Tuesday, June 03, 2008

প্রবাসের কথোপকথন - ১৪

এই রাস্তাই তো? দেখো তো আবার, ম্যাপের সাথে কিন্তু মিলে না। ম্যাপে যেখানে বললো, সেখানে কিছুই নাই।

এই রাস্তাই নিয়ে যাবে। আগের বার ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে এই রাস্তা দিয়েই এসেছিলাম। আসার পথে বুঝি নাই, তবে যাওয়ার সময় তো একটা রাস্তা একদম সোজা এসে ইন্টারস্টেটে মিশেছিল পারডু ক্যাম্পাস থেকে। গুগুলের দেখানো রাস্তাটা যেন কেমন বদখদ ছিল।


ঐ তো, এক্সিট দেখা যায়। লেখা আছে পারডু ইউনিভার্সিটির রাস্তা।

এটাই হবে। নিয়ে নেন। আমি এই রাস্তা দিয়ে ফিরি নাই অবশ্য। ইলিনয় থেকে এসেছিলাম। অন্য রাস্তা ছিল সেটা। খুবই বীভৎস অভিজ্ঞতা অবশ্য। ওয়াবাশ নদীর পরে বামে যেতে হত। আমি বেকুবের মত আগের রাস্তা নিয়ে ফেলেছিলাম। কোথায় যে গিয়ে হাজির হলাম এরপর! ফিরতি রাস্তা খুঁজে না পেয়ে ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম গুগুল ম্যাপ দেখে উদ্ধার করতে। ওকে পাশের রাস্তার নাম বললাম, বলে যে গুগুলে নাকি ঐ জায়গার কোন ইনফরমেশন নাই। চারদিকে তো শুধু ভূট্টা ক্ষেত। এর মধ্যে আমি সত্তর মাইল বেগে টানলাম গাড়ি। মিনিট দশেক চলার পর একটা রাস্তার নাম পাওয়া গেল গুগুলে। সেই থেকে আমি চেনা রাস্তার বাইরে চালাই না আমেরিকান মিডওয়েস্টে।


এই কথা আগে বলবা না? তাহলে তো ভোর চারটার সময় পারডু ক্যাম্পাস দেখতে আসি না।

ব্যাপার না। কী আছে দুনিয়ায়! এই দেশে গাড়ি, ফোন, আর ক্রেডিট কার্ড সাথে থাকলে কিছু লাগে না। হারালেও ভয় নাই। আর এই এলাকায় হারানোর হলে ভরদুপুরেও হারানো যায়।


ক্ষুধা লাগসে, কিছু খাওয়া দরকার। সামনে কোন ম্যাকডোনাল্ডস দেখলে বলো তো।

রাস্তায় তো রাস্তার নামই দেখছি না, খাবার দোকান দূরের কথা। আচ্ছা, ম্যাপে বলছে যে স্টেট রাউট ২৮ নিতে হবে। দেখছি না কোন দিকে। ডানে ওয়ানওয়ে, বামে ডেড এন্ড, সোজাই চলেন। ঐ যে একটা হাসপাতাল আছে। ওখানে জিজ্ঞেস করি গিয়ে। আপনি থাকেন, আমি জেনে আসি।


কাজ হল?

নাহ, অযথা দরজা ধাক্কায় চলে আসলাম। কাউকে দেখলাম না ভিতরে। মনে হয় অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া দরজা খুলবে না। আজিব জায়গায় আসলাম।


ঐ যে একটা হোয়াইট ক্যাসল দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আট-দশটা বার্গার খেয়ে ফেলি গিয়ে।

বলেন কী? আট-দশটা বার্গার? গাড়ির জানালা খুলে চালাতে হবে তাহলে অযথা। বাদ দেওয়া যায় না? ম্যাকডোনাল্ডসই মেরে দেই আরেকটু কষ্ট করে। সাইজে ছোট হলেই বেশি খেতে হবে এমন কথা নাই তো। সে যাকগে, আমার পেটের ইঁদুরটা নাচতে নাচতে ঘুমায় গেছে। ওখান থেকে রাস্তার ব্যাপারেও জেনে নেওয়া যাবে।


কী খাবেন? রাত তো অনেক হল, বেড়াতে বেরিয়েছেন বুঝি? কতগুলো বার্গার দেবো?

ঢালতে থাকেন খাবার। আমরা চারজন আছি। আপাতত জনপ্রতি চারটা করে বার্গার দেন। লাগলে পরে আবার নেবো নাহয়। কোক নেই তো পেপসিই দেন। ইয়েস, অ্যান্ড বিওয়্যার অফ দ্য এলিফ্যান্ট দ্যাটস উইথ আস। আরে আরে তেড়ে আসার কী হল? তুমি একটু স্বাস্থবান দেখেই তো আমি ইয়ার্কি করি। ইটস ওকে, হি প্রমিসড হি উড লিভ দ্য কিচেন অ্যালোন।


তুমি তো খুব মিন। কাম হিয়ার সুইটি। এসো আদর করে দেই তোমাকে।

ইয়া, আইম শিওর হি কুড ইউজ সাম লাভ, ইট ওয়াজন্ট দ্য বেস্ট অফ এক্সপিরিয়েন্সেস ফর হিম টু রাইড উইথ মি। লাভ নাই চোখ রাঙায়। যাও গিয়ে মোটির আদর খাও। এত সহজে ছেড়ে দিবো ভাবসিলা? আসল পরিকল্পনা তো এটাই ছিল। খাওয়া নিয়ে ক্ষেপানো তো পুরনো হয়ে গেছে।


ইজ দেয়ার এনিথিং এলস আই ক্যান হেল্প ইউ উইথ হোয়াইল শি টেকস দ্য অর্ডার?

হু, পারেন। বিশাল সাহায্য দরকার একটা। আমরা রাস্তা হারিয়ে এখানে এসে পড়েছি। এসেছি ভার্জিনিয়া টেক থেকে। হ্যাঁ, ঐ গোলাগুলির ইউনিভার্সিটি। সবাই ভাল আছে এখন, থ্যাঙ্ক ইউ। যাচ্ছিলাম শিকাগো। কনসার্ট দেখতে। পথে ভাবলাম পারডু ইউনিভার্সিটি দেখে যাই। মাঝপথে প্ল্যান তো, তাই ম্যাপ নিয়ে বের হইনি। এই ভোররাতে তাই অন্ধের মত পথ হাতড়াচ্ছি ভূট্টা ক্ষেতের মাঝে।


তোমাদের তো দেখি হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমারের মত অবস্থা।

বলতে পারো। গোয়িং টু হোয়াইট ক্যাসল। আমিও বুঝতে পারছি না পুরোটা। জাস্ট প্লে অ্যালং। বুঝার ভান কর। আমি নিজেও মুভিটা দেখি নাই এখনও, তবে জানি যে একটা ইন্ডিয়ান আর একটা চাইনিজ কী সব যেন করে। এটাও না চিনতে আরও বেকুবের মত দেখাবে। হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার, অফিস স্পেস, নেপোলিয়ন ডায়নামাইট, ন্যাশনাল ল্যাম্পুন, ইত্যাদি হল এই দেশের কাল্ট ফেভারিট। প্রতিটাতেই কিছু না কিছু বাঁদরামো করে বেড়ায় কিছু পোলাপান। এখানে এগুলো নিয়ে না জানা খুবই খেতু ব্যাপার। বুঝো আর না বুঝো, বুঝদারের মত একটা হাসি ধরে রাখো মুখে।


এখান থেকে বের হয়ে স্টেট রোড ২৬ পাবে, তারপর সাউথ স্ট্রিট। যেতে যেতে ইউএস ৫২ পার করবে, একটা হাসপাতাল পার করবে, মেইন স্ট্রিটের উপর একটা লিকার স্টোর পার করবে। ঠিক পথে থাকলে এগুলো পরপর পাবে সব।

ঠিক আছে। মদের দোকান পর্যন্ত যেতে পারবো। হাসপাতালটা তো চোখে পড়েছেই। আচ্ছা, তারপর কলাম্বিয়া স্ট্রিট আর কোর্ট হাউসও পার করবো। এরপর?


এরপর হাতের ডানে ট্রিপল এক্স পড়বে। ওটাকে ফেলে কিছুদূর এগোলেই তোমার চেনা রাস্তা পাবে।

হু, এরপর হয়তো ওয়াবাশ খুঁজে পাবো। ঐ দিকটা কিছু কিছু মনে আছে এখনও। একটু আপহিল রাস্তা, পুরনো বাড়ি, চার্চ। সব মিলিয়ে পুরনো ঘরানার বেশ ছিমছাম জায়গা। বার্গারগুলো শেষ করেই রওনা দিচ্ছি। বাই দ্য ওয়ে, ট্রিপল এক্স কি একটা অ্যাডাল্ট বুকস্টোর?


নো, ইটস আ বার্গার জয়েন্ট। থ্যাঙ্কস ফর কামিং। ওহ ইউ আর সো লাইক হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার।

ইয়ে, মানে, আচ্ছা ঠিক আছে। চলেন ভাই তাড়াতাড়ি, বেইজ্জতি প্রশ্ন করে ফেলেছি। এই বামে দিয়ে বের হন। সামনের গাড়িটার লাইসেন্স প্লেটে লেখা আছে, ইন গড উই ট্রাস্ট। আমেরিকা তো না, যেন জেরুজালেমে আছি। ২০০৪ এর ইলেকশনের পর একটা কার্টুন দেখেছিলাম। সেটায় নিউ ইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়াকে ক্যানাডার সাথে যোগ করে লেখা, ইউনাইটেড স্টেটস অফ ক্যানাডা। বাদবাকি স্টেটগুলোকে লাল রং করে বড় করে লেখা, জেরুজাল্যান্ড।


এই গানটার ভলিউম একটু বাড়িয়ে দে তো রে। এটার বেজ অসাধারণ।

বাজনা ভাল, কিন্তু কানে লাগে খুব। আমি এককালে বেজ সহ্য করতে পারতাম না। কেমন যেন লাগতো। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে ধরে-বেঁধে আমাকে সেট দ্য কন্ট্রোলস ফর দ্য হার্ট অফ দ্য সান শুনানো হয়েছিল। ওটা শুনে বুঝেছিলাম বেজ কী জিনিস।


শোন, বেজ হল মা-বাপের মত। না থাকলে বুঝা যায় কী জিনিস।

দামী কথা রে, বহুত দামী কথা। যাক, কালকে রাতটা কোন রকমে পার করা গেল তবু। আবার ক্ষুধা লেগে গেছে। এই বেলায়ও কি ফাস্ট ফুড খাবেন, নাকি ভাল কোথাও বসবেন?


ভাল কোথাও বসি। একটু লিকার খেতে পারলে ভাল হত। ঐ যে সামনে একটা রেস্তোরাঁ আছে। জোস বার অ্যান্ড গ্রিল। চল ওখানেই যাই।

আমি কোক নিবো। জীবনে তো অ্যালকোহল ছুঁইনি এখনও। অবশ্য, জীবনের অনেক কিছুই তো ঠিক মত যায়নি। যা হয় হবে, নিয়েই ফেলি একটা। নিয়ম কী খাওয়ার? আমি তো জানি না তেমন কিছু একটা।


মদ খেলে সব সময় নিচের থেকে উপরে উঠবা। আগে বিয়ার, পরে ককটেল বা ওয়াইন। উলটা করতে নাই। তাহলে মাথা ধরবে। একটা লং আইল্যান্ড আইসড টি নিতে পারো। আমার বেশ ভাল লাগে ওটা। বেশি জোরে টেনো না শুরুতেই। একটু চেখে দেখো কেমন লাগে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

Saturday, May 03, 2008

এক একটা দিন...

১.
আজ সত্যজিতের জন্মদিন

ব্যস্ততা কমেনি তিল পরিমাণ তবু শুধু এটুকু লেখার জন্য ব্লগে পোস্টানো হাজার টুকরায় ছড়িয়ে থাকা জীবনের এক একটা দিন কেটে যাচ্ছে এমনি এমনি হোমওয়ার্ক, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রোজেক্ট, আর পরীক্ষার ভারে চিড়ে-চ্যাপ্টা অবস্থা সিমেস্টারের জঘন্যতম সময়টা কাটছে শেষ কবে রান্না হয়েছে ঘরে, খেয়াল নেই নুডুলস, চিপস, আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের উপর চলছে দুনিয়া ঘুমের অপর নাম বিলাসিতা, চায়ের অপর নাম জীবন বেশ অনেক দিন হয় পাখির ডাক না শুনে ঘুমানো হয়না কিছু পাখি ঠিক ৬ টা নাগাদ ডাকে এরপর কিছুক্ষণের বিরতি আধা ঘন্টা মত পরে পরের দফা ডাকাডাকি শুরু হয় মাঝের সময়টা আমি গুনগুনাই আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে, শাখে শাখে পাখি ডাকে, কত শোভা চারিপাশে এরপর দ্বিতীয় দফার ডাকাডাকি শুনতে শুনতে ঢুলে পড়ি ঘুমে

বাসের জন্য বসে ছিলাম রাত জেগে গুল-তাপ্পি মেরে প্রোজেক্ট রিপোর্ট দাঁড় করিয়েছি কোন রকমে পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভাবছিলাম, আমার হাত দিয়ে বের হওয়া কাজগুলো অযত্ন নয়তো অসম্পূর্ণতায় ভোগে যা-কিছুই করি না কেন, সব খানেই এই এক সমস্যা একবার দেখলে দ্বিতীয়বার দেখতে ইচ্ছে করে না একবার পড়ে সারতেই ঘাম ছুটে যায়, দ্বিতীয়বার পড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না এমন সময় বাজ পড়ার মত করেই মনে পড়ে গেল, আজ সত্যজিতের জন্মদিন! আহা রে, যদি সত্যজিতের মত লিখতে পারতাম

২.
১৯৯২ সালটা খুব মনে পড়ে ইমরান খানের বছর ওয়াসিম আকরামের বছর ইমরানের অবসরের পর শচীনাসক্ত হবার বছর তবু ১৯৯২-কে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সত্যজিতের মারা যাবার বছর হিসেবে রাতের খাবার খাচ্ছিলাম ১০টার ইংরেজি সংবাদে সত্যজিৎ মারা যাবার খবর দেখলাম মাত্রই কিছুদিন আগে টিনটোরেত্তোর যীশু কিনেছিলাম চুরি যাওয়া চিত্রকলা খুঁজের বের করবে-করবে করছে ফেলুদা পড়তে পড়তেই খাচ্ছিলাম সেই বইটা হাতে নিয়েই পুরো রাত কেঁদেছিলাম ২৩ এপ্রিল, ১৯৯২

মায়ের খুব শখ ছিল ছবি আঁকা শেখাবে কালে নানার মত ডাক্তার বানানোর ইচ্ছা ছবি আঁকার হাত থাকলে পরে হয়তো বায়োলজিতে সাপ-ব্যাঙ আঁকতে কষ্ট কম হবে, এই ছিল চিন্তা আমি শুধু এক কোণায় বসে নদী, বাড়ি, কলা গাছ, আর দিগন্তে ডুবে যাওয়া সূর্য আঁকতাম আমার গুণের নমুনা দেখেই হয়তো দুই দুইটা আর্ট স্কুল ব্যবসা গুটিয়ে উঠে গেছিলো ভূতের গলি মসজিদের সামনের ডাস্টবিনের সামনে দিয়ে প্যাঁক-কাদা পাড়িয়ে আর্ট স্কুলে যেতে হত না এই বিষম আনন্দের পাশেই ছিল সাদা কাগজ পেলেই সত্যজিতের মত করে স্কেচ করার চেষ্টা চোখা একটা থুতনি, একটু বাম দিকে স্পষ্ট সিঁথি, পরিপাটি চুল, আর পোর্ট্রেইট ফুটিয়ে ওঠানোর জন্য অদ্ভুত সুন্দর ছায়ার কাজ আন্তরিক চেষ্টা ছিল, পারলাম না

৩.
সত্যজিতের প্রথম বই নানা কিনে দিয়েছিল অ্যাডিনয়েড গ্লেন্ডে অপারেশনের আমি তখন হাসপাতালে গড়াচ্ছি নানা এসে বললো, তার ছাত্রের দোকান থেকে একটা চাচা চৌধুরী আর একটা সত্যজিৎ এনেছে আমার জন্য পাঠক সমাবেশের সাথে সেই থেকেই পরিচয় সেই দিনগুলোর নস্টালজিয়া থেকেই অনেক দিন পর নানাকে ফোন করলাম চিরাচরিত সূচনা নানা, আমি অভি শরীর কেমন? নানার জবাব, শরীর বাদামি, পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি হেসে গড়াগড়ি দিলাম, লিভারপুল-চেলসি নিয়ে কথা বললাম সত্যজিতের কথা কেন যেন মুখে আসলো না একেবারে অচেনা-অজানা একটা মানুষ এত প্রভাব রাখতে পারে, ভাবতে অবাক লাগছিল নিজেরই

সোনার কেল্লা অনেক পরে হাতে পেয়েছি আমার শুরু ছিল মনে হয় কৈলাসে কেলেঙ্কারি দিয়ে এরপর কখনো রয়েল বেঙ্গল রহস্য পড়ে ভয়ে কেঁপেছি, কখনো প্রফেসর শঙ্কুর মত কাল্পনিক অ্যানাইহিলেটর গান দেগেছি ডানে-বামে, কখনো তাড়িণীখুড়োর গল্পের মত ডুয়েল লড়েছি লখনৌয়ে আহ, সেই সব দিনগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এভাবে কলমের খোঁচায় স্বপ্ন দেখানোর মত স্রষ্টা আর ক’জন আসবে কে জানে

৪.
পাইলট, পুলিশ অফিসার, আইসক্রিম-ওয়ালা থেকে ফায়ার-ফাইটার হয়ে রোমান্টিক স্বপ্নগুলো এসে চলচ্চিত্রকার হওয়ায় এসে ঠেকেছে বেশি বয়সে এসে এই ভূত মাথায় ঢুকবার কারণ শুধু এবং শুধুই সত্যজিৎ বহুদিন পর এই সেদিন আবার বৃষ্টিতে ভিজলাম জানালার পাশে বসে কাজ করছিলাম আলোর ঝলকানি, বিকট শব্দে বাজ পড়ার আওয়াজ, আর বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টিপাত মুহূর্তেই দৌঁড়ে রাস্তায় নেমে গেলাম গাছের নাচ, বাতাসের ডাক, আর আকাশের হাঁক শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, ইন্টারস্টেটটার জায়গায় যদি একটা ধোঁয়া উড়িয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেন থাকতো!
ব্যাগ-বই-ছাতা-জামা দিয়ে সবাই মাথা ঢাকছে, আর আমি স্রোতের বিপরীতে হেঁটে যাচ্ছি খালি পায়ে, টুটা-ফাটা টি-শার্ট পড়ে

ঘরে ফিরে ভেজা শরীরেই বসে পড়লাম কম্পিউটারের সামনে খুঁজে-পেতে বের করলাম অপুর সংসার নিত্যদিন চোখে ভাসা দৃশ্য দুটো বের করে দেখলাম সদ্যবিবাহিত অপু রাতে বৌয়ের আঁচল জামায় বেঁধে রেখেছে, ওদিকে চোখ খুলে অপু দেখে সিগারেটের প্যাকেটে লেখা, প্রতিদিন একটা করে, কথা দিয়েছো চামড়ার আতিশয্য এড়িয়ে অনুভূতির গভীরতার কী দুর্দান্ত প্রকাশ অন্য দৃশ্যটি ছেলের সাথে অপুর পুনর্মিলনের বড় বড় চোখ করে নিগৃহীত পুত্রের নিষ্পাপ প্রশ্ন, বাবা কাকে বলে?

এক একটা দিন এভাবেই মনে পড়ে সত্যজিৎকে আজ সেই সত্যজিতের জন্মদিন

(মে ০২, ২০০৮)

Tuesday, March 11, 2008

নীড়ে ফেরাঃ গর্ভধারিণী পর্ব

প্রতীক্ষার প্রহর অনেক দিনের চাইলেই আবেগগুলোর বল্গা ছেড়ে দেওয়া যেত মুখোমুখি হতেই তবু দেওয়ালগুলো দাঁড়িয়ে গেল কীভাবে যেন কথাটা আমার মাকে বলা ভুললো না দূরত্বের ছলে আমিও চিরচেনা বড় ছেলের মত করেই আলাদা হয়ে গেলাম, চোখ সরিয়ে নিলাম, গাড়ির বুট থেকে মালপত্র নামাতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম এভাবেই শুরু চার দিনের এক ঝটিকা সফরের গর্ভধারিণী পর্ব দুষ্টুমিভরা বাঁকা হাসি মুখে নিয়ে বললাম, পঞ্চাশ হওয়ার আগেই আশি হয়ে গেলে দেখছি মাথাটা আলতো করে ঝাঁকিয়ে, একটু পেছনে হেলিয়ে, মুচকি হেসে এসে জড়িয়ে ধরলো, মাথায় হাত বুলালো

লুইজিয়ানা ছেড়েছি ঠিক সাত মাস আগে স্প্রিং-ব্রেকে অনেকটা ধুম করেই বেড়াতে চলে আসা মা অসুস্থ, মাঝে কিছু সময় হাসপাতালে ছিল ছোট ভাইটা ক্লাস আর কাজের ভাঁজে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থার মাঝেও যেটুকু পেরেছে করেছে পুরুজিত তো বন্ধুর মাকে নিজের মায়ের মত করে আগলে রাখছে অনেক দিন ধরেই একই দেশে আমি দূরে বসে কোন বেলায় মুড়ি-চানাচুর খাই, তো কোন বেলায় বসে বসে স্পেলবাইন্ডার দেখি চোখের আড়াল হতে পারলে জীবন কী সহজ, অনাবিল পড়তে ভাল লাগুক চাই না লাগুক, হোমওয়ার্ক শেষ হোক বা না-হোক, লেখাপড়াকে দায়িত্ব এড়ানোর উছিলা হিসেবে কী সহজে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় পড়শি বাঙালিরা কেউ খাবার দিয়ে গেছেন, কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন, কেউ দিনে কয়েক দফা করে খোঁজ নিয়ে গেছেন

এক বেডরুমের ছোট্ট বাসাটায় ঢুকতেই স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরলো যেন নাতিদীর্ঘ প্রবাসজীবনে একবার দেশে গিয়েছিলাম নস্টালজিয়া তেমন একটা কাবু করেনি শুধু কেমন যেন একটা অন্য রকম লাগা ছিল এবার লুইজিয়ানা ফিরে বুঝলাম, নীড় মানে নিজের দেশ, ঘর, আলো, বা বাতাস না মা যেখানে, নীড় সেখানেই; সর্বংসহা গর্ভধারিণীর স্মিত হাসি যেখানে, সেখানেই জীবন গুড়ি গুড়ি তেলাপোকাগুলো দেখে কত্ত দিনের চেনা মনে হচ্ছিল ফেলে যাওয়া শেভিং ক্রিমের কৌটায় তেলাপোকার ডিম, রংচটা কার্পেটে মশলার গন্ধ, পানির কলের বিকট আওয়াজ মনে হচ্ছিল যেন এই গতকালই এখানে ছিলাম আমি

হার্ভার্ড ব্র্যান্ডের আফটার শেভ’টা চোখে পড়ে গেলো দেশ ছাড়ার আগে বাবার দেওয়া ছেলে গায়ে-গতরে বেড়ে ওঠার প্রথম স্বীকৃতি ছিল সেটা সংসারের দায়িত্বের পালাবদল হতে হতে আজকের অবস্থা অনেক ভিন্ন আমার এককালের জাঁদরেল বাবা আজকে ফোন করে বলে মাকে দেখে রাখতে, মায়ের সাথে ঝগড়া করে দুই তরফ থেকেই ফোন করে অনুযোগ করে এমনতর কথা ভাবতে ভাবতে বসে পড়লাম ৩৫ ডলারে কেনা রিক্লাইনারটায় মাত্র একটা বছর আগে এখানেই একা বসে কাটিয়েছি জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময়টুকু পুরো দিন ঘুরে আমার প্রতীক্ষিতার জন্য বিয়ের আংটি কিনে এনে এই রিক্লাইনারে বসেই ফোন করে অঞ্জনের সুরে বলেছিলাম, আর মাত্র কয়েকটা মাস, ব্যাস্‌ এইতো সামনেই মা জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে বসেছিল এখানে বসেই জবাবে শুনেছিলাম, তোমাকে বলা হয়নি, আমি আমার এক ক্লাসমেটের সাথে আছি এখন, বিদায় সেই মুহূর্তটার আগ পর্যন্ত জানতাম আমাকে দিয়ে কোনদিন অভিনয় সম্ভব না হায় রে জীবন সেই দিনটায় সামান্য এক কৌটা ঝাঁঝালো সুগন্ধী পেয়েই কী খুশি হয়ে গিয়েছিলাম

আমার মাকে নিয়ে আমি কখনো লিখি না শুধুমাত্র কোথায় শুরু করবো জানি না দেখেই নানা পিএইচডি করার সময়টায় আমার মাকে গ্রামে থাকতে হয়েছে পাঁচ বছর লেখাপড়ার সেই ছেদ উত্তরণ করে অনার্স সেরেও মাস্টার্স করতে পারেনি আমি পেটে চলে আসায় মা-বাবা-ভাই বছর তিনেক আগে ডিভি পেয়ে আমেরিকা চলে এসেছে মা সেই থেকে আমাদের দুই ভাইয়ের পড়ার খরচ যোগাচ্ছে হাড়কেপ্পন এক চাইনিজ রেস্তোরাঁয় অহর্নিশ কাজ করে বকলে শুনে না, বারণ করলে মানে না বাসা ভাড়া, প্লেনের টিকেট, হরেক রকম বিল, ভার্সিটির টিউশন, ইত্যাদির সবকিছু আমরা দেই আমার মায়ের মাংস বেঁচে

বাবা দেশে আটকে আছে সরকারী চাকরি আর পেনশনের দুশ্চিন্তা নিয়ে মায়ের শরীরের ভাঙনটা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল শুকিয়ে আধখানা হয়ে যাওয়া আমার মাকে দেখে মনে পড়ছিল প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা হিসপ্যানিক ম্যানেজার এক বেলায় ষোল থেকে কুড়ি বালতি বরফ টানাতো, আমি কাউন্টারের ওপাশে বসে দেখতাম ইংরেজি বলতে সংকোচের সুযোগ নিয়ে দাসের মত খাটাতো আমার মাও নিঃশব্দে শ্রম দিয়ে যেতো, স্বামী-সন্তানের স্বাচ্ছন্দ্যের স্বপ্ন নিয়ে রিৎজ্‌ কোম্পানির বিস্কুট ওয়ালমার্টগামী মাত্রই চেনেন স্যাম্‌স ক্লাব থেকে রিৎজের প্যাকেট নিয়ে আসতাম মা আমার সকাল-সন্ধ্যা কামলা খাটতো সেই বিস্কুট খেয়ে ভিড়ের দোহাই দিয়ে ম্যানেজার লাঞ্চ ব্রেক দিতো না, দোকানের খাবার খেলেও টাকা নিতো, মেপে মেপে ড্রিংক দিতো পকেটে লুকানো বিস্কুটগুলোই ছিল ভরসা আমরা দুই ভাই প্রেম আর বন্ধু নিয়ে মেতে থেকে জগৎ উদ্ধার করতাম লন্ড্রি থেকে কাপড় এনে রাগ হতাম মায়ের উপর, পকেট থেকে বিস্কুট বের করতে ভুলে গেছে দেখে ছোট ছোট প্যাকেটে ছোট্ট, গোল বিস্কুটগুলো আমার সেই মা’টা কেমন ছোট্ট, শুকনো আজকে

বহুদিন পর সামনে পেয়ে আলাপচারিতাগুলোও যেন কেমন হয়ে গেল

- না, বাবা তেমন কষ্ট হয় নাই এমনিই মাথা ঘুরাচ্ছিল খুব তোমার লোপা আন্টি এসে বললো, এভাবে বসে থাকার মানে নেই ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেল ওরা দেখে হাই-প্রেশার, ফ্লু ব্রেইনে স্ক্যান করে দেখলো সাইনাস ইন্‌ফেকশন ভর্তি করে রেখে দিলো কাজে যেতে পারলাম না সেদিন আর সাথে অ্যান্টিবায়োটিক এরপর কী একটা ওষুধ দিলো, শুধু ঘুমালাম কয়দিন

- হুম, ভাল হয়েছে দরকার ছিল বিশ্রামটা আমাদের কথা তো শুনবা না, এভাবেই ঘুম দরকার ছিল তোমার তো চিরকাল লো-প্রেশার ছিল, হঠাৎ উল্টাযাত্রা কেনো?

- আমি কী জানি! আমিও তো শুনে অবাক চোখের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে সামনে আমার একটা চোখ নাকি সরে যাচ্ছে, অপারেশন করতে হবে ঠিক রাখতে দৃষ্টিশক্তি তেমন একটা ভাল হবে না আর থাক, কী দরকার এখন এসব করে টাকা নষ্ট করার?

- দেখা যাক আর কয়টা দিন সময় দাও, দেখি কী করা যায় আহা, মানা করলাম তো এটা নিয়ে কথা বলতে হাতের এই অবস্থা কীভাবে হল? রক্ত নিতে গিয়ে হাত এভাবে মোরব্বা বানানোর মানে কী? ধমকও দিতে পারলা না একটা মুখচোরাই থেকে গেলা আজীবন নিজের কথা মুখ ফুঁটে বলার সাহস কবে হবে তোমার?

- নতুন একটা নার্স, বলে ভেইন খুঁজে পায় না অযথা ওদের উপর রাগ কোর না ওরা অনেক যত্ন নিয়েছে আমার বিনাপয়সায় এরচেয়ে ভাল চিকিৎসা আশা করা ঠিক না

- কী করতে যে আমেরিকা আসলাম পেলাম তো না-ই কিছু, বরং হারালাম সবকিছু দেশের জীবন কত গোছানো ছিল কোন ভূতের কামড়ে যে আমি আমেরিকা আসলাম আমি না আসলে তুমিও সুরসুর করে এসে পড়তা না যৎসামান্য যা-কিছু ছিল, তাও গেলো

- এভাবে ভাবতে নাই আর সবার মত ভাবতে পারো না? ঐ এক দুঃখ বুকে নিয়ে নিজের জীবনটা নষ্ট করে দিবা এভাবে?

- আমি কিন্তু কোন পুরানো কথা তুলি নাই, মা আমি ভালই আছি

- আমার কাছে লুকানোর চেষ্টা করছো? একটা মেয়ের জন্য এভাবে সব ছেড়ে দিচ্ছো? দেখিয়ে দেওয়ার জেদ কাজ করে না বুকের মধ্যে? মনে হয় না, কোন একদিন যেন ভুল বুঝতে পারে?

- আমি তো প্রতিশোধ-তাড়িত মানুষ না! আমাকে দিয়ে এরকম চিন্তা আসে না আমার কষ্টটা শুধু আমি একা বুঝি আমার মত করে ছেড়ে দাও, প্লিজ আমি আমার জগৎটা একটু একটু করে আবার তৈরি করছি

- মাত্র দু-তিন বছর ধরে চেনা একটা মেয়ের জন্য এত কিছু ছেড়ে দিচ্ছো, একবার এই মা’র কথা মনে পড়ে না? আমি যে পঁচিশ বছর ধরে তোমাকে একটু একটু করে বড় করলাম, সেটার কী হবে? আমি যে সেই চার বছর বয়স থেকে সাথে সাথে ঘুরে তোমাকে লেখাপড়া করালাম, তার কী হবে? তোমার উপর ঐ মেয়ের দাবি আছে, আমার দাবি নেই?

সেই সে রিক্লাইনারে বসে জীবনের দ্বিতীয় ঝাঁকিটা খেলাম আমার মা আমার সামনে দাঁড়িয়ে তার পাওনাটুকু দাবি করছে, করতে হচ্ছে আর কীই বা করবে? ভাল রেজাল্ট চাইতো, পেতো অথচ কুসন্তান এই আমি তো কোনদিন মা-বাবাকে খুশি করার মানসে লেখাপড়া করিনি, করেছি ছেলেভুলানো এক সুন্দরীকে ঘরে তোলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে এভাবে কেটে গেল প্রথম রাত

পরদিন ব্লাড টেস্ট করাতে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে অপেক্ষা করতে করতে এক কাল্লুমামার কায়কারবার দেখছিলাম গাম চিবাচ্ছে, গাম বিলাচ্ছে, সবার কুশল জানতে চাচ্ছে, সবার সাথে হাত মেলাচ্ছে নাহ, আমেরিকার সাউথ আসলেই আলাদা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলাম, বললো ভয় পায় না আর যাবার পথে মা বলছিলো গাড়ি চালানোর কথা

- আজকে আমি চালাই, তুমি দেখো তো আমার চালানোটা কেমন এখন আমি মাঝেমধ্যে একটু-আধটু শিখেছি

- নাহ, হাতটা ঠিকমত ঘুরানো শিখবা না তুমি কোনদিন এ কী, খালি পায়ে চালাচ্ছো কেন? পায়ে গরম লাগবে তো

- আমার এভাবেই সুবিধা আমাকে আমার মত একটু চালাতে দিয়েই দেখো না আহারে, আজমীরের ঐ গাড়িটা আর নাই, না? খুব মনে পড়ে ওটার কথা ওটায় করে আমাকে নিউ ইয়র্ক থেকে নিয়ে গিয়েছিল তোমাদের ওখানে

- আর বোল না ঐ পাগলের কথা আমারো খুব মন পড়ে ঐ গাড়িটার জন্য

- আচ্ছা, এবার যে তুমি আমাকে তেমন বকা-ঝকা করছো না?

- দেই নাই, তবে দিতে কতক্ষণ? রাস্তার দিকে চোখ রাখো আরেকটু জোরে চালাতে পারো, স্পিড লিমিট ৩৫ এখানে ওহ, আজকে বিকেলে তোমাকে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে যাবো কিন্তু

- জানো, সেদিন তোমার মঞ্জু আঙ্কেল একটা কথা বলছিল মানুষ তো মিড্‌ল-ইস্ট থেকে কত কত দিনার পাঠায়, তবু সবাই আমেরিকা আসতে চায় দামী জিনিসপত্র সব দেশ থেকেই যায়, তবু লোকে আমেরিকা আসতে চায় সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে, ঘুরে বেড়ানোর গল্প শুনে ছবি দেখে দেশের লোক শুধু সমুদ্রের পাড়টাই জানবে, ভিতরের কষ্টগুলোকে জানবে না এর জন্য আমরাই দায়ী

চলছিলো এভাবেই আমাদের সেই টয়োটা ক্যামরি – আমার দ্বিতীয় বৌ, আমার আদরের আদমজী জুট মিল মা বলছিলো কুকুরের ডাক শুনে ভয় পেয়ে গাড়িটার রিয়ারভিউ মিররে ব্যাথা পাবার কথা আমি আফসোস করছিলাম কাল্লুদের হাতে হেনস্তা হবার দিনে গাড়িটা না থাকা নিয়ে হাঁটার সময় মা আর পিছিয়ে পড়ছিল না, হয়তো আমি তার তালে হাঁটার কারণেই একসাথে বাজার সারলাম শেষ বেলাটা কেটে গেল ঘরোয়া আলাপ করে

- ঘরে শানের শিক কাবাব মশলা আছে? না থাকলে নিয়ে রাখো কিছু গরুর মাংসে দিয়ো, কষানোর সময় অন্যরকম মজা

- বাসায় স্যামন ম্যারিনেট করে রেখেছি তোমাদের জন্য শরীর ভাল না দেখে তেমন কিছু করতে পারলাম না এবার, বাবা তোমার ছোট খালুর কাছ থেকে শিখেছি টেলিফোনে লেমন-পেপার আর মধু দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখা আছে ঘরে গিয়ে বেক করবো

- না করে ভাল করেছো আমি তো এবার এসেছি তোমাকে খাওয়াতে এত এত লোক আমার রাঁধা বিরিয়ানি খেয়ে যায়, অথচ তুমিই বাদ থেকে গেলে শর্টকাট শিখেছি একটা তন্দুরী মশলা দিয়ে মুরগি ওভেনে বসিয়ে দিবা, আর রাইস কুকারে সিন্ধি মশলা দিয়ে বিরিয়ানি ৪৫ মিনিটে মামলা খতম গন্ধ বা নোংরার বালাই নেই

কোনদিন কি ভেবেছি এরকম ‘মেয়েলি’ আলাপ করবো আমি মায়ের সাথে? সাথে সাথেই মনে হল, অনুভূতিশূন্য হওয়ার মধ্যে আদতে কোন পৌরুষ নেই পেছনের দিকে তাকালে আফসোস হয় আড়ালে থাকার দিনগুলো মনে করে খেতে বসে মনে হচ্ছিল, কতদিন পর তিনজন একসাথে, কতদিন আব্বুসহ চারজন একসাথে খাই না মা চোখে পানি এনে বললো যেন দারুর দুনিয়া থেকে দূরে থাকি না, চেখে দেখার জন্যও না ১% অ্যালকোহল থাকলেও না অন্য সময় হলে আলাদা কথা ছিল, এখন তোমার মনে অনেক কষ্ট, এখন এটা নেশা হয়ে যাবে কী আশ্চর্য যুক্তিবাদী হয়ে গেছে আমার আবেগপ্রবণ মা, কত বড় হয়ে গেছে আমার ছোট ভাইটা

নীড়ে ফেরা বোধহয় একেই বলে

(প্রায় শেষ)

নীড়ে ফেরাঃ দ্বিচল সম্মেলন পর্ব

অ্যালাবামার অবার্নে যাবার সৌভাগ্য হলে একবার কদম ফেলে যাবেন সহ-সচল দ্রোহীর বাসায়। যেকোন দিন, যেকোন সময় দ্রোহীর দরজায় টাক্‌-টাক্‌ করে বলবেন, চাটনি আছে তো? কথাটা ঠাট্টা ভেবে উড়িয়ে দিলে নিজেই ঠকবেন।

স্প্রিং ব্রেকে লুইজিয়ানা যাবার পরিকল্পনা হাতে নিয়েই আমাদের সবার মাথায় হাত। যাত্রাপথ একেক দিকে এক হাজার মাইল করে। গুগুলের হিসেবে প্রায় ১৬ ঘন্টার মামলা। গাড়ি নাহয় ভাড়া করা গেল, কিন্তু এতগুলো গরুকে একরাত আশ্রয় দেবার মত গোয়াল কোথায় পাই? শুরু হয়ে গেল বিভিন্ন নেটওয়ার্কে পাত্তা লাগানো। সচলায়তনের সদস্যদের প্রোফাইল ঘেঁটে বের হল, দ্রোহীর বাস অবার্নে। আদর্শ বিশ্রামস্থল। ঠিক সাড়ে আট ঘন্টার দূরত্ব। ওদিকে আরেক বড় আপুও মিলে গেল। দ্রোহী তবু আধা-চেনা, দ্রোহীনি ভাবি তো একেবারেই অচেনা। প্রথম রাতে তাই তাঁদের জ্বালাতন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ঘুম-জড়ানো চোখে আপু আমাদের জন্য দরজা খুলে দিলেন ভোর সাড়ে চারটার দিকে। মধ্যাহ্নভোজের জন্য দ্রোহীর দরজায় হাজির হলাম পরদিন বেলা দেড়টার দিকে।

অধম ছিলাম চালকের আসনে। একে একে যে-ই নামছিলো, সবাইকে বলে দিচ্ছিলাম নিজেকে ইশতিয়াক বলে পরিচয় দিতে। কাজ হল না। সুজন চৌধুরীর অসামান্য স্কেচের বদৌলতে দ্রোহী আমার কুলার মত কানগুলোর ব্যাপারে বিশেষ ওয়াকিবহাল। কান দেখে চিনে ফেললেন। দ্রোহীর প্রতি আমার প্রথম কথা, আপনি তো অতটা ওবামার মত না। সশব্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রোহী ইঙ্গিত করলেন দেওয়ালে ঝুলানো বিয়ের ছবির দিকে। বলতে বলতেই ভাবি হাজির। ভাবির প্রতি আমার প্রথম কথা, আপনিই দ্রোহীর সেই বউ!

আবজাবের বদৌলতে দ্রোহীর খান্ডারনি বৌয়ের গল্প সবাই জানেন। আসা-যাওয়ার পথে ভাবির সাথে দুই রাতে বেশ ক’ঘন্টা তুমুল আড্ডার পর বুঝলাম, দ্রোহী আসলে তোপসে নন, জটায়ু! সদাসহাস্য, প্রাণময়, পঁচানিস্ট ভাবির সাথে প্রথম কিছুক্ষণ কথা কম হচ্ছিল। দ্রোহীর সাথেই চলছিল আলাপ-সালাপ। বলছিলেন, তিনি খুবই সংগ্রামী মানুষ। জীবন গেছে ইধার-উধার ইতি-উতি করেই। অধমের সাথে মিলে গেল অনেক কিছুই। জেনে খুবই অবাক হলাম যে সেই বছর দু-তিন আগে বাতায়ন নিয়ে আমার আর হিমু ভাইয়ের নিরীক্ষার সময়েই তিনি অধমকে চিনেছেন। বাংলা ব্লগিং নিয়ে কথা হচ্ছিল। বাংলায় লিখতে পারার আনন্দ নিয়ে কথা হচ্ছিল। হিমু নামক এক হাঁটুপানির জলদস্যুর দুর্ধর্ষ ব্লগিঙের তোড়ে লিখতে বসলেই বিচিত্র সব অনুভূতির কথা হচ্ছিল। সাথে ছিল আবহাওয়া, রাজনীতি, স্কুল-কলেজের জীবন, দেশ, আর গাড়ি। একেবারেই নৈমিত্তিক পুরুষালি বাতচিত। ভাবির সম্মানে শুধু নারীপ্রসঙ্গ বাদ ছিল।

ঝড়ের পূর্বাভাষ ছিল, কিন্তু তাই বলে শিলাবৃষ্টি হবে ভাবিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হল খাদ্যবর্ষন। ভদ্রতা করে ভাবিকে বলেছিলাম যে আমরা চুলা থেকেই নিয়ে নিতে পারবো। ভাবি কপট হাসি দিয়ে বললেন, ছেলেমানুষের খাবলাখাবলিতে খাবার পড়ে ওনার ঘর নোংরা হবে, সেই ভয়েই টেবিলে দেওয়া। আত্মা কেঁপে উঠলো। জানতে চাইলেন কেউ বিশ্রামাগারে ঢুঁ মারতে চাই কিনা। পেট বেঁধে, কাষ্ঠ হেসে না বললাম। এবার হালকার উপর ঝাপসা ঝাড়ির ছলেই বললেন, গেলে ওনার সামনে দিয়েই যেতে এবং আসতে হবে, অতএব লজ্জার কিছু নেই। এবার আত্মা নীরবে চিৎকার দিয়ে উঠলো।

ভাবি এরপর শুরু করলেন গরমাগরম খাবারের ঢাকনা ওঠানো। মুরগি খেয়ে অভ্যস্ত, তাই মুরগি আছে। মুরগি খেয়ে বিরক্ত, তাই মাছ আছে। কাবাব আছে। সবজি আছে। সালাদ আছে। রাইস কুকারের আশীর্বাদে পেটে ভাতের চর পড়ে গেছে, তাই খিচুড়ি আছে। সাথে আছে চাটনি। এত কিছু দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ভাবি নিশ্চয় রান্নাবান্না খুব এনজয় করেন। মুহূর্তে খসে পড়লো সব পর্দা। হাসির বন্যায় ভেসে গিয়ে ভাবি বললেন, আই লাভ কুকিং! পরক্ষণেই আবার রাগত চেহারা করে হুকুম দিলেন, সব শেষ করে যেতে হবে, তাঁকে যেন বাসি খাবার খেতে বাধ্য করা না হয়। মমতায় নাকি খাবারের স্বাদ বাড়ে। টের পেলাম। অনেকটা পথ বাকি, তাই খেয়েই উঠে পড়তে হল। তিনজন চালক ছিলাম আমরা। পাল্লা দিয়ে ভাবিকে শাপ-শাপান্ত করেছি তিনজনেই বাকিটা পথ। খাবারের আরামে চোখ বুঁজে আসছিল ঘুমে। পাছে মুখ থেকে স্বাদ চলে যায়, এই ভয়ে প্রথম অনেকক্ষণ কেউ কফিও ছুঁয়ে দেখিনি।

ফিরতি পথেও যথারীতি অনেক রাত হয়ে গেল। পরদিন তাঁর মিডটার্ম পরীক্ষা, সহপাঠীদের সাথে রাতভোর ফাইট দেবার কথা, তবু দ্রোহীর কড়া হুকুম, রাতে তাঁর বাড়িতেই খেতে হবে। আগের দফায় ভাবি বলছিলেন, চাটনিটা ডালের সাথে খেলে মজা লাগতো। পাশ থেকে ওয়াসেফ ফরমায়েশ করে ফেলেছিল পরের বার ডাল রাঁধতে। এবারেও খাবারের বন্যা, তবে একেবারেই নতুন সব আইটেম। মাছ, ভর্তা, বড়ইয়ের আচার, চাটনি, ডাল, সবজি, আরো অনেক কিছু। জেনেবুঝেই ইলাস্টিকের কোমড়বিশিষ্ট প্যান্ট পড়ে এসেছিলাম এইবার। এবারে বলে দিতে হয়নি যে ভাবির রান্নায় লবণ কম, ঝাল বেশি। আমরা যে পশুরই উত্তরপ্রজন্ম, তার নিদর্শন রেখে রীতিমত যুদ্ধ করে খেলাম সবাই। হাত ধুতে গিয়ে দেখি গোলাপির রাজত্বে চলে এসেছি। বেরিয়ে এসে ভাবিকে বললাম, সচলায়তনে আপনার কথা লিখলে গোলাপি ভাবি নামে লিখবো। ভাবি হেসে বললেন, তাঁর প্রিয় রঙ অন্য, গোলাপি কোন কিছুই তাঁর কেনা না। মুরুব্বি তখন হামলে পড়লেন প্রতি বিন্দু গোলাপি রঙ কীভাবে সম্প্রদানের হাইওয়ে ধরে এথায় পৌঁছেছে তা ব্যাখ্যা করতে। আমিও ব্যাপক মনোযোগের সাথে ঠাকুর ঘরের কলার বয়ান শুনে গেলাম।

এরপর শুরু হল আড্ডা, এবং দ্রোহীর গোলাপি থেকে কমলা হয়ে লাল হওয়া। যাবার সময় তাড়াহুড়ার কারণে অনেকটা আচমকাই আড্ডা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। সেবার আজমীরকে দেখে দ্রোহী বলছিলেন, চেনা চেনা লাগে। ভাবিকে দেখে আজমীর বলছিলো, চেনা চেনা লাগে। কিয়ৎকাল পর কথাবার্তা ঘুরে গিয়েছিল এক কোণায় পড়ে থাকা কিছু ডাম্বেল, দক্ষিণের উষ্ণ আবহাওয়া, অসামান্য সুন্দরী মেয়েদের ছড়াছড়ি, আর কে বা কারা দেখতে চামচিকার পাছার মত হওয়ায়। এক ফাঁকে দ্রোহী ভাবিকে টিটকারি মেরে বলে বসলেন, সাত-সকালে তিনি রেয়াজ করার সময় নাকি পাশের বাড়ির বাঙ্গালি পড়শি দেওয়াল পিটিয়ে বলেন, বৌকে আর মারিস না! সেবার ভাবি শুধু ধরিয়ে দিয়েছিলেন যে সব রকম প্রাণির পশ্চাৎদেশের প্রতি দ্রোহীর বিশেষ মনোযোগ আছে। ওস্তাদের মার যদি শেষ রাতে হয়ে থাকে, তাহলে ওস্তাদের বৌয়ের মার ফজর ওয়াক্তে।

অভিব্যক্তিতে অসামান্য পারদর্শী গোলাপি/চাটনি ভাবি একের পর এক বলে চলছিলেন আমাদের প্রিয় দ্রোহীর যাপিত জীবনের বিবিধ কৌতূহল-উদ্দীপক ঘটনা। চুম্বক অংশে ছিল বিয়ের পর নতুন মানুষকে কাছ থেকে চেনার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা। দ্রোহী বলছিলেন, ছেলেবেলা থেকে একা ঘুমিয়ে অভ্যাস। রাতে কারো গায়ে হাত লাগলেই নাকি সজোরে হাত চালিয়ে দিতেন। কোন এক কালে ঘুমের মধ্যে এক বড় বোনের গলা টিপে ধরেছিলেন! জানা গেল, রান্নাবান্নার হাতা/নাড়ানি যথাযথ ভাবে ব্যবহার করলে এহেন দুরন্ত পতিকেও শুধরে দেওয়া যায়। সমস্যা হল, হাত চালানো বন্ধ করা গেলেও আলাপচারিতা বন্ধ করা যায়নি অদ্যাবধি। এমনই এক গল্প দিয়ে শেষ করছি দ্বিচল সম্মেলন পর্ব।

ভাবি বলছিলেন ঘুমের মাঝে দ্রোহীর কথা শুনে প্রথমবার জেগে যাবার কথা। নিশিরাত। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। ডাকাডাকি শেষে ঝিঁঝিঁ থেকে কুকুর পর্যন্ত সবাই ক্লান্ত। এমন সময় নীরবতা খান্‌খান্‌ করে দ্রোহী বলে উঠলেন, বিলাইয়া দিয়ো! ধরফরিয়ে উঠে ভাবি জানতে চাইলে কী বিলাতে হবে। অচেতন দ্রোহীর সচেতন জবাব, ঐ যে ঝুলতেসে, যেটা পছন্দ, রেখে বিলায় দিয়ো! বোঝা গেল, বিয়ের উপহারের স্বপ্ন কথা বলছে। কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে ভাবি আবার শুলেন। এবার ঘুমন্ত দ্রোহীর সহাস্য চিৎকার, অনেক গুলা বৌ, হাঁটাহাঁটি করতেসে! বেচারি ভাবি আবারো উঠলেন, তবে এবার কৌশলে জানতে চাইলেন, তোমার বৌ কোনটা? লজ্জায় লাল হয়ে দ্রোহী বললেন, এই যে এইটা! অচেতন এই প্রেমের কাহানি শুনে আনন্দিত ও মুগ্ধ হয়েছিলাম সবাই।

নাহ, আরো দুয়েকটা বলে যাই। আরেক রাতে নাকি দ্রোহী ঘুমের ঘোরে বলছিলেন, আমি লাইব্রেরিতে! উপরে উঠি! কাগজ কাটি! আরেক রাতে বলে বসলেন, সিচুয়েশন বুঝতে হবে তো! অনেক অনেক ডাটা! বাকি গল্পগুলো নাহয় দ্রোহী ও তাঁর আবজাব সিরিজের জন্যই রেখে দেই।

ভাবি একের পর এক গল্প বলে যাবার সময় দ্রোহী শুধু মাথা নেড়ে বলছিলেন, ইজ্জত মেরে দিলো। হয়তো তা-ই। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে গিয়েছিল অসামান্য প্রাণচঞ্চল ও অতিথিবৎসল দ্রোহী দম্পতির ছোট ছোট খুনসুটিগুলো। একজন বলেন আমার মত পাবা না, তো আরেক জন বলেন তোমার চেয়ে ভাল পাবো খুঁজলে। পঁচানোর প্রতিযোগিতার ফাঁকে ফাঁকেই চোখে পড়ে যাচ্ছিল অসামান্য মমতার চিহ্নগুলো। একদিন বেলা সাড়ে বারোটায় ফোন না আসলেই ভাবির অস্থির হয়ে পথে নামা, সুপার-গ্লু দিয়ে ভাবির দুই ঠোঁট লেগে যাবার ভয়ে দ্রোহীর টেনশনে অজ্ঞান হবার দশা, এমন অনেক খুচরো মুক্তায় ভরা ছিল আড্ডাটা।

ভাবির অনবরত হাসি দেখেই বুঝেছি দ্রোহী তাঁকে আনন্দে রেখেছেন। অন্যদিকে সুখী মানুষের নিদর্শন স্বরূপ দ্রোহী নাকি ঘুমের ঘোরে ইদানিং কথা ছেড়ে গান ধরেছেন। সমস্যা একটাই, গানের কথা শুধু বিটিভি-র মত একই ফ্রিকোয়েন্সির একটা পুউউ আওয়াজ।

(চলবে)

প্রবাসের কথোপকথন ১৩

“একুশে নিয়ে কী করতে চাও বলো, সময় হলে সাহায্য করবো।”
নাটক করা যায় একটা? আমরা সবাই মিলে চেষ্টা-চরিত্র করলে কিছু একটা দাঁড় করানো যায়। এই, তোর না কী আইডিয়া আছে বলছিলি।

“তেমন কিছু না। এবিসিডি কালচার, দেশকে ভুলে যাওয়া, এগুলা নিয়ে কিছু করার চিন্তা ছিল। সময় নেই হাতে একদম, এটাই ঝামেলা। রিসার্চের কাজ নিয়ে দৌঁড়ের উপর আছি একদম।”
তুই শুধু আইডিয়াটুকু বল। সেটাকে রিফাইন করে নাটক বানানোর দায়িত্ব আমরা ভাগ করে নেবো।

“নাটক করতে চাও তোমরা? সেটার জন্য তো অনেক প্রস্তুতি দরকার। মুনীর চৌধুরীর কবর করতে পারো। আমার কাছে তো কোন কিছু তৈরি নেই। তোমরা কবর যোগাড় করতে পারলে সেটা করতে পারতে ছেলেরা মিলে।”
খুঁজে দেখেছি, কিন্তু ইন্টারনেটে পেলাম না। দেশ থেকে আনাতে পারি, তবে সময় লাগবে অনেক। এমনই সাহিত্যজ্ঞান আমার, অন্য কোন নাটকও চিনি না যেটা একুশের সাথে যায়।

“সব ভাবী, বৌদিদের বল একটা করে গান গাইতে। ছেলেদের মধ্যে কেউ কবিতা, বা একুশে নিয়ে কিছু বলতে পারে কিনা দেখো। সময় কম, এটা মাথায় রেখো শুধু।”
সমস্যা অন্য জায়গায়। এবার একুশে পড়েছে বৃহস্পতিবারে। কাউকে পাওয়া যাবে না ঐ দিনে। মিডটার্মও চলছে এখনি। ধুর, একুশে যদি মার্চের ৩ তারিখে হত, তাহলে ঝামেলা হত না কোন। স্প্রিং ব্রেকে সময় নিয়ে কিছু করা যেত। আগে কী করা হত এখানে? লুইজিয়ানা থাকতে একুশেতে কিছু করা হত না, তবে স্বাধীনতা দিবস আর পহেলা বৈশাখ মিলিয়ে একটা অনুষ্ঠান করা হত বেশ জাঁকজমক করে।

“আমরা একুশে ফেব্রুয়ারিটা ঠিক মত করি। এছাড়া এপ্রিলের দিকে স্ট্রিট ফেয়ারে দেশী খাবার বিক্রি করে ফান্ড জমাই। এই টাকা দিয়েই দেশের আমরা পরে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। একুশের দিনে আমরা স্টুডেন্ট সেন্টারের শো-কেইসে একটা শহীদ মিনার সাজাই। ওখানে বাংলা লেখা থাকে, আর একুশের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা থাকে।”
হ্যাঁ, দেখেছিলাম। এবারেও শো-কেস ভাড়া করা হয়েছে এক সপ্তাহের জন্য। ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন আছে একটা। কতটুকু লেখা হয় সাধারণত? মানে, পাকিস্তানিরা কিছু বলে না?

“মিথ্যা তো না, লিখতে কী? করার সময় খেয়াল ছিল না? আর, এটা তো এখন সারা দুনিয়ায় স্বীকৃত ইতিহাস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।”
তাও কথা। যাক, দেখে নিবো নে আগের বছরের লেখাগুলো। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সপ্তাহের মাঝখানে এভাবে কিছু একটা আয়োজন করা সম্ভব না। করলে পরের উইকএন্ডে করতে হবে। এত লোকের জমায়েত হলে একটু পরেই খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটা হুলস্থূল শুরু হয়ে যাবে। বুঝতে পারছি না কী করবো।

“কোন ধরনের খাওয়া-দাওয়ার কিছু করার দরকার নাই। অকারণে একটা হৈ-চৈ হবে। হালকা খাবার রাখবা। বিরিয়ানি রান্না করে তো একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা যায় না। হালকা চিপ্‌স রাখতে পারো কিছু। সাথে চা। সব তুলে রাখবা অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত। কাউকে ধরতে দেওয়া যাবে না।”
এখানেই তো সমস্যা। অনুষ্ঠান হোক আর না হোক, মুডটা হালকা করে দেওয়ার মত অনেক কিছুই আছে। খাবার থাকলে দেখা যাবে ছাত্রদের মধ্যেই কেউ ওগুলা বের করে ফেললো, অথবা বাচ্চার বাপ-মা এসে বলবে তাদের ছেলে-মেয়েকে কিছু দিতে। মশাল পার্টি চলে যাবে একটু পর পর বিড়ি ফুকতে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের পাশেই টেনিস কোর্ট। লাভের মধ্যে দেখা যাবে একুশেতে নীরবতা পালন করে সবাই মিলে ক্রিকেট খেলছি।

“না, এসব কিছু করতে দিও না। অনুষ্ঠান শেষ হলে যে যার বাড়ি চলে যাবে, কোন লাফালাফি নাই।”
আচ্ছা, আরেকটা সমস্যা। একুশেতে চিপ্‌স দিবো? কেমন হয়ে যায় না? কুড়মুড়ে খাবার যায় না মনে হয় ভাষা দিবসের সাথে।

“ঠিকই। তাহলে নুডুল্‌স দিতে পারো।”
এইটাও তো কেমন কেমন হয়ে যায়। যাক, তবু এটা আপাতত থাকুক। তবে আর যা-ই হোক না কেন, পটলাক্‌ করা হবে না। রান্না ভাগ-বাটোয়ারার ব্যাপার নাই কোন এখানে। সোডার বদলে অন্য কিছু দেওয়া যায়?

“মনে হয় না। সোডাই থাকুক। খাবারের ব্যবস্থা না থাকলে সময়ের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি করতে হবে। বলে দিতে হবে যে ঠিক বিকেল ৫ টায় আসবো এবং সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে চলে যাবো। এর বেশি দেরি হলেই লোকে খাবার আশা করবে। সবাই একত্র হয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করবো। যারা গান জানেন, তারা দুইটা করে গান গাইলেই হয়ে যায়।”
যোগাযোগ করে দেখলাম এর মধ্যেই। অনেকেই ব্যস্ত। একেকজনের একেক রকম ঝক্কি। কাউকে জোরও করতে পারছি না। তবু বলে রেখেছি। কোন জায়গাও রিজার্ভ করতে পারছি না। বাসায় করলেই খাবার দেওয়ার ভদ্রতা করতে হবে।

“দেখো কী করতে পারো এই ব্যাপারে। যারা গান গাইবে, তাদের কিন্তু অনুষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্য মাথায় রেখে গান তুলতে বল। কেউ আধুনিক গান ধরে বসলে সমস্যা।”
অবশ্যই। ফাস্ট বিটের দেশাত্মবোধক হলেও সমস্যা। কেউ একুশেতে ও মাঝি নাও ছাইড়া দে ধরে বসলে কেলেংকারি হয়ে যাবে।

“আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে ভাল মত করা যেতো। একটা নাটক যোগাড় করতে পারলে হত। ডিসেম্বরের আগে বললে দেশ থেকে কেউ নিয়ে আসতে পারতো।”
গতস্য শোচনা নাস্তি। আপাতত এই দফা ড্যামেজ কন্ট্রোল করে নেই। আমারো ইচ্ছা ছিল রেডিও নাটক জাতীয় কিছু করার। স্ক্রিনিঙ্গের ঝামেলা থাকতো না, সহজে শেখানোও যেতো সবাইকে।

“আমার এক বন্ধু খুব ভাল গান গায়। সাংস্কৃতিক ব্যাপারে খুবই নাম। তবে মহা চাল্লু ছেলে। এসেছিলো জে-১ ভিসায়। কীভাবে যেন কায়দা করে থেকে গেছে।”
এটা কীভাবে সম্ভব? এক্সচেঞ্জ ভিসায় আসলে তো দুই বছর পর দেশে ফেরা বাধ্যতামূলক।

“উহু, ভুল জানিস তুই। একটা ফাঁক আছে। উনি মনে হয় ঐটাই কাজে লাগিয়েছেন। যেই লাইনে পড়াশুনা করেছেন, সেই লাইনে যদি নিজের দেশে কাজ না থাকে, তাহলে আমেরিকায় থেকে যাওয়া যায়।”
উনি না বললেন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছেন? চালু মাল আসলেই।

“এখন তাকে হান্ড্রেড এইটি পে করে বছরে।”
বলেন কী? তার মানে মাসে কত করে পড়ে? নব্বই দুগুণে একশো আশি, পাঁচ আঠেরোং নব্বই, ছয় পনেরোং নব্বই, পনেরো হাজার কর মাসে!

“আজকে ক্যারিয়ার ফেয়ারে এই পোলা হাভাইত্যার মত জিনিস টোকাইসে পুরা।”
কী করবো? চাকরি তো দিবে না কেউ আমাকে। জিপিএর যা করুণ দশা, এই সিমেস্টার শেষ না হলে কিছু আশা করতে পারছি না। আপাতত সামার ধরে থিসিস লিখে ডিসেম্বরে মাস্টার্স করার চিন্তায় আছি। এরাও আমাকে চাকরি দিবে না, আমিও এদের কাছে চাকরি চাইছি না। চারটা ব্যাগ আর গোটা দশেক তাসের প্যাকেট এনেছি।

“এই বেকুব, ভিতরে না দেখেই এতগুলা প্যাকেট আনলি কেন? তাসের মধ্যে কোন ফোটা-ফাটি নাই। টুয়েন্টি-নাইন খেলতেও ব্রিজের মত কাগজ-কলম নেওয়া লাগবে। স্কোরিং করার কিছু নাই।”
শিট!

Friday, February 15, 2008

মৌনচিত্র ৫

ময়ূরকণ্ঠী রাতেরও নীলে, আকাশে তারাদের ঐ মিছিলে, তুমি আমি আজ চল চলে যাই, শুধু দুজনে মিলে...

অনেক, অনেক দিন পর! কার গাওয়া যেন? শাকিলার গলায় শুনেছিলাম কখনো? নাহ, ভাবী মনে হয় না পরপর দুইটা শাকিলা গাবেন। পুরুষ কণ্ঠে শুনেছিলাম। সতীনাথ না। হেমন্ত না। দেবব্রত? মানবেন্দ্র! হ্যাঁ, মানবেন্দ্র। সবার গলায় সব ধরনের গান মানায় না। ভাবীর গলায় আধুনিক গান কী অসাধারণ মানায়! ভিডিও হচ্ছে তো ঠিক মত? নাহ, এভাবে হবে না। আবার কখনো গাইয়ে নিতে হবে গানটা। ধ্যাৎ, কেউ একটু আরাম করে গানটা শুনতেও দিবে না।

হয়তো পাবো না পথেরও ঠিকানা, তবু যাবো আজ ছাড়িয়ে সীমানা, সাথী যদি হও পাশে থেকে মোর, করি না ভয় নিখিলে...

না, পারবো না ভাল করে বলতে। এই গানটা শুনতে দাও ঠিক মত। অনেক দিন পর শুনছি। মন কেন খারাপ হয়ে যায় সেটা কি তোমার জানতে বাকি আছে? এক সময় খুব প্রিয় ছিল গানটা। দেশ ছেড়ে আসার পর হারিয়ে ফেলেছিলাম। প্যারোডি করলে অন্য ঘরে গিয়ে কর, প্লিজ। সব জায়গায় অযথা চ-বর্গ আর প-বর্গের ছড়াছড়ি ভাল লাগে না। চুপ করে শোনো, ভাল লাগবে।

আকাশ যদি ঢাকে ঘনঘটায়, তারারা মেঘে মেঘে হারিয়ে যায়...

সবাই গলা মেলাচ্ছে। গুনগুন করবো? করি, কী আছে কপালে! গলা ছেড়ে গান গাইলে নাকি হতাশা কেটে যায়, দেখি আজকে চেষ্টা করে। আরে নাহ, প্রেমে পড়ি নাই। গানটা এমনিতেই খুব প্রিয়। তবে আপনার গলায় কিন্তু একটা গান রেকর্ড করাবো আমি, বৌদি। উহু, কোন মাফ নাই। ইউটিউবে দেওয়া হবে না, প্রমিস। আজি এসেছি বধূ হে গেয়ে দেবেন আমাকে। ডি. এল. রায়ের মনে হয়। ঐ যে, তিতলি ভাইয়ার জন্মদিনের গান। দেশে একবার ই-টিভিতে শুনেছিলাম গানটা। গান-কবিতা কিছুই খুঁজে পেলাম না। এই ঘরানায় আমার দৌঁড় তো জানেনই।

যা আছে থাক না,করি না ভাবনা, আঁধারে-কুয়াশায় হারিয়ে যাবো না, মনেরো আলোয় চিনে নেবো পথ, তুমি ভরসা দিলে...

আশ্চর্য মানুষ। গত দুই দিন টানা কাজ করলেন সর্দি-জ্বর নিয়েও। তবু একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছেন। কাচ্চি বিরিয়ানি করেছেন পঞ্চাশ জনের জন্য। সাথে বোরহানি, মিষ্টি, কেক। ক্লান্তি নেই কোন। উহু, আমার কাছে থাকো, মামা। মা গান করছে তো। হ্যাঁ, স্পাইডারম্যান দিবো তোমাকে। যায় না রে মামা। এই, চিৎকার করলে দিবো একটা ধাই! হ্যাঁ, হ্যাপি বার্থ ডে গাওয়া হবে তোমার জন্য। আম্মুর গান শুনে নেই একটু? দেখো তোমার জন্য মা কত্ত গান করছে। সবাই কত খুশি। আসো, মামার সাথে তুমিও গাও।

তুমি আমি আজ চল চলে যাই, শুধু দুজনে মিলে...

Friday, February 08, 2008

ওয়ান লাইন ওয়ান্ডার

আমি ব্যক্তিগত ভাবে বারাক ওবামার একান্ত অনুসারী, সেটা মনে হয় জানতে বাকি নেই কারো। সুপার টিউস ডে'তে সাগ্রহে বসে ছিলাম ওবামার দৌড় দেখতে। কিছু প্রশ্ন বাকি ছিল ওবামাকে নিয়ে --

* আইওয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নেভাডা, সাউথ ক্যারোলিনায় সুযোগ ছিল ভোটারদের সাথে মুখোমুখি হয়ে প্রচার চালানোর। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেয় ক্লিনটনদের "নেম রেকগনিশন" এবং "পলিটিক্যাল মেশিন"এর কথা। ওবামার যাদুর পরশ পেতে হলে তাঁর সাথে একই ঘরে থাকতে হয়, সেই ঘরের উপচে পড়া প্রাণের বন্যায় ভাসতে হয়। প্রথম দিকের কিছু প্রাইমারি/ককাস ছাড়া এই সুযোগ সীমিত। দেশব্যাপী ২২ টির বেশি অঙ্গরাজ্যে একসাথে নির্বাচন হওয়ায় ওবামার প্রচারণা ও ব্যাপকভিত্তিক গ্রহনযোগ্যতার প্রথম পরীক্ষা ছিল। কী হবে এর ফলাফল?

* আইওয়ার বিজয় কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ৯৮% শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় ওবামার বিজয় তাঁর "ভ্যালিডিট"র অকাট্য প্রমাণ ছিল। ঝামেলা হল, সাউথ ক্যারোলিনায় ওবামা মাত্র ৩০% মত শ্বেতাঙ্গ পুরুষের ভোট পেয়েছিলেন। বিল ক্লিনটনের বিদ্বেষী ইঙ্গিতের পর কি সাদাদের চোখে ওবামা শুধুই একজন কালো হিসেবে প্রতীয়মান হওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন?

* ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির ভোটারদের ৫৭% নারী। নারী ভোটাররা খুবই বাধ্য ও অনুগত হিলারি-সমর্থক। একই সত্য প্রযোজ্য হিসপ্যানিক ভোটারদের ক্ষেত্রেও। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ও মিজৌরার মত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ওবামা ২০% পিছিয়ে ছিলেন। একই রকম দূরত্ব প্রায় ঘুচিয়ে ওবামা নিউ হ্যাম্পশায়ারে হিলারির সাথে কঠিন লড়াই করেছিলেন। এত কম সময়ে কি ক্যালিফোর্নিয়ার মন ও মত ঘুরানো সম্ভব?

এবারের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির খোঁজ রাখেন, এমন কেউই সুপার টিউস ডে'র পর কোন একক বিজয়ী দেখার আশা করার কথা নয়। আমিও করিনি। নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি হিলারির ঘরে গেছে। ক্যালিফোর্নিয়াও তাই। তবে "ট্রাইস্টেট ট্রাইফ্যাক্টা" জিততে পারেননি হিলারি। ওবামা অনেককেই অবাক করে কানেটিকাট জিতে নেওয়ায় ইস্ট কোস্টে কিছু জনপ্রিয়তার আভাষ মিলেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় হারের পিছনে একটা বড় কারণ ছিল অ্যাবসেন্টি ব্যালট। প্রায় ৩ মিলিয়ন ভোট ডাকযোগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৩ সপ্তাহ আগে। সেই সময় ওবামাকে সাউথ ক্যারোলিনায় ব্যস্ত রাখছেন বিল ক্লিনটন, আর হিলারি পুরো সপ্তাহ জুড়ে প্রচারকার্য চালাচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। প্রতি চার ভোটে তিনটিই তখন হিলারির। তবুও দেখার মত ছিল ভোটের আগের রাতে ২০% এর ব্যবধানটি কর্পূরের মত উড়ে যাওয়া।

হিলারি আর ওবামার মাঝে বিভক্ত ডেমোক্রেটরা এখন পথ খুঁজছে কোন ভাবে দুই জনকে "রানিং মেট" করে দিয়ে সম্ভাব্য তিক্ততা এড়াতে। প্রশ্ন হল, হিলারি ও ওবামা একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারলেও বিল ক্লিনটনকে সহ্য করতে পারবেন তো? একটি পলিটিক্যাল কার্টুনে দেখছিলাম হিলারি বলছেন, "আমার মনে হয় না ওয়াটারবোর্ডিং নির্যাতনের কাতারে পড়ে... যাক, বিল'কে নিয়ে অনেক কথা হল, এবার অন্য কিছু বলুন।"

প্রাইমারি ইলেকশনের ভোটের ভিত্তিতে এই মুহূর্তে দুই প্রার্থীই প্রায় সমান সংখ্যক নির্বাচিত "ডেলিগেট" পেয়েছেন। পার্টির এলিটগোষ্ঠী তথা "সুপার ডেলিগেট"দের মাঝে ৮০ ভোট মত এগিয়ে আছেন হিলারি, যদিও প্রায় অর্ধেক সুপার ডেলিগেট এখনো নিজেদের পছন্দের কথা প্রকাশ্যে জানাননি। সামনের দিনগুলোর দিকে তাকালে আমিও আর সবার মত কিছুটা অনিশ্চিত। জয় যার দিকেই যাক না কেন, আমি ওবামার কিছু ব্যাপার মুগ্ধ নয়নে দেখছি --

* "হার্টল্যান্ড আমেরিকা"য় ডেমোক্রেটরা প্রায় কখনই সুবিধা করতে পারেনি। নির্বাচনের পর আমেরিকার মানচিত্র মানেই দুই প্রান্তে দুই মহাসাগরের পাড় ছুয়ে কিছু নীল অঙ্গরাজ্য, আর মাঝে বিশাল এক লালের সমুদ্র। ওবামা এই প্রথা ভাঙার চেষ্টাটুকু হলেও করেছেন। ইভ্যাঞ্জেলিক্যাল খ্রীষ্টানদের মত গোড়াদের সাথেও গিয়ে কথা বলেছেন। গীর্জায় গিয়ে বলেছেন দেশের স্বার্থে কিছু ব্যাপারে হলেও ঐকমত্যের কথা। আইডাহোর মত কট্টর রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যে ওবামা রেকর্ড পরিমাণ দর্শক সমাগম ঘটিয়েছেন। উপস্থিত দর্শকদের প্রায় সমান সংখ্যক ভোটার পরদিন তাঁকে ভোট দেয়। সুপার টিউস ডে'তে সাকুল্যে ওবামা জিতেছেনও বেশি অঙ্গরাজ্য। সিএনএন'এর হিসাব অনুযায়ী দুই প্রার্থীর মোট ব্যবধান ০.৪%!

* লাতিনো ভোটে এখনো পিছিয়ে থাকলেও সাদাদের মাঝে ৪৪% ভোট পাওয়া, কালোদের মাঝে হিলারিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া ৮০% ভোট, নারী ভোটারদের মাঝে সমানে সমান থাকা, ৪০ বছরের কম বয়সী সকল ভোটারের কাছে প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠা।

* যথারীতি আরো একটি লোম খাড়া করা ভাষণ। এমএসএনবিসি থেকে এমবেড করা এই ভিডিও শুনে দেখতে পারেন। যদি পুরোটা শুনবার ধৈর্য না থাকে, তাহলে অন্তত ১৪ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত শুনুন। সেটুকুও সম্ভব না হলে শুধু এই বাক্যটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আওড়ান -- "উই আর দ্য ওয়ানস্‌ উই হ্যাভ বিন ওয়েইটিং ফর!" আমরা আমাদেরই অপেক্ষায় ছিলাম এতকাল! চিরকাল অনুরণিত হবার মত একটি কথা।



সামনে লুইজিয়ানা, ওয়াশিংটন, আর নেবরাস্কায় ইলেকশন। এরপর আসছে ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ড, আর ডিসি। বলা হচ্ছে ভাল কিছু সপ্তাহ যাওয়ার কথা ওবামার। তবে তার পরেই আসছে ফাইনাল পরীক্ষা -- টেক্সাস, ওহায়ো, আর পেনসিল্ভ্যানিয়া।

Friday, February 01, 2008

প্রবাসের কথোপকথন ১২

“মেয়ের জ্বর কমে নাই এখনো? ডাক্তার দেখান। ভাবীকে দুইটা দিন ছুটি নিতে বলেন। নতুন কাজ নিলে ছুটি পেতে সমস্যা হবেই এরকম। কী আর করবেন ছুটি না পেলে, আল্লাহ আল্লাহ করেন, ঠিক মত ওষুধ দেন, দেখে রাখেন।”

“ডঃ ইউনুস সাক্ষাৎকার দিসে, দেখসেন নাকি? কয় বিজ্ঞাপন দিয়েও নাকি গরীব পাওয়া যাবে না বাংলাদেশে। হায়রে গ্রামীন ব্যাংক। ৮০ বছরের বুড়িরেও রেহাই দেয় না টিনের চালের জন্য, আবার বড় বড় কথা।”

“এই কয়দিন ধরে ব্যবসায় এত মন্দা অবস্থা যে বলার না। জমার টাকাই তুলতে পারি না। মন খারাপ করে কালকে গাড়ি বেরই করি নাই। ঘর থেকে টাকা নিয়ে জমার টাকা পুরাতে হয়, এমন বাজে অবস্থা। অর্থনীতি একদম গেছে। আগে কী রমরমা ছিল!”

“আজকের ঠিকানা দেখেছেন? তারেক রহমানকে নাকি রিমান্ডে টর্চার করা হয়েছে। এই কাজটা কেন করতে গেল? এত্ত সাহস বেড়ে গেছে সরকারের? যত যাই হোক, শহীদ জিয়ার ছেলে। তাকে এই ভাবে চোখ বেঁধে অত্যাচার করার কী মানে আছে? এইটার আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া দরকার।”

“আর তারেক যে পাঁচ বছর ধরে এত লুটপাট করলো, সেটার কী হবে? তখন আইন কই ছিল? কথা বের হয় নাই কেন তখন আপনাদের মুখ দিয়ে? আরে আমার মামা বুক চাপড়ায় বলসিলো, আমারে ঠিক মত বিয়াটা করতে দে। তারেক লোকজন সহ তারে বিয়ার আসর থেকে তুইলা নিয়া গিয়া পিটাইসে। আজকে স্রেফ চোখ বানসে আর এত কান্নাকাটি লাগায় দিসেন! মহিউদ্দীন খান আলমগীরকে যে চোখ বেন্ধে পিটাইসে, যাতে কে মারসে দেখতে না পারে? আদালতে বলসিলো যে তার পায়খানার রাস্তা দিয়ে গরম ডিম ঢুকায় দিসে, যাতে কাউকে দেখাতে না পারে।”

“রাবেয়া আপা, আমার মামাতো ভাই এইটা। বড় মামার ছেলে। ওরে দুইটা পিঠা দেন। এই নাও ভাইয়া, তোমাদের ভার্জিনিয়ায় তো ভাপা পিঠা পাও না। এই, তোর ছেলেকে এই পিঠাটা দে।”

“পিঠার ইংরেজি জানি না, বাবা। সাদাটাই মজা তো। এটায় নারিকেল আছে। থাক, ভাল না লাগলে গুড়টা খাও শুধু। বার্গার আরেকদিন খাবো। হ্যাঁ হ্যাঁ, মা বাসায় গেলে বিরিয়ানি রান্না করে দিবে তোমাকে।”

“আরে তারেকের হাড্ডি ভাঙে ভাঙুক, আপনি নিজে সৎ হন। আপনি কখনো চুরি করেন নাই? এত বছর ধরে নিউ ইয়র্ক আছেন, কোন অন্যায় করেন নাই? দেশে যে এনজিও খুলতে মাসে মাসে টাকা পাঠান, ঐটা এমনি এমনি হয়ে যাচ্ছে?”

“না, কোন অন্যায় করি নাই। আমাকে বলসে এনজিও খুলতে ৫০ লাখ টাকা লাগবে। ৩০ লাখ মত জোগাড় করে পাঠায় দিসি। আরেক কিস্তি সামনে পাঠাবো। এই টাকা এখানেই জোগাড় করা। এর মধ্যে চুরি নাই কোন।”

“একটা ফর্ম জমা দিতে হয় প্রথমে, মনে পড়ে? জ্বী, ঐ যে ১০ জনের সিগনেচার সহ একটা কাগজ জমা দিতে হয়। ঐটায় কার কার নাম ছিল? ঐ ১০ জনের কেউ কি আদৌ অংশীদার? সাজানো নাম ছিল না সব? জ্বী, এই খানেই চুরিটা করছেন। আমার এক চাচা একই কাজ করসে। আমাকে বলতে আইসেন না যে এনজিও খুলসেন কিন্তু চুরি করেন নাই। নিজে সৎ হন, তাহলেই সব ঠিক। অযথা তারেকের জন্য কেঁদে লাভ নাই।”

“চেনা চেনা লাগে, তবু অচেনা, ভালবাসো যদি, কাছে এসো না...”

“আহারে কী সুন্দর সব সিনেমা ছিল। জোনাকি সিনেমা হলে প্রতি সপ্তাহে যেতাম সিনেমা দেখতে। এখন কী সব নাখাস্তা সিনেমা বানায়।”

“আচ্ছা, আমি একটা কথা বুঝি না। মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে ধরে না কেন? এই চোর দেখি সেদিন টিভিতে সাক্ষাৎকার দেয়। আমার তো রাগে গা জ্বালা করছে এখনো।”

“আরে এরা বেছে বেছে নিজের মত লোক ধরছে। নাইলে মান্নান ভূঁইয়া কীভাবে বাইরে থাকে এখনো? সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হয়েও ব্যাটা এখন আরামে ঘুরে বেড়ায়। ঐদিকে আওয়ামী লীগে আমুর মত চোরকে ধরার নাম নাই। সবই এক। নিজেরটা ছাড়া কেউ কিছু বুঝে না।”

“মেয়র মহিউদ্দীন প্রতি বছর ২৫ জন হাজ্বীকে হজ্জ্ব করার পয়সা দেয়। একবার গরমের জন্য ২৪ টা এসি কিনে দিসে নিজের টাকায়। একে জেলে ভরসে, কিন্তু সাদেক হোসেন খোকা বাইরে।”

“আরে মহিউদ্দীনকে ধরসে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর খোলা রাখতে। তবে ধরুক। সব কয়টাকে ধরুন। এগুলার একটাও নির্দোষ না। বাইন্ধা পিসা দিয়া বাইরানোর কাম এগুলারে।”

“হবে, বাবা। তুমিও একদিন স্টুডেন্ট অফ দ্য মান্থ হবে। মাথাটা খারাপ করে ফেললো, বুঝলা? সবাই স্টুডেন্ট অফ দ্য মান্থ হয়, আমি কেন হই না? এত বলি যে তুমি মাত্র এসেছো, ইংরেজি বুঝতে সমস্যা হবে তোমার। পড়াশুনার দিকে আগ্রহটা আছে। ইচ্ছা আছে ভাল একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর, কিন্তু নিউ ইয়র্কে থেকে টাকা জমানো সম্ভব না। সাইথে যাবো গিয়ে ভাবি প্রায়ই। আমরা দুই জন মিলে কাজ করলে এর অর্ধেক টাকায়ও ভাল চলে যাবে।”

“আরে মঈন ইউ তো নোয়াখালির লোক। বরকতুল্লাহ বুলুর আত্মীয়। ওর দৌড় জানা আছে। কিছুই করবে না বিএনপির লোকজনের।”

“আরে আরও আছে। জেনারেল মতিন তো ৭১’এর সেই চার আল বদরের একটার আত্মীয়। যেইটা শহীদুল্লাহ কায়সারের বাসায় এসে তাকে চিনিয়ে দিলো। পান্না কায়সার নাকি টান দিয়ে মুখের উপর থেকে মাফলার খুলে চেহারা দেখে ফেলেছিলো। বিবিসি থেকে ডকুমেন্টারি করার সময় সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলো, দরজা খুলে নাই। খুব নাকি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটির।”

“খোকাকে কেন ধরে না জানেনে? খোকা এক সময় ব্যারিস্টার মইনুলের উকিল ছিল। এদের অনেক আগে থেকেই কানেকশন। মইন তো জামাতের সমাবেশেও যাওয়া-আসা করতো।”

“এই লোকটা অতিরিক্ত কথা বলে, বুঝলেন? এর একলার জন্য সরকারের ভাবমূর্তির ১২টা বাজলো পুরা। হাসিনার পিছনে যেভাবে উঠে-পড়ে লাগলো। অথচ কয়দিন আগেই নিজের ছেলের জন্য নমিনেশন চাইতে হাসিনার কাছে ঘুরে আসলো। হাসিনা দেয় নাই দেখে শোধ তুলছে এখন।”

“আরে আর্মিও তো মানুষ। দেশে এখন শুনি ঘুষের রেট বেড়ে গেছে, তবু ঘুষ আছেই। রিস্ক বেশি, তাই রেট বেশি। আসল লোকগুলোকে তো ধরে না। এরা আছে দুই দিন পরপর মাইনাস-টু নিয়ে লাফালাফিতে। হাসিনাকে আজম চৌধুরীর মত একটা বাটপারের মামলা দিয়ে আটকায় রাখলো। এত কিছু থাকতে নাজমুল হুদাকে গ্রেফতার করলো ঘরে মদ-বিয়ার রাখার জন্য। তামাশা নাকি রে ভাই এগুলা?”

“এদের আসলে সমাজ থেকেই বর্জন করা উচিত। মিডিয়াও তো এদের নিয়েই লাফায়। আদালতে নেওয়ার সময় শ’খানেক ক্যামেরাম্যান সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, আর এরা ভিক্টরি সাইন দেখায়। আরে ব্যাটা জেলে যাওয়ার সময় এসব কী? সেই দিন আর নাই যে জেলে গেলে বড় নেতা হয়ে বের হবে। বাঙালি এত গাধা না। মিডিয়ার উচিত এদের কোন ছবিই না দেখানো। পত্রিকাগুলার উচিত শুধু হাতে-পায়ে বেড়ি পড়ানো ছবি ছাপানো।”

“ম্যারিয়ন জোন্সের স্বর্নপদক কেড়ে নিসে দেখসেন? মজা দেখেন, যে সেকেন্ড প্লেসে ছিল, তাকেও দিবে না। আজব কথাবার্তা।”

“সেইদিন একটা নাটক দেখলাম নতুন। ফোর-টুয়েন্টি। হেব্বি জোস। দুই ঠগ গ্রাম থেকে শহরে এসে বড়লোক হয়ে যায়, সেই কাহিনী। ১০ পর্ব দেখলাম। আজকে রাতে আবার আছে।”

“হ্যাঁ, এইটাই বাকি ছিল। বাংলাদেশের যেই অর্ধেক মানুষ ফোর-টুয়েন্টি ছিল না, এখন সেগুলাও বাটপার হবে এই নাটক দেখে।”

“ঐ যে দেখেন, ভাগলো আমার চেহারা দেখেই। আমার আগের রুমমেটের কাছ থেকে ব্যবসার নাম করে ২২ হাজার ডলার হাতায় নিয়ে ভাগসে শালা। অল্প অল্প টাকা নিয়ে ফেরত দিয়ে দিতো তাড়াতাড়ি করে। এই ভাবে বিশ্বস্ততা দেখায় একবার পুরা ২২ হাজার ডলার নিয়ে ভেগে গেছে।”

“দেখেন, দেখেন। দুদক থেকে বলে, দুর্নীতি না হলে নাকি বছরে ১২ হাজার প্রাইমারি স্কুল বানানো যেতো। শালা বাঞ্চোতের দল, দেখা দেখি এক বছরে কয়টা স্কুল বানালি! উলটা ঢাকা ইউনিভার্সিটির স্যারেগো নিয়া রিমান্ডের ভরসোস।”