Showing posts with label দিনলিপি. Show all posts
Showing posts with label দিনলিপি. Show all posts

Monday, July 13, 2009

প্রবাসের কথোপকথন - ১৮

– বোর্ডিং পাস আর আইডি দেখাও।
: লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটা পঙ্গু, অথর্ব মানুষ আমি। এত জায়গায় আইডি দেখালাম, এখন প্লেনের দুয়ারে এসেও ঝামেলা করতে হবে, তাই না? কত যে ঘাঁটাতে পারো তোমরা!

– এই ছোকরা, ফেলে চলে যাবো কিন্তু তাহলে। আমি মানুষ খুব খারাপ।
: আচ্ছা দেখো, দেখো। হুঁ, আমি জানি সিট কোথায়। বেছে বেছে সামনের দিকের আইল সিট নিয়েছি। এখন এই নরাধমকে দেখতে দেখতে যেতে হবে তোমার।

– দেখা যাবে কী হয়। এ কী, লাঠি হাতে রেখেছো কেনো? ওটা কোথাও সরিয়ে রাখতে হবে। কষ্ট করে উপরে তুলবার দরকার নেই। আমি আমার কোট ক্লজেটে রাখছি। প্লেন থামলে এনে দেবো।
: তথাস্তু। এই নাও। তোমাদের প্লেনে তো সামনের দিকেও অনেক আওয়াজ দেখছি।

– ব্যাপার না। এই ব্রাউনিটা একটু চেখে দেখো তো। আজকের বিশেষ খাবার এটা। বয়ফ্রেন্ডের জন্য কিছু নিয়ে যাবো কিনা ভাবছি।
: ভুল মানুষকে দিলে। আমি চিনি বেশি খাই। এক কাপ চায়ে চার-পাঁচ চামচ পর্যন্ত নিয়ে ফেলি। অন্য কাউকে দাও।

– কেউ তো নিচ্ছে না দেখি। তা তুমি এমন বেজার মুখ করে বসে আছো কেনো? ঝামেলা হয়েছে কোনো?
: নাহ, তেমন কিছু না। ট্রাভেল কিট-এ আমার সবকিছু থাকে, তবুও কী সব নিয়মের জন্য একটা একটা করে বের করে জিপলক ব্যাগে ঢুকাতে হল। এবারে দেখলাম নেল-কাটার, সেফটি-রেজার, ইত্যাদি নিতে দিচ্ছে। আমার একটা ৭ আউন্সের কৌটায় কয়েক ফোঁটা আফটার-শেভ ছিলো, সেটা নিতে দিলো না। বলে, কৌটার ভেতরে যতটুকুই থাকুক, কৌটার আকার ৩ আউন্সের বেশি হতে পারবে না। যন্ত্রণার শেষ নেই।

– মন খারাপ কোর না। কী ড্রিংক নেবে তুমি? বাড়তি একটা কোক রেখো তাহলে। তোমার দুস্থ অবস্থার সম্মানে।
: চিয়ার্স টু অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন!

– কেনো, এমনিতে কি বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া যায় না? যাক, কাজে নামি আমি এবার।
: তা তো অবশ্যই। তোমার গৎবাঁধা কথাগুলো বলে নাও। আমি পালাচ্ছি না।

– উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি মেমফিস থেকে গ্রিন্সবোরো পর্যন্ত এই ফ্লাইটে। আমাদের আনুমানিক যাত্রাকাল সাড়ে ছয় ঘন্টা…
: সে কী? টিকেট তো বলছে দেড় ঘন্টা!

– গত ফ্লাইটের কথা ভুলে গেছো? মিসিসিপি’র উপর ঝড়-বাদলা হওয়ায় গত ফ্লাইটে আমাদের আকাশে চক্কর দিতে হয়েছে আড়াই ঘন্টা। এক ঘন্টার ফ্লাইটের জন্য আড়াই ঘন্টা বাড়তি দেরি হওয়ায় তোমরা সবাই বিরক্ত, তাই এবারে আমি একটু বেশি করে বলে দিলাম আর কি।
: গড ফরবিড। মনে হয় না এমনটা হবে এবার। এদিকের আকাশ পরিষ্কার দেখলাম রওনা দেওয়ার আগে।

– সিট বেল্ট ও ইমার্জেন্সি বিষয়ক খুঁটিনাটিগুলো মেনে চলার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমার পক্ষে যদি আপনাদের এই যাত্রা কোনভাবে আনন্দদায়ক করা সম্ভব হয়, তবে নিঃসংকোচে জানাবেন। আপনাদের মনোরঞ্জনের জন্য আমি যেকোন কিছু করতে প্রস্তুত। এনিথিং টু মেইক ইয়োর ফ্লাইট এনজয়েবল অ্যান্ড কমফোর্টেবল… উইদিন রিজন। আই ডোন্ট ডু ফুট মাসাজ; নট এনিমোর। সো, ডোন্ট অ্যাস্ক। একটু পর তোমাদের আমি কিছু খাবার দেবো। তারপর সময় করতে পারলে গল্প শোনাবো, আর সবশেষে থাকবে গান।
: বিমানবালা বেশ রসিক দেখছি। আপনি তো মনে হয় অনেক ঘুরে বেড়ান। সব সময়ই কি এমন?

– সব সময় না। তবে এই জন তো অনেক বেশিই খোশ মেজাজে আছে মনে হয়। বাকি পথ আরামে কাটলেই হয়। তুমি ছাত্র?
: জ্বী, আমি ভার্জিনিয়া টেকে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। তড়িৎকৌশলের ছাত্র। আপনিও কি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট?

– নো, বাট আই হ্যাভ আ বিয়ার্ড! আমি কর্নেল থেকে পাশ করেছিলাম। আমিও একই বিষয় নিয়ে পড়েছি। প্রায় বিশ বছর আগের কথা। আমার এখন নিজের ব্যবসা আছে একটা। বিছানা বানাই। ঐ যে, পার্টনার ফোন করেছে।
: কর্নেলে আমার খুব কাছের এক বন্ধু পড়ে, প্রশংসা শুনেছি খুব। কান তো বন্ধ রাখা যায় না, তাই তোমার ফোনের কথাবার্তা কিছুটা শুনে ফেলেছি বলে দুঃখিত। তোমার ব্যবসা ভালই চলছে মনে হলো। এই মন্দার মধ্যেও তো বেশ লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছো।

– আমি অসুস্থ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য বিছানা, হুইল-চেয়ার, ইত্যাদি বানাই। ব্যবসার ধরনটাই এমন যে এটার উপর মন্দা তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। আমরা মূলত ডিজাইনের কাজটুকু করি। প্রতি ইউনিটে বেশ ভালই লাভ থাকে।
: ভালই তাহলে। এবারেও কি বিজনেস ট্রিপ ছিলো?

– উহু, এটা ছিল এমনি বেড়াতে যাওয়া। এক সপ্তাহ ফ্লোরিডায় ছুটি কাটিয়ে এলাম।
: বেশ ভালোই তাহলে। প্লেন মনে হচ্ছে একটু পরেই ছাড়বে। আমাদের আগে যা লম্বা লাইন দেখতে পাচ্ছি! দেড় ঘন্টার ফ্লাইট হওয়ার কথা। এখন দেখি ছাড়তে ছাড়তেই দেড় ঘন্টার উপর হয়ে গেল ভিড়ের কারণে। বিমানবালা আসছে আবার, কিছু বলবে মনে হয়।

– জরুরি কোনো কাজে ব্যস্ত না থাকলে একটা প্রশ্ন করতাম আপনাকে।
: না, ব্যস্ত নই। বলে ফেলো। আমার লাঠি ফেরত দেবেন?

– না, তোমাকে না। তোমার পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করছিলাম।
: বলুন কী প্রয়োজন। কোনো সমস্যা হয়নি তো?

– আপনি কি আপনার স্ত্রী সহ এসেছেন?
: জ্বী, আমার স্ত্রীও এই প্লেনেই আছেন।

– আপনি চাইলে তাঁর সাথে বসতে পারেন। আমি সিট বদলে দিতে পারি আপনাদের সুবিধার্থে।
: সে-কষ্ট করতে হবে না। আমি বেশ আছি। ধন্যবাদ।

– ঠিক আছে তাহলে। আপনার স্ত্রী বলছিলেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। আমি অন্য দিকে যাই তবে। প্রয়োজন পড়লে জানাবেন…
: আপনার স্ত্রী ডাকলেন, তবু গেলেন না?

– আমার স্ত্রী আছে, তবে আমার ছেলে সহ। যে-ভদ্রমহিলার কথা বিমানবালা বলছিলো, তিনি আমার স্ত্রী নন। বিমানবালা ভুল করে আমাকে ডাকছিলো। ভদ্রমহিলা সুন্দরী বেশ। পাশে বসতে পারলে মন্দ হতো না, কী বলো?
: তাহলে তো মিস করে ফেললে। চলে যেতে। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলতে, বিমানবালার ভুল।

– স্ত্রীর সামনে এই কাজ করা যায় নাকি? বাসায় গেলে তো আমাকে নাইনটি ডে’স, নো ইন্টারেস্ট প্রোগ্রামে ফেলে দেবে। ক’দিন পরেই ২৫ বছর পূর্তি।
: হাহ হাহ, মনে হয় না এই বয়সে এসে এমন ব্যাপারে সুযোগ নেবে তুমি।

– তা আর বলতে। যাক, ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা বলে। আমার কার্ড রাখো, কখনও দেখা হবে আবার।
: না হলেই ভালো। তোমার কাজের যা ধরন, তাতে দেখা না হওয়াই সুলক্ষণ।

– আই’ল কাট ইউ আ ডিল, তবে আশা করি আসলেই দেখা হবে না আর।
: আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমাকে তো চিনবে না, তবু পারলে ওদিকটায় বেড়াতে যেয়ো, ভালো লাগবে। বিমানবালা এবারে কী বলে শুনে দেখি।

– আমাদের সাথে এই ফ্লাইটে থাকবার জন্য অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আমার আতিথেয়তা যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তবে মন খুলে উপহার দিতে পারেন। আই ওনলি এক্সেপ্ট ডায়মন্ড নেকলেস, গোল্ড ব্রেইসলেট, অ্যান্ড রুবি রিংস। তোমাদের গল্প বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম তার আগেই অনেকে ঘুমিয়ে গেছো। তাই সে-চেষ্টা আর করলাম না। আই ডিড সিং ফর ইউ, দো। আই স্যাং সোলো। পারহ্যাপ্স সো লো দ্যাট ইউ ডিড নট হিয়ার মি। শুভ হোক তোমাদের বাকি দিন।

প্রবাসের কথোপকথন - ১৭

– হে, ইশ! আর কতক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরার পর আমাকে চিনবে?
: খুবই দুঃখিত, ডন। একটু বেখেয়াল ছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ঠিক সাড়ে এগারোটায়ই আসবে। সেজন্য বাইরের দিকেই নজর ছিল। খেয়াল করি নি যে এসে বসে আছো।

– কোন ব্যাপার না। আমি মজা দেখছিলাম। আই ওয়াজ গোয়িং টু লেট ইউ ওয়ান্ডার অ্যাবাউট সাম মোর।
: দু’বছর পর আবার এলাম তো, এতদিনের চেনা লুই’স ক্যাফেও কেমন যেন অচেনা ঠেকছিল। শহরটা কত বদলে গেছে। এই সামনেই তো বিশাল একটা শপিং এরিয়া ছিল, এখন দেখি সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

– হ্যাঁ, গত দু’বছরে অনেক দালান-কোঠা হয়েছে। শহরটা খাপছাড়া রকম আধুনিক হয়ে গেল চোখের পলকে। কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। ক্যাটরিনার পর নিউ অর্লিয়েন্স তার সব জৌলুস হারালো, আর এদিকে ব্যাটন রুজে শুরু হল ঠিকাদারির ধুম।
: এটাই জগতের নিয়ম। তবে এবার দেখলাম গুস্তাভ অনেক গাছ-পালা ফেলে দিয়ে গেছে। আগে কত সবুজ ছিল ব্যাটন রুজ। কচু নামে একটা খাবার আছে আমাদের দেশে। লুইজিয়ানা বেড়াতে এলেই লোকে কচু তুলে নিয়ে যেতো। প্লেন থেকে তাকালে সবুজ সমুদ্র মনে হতো। এখন গাছ কমে গেছে অনেক। কিছু গেছে প্রকৃতির ঘূর্ণিঝড়ে, কিছু গেছে কংক্রিট মিক্সারের ঘূর্ণিতে।

– এটাই স্বাভাবিক। কোথাও কমতি হলে কোথাও বাড়তি হবেই। তুমি তো কিছুটা বদলেছো। শুকিয়ে গেছো আগের চেয়ে, লুকস-ও একটু ভিন্ন।
: ভেতরের পরিবর্তনের তুলনায় বাইরেরটুকু কিছুই না। এই দু’বছরে অনেক কিছু শিখলাম। অনেক নাইভ ছিলাম আগে। বিশ্বাস করে ঠকতে ঠকতে টনক নড়েছে।

– চিয়ার আপ। এটা কোন ব্যাপার না। ইউ আর নট ইভেন টুয়েন্টি ফাইভ।
: আই অ্যাম, অ্যাকচুয়ালি।

– সো ইউ জাস্ট টার্ন্ড টুয়েন্টি ফাইভ…
: মেক দ্যাট টুয়েন্টি সিক্স অ্যান্ড আ হাফ। এনিওয়ে, ইউ ওয়্যার সেইং…

– আমার এই শিক্ষাটা হয়েছিল ৪৭ বছর বয়সে। আমার অধীনস্থ লোকজন মিলে ভোট দিয়ে আমাকে বাদ দিয়ে দিলো। আমি তখন এলএসইউ-তে কাজ করি। কী এক কারণে টাকা কিছুটা কমে গেছে ডিপার্টমেন্টে। ওরা সবাই মিলে ঠিক করলো যে আমাকে বাদ দিয়ে আমার বেতনের টাকাটা সবাই মিলে ভাগ করে নেবে।
: এটা তো এমন ঘটনার জন্য খুবই বাজে সময়। ওই বয়সে মানুষ সংসার গুছিয়ে বসে, জীবনের শেষ অংশটার জন্য প্রস্তুতি নেয়।

– আমার দুই মেয়ের তখন ভার্সিটি শুরু করার সময়। আচমকা এক সকালে শুনি আমার চাকরি নেই। আমি আর আমার স্ত্রী তখন একেবারেই হতভম্ব। গতকাল বিকেলে যারা আমার সাথে এক সাথে বাজার করলো, লাঞ্চ খেলো, আমার মেয়েদের সাথে আহ্লাদ করলো, তারা আমাকে সকালে বলে যে আমার চাকরি নেই। উই আর স্যরি, ডন, বাট দেয়ার ইজ সামথিং উই গটা ডু।
: দুঃখজনক, খুবই দুঃখজনক। কী বলবো বুঝতে পারছি না।

– দুঃখের কিছু নেই। কিছু লোক খুব অমানবিক আচরণ করেছিল আমার সাথে। যা করেছে, শুধু তা নিয়েই রাগ ছিলো না। ওরা আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছিলো না পর্যন্ত। আই ওয়াজ অ্যাংরি, আই ওয়াজ ভেরি অ্যাংরি।
: তোমার রাগ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আড়াই বছর তোমার অধীনে কাজ করেছি, খুব একটা কম সময় তো না।

– আরে নাহ, তোমার সাথে তো আমি রাগ করিনি কোনদিন। অন্যদের উপর করেছি অবশ্য। তবে ঐ লোককে আমি একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারতাম। দেয়ার উড বি টু ব্লোজ। ওয়ান ইজ মে হিটিং হিম, দি আদার ইজ হিম হিটিং দ্য ফ্লোর।
: এই বয়সেও তোমার যা শরীর, তুমি অনায়াসেই পারতে, সে-নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

– আমি এখনও নিয়ম করে জিম-এ যাই। তাছাড়া জীবনভর পরিশ্রম তো আছেই। আমার শুরুটা কিন্তু খুব অনাড়ম্বর। ওকলাহোমার একটা পাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। বাবার সাথে কাজে হাত লাগাতে হতো। ছেলেবেলায় গরু চরিয়েছি, কাঠ কেটেছি। সেখান থেকে লেখাপড়া করে উঠে এসেছি এতদূর।
: আমার মত ফার্স্ট জেনারেশন ইমিগ্র্যান্টদের জন্য এই কাহিনীগুলো খুব প্রেরণাদায়ক। সবাই মনে করে এখানে ডলার গাছে ধরে, নয়তো যুদ্ধ করে এত উন্নতি হয়েছে। একটা দেশ গড়তে যে তোমার মত কত শত মানুষ প্রয়োজন, সেটা কেউ বোঝে না।

– সেই লোকগুলো এখন আর লুইজিয়ানায় নেই। একজন ওকলাহোমায়ই আছে বলে জানি। আমি তখন বলেছিলাম যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় খুব ভাল কিছু বন্ধু আছে। আমাকে বাদ দেবে দাও, আমি শুধু কিছু ফোন কল করবো এরপর। করেছিলামও। এই অন্যায়ের জন্য আমি এল-এস-ইউ’কে স্যু করতে পারতাম। আই কুড ওউন দ্য ম্যাসকট, কিন্তু আমারই এক কাছের বন্ধুকে পাঠালো আমার কাছে। অনুরোধ করলো যেন আমি আইনী পথে না যাই, ওরা ব্যাপারটা নিজের মত মীমাংসা করবে।
: তাহলে তো বেশ ভাল ভাবেই উৎরে গেলে শেষ পর্যন্ত। ঝামেলা আরও অনেক দূর গড়াতে পারতো।

– তা তো পারতো অবশ্যই। তুমি বলেছিলে যে তুমি অ্যাকাডেমিয়ায় থাকার চিন্তা করছিলে, তাই বললাম। দু’টা কথা মনে রাখবে সব সময়। প্রথমত, এমন কিছু পড়বে যাতে সত্যিই আগ্রহ পাও। আদারওয়াইজ ইউ ও’ন্ট হ্যাভ আ রিজন টু ওয়েইক আপ এভরি মর্নিং। দ্বিতীয়ত, অ্যাকাডেমিয়ায় কাউকে বিশ্বাস করবে না। আমরা আগে অনেক দান-খয়রাত করতাম। অথচ ১০ বছর পরও দেখি, পিপল ইউ আর হ্যাভিং কফি উইথ ও ইউ মানি! মানুষ খুবই বিচিত্র।
: দুটোই আমি খুব মূল্য দিয়ে শিখেছি। এই যে রিসেশন, চাকরির বাজারে খরা, এরপরও টিকে আছি নিজের আগ্রহের কিছু নিয়ে পড়েছি বলে। হয়তো এই লাইনে টাকা-পয়সা পাইনি, তবুও মনে শান্তি আছে। দেখি, পিএইচডি’টা ঠিক মত সারতে পারি কিনা। আর অ্যাকাডেমিয়া কেন, কোন কিছুতেই কাউকে আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করি না। আগে আগ বাড়িয়ে প্রতিটা মানুষের উপর কিছু বিশ্বাসের বিনিয়োগ করতাম, দেখতাম সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কীভাবে দেয়। কেউ মর্যাদা না দিলে তাকে আর কাছের মানুষ মনে করতাম না। এখন কেউ বিশ্বাস অর্জন করে নিতে পারলে নিক, আমি সেধে বিশ্বাস করে ঠকতে নারাজ। কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা খুব খারাপ।

– এত হতাশাবাদী হয়ে গেলে কবে তুমি? নাহয় কিছুটা সময় নিজের ইচ্ছে মত যায়নি, তাই বলে এভাবে দেখতে হবে কেন?
: এই যে গত দু’বছর কেমন এলেবেলে কাটলো। গ্র্যাজুয়েট স্কুলে গিয়ে যেন এতিমখানায় পড়লাম। অ্যাডভাইজার জুটলো যা-গরু-চড়ে-খা জাতীয়।

– এটা কোন ব্যাপার না। ইট ওয়াজ দেয়ার লস, নট ইওরস। সময় হলে দেখিয়ে দিও। শিক্ষা ব্যাপারটা এখন ব্যবসা হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। তুমি যেমন গুরু-শিষ্য সম্পর্ক আশা করছিলে, সে-ধরনের অ্যাপ্রেন্টিসশিপ আর নেই। শুধুমাত্র টিয়ার-থ্রি’র কিছু স্কুলে গেলে এমনটা পাবে। সেখানে কামড়া-কামড়ি করে ফান্ড আনার চেয়ে নিজের ভাইকে শেখানোটা জরুরি বেশি। তবে সেটা নিয়ে তো এত বিরক্ত হলে চলবে না। নিজের কাজ করে যেতে হবে।
: নট দ্যাট আই অ্যাম প্রাউড অফ ইট, কিন্তু এই সিনিজম’টা এখন অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।

– হোল্ড অন আ মিনিট। টাইম-আউট। মাসে কয় বেলা খাও তুমি?
: দিনে তিন বেলা করে ত্রিশ দিনে ৯০ বেলা বলতে পারো।

– টুকটাক স্ন্যাক খাও না?
: অবশ্যই, তা তো থাকেই কিছু না কিছু।

– তবুও কি তুমি কখনও না কখনও দিস ইজ দ্য ওয়ার্স্ট মিল অফ মাই লাইফ বলো নি?
: সে তো হরদমই বলি।

– ওয়ান মিল আউট অফ অ্যাবাউট আ হান্ড্রেড ইজ ব্যাড, অ্যান্ড ইউ আর স্টিল কমপ্লেইনিং! এটা কি ঠিক হল? শ’এ একটা তো ভালো-মন্দ হতেই পারে। তুমি ৯০ বছর বাঁচবে জীবনে। নাহয় সেই লম্বা জীবনের দু’টা বছর একটু খারাপই গেল। এটা তো জীবনেরই অংশ। এটাকে এভাবে দেখার কিছু নেই। বাকি ৮৮ বছরের মধ্যে থেকে সেরাটা বের করে আনো।
: ইউ শিওর নো হাউ টু লিফট আ ম্যান’স স্পিরিট, ডন। কথাটা মনে থাকবে। এভাবে ভাবিনি কখনও। তোমার নাতি-নাতনিরা কেমন আছে? অনেক বড় হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। মাত্রই দু’বছর পর এলাম, তবু কোনো পিচ্চিকে চিনতে পারি না আর। সবাই এক মাথা পরিমাণ বড় হয়ে গেছে।

– আমার নাতনি ইসাবেলা’র কথা তোমার সবচেয়ে বেশি মনে থাকার কথা। ওর বয়স এখন পাঁচ বছর। প্রি-ম্যাচিউর ছিল, তাই কোমড়ের হাড় বাড়েনি, জানোই তো। ডাক্তাররা ওর উপর অনেক গুলো অপারেশন করবে সামনে। হাড়গুলো জায়গা মত বসাবে।
: এতটুকু বয়সে কী কষ্ট। ভাবলেই গা শিউরে উঠে।

– ওর কিন্তু তেমন বিকার নেই। ও টাবের উপর আরাম করে বসে থাকে। দুই হাত মাথার পেছনে দিয়ে শুয়ে শুয়ে পা দুলায়। দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওর এত বড় সমস্যা আছে শরীরে। ওর বাবা খুবই ধারালো বুদ্ধি রাখে। ডাক্তারদের জেরা করে করে বের করেছে কী করতে যায়। একটা পর্যায়ে দেখে যে ডাক্তারের নিজেরই স্পষ্ট ধারণা নেই কী করবে, জটিলতা হলে কীভাবে সামলাবে, ইত্যাদি নিয়ে। হি ইজ ওয়েইটিং ফর অ্যানাদার ওপিনিয়ন নাউ।
: বোঝো কীভাবে এটা? এই যে, লোকজন কিছু না জেনেও মুখে মুখে হাতি-ঘোড়া মেরে ফেলে, এদের ধরো কীভাবে তুমি?

– যা বলছে, সেটার চেয়ে যা বলেনি সেটার উপর মনোযোগ দেবে বেশি। তোমার সাথে যখন কথা বলতে আসবে, তখন দে আর দ্য ওয়ানস ইন কন্ট্রোল অফ দ্য কনভার্সেশন। এই ব্যাপারটা থেকে বের হয়ে আসবে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবে কী বলছে, এরপর কিছু একটা উছিলা দিয়ে সরে যাবে। এক বেলা সময় নেবে। ভেবে দেখবে কী কী বলেনি তোমাকে। পরের বেলায় যখন কথা হবে, তখন ইউ উইল বি দ্য ওয়ান ইন কন্ট্রোল অফ দ্য কনভার্সেশন।
: রিডিং বিটউইন দ্য লাইনস। শিখতে পারলাম না জীবনে।

– অবশ্যই শিখবে। সময়ের সাথেই হবে। বয়স তো কম হলো না আমার। এখন এরকম কোন ফাঁক-ফোকর পেলেই আমি তার জন্য ফাঁদ পেতে বসে থাকি। একটা ‘উম’ দিয়ে বাক্য শুরু করলেই চেপে ধরি।
: এটা কেমন কথা আবার?

– ইফ ইউ স্টার্ট আ সেন্টেন্স উইথ ‘উম’, দেন ইদার ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ইউ আর টকিং অ্যাবাউট, অর ইউ আর জাস্ট লাইং।
: এটা খেয়াল রাখতে হবে। আমার তো বাক্যের শুরুতে উম-আম করার স্বভাব অনেক পুরনো।

– বিলটা এদিকে দিও। মাই সান ইজ স্টিল আ স্টুডেন্ট, হি কান্ট পে।
: আমি জীবনের একেবারে শেষে গিয়ে একটা বই লিখবো, বলেছিলাম তোমাকে? সেখানে আমার দেখা কিছু অসামান্য মানুষের কথা লেখা থাকবে। তোমার জন্য একটা চ্যাপ্টার থাকবে সেখানে।

– এভাবে ভাবার কোন দরকার নেই। আমি ১১৬ বছর বাঁচবো। তোমাকে যেন ঠিকঠাক দেখি ততদিন। আমি এখন লেখালেখি করছি কোস্টাল এরিয়াগুলো নিয়ে। আজ থেকে ৬০ বছর আগে এই সমুদ্রতীর কেমন ছিল তা নিয়ে সাক্ষাৎকার নিচ্ছি সবার। তাঁদের জীবদ্দশায় কী পরিবর্তনগুলো এসেছে, তা নথিবদ্ধ করছি। পাশাপাশি সবাইকে একটা বাড়তি প্রশ্ন করছি। হোয়াট ডিড ইওর গ্র্যান্ড ফাদার টেল ইউ হোয়েন ইউ ওয়্যার ইয়াং।
: অপেক্ষায় থাকলাম বই বের হওয়ার। ছবি তুলে রাখি তোমার সাথে একটা। স্মৃতিগুলো আকার পাবে।

– অবশ্যই। ঐ মেয়েটাকে বলি ছবি তুলে দিতে। ক্যান ইউ টেক আ পিকচার অফ আস, প্লিজ। ইউ গেট এক্সট্রা পয়েন্টস ফর ফিগারিং আউট হু ইজ দ্য ওল্ডেস্ট!

Tuesday, March 31, 2009

গানবন্দী জীবনঃ রক ইউ লাইক আ হারিকেন

পরীক্ষিত ও প্রমাণিত কিছু মেয়েলিপনা আছে আমার। মুরুব্বিদের দেখে জেনেছি, নারীমন ভাল করে দেওয়ার অব্যর্থ উপায় হল বাজার করা। এই রোগ আমারও আছে। এমনিতে প্রতিটা পয়সার হিসেব টুকে রাখলেও মন খারাপ হলে কেমন যেন হয়ে যায় সব। যেই আমি কেউ কিছু চাইলে খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে জেনে নেই, কিছু কিনবার আগে তার যাবতীয় তত্ত্ব-তালাশ করি, সেই আমিই দুই হাতে খরচ করি, সবার ইচ্ছাপূরণ করে দেই বিনাপ্রশ্নে। এমনই এক দুর্বল মুহূর্তে জীবনের প্রথম সাউন্ড সিস্টেম কিনি। চিরকঞ্জুস আমার এই বিরাট খরচের পেছনের কারণ ছিল বিরাট এক অপমান।

আমেরিকা এসে প্রথম কাজ পেয়েছিলাম একটি খাবারের দোকানে। নাম শুনে হাসা নিষেধ – উইনারশ্নিটজেল। মালিক এক পাকিস্তানি লোক আর তার দূরপ্রাচ্যীয় (পড়ুন চিংকু) স্ত্রী। বেতন খুবই কম, ঘন্টায় মাত্র সোয়া পাঁচ ডলার। নগদে কাজ, তাই খাটনির মাত্রা ছিল অমানুষিক। ডেলিভারি ট্রাক থেকে মালপত্র নামিয়ে ফ্রিজারে সাজাতে হত, সকাল-বিকালে দোকানের ভেতর-বাহির ঝাড়তে হত, পার্কিং লট থেকে গুদাম পর্যন্ত সাফ করতে হত, আর খাবার তৈরি ও বিক্রি তো আছেই। লোকলজ্জায় বেসবল ক্যাপ দিয়ে প্রায় নাক পর্যন্ত ঢেকে নিঃশব্দে কাজ করে যেতাম।

জাত্যভিমান মানুষকে কতটা অন্ধ ও কট্টর করে তোলে, তা খুব চোখে পড়তো। একবার এক খদ্দের খাবার ফেরত দিয়ে গেলেন, আমার হাতে তৈরি দেখে। একই সাথে মুদ্রার অপর পিঠও সেখানেই দেখলাম। আমার সাথের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি চাকরির ঝুঁকি নিয়েও সেই খদ্দেরকে তাড়িয়ে দিল দোকান থেকে। আরেকবার এক খদ্দের “হেই” বলে সম্বোধনের পর সেই মেয়ে রুদ্রমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, “হেই ইজ ফর হর্সেস, অ্যাড্রেস প্রপারলি।” কৃষ্ণাঙ্গদের উচ্চারণ ঠিকমত বুঝে উঠিনি তখনও। একদিন খদ্দেরকে টাকা ফেরত দেওয়ার সময় এক সহকর্মিনী বলে উঠলো, “ডু ইউ হ্যাভ এনি পিনিস?” আমি স্রেফ বেকুব বনে গেলাম। আমতা আমতা করতে করতেই সেই মেয়ে বলে উঠলো, “দ্যাটস ওকে, আই গট ওয়ান।” এবার আমার আরও তব্দা খাওয়ার পালা। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি তার পকেট থেকে ছোট্ট-গোল এব্রাহাম লিংকন বের করার বুঝলাম পেনি চাইছিল।

সেই দোকানে যারা কাজ করতাম, তারা সবাই ছিলাম জীবন সংগ্রামে বিভিন্ন ভাবে বিপর্যস্ত মানুষ। কমিউনিটি কলেজে পড়ুয়া কিছু মেয়ে ছিল, কিছু ছিল হাইস্কুল ড্রপ-আউট। ম্যানেজারকে লুকিয়ে কাজের অবসরে লুকিয়ে তারা হোমওয়ার্ক করতো, কোনদিন টুকটাক অংক দেখিয়ে নিত। সেই সময়টায় সবাইকে আগলে রাখতেন বয়স্ক এক মহিলা। আফ্রিকার কোন এক দেশ থেকে আমেরিকা এসেছিলেন। স্বামীর সাথে। কিছুদিনের মধ্যেই সেই স্বামী পরের ঘরে চলে গেছে, ফেলে গেছে স্ত্রী আর তিন ছেলে-মেয়ে। সে-ভদ্রমহিলা সন্তানের স্নেহেই আমাদের দেখে রাখতেন। দিনের শেষে গ্রিজ জমে থাকা পাতিল নিজেই সাফ করতেন, আমাদের সুবিধার জন্য বেশিক্ষণ কাজ করতেন, ম্যানেজারকে লুকিয়ে প্যাকেটে ভরে খাবার দিয়ে দিতেন রাতের জন্য। হয়তো আজও তিনি “ইশ”কে মনে রেখেছেন, অথচ আমি তাঁর নাম ভুলে গেছি ঠিকই। কনভিনিয়েন্ট অ্যামনিশিয়া।

কাজ সেরে ফিরছিলাম এক রাতে। ২৫শে এপ্রিল, ২০০৪। রবিবার রাত সাড়ে এগারোটা। সপ্তাহান্তের ফুর্তি সেরে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেছে। ক্যাম্পাসের এক পাশ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ডর্মিটরির সামনেই মাঠ, মাঠের পাশে রাস্তা, রাস্তার একপাশে ছোট্ট মসজিদ। সামনে পড়লো তিনটি ছেলে। সৌজন্যবোধক ভাবে মাথা নাড়িয়ে হেঁটে চললাম। হঠাৎ শুরু হল গালাগালি। দ্রুত পা চালিয়ে কেটে পড়ার চেষ্টা করলাম। সাথে পেছনের পায়ের আওয়াজও দ্রুততর হল। সাথে বেড়ে গেল গালির তোড়। বাধ্য হয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। এতে কাজ হল কিছুটা। একজন একটু পৃথুল হওয়ায় বাকি দু’জন ক্ষান্ত দিল, তবে তাই বলে উৎপাত বন্ধ হল না। রাস্তার পাড়ের কাঁকড় তুলে ছুঁড়ে মারতে লাগলো। মাথায় জ্যাকেটের হুড তুলে দিয়ে রক্ষা পেলাম। প্রবাসে এসে মসজিদেরই সামনে হেনস্তা হলাম। দুঃখ, হতাশা, আর রাগ মিলিয়ে কেমন যেন এক অনুভূতি কাজ করছিল। সেই দুঃখ থেকেই অধমের অ্যালটেক লান্সিংয়ের ফাইভ-পয়েন্ট-ওয়ান সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম কেনা। সামনে পেয়ে মনে হয়েছিল, কী লাভ এত সঞ্চয়ী আর সুশৃঙ্খল থেকে? জীবন তো এমনিতেও কষ্টের, ওমনিতেও কষ্টের।

তখন চলছিল স্করপিয়নসের ক্রেজ। দেশ ছাড়ার আগে সবেমাত্র ডিভিডি কিনেছি কনসার্টের। বাইরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই অ্যাক্যুস্টিক ভার্সন যোগাড় করেছিলাম। ঠিক করলাম, রক ইউ লাইক আ হারিকেন দিয়েই উদ্বোধন করবো। তালে তালে ভুলে যাবো মাথায় তাল পড়ার কথা। সব ঠিকঠাক করে গান ছেড়ে দেখি তেমন কোন তফাৎ বুঝছি না। কিছুক্ষণ গুঁতাগুঁতি করে টের পেলাম, সাউন্ড কার্ডই কম্প্যাটিবল না। অতঃপর আবারও মন খারাপ, আবারও ধুম করে কিছু খরচ করে ফেলা। শেষতক সাউন্ড কার্ডও কেনা হল, এবং সেটার উদ্বোধন রক অই লাইক আ হারিকেন দিয়েই হল।

বড় বড় ব্যান্ডের কনসার্টে যাওয়ার শখ মিটবে, বৈশ্বিক ঘটনাবলির ঠিক মাঝখানে থাকবো, বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে বেড়াবো, অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ফুর্তি করবো, প্রশস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাবো, ফ্রেন্ডসের জোয়ি’র মত হাউ-ইউ-দুইং বলে বেড়াবো – এই ছিল দেশ ছাড়ার সময় বুকের ভেতর কুসুম কুসুম স্বপ্ন। হয়েও হল না।

খুব প্রিয় এই গানটা এভাবেই জড়িয়ে আছে জীবনের খুব অপমানজনক একটি অধ্যায় আর ভেঙে যাওয়া অনেক খুচরো স্বপ্নের সাথে।

Tuesday, December 30, 2008

গানবন্দী জীবনঃ আজ আমার শূন্য ঘরে আসিল সুন্দর

৩. আজ আমার শূন্য ঘরে আসিলো সুন্দর
আমার নানা প্রচন্ড শিল্প-রসিক। শিক্ষায় ডাক্তার, পেশায় প্রফেসর, নেশায় কবিতা আর গানের অনুরাগী। এতটাই বেশি যে রেডিওতে একবার নানার সাক্ষাৎকার পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। নানা নিজের সংগ্রহের এলপি থেকে কী কী যেন শুনিয়েছিল। রেকর্ডিংটা হারিয়ে গেছে অনেক দিন হয়।

পরিবারে নতুন কোন অতিথি এলেই নামের জন্য নানার কাছে যাওয়া হয়। আমার মা-খালাদের ডাকনাম নানার দেওয়া – সীমা, নিশি, শীলা। আমার খুব পছন্দের নাম তিনটাই। আমার ডাকনামও নানারই দেওয়া – অভি। গালভরা ভাল নামটার চেয়ে এই নামটা অনেক বেশি আপন। নানার সাথে আমার চুক্তি আছে। আমার ছেলে-মেয়ের নাম ঠিক করে না দিয়ে তার ছুটি নেই।

বড় নাতি হিসেবে অনেক আদর পেয়েছি নানার কাছে। আমার জন্মদিন পালনের জন্য নানা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসে ঘুরে যেত রাতের ট্রেনে। আমার পছন্দ বলে বাক্স বাক্স গলদা চিংড়ি পাঠাতো। নানার বিশাল বইয়ের ভান্ডার থেকে আমাকে নিজের ইচ্ছামত চুরি করতে দিতো। বইমেলা এলে প্রথম বার যাওয়ার আগে আমি অবসর পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতো। আমাদের দুই ভাইয়ের চালানো সব সাইকেল নানার কিনে দেওয়া ছিল। একবার আমি ঝোঁকের মাথায় স্কুল থেকে একটা কুকুর ছানা কিনে এনেছিলাম। থাকি ভূতের গলির এক ভাড়া বাড়িতে। জল্লাদ বাড়িওয়ালা, তার উপর এমনিতেই বাসা-ভর্তি মানুষ। আমার নানা সেই কুকুরটা পেলেছিল আট বছর ধরে। ট্রাকচাপা পড়ে আমার ‘শাইনি’ মারা যাবার পর অনেক কেঁদেছিল।

নাতিপাগল আমার অসামান্য নানা আমাকে কোলে করে প্রথম বার বাসায় ঢোকার সময় গেয়েছিল, ‘আজ আমার শূন্য ঘরে আসিলো সুন্দর, ওগো অনেক দিনের পর’। স্মৃতিশক্তি আমার এমনিতেই খারাপ, তার উপর সেই ঘটনা পাক্কা ২৬ বছর আগের। তবু যেন সেই মুহূর্তের আগলে ধরা অনুভূতিতে মনটা অবশ হয়ে যায়। কল্পণায় ভাসে, উত্তম কুমারের মত দেখতে এক সুপুরুষ রঙিন কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট একটা মাংসপিণ্ড কোলে করে শিশুতোষ আনন্দে গানটা গাইছে।

নানার অফুরন্ত গল্পের সম্ভারের কারণে সত্যজিতের তাড়িণীখুড়োর কীর্তিকলাপ পড়ে মনে হয়েছিল যেন চুপিচুপি আমার নানাকে দেখে লেখা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের যে-কোন ছাত্রকে বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর ইছহাকের কথা জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে তার উচ্ছ্বলতার কথা। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে বেড়াতো। ল্যাবরেটরি ক্লাসে সল্যুশন বানিয়ে নিজের ধমনীতে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করতো। দেশ-বিদেশের ইতিহাস নিয়ে মজার সব গল্প বলে যেত। ‘প্রফেসর ইছহাকের বড় মেয়ের বড় ছেলে’ পরিচয়ের সুবাদে কোনদিন ডাক্তারের কাছে গেলে লাইনে দাঁড়াতে হয়নি, ফি দিতে হয়নি।

হাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে বিলেত গিয়েছিল। সে-সময় বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে নাকি একবার বরফজমা হ্রদের উপরের বরফ কেটে খালি গায়ে ডুব দিয়েছিল। এছাড়াও কাজের চাপে বৌয়ের চিঠি ভাইকে পাঠিয়ে দেওয়ার মত কীর্তি ছিল অনেক। ডানপিটে, খেলাপ্রিয়, এভার্টন আর ইংল্যান্ডের ভক্ত, প্রচন্ড রোম্যান্টিক এই মানুষটাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তার পাঁচটা ছেলে-মেয়ে আছে।

বাজারে দর কষাকষিতে আমার নানার মত পারদর্শী খুব কম দেখেছি। এই বয়সেও সকাল হলেই চলে যায় কাঁচা বাজারে। নানার বাসায় বেলায় বেলায় জনা বিশেক লোক খাওয়া-দাওয়া করতো এক সময়। খাওয়ার লোক কমলেও বাজারের পরিমাণ তেমন কমেছে বলে মনে হয় না। নিউ মার্কেট আর টঙ্গী বাজারের দোকানীরা নানাকে আড়ালে ডেকে নানার পছন্দমত দামে জিনিস দিয়ে দিতো। সবার সামনে নানা দর-দাম করলে ব্যাপারীর বেশি ক্ষতি, তাই!

নানার সাথের এই খুচরো অনুভূতিগুলো ঘুরে-ফিরে আসে এই গানটার সাথে। কথা হলেই বিভিন্ন রকম উপদেশ দেয় নানা। ভেজা চুলে বের হতে নেই, গলার পেছনটা স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়, বাজারে গেলে প্রথম চক্করে কিছু না কিনে সব দোকানের দাম যাচাই করে নিতে হয়, এমন ছোট ছোট উপদেশের পাশাপাশি এই গানটাও গেয়ে শোনায় একবার করে। অতুলপ্রসাদের এই গানটা শুনলেই মনে হয় যেন নানি বিছানার পাশে মোড়ায় বসে সুপারি কাটছে, আমি নানার পাশে শুয়ে আনন্দমেলা পড়ছি, আর নানা উৎপাত করার জন্য গায়ের উপর পা তুলে দিয়ে দুষ্টামি করছে।

Friday, November 14, 2008

গানবন্দী জীবনঃ সে যে বসে আছে একা একা

০. ভূমিকা
জীবনের গতিময়তা, আকস্মিকতা, আর গভীরতার সাথে সবাই কমবেশি পরিচিত। বহুবার চেষ্টা করেও জীবনকে থামাতে বা ফেরাতে পারিনি। অথচ সেই জীবন যেন নিজে থেকে এসে আটকা পড়েছে কিছু গানের মাঝে। স্মৃতির স্ফটিক হয়ে যাওয়া জীবনের ভগ্নাংশগুলো খুব বেশি জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে সেই গানগুলোর সাথে সাথে। কিছু গান, আর তার মাঝে আটকা পড়া জীবন নিয়েই এই প্রলাপ-সিরিজ।

১. সে যে বসে আছে একা একা
সবেমাত্র নিজের একটা ঘর পেয়েছি তখন। আমেরিকা এসেছি প্রায় ৬ সপ্তাহ হয়ে গেছে। প্রথম ক'দিন খুব বাজে কেটেছিল। প্রথম যে-বাসায় উঠলাম, সেখান থেকে তিন দিনের মাথায় বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা ছিল সেই ক'দিন। জেটল্যাগে মারা যাচ্ছি এমন সময় সাত-সকালে উঠিয়ে দিয়ে বাড়ির মালিক বললেন, আমি বাইরে যাবো, তুমি বের হও বাসা থেকে। সেই দিনটা কাটলো পার্কের বেঞ্চে বসে। সে-বাসার একটা ঘর খালি ছিল, তবু সেখানে ঢোকা বা শোয়া বারণ। যাঁর ঘর, তিনি দূর থেকেই মানা করে দিয়েছেন ফোন করে। উঠেছিলাম অস্থায়ী ভাবে, তবু তিন দিনের মাথায় বলে দেওয়া হল লিভিং রুমে শাওয়ার কার্টেইন টাঙিয়ে থাকার কথা। শর্ত মানলে এক-তৃতীয়াংশ ভাড়া দিয়ে থেকে যাওয়া, না মানলে সে-রাতেই অন্যত্র জায়গা খোঁজা। বের হয়ে গিয়েছিলাম।

হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম পথে পথে। জানুয়ারির সকাল। কী প্রচণ্ড শীত। দু'হাতের গিঁটের চামড়া ফেটে রক্ত ঝরছে শীতের প্রকোপে। এরই মাঝে আরেক স্বদেশী উদ্ধার করলেন। নিয়ে গেলেন তাঁর বাসায়। থাকতে দিলেন দু'সপ্তাহ। সে-বাসায় শোওয়ার ঘর তিনটি, কিন্তু মানুষ থাকে মাত্র সাতজন। এক বাঙালি নিজের ঘরে, বাকি দুই ঘর মিলিয়ে ছয় নেপালি। একটা ঘরে বিশাল উঁচু এক বিছানা। পথে-ঘাটে যত ম্যাট্রেস ফেলে রাখা ছিল, তার সব কুড়িয়ে এনে স্তুপ করা হয়েছে সেই ঘরে। ফলাফল, প্রায় চার ফুট উঁচু বিছানা। সেই ঘরে থাকতো দুই জন।

অন্যঘরটি আয়তনে বড়, সাথে লাগোয়া বাথ, ড্রেসিং। সে-ঘরে থাকতো চারজন। কোন আসবাব নেই। এক কোণায় কিছু বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা। চাদর পেতে বিছানা বানানো। একজন ঘুমিয়ে উঠে গেলে আরেকজন এসে ঘুমায়। খুব একটা অর্থকষ্টের কারণে যে এই ব্যবস্থা, তাও না। তবু অবাক হয়ে ভাবছিলাম, দু'জন বাঙালিকে আজ পর্যন্ত এক ঘরে থাকতে দেখলাম না। নিজের একটা ঘরের মূল্য আমাদের কাছে অপরিমেয়। অথচ মুদ্রার অন্য পিঠে একই এলাকা থেকে উঠে আসা এই ছাত্রেরা।

চার সপ্তাহ পর এক অ্যাপার্টমেন্টে একটা ঘর খালি হল। উঠলাম সেখানে। নিজের ঘর। বিছানা হিসেবে ব্যবহারের জন্য আমিও একটা ম্যাট্রেস কুড়িয়ে নিলাম। সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম ৩৫০০ ডলার। স্কলারশিপের পরও নিজের পকেট থেকে হাজার তিনেক টাকা দিতে হত বিশ্ববিদ্যালয়কে। বাকি টাকা থেকে ৪০০ ডলার দিয়ে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনলাম। বাধ্য হয়েই কিনতে হল। ঠান্ডা বয়ে দু'মাইল হেঁটে লাইব্রেরিতে যেতে পারি না। সেই কম্পিউটার রাখবার জন্য টেবিলের প্রয়োজন। ওয়ালমার্ট থেকে বিশাল একটা টেবিল কিনলাম। অল-পার্পাস টেবিল হিসেবে ব্যবহারের জন্য। সেই দিন থেকে ৪ বছর ধরে লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়া, কাপড় ইস্ত্রি করা, ইত্যাদি সব কাজই করেছি ৫৮ ডলারে কেনা সেই টেবিলে। আজকে আমি ভার্জিনিয়া, লুইজিয়ানায় সেই টেবিল আজও আছে।

রাত জেগে নাট-বল্টু লাগাচ্ছিলাম সেই টেবিলের। শ্রান্ত হয়ে বিরতি নিয়েছিলাম একটু। এক বন্ধু বললো, নতুন একটা গান শুনে দেখতে। অর্ণবের "সে যে বসে আছে" সেই প্রথমবারের মত শুনলাম। কোথায় যেন একটা মোঁচড় লাগলো। একটা কোণায় গিয়ে পা ছড়িয়ে বসলাম। দেওয়ালে হেলান দিয়ে পুরো রাত কাটিয়ে দিলাম গানটা শুনতে শুনতে।

এইতো সেদিন ওয়াশিংটন ডিসি গিয়েছিলাম অর্ণবের কনসার্ট দেখতে। শেষদিকে যখন সবাই গলা মিলিয়ে গাইছে, তখন আমি আনমনে ফিরে গেছি আমার সেই প্রথম দিকের দিনগুলোয়। সেই দিনের প্রতিটা অনুভূতি যেন অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছিল গানটার সাথে। শত মানুষের মাঝেও যেন একা একা বসে ছিলাম, রঙিন স্বপ্ন বুনছিলাম, জানালার পাশে বসে মেঘ গুনছিলাম। ঘাড় ফেরালেই জীর্ণ বিছানা, হাত বাড়ালেই কোণায় পড়ে থাকা ওটমিল বিস্কুট।

বৃন্দাবনে জগন্নাথ

সপ্তাহ খানেক আগের কথা। পুরুষ দেহের সবচেয়ে ঘাউড়া অঙ্গের সাথে ঘন্টা কয়েক সময় কাটালাম একান্তে। প্রবাসে একলা আছি অনেক দিন। মনের ক্ষুধাগুলো কোন ভাবে চেপে রাখা গেলেও দেহের ক্ষুধাকে খুব বেশি দিন চেপে রাখা যায় না। হাতে কাড়ি কাড়ি ডলার থাকলে কোন চিন্তা নেই, কিন্তু আমার মত হতদরিদ্র ছাত্র হলেই বিপত্তি। কপাল ভাল থাকলে হয়তো একই ঝাঁকের আর কোন পাখি মিলে যেতে পারে। যাদের সেই ভাগ্যও নেই, তাদের ‘আপনা হাত জগন্নাথ’। আমি শেষ দলের মানুষ।

প্রথম চিন্তাই ছিল, কোন হাত? দীর্ঘদিনের অনভ্যাসজনিত কারণে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে ছিলাম দুই হাতের দিকেই। কিছুক্ষণ হাওয়ায় হাত মকশো করলাম। অনেকটা শ্যাডো প্র্যাকটিসের ঢঙ্গে। নাহ, তবু মনে পড়ে না। অগত্যা বাধ্য হলাম সীমিত আকারে অডিশন দিতে। মানুষ আমি ডানহাতী। প্রত্যাশিত ভাবেই ডান হাত হল ব্যাটম্যান, আর হতভাগা বাম হাত হল রবিন।

অধম এই আমি ইবলিশ হলেও মোনাফেক নই। ইবলিশের আদর্শ অনুসরণ করে আমি ভাল-মন্দ নির্বিশেষে সব কাজ করি বিসমিল্লাহ বলে। ব্যতিক্রম হল না এবারও। বাড়ন্ত প্রত্যাশা, শুকনো কাপড়, আর এক রোল টয়লেট পেপারসহ ঢুকে পড়লাম বৃন্দাবনে। রুমমেটের সাথে চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল মাঝপথে। চোখ টিপে বললাম, হে বন্ধু, বিদায়। বাচ্চা ছেলে। ভদ্রতা করে হাসি চেপে শুধু বললো, বেস্ট অফ লাক, ব্রাদার! জবাবে বললাম, বিসমিল্লাহ বলে নিয়েছি, রাখে আল্লাহ মারে কে?

আমার যুদ্ধক্ষেত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল। দেহ থেকে সুতা খসে গেল, হাতের নাগালের সবটুকু জায়গা ঢেকে দেওয়া হল টয়লেট পেপারে। দুস্থ, রুক্ষ, আগাছামণ্ডিত চেহারাটা আয়নায় দেখলাম কিছুক্ষণ। নাহ, বেসিনের উপরের ছোট আয়নায় পোষাচ্ছে না। বিব্রতকর অবস্থায় যাবার আগেই খেয়াল হয়েছিল, ভাগ্যিস। দৌঁড়ে ঘরে গেলাম, টেনে নিয়ে আসলাম ঢাউশ আয়নাটা। এবার হয়েছে। দৃষ্টিসুখ যেন সৃষ্টিসুখ। আগডুম-বাগডুম ভাবতে ভাবতে দাঁড়ালাম আয়নার সামনে। এবার খেলা ভাঙার খেলা।

চলছিল ভালই। তবে কিছুদূর এগিয়ে মনে হল, একটু ভিজিয়ে নিলে মন্দ হত না। নয়তো বলি এক, করে আরেক। আলতো করে হাত বুলিয়ে একদিকে আনার বেলায় ঠিক আছে, কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে একটু ভিন্ন কোন অবস্থানে নিতে গেলেই তিড়িং করে আরেক দিকে চলে যায়। এতক্ষণ কাজের কাজ তো হলই না, উলটা ধস্তাধস্তি করেই ঘেমে গেলাম পুরো। ভিজিয়ে নেবার পর দুঃসময়ের সঙ্গী হিসেবে এগিয়ে এল টয়লেট পেপারগুলো। প্রায় আধ ঘন্টা পর দেখা গেল এক ঘর টিস্যুর মধ্যে বসে আছি ক্লান্ত আমি। বড় বড় শ্বাস পড়ছে সশব্দে, অসম্পূর্ণ কাজের বিরক্তিকর নিদর্শন ছড়িয়ে আছে আশেপাশে। মনের ভেতর একটা কণ্ঠ বলছে বাদ দিতে। সবার জন্য সব না। পরে কোনদিন হবে নাহয়। সাথে সাথেই অন্য অংশ প্রতিবাদ করে উঠলো। না, পারতে হবে। এত আয়োজন তো সবদিন হয় না। এক রুমমেট বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি, আরেকজনকে দিয়ে বৃন্দাবনের কাজ সারিয়েছি আগেই। এই কষ্ট বৃথা যেতে দেওয়া যায় না।

যুদ্ধজয়ের প্রথম শর্ত মানচিত্রজ্ঞান। ভেবে বুঝলাম, মানচিত্রজ্ঞানের অভাবই আমার দুরবস্থার কারণ। মাঝপথে কিছুটা স্কাউটিং সেরে নিলাম। যুদ্ধক্ষেত্রটা অনেকটা বটগাছের মত। গোড়ার দিকে শক্ত মাটিতে শেকড় ছড়িয়ে আছে। চাইলেও তাকে তৎক্ষণাৎ ঘায়েল করা আমার কম্মো না। যদি কখনও আগ্রাসী ও আগ্রহী কোন সুন্দরীর সান্নিধ্য পাই, তাহলে তাকে দিয়েই করিয়ে নিতে হবে।

মূলের সাথে লেগে থাকা কাণ্ডটাই সবচেয়ে বেয়াড়া। পিছলে যায়, ফসকে যায়। চাপাচাপি করে তবুও কিছুটা সামাল দেওয়া যায়। আপোষের সাথেই কাজ এগিয়ে নিলাম। বটের মতই দু’পাশ বেয়ে ঝুল নেমে আছে কিছু। আর বাকি আছে গাছের আগার সাথে সম্মুখ-সমর। ঝুলগুলো একেবারেই নিরীহ। এরা দৃষ্টিসীমায় থাকলেও বৃষ্টিসীমায় থাকে না। এদের ছেড়ে গেলেও চলতো, তবু লেগে গেলাম। করবো যখন, ঠিকমতই করি। এমনিতেই মাসে একবার এমন সুবর্ণ সুযোগ মেলে।

যেমনটা বলছিলাম, আসল যুদ্ধ গাছের আগায়। ঝুলে হাত পড়তেই ফোঁস করে উঠলো সেটা। আমিও তাই বলে ছেড়ে দেবার পাত্র না। কৌশলটা কঠিন না তেমন একটা। শক্ত মুঠি করতে হয় শুরুতে। পিছলে যেতে চায়। চাবেই তো। মানবদেহের সব অনুষঙ্গেরই নিজস্ব প্রাণ আছে। শক্ত করে ধরতে হয়। গোড়া শক্ত না হলে আগার পরিচর্যা হবে কীভাবে? চলছে আমার কাজ। শরীর ভার হয়ে ছিল, একটু একটু করে হালকা হচ্ছি। আহা, কী আরাম। ছিলাম টম ক্রুজ, হয়ে যাচ্ছি ড্যানিয়েল ক্রেগ। ছন্দে ছন্দে হাত দু’টো দুলছে। আমি মুগ্ধ চোখে নিজেকে দেখছি জোড়া আয়নায়। এমন সময় ঠক্‌-ঠক্‌-ঠক্‌। ভাইয়া, আন্টি তোমার খোঁজ করছে।

আমার মা চিরদিনই কিছুটা বেরসিক। তারচেয়েও বাজে তার সময়জ্ঞান। আমি কোন কুকাজে রত হলেই আমাকে তার মনে পড়তে হবে। বইয়ের ভাজে বই নিয়ে কাঁথার নিচে ঢুকতে গেলেই আচমকা উদয় হয়ে বলে, টেবিলে বসে পড় বাবা, আমি গরম দুধ এনে দেই। জমানো টাকায় মোড়ের ভিডিও গেমের দোকানে যেতে গেলে বলে, মসজিদে যাও, সাথে খুচরা টাকা থাকলে দান-খয়রাত কোর। দশ মিনিট ধরে হেয়ার-জেল লাগিয়ে বের হওয়ামাত্র মাথায় এক আজলা পানি ঢেলে দিয়ে বলে, জমজমের পানি এটা, একটু দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দেই, মাথা ঠান্ডা হবে। অতএব, এ-রকম সময়ে আমার মায়ের আমাকে মনে পড়তেই হল।

আমিও এ-যুগের ছেলে। জননীর চেয়ে মান-ইজ্জত বড়। তারচেয়েও বড় ব্যক্তিগত বিলাস। অতএব, রুমমেটকে বলে দিলাম মাকে অপেক্ষা করতে বলতে। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন। এক হাত ধুয়ে, দরজার ফাঁক দিয়ে ফোন নিলাম। শীতের ভোরের মত প্রশান্ত আর শরতের মেঘের মত ভেসে যাওয়া একটা কণ্ঠে বললাম, হুম। মা অবাক হল এই আনন্দে। এ-আনন্দের স্বাদ আমার পাবার কথা না। একটু উদ্বিগ্ন হয়েই প্রশ্ন, কী করছো?

এজবাস্টনের টাই ম্যাচে ফিফটি করার পরের স্টিভ ওয়াহ’র মত চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, একা একা চুল কেটে সারলাম, কী যে শান্তি!

Thursday, October 16, 2008

‘কী ব্যাপার ইশতি, আমার খবর নাও না যে?’

গিয়েছিলাম কামলা খাটতে। ফেরার পথে বাসের ভেতর জালাল ভাইয়ের ফোনের আওয়াজ টের পাইনি। নেমেই দেখি ভয়েসমেইল। ভাঙা ভাঙা সিগনালে শুধু “জুবায়ের ভাই” আর “সাতটা বিশ” শুনতে পেলাম। নানান কারণে ব্লগে অনিয়মিত হলেও জুবায়ের ভাইয়ের খবরটা দেখে যেতাম প্রতি রাতে। কাল রাতে আপডেটগুলোয় চোখ বুলাতে গিয়ে মনে কেমন যেন কু-ডাক দিচ্ছিল একটা। ভয়েসমেইল শুনে ছ্যাৎ করে উঠলো তাই। জালাল ভাইকে ফোন করলাম, বাসায় এসে সচলায়তনে দেখলাম জুবায়ের ভাইয়ের সেই ছবিটা।

নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কাঁদবো না। প্রথম ফোঁটা দুটো এইতো সবে গড়াচ্ছে। অনেক বেশি অপরাধবোধ কাজ করছে মনের মধ্যে। কানে বাজছে ফোন করেই জুবায়ের ভাইয়ের অনুযোগ, “কী ব্যাপার ইশতি, আমার খবর নাও না যে?”

সচলায়তনে প্রথম দিকে নিজের মত এক কোণে থাকতাম। বড় লেখা দেখলে পড়তাম না, মন্তব্য করলেও ভয়ে ভয়ে করতাম। তখন ‘চুপকথা’ প্রকাশিত হচ্ছে কিস্তিতে। ধারাবাহিক উপন্যাস বলেই দূর দিয়ে যেতাম। একদিন কোন কুক্ষণে ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম একটি পর্বে। সেই থেকেই জুবায়ের ভাইয়ের লেখার সাথে পরিচয়। জুবায়ের ভাই কিছু লিখলেই প্রথমে মনে মনে কিছুক্ষণ বকে নিতাম তাঁকে। জুবায়ের ভাইয়ের লেখাগুলো যত বড়ই হোক, পড়তেই হত। না পড়লে ঘুম আসতো না, কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগতো। সপ্তাহের শুরুতে ফোনে বলতাম আমার লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে হলেও ছোট ছোট লেখা দিতে, আবার সপ্তাহের শেষে এই আমিই বলতাম লেখা দিচ্ছেন না কেন।

ব্লগের বাইরে জুবায়ের ভাইয়ের সাথে কথাবার্তার শুরু জানুয়ারির মাঝামাঝি। সচলায়তনেই ব্যাক্তিগত মেসেজ পাঠিয়ে জুবায়ের ভাই ধন্যবাদ দিয়েছিলেন ‘অবিনাশী গান’ এর সাথে তাঁকে একটা পোস্ট কার্ড দেবার জন্য। সামর্থ্যের অভাবে আট আনার পোস্টকার্ড, আর লজ্জার আধিক্যে শুধু ‘প্রিয় লেখককে শুভেচ্ছা’। সন্ধ্যা থেকে চেয়ে আছি সেই সামান্য অভিনন্দনটুকুর জবাবে জুবায়ের ভাইয়ের দেওয়া আন্তরিক মেসেজটার দিকে। একটা জায়গায় লিখেছিলেন, “লেখক হওয়ার বাসনা সত্যিই ছিলো, হলো না এ জীবনে, তবু প্রিয় লেখক হলাম কী করে? তারপরও মনে হয়, এইসব ছোটো ছোটো ভালো লাগা আছে বলে জীবন এতো সুন্দর।” হায় সে বিনয়, হায় সে জুবায়ের ভাই।

তার ক’দিন পরেই আবার মেসেজ দিয়েছিলেন। ফোন নম্বর নিশ্চিত করে বললেন সপ্তাহান্তে চমকে দেবেন। সেই শনিবারেই ছিল জুবায়ের ভাইয়ের সাথে প্রথম কথা। “ইশতি, আমি বর্গীয়-জ জুবায়ের!”। ঘুম জড়ানো চোখে সালাম-পর্ব সেরে আলাপচারিতায় যেতেই বললেন, “আপনাকে চমকে দেবো বলেছিলাম না? এখানে আরও একজন জুবায়ের আছেন। অন্তস্থ-য যুবায়ের।” বলেই ফোন দিয়েছিলেন সুবিনয় মুস্তফীকে। যুবায়ের ভাইয়ে অনেক বেশি হিংসা হচ্ছে আজকে, জুবায়ের ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তাই।

সেই থেকে প্রায়ই ফোন করতেন। অনেক আপত্তির পরও আপনি করে বলতেন। বলতেন, অহেতুক কাউকে কষ্ট দিতে চান না, সবাইকে সম্মান দেখাতে চান। আপনি করে ডাকলে আর কথা না বলার হুমকির পর অবশেষে তুমিতে নেমেছিলেন। আমার দ্বিগুণেরও বেশি বয়সী হয়েও আশ্চর্য রকম উদার ভাবে কথা বলতেন, আমার মত জানতে চাইতেন। প্রবাসজীবন নিয়ে কথা হত, লুইজিয়ানার গরম নিয়ে কথা হত, মা-ভাই কেমন আছে তা নিয়ে কথা হত, আর অনেক বেশি কথা হত বাংলাদেশ নিয়ে।

আমি লেখক নই, ইতিহাসবেত্তা নই, সমাজবিজ্ঞানী নই। আমি স্রেফ হাতুড়ে প্রকৌশলী। রাজনীতি, দর্শন, সমাজ, বা ইতিহাস নিয়ে লিখতে তাই আমার হাত কাঁপতো অনেক। জুবায়ের ভাই একদিকে ধাঁরালো সমালোচনা করতেন, আরেক দিকে সাহস দিতেন। আমি বলতাম যে তাঁর মাপের একজন মানুষের সাথে কথা বলতেই বুক দুরুদুরু করে আমার। তিনি জবাবে বলতেন, বিশ্বাস অটল থাকলে তো এটা হবার কথা নয়।

জুবায়ের ভাইকে আমি ‘সচলায়তনের হেডমাস্টার’ ডাকতাম। একমাত্র তিনিই সরাসরি ভুল ধরিয়ে দিতেন। শুনেছি কটূ কোন ভুল ধরা পড়লে ব্যাক্তিগত মেসেজ পাঠিয়ে সেটা জানান দিতেন। আমার সময় রাত ১১ টার দিকে জুবায়ের ভাই সাধারণত সচলায়তনে আসতেন। আমার লেখাগুলোয় প্রথম দিকের মন্তব্যকারী হতেন সব সময়। অল্পবিস্তরে অনেক গভীর সমালোচনা রেখে যেতেন। মনটা কোন রাতে জুবায়ের ভাইয়ের মন্তব্যের অপেক্ষা করতো, কোন রাতে লেখার। কিছুদিন আগে জুবায়ের ভাই খেলাপীর খাতায় আমার নাম তুলে দিয়ে গিয়েছেন। ‘হারিকেন, ফুটবল, ও কিছু মানুষের কথা’ নিয়ে বলেছিলাম, লেখায় ছেদ পড়ে গেছে দেখে আর দেইনি। সেই ছিল জুবায়ের ভাইয়ের কাছে প্রথম ধমক খাওয়া। তুমি থেকে আবার আপনিতে উঠে গিয়েছিলেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম শেষ করবো। জুবায়ের ভাই শেষ হয়ে গেলেন, আমি শেষ করতে পারলাম না। নিজেকে বলছিলাম শক্ত থাকবো। লেখাটা আজই সেরে পোস্ট করে দেবো। পারলাম না। মন মানলেও চোখ আর মানলো না।

দেশ আর রাজনীতি নিয়ে অনেক গল্প হত। জুবায়ের ভাইয়েরই গুঁতাগুঁতিতে ‘নিজস্ব ধাঁচের গণতন্ত্র’ লেখা শুরু করেছিলাম। তাঁরই ধমকে সেটা শেষ হয়েছে। অখণ্ড পিডিএফ কপি ডাউনলোড করে জুবায়ের ভাই কথা দিয়েছিলেন, পুরোটা আবার পড়ে জানাবেন তাঁর মত। পারলেন না। আমি বারাক ওবামার ভক্ত, তাই আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ওবামার মধ্যপন্থা সম্পর্কে আমার মতামত। ফোনে বলার পরে বলেছিলেন, “এবার এগুলো লিখে ফেল দেখি।” হল না।

সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর জুবায়ের ভাই হাত দিয়েছিলেন ‘আমাদের বাতিঘরগুলো ও আসন্ন দিন’ সিরিজে। দুরন্ত সেই সিরিজে লিখে চলছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের কথা। ষষ্ঠ পর্বের পর আটকে যায় সিরিজটি। জুবায়ের ভাই একদিন ফোন করে বললেন, “আমি তো ফেঁসে গেছি, ইশতি! এত বড় কাজে যে হাত দিয়েছি সেটা তো আগে বুঝিনি।” সে-দফা ভূমিকা বদলে গিয়েছিল। সবিস্তারে আলোচনা হচ্ছিল ইতিহাস নিয়ে, সিরিজ এরপর কোনদিকে যেতে পারে তা নিয়ে। জুবায়ের ভাইকে বলেছিলাম, আপনার লেখা এই সিরিজের লিংক আমি এ-প্রজন্মের অনেকের কাছে বিলিয়েছি, তাদের জন্য হলেও আপনাকে শেষ করতে হবে। জবাবে বলছিলেন বিভিন্ন জায়গায় গল্প-উপন্যাস লেখার কথা। ঠান্ডা গলায় বলেছিলাম, এমন কোন গল্প আপনি লিখবেন না যেটা আর কেউ বছর দশেক পর লিখতে পারবে না, তবে আমাদের ইতিহাস নিয়ে আপনার বিশ্লেষণের দায়িত্বটুকু আর কেউ পালন করতে পারবে না। জুবায়ের ভাই কথা দিয়েছলেন শেষ করবেন। বিনিময়ে আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন, সিরিজশেষে ফোনে প্রকাশ করা মতটুকু আমি পোস্ট আকারে দেবো।

একবার বায়না করার মত করেই জুবায়ের ভাই বলেছিলেন গল্প লেখার কথা। গল্পে গল্পে বললে বোধগুলো অনেক তরল অবস্থায় মানুষের মনের মাঝে ঢুকে যায়। বিশ্লেষণী প্রবন্ধ এই দিকে অনেক কাঠখোট্টা। বলেছিলাম যে আমাকে দিয়ে গল্প হয় না। নাম বানাতে পারি না, প্রথম পুরুষ ছাড়া লিখতে পারি না। জুবায়ের ভাই উপদেশ দিয়েছিলেন কিছু। কথা দিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের উপর একটা গল্প লিখবো। জুবায়ের ভাইয়ের সেটা দেখে দেওয়ার কথা ছিল। হল না।

এইতো সেদিন সচলায়তন নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে লেখার পর ফোন করে সাহস জুগিয়েছিলেন। শহীদ জননীকে নিয়ে লেখা পোস্টের আকার আরো বড় হতে পারতো বলেছিলেন। লেখার আকার দেখে পাঠক ভাগার ভয়ের কথা শুনে নিজের মত লিখে যাবার কথা বলেছিলেন। সেদিনই মাত্র তানভীর ভাইয়ের পোস্টে জুবায়ের ভাই আমার কথা বলেছেন জেনে লজ্জা আর আনন্দে ডুবে গেছি। লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ততায় ডুবেছিলাম কিছুদিনের জন্য। ফিরতাম অচিরেই। অথচ আজকে নাকি জুবায়ের ভাই নেই!

আমার কানে সেই সন্ধ্যা থেকে ভেসে আসছে একটাই কথা, “কী ব্যাপার ইশতি, আমার খবর নাও না যে?”

Tuesday, June 03, 2008

প্রবাসের কথোপকথন - ১৫

তোমার গা থেকে ফুলের সুবাস আসছে আজকে। খুব সুন্দর গন্ধ, এত চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না কীসের গন্ধ এটা। ইউ লুক ভেরি ফ্রেশ অ্যাজ ওয়েল।
ফুল ঠিক মাই কাপ অফ টি না। আমার দৌঁড় গোলাপ পর্যন্ত। তবে ল্যাভেন্ডার খুব প্রিয়। ছোটবেলায় নানাকে দেখতাম ইয়ার্ডলি ব্যবহার করতে। ওদের ল্যাভেন্ডারটা অসাধারণ লাগতো। আমিও তোমার পারফিউমের গন্ধটা চিনতে পারছি না। সকাল বেলা বাসে যাবার সময় এরকম তাজা সুবাস পাই, কিন্তু মেয়েলি ব্যাপারে ধারনা কম দেখে চিনতে পারি না। ওদিকে আবার জিজ্ঞেসও করতে পারি না চড় খাবার ভয়ে।

উহু, তবুও কিছু একটা ভিন্ন আজকে। কিছু একটা করেছো যা আগের বার করনি।
আজকে গোসল করে, শেভ করে এসেছি। নাহলে আমার ঘাম-ময়লা-দুর্গন্ধ তোমার হাতে চলে যেত। সেটা হতে পারে। আফটার শেভটার জন্য এরকম লাগছে হয়তো। আন্দাজ করতে পারো কিনা দেখি তো। উহু, জিলেট না। ওল্ড স্পাইসও না। ব্রুট।

গন্ধটা পছন্দ হয়েছে আমার। আগে তেমন কাউকে দেখিনি এটা ব্যবহার করতে।
না দেখারই কথা। এটার বদনাম আছে বুড়াদের ব্র্যান্ড হিসেবে। তবে আমার বেশ লাগে। কেমন যেন শান্ত একটা গন্ধ। জ্বলে খুব, এটাই সমস্যা।

তোমার চুলগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। দেখে তো মনে হচ্ছে না চুল পড়ার সমস্যা আছে, বরং বেশ ঘন আর সিল্কি।
বলে যাও, শুনে সুখ পাই। আমার অত খুঁতখুঁতে ভাব নেই। শুধু কান আর ঘাড়ে চুল লাগলেই অস্বস্তি লাগে।

ট্রিমারে কয় নম্বর সাইজ ব্যবহার করো তুমি চুল কাটানোর সময়? সে কী, এত বছর ধরে চুল কাটিয়েও তুমি জানো না কোন সাইজ? ঠিক আছে, কত ইঞ্চি বললেও চলবে।
এসব ব্যাপারে আমার কোনই ধারনা নেই। সাইজের আন্দাজ বলতে পারবো না। আমি চুল কাটাতে গেলে শুধু বলি, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু ফিল মাই ইয়ারস। এরপর নাপিত যা করার করে। এই যে এখন যেমন চুলের ভারে এলোমেলো অবস্থা। মেয়েদের মত কানের উপর থেকে চুল সরাতে সরাতে ক্লান্ত।

মেয়েদের মত হলেই খারাপ, তাই না? খুব খারাপ। রাগ করার কিছু নেই, ঠাট্টা করছিলাম। সাইজ না জানলে তো একটু ঝামেলা হয়ে গেল। এত্ত কম জানলে কি চলে এই যুগে? লম্বা চুল রাখলে যখন খারাপ লাগে, তাহলে যেমন আছে তেমনটাই রেখে শুধু ছোট করে কাটাতে পারো তাহলে।
সেটাই ভালই হয়। সেই যে ছোটবেলায় বাবা চুল আঁচড়ে দিতো, এরপর থেকে তো সাহসে কুলায়নি কোনদিন কিছু করতে। তোমার মাথায় কিছু খেললে বল। লেট ইওর ইমাজিনেশন রান ওয়াইল্ড। তুমি যা বলবা, তাই হবে। একটা ঝুলঝাড়ুর চুল কাটলেও আপত্তি করতে পারে, আমি করবো না। তোমার হাতেই আমার মাথা সঁপে দিলাম, যাও। অবশ্যই, বল তো ন্যাড়া হতেও আপত্তি নেই। আই ওয়োন্ট হোল্ড এনিথিং এগেইন্সট ইউ, আই প্রমিস। আমার এই খোমা প্রসাধনের ঊর্ধ্বে, তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। বছরের পর বছর ধরে সাত-সকালে উঠে নিজের মুখ দেখতে দেখতে এখন দুঃস্বপ্ন দেখেও ভয় লাগে না। এই রকম চেহারা নার্ভের জন্য ভালো।

অনেক হল, ঠাট্টা রাখো এবার। তুমি কোন দেশ থেকে যেন? ও হ্যাঁ, বাংলাদেশ। আমি লেবানন থেকে এসেছি। আমি আরেকটু বেশিদিন হয় দেশে যাই না। প্রায় ১৩ বছর। যেতে মন চায়, যাবো যাবো করি, আমার মা ওখানেই, কিন্তু গোলাগুলি আর যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য যাওয়া হয় না।
খুব খারাপ লাগার কথা অবশ্যই। বাকি ভাই-বোন সহ এখানেই থাকো, না? ওহ, আমি তো ভাবলাম তুমি এখানে পড়াশোনা কর। আমি আছি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙ্গে। আরে ধুর, ফালতু কথা ওসব। স্মার্ট না ছাই। বাপ-মা ধরে-বেঁধে পড়ালো দেখে পড়ছি। আমার হাতে ছেড়ে দিলে অর্থনীতি নয়তো ইতিহাস নিয়ে পড়তাম। এই যে, এখন বুড়া বয়সে এসে আর ভাল লাগে না পড়তে, তার কারণ ঐ জোর করে পড়ানোই।

এটা কোন কথা হল না। লেগে থাকো, হয়ে যাবে। লাইফ ইজন্‌’ট ফেয়ার, অ্যান্ড নো ওয়ান এভার সেড ইট ইজ। ম্যান আপ, ডুড।
ঠিক হল না কিন্তু। মারলা তো মারলা, একদম বেল্টের নিচেই মারলা। নাহ, এই জন্যই মেয়েদের সাথে কথা বলতে ভয় লাগে আমার। প্রথম দিকের আধো-আধো কথা ভুলে নিজের ডিফেন্স লোয়ার করি, আর তারপর ধুম করে এরকম কিছু একটা বলে বসে সবাই।

নারী আর পুরুষ কখনও সমান হতে পারে না, এটা আমরাও বুঝি। তবে ছেলেরা দুর্বল লিঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা তাদের ঠিকই সহ্য করে এসেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।
ঐ যে আবার শুরু হল কোমড়ের নিচে মারামারি। এমন একটা সময় বলছো এসব, যখন আমি পুরোপুরিই তোমার মর্জির কাছে জিম্মি। এই মুহূর্তে তোমার সাথে একমত না হলে আমাকে যাচ্ছেতাই একটা মো-হক নিয়ে ঘুরতে হবে এক মাস।

ভয় নাই। চুলও ছিড়বো না, বকাও দিবো না। গরমের এত ভয় তোমার, মাথায় এত গরম লাগে, তবু আজকের মত দিনে তুমি সুইমিং পুলে না কেন?
চুল, চুল। এই জঙ্গলটা সাফ করে নেই আজকে, তারপর কালকে থেকে নাহয় যাবো আবার। সপ্তাহ খানেকের একটা বড় ট্রিপ দিয়ে আসলাম। বাড়ি থেকে সাতশ' মাইল দূরে গিয়ে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। সেই গাড়ি ঠিক করতে করতে আমরা আরো ঘুরে বেড়ালাম। না না, বন্ধুর গাড়ি। আমার না।

আমার একটা হোন্ডা আছে। ১০ বছর পুরনো। আমি যখন ১৮ বছরের ছিলাম, তখন কিনেছিলাম।
ভাল সার্ভিস দেওয়া উচিত। হোন্ডা খুব রিলায়েবল গাড়ি। তবে আওয়াজ বেশি করে, এটাই সমস্যা। ইদানিং সেগুলো ঠিক করে ফেলেছে অবশ্য।

আমি চালাই খুব কম। ১০ বছরে মনে হয় মাত্র এক লাখ মাইলে চলেছে গাড়ি। আই বট অ্যান অ্যাকর্ড।
এক মালিকের হাতে চলা গাড়ি, বিক্রি করলে দাম পাবা ভালো। হোন্ডার প্রাইস রিটেনশন সবচেয়ে ভাল। আমেরিকান আর কোরিয়ান গাড়ির দাম সবচেয়ে কমে।

আমার বাবা বলেছিল তাকে বিক্রি করে দিতে। তেলের দাম বেশি দেখে তার ট্রাকটা বের করতে চায় না।
কেনার সময় খেয়াল রাখা দরকার ছিল। এই ভুল করেই ডেট্রয়েট ডুবলো। তেল একটা সীমিত সম্পদ, এর দাম কখনো না কখনো বাড়বে। এই সহজ সত্যটা ভুলে গিয়ে আজকে আমেরিকার বেহাল দশা। বেশি বেশি লাভের লোভে ট্রাক আর এসইউভি বিক্রি করতে থাকলো। আজকে অর্থনীতির বেহাল দশা হত না সময় থাকতে সচেতন হলে।

আমি এই জন্যই কোন খোঁজ রাখি না। সবাই শেয়ার মার্কেট নিয়ে চিন্তা করে, আমি কিচ্ছু করি না। স্রেফ নিজের মত থাকি।
কে যেন বলেছিল, হ্যাপিনেস ইজ আ চয়েস। সুতরাং যা করছো, ঠিকই হয়তো। অযথা খাল কেটে ডিপ্রেশন ডেকে আনার মানে নেই কোন। তবে তেলের দাম হিসেবে রাখতেই হয়। আমি চার বছর আগে ওয়ান এইটি ফাইভে কিনেছিলাম, এবার কিনলাম ফোর টুয়েন্টিতে। জাপানি গাড়ি কিনেছিলা বলে রক্ষা, নয়তো অনেক টাকা যেত তেল কিনে।

আমার ইচ্ছা একটা লেক্সাস কেনার। ইএস। ইউ নো হোয়াট আই অ্যাম টকিং এবাউট, রাইট?
আই শিওর ডু। আমার রুমি একটা লেক্সাস চালায়। আর এবার ঘুরে আসলাম ভলভোয়। বেশ লাগলো চড়ে। আমার শখ বিএমডব্লিউ কেনার। সারা জীবনের শখ আমার।

শোন, থ্রি-এইটথ্‌ ইঞ্চ কাটি তোমার চুল। আর সামনে কিছুটা বড় রাখি। স্পাইকিং জেল লাগিয়ে দেই। খারাপ লাগবে না দেখতে।
অ্যাজ ইউ লাইক ইট। আমার কাছে সব সমান। পেছনে যেমন খুশি করতে পারো। স্কোয়্যার আর রাউন্ডের তফাৎ নেই আমার কাছে। দ্যাট্‌স পারহ্যাপস দি ওনলি পার্ট অফ মাই বডি হুইচ আই ক্যান্ট সি নো ম্যাটার হাউ মাচ আই ট্রাই। ওয়েল, হয়তো আরো দুই-একটা জায়গা আছে, তবে সেদিকে নাহয় না যাই। আপাতত স্কোয়্যারই করে দাও। তো এই গাড়ি বিক্রি করলে কি লেক্সাস কিনবে? মিন্ট কন্ডিশনে আপত্তি না থাকলে বছর পাঁচেকের পুরনো লাক্সারি মডেলের গাড়ি কিনতে পারো। দে কাম ফুললি লোডেড টু।

আমার এই স্বপ্নটা সত্যি হবে বলে মনে হয় না। ঐ যে আয়নার নিচে ছবিটা দেখতে পারছো? ঐটা আমার মেয়ের ছবি। ওর জন্মের পর আমার এক্স-হাসব্যান্ড খুব অবাক হয়েছিল আমার দেওয়া নাম শুনে। আই নেমড হার অ্যালেক্সিস, বিকজ আই ওয়ান্টেড আ লেক্সাস অল মাই লাইফ।
আইডিয়াটা খুব পছন্দ হয়েছে আমার। আমার ছেলে হলে তাহলে নাম রাখতে হবে বিমার।

বিমার ফ্রম বিএমডব্লিউ, রাইট? শুনতে খারাপ না। নাও, হয়ে গেছে তোমার চুল কাটা। ইট্‌স টুয়েলভ নাইনটি ফাইভ।

প্রবাসের কথোপকথন - ১৪

এই রাস্তাই তো? দেখো তো আবার, ম্যাপের সাথে কিন্তু মিলে না। ম্যাপে যেখানে বললো, সেখানে কিছুই নাই।

এই রাস্তাই নিয়ে যাবে। আগের বার ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে এই রাস্তা দিয়েই এসেছিলাম। আসার পথে বুঝি নাই, তবে যাওয়ার সময় তো একটা রাস্তা একদম সোজা এসে ইন্টারস্টেটে মিশেছিল পারডু ক্যাম্পাস থেকে। গুগুলের দেখানো রাস্তাটা যেন কেমন বদখদ ছিল।


ঐ তো, এক্সিট দেখা যায়। লেখা আছে পারডু ইউনিভার্সিটির রাস্তা।

এটাই হবে। নিয়ে নেন। আমি এই রাস্তা দিয়ে ফিরি নাই অবশ্য। ইলিনয় থেকে এসেছিলাম। অন্য রাস্তা ছিল সেটা। খুবই বীভৎস অভিজ্ঞতা অবশ্য। ওয়াবাশ নদীর পরে বামে যেতে হত। আমি বেকুবের মত আগের রাস্তা নিয়ে ফেলেছিলাম। কোথায় যে গিয়ে হাজির হলাম এরপর! ফিরতি রাস্তা খুঁজে না পেয়ে ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম গুগুল ম্যাপ দেখে উদ্ধার করতে। ওকে পাশের রাস্তার নাম বললাম, বলে যে গুগুলে নাকি ঐ জায়গার কোন ইনফরমেশন নাই। চারদিকে তো শুধু ভূট্টা ক্ষেত। এর মধ্যে আমি সত্তর মাইল বেগে টানলাম গাড়ি। মিনিট দশেক চলার পর একটা রাস্তার নাম পাওয়া গেল গুগুলে। সেই থেকে আমি চেনা রাস্তার বাইরে চালাই না আমেরিকান মিডওয়েস্টে।


এই কথা আগে বলবা না? তাহলে তো ভোর চারটার সময় পারডু ক্যাম্পাস দেখতে আসি না।

ব্যাপার না। কী আছে দুনিয়ায়! এই দেশে গাড়ি, ফোন, আর ক্রেডিট কার্ড সাথে থাকলে কিছু লাগে না। হারালেও ভয় নাই। আর এই এলাকায় হারানোর হলে ভরদুপুরেও হারানো যায়।


ক্ষুধা লাগসে, কিছু খাওয়া দরকার। সামনে কোন ম্যাকডোনাল্ডস দেখলে বলো তো।

রাস্তায় তো রাস্তার নামই দেখছি না, খাবার দোকান দূরের কথা। আচ্ছা, ম্যাপে বলছে যে স্টেট রাউট ২৮ নিতে হবে। দেখছি না কোন দিকে। ডানে ওয়ানওয়ে, বামে ডেড এন্ড, সোজাই চলেন। ঐ যে একটা হাসপাতাল আছে। ওখানে জিজ্ঞেস করি গিয়ে। আপনি থাকেন, আমি জেনে আসি।


কাজ হল?

নাহ, অযথা দরজা ধাক্কায় চলে আসলাম। কাউকে দেখলাম না ভিতরে। মনে হয় অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া দরজা খুলবে না। আজিব জায়গায় আসলাম।


ঐ যে একটা হোয়াইট ক্যাসল দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আট-দশটা বার্গার খেয়ে ফেলি গিয়ে।

বলেন কী? আট-দশটা বার্গার? গাড়ির জানালা খুলে চালাতে হবে তাহলে অযথা। বাদ দেওয়া যায় না? ম্যাকডোনাল্ডসই মেরে দেই আরেকটু কষ্ট করে। সাইজে ছোট হলেই বেশি খেতে হবে এমন কথা নাই তো। সে যাকগে, আমার পেটের ইঁদুরটা নাচতে নাচতে ঘুমায় গেছে। ওখান থেকে রাস্তার ব্যাপারেও জেনে নেওয়া যাবে।


কী খাবেন? রাত তো অনেক হল, বেড়াতে বেরিয়েছেন বুঝি? কতগুলো বার্গার দেবো?

ঢালতে থাকেন খাবার। আমরা চারজন আছি। আপাতত জনপ্রতি চারটা করে বার্গার দেন। লাগলে পরে আবার নেবো নাহয়। কোক নেই তো পেপসিই দেন। ইয়েস, অ্যান্ড বিওয়্যার অফ দ্য এলিফ্যান্ট দ্যাটস উইথ আস। আরে আরে তেড়ে আসার কী হল? তুমি একটু স্বাস্থবান দেখেই তো আমি ইয়ার্কি করি। ইটস ওকে, হি প্রমিসড হি উড লিভ দ্য কিচেন অ্যালোন।


তুমি তো খুব মিন। কাম হিয়ার সুইটি। এসো আদর করে দেই তোমাকে।

ইয়া, আইম শিওর হি কুড ইউজ সাম লাভ, ইট ওয়াজন্ট দ্য বেস্ট অফ এক্সপিরিয়েন্সেস ফর হিম টু রাইড উইথ মি। লাভ নাই চোখ রাঙায়। যাও গিয়ে মোটির আদর খাও। এত সহজে ছেড়ে দিবো ভাবসিলা? আসল পরিকল্পনা তো এটাই ছিল। খাওয়া নিয়ে ক্ষেপানো তো পুরনো হয়ে গেছে।


ইজ দেয়ার এনিথিং এলস আই ক্যান হেল্প ইউ উইথ হোয়াইল শি টেকস দ্য অর্ডার?

হু, পারেন। বিশাল সাহায্য দরকার একটা। আমরা রাস্তা হারিয়ে এখানে এসে পড়েছি। এসেছি ভার্জিনিয়া টেক থেকে। হ্যাঁ, ঐ গোলাগুলির ইউনিভার্সিটি। সবাই ভাল আছে এখন, থ্যাঙ্ক ইউ। যাচ্ছিলাম শিকাগো। কনসার্ট দেখতে। পথে ভাবলাম পারডু ইউনিভার্সিটি দেখে যাই। মাঝপথে প্ল্যান তো, তাই ম্যাপ নিয়ে বের হইনি। এই ভোররাতে তাই অন্ধের মত পথ হাতড়াচ্ছি ভূট্টা ক্ষেতের মাঝে।


তোমাদের তো দেখি হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমারের মত অবস্থা।

বলতে পারো। গোয়িং টু হোয়াইট ক্যাসল। আমিও বুঝতে পারছি না পুরোটা। জাস্ট প্লে অ্যালং। বুঝার ভান কর। আমি নিজেও মুভিটা দেখি নাই এখনও, তবে জানি যে একটা ইন্ডিয়ান আর একটা চাইনিজ কী সব যেন করে। এটাও না চিনতে আরও বেকুবের মত দেখাবে। হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার, অফিস স্পেস, নেপোলিয়ন ডায়নামাইট, ন্যাশনাল ল্যাম্পুন, ইত্যাদি হল এই দেশের কাল্ট ফেভারিট। প্রতিটাতেই কিছু না কিছু বাঁদরামো করে বেড়ায় কিছু পোলাপান। এখানে এগুলো নিয়ে না জানা খুবই খেতু ব্যাপার। বুঝো আর না বুঝো, বুঝদারের মত একটা হাসি ধরে রাখো মুখে।


এখান থেকে বের হয়ে স্টেট রোড ২৬ পাবে, তারপর সাউথ স্ট্রিট। যেতে যেতে ইউএস ৫২ পার করবে, একটা হাসপাতাল পার করবে, মেইন স্ট্রিটের উপর একটা লিকার স্টোর পার করবে। ঠিক পথে থাকলে এগুলো পরপর পাবে সব।

ঠিক আছে। মদের দোকান পর্যন্ত যেতে পারবো। হাসপাতালটা তো চোখে পড়েছেই। আচ্ছা, তারপর কলাম্বিয়া স্ট্রিট আর কোর্ট হাউসও পার করবো। এরপর?


এরপর হাতের ডানে ট্রিপল এক্স পড়বে। ওটাকে ফেলে কিছুদূর এগোলেই তোমার চেনা রাস্তা পাবে।

হু, এরপর হয়তো ওয়াবাশ খুঁজে পাবো। ঐ দিকটা কিছু কিছু মনে আছে এখনও। একটু আপহিল রাস্তা, পুরনো বাড়ি, চার্চ। সব মিলিয়ে পুরনো ঘরানার বেশ ছিমছাম জায়গা। বার্গারগুলো শেষ করেই রওনা দিচ্ছি। বাই দ্য ওয়ে, ট্রিপল এক্স কি একটা অ্যাডাল্ট বুকস্টোর?


নো, ইটস আ বার্গার জয়েন্ট। থ্যাঙ্কস ফর কামিং। ওহ ইউ আর সো লাইক হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার।

ইয়ে, মানে, আচ্ছা ঠিক আছে। চলেন ভাই তাড়াতাড়ি, বেইজ্জতি প্রশ্ন করে ফেলেছি। এই বামে দিয়ে বের হন। সামনের গাড়িটার লাইসেন্স প্লেটে লেখা আছে, ইন গড উই ট্রাস্ট। আমেরিকা তো না, যেন জেরুজালেমে আছি। ২০০৪ এর ইলেকশনের পর একটা কার্টুন দেখেছিলাম। সেটায় নিউ ইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়াকে ক্যানাডার সাথে যোগ করে লেখা, ইউনাইটেড স্টেটস অফ ক্যানাডা। বাদবাকি স্টেটগুলোকে লাল রং করে বড় করে লেখা, জেরুজাল্যান্ড।


এই গানটার ভলিউম একটু বাড়িয়ে দে তো রে। এটার বেজ অসাধারণ।

বাজনা ভাল, কিন্তু কানে লাগে খুব। আমি এককালে বেজ সহ্য করতে পারতাম না। কেমন যেন লাগতো। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে ধরে-বেঁধে আমাকে সেট দ্য কন্ট্রোলস ফর দ্য হার্ট অফ দ্য সান শুনানো হয়েছিল। ওটা শুনে বুঝেছিলাম বেজ কী জিনিস।


শোন, বেজ হল মা-বাপের মত। না থাকলে বুঝা যায় কী জিনিস।

দামী কথা রে, বহুত দামী কথা। যাক, কালকে রাতটা কোন রকমে পার করা গেল তবু। আবার ক্ষুধা লেগে গেছে। এই বেলায়ও কি ফাস্ট ফুড খাবেন, নাকি ভাল কোথাও বসবেন?


ভাল কোথাও বসি। একটু লিকার খেতে পারলে ভাল হত। ঐ যে সামনে একটা রেস্তোরাঁ আছে। জোস বার অ্যান্ড গ্রিল। চল ওখানেই যাই।

আমি কোক নিবো। জীবনে তো অ্যালকোহল ছুঁইনি এখনও। অবশ্য, জীবনের অনেক কিছুই তো ঠিক মত যায়নি। যা হয় হবে, নিয়েই ফেলি একটা। নিয়ম কী খাওয়ার? আমি তো জানি না তেমন কিছু একটা।


মদ খেলে সব সময় নিচের থেকে উপরে উঠবা। আগে বিয়ার, পরে ককটেল বা ওয়াইন। উলটা করতে নাই। তাহলে মাথা ধরবে। একটা লং আইল্যান্ড আইসড টি নিতে পারো। আমার বেশ ভাল লাগে ওটা। বেশি জোরে টেনো না শুরুতেই। একটু চেখে দেখো কেমন লাগে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।