়ামী লীগ না। বগুড়ায় একাধিক আসন জেতার মত দল আওয়ামী লীগ না। এই ভোটগুলো আওয়ামী লীগ আর পাবে না। এগুলো স্রেফ দৈব দুর্বিপাক। তারেক জিয়া বাড়াবাড়ি রকম চুরিদারি না করলে, খালেদা জিয়া তাঁর ছেলেদের ব্যাপারে অন্ধ না হলে, পিন্টুর মত গুন্ডাদের মনোনয়ন না দিলে, কাউকে মনোনয়ন দিলে পুরো পরিবারশুদ্ধ মনোনয়ন না দিলে এই সৌভাগ্য আওয়ামী লীগের হত না। এই ঐক্য চরম অস্বাভাবিক। ব্যবসা-মনস্ক জাতীয়তাবাদীরা আওয়ামী লীগের সমর্থক নন। সেনাবাহিনী বা ইসলামী শাসনের প্রবক্তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক নন। এঁদের নব্যপ্রাপ্ত সমর্থক ভেবে এঁদের আদর্শ অবলম্বন করেও আওয়ামী লীগ এই ভোটগুলো পাবে না।

3. বামপন্থী ভোটঃ অনেকটা বাধ্য হয়েই বাম ঘরানার মুক্তমনা মানুষেরা ভোট দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে। ধর্মব্যবসায়ী দলগুলোর সাথে আঁতাত করার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন করে মুসলমানী দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আওয়ামী লীগ ড্যামেজ-কন্ট্রোল করার জন্য যতই "আমরা আসলে ওদের প্রগতিশীল করতে চেয়েছিলাম" বলুক না কেন, অসাম্প্রদায়িক কেউ এ-কথায় ভুলেননি। এই ভোটও আর পাওয়া যাবে না।

4. বীতশ্রদ্ধ মধ্য ও নিম্নবিত্তঃ বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুব কম। যুদ্ধাপরাধী তোষণের দায়ে বিএনপি দুষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি বাদ দিলে তেমন কোন তফাৎ নেই। বিএনপি'র বদলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও দ্রব্যমূল্য ও দুর্নীতি বেড়েই চলতো (হয়তো এতটা নয়)। আওয়ামী লীগের এই বিজয় যতটা অর্জন, তার চেয়ে উপহার বেশি। অতএব, এই আশংকা অবাস্তব নয় যে আওয়ামী লীগ একে যথাযথ মূল্যায়ন করবে না। বিজয়ের মাত্রার সাথে সমানুপাতিক উন্নয়ন না করলে দলহীন এই সাধারণ মানুষ আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সাথে থাকবে না।

৩. জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী সমীকরণঃ
এই নির্বাচনের মূল ম্যান্ডেট আওয়ামী লীগের পক্ষে না, যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে। সাম্প্রতিক সময়ে মূলত বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনের চেষ্টায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সামনে এসেছে। নির্বাচন পিছিয়ে জানুয়ারি মাসে নেওয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, গণহত্যা, অত্যাচার, যুদ্ধাপরাধী বিচার, ইত্যাদি ব্যাপারে যেই গণসচেতনতা গড়ে উঠেছে, তার পেছনে আওয়ামী লীগের তিল পরিমাণ অবদান না থাকলেও এর পূর্ণ সুফল ভোগ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় মহাজোট।

অতীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দু'টি সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর একবার, ’৯৬ এর নির্বাচনের পর আরেকবার। সেই গণজাগরণ আওয়ামী লীগের তৈরি ছিল না, আওয়ামী লীগ সেই গণদাবির প্রতি কোন শ্রদ্ধাও দেখায়নি। জামায়াতের সাথে বরং আওয়ামী লীগ কৌশলগত আঁতাত করবার চেষ্টাও করেছিল এক কালে। মাত্র ক’দিন আগে তারা প্রায় রাজনৈতিক মুসলমানি করে বসেছিল মোল্লাদের সাথে চুক্তি করে। জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী যে একই কাতারের, সেই সত্য আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেনি। এর সব কিছুই সামাজিক, অরাজনৈতিক অর্জন। এই নির্বাচনের আগে বিজয় দিবস নিয়ে বাঙালি গর্বে সরব হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের অবদান একেবারেই নগণ্য, অথচ এই আন্দোলনগুলোই আওয়ামী লীগকে ২৬২টি আসন এনে দিয়েছে।

ক্রমে শক্ত হয়ে ওঠা জামায়াতকে একমাত্র এই সমীকরণটিই ডুবাতে পারতো যে ‘জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী সমার্থক’। এই কথা মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার মত নৈতিক অবস্থান আওয়ামী লীগের ছিল না। জামায়াত দেরিতে হলেও এটি বুঝতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধের কথা তাদের ইশতেহারে ঢুকিয়েছে, বিজয় দিবস বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মত ঘটনাগুলোকে মেনে নিয়েছে (যা এগুলোকে পর্যায়ক্রমে গুরুত্বহীন ও কথার কথা করবার প্রক্রিয়ায় আছে)। আগামী নির্বাচনের আগে জামায়াত নিজের শরীর থেকে যুদ্ধাপরাধের সব দৃশ্যমান চিহ্ন মুছে ফেলে স্রেফ একটি “ইসলামিক” দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই বিজয়ের পেছনে তাই জামায়াতের বিলম্বিত উপলব্ধির ভূমিকা ব্যাপক।

সংবিধানের যাবতীয় কলঙ্কজনক ধারা এবং যুদ্ধাপরাধীদের চূড়ান্তভাবে শেষ করে দেওয়ার সুযোগকে আওয়ামী লীগ দলীয় জয় হিসেবে নিয়ে কতটা সুনিপুণ ভাবে হারায়, সেটাই দেখার বিষয়।

৪. বিজয়ী কুপ্রার্থী
অতি-খুশিতে বগল বাজানো শুরু করবার আগে বিবেচনার নেওয়া উচিত যে এই দুর্যোগের কালেও জামায়াত প্রায় প্রতিটি আসনেই ভোট পেয়েছে বেশি। কমান্ডার নিজামি হেরে গেলেও আড়াই লাখ ভোটের মধ্যে মাত্র ২২ হাজার ভোটে হেরেছেন। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মত পাপীও জিতে গেছেন। এই বিষয়গুলো আমলে নেওয়া উচিত আওয়ামী লীগের, সাথে তাকিয়ে দেখা উচিত নিজ দলের এমন অনেক প্রার্থীর দিকে যাঁরা সাধারণ অবস্থায় জিততেন না। এই তালিকায় এরশাদ থেকে শুরু করে কামাল আহমেদ মজুমদার পর্যন্ত অনেকেই আছেন। নৌকার এই সুদিনেও ঢাকা শহরে কি এর চেয়ে ভাল প্রার্থী মিলতো না?

সাম্প্রতিক কালে বিএনপি’র মত আওয়ামী লীগের ভেতরেও রাজনৈতিক সার্জারির মাধ্যমে নেতা আমদানির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সজীব ওয়াজেদ জয় দেশে গেলে শিশুদের মেলা কিংবা অধুনা পত্রিকায় তাঁকে বিদগ্ধ রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তারই নিদর্শন। আগামী কিছুদিনে এই প্রক্রিয়া অব্যহত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল সমাজতন্ত্রের পতন। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি নিজ নিজ শাসনামলে অনেক কর্মী রিক্রুট করলেও আওয়ামী লীগ তেমন কিছুই করতে পারেনি। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক দিয়েছে। আওয়ামী লীগ তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি কখনই। সামনেও করবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রমাণ হল, দেশ থেকে খবরে জানলাম ছাত্রলীগ এরই মধ্যে হল দখলে নেমেছে।

৫. স্বপ্নের সিড়ি বেয়ে স্বর্গে নামি
সাময়িক এই বিজয় আওয়ামী লীগ কতটা কাজে লাগায়, সেই ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগত ভাবে সন্দিহান। দেশটা কিছু লম্পটের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায় অনেক খুশি হলেও তাই পাশাপাশি রয়ে গেছে হতাশ হওয়ার ভয়। দিনভর অনেক রকম কথা শুনেছি। ‘যাকে মাথায় তোলা হয়, তার দেওয়া ছোট আঘাতও লাগে বেশি’। ‘দ্য হাইয়ার ইউ রাইজ, দ্য হার্ডার ইউ ফল’। ‘আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে কী লাভ, আগেও তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলেছিল’। এগুলো সত্যকথন, এগুলো আওয়ামী লীগ কানে তুলবে না।

তেমন কোন প্রচার ছাড়াই ‘না’ ভোটের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখা গেছে এবার। আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির খুব ঘৃণ্য একটি অভ্যাস হল তাদের সমর্থন না করলে ভোটারদের দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এবারেও নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা ‘না’ ভোট দেওয়াকে নির্বুদ্ধিতা কিংবা রাজাকারকে ক্ষমতায় আনার সাথে তুলনা করেছেন। কেউ ভেবে দেখেননি যে নিজামির সাথে মিটিং করা কিংবা দেশময় অতিরিক্ত আত্মপ্রচারের মত ‘বুদ্ধিমান’ কাজ আওয়ামী লীগই করেছে, সাধারণ ভোটারেরা না।

হয়তো উদ্দেশ্য বা আদর্শের বদলে ব্যক্তিপূজা থেকে গঠিত বলেই বিএনপি তুলনামূলকভাবে গতিশীল একটি দল। তারা নতুন ভোটারদের কাছে যাবে, অনেক ভাল ফল বয়ে আনবে। পরবর্তী নির্বাচনের সময় হয়তো দেশপ্রেম নামক চিজটি এমন “হিপ” থাকবে না। তখন হয়তো মুম্বাইয়ের নায়ক-নায়িকার মত “আমার বাংলাদেশ”ও “কুল” থাকবে না। হয়তো সেবার কোন ঠিকা বুয়া দু’দিন আগে তেহকেই ঠিক মত ব্যালট পেপার ভাজ করার পদ্ধতি রপ্ত করতে লাগবেন না। হয়তো সেদিনও অলস দুপুরে গুগুলে “বাংলাদেশ” লিখে সার্চ করলে আদৌ আমার দেশ নিয়ে একটি মানসম্মত বাংলাদেশি ওয়েবসাইট পাওয়া যাবে না। হয়তো সেদিন আর ইন্টারনেট জুড়ে ‘মুক্তিযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা অতিরঞ্জন’ দাবি করলে আর কোন তরুণ ছাত্র বা সাংবাদিক উদ্যোগী হয়ে প্রতিবাদ করবেন না। হয়তো সেদিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতিকদের উন্নাসিকতা উপেক্ষা করে কোন এমএমআর জালাল নিজ খরচে প্রবাসের পথে পথে ঘুরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সব রকম নথি সংগ্রহ করে যাবেন না।

সেদিনের বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে যে স্থিতধী, মোহমুক্তি, ও প্রশ্নোর্ধ্ব দেশপ্রেম প্রয়োজন, তা আওয়ামী লীগকে দেখাতে হবে। মুক্তচিন্তার প্রসার, মানবাধিকার রক্ষা, আইনের সংস্কার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ও নারী অধিকারায়ন না করলে এ-দিনের অনেক ভোটার নীরব হয়ে যাবেন। অন্যদিকে হায়েনা ফিরে আসবে নতুন কোন রূপে, আরো শান দেওয়া নখরদন্ত নিয়ে।

২০০১ এর নির্বাচনের পর গৎ বাঁধা কিছু প্রতিশ্রুতির ময়ূরপুচ্ছ গায়ে লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল কিছু হায়েনা। এবারে আওয়ামী লীগও একই ধারার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। সে-কারণেই আশা করতে সংকোচ হয়। ২৬২ টি আসনে জয়ের জন্য যেই নৈতিক উচ্চতা ও সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা লাগে, তা আওয়ামী লীগের নেই। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের প্রচারণাতেই বলা ছিল, তারা বিএনপি-জামায়াত জোটের তুলনায় উন্নততর দেখে তাদের ভোট দেওয়া উচিত। সেই মতেই, বিএনপি-জামায়াত জোট অনেক বেশি খারাপ দেখেই আওয়ামী লীগের অনেক বড় জয়।

আওয়ামী লীগের তাই সবচেয়ে বড় ধন্যবাদ দেওয়া উচিত তারেক জিয়াকে তার অবিমৃশ্যতার জন্য, ডিসেম্বর মাসকে বিজয়ের মাস হওয়ার জন্য, আর অগণিত দেশপ্রেমিককে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে ব্যাপকভিত্তিক জনমত গড়ে তুলবার জন্য।

Thursday, October 16, 2008

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও বাঙালি ভোট

১. আমেরিকায় বাঙালি ভোট ও রাজনৈতিক মানচিত্রে তার গুরুত্ব
বাঙালি স্বভাবগত ভাবেই রাজনীতিমগ্ন জাতি। আমেরিকায় বসবাসকারী বাঙালিরাও এর ব্যতিক্রম নন। আমেরিকার ইতিহাসে স্মরণকালের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই বাঙালিরাও অনেকাংশে নির্বাচন-জ্বরে আক্রান্ত। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রকম বিশ্লেষণ চলছে এই নির্বাচন গিরে। আমেরিকায় বসবাসকারী ভোটারদের নির্বাচন ভাবনার কিছু দিক সেই আলোচনায় উহ্য রয়ে যায়, এবং পৃথক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

অভিবাসীর দেশ আমেরিকায় আইরিশ, ইতালীয়, বা হিসপ্যানিকদের তুলনায় বাঙালিদের বসবাস অনেক কম সময় ধরে। সময়ের আবর্তে ইতালি, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, ভিয়েতনাম, বা মেক্সিকো থেকে আগত অভিবাসীরা মূলধারার মার্কিন সমাজে মিশে গেলেও বাঙালিরা কিছুটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পছন্দ করেন। সুযোগ পেলেই দেশি গান, খাবার, পোশাকে হারিয়ে যাওয়ার তাড়না বাঙালির যাবার নয়। অপরাপর জাতিগুলো এক শব্দে ‘আমেরিকান’ হলেও বাঙালিরা ততটা নয়। আমেরিকায় স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী বাঙালিদের রাজনৈতিক চেতনা তাই মূলধারার আমেরিকার সামাজিক ও আঞ্চলিক উপাদানগুলোর চেয়ে বৈশ্বিক উপাদান দিয়ে চালিত বেশি। এ-কারণে বাঙালিরা সংখ্যায় প্রচুর হলেও আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য কোন অংশ নয়।

ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা এদিক থেকে অনুকরণীয় রকম ভিন্ন। মাত্র ক’দিন আগেই আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ গভর্নর নির্বাচিত ববি জিন্ডাল ভারতীয় বংশোদ্ভূত। শুধু তাই নয়, তিনি নির্বাচিত হয়েছেন লুইজিয়ানার মত রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যে এবং রিপাবলিকান দলের সমর্থনপুষ্ট হয়ে। মুদ্রার অন্যপিঠে আছেন বাঙালিরা, যাঁরা প্রবাসে বসেও দেশের রাজনীতিরই লেজুড়বৃত্তি করেন। ইসরায়েলের পর তাই আমেরিকার অন্যতম মিত্র হিসেবে ভারত উঠে আসছে, ইহুদিদের পর সবচাইতে সুবিধাভোগী হিসেবে ভারতীয়রা জায়গা করে নিচ্ছেন, পেছনে পরে থাকছে বাঙালিরাই।

পরিহার্যতার পীড়াদায়ক বাস্তবতার কারণে বাঙালিরা মূলধারার তুলনায় ভিন্নতর প্রণোদনায় রাজনৈতিক ভাবে উদ্বুদ্ধ বোধ করে থাকে। আমেরিকার ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির উপাদানগুলোর মধ্যে সাস্থ্যসেবা বাঙালিদের কাছে মুখ্য বিবেচ্য। উচ্চমূল্যের কারণে চিকিৎসাবঞ্চিত থাকা থেকে বেরিয়ে আসতে চান তারা সবাই। সাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক নীতির কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টিই গড়পড়তা সব বাঙালির পছন্দ। এই ইস্যুগুলোর পাশাপাশি উদারপন্থা ও অভিবাসীদের প্রতি সহনশীলতার কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টি আমেরিকার অধিকাংশ অভিবাসীর ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। বাঙালিরা তাই প্রার্থী নির্বিশেষে ডেমোক্রেটিক পার্টির নিষ্ঠাবান ভোটিং ব্লক।

সাদা চোখে দেখলে বারাক ওবামা ও জন ম্যাকেইনের দ্বৈরথে বাঙালি ভোটারদের অবস্থান এটুকুতেই সমাপ্ত। মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাঙালিমাত্রেই নীল পতাকাধারী ডেমোক্রেটিক দলের গাধা মার্কায় ভোট দেবেন। প্রশ্ন হল, কতজন বাঙালি ভোট দেবেন, কেন ভোট দেবেন, কতটা উচ্ছ্বাসের সাথে ভোট দেবেন, এবং সেই ভোট কতটুকু মূল্য পাবে।

২. বাঙালি ভোট অবহেলিত হবার কারণ
আমেরিকায় বাঙালি ভোট তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ার একটি বড় কারণ অবস্থানগত। বাঙালিরা যেসব অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন, সেগুলো দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের কোন না কোনটির নির্ভরযোগ্য ঘাঁটি। নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, অরিগন, ম্যাসাচুসেটস, বা ওয়াশিংটনে বাঙালিরা নীলের সাগরে বিলীন। অন্যদিকে টেক্সাস, ওকলাহোমা, বা অ্যারিজোনায় বাঙালিরা রক্ষণশীলদের দুর্গে বন্দী।

এই প্রান্তিক পরিস্থিতির বিপরীত অবস্থানে আছে তথাকথিত ‘সুইং স্টেট’ গুলো। এই স্টেটগুলো তুলনামূলক ভাবে জনবৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়ায় এগুলো নির্দিষ্ট কোন দলের ঘাঁটি নয়। এই গোটা দশেক ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’-এই নির্ধারিত হয় মার্কিন নির্বাচন। নিউ জার্সি কিংবা ফ্লোরিডার মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে নির্বাচনের ফলাফল ঘুরে যেতে পারে বলে দুই দলই এসব এলাকায় ভোটারদের তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। নিউ জার্সির একাংশের শ’খানেক ‘ইহুদি’ ভোটার, ফ্লোরিডার ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ভোটার, বা ওহায়োর ‘ইভ্যাঞ্জেলিক্যাল’ ভোটারেরা তাই উভয় পক্ষ থেকেই ঈর্ষণীয় মনোযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে সংখ্যায় অনেক বেশি হয়েও অনেক এলাকায় ভোটারেরা নির্বাচনের দামামা তেমন একটা শুনতে পাচ্ছেন না।

বিশ্বস্ত ভোটার হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা ডেমোক্রেটিক দলের কাছ থেকেও তুলনামূলক ভাবে কম সমাদর লাভ করে থাকে। সংখ্যালঘু হলেই ডেমোক্রেটিক দলের পক্ষে ভোট দিতে হবে, এই রীতি থেকে বাঙালিরাও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে একটু একটু করে। এক্ষেত্রে ‘সুইং ভোটার’-এর মর্যাদা লাভের চেয়ে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতি অসম্মতির ভূমিকা বেশি। বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে একটি সমান্তরাল উদাহরণ এ-ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে।

অপেক্ষাকৃত সহনশীল ও মধ্যবামপন্থী দল হওয়ার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ধারাবাহিক ভাবে জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট পেয়ে এসেছে। অনায়াসে পেয়ে যাওয়ায় এই ভোট কখনই যথাযথ মূল্য পায়নি, ভোটারদের প্রয়োজনগুলো দল বা সরকারের কাছে প্রাধান্য পায়নি। এই নিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় ও জাতিগত ভাবে সংখ্যালঘুদের প্রতি মনোযোগী না হয়ে বরং তাদের ভুলে গেছে। অল্প কিছু উগ্র ধর্মান্ধ ও জাতীয়তাবাদীর ভোটের লোভে তাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরে আসতে পেরেছে অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে সরব ও অনড় অবস্থান থেকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্রেটিক দলের ব্যাপারে বাঙালিদের কিঞ্চিৎ আশাভঙ্গের কারণটিও অনুরূপ। রিপাবলিকান দলের নিরন্তর আক্রমণের মুখে ডেমোক্রেটিক দল নিজেদের শক্তিশালী ও দৃঢ় হিসেবে জাহির করবার প্রয়োজনে তাদের অনেক মৌলিক নীতির সাথে আপোষ করেছে। সেপ্টেম্বর ১১-র সন্ত্রাসী আক্রমণের পর এটি কিছুটা রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে করা, কিছুটা নেতৃত্বের ব্যর্থতা। তালেবান সরকারের পতন ঘটাতে আফগানিস্তান আক্রমণ বিশ্বের অনেকেই সমর্থন করলেও ইরাক যুদ্ধের পেছনে তেমন কোন কারণই ছিল না। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ একক ভাবে বিশ্বের চোখে খলনায়ক হলেও বাস্তব এটাই যে ডেমোক্রেটিক দলও সেই আক্রমণের সমর্থনে সিনেট ও কংগ্রেসে ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশের খেলাফত মজলিশের মত আমেরিকার‌ কট্টর ডানপন্থী ইভ্যাঞ্জেলিক্যালদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছে ডেমোক্রেটিক দল। এর সাথে আছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির প্রশ্নে ইসরায়েলের পক্ষে নিঃশর্ত সমর্থন, ইত্যাদি। নির্বাচন জয়ের জন্য অল্প কিছু ভোটের সন্ধানে ডেমোক্রেটিক দল এভাবেই পেছনে ফেলে গেছে তার অনেক পুরনো সমর্থকদের।

৩. ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থন – বিল ও হিলারি ক্লিনটন
ইংরেজ ধাঁচের গণতন্ত্রগুলোর সাথে আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। আভিজাত্যের প্রভাব আমেরিকায় নেই বললেই চলে। এদেশে উদয়াস্ত পরিশ্রম করলে যে-কেউ একটি সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ভাষার মানুষের মিশেল হওয়ায় এখানে সামাজিক সহনশীলতা ব্যাপক। আমেরিকার রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যাপারেও কথাগুলো সত্য। এখানে ইংরেজ ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর মত বহু বছর ধরে দলের হয়ে কাজ করে একটু একটু করে উঠে আসতে হয় না। মানুষকে আকর্ষণ ও আস্বস্ত করবার মত গুণাবলি থাকলে যে-কেউ দলের নেতৃস্থানীয় অবস্থানে উঠে আসতে পারেন খুব সহজেই। নির্বাচিত হওয়ার বছর খানেক আগেও তেমন কেউ জিমি কার্টার নামে জর্জিয়ার অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের নাম জানতেন না। তাঁকে হারিয়ে দুই দফার জন্য রাষ্ট্রপতি হওয়া রনাল্ড রেগান ছিলেন হলিউডের ডাকসাইটে নায়ক।

দ্রুত জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা অর্জনের পথটির কারণে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে অধীষ্ঠিতরা তাই প্রায়ই চুম্বক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। তাঁরা নির্বাচিত হবার পর নিজের নীতি ও বিশ্বাস প্রচার করে একটি সুনাম রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দলের সমর্থন ও প্রতিনিধি পরিষদের দলীয় সাংসদদের ভূমিকা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই মূল কৃতিত্বের ভাগিদার হন শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি। একই বাস্তবতা অজনপ্রিয় কাজের বেলায়ও প্রযোজ্য। সাম্প্রতিকতম দুই রাষ্ট্রপতির দিকে তাকালেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হবের ইরাক যুদ্ধ, দুর্বল অর্থনীতি, কট্টর ডানপন্থা, ইত্যাদির দায় মাথায় নিয়ে জর্জ বুশ পৃথিবীময় ঘৃণিত। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তি, আফ্রিকায় ত্রাণ সহায়তা, ও বর্ধনশীল অর্থনীতির কারণে বিল ক্লিনটন সবচেয়ে আদৃত নামগুলোর একটি।

এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালিরা মূলত বিল ও হিলারি ক্লিনটনের একান্ত অনুসারী। বয়োজ্যেষ্ঠ বাঙালিরা, যাঁরা বছর দশেকের বেশি সময় ধরে আমেরিকায় আছেন, তাঁরা অর্থনৈতিক স্বর্ণযুগের কারণে বিল ক্লিনটনকে স্মরণ করেন প্রতিদিন। বিল ক্লিনটনের প্রথম শাসনামলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করার জন্য হিলারি ক্লিনটনের প্রয়াসের কথাও তাঁরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। সেই সাথে হিলারি ক্লিনটন বাঙালিদের মুখ্য বসত নিউ ইয়র্কের সিনেটর, এক কালে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন, ডঃ ইউনুস সহ অনেক বাঙালির পরিচিত, বাংলাদেশের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন, বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় সহায়তা করেছেন। সব মিলিয়ে আমেরিকার রাজনীতিতে বাঙালিদের পছন্দের শীর্ষে আছেন বিল ও হিলারি ক্লিনটন।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রাইমারি নির্বাচনের সময় বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনের মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হয়। বিভিন্ন সময়ে তিক্ততার জন্ম দেওয়া সেই লড়াইয়ের পর আমেরিকা জুড়ে অনেক হিলারি-সমর্থকই বারাক ওবামাকে সমর্থন করা থেকে বিরত আছেন। কেউ কেউ রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাকেইনের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথাও বলছেন প্রকাশ্যে। বাঙালিদের মধ্যে তেমন প্রবণতা না থাকলেও প্রৌঢ়দের মধ্যে এক ধরণের নির্লিপ্ততা চোখে পড়বার মত। এঁদের অনেকেই প্রথম বারের মত ভোটার হয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার আশায়। বারাক ওবামার পক্ষে হয়তো তাঁরা তবু ভোট দেবেন, তবে দল বেঁধে বা উচ্ছ্বাসের সাথে নয়। তাঁরা ওবামার চৌকষ উপস্থাপনা ও স্থিতধী চিন্তায় মুগ্ধ হলেও মন থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না হিলারির বিপরীতে প্রাক-নির্বাচনী লড়াইয়ের সময়ের তিক্ততা।

৪. বাঙালির চোখে ব্যক্তি বারাক ওবামা
এব্রাহাম লিংকনের অঙ্গরাজ্য ইলিনয় থেকে নির্বাচিত সিনেটর বারাক ওবামা পুরো আমেরিকার কাছেই এক নতুন ব্যক্তিত্ব। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অন্যতম কনিষ্ঠ প্রার্থী, মাত্র দু’বছর আগে সিনেটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। এর আগে তিনি বছর সাতেক ইলিনয়ের স্টেট সিনেটে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বারাক ওবামার জাতিগত পরিচয় এখন অনেকেই জানেন। ওবামার বাবা ছিলেন কেনিয়া থেকে আগত, তাঁর মা শ্বেতাঙ্গ, তাঁর জন্ম হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে, তিনি শৈশবে কিছু বছর ইন্দোনেশিয়ায় কাটিয়েছেন। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রার্থী হিসেবে তিনি মূলধারার আমেরিকানদের কাছে সংশয়ের, আর বাঙালিদের কাছে ভয়ের। অনেক বাঙালিই ভয় পান ওবামা আসলেই নির্বাচিত হতে পারবেন কিনা, নির্বাচনে ভোট পেলেও কারচুপিতে হেরে যাবেন কিনা, ভোটে জিতলেও তাঁকে বেঁচে থাকতে দেওয়া হবে কিনা, ইত্যাদি ভয়ের কথা শোনা যায় বাঙালি আলোচনাগুলোয় কান পাতলে।

ওবামার ব্যাপারে প্রৌঢ় বাঙালিদের এই সংকোচের মধ্যে একটি প্রজন্মগত বৈশিষ্ট্যও লক্ষ করা যায়। হিলারি ক্লিনটন ও বারাক ওবামার প্রাইমারি নির্বাচনের সময় উভয়েই ১৮ মিলিয়নের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য দিক হল, হিলারি পুরনো ডেমোক্রেট ও বয়োজ্যেষ্ঠদের ভোট পেয়েছিলেন। এই ভোটে বখরা বসানোর চেষ্টা না করে ওবামা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত করেছেন নতুন ভোটারদের। সদ্য ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশ করা ছেলেমেয়েরা তাঁর হয়ে প্রাণান্ত খাটুনি করেছে। দেশ নিয়ে ভেবেছে, রাজনীতিতে জড়িত হয়েছে। এই ‘আর্মি অফ নিউ ভোটারস’ দিয়েই ওবামা হারিয়েছেন হিলারিকে। প্রৌঢ় বাঙালিদের হিলারির প্রতি সমর্থনের কারণ ও ধরণ মূলধারার আমেরিকান ভোটারদের সাথে মিলে যায় এক্ষেত্রে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ভোটারদের মাঝে ওবামার ব্যাপারে আমেরিকান তরুণ-তরুণীদের অনুরূপ উচ্ছ্বাস ও উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। এই দিক থেকে প্রজন্মগত পছন্দের বিভেদ অনেক প্রকট।

সবশেষে আছে ধর্মের প্রসঙ্গ। হাজার উদারতা সত্ত্বেও আমেরিকায় ধর্মীয় অনুভূতি অন্য যেকোন পশ্চিমা দেশের চেয়ে গভীর। দুই প্রান্তের দুই মহাসমুদ্রের তীরের অভিবাসী-অধ্যুষিত অংশগুলো বাদ দিলে এদেশ অত্যন্ত ধর্মভীরু ও কট্টর। দুঃখজনক বাস্তবতা এটাই যে এদেশে খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বি নন, এমন কারও জন্য রাষ্ট্রপতি পদের মত ক্ষমতাধর কোন অবস্থানে আরোহন দুষ্কর। বারাক ওবামার পুরো নাম বারাক হুসেইন ওবামা। ধর্মবিশ্বাস মতে খ্রীষ্টান হওয়া সত্ত্বেও পিতৃদত্ত এই মুসলিম নামটি তাঁকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। রিপাবলিকান দল ভোটারদের ভীত করার জন্য বারাক ওবামাকে মুসলিম বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে আসছে বহুদিন ধরে। এই মিথ্যা আক্রমণের বিপরীতে এক পর্যায়ে বারাক ওবামা সাংবাদিক সম্মেলনে নিজের ধর্মের কথা খোলামেলা ভাবে বলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি অনেক কালের মধ্যে প্রথম ডেমোক্রেটিক প্রার্থী যিনি গীর্জায় গিয়ে ইভ্যাঞ্জেলিকালদের সাথে দেখা করেছেন, মৌলিক বিভেদগুলো মেনে নিয়ে দেশের কারণে এক হতে বলেছেন। যেকোন ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর চেয়ে তিনি তাঁর ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে সরব। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মকর্ম নিয়ে কোন মাথা-ব্যাথা না থাকলেও গুজব প্রতিহত করতে গিয়ে ওবামার বলা কিছু কথা বাঙালি ও মুসলিম ভোটারেরা কিছুটা মনক্ষুন্ন। তাঁরা আশা করেছিলেন বারাক ওবামা সরাসরি প্রশ্ন করবেন তিনি মুসলিম হলেও কেন তা তাঁকে অযোগ্য করবে। ওবামা তেমনটা না করা রাজনৈতিক ভাবে সমীচিন হলেও এটি অনেকের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

৫. বাঙালির চোখে ব্যক্তি জন ম্যাকেইন
বারাক ওবামার প্রতিদ্বন্দ্বী জন ম্যাকেইন দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অ্যারিজোনা থেকে নির্বাচিত সিনেটর। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তাঁর যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে তিনি আরও অনেকের সাথে যুদ্ধবন্দী হন। জন ম্যাকেইনের পিতা সে-সময় নেভির অ্যাডমিরাল ছিলেন। বাবার ক্ষমতার সূত্রে তাঁর মুক্তির বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সহযোদ্ধাদের ফেলে একা যাবেন না বলে তিনি দীর্ঘ চার বছর থেকে গিয়েছিলেন যুদ্ধবন্দীদের ক্যাম্পে। সে-সময় ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম শাস্তি পেতে হয়েছিল তাঁকে। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি যোগ দেন রাজনীতিতে।

নীতির প্রশ্নে আপোষহীন থাকার একটি সুনাম জন ম্যাকেইনের অনেক দিনের। রিপাবলিকান দলের সমর্থক নন, এমন সবার মাঝেও তাঁর ভাবমূর্তি একজন নিপাট ভদ্রলোকের। আমেরিকার শাসনব্যবস্থায় নিম্নকক্ষ বা কংগ্রেসের হাতে যাবতীয় ব্যয়ভারের দায়িত্ব অর্পণ করা আছে। বাজেট থেকে শুরু করে ছোট ছোট ‘স্পেন্ডিং বিল’ গুলোও কংগ্রেসের হাত ঘুরে আসতে হয়। জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের এলাকার উন্নয়নের জন্য এসব বিলের মধ্যে অনেক রকম প্রকল্প ঢুকিয়ে দেন। রাজনীতির পরিভাষায় এগুলোকে ‘ইয়ারমার্ক’ বলা হয়, আর অপচয়ের কারণে কথ্য ভাষায় বলা হয় ‘পর্ক-ব্যারেল’ (শূকরের মাংস আর মদের ব্যারেল নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠার জন্য বাড়তি টাকা বোঝাতে)। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জন ম্যাকেইন এ-ধরণের অপচয়ের বিরুদ্ধে অনেক শক্ত অবস্থান নেওয়ার কারণে বিখ্যাত।

রিপাবলিকান দলের নেতা হলেও জন ম্যাকেইন মূলত অর্থনৈতিকভাবে রক্ষণশীল। গর্ভপাত বা সমকামিতার ব্যাপারে সামাজিক ভাবে রক্ষণশীল হলেও তিনি জর্জ বুশ বা মিট রমনি বা মাইক হাকাবি-র মত কট্টর নন। অ্যারিজোনা অন্যতম ‘বর্ডার স্টেট’ হওয়ায় তিনি অবৈধ অভিবাসন নিয়েও কাজ করেছেন। অত্যধিক ব্যয়, অভিবাসন নীতি, ইত্যাদি বিষয়ে নিজের দলের বিপক্ষে তিনি অপ্রিয় অবস্থান নিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। এতে করে বহু বছর ধরে জন ম্যাকেইন একজন প্রথাবিরোধী বা ম্যাভরিক হিসেবে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন।

বর্ণিল ক্যারিয়ার ও চারিত্রিক গুণাবলির কারণে জন ম্যাকেইন বাঙালিদের চোখেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ২০০০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী অ্যাল গোর তাঁর ‘রানিং মেট’ হিসেবে বাছাই করেছিলেন জো লিবারম্যানকে। ইসরায়েল ও ইহুদি অধিকার প্রসঙ্গে আমেরিকার অন্যতম কট্টর এই ব্যক্তিকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ায় বাঙালি সহ অনেক মুসলমানের ভোটই হারিয়েছিলেন অ্যাল গোর। সেই বছরও রিপাবলিকান দলের মনোনয়নের জন্য প্রতিযোগিতা করেছিলেন জন ম্যাকেইন। প্রথম দিকের কিছু নির্বাচনে তিনিই জিতেছিলেন, জর্জ বুশ নন। দক্ষিণা অঙ্গরাজ্য সাউথ ক্যারোলিনার প্রাইমারি নির্বাচনের আগে গুজব রটানো হয়েছিল যে জন ম্যাকেইনের একটি জারজ সন্তান আছে। বাস্তবে সেই কন্যা সন্তানটি বাংলাদেশ থেকে দত্তক নেওয়া ব্রিজিট ম্যাকেইন। জর্জ বুশ ও কার্ল রোভের নোংরা কৌশল ও চরিত্রহননের হাতে ধরাশায়ী হলেন জন ম্যাকেইন।

রাজনীতির প্রয়োজনে জন ম্যাকেইন এরপর দিনে দিনে আরো বেশি ডানপন্থী হতে থাকেন। বিভিন্ন রকম ইস্যুতে তিনি নিরলস সমর্থন দিয়ে গেছেন রিপাবলিকান প্রশাসনকে। বাঙালি ও অন্যান্য অভিবাসীদের মধ্যে জন ম্যাকেইনের যেই শক্ত অবস্থান ছিল, তা সেই সময়টা থেকেই লোপ থেকে থাকে। ইরাক যুদ্ধের পক্ষে থাকা, দলত্যাগী জো লিবারম্যানকে সাথে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করা, প্রচারনার কাজে জর্জ বুশের আমলের ব্যক্তি ও কৌশল নিয়োগ, আপোষহীনতার নীতি থেকে সরে আসা, এবং মোটা দাগে একজন রিপাবলিকান হওয়ার কারণে জন ম্যাকেইন শুধু বাঙালি নয়, সবার কাছেই কম-বেশি অসমর্থনের পাত্র।

৬. কেমন যাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এই মুহূর্তে বারাক ওবামা জনপ্রিয়তায় বেশ খানিকটাই এগিয়ে। আমেরিকার ভোটাররা সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তার চিন্তা করলে রিপাবলিকানদের ভোট দেন, আর অর্থনীতির চিন্তা করলে ডেমোক্রেটদের। সেই সাথে যোগ হয়েছে গত আট বছরের দুঃশাসনের ফলে রিপাবলিকানদের প্রতি জমে ওঠা বিদ্বেষ। সব রকম নির্দেশক ডেমোক্রেটদের পক্ষে হওয়া সত্ত্বেও ওবামা বনাম ম্যাকেইন প্রতিযোগিতা বেশ কাছাকাছি ছিল কিছুদিন আগ পর্যন্ত। ওবামা কৃষ্ণাঙ্গ, তরুণ, ও স্বল্পপরিচিত হবার ফলে এরকমটা হয়েছে বলে অধিকাংশ বিশ্লেষক মত ব্যক্ত করতেন।

আমেরিকার নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের কিছু ‘ইলেক্টোরাল ভোট’ থাকে তার জনসংখ্যা অনুযায়ী। সে-কারণেই আকারে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও মন্টানার ভোট সংখ্যা ৩ এবং নিউ জার্সির ভোট সংখ্যা ১৫। ৫০টি অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে ইলেক্টোরাল ভোট ৫৩৮টি। ২০০৪ সালের নির্বাচনে জর্জ বুশ জিতেছিলেন ২৮৬-২৫১ ব্যবধানে। ভোর পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে ছিল ওহায়োর ২০টি ইলেক্টোরাল ভোটের উপর। ঠিক যেমন ২০০০ সালে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ফ্লোরিডার ২৭টি ভোটে।

এবছর এখনও পর্যন্ত বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক দলের ঘাঁটিগুলো ধরে রেখেছেন। স্পষ্ট ব্যবধানে যেসব অঙ্গরাজ্যে এগিয়ে আছেন, তাতে তাঁর পক্ষে ২৬৪ ভোট মোটামুটি নিশ্চিত। বিজয়ের জন্য দরকার আর ৬ টি ভোট, জিততে হবে ৭টি অঙ্গরাজ্যের যেকোন একটি। এগুলোর সবই ২০০৪ সালে জর্জ বুশের পক্ষে গিয়েছিল। একমাত্র ইন্ডিয়ানা বাদে বাকি ৬টিতেই (ফ্লোরিডা, ওহায়ো, কলোরাডো, নেভাডা, ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা) ওবামা এগিয়ে আছেন। শেষ তিন সপ্তাহ এই অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে তিনি স্মরণকালের ব্যাপকতম ব্যবধানে জিততে পারেন। তবে এক্ষেত্রে গলার কাঁটা হয়ে আছে ‘ব্র্যাডলি এফেক্ট’ বলে একটি ঘটনা।

১৯৮২ সালে টম ব্র্যাডলি নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের আগে সব জরিপে তিনি বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন, অথচ নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরাজিত হন। পরবর্তীতে দেখা যায়, প্রাক-নির্বাচন জরিপের সময় ব্র্যাডলিকে ভোট দেবার কথা বললেও কৃষ্ণাঙ্গ বলে অনেকেই তাঁকে ভোট দেননি। এই ঘটনা এবারেও ঘটতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। শেষ মুহূর্তে ভোটিং বুথে ঢুকে অনেকে হয়তো বারাক ওবামাকে তাঁর বর্ণের কারণে ভোট না দিতে পারেন। অন্যদিকে অনেকে ‘রিভার্স-ব্র্যাডলি এফেক্ট’ এর কথাও বলছেন, আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে অনেকে হয়তো ভোটিং বুথে গিয়ে ওবামাকেই ভোট দেবেন, শুধু মুখে বলছেন না আগে থেকেই। এছাড়া আছে সময়ের আগেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যাবার ভয়। বারাক ওবামার সামনের পথটুকু কেমন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজের হাতেই।

Sunday, July 27, 2008

শূন্য আটের দিনগুলিঃ ফর সার্টেইন, ভিকট্রি উইল বি আওয়ারস

৩.১
গল্পটা সম্ভবত নানার কাছে শুনেছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের গল্প। ইউরোপ তখন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার ভয়ে কাঁপছে। বিভিন্ন দেশে গুপ্ত সমাজতন্ত্রী সন্দেহে উইচহান্ট চলছে। এরই মাঝে খবর বেরোলো, ফ্রান্সের অধিপতি চার্লস দ্য গলের ছেলে নাকি তালিকাভুক্ত সমাজতন্ত্রী। এক সাংবাদিক এ-নিয়ে প্রশ্ন করলেন তাঁকে। দ্য গল জবাবে বললেন, আমার ছেলে যদি আঠারো বছর বয়সে সমাজতন্ত্রী না হয়, তাহলে বুঝতে হবে তার কোন সমস্যা আছে। যদি সে চল্লিশ বছর বয়সেও সমাজতন্ত্রী থাকে, তাহলেও বুঝতে হবে তার কোন সমস্যা আছে।

বয়সের সাথে সাথে কিছু মানুষ শক্তিশালী হয়, আর কিছু মানুষ হয় সাবধানী। চেতনার যে-বীজ মানুষের ভেতর শৈশবে উপ্ত হয়, কেউ বয়সের সাথে সাথে তার বাস্তবায়নের জন্য শক্তি সঞ্চয় করেন, বিপর্যয় আর প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করে যান। আবার কেউ বয়সের সাথে সাথে কেমন যেন মিইয়ে যান। তাঁরা কখনো সুশীল, কখনো মধ্যপন্থী, কখনো জাতির বিবেক।

দুটোর মাঝে অনেক মিল থাকা সত্ত্বেও স্বপ্ন পানির চেয়ে মূল্যবান। দুটোই বিনামূল্যে পাওয়া যায়, দুটোই মানুষ হেলায় হারায়। তবে পানির পরিশোধনাগার থাকলেও স্বপ্নের পরিশোধনাগার নেই। বাস্তবায়ন করতে হলে স্বপ্নকে বেহায়ার মত আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়। বয়সের সাথে অনেক স্বপ্নের পঁচন ধরে, অনেক সদিচ্ছা হারিয়ে যায়। নির্লিপ্ততার জং ধরে যায় স্বপ্নগুলোর মধ্যে। কিছুদিন না যেতেই এককালের স্বপ্নবাজেরা হয়ে যান অক্ষম পরাজয়ের পূজারী। তেমনটা হয়ে যাওয়াই সাফল্য, হতে না পারাটা সমস্যা। অন্যথায় রাষ্ট্রযন্ত্র বিব্রত হবে, এর আপদকালীন শান্তিব্যবসায়ীদের বাজার নষ্ট হবে।

৩.২
আইনের প্রয়োগ আদালতে হলেও এর জন্ম মানুষের মনে। নিজের মনে প্রতিটি মানুষ জানে কোন কাজটি অন্যায় কিংবা কার ভোগবিলাস অন্যায্য। মানুষ দূরদর্শী হলেও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নয়। সে-কারণেই অন্যায়ের প্রতিবিধান করবার জন্য আইনের সংশোধন হয়। রাষ্ট্র এতে বাধা দেয়, অহেতুক দুর্যোগের ভয়ে কেউ কেউ গালভরা বুলি ছড়িয়ে শান্ত হতে বলেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বা ইচ্ছাপ্রকাশকে এঁরা বাহুল্য মানেন। পাপাচারীর সানন্দ উপস্থিতি এঁদের কাছে সহনীয়। দু’চারটে চড়-থাপ্পড় মেরে দেওয়া কিংবা উকিল বাপের উপস্থিতিতে হালকা করে বকে দেওয়াই এঁদের কাছে সহজ সমাধান। এরপর যে বিধির হাতে বিধান ছেড়ে দিয়ে বালিতে মুখ গুঁজে সাহিত্যরস আস্বাদন করা যায়!

মাত্র সাঁইত্রিশ বছর গেল। গোলাম আযম নাগরিকত্ব পেয়েছে, শাহ আজীজ সংসদ ভবন চত্বরে শায়িত হয়েছে, কামারুজ্জামান মন্ত্রী হয়েছে, নিজামী রাজসিক অভ্যর্থনার সাথে কারামুক্ত হয়ে রাজনীতিতে ফিরেছে। রাষ্ট্র এদের ব্যাপারে সবসময়ই নীরব। ঝুঁকি নিয়েও এদের প্রাপ্য বিচারের দাবি তুলেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। জনতার আদালতে দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল তাদের কুশপুত্তলিকা। বুঝিবা সাহিত্যচর্চায় ব্যাঘাত ঘটার ভয়েই সুশীলেরা জাহানারা ইমামের উপরও ছিলেন বিরক্ত।

আমি মনে করি না শহীদ জননীর সে-প্রয়াস শুধুই স্বামী-সন্তান হারানোর বেদনা থেকে ছিল। যে-মা হাসিমুখে সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাতে পারেন, তিনি স্রেফ আবেগের বশবর্তী হয়ে সংগ্রামের ডাক দিতে পারেন না। তাঁর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় ছিল, মুক্তি সবচেয়ে বড় আরাধ্য ছিল। কোন দুর্যোগের ভয় তাঁকে বিরত করেনি তাই। সুবিধাবাদীদের দাপট সত্ত্বেও তিনি লড়ে গেছেন একা। স্বপ্নের সাথে আপোষ না করা এই মহীয়সী শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বলে গেছেন যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির কথা।

দ্য গলের সেই গল্প মনে পড়ে। সাথে কাকতালীয় ভাবেই ’০৮-এ মনে পড়ে শহীদ জননীর শেষ চিঠির একেবারে শেষ কথাগুলো। ফর সার্টেইন, ভিকট্রি উইল বি আওয়ারস।

Saturday, July 19, 2008

শূ্ন্য আটের দিনগুলিঃ ভাগ্যিস ’৭১ এ জন্মাইনি

২.১
সবাই শুধু নারীজীবনের দুর্দশার কথা বলে। অসাম্য, অবরোধবাস, অবিশ্বাস, আবেগপ্রবণতা, অযোগ্যতা, ইত্যাদির অনেক অভিযোগের কাঁটা বিছানো পথ পাড়ি দিতে হয় মেয়েদের। নারী হয়ে সফল হওয়া তাই খুবই দুরস্ত, দুষ্কর। অনেক কষ্ট, অনেক বৈষম্য, অনেক দুর্বলতা, অনেক খোটা। সমাজ ও সাহিত্যে এই সত্য আজ মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে পূর্ণতার প্রশ্ন এলে জবাব খুব সহজ একজন নারীর জন্য -- মাতৃত্ব। এটি আত্মোৎসর্গকারী এমন এক নিম্নগামী আবেগ যার ঐশ্বরিকতাকে চেষ্টা করেও ধরাধামে নামানো যায় না।

পুরুষজন্ম সে-তুলনায় অনেক আরামের। প্রত্যাশার আঁতশকাচের নিচে বড় হতে হতে পুরুষমাত্রেই উচ্চাভিলাষী হয়ে যায় একটা সময়। আবেগজনিত কিছু নিয়ে তাদের চিন্তা করতে হয় না। ছকে বাঁধা জীবনে, ছাঁচে মাপা সাফল্য। কিন্তু পুরুষের পূর্ণতার একটি বিশেষ নির্ণায়ক আছে। একটি ছেলের জীবনের পরম আরাধ্য একটাই –- বাবার চোখে একজন যোগ্য মানুষ হওয়া। বাবার মুখে সামান্যতম প্রশংসাও তাই যে-কোন ছেলের কাছে অনেক, অনেক বড়।

আমার বাবা খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। তার ছেলে হওয়াটা মহা ঝক্কির ব্যাপার ছিল। একটু এদিক-ওদিক হলেই শুনতে হত, আমার ছেলেদের এমন করবার কথা না। বলা হত একশ’ জনের চেয়ে আলাদা হবার কথা। অংকে ৯৮ পেলে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করা হত বাকি ২ নম্বর কোথাও গেল। বাবার আদরে-শাসনে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর একটি উক্তি খুব মনে পড়ে যায় –- দশের মধ্যে একজন হয়ো না, দশে এগারো হও।

বয়স তখন আমার বাও-তেও। কোন এক জাতীয় দিবসে একাত্তরের গণহত্যার চিত্র দেখাচ্ছে। কী বলছি, তা বুঝে ওঠার আগেই মুখ দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে গেল -- ভাগ্যিস ’৭১-এ জন্মাইনি! অল্প বয়সে মারা যেতাম তাহলে!

সামান্যতম ত্রুটিও ধরে দেওয়া বাবা আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল নিঃশব্দে।

২.২
আলী আমান আজকে একজন রং মিস্ত্রি। সহায়-সম্বল নেই, ছেলের সংসারে থাকেন, দিনমজুরি করে পেট চালান। তিনি নিবন্ধিত জামাতীদের একটি প্রহসনমূলক অনষ্ঠানে একা গিয়ে হাজির হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছেন। রাজাকারের ফাঁসি চেয়েছেন। গগনবিদারী জয় বাংলা ধ্বনির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। শাস্তিস্বরূপ তাঁকে প্রকাশ্যে লাথি খেতে হয়েছে। অন্ধকার ঘরে বন্দী থাকতে হয়েছে তিন ঘন্টার ওপর।

কোন জরুরী অবস্থা ভঙ্গ হয়নি তাঁর এই লাঞ্ছনায়। কোন সেক্টর কমান্ডার তাঁর সমর্থনে আসেননি। কোন সুশীল এগিয়ে এসে আলী আমানের লাঞ্ছনাকারীদের নারায়ে-তাকবীর ধ্বনির প্রতিবাদ করেননি। তবু আলী আমান পত্রিকা অফিসে এসেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে গেছেন।

একজন আলী আমান যতটা পুরুষ, আমরা সবাই ততটাই নপুংসক। প্রান্তিক মানুষ আলী আমানের এই সাহস সুবিধাভোগী এই আমাদের ভয় পাওয়ার অধিকার দেয় না।

শূ্ন্য আটের দিনগুলিঃ বুড়া মাইনষের মত কাশোস ক্যান?

১.১
দুষ্ট ছিলাম আজীবন, নষ্ট ছিলাম না। মৌলিক কিছু বিধিনিষেধ আর মূল্যবোধ মাথার ভেতর খুব পোক্তভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিল বাবা-মা। তার উপর পড়াশুনা করেছি ক্যাথলিক স্কুলে। আমার দৌঁড় তাই উলটাপালটা দৌঁড়নো আর পিড়পিড় করে কথা বলা পর্যন্ত।

নষ্ট ছেলেপুলেদের দেখতাম মহা আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। এরা স্যারদের পুচ্ছদেশে চকের গুঁড়ো মারতো, সহপাঠীদের বোন'দের দিকে কুনজর দিতো, ক্লাসে নোংরা বইপত্র নিয়ে আসতো। শাস্তির ভয় এদের কখনোই ছিল না। আমরা ডিটেনশনের নাম শুনেই আতঙ্কে কাঁপতাম, ওরা বেতের বাড়ি খেয়েও হিহি করে হাসতো আর নিজের মত বদমায়েশি করে যেত।

ওরা সংখ্যায় কম ছিল, বড়লোকের পোলাপান ছিল, শিক্ষক-ছাত্র নির্বিশেষে সবাই ওদের হাতে ছিল। খেলতে না পারলেও ওরাই বিভিন্ন টুর্নেমেন্ট আয়োজন করে টিম ক্যাপ্টেন হত। বাকিরা ছিল অচ্ছুৎ, খ্যাত। ওরা আমাদের সাথী ছিল না, কিন্তু কীভাবে যেন প্রতিনিধি হয়ে যেত খুঁটির জোরে। যাক যে কথা।

জানি নে কেন জানি মনে পড়ে গেল। একেবারেই কাকতাল, বিশ্বাস করুন।

১.২
ঠোঁট না নাড়িয়ে কথা বলা ছিল আমার প্রিয় দুষ্টামি গুলোর একটি। একবার ক্লাসে স্যার অংক করতে দিয়ে পায়চারি করছেন। পুরো ক্লাস জুড়ে পড়ানোর বদলে একটু আরামে সময়টা পার করে দেওয়া আর কি। অংক মিলে যাবার পর আমি মনে সুখে আড্ডা মারছি। আশপাশ দিয়ে গেলে গুমগুম আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষক মহাশয় ক্রমাগত আমার পাশ দিয়ে হেঁটে চলছেন। আমিও কথা বলছি, তিনিও বুঝতে পারছেন যে আমি-ই কথা বলছি। তবে ধরতে পারছেন না হাতে-নাতে।

হঠাৎ কাশি এল খুব। নেহায়েত নির্বিষ একটা কাশি দিলাম খুকখুক করে। তৎক্ষণাৎ ধুম করে এক কিল পড়লো পিঠে।

“এই ব্যাটা, বুড়া মাইনষের মত কাশোস ক্যান?”

এটাও কেন জানি মনে পড়ে গেল। কালতাল মাত্র, বিশ্বাস করুন।

Wednesday, July 16, 2008

রাজাকারের লাথিতে মাকড়সার গৃহধ্বংস

আমাদের পরিচিত জীবনধারাটি খুব বেশি যৌগিক। জীবন গঠনের মৌলিক উপাদানগুলোর সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই অনেক দিন হয়। একটা সময় মানুষ জীবন নিয়ে খুব গভীর ভাবে ভাবতো। একেকটি নতুন অনুভবের সাথে ঝংকার তুলতে নিত্য-নতুন শব্দের জন্ম নিত। আজকাল কেউ আর এসব ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। জীবন অনেক দ্রুত এবং জটিল হয়ে গেছে, এমনটাই দাবি করি আমরা। ফলাফল অপ্রত্যাশিত নয়।


আগে মনের অবস্থা স্বাভাবিকের থেকে ভিন্ন হলে তাকে অনেক রকম নাম দিতাম। উদাস, উৎফুল্ল, প্রশান্ত, আশ্বস্ত, বিরহী, ব্যথিত, আড়ষ্ট, আতঙ্কিত, অভিমানী। এখন শুধুই ‘কেমন-কেমন’ লাগে। আগে গৃহের বাঁধন ছিড়ে বের হলে গন্তব্য হত নিরুদ্দেশ, অসীম, তেপান্তর, দিগন্ত, মহাকাল, সিদ্ধিলাভ। এখন শুধুই ‘এইতো সামনে’। আগে কিছু খাওয়ার জন্য মন উচাটন হলে সবকিছুর কথা আলাদা করে বলতাম। তেল, ঝোল, নুন, মশলা, মরিচ, রঙ, সুবাস, উত্তাপ। এখন খাবারটুকু ‘ইয়াম্মি’ হলেই খুশি। আগে পাশের মানুষটিকে বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন ভাবে দেখতাম। বন্ধু, সাথী, জীবনসঙ্গী, উপদেষ্টা, ভরসাস্থল, আত্মীয়, আপন, অচিন, আরাধ্য। এখন দু’টি করে হাত ও পা থাকলেই খুশি।


পাহাড়ে বসত করলে যৌগিক জীবনের মৌলিক উপাদানগুলো খুব বেশি বিশ্লিষ্ট হয়ে চোখে পড়ে। এখানে আবহাওয়া মানে শুধু ‘আহ্‌’ বা ‘ধ্যাত্‌’ নয়। একেকটি ঋতুর মাঝে বিভেদ খুব স্পষ্ট। একই ভাবে কোন সঙ্গীর সাথে পাহাড়ে দিনাতিপাত করলে কিছুদিন পরই জীবনে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। ইন্দ্রিয়গুলোও স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে পাহাড়ি জীবনে। কখনো বুক ভরে শ্বাস নিলেই শরতের প্রাণ টের পাওয়া যায়। কখনো ভেজা বাতাসের স্পর্শ বলে দেয় বৃষ্টি এল বলে। কখনো হিমশীতল বাতাসের শনশন শব্দ শীতের উপস্থিতি জানান দেয়। কখনো ফুলেল গন্ধ বসন্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।


পাহাড়ি জীবন সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার জন্য রইলো বাকি দুই। একটি পঞ্চেন্দ্রিয়ের শেষটি, দৃষ্টি। অন্যটি বাবা আদমের আমল থেকে রক্তে বয়ে চলা আদিম রোগ, দৈনন্দিন সঙ্গীর অভাববোধ। আমার জানালাটা দৃষ্টিসুখের প্রয়োজন মেটায় খুব ভাল ভাবে। কম্পিউটারে কাজ করতে করতে পেছনে প্রকৃতির খেলা দেখা অনেক দিনের অভ্যাস হয়ে গেছে। একটা সময় অবিরাম তুষারপাত দেখতাম, এখন অঝোর বর্ষন দেখি। সকাল হলে এই জানালা দিয়েই সূর্য উঁকি দিয়ে ঘুম ভাঙায়। বছরের বিভিন্ন সময়ে এই জানালা দিয়েই পাহাড়ের রঙ-বদল দেখি। একাকী সেই দিনগুলোয় সাথে থাকতো আমার একমাত্র সঙ্গী, ছোট্ট একটা মাকড়সা।


জানালার এক কোণায় ছিল এই মাকড়সাটার বসবাস। কেউ কাউকে জ্বালাতাম না। কোন চিন্তায় আটকে গেলে ওর দিকেই তাকিয়ে বিড়বিড় করতাম আপন মনে। অজান্তেই একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। অনেক অলস দুপুর কেটেছে স্রেফ মাকড়সার লাফালাফি দেখে। আমিও ওকে ঘাটাতাম না, ও-ও জাল বুনে বিরক্তির কারণ হত না। অসম ও অস্বাভাবিক বিধায় বন্ধুত্ব ছিল না, কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। গতকাল মেজাজ খারাপ করে আমার একমাত্র সঙ্গীকে ফেলে দিয়ে এসেছি। অভ্যাসবশত, চোখ আজো ঘরে ঢুকেই কাউকে খোঁজে, বাসার অন্যতম প্রাণিটির অভাবে বিষণ্ণতা আরো বেশি গ্রাস করে।


মেজাজটা খারাপ হয়েছিল রাজাকারের হাতে মুক্তিযোদ্ধার লাঞ্ছনা দেখে। অক্ষম আমি সেই ক্রোধ ঝাড়লাম অবল এক মাকড়সার ওপর। আমার ঘর, আমার খাবার, আমার জানালা। কোনদিন তো আমার মত হবি না, আমার বন্ধু হবি না। তবে অযথা আমার জায়গায় ভাগ বসাচ্ছিস কেন? নিজের মত জায়গা খুঁজে নে, নয়তো দূরে গিয়ে মর। এই ভেবে কাগজবন্দী করে হতচ্ছাড়া মাকড়সাটা ফেলে দিলাম গতকাল। রাগ নেমে যাবার পর থেকেই মন বেশ খারাপ। কারো উপকারে আসতে না পারি, অন্তত কারো ক্ষতি করছিলাম না। হোক না সে ছোট্ট এক মাকড়সা।


আজকে সকাল থেকে বারবার চোখ যাচ্ছে জানালার কোণার দিকে। আমার চোখ শুধু পাহাড় নয়, মাকড়সাও দেখতো। শূন্যতা থেকে সেটাই বুঝতে পারছি। ক্রোধ আর নিঃসঙ্গতা মেশানো অস্বস্তিকর একটা অনুভূতিতে ডুবি-ভাসি করে কেটে গেল পুরো দিন। ভেবে মনে হল, স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের কাছে আমাদের ক্রমাগত পরাজয়ের পেছনে জীবনের যৌগিকতার কাছে পরাজয় একটি বড় কারণ।

যে-কোন কারণেই হোক, আমরা মূল্যবোধগুলোকে আর আলাদা করে চিহ্নিত করি না। স্বাধীনতা, বীরত্ব, দেশপ্রেম, সততা, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, কিংবা অধিকারবোধের চেয়ে ‘হবে একটা কিছু’ই বড় এখন। স্বাধীনতাবিরোধিতা তাই আমাদের রাগায় না, দেশদ্রোহিতা করে না উচ্চকণ্ঠ। ইতিহাসবিকৃতির কথা উঠলে আমরা সত্যভাষণের চেয়ে রাজনৈতিক দলাদলি করি বেশি, রাজাকারের আস্ফালন দেখে দায়িত্বহীনতার অভিযোগের আয়নাগুলো নিজের বদলে অন্যের মুখের সামনে ধরি।


খুব প্রত্যাশিত ফল হিসেবেই আত্মশুদ্ধি বা আত্মোপলব্ধির বদলে আমরা নিষ্ফল আক্রোশ প্রকাশ করি ভাঙচুর বা গালাগালির মাধ্যমে। আড়ালে ওরা আরো সংগঠিত হয়, আরো বেশি লজ্জা দেবার জন্য। রাজাকারের লাথিতে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজকে নিজের দায়িত্ব বলে জ্ঞান করে না, সুশীল সমাজ ঠুনকো বিভেদের উর্ধ্বে ওঠে না, হাইকোর্টে কমান্ডার নিজামির জামিন নামঞ্জুর হয় না, রাজনীতির নামে দুর্জনদের সাথে আঁতাতের জন্য বড় দলগুলো ক্ষমা চায় না, ধৃষ্টতার প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামি’র অফিসে একটা ঢিল পড়ে না, বিচারপতি জে আর মোদাচ্ছিরের বাসার দেওয়ালে কেউ রক্তাক্ষরে ‘ছিহ্‌’ লেখে না, মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘরে একটা পয়সা অনুদান পড়ে না। অযথা নির্বিষ, নির্বান্ধব একটা মাকড়সার গৃহধ্বংস হয় দশ হাজার মাইল দূরে।

Thursday, July 03, 2008

নিজস্ব ধাঁচের গণতন্ত্রঃ ৬

৬. ডিস্ট্রিবিউটেড সিঙ্গুলারিটি
জাতিগতভাবে আমাদের বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটা হল উদ্ভাবনী শক্তির অভাব। অন্যের অনুকরণেই শুধুমাত্র আমাদের সুকুমারবৃত্তিগুলো জেগে ওঠে। বিজ্ঞান থেকে সঙ্গীত পর্যন্ত সর্বত্রই এক অবস্থা। উদ্ভাবনের উপহার সবার মধ্যে থাকে না। এতে দোষেরও কিছু নেই। তবে যে-বিষয়টি ঐকান্তিক ভাবে প্রয়োজন, তা হল শূন্যতা সম্পর্কে সচেতনতা। উদ্ভাবকেরা শূন্যতাকে পূরণ করার উপায় বের করেন, আর শূন্যতা সম্পর্কে সচেতন মানুষেরা সেই উদ্ভাবনকে ছড়িয়ে দেন সর্বত্র। নেতৃত্বের ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম। বড় নেতা খুব কম মানুষই হতে পারেন। অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বহুযুগে একজন গান্ধী বা বঙ্গবন্ধু আসেন, তবে তাঁদের সাফল্য নির্ভর করে প্রজন্মের উপর। প্রস্তুত ও উপযুক্ত প্রজন্ম ছাড়া কোন নেতাই সফল হতে পারেননি। ইতিহাসের মহানায়ক বিরল ও দৈব হলেও ইতিহাসের সাক্ষী ও বাস্তবায়নকারীরা সাধারণ মানুষ। শূন্যতা নিয়ে সচেতন না হলে কোন জাতি প্রস্তুত হতে পারে না তার মহানেতার জন্য।

অনুকরণপ্রিয়তা থেকেই আমরা ভাবতে ভালবাসি যে গণতন্ত্র আমাদের শূন্যতাগুলো পূরণের জন্য শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। এই ভাবনাটি ভুল, এমন কোন তত্ত্বের অবতারণা করছি না। তবে প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক, আমাদের গণতন্ত্রমুখীতার কতটুকু সচেতন। আমরা জানি যে আমাদের অঞ্চলে একনায়কতান্ত্রিক যেকোন শাসনব্যবস্থাই স্বৈরাচারী দৌরাত্ম্যের রূপ নিয়ে ফেলে। নোংরা সাম্রাজ্যবাদ বলতে যা বোঝায়, তা পশ্চিমেও ছিল। তবে রাজায় রাজায় যুদ্ধের যুগ পেরিয়ে এখন অনেক সভ্য ও শালীন ভাবে রাজনীতি পরিচালিত হয় পশ্চিমে। বিভিন্ন রকম ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও পাশ্চাত্য সমাজ অনেক সহনীয়, তাদের বেলায় এককেন্দ্রীক শাসনব্যবস্থা কার্যকর। অন্তত এমনটাই আমাদের ধারণা, আর এমনটাই পাশ্চাত্য প্রচার করে থাকে।

প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের তফাৎগুলোর জন্য রাজনীতি যতটা, তার চেয়ে পারিবারিক ব্যবস্থা হয়তো কিছুটা বেশি দায়ী। এক প্রজন্ম আগ পর্যন্ত সনাতন বাঙালি পরিবারে বাবার বয়স মায়ের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। বন্ধু বা জীবনসঙ্গী হওয়ার আনন্দের চেয়ে অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিয়ে পুরুষদের ভাবতে হয়েছে বেশি। বাঙালি পরিবারে স্বামী বা পিতা বা বড় সন্তানের অবস্থান তাই যতটা আহ্লাদের, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বের। পরিবারের কর্তার জীবন কাটে হরেক রকম হিসেব-নিকেশে। ফলাফলস্বরূপ আমার মতই অনেকে বেশি বয়সে এসে বাবার চরিত্রের নরম দিকটির সাথে পরিচিত হন। তার আগ পর্যন্ত বাবা মানেই বিভীষিকা, বাবা মানেই বাঘের মত ভয় পাওয়া।

এতকিছুর পরও ছেলেবেলায় প্রিয় ব্যাক্তিত্বকে নিয়ে রচনা লিখলেই সবাই বাবা, নয়তো নবীজী (স) এর নাম লিখতাম। আমার বাবা অত্যন্ত সজ্জন মানুষ, তিনি মিঠে-কড়া শাসনে আমাদের লালন-পালন করেন, সকাল হলে বাবার আযানে ঘুম ভাঙে, সন্ধ্যা হলে বাবার সাথে মাগরিবের নামায পড়ি, রাতে বাবা আমাদের দুই ভাইবোনকে অত্যন্ত যত্নের সাথে লেখাপড়া করান, রাতের খাবারের পর বাবার তেলাওয়াত শুনতে শুনতে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, ইত্যাদি কথা আমরা প্রত্যেকেই লিখেছি জীবনে কখনো না কখনো। বাবা নামক অনুপ্রেরণাদায়ী মহীরূহগুলো না থাকলে কি এই চোথামারা রচনাগুলো থাকতো না? খুব থাকতো। দেশ-বিদেশের শিক্ষা আর অগণন বর্ষা-বসন্ত পেরিয়ে এসে আজও প্রিয় ব্যাক্তিত্বকে নিয়ে রচনা লিখলে আমি আমার বাবার কথাই বলবো। শুধু আমি নই, প্রায় সবাইই লিখবেন। এই অনুপ্রেরণার ভূমিকা আমাদের সমাজে ব্যাপক। কঠোর, কর্কষ বাবাগুলো প্রাচ্যের পরিবারে যতটা একনায়ক, তার চেয়ে অনেক বেশি নায়ক।

প্রাচ্যের তুলনায় এই দিকে পাশ্চাত্য একেবারেই আলাদা। এখানে আদৌ এই ধরণের মধ্যযুগীয় বিষয়বস্তু দেওয়া হয় না। বাড়তি কিছু নম্বর পাওয়ার আশায় সেখানে ধর্মের চর্বিতে চুবিয়ে চুবিয়ে রচনা লিখতে হয় না। তবে প্রিয় ব্যাক্তিত্ব নিয়ে রচনা লিখতে দেওয়া হলে অনেক রকম প্রিয় ব্যাক্তিত্ব পাওয়া যাবে। হেমিংওয়ে থেকে জিম মরিসন পর্যন্ত অনেক রকম নাম ঘুরে-ফিরে আসবে। এখানে মানুষ নিজের ইচ্ছা আর স্বপ্নগুলোর সাথে মিলিয়ে ব্যাক্তিত্ব পছন্দ করে। আমি যে-পথে যেতে চাই, সে-পথের অগ্রণীই তো হবেন আমার আদর্শ। যারা ঝরে যাওয়ার চেয়ে মরে যেতে পছন্দ করে, তারা কার্ট কোবেইনকে প্রিয় ব্যাক্তিত্ব মানে। যারা বিশ্বশান্তির জন্য কাতর, তারা জন লেননকে স্মরণ করে। নারীবাদীরা আপাদমস্তক শ্রদ্ধাবনত হয়ে ওপরাহ্‌’কে মানে। প্রথাবিরোধী আর মুক্তিকামী মাত্রই চে গেভারা’র পোস্টারের দিকে তাকিয়ে নির্ঘুম রাত কাটায়। খোঁজ নিলে এরকম অজস্র পছন্দ পাওয়া যাবে পশ্চিমে।

এই স্বাধীন পছন্দগুলো পশ্চিমের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গণতান্ত্রিকতাকে ইঙ্গিত করে। ডিস্ট্রিবিউটেড ডেমোক্রেসির পশ্চিমে বিনয় জীবনের অংশ হিসেবেই আসে, আর অথরিটি আসে শাসনের পথ হিসেবে। পশ্চিমা সমাজে পরিবার অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। স্ত্রী-পুরুষ-পুত্র-কন্যা-চাচা-মামা-বন্ধু নির্বিশেষে সবার মতামতের ভূমিকা আছে পরিবারে। হুকুম দেওয়া হয় অনুরোধের সুরে। আমার মনে হয় তোমার এই কাজটা করা উচিত, তুমি বোধহয় এটা করতে পারলে খুশি হবে, আমি হলে মনে হয় এভাবে করতাম কাজটা। এভাবেই কর্তৃত্বের বদলে অনুপ্রেরণা আর যুক্তি দিয়ে চালিত হয় জীবন।

প্রাচ্যের অবস্থা উলটো। একারণে এখানে এমন ব্যবস্থা দরকার, যা পূর্বের সামাজিক রীতিকে প্রতিফলিত করে। আমরা দু’টাকা বেশি জুটলেই ভাবি আত্মীয়-পরিজনের কথা। নিজের লোক ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না, মাইক ও ক্ষমতা পেলে ছাড়তে চাই না। নিজগৃহের দায়িত্ব ও কর্তৃত্বপরায়নতার রেশ চলে আসে আমাদের রাজনৈতিক জীবনেও। দেশটা পশ্চাৎপদ, আমাদের অনেক কাজ বাকি, সময় কম, মানুষের মাঝে শৃঙ্খলাবোধেরও অভাব ভীষণ। এরকম অবস্থায় কিছু মাত্রায় হলেও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা একটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা। সীমিত মাত্রায় এধরনের এককেন্দ্রিকতার প্রচলন করতে আমরা খুচরো নির্বাচনগুলোয় শুধু মূল নেতাকে নির্বাচিত করতে পারি। অতঃপর তাঁকে নিজের পছন্দমত লোক নিয়োগ করার অধিকার দেওয়া যায়।

বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারী আমলারা একই জায়গায় থাকেন, শুধু তাঁদের মাথার উপর মনিব বদল হয়। এই ধারাটির পরিবর্তন করে প্রত্যেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে তাঁর পছন্দের লোকজনকে নিয়ে কাজ করার অধিকার দেওয়া উচিত। এতে করে মেয়াদশেষে তাঁর কাছে জবাবদিহিতা চাওয়াও অনেক সহজ ও স্বচ্ছ হবে। আগের আমলের রেখে যাওয়া আমলাতন্ত্রের কারণে কাজ গতিশীলতা পায়নি, এমনটা কেউ দাবি করতে পারবেন না তখন।

নেতার জন্যও এধরনের ব্যবস্থা উপকারী হওয়া উচিত। যোগ্য মানুষের সাহচর্য না পেলে যোগ্যতার অবস্থানে যাওয়া দুষ্কর। পথে-প্রবাসে অনেকের সাথেই আমাদের চেনা-পরিচয় হয় যাঁরা দেশ পরিচালনার কাজে সাহায্য করতে পারেন। তাঁদের ফেলে আমলাতন্ত্র বা দলীয় প্যানেল থেকে বেঁধে দেওয়া কাউকে নিয়ে প্রশাসনিক কাজ সমাধা করার পদ্ধতিটি আমাদের অহেতুক বিবাদ ছাড়া কিছু দিচ্ছে না। পারিবারিকতা আর স্বেচ্ছাচারে সম্মিলিত কুফল এমনিতেও থাকবে। আত্মীয়পরায়নতা কোন না কোন মাত্রায় বিদ্যমান থাকবেই আমাদের সমাজে। আমরা জোর করে এগুলো এড়াতে চাই, চাই জোর করে হলেও ঐক্য চাপিয়ে দিতে। বাস্তব হল, যেকোন কিছুই নিয়মে নিষিদ্ধ থাকলে তা নিয়ে ঝামেলা হয় বেশি। অনুশাসনের বাড়াবাড়ি ও তার কুফলগুলো আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। নির্বাচিত হবার পর তাই সীমিত, নিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারের অধিকার দেওয়া যায় রাজনীতিকদের।

নিজের মানুষ বা কাছের মানুষদের নিয়ে কাজ করবার অধিকারটুকু পেলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা লেগেসি নিয়েও চিন্তিত হবেন, যেমনটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যায় প্রশাসনিক বিভাগকে নিয়ে। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি নিজের দল ও মতের লোকেদের নিয়ে প্রশাসন সাজান। চাইলে পুরনো কর্মকর্তাদেরও রাখেন। এসব খুঁটিনাটি নিয়ে কেউ ঘাটায় না। শাসনকালের মেয়াদ শেষ হলে রাষ্ট্রপতিরা নিজের নামে লাইব্রেরি বা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, লেখালেখি করেন, নয়তো বিশ্বময় ঘুরে বেড়ান শান্তির খোঁজে। ক্ষমতার পাশাপাশি দায়-দায়িত্বও ব্যক্তির ঘাড়ে দেখে এককেন্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দেরিতে হলেও লেগেসি নিয়ে চিন্তা দেখা যায়। একক ক্ষমতার মাদকতা থেকে কেউ সহসা বের হয়ে আসতে পারেন না। স্বল্পমেয়াদে তো নয়ই। তবু পৃথিবীর সব একনায়কই নিজের ভাবমূর্তি সম্পর্কে সচেতন। সিজার থেকে এরশাদ পর্যন্ত কেউ এর ব্যতিক্রম নন। যেখানে শাসনব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে হয়, সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই এই চেতনার উন্মেষ একটু দেরিতে হয়।

পশ্চিমের সমাজে বিভিন্ন রকম শাসনব্যবস্থায় এই রকম একনায়কতন্ত্র ছড়িয়ে আছে, যা সমাজের তৃণমূলের গণতান্ত্রিকতার সাথে এক ধরণের প্রয়োজনীয় বৈপরিত্য সৃষ্টি করে। যেখানে সমাজ গণতান্ত্রিক, সেখানে শাসনব্যবস্থা একনায়কতান্ত্রিক। প্রাচ্যে পরিবার কাঠামো থেকে মজ্জায় ঢুকে যাওয়া এক ধরণের প্রশাসনস্পৃহা আমাদের বিরত রাখে রাজনীতি কিংবা আইন প্রণয়ন থেকে। সেকারণে আমাদের দেশে সংসদের নিম্নকক্ষ কিংবা স্থানীয় সরকারে বিশ্লিষ্ট ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় নিয়মতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র, দেওয়া যায় পরিমিত স্বেচ্ছাচারের সাময়িক অধিকার। রাজনীতি আর প্রশাসনের মাঝের খিচুড়ি সম্পর্কটি এভাবে পৃথক সম্ভব।

মোটা দাগে বিবেচনা করলে পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা শাসনব্যবস্থাগুলো সংসদীয়, নয়তো রাষ্ট্রপতিশাসিত। এই দুই শাসনব্যবস্থার মূল পার্থক্য লেজিসলেটিভ বনাম ইন্সপিরেশনাল। একটিতে অনেক সময় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে শুদ্ধ ও সঠিক আইন প্রণীত হয়। অন্যটিতে নেতার আদর্শে জাতি স্বপ্ন দেখে। সম্প্রতি হিলারি ক্লিনটন ও বারাক ওবামার মধ্যকার প্রাইমারি নির্বাচন এই বিষয়টি চোখের সামনে নিয়ে এসেছে দারুণভাবে। হিলারি ও ওবামার মধ্যে সবচেয়ে গভীর পার্থক্য ছিল চিন্তা ও কার্যধারায়। দু’জনেই অল্প সময় ধরে সিনেটর থাকলেও একজন বিভিন্ন রকম নেগোশিয়েশনে পারদর্শী, আরেকজন ইন্সপিরেশনে। একজন জনসভায় খুঁটিনাটি হিসেব করে করে বোঝাতেন কী করবেন এবং কেন, অন্যজন লোমহর্ষক বক্তৃতায় হাজার হাজার মানুষকে উজ্জীবিত করতেন আত্মোন্নতিতে নিয়োজিত হতে।

আমাদের শাসনব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ে বাবার মতই একনায়ক আমরা। এই পর্যায়টায় সবাই প্রশাসনমনস্ক। পক্ষান্তরে উপরতলায় নিজ নিজ পরিবার ও পরিপার্শ্বের দেওয়া শিক্ষা নিয়ে দর কষাকষি করে আমরা সম্মিলিত সামাজিক মূল্যবোধের জন্ম দেই। আমাদের দেশটার জনসংখ্যা অনেক বেশি দেখেই আমাদের সমাজে অনুপ্রেরণার ভূমিকা প্রবল, ঠিক যেমন আমাদের পরিবারগুলো বড় দেখেই সেখানে বাবাতন্ত্রের প্রচলন বেশি। আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একক অংশগুলোকেও এভাবেই গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন শুধু কিছু নিঃসংশয়, নিঃসংকোচ মানুষের।

যদি বলেন বাঙালি সংশোধনের অযোগ্য একটি স্বার্থপর জাতি, তবে বলবো অন্ধকারের পরই প্রখরতম সূর্য আসে। যদি বিশ্বাস করেন যে বাঙালির স্পৃহা ও সম্ভাবনা অমিত, তবে হাল না ছেড়ে কণ্ঠ ছাড়ুন জোরে। হয়তো রাজনীতির পথে-প্রান্তরে আমার মতই আপনারাও স্রেফ নিজের মতে অত্যন্ত সরব থাকবেন। তবু আমারই মত বেহায়া স্বপ্নবাজি করে দিন কাটাবেন আপনারাও। বিবাদ হবে, ঝামেলা আসবে, ঝগড়া বাঁধবে, লাশ পড়বে। তবু বেহায়া বাঙালির বেহায়া স্বপ্ন থেমে থাকবে না। হতাশাবাদীরা যা-বলে বলুক না কেন, এখানেই আমাদের নিজস্বতা। স্বাধীনতা আর সমঝোতার এই মিশেলই আমাদের নিজস্ব ধাঁচের গণতন্ত্র।