Tuesday, August 04, 2009

ডিজিটাল বাংলাদেশঃ ১ [ভিশন ২০২১]


ভিশন ২০২১

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রত্যাশা পূরণের কথা উঠলে দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশিত এই চমকের কথাই জোর দিয়ে বলছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। ইশতেহারে পরিবেশিত 'ভিশন ২০২১'-এ লিপিবদ্ধ কথাগুলো বাংলাদেশকে কতটুকু "ডিজিটাল" করতে পারবে, এবং সত্যিকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা সময়েরই দাবি।

বহুল প্রচারিত এই ‘ভিশন ২০২১’ এর ব্যাপারে ইশতেহারে (বাংলায় আছে, ইংরেজিতে নেই) মাত্র সাত লাইনে যা বলা আছে, তার নির্যাস হলোঃ

১. প্রতিভাবান তরুণ ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে সফটওয়্যার শিল্প ও আইটি সার্ভিসের বিকাশ সাধন করা হবে,
২. ২০১৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে এবং ২০২১ সালে প্রাথমিক স্তরে আইটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে,
তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক টাস্কফোর্স সক্রিয় ও কার্যকর করা হবে,
৩. বিভিন্ন স্থানে হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইসিটি ইনক্যুবেটর, এবং কম্পিউটার ভিলেজ স্থাপন করা হবে।

খুব একটা বিস্তারিত কিছু নয়, বলা বাহুল্য। এই গোটা পঞ্চাশেক শব্দ বারংবার উচ্চারিত হচ্ছে আগামী দিনে দেশ গড়ার মূল লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে, মানুষও তাতেই বিশ্বাস স্থাপন করছে। যাঁরা ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে আরেকটু সবিস্তারে স্বপ্ন দেখতে চান, তাঁদের জন্য কিছু চিন্তার-খোরাক যোগানো যাক।

উন্নয়নের জন্য প্রকৌশল

উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার দু’টি পথ আছে।

একটি পথটি অনুকরণ-ভিত্তিক। অন্যের যা আছে, তা আমারও চাই।

ভারতের অজস্র লোকাল ট্রেন আছে, আমাদেরও চাই। জাপান বা ইউরোপে বুলেট ট্রেন আছে, আমাদেরও চাই। নিউ ইউর্ক বা লন্ডনের মতো মেট্রোপলিটন শহরে পাতাল রেল আছে, আমাদেরও চাই। ব্রাজিলের সাও পাওলোতে পাতাল রেল না থাকলেও অনেক অনেক বাস এবং তার জন্য আলাদা লেন আছে, আমাদেরও এমন ‘ট্রেন অফ বাসেস’ চাই। উন্নত বিশ্বে ক্রেডিট কার্ড আছে, আমাদেরও এমন ‘প্লাস্টিক মানি’ চাই। আমেরিকার ডিজিটাল পাসপোর্ট আছে, আমাদেরও চাই। সিঙ্গাপুর বা ওয়াশিংটন ডিসি’র প্রতিটি কোণে ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা আছে, আমাদের চাই। বাকি পৃথিবীর হাইস্পিড ইন্টারনেট আছে, আমাদেরও চাই। এমনি অনেক অনেক ব্যাপার।

চোখ-কান খোলা রেখে চললে এমন অনেক কিছুই দেখা-জানা যায় প্রবাস থেকে। এ-ধরনের কিছু চাহিদার একটি সংকলন তৈরি কষ্টের কিছু নয়। তুলনায় অনেক কঠিন হলো এর পেছনের কারিগরী অবকাঠামো দাঁড় করানো। সদিচ্ছা থাকলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর প্রযুক্তি কেনাবেচা করে এই ঘাটতির অনেকটাই খুব সহজে পূরণ সম্ভব।

দ্বিতীয় পথটি একটু কঠিন। মুখস্ত বা চোথামারা পদ্ধতি দিয়ে এই পথে সমাধান মেলে না। এর জন্য দরকার নিজের দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার, দেশজ মেধা ও শ্রম কাজে লাগানো, দেশের কথা মনে রেখে দেশের মতো করে তৈরি প্রকল্প হাতে নেওয়া।

এ-ধরনের পরিকল্পণা হাতে নেওয়ার আগে অনেক চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন, দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সব রকম মানবসম্পদের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। জোট সরকারের পাঁচ বছর ধরে সবাই ব্যস্ত ছিল প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নিয়ে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলোরই কোন অস্তিত্ব ছিল না। ফলাফল, ক্ষমতার ব্যপ্তি থাকলেও পরিকল্পনার গভীরতা নেই।

সর্বশেষ নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয়ের পর অনেক বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই দাবিগুলোর মধ্যে নৈমিত্তিক কাজে প্রশাসনিক দুর্নীতি কমানো ছাড়া তেমন বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই নিরাশার অন্যতম কারণ হলো, আমাদের বৌদ্ধিক পরিকল্পনাগুলো এটুকুতেই সীমিত। আজও আমরা চুরি এবং দুর্নীতিকে সমার্থক বলে জানি।

যতদিন না ডিজিটাল বাংলাদেশের চাহিদাটুকু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসছে, ততদিন এর জন্য সত্যিকার কাজ হবে না। সে-উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্পগুলোর পেছনের কারিগরী শৈলী যথাসম্ভব সহজভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই প্রয়াসের লক্ষ্য একটাই – সাধারণ মানুষ প্রযুক্তিবিদের মতো ভাবতে শিখুক। তার এই ভাবনাই কালক্রমে চাহিদায় রূপান্তরিত হয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্যথায় সুবর্ণ জয়ন্তীতে প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার সুবর্ণ একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য প্রকৌশল

প্রকৌশল মানেই বাস্তববাদিতা। বিজ্ঞানীর মতো দার্শনিক ও নতুন চিন্তার বিলাসিতা প্রকৌশলীদের নেই। সহজ ভাষায়, প্রকৌশলীরা নিউটনের চেয়ে ম্যাকগাইভার বেশি। প্রকল্পের আগে তাই অনেক রকম হিসেব কষতে হয় প্রকৌশলীদের। বিজ্ঞানীর কাছে দাবিটি বিজ্ঞানের অগ্রগতির, নতুন দিগন্ত খুঁজে বের করার। বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য তাই সাধারণ ভাবে অর্থের যোগান দেওয়া হয় অনেক লম্বা সময়ের জন্য।

পক্ষান্তরে, প্রকৌশলীর কাছে দাবিটি সাধারণ মানুষের। প্রান্তিক ভোক্তার খুব সাধারণ চাহিদাগুলোর সমাধানই প্রকৌশলীর কাজ। প্রকৌশলের জন্য অর্থের যোগান সে-কারণেই সময়ের সীমায় সীমিত থাকে। যে-দেশে যেমন শিল্প গড়ে ওঠে, সে-দেশে তেমন প্রকৌশলই শক্তিমান অবস্থানে থাকে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রায়শ উপেক্ষিত একটি দিক হলো মূলনীতি ও দিকনির্দেশনা। সরকারের কাজ গবেষণা করা নয়, গবেষণার দিকনির্দেশনা দেওয়া। সরকার মানুষের সব প্রয়োজন মেটাবে না, মানুষের প্রয়োজনগুলোর স্বীকৃতি দিয়ে তা যোগাতে সহায়তা করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যাতায়াত ব্যবস্থার কথা। প্রতিটি মানুষকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পরিবহনের কাজ সরকার করবে না, বরং সরকার এই বিষয়টি দৃষ্টিগোচর করবে যে এই দুই মেট্রোপলিটান শহরের মধ্যে সুলভ যোগাযোগ নিশ্চিত করা উচিত। অতঃপর, সরকার এ-কাজে ন্যূনতম দিকনির্দেশনা দেবে শুধু। এরপর কালক্রমে প্রযুক্তি আসবে, আসবে বিস্তারিত নীতিমালা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন প্রকল্পে হাত দেওয়ার আগের প্রথম যে প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে হবে তার মধ্যে আছেঃ

১. কার জন্য তৈরি করা হবে?
২. হাতে কী কী সম্পদ আছে?
৩. পূর্বপ্রস্তুত সমাধান আছে কিনা, থাকলে তা কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
৪. কত কম খরচে কত বেশি লাভ করা যায়, এবং শেষ দিন পর্যন্ত নিংড়ে কতটুকু বাড়তি আয় বের করা যায়?

সহজ, সাধারণ এই প্রশ্নগুলোর উপর মূলনীতি দাঁড় করানোর কারণ একটাই – প্রযুক্তির ব্যাপারে আপাত-অজ্ঞ মানুষও যেন ভাল-মন্দ বিচার করতে পারেন। শিক্ষা বা পেশা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে কম-বেশি প্রযুক্তি-সচেতন না করলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ও প্রগতি নিশ্চিত করানোর জন্য প্রান্তিক নাগরিকদের পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সূত্র জানার প্রয়োজন নেই, শুধু প্রয়োজন একটি প্রযুক্তির উপযোগিতা বিচার-বিবেচনা করতে জানা।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর, দেশের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের জন্য। সুবিধাভোগীদের জন্য প্রযুক্তির প্রসার খুব সহজ। তুলনায় কঠিনতর হলো এমন কোন উন্নয়ন যা প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে। টাকার অংকে বললে বুঝতে সহজতর হবে। একজন শিল্পপতির আয় এক কোটি টাকা বৃদ্ধির চেয়ে এক কোটি রিকশাওয়ালার আয় এক টাকা করে বৃদ্ধি করা অনেক বেশি কষ্টের। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনেই কোন না কোন ভাবে প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে।

সম্পদের বিভিন্ন প্রকরণের মধ্যে শুধু মানবসম্পদই বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে আছে। অদক্ষ শ্রমিক ছড়িয়ে আছে দেশময়, আর প্রবাসে আছেন অনেক দক্ষ শ্রমিক। মাঝামাঝি স্তরের মোটামুটি শিক্ষিত তরুণও আছেন অনেক। তুলনায় প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে। শুধু মানুষ দিয়ে প্রযুক্তি হয় না, কিছু না কিছু কাঁচামাল লাগে। প্রযুক্তির যুগে কাঁচামালগুলো আর স্রেফ লোহা বা তামা নয়। রূপান্তরিত যে-কাঁচামাল প্রযুক্তির জন্য ব্যবহার করা হয়, তা খুব কম মূল্যে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশের আপেক্ষিকে সেই কাঁচামালের ব্যবহারই সর্বাধিক উপযুক্ত সমাধান।

যে-কোন কিছুরই নির্দিষ্ট আয়ু আছে, তবে সবকিছুই ওয়ান-টাইম-ইউজ নয়। ইটের বাড়ি ভেঙে সেই ইট যেমন নতুন বাড়ি বানানোর কাজে লাগানো যায়, তেমনি বিদ্যমান প্রযুক্তি ও অবকাঠামোও পুনর্ব্যবহার করে খরচ সীমিত রাখা যায়। অতএব, খরচের কথা মাথায় রেখেই নতুন প্রযুক্তি গড়ে তুলতে হবে। এ-কারণে বিগত শতাব্দিতে গড়ে তোলা সব রকম শিল্প কারখানা সম্পর্কে পূর্ণ ও বাস্তবসম্মত জ্ঞান প্রয়োজন।

সাধারণত ত্যানা প্যাঁচানো কিংবা অতিরিক্ত কচলে তিতারস বের করাকে নেতিবাচক ভাবে দেখা হলেও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটাই মূল লক্ষ্য। প্রযুক্তি টেকসই হওয়ার পেছনে এটি অনেক বড় উপাদান। উদাহরণ হিসেবে জাপানে নির্মিত গাড়ি ও আমেরিকায় নির্মিত গাড়ির পার্থক্যের দিকে তাকানো যায়। দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহারোপযোগী করে তোলার চেষ্টা থাকে বলে টয়োটা বা হোন্ডার তৈরি গাড়ি বিশ্বজয় করছে। পক্ষান্তরে, স্বল্পকালীন ব্যবসা মাথায় রেখে তৈরি হওয়ায় আমেরিকায় নির্মিত গাড়ি বাজার হারাচ্ছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের বইয়ে আছে, ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন যে তালেবানরা পাহাড়-পর্বতে শুধু টয়োটার গাড়ির উপরেই ভরসা করে, অন্য কিছু নয়। বাংলাদেশের মতো সীমিত আয়ের দেশকে ডিজিটাইজ করতে হলে মূলনীতি হতে হবে এভাবে বিদ্যমান প্রযুক্তির মধ্য থেকে ‘এক্সট্রা মাইল’ বের করে আনা এবং নতুন প্রযুক্তিকে কালোত্তীর্ণ করা।

এই সাধারণ প্রশ্নগুলোর ভিত্তিতেই সাধারণ কিছু চিন্তা, কল্পনা, ও দর্শন মিশিয়ে এবার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়া যাক।

ছবিঃ "স্টেপ-আউট", শোভন নাজমুস

1 comment: