মাত্রই গত রাতে ঘুমানোর আগে দেখছিলাম মাইকেল জ্যাকসন ব্রিটেনে গাইবেন। জ্যাকসন-ফাইভের রিইউনিয়ন হবে, এরপর ৫০টি শো করবেন তিনি। খুব আফসোস হচ্ছিল ব্রিটেনে নেই দেখে। একই সাথে আনন্দিত হচ্ছিলাম অনেক, অনেক দিন পর এই মহাশিল্পীর গান-নাচ দেখার আশায়।
মনে মনে ভাবছিলাম, এই ভঙ্গুর শরীরে মুনওয়াক সইবে তো? দেখা যাবে ঝাঁকি দিতে গিয়ে হাড়-গোড় খুলে রয়ে গেছে। এক টানা ৫০টি শো করা তো নবীন শিল্পীদের জন্যও অনেক ধকলের!
বিবিসি-র ছবিতে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই জ্যাকসনের পেছনে সেই জ্যাকসনের ভিডিও ছাড়লে কেমন হবে। মনে মনে গালি দিচ্ছিলাম কালো থেকে সাদা হওয়ার জন্য। মানুষের সবকিছু বদলে গেলেও নাকি তার চোখগুলো একই রকম থেকে যায়। ছবি দেখে ভাবছিলাম, সেই দুরন্ত চোখগুলোও আর আগের মত নেই।
সব ভাবনা আর কল্পনার সমাপ্তি হয়ে গেল। বিশ্বজুড়ে সব মিডিয়ায় প্রকাশ, মাইকেল জ্যাকসন আর নেই। আজ দুপুরের পর তিনি হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। খুব দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাঁকে আর ডিপ-কোমা থেকে ফিরিয়ে আনা যায়নি।
বহু গায়ক আসবেন, অনেক "এন্টারটেইনার" জন্ম নেবেন, কিন্তু দ্বিতীয় জ্যাকসন আসবে না। শত বিতর্ক আর হাস্যকর কার্যকলাপ সত্বেও মাইকেল জ্যাকসন চিরকাল "থ্রিলার" হয়েই রইবেন।
গান গেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন অনেকেই, কিন্তু মাইকেল জ্যাকসনের মত কেউই ছিলেন না। 'থ্রিলার' অ্যালবামের ৭টি গান টপচার্টের শীর্ষে ওঠার কথা সবাইই জানেন। মুনওয়াকের কথাও সবাই জানেন। একই কণ্ঠে নরম-কঠিন সব রকম গানের কথাও জানেন।
এই সাফল্যটুকুও অনেকেই হয়তো পাবেন। যা পাবেন না, তা হল জ্যাকসনের বাধভাঙা জনপ্রিয়তা। জ্যাকসন সেই কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী যাঁর গান শ্বেতাঙ্গ দুনিয়াকেও কাঁপিয়েছিল। সেই শিল্পী যাঁর গান শোনার পাশাপাশি দেখে এবং অনুকরণ করে কেটেছে লক্ষ লক্ষ কিশোর-তরুণ-যুবকের দিন-রাত। সেই শিল্পী যাঁর গান শুনে আমার বাবা তার বিদেশি কনসালটেন্টের কাছ থেকে ক্যাসেট চেয়ে এনে ছেলেদের শুনিয়েছিলো। সেই শিল্পী, যাঁর নামে বের হওয়া গেম সেগা'য় খেলতে বেহায়ার মত পড়শির বাড়ি গিয়ে বসে থাকতাম।
একটু পাগলাটে আর খামখেয়ালি না হলে বোধহয় প্রতিভাবানদের মানায় না। একটু তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে না গেলেও তাই। তাই বলে এতটাই দ্রুত? মাত্র ৫০ বছর বয়সে?
Showing posts with label বিনোদন. Show all posts
Showing posts with label বিনোদন. Show all posts
Monday, July 13, 2009
Friday, February 20, 2009
গানবন্দী জীবনঃ ওবলাডি ওবলাডা
প্রিয় মানুষের প্রতি বিশ্বাস সব সময়ই মাত্রাছাড়া হয়। চিন্তা ও বুদ্ধির স্বাধীনতার শিখরে পৌঁছেও মানুষ প্রিয়ত্বের কাছে ন্যুব্জ হয়ে থাকে আজীবন। মানুষ কীভাবে যেন অন্যের ছায়া হয়ে যায়। অন্য কারও হাসিতে মন খুশি হয়ে ওঠে, অন্য কারও দুঃখে মন খিটখিটে হয়ে ওঠে। অন্যের প্রিয় গান নিজের প্রিয় হয়ে ওঠে।
বড় হওয়ার সুবাদে প্রায় সব নিকটাত্মীয়ের কাছেই এই যত্নটুকু পেয়েছি। আমার ভাল লাগে, তাই আমার ছোট মামা মুহম্মদ জাফর ইকবালের সব বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিল। চলন্ত গাড়ির পাশে পাশে কাউকে দৌঁড়াতে দেখলে আমি খুশি হতাম, তাই আমার মামা ট্রেনের পাশে পাশে ছুটতো। সেই সময়গুলোর কথা।
আমার নানার ছিল এলপি’র এক বিশাল সংগ্রহ। রেকর্ড প্লেয়ারে সেগুলো চলতো খুব। পুরনো দিনের গান কিংবা পল্লীগীতি সেই বয়সে পোষাতো না তেমন একটা। সৌভাগ্যক্রমে, বিটলসের গান ছিল নানার খুব প্রিয়। পুরনো আমলের সেই গানগুলোর অর্থ না বুঝলেও তালে তাল মেলাতাম খুব। হয়তো তালের জন্যই ‘ওবলাডি ওবলাডা’ ছিল খুব প্রিয় গান। আমার পছন্দ, তাই নানা বারবার বাজাতো এই গান। গানের কথা কিছুই বুঝতাম না সেই বয়সে, শুধু ‘ও জ্যেডি, ও জ্যাডা’ বলে লাফালাফি করতাম। আর ছিল এলপি উলটে দেওয়া কিংবা পিন নাড়াচাড়ার আনন্দ। অগণিত এলপি আর পিন ভাঙলেও কোন শাসন পোহাতে হয়নি।
সে-সময় নানারা থাকতো সেন্ট্রাল রোডের এক বাসার নিচতলায়। সেখানেই আমার বড় হয়ে ওঠা। সকাল হলে দুই খালা তারস্বরে রেওয়াজ করতো, দুপুর হলে ছোট মামা চোখে গেঞ্জি পেঁচানো অবস্থায়ই কাছে ডেকে ‘অভি রে, অর্ণব রে’ করতো, বিকেল হলে বড় মামা বারান্দায় খেলতো। সেই সাথে ছিল গ্যারেজের সামনের জায়গাটুকুতে ক্রিকেট খেলা। নিঃসন্তান বাড়িওয়ালা শত রাগী হলেও আমার বেলায় প্রশ্রয়ী ছিল অনেক। টুকিটাকি দুষ্টামির কথা তো বাদই দিলাম।
একবার ‘কারেন্ট কী জিনিস’ জানবার ভূত ঢুকলো মাথায়। টেবিল ঠেলে বারান্দার এক সকেটের পাশে নিলাম। সেই টেবিলে উঠে একটি তারের দুই মাথা সকেটে ঢুকিয়ে দিলাম সুইচ টিপে। বিদ্যুতের ধাক্কায় টেবিল থেকে ছিটকে পড়লাম। সারা বাড়ির ফিউজ জ্বলে গেল। আরেকবার দাওয়াতে যাওয়ার তাড়ায় বারান্দার ‘আড়াল’ কাজে লাগিয়ে কাপড় বদলাচ্ছিলাম। যেই না প্যান্ট খুললাম, অমনি কাছের এক উঁচু দালান থেকে অট্টহাসি। সেই বেইজ্জতি ভুলতে পারিনি এখনও।
দিনের বেলা নানা-নানির আদরে সময় কাটতো। নানা বালিশে হেলান দিয়ে তাস খেলতো, আর নানি পাশের মোড়ায় বসে পান-সুপারি বানাতো। খেলতে খেলতে নানা আমাদের উপর পা তুলে দিত। ছোট ভাই তখন নানির কাছে অনুযোগ করে বলতো, নানি দেতো নানা তী তলে, নানা পা দেয়, নানার পা তা তেতে দাও তো!
সেই বাসাতেই ১৯৯১-এর নির্বাচন দেখেছিলাম। রাত জেগে বিটিভির বোর্ডে ফলাফল দেখানো হচ্ছে, মাঝে চলছে আনন্দমেলা, চলচ্চিত্র, গানের অনুষ্ঠান। একটু পর পর খাওয়া-দাওয়া, রাতভর আড্ডা আর গালগপ্পো। শবে-বরাত এলে ছাদে উঠে লুকিয়ে আতশবাজি পোড়াতাম। রাস্তার ঠিক উলটো দিকেই ছিল মানিক মামার মুদির দোকান। আমাকে আসতে দেখলেই এক বোতল কোক খুলে রাখতো। প্রতিদিন নানি কোক খাওয়াতো, নানা ঢাকা ক্লাব থেকে খাবার এনে খাওয়াতো।
নানাদের সেই ভাড়া বাসাতেই প্রথম দেওয়াল টপকানো শিখেছিলাম। একেক দিনে একেক রকম বোলিং অ্যাকশন নকল করে বোলিং শিখেছিলাম। ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে এনে ইন্ডিয়ানা জোনস, কিং সলোমন্স মাইন, স্টার ওয়ারস, সব দেখেছিলাম সেই বাসায়।
চুরির উৎপাতের কারণে প্রতি রাতে দরজা-জানালায় খিল দিয়ে শুতে হত। বড়দের মত এই কাজটা করায় আমার ছিল ব্যাপক উৎসাহ। যেমন ইচ্ছা, তেমন কাজ। এক রাতে আমি ভুলে গেলাম বাথরুম আর বেডরুমের মাঝের ড্রেসিং রুমের দরজায় খিল দিতে। সকালে উঠে দেখি ঘর ফাঁকা।
আমার নানা স্মিত হেসে বলেছিল, ব্যাপার না।
ওবলাডি ওবলাডা, লাইফ গোজ অন।
বড় হওয়ার সুবাদে প্রায় সব নিকটাত্মীয়ের কাছেই এই যত্নটুকু পেয়েছি। আমার ভাল লাগে, তাই আমার ছোট মামা মুহম্মদ জাফর ইকবালের সব বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিল। চলন্ত গাড়ির পাশে পাশে কাউকে দৌঁড়াতে দেখলে আমি খুশি হতাম, তাই আমার মামা ট্রেনের পাশে পাশে ছুটতো। সেই সময়গুলোর কথা।
আমার নানার ছিল এলপি’র এক বিশাল সংগ্রহ। রেকর্ড প্লেয়ারে সেগুলো চলতো খুব। পুরনো দিনের গান কিংবা পল্লীগীতি সেই বয়সে পোষাতো না তেমন একটা। সৌভাগ্যক্রমে, বিটলসের গান ছিল নানার খুব প্রিয়। পুরনো আমলের সেই গানগুলোর অর্থ না বুঝলেও তালে তাল মেলাতাম খুব। হয়তো তালের জন্যই ‘ওবলাডি ওবলাডা’ ছিল খুব প্রিয় গান। আমার পছন্দ, তাই নানা বারবার বাজাতো এই গান। গানের কথা কিছুই বুঝতাম না সেই বয়সে, শুধু ‘ও জ্যেডি, ও জ্যাডা’ বলে লাফালাফি করতাম। আর ছিল এলপি উলটে দেওয়া কিংবা পিন নাড়াচাড়ার আনন্দ। অগণিত এলপি আর পিন ভাঙলেও কোন শাসন পোহাতে হয়নি।
সে-সময় নানারা থাকতো সেন্ট্রাল রোডের এক বাসার নিচতলায়। সেখানেই আমার বড় হয়ে ওঠা। সকাল হলে দুই খালা তারস্বরে রেওয়াজ করতো, দুপুর হলে ছোট মামা চোখে গেঞ্জি পেঁচানো অবস্থায়ই কাছে ডেকে ‘অভি রে, অর্ণব রে’ করতো, বিকেল হলে বড় মামা বারান্দায় খেলতো। সেই সাথে ছিল গ্যারেজের সামনের জায়গাটুকুতে ক্রিকেট খেলা। নিঃসন্তান বাড়িওয়ালা শত রাগী হলেও আমার বেলায় প্রশ্রয়ী ছিল অনেক। টুকিটাকি দুষ্টামির কথা তো বাদই দিলাম।
একবার ‘কারেন্ট কী জিনিস’ জানবার ভূত ঢুকলো মাথায়। টেবিল ঠেলে বারান্দার এক সকেটের পাশে নিলাম। সেই টেবিলে উঠে একটি তারের দুই মাথা সকেটে ঢুকিয়ে দিলাম সুইচ টিপে। বিদ্যুতের ধাক্কায় টেবিল থেকে ছিটকে পড়লাম। সারা বাড়ির ফিউজ জ্বলে গেল। আরেকবার দাওয়াতে যাওয়ার তাড়ায় বারান্দার ‘আড়াল’ কাজে লাগিয়ে কাপড় বদলাচ্ছিলাম। যেই না প্যান্ট খুললাম, অমনি কাছের এক উঁচু দালান থেকে অট্টহাসি। সেই বেইজ্জতি ভুলতে পারিনি এখনও।
দিনের বেলা নানা-নানির আদরে সময় কাটতো। নানা বালিশে হেলান দিয়ে তাস খেলতো, আর নানি পাশের মোড়ায় বসে পান-সুপারি বানাতো। খেলতে খেলতে নানা আমাদের উপর পা তুলে দিত। ছোট ভাই তখন নানির কাছে অনুযোগ করে বলতো, নানি দেতো নানা তী তলে, নানা পা দেয়, নানার পা তা তেতে দাও তো!
সেই বাসাতেই ১৯৯১-এর নির্বাচন দেখেছিলাম। রাত জেগে বিটিভির বোর্ডে ফলাফল দেখানো হচ্ছে, মাঝে চলছে আনন্দমেলা, চলচ্চিত্র, গানের অনুষ্ঠান। একটু পর পর খাওয়া-দাওয়া, রাতভর আড্ডা আর গালগপ্পো। শবে-বরাত এলে ছাদে উঠে লুকিয়ে আতশবাজি পোড়াতাম। রাস্তার ঠিক উলটো দিকেই ছিল মানিক মামার মুদির দোকান। আমাকে আসতে দেখলেই এক বোতল কোক খুলে রাখতো। প্রতিদিন নানি কোক খাওয়াতো, নানা ঢাকা ক্লাব থেকে খাবার এনে খাওয়াতো।
নানাদের সেই ভাড়া বাসাতেই প্রথম দেওয়াল টপকানো শিখেছিলাম। একেক দিনে একেক রকম বোলিং অ্যাকশন নকল করে বোলিং শিখেছিলাম। ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে এনে ইন্ডিয়ানা জোনস, কিং সলোমন্স মাইন, স্টার ওয়ারস, সব দেখেছিলাম সেই বাসায়।
চুরির উৎপাতের কারণে প্রতি রাতে দরজা-জানালায় খিল দিয়ে শুতে হত। বড়দের মত এই কাজটা করায় আমার ছিল ব্যাপক উৎসাহ। যেমন ইচ্ছা, তেমন কাজ। এক রাতে আমি ভুলে গেলাম বাথরুম আর বেডরুমের মাঝের ড্রেসিং রুমের দরজায় খিল দিতে। সকালে উঠে দেখি ঘর ফাঁকা।
আমার নানা স্মিত হেসে বলেছিল, ব্যাপার না।
ওবলাডি ওবলাডা, লাইফ গোজ অন।
গানবন্দী জীবনঃ মিস লংকা
দুই ছেলেকে নিয়ে আমাদের মায়ের পরিকল্পণাগুলো অনেক দূরপ্রসারী ছিল। ছোট ভাইটি আমার চেয়ে প্রায় সাড়ে চার বছরের ছোট। তখনও তার কেঁদে-কেটে স্কুলে যাওয়ার বয়স। আমি পড়ি চতুর্থ কি পঞ্চম শ্রেণিতে। ভাইকে নিয়ে তখনও তেমন নির্দিষ্ট পরিকল্পণা না থাকলেও আমার বেলায় ছিল। মায়ের ইচ্ছা ছিল আমাকে নানা-দাদার মত ডাক্তার বানাবে। শুধু ভাবলেই হল না। ডাক্তারি শেখা অনেক কঠিন ব্যাপার। আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
যেমন চিন্তা, তেমন কাজ। ব্যাঙ-কেঁচো-তেলাপোকার ছবি আঁকার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আমাদের দুই ভাইকে ভর্তি করা হল ছবি আঁকার স্কুলে। বড় বোর্ড, হরেক রকম পেনসিল, আর গোল করে পাকানো আর্ট পেপার নিয়ে আমরা দুই ভাই প্রতি সপ্তাহে আর্ট স্কুলে যেতাম। গান বা ছবির প্রতি অনুরাগ নয়, বরং বিকেলে ঘর থেকে বের হতে পারাই ছিল মূল আকর্ষণ।
কাঁচা বয়সে কারও উপর কিছু চাপিয়ে দিতে নেই। বিশেষ করে নান্দনিক ব্যাপারে। আমাদের শিক্ষক এ-ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। তিনি প্রথম দিন ক্লাসে এসেই বললেন “ফ্রি হ্যান্ড ড্রয়িং” করতে। লোকজনের দেখাদেখি নৌকা আঁকলাম, নদীর পাড়ের কুড়েঘর আঁকলাম, বাড়ির পেছনে কলা গাছের পাতা আঁকলাম, আর আঁকলাম মেঘ এবং পাখি। এই একই ছবি এঁকে চললাম প্রায় দু’তিন মাস। শিক্ষক মহাশয়ও “ফ্রি হ্যান্ড ড্রয়িং”এর বাইরে কিছু করান না, আমিও নতুন কিছু আঁকতে পারি না।
ছবি আঁকা এবং গান গাওয়া, এই দু’টি গুণ একেবারেই নেই দেখে এই দিকের শিল্পীদের অনেক শ্রদ্ধার চোখে দেখি আমি। হাজারো ফাঁকিবাজি সত্বেও সেই শিক্ষক তাই আমার পরম আরাধ্য ছিলেন। এমনিতেও গল্প বেশি, পড়া কম ধরণের শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রিয় হন। ভূতের গলি মসজিদের সামনের ময়লার ডিপো কিংবা ঝড়-বাদলায় ড্রয়িং বোর্ডকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করতে হওয়া তাই গায়ে মাখতাম না। কিছু না পড়ালেও অভিভাবকদের তুষ্ট রাখতে আমাদের ঠিক দেড় ঘন্টা আটকে রাখা হত সেই স্কুলে। দেড় ঘন্টার আড্ডা আর ঘর-বাড়ি আঁকা মন্দ লাগতো না।
এক বিকেলে গিয়ে দেখি ক্লাস ফাঁকা। স্যারের মুখেও কেমন যেন অন্য রকম রোশনাই। আয়োজন করে বসতে না বসতেই বললেন, আজ ছুটি। ছাত্র-অভিভাবক নির্বিশেষে সবাই আনন্দে বাড়ি ফিরে যাওয়া শুরু করলো। বুঝে গেলাম, সবাই এমন কিছু জানে যা আমার অজানা। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম ছুটির কারণ। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্যার বললেন, আজকে মিস লংকা!
ঘরে ফেরার পথে খেয়াল করলাম, পথ-ঘাটে মানুষ অস্বাভাবিক রকম কম। বাসায় এসে দেখি সবাই টিভির সামনে বসে আছে অসীম আগ্রহে। সেখানেই মিস লংকার সাথে পরিচয় আমার। ‘এসব মানুষে দেখে?’ জাতীয় একটা মুখ করে ঠিকই সোফার এক কোণে বসে পড়লাম। বাকিটা ইতিহাস। চা-বাগানে ববিতা দৌঁড়াচ্ছে, পেছন পেছন ছুটছে নায়ক। মূক-বধির নায়িকাকে ফুসলাতে গাইছে – চুরি করেছ আমার মনটা, হায়রে হায় মিস লংকা! নায়িকার অসম্মতি ও আনুষাঙ্গিক নানাবিধ নাটকীয় বালা-মুসিবত অতিক্রম করে নায়ক বাধ্য হয়েই পিতার পছন্দে বিয়ে করলো। দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে বাসর ঘরে ঢুকতেই কোমর দুলিয়ে কিন্নরকণ্ঠী লাল-টুকটুক বৌ গেয়ে উঠলো সেই গান। মনের খবর হায় ছিল না জানা, তোমার বাড়িটাই ছিল না চেনা, লগ্ন এলো এত দিন পরে, হাসি মেলে চেয়ে দেখো না! অন্তরে আজ বাজে ডংকা, হায় রে হায় মিস লংকা। আহা, শেষে এসে মনে কী শান্তি!
ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই গানটি পথ-ঘাটে শুনলেই সেই দিনটায় ফিরে যায় মন। ডাস্টবিনের গন্ধ, পঁচা-গলা পানি, আর ঝিরঝির বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিস লংকার কাছে যাওয়ার তাড়না। স্থির হয়ে বসে থেকেও মনে মনে নেচে ওঠা। সেই সময়গুলোয়, যখন অধমের চিত্রাঙ্কনের গুণেই কিনা জানি না, দুই দুইটি আর্ট স্কুল ব্যবসা গুটিয়েছিল ভূতের গলি এলাকায়।
যেমন চিন্তা, তেমন কাজ। ব্যাঙ-কেঁচো-তেলাপোকার ছবি আঁকার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আমাদের দুই ভাইকে ভর্তি করা হল ছবি আঁকার স্কুলে। বড় বোর্ড, হরেক রকম পেনসিল, আর গোল করে পাকানো আর্ট পেপার নিয়ে আমরা দুই ভাই প্রতি সপ্তাহে আর্ট স্কুলে যেতাম। গান বা ছবির প্রতি অনুরাগ নয়, বরং বিকেলে ঘর থেকে বের হতে পারাই ছিল মূল আকর্ষণ।
কাঁচা বয়সে কারও উপর কিছু চাপিয়ে দিতে নেই। বিশেষ করে নান্দনিক ব্যাপারে। আমাদের শিক্ষক এ-ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। তিনি প্রথম দিন ক্লাসে এসেই বললেন “ফ্রি হ্যান্ড ড্রয়িং” করতে। লোকজনের দেখাদেখি নৌকা আঁকলাম, নদীর পাড়ের কুড়েঘর আঁকলাম, বাড়ির পেছনে কলা গাছের পাতা আঁকলাম, আর আঁকলাম মেঘ এবং পাখি। এই একই ছবি এঁকে চললাম প্রায় দু’তিন মাস। শিক্ষক মহাশয়ও “ফ্রি হ্যান্ড ড্রয়িং”এর বাইরে কিছু করান না, আমিও নতুন কিছু আঁকতে পারি না।
ছবি আঁকা এবং গান গাওয়া, এই দু’টি গুণ একেবারেই নেই দেখে এই দিকের শিল্পীদের অনেক শ্রদ্ধার চোখে দেখি আমি। হাজারো ফাঁকিবাজি সত্বেও সেই শিক্ষক তাই আমার পরম আরাধ্য ছিলেন। এমনিতেও গল্প বেশি, পড়া কম ধরণের শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রিয় হন। ভূতের গলি মসজিদের সামনের ময়লার ডিপো কিংবা ঝড়-বাদলায় ড্রয়িং বোর্ডকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করতে হওয়া তাই গায়ে মাখতাম না। কিছু না পড়ালেও অভিভাবকদের তুষ্ট রাখতে আমাদের ঠিক দেড় ঘন্টা আটকে রাখা হত সেই স্কুলে। দেড় ঘন্টার আড্ডা আর ঘর-বাড়ি আঁকা মন্দ লাগতো না।
এক বিকেলে গিয়ে দেখি ক্লাস ফাঁকা। স্যারের মুখেও কেমন যেন অন্য রকম রোশনাই। আয়োজন করে বসতে না বসতেই বললেন, আজ ছুটি। ছাত্র-অভিভাবক নির্বিশেষে সবাই আনন্দে বাড়ি ফিরে যাওয়া শুরু করলো। বুঝে গেলাম, সবাই এমন কিছু জানে যা আমার অজানা। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম ছুটির কারণ। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্যার বললেন, আজকে মিস লংকা!
ঘরে ফেরার পথে খেয়াল করলাম, পথ-ঘাটে মানুষ অস্বাভাবিক রকম কম। বাসায় এসে দেখি সবাই টিভির সামনে বসে আছে অসীম আগ্রহে। সেখানেই মিস লংকার সাথে পরিচয় আমার। ‘এসব মানুষে দেখে?’ জাতীয় একটা মুখ করে ঠিকই সোফার এক কোণে বসে পড়লাম। বাকিটা ইতিহাস। চা-বাগানে ববিতা দৌঁড়াচ্ছে, পেছন পেছন ছুটছে নায়ক। মূক-বধির নায়িকাকে ফুসলাতে গাইছে – চুরি করেছ আমার মনটা, হায়রে হায় মিস লংকা! নায়িকার অসম্মতি ও আনুষাঙ্গিক নানাবিধ নাটকীয় বালা-মুসিবত অতিক্রম করে নায়ক বাধ্য হয়েই পিতার পছন্দে বিয়ে করলো। দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে বাসর ঘরে ঢুকতেই কোমর দুলিয়ে কিন্নরকণ্ঠী লাল-টুকটুক বৌ গেয়ে উঠলো সেই গান। মনের খবর হায় ছিল না জানা, তোমার বাড়িটাই ছিল না চেনা, লগ্ন এলো এত দিন পরে, হাসি মেলে চেয়ে দেখো না! অন্তরে আজ বাজে ডংকা, হায় রে হায় মিস লংকা। আহা, শেষে এসে মনে কী শান্তি!
ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই গানটি পথ-ঘাটে শুনলেই সেই দিনটায় ফিরে যায় মন। ডাস্টবিনের গন্ধ, পঁচা-গলা পানি, আর ঝিরঝির বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিস লংকার কাছে যাওয়ার তাড়না। স্থির হয়ে বসে থেকেও মনে মনে নেচে ওঠা। সেই সময়গুলোয়, যখন অধমের চিত্রাঙ্কনের গুণেই কিনা জানি না, দুই দুইটি আর্ট স্কুল ব্যবসা গুটিয়েছিল ভূতের গলি এলাকায়।
Thursday, January 24, 2008
ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে (The Over-Trump)
আচমকা মাথা-চাড়া দেওয়া অসংখ্য বদ-চিন্তার একটির সমাপ্ত রূপ। ঈদের অনুষ্ঠানে ছাত্রদের পরিবেশনা।
Subscribe to:
Posts (Atom)