Tuesday, June 03, 2008

প্রবাসের কথোপকথন - ১৪

এই রাস্তাই তো? দেখো তো আবার, ম্যাপের সাথে কিন্তু মিলে না। ম্যাপে যেখানে বললো, সেখানে কিছুই নাই।

এই রাস্তাই নিয়ে যাবে। আগের বার ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে এই রাস্তা দিয়েই এসেছিলাম। আসার পথে বুঝি নাই, তবে যাওয়ার সময় তো একটা রাস্তা একদম সোজা এসে ইন্টারস্টেটে মিশেছিল পারডু ক্যাম্পাস থেকে। গুগুলের দেখানো রাস্তাটা যেন কেমন বদখদ ছিল।


ঐ তো, এক্সিট দেখা যায়। লেখা আছে পারডু ইউনিভার্সিটির রাস্তা।

এটাই হবে। নিয়ে নেন। আমি এই রাস্তা দিয়ে ফিরি নাই অবশ্য। ইলিনয় থেকে এসেছিলাম। অন্য রাস্তা ছিল সেটা। খুবই বীভৎস অভিজ্ঞতা অবশ্য। ওয়াবাশ নদীর পরে বামে যেতে হত। আমি বেকুবের মত আগের রাস্তা নিয়ে ফেলেছিলাম। কোথায় যে গিয়ে হাজির হলাম এরপর! ফিরতি রাস্তা খুঁজে না পেয়ে ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম গুগুল ম্যাপ দেখে উদ্ধার করতে। ওকে পাশের রাস্তার নাম বললাম, বলে যে গুগুলে নাকি ঐ জায়গার কোন ইনফরমেশন নাই। চারদিকে তো শুধু ভূট্টা ক্ষেত। এর মধ্যে আমি সত্তর মাইল বেগে টানলাম গাড়ি। মিনিট দশেক চলার পর একটা রাস্তার নাম পাওয়া গেল গুগুলে। সেই থেকে আমি চেনা রাস্তার বাইরে চালাই না আমেরিকান মিডওয়েস্টে।


এই কথা আগে বলবা না? তাহলে তো ভোর চারটার সময় পারডু ক্যাম্পাস দেখতে আসি না।

ব্যাপার না। কী আছে দুনিয়ায়! এই দেশে গাড়ি, ফোন, আর ক্রেডিট কার্ড সাথে থাকলে কিছু লাগে না। হারালেও ভয় নাই। আর এই এলাকায় হারানোর হলে ভরদুপুরেও হারানো যায়।


ক্ষুধা লাগসে, কিছু খাওয়া দরকার। সামনে কোন ম্যাকডোনাল্ডস দেখলে বলো তো।

রাস্তায় তো রাস্তার নামই দেখছি না, খাবার দোকান দূরের কথা। আচ্ছা, ম্যাপে বলছে যে স্টেট রাউট ২৮ নিতে হবে। দেখছি না কোন দিকে। ডানে ওয়ানওয়ে, বামে ডেড এন্ড, সোজাই চলেন। ঐ যে একটা হাসপাতাল আছে। ওখানে জিজ্ঞেস করি গিয়ে। আপনি থাকেন, আমি জেনে আসি।


কাজ হল?

নাহ, অযথা দরজা ধাক্কায় চলে আসলাম। কাউকে দেখলাম না ভিতরে। মনে হয় অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া দরজা খুলবে না। আজিব জায়গায় আসলাম।


ঐ যে একটা হোয়াইট ক্যাসল দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আট-দশটা বার্গার খেয়ে ফেলি গিয়ে।

বলেন কী? আট-দশটা বার্গার? গাড়ির জানালা খুলে চালাতে হবে তাহলে অযথা। বাদ দেওয়া যায় না? ম্যাকডোনাল্ডসই মেরে দেই আরেকটু কষ্ট করে। সাইজে ছোট হলেই বেশি খেতে হবে এমন কথা নাই তো। সে যাকগে, আমার পেটের ইঁদুরটা নাচতে নাচতে ঘুমায় গেছে। ওখান থেকে রাস্তার ব্যাপারেও জেনে নেওয়া যাবে।


কী খাবেন? রাত তো অনেক হল, বেড়াতে বেরিয়েছেন বুঝি? কতগুলো বার্গার দেবো?

ঢালতে থাকেন খাবার। আমরা চারজন আছি। আপাতত জনপ্রতি চারটা করে বার্গার দেন। লাগলে পরে আবার নেবো নাহয়। কোক নেই তো পেপসিই দেন। ইয়েস, অ্যান্ড বিওয়্যার অফ দ্য এলিফ্যান্ট দ্যাটস উইথ আস। আরে আরে তেড়ে আসার কী হল? তুমি একটু স্বাস্থবান দেখেই তো আমি ইয়ার্কি করি। ইটস ওকে, হি প্রমিসড হি উড লিভ দ্য কিচেন অ্যালোন।


তুমি তো খুব মিন। কাম হিয়ার সুইটি। এসো আদর করে দেই তোমাকে।

ইয়া, আইম শিওর হি কুড ইউজ সাম লাভ, ইট ওয়াজন্ট দ্য বেস্ট অফ এক্সপিরিয়েন্সেস ফর হিম টু রাইড উইথ মি। লাভ নাই চোখ রাঙায়। যাও গিয়ে মোটির আদর খাও। এত সহজে ছেড়ে দিবো ভাবসিলা? আসল পরিকল্পনা তো এটাই ছিল। খাওয়া নিয়ে ক্ষেপানো তো পুরনো হয়ে গেছে।


ইজ দেয়ার এনিথিং এলস আই ক্যান হেল্প ইউ উইথ হোয়াইল শি টেকস দ্য অর্ডার?

হু, পারেন। বিশাল সাহায্য দরকার একটা। আমরা রাস্তা হারিয়ে এখানে এসে পড়েছি। এসেছি ভার্জিনিয়া টেক থেকে। হ্যাঁ, ঐ গোলাগুলির ইউনিভার্সিটি। সবাই ভাল আছে এখন, থ্যাঙ্ক ইউ। যাচ্ছিলাম শিকাগো। কনসার্ট দেখতে। পথে ভাবলাম পারডু ইউনিভার্সিটি দেখে যাই। মাঝপথে প্ল্যান তো, তাই ম্যাপ নিয়ে বের হইনি। এই ভোররাতে তাই অন্ধের মত পথ হাতড়াচ্ছি ভূট্টা ক্ষেতের মাঝে।


তোমাদের তো দেখি হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমারের মত অবস্থা।

বলতে পারো। গোয়িং টু হোয়াইট ক্যাসল। আমিও বুঝতে পারছি না পুরোটা। জাস্ট প্লে অ্যালং। বুঝার ভান কর। আমি নিজেও মুভিটা দেখি নাই এখনও, তবে জানি যে একটা ইন্ডিয়ান আর একটা চাইনিজ কী সব যেন করে। এটাও না চিনতে আরও বেকুবের মত দেখাবে। হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার, অফিস স্পেস, নেপোলিয়ন ডায়নামাইট, ন্যাশনাল ল্যাম্পুন, ইত্যাদি হল এই দেশের কাল্ট ফেভারিট। প্রতিটাতেই কিছু না কিছু বাঁদরামো করে বেড়ায় কিছু পোলাপান। এখানে এগুলো নিয়ে না জানা খুবই খেতু ব্যাপার। বুঝো আর না বুঝো, বুঝদারের মত একটা হাসি ধরে রাখো মুখে।


এখান থেকে বের হয়ে স্টেট রোড ২৬ পাবে, তারপর সাউথ স্ট্রিট। যেতে যেতে ইউএস ৫২ পার করবে, একটা হাসপাতাল পার করবে, মেইন স্ট্রিটের উপর একটা লিকার স্টোর পার করবে। ঠিক পথে থাকলে এগুলো পরপর পাবে সব।

ঠিক আছে। মদের দোকান পর্যন্ত যেতে পারবো। হাসপাতালটা তো চোখে পড়েছেই। আচ্ছা, তারপর কলাম্বিয়া স্ট্রিট আর কোর্ট হাউসও পার করবো। এরপর?


এরপর হাতের ডানে ট্রিপল এক্স পড়বে। ওটাকে ফেলে কিছুদূর এগোলেই তোমার চেনা রাস্তা পাবে।

হু, এরপর হয়তো ওয়াবাশ খুঁজে পাবো। ঐ দিকটা কিছু কিছু মনে আছে এখনও। একটু আপহিল রাস্তা, পুরনো বাড়ি, চার্চ। সব মিলিয়ে পুরনো ঘরানার বেশ ছিমছাম জায়গা। বার্গারগুলো শেষ করেই রওনা দিচ্ছি। বাই দ্য ওয়ে, ট্রিপল এক্স কি একটা অ্যাডাল্ট বুকস্টোর?


নো, ইটস আ বার্গার জয়েন্ট। থ্যাঙ্কস ফর কামিং। ওহ ইউ আর সো লাইক হ্যারল্ড অ্যান্ড কুমার।

ইয়ে, মানে, আচ্ছা ঠিক আছে। চলেন ভাই তাড়াতাড়ি, বেইজ্জতি প্রশ্ন করে ফেলেছি। এই বামে দিয়ে বের হন। সামনের গাড়িটার লাইসেন্স প্লেটে লেখা আছে, ইন গড উই ট্রাস্ট। আমেরিকা তো না, যেন জেরুজালেমে আছি। ২০০৪ এর ইলেকশনের পর একটা কার্টুন দেখেছিলাম। সেটায় নিউ ইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়াকে ক্যানাডার সাথে যোগ করে লেখা, ইউনাইটেড স্টেটস অফ ক্যানাডা। বাদবাকি স্টেটগুলোকে লাল রং করে বড় করে লেখা, জেরুজাল্যান্ড।


এই গানটার ভলিউম একটু বাড়িয়ে দে তো রে। এটার বেজ অসাধারণ।

বাজনা ভাল, কিন্তু কানে লাগে খুব। আমি এককালে বেজ সহ্য করতে পারতাম না। কেমন যেন লাগতো। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে ধরে-বেঁধে আমাকে সেট দ্য কন্ট্রোলস ফর দ্য হার্ট অফ দ্য সান শুনানো হয়েছিল। ওটা শুনে বুঝেছিলাম বেজ কী জিনিস।


শোন, বেজ হল মা-বাপের মত। না থাকলে বুঝা যায় কী জিনিস।

দামী কথা রে, বহুত দামী কথা। যাক, কালকে রাতটা কোন রকমে পার করা গেল তবু। আবার ক্ষুধা লেগে গেছে। এই বেলায়ও কি ফাস্ট ফুড খাবেন, নাকি ভাল কোথাও বসবেন?


ভাল কোথাও বসি। একটু লিকার খেতে পারলে ভাল হত। ঐ যে সামনে একটা রেস্তোরাঁ আছে। জোস বার অ্যান্ড গ্রিল। চল ওখানেই যাই।

আমি কোক নিবো। জীবনে তো অ্যালকোহল ছুঁইনি এখনও। অবশ্য, জীবনের অনেক কিছুই তো ঠিক মত যায়নি। যা হয় হবে, নিয়েই ফেলি একটা। নিয়ম কী খাওয়ার? আমি তো জানি না তেমন কিছু একটা।


মদ খেলে সব সময় নিচের থেকে উপরে উঠবা। আগে বিয়ার, পরে ককটেল বা ওয়াইন। উলটা করতে নাই। তাহলে মাথা ধরবে। একটা লং আইল্যান্ড আইসড টি নিতে পারো। আমার বেশ ভাল লাগে ওটা। বেশি জোরে টেনো না শুরুতেই। একটু চেখে দেখো কেমন লাগে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

No comments: