Thursday, January 24, 2008

বাঙ্গালির ডিখ্যাতিফিকেশন

১. খ্যাৎনামা
মানুষ হিসেবে আমি প্রাচীন, অচল। কমপক্ষে এক প্রজন্ম আগে আটকে আছি। আমার মারকুটে বাবা অত্যন্ত যত্নের সাথে শিখিয়েছিল, লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে। সকাল হলেই ছিল আমার নাম ধরে বিকট এক ডাক, আর সাথে ফ্যান বন্ধ করে দেওয়া। ঘুম ভেঙে বিবিসি রেডিও শুনতে পেতাম প্রতি সকালে। সরকারী চাকরিজীবি বাবার সিংহভাগ উপার্জন চলে যেত আমাদের দুই ভাইয়ের স্কুল আর প্রাইভেট টিউটরের পেছনে। ছোট মামা স্কলারশিপের টাকা দিয়ে একটা আটারি কিনে দিয়েছিল। বয়স তখন বছর সাতেক হবে হয়তো আমার। জীবনে আর কখনও কোন টিভি গেইম হাতে পাইনি। আমার মিতব্যয়ী বাবা প্রতি বছর হাজার কয়েক টাকা তুলে রাখতো একুশে বইমেলার জন্য, মেলা এলে পূর্ণ স্বাধীনতায় খরচ করতাম। ঘরে সম্পদ বলতে ছিল শুধু কয়েক শেলফ বই। প্রতি বেলায় এক তরকারি, এক ভাজি, আর ডাল ছিল মেন্যু। ভোগ বলতে জুম্মাবারে বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস। আর প্রাত্যহিক বিনোদন বলতে বইগুলো নাড়াচাড়া করা। সান্ধ্য আইন মেনে ঘরে ফিরতে হত। হাজার অপছন্দ সত্ত্বেও ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত পড়ার টেবিলে বসে থাকতে হত। অন্যথায় শাস্তি ছিল বেতপেটা, আর মেনে চলার পুরস্কার ছিল সেই শাস্তি থেকে রেহাই।

এমনি করেই বেড়ে ওঠা এই আমি যে খ্যাৎ আর বিব্রতকর হব, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। প্রবাস বলতে সবাই বাইরের কোন দেশকে বোঝে। আমার কাছে প্রবাসের সংজ্ঞা মিলে যেতে না পারায়, স্বকীয়তাকে সংকুচিত করে রাখায়। সে-অর্থে আমার প্রবাস জীবনের সূচনা দেশে থাকতেই। উন্নত ব্যক্তি, সমাজ, ও রাষ্ট্রের উৎকর্ষের সামনে নিজেকে অপ্রস্তুত অবস্থায় আবিষ্কার করেছি অগণিত বার। খেতু থেকে আধুনিক হবার চেষ্টা খুব একটা গা লাগিয়ে করিনি, তবে চিনেছি অনেক খ্যাতাচারই। মনটা একদিকে ছোট হয়ে যায়, আবার আরেক দিকে ভেবে ভাল লাগে যে আমি অচল হলেও খুব দুর্লভ কোন প্রাণি নই।

২. কুলির কাপে ঝড়
আমি মানুষ হিসেবে ভীতু বলেই কিনা জানি না, আমার শখের বিষয় বা বস্তুগুলো কিছুটা নিরীহ। লোকের গাড়ি কেনার শখ থাকে, আমার শখ একটা সাইকেলের। কেউ সাগরপাড়ে বেড়াতে চায়, আমি চাই স্রেফ একটা ডিঙি নৌকা। সবাই বাড়ি চায়, আমি চাই ছোট্ট, সুন্দর একটা ছোটঘর। খালার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে একবার সুন্দর এক ‘বিশ্রামাগার’ ঢোকার সৌভাগ্য হল। আলতো করে এদিক-ওদিক হাত বুলাতে বুলাতে হাঁটছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল বেসিনের উপর রাখা একটা ছোট্ট কাপে। গবেষণা করে বের করলাম, এই কাপের কাজ কুলকুচিতে সাহায্য করা। আজলা তুলে পানি নিয়ে কেউ কুলি করে না এই যুগে। শিখলাম।

৩. সুড়ুৎ সুড়ুৎ সুড়ুৎ
এবার বলছি চায়ের কাপের কথা। না, চা খাওয়ার সময় হাজারো আয়েশ সত্ত্বেও সুড়ুৎ করা যাবে না। নানি যদি কাপ থেকে পিরিচে ঢেলে দেয়, তাহলে হয়তো ফু দিয়ে খেয়ে নেওয়া যায়, তবে তা খুবই সন্তর্পনে হতে হবে। প্রকাশ্যে কখনো নাকি চায়ে ফু দেওয়া যায় না, পিরিচে নেওয়া তো দূরের কথা। মন যত উচাটনই হোক, এক থেকে দেড় চামচের বেশি চিনি নেওয়া যায় না। জ্বালার শেষ এখানেই নয়। আরামে নাকি সশব্দে আহ্‌ করাও বারণ। চা তবু গরম গরম পান করতে হবে। উফ, এত নিয়মের বালাই কেন?

৪. মন্ডা-মিঠাই যত চাও
মিষ্টি খাওয়ার বাতিক পেয়েছি দাদার কাছ থেকে। দাদা ছিল গ্রামের ডাক্তার। উত্তরাধিকারসূত্রে একটা শিক্ষিত বাপ, পরার্থপর হিসেবে রেখে যাওয়া সুনাম, আর কিছু বদভ্যাস ছাড়া এমনিতেও কিছু পাবার কথা না। দাদার উৎপাতে নাকি মিষ্টিওয়ালা গ্রামে ঢুকে মসজিদ পেরিয়ে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারতো না। তার আগেই হাঁড়ির মিষ্টি খতম। ম্যাট্রিকের রেজাল্টের পর বিষম আনন্দে আমার বাবা অনেক মিষ্টি এনেছিল। আমার আনন্দ দেখে সবাই খুব খুশি। আমি যে বেশি নম্বরের চেয়ে বেশি মিষ্টি দেখে আনন্দিত, তা খোলাসা করে বললে মনে হয় না আর লেখাপড়া করা হত। যাক সে কথা। মিষ্টিও নাকি এক বসায় বেশি খাওয়া অনুচিত। হাত লাগিয়ে খাওয়া তো চূড়ান্ত অসম্মানজনক। দাদার যুগই ভাল ছিল, এই ভাবতে ভাবতে চামচ তুলি আজও।

৫. টয়োটা ক্যামরি
সুযোগ হলে কেউ ‘ডুড, হোয়্যার ইজ দ্য পার্টি’ মুভিটা দেখে নিয়েন। দেসি কালচারের বীভৎস খ্যাতাচার নিয়ে তৈরি দুর্দান্ত কমেডি। চলচ্চিত্র থেকে ধার করেই বোঝাই এই খ্যাতাচার। উঠতি বয়সের কিছু ভারতীয় তরুণ গোরা মেয়ে বাগানোর জন্য পার্টি দিচ্ছে। কীভাবে যেন খবর পেয়ে চলে এসেছে তেলচপচপে খেতু থেকে শুরু করে গলায় মাথায় তিলক দেওয়া ভোলাভালা লোকজনও। আধুনিক প্রজন্মের তো জাত যায়-যায় অবস্থা। গেট ভেঙে যেন ঢুকে পড়বে সবাই। কী করা যায় এই ভিড় থেকে রেহাই পেতে? কীভাবে তাড়ানো যায় এত লোক? কী মতলব আঁটা যায় সবাইকে বের করে প্রপার স্ক্রিনিং করে লোক ঢোকানোর? চ্যাংড়া এক বান্দা মাইক্রোফোনে ঘোষনা দিল, মিস্টার প্যাটেল, ইয়োর টয়োটা ক্যামরি হেডলাইটস আর অন। মুহূর্তে ফ্লোর খালি হয়ে গেল। প্রবাসীমাত্রই এই ক্যামরি-প্রীতির সাথে পরিচিত। খেতু থেকে জাতে উঠতে চাইলে ক্যামরিবিনা চলতে হয়। তেলে নাহয় কম মাইল গেল, গাড়িও নাহয় বসে গেল বছর সাতেকের মাথায়। তবু নিশ্চয়ই খ্যাৎ থাকবেন না আপনি?

৬. ব্যবহার শেষে গোল বোতাম টিপুন
জনৈক বড়ভাই মাত্র এলেন দেশ থেকে। বলছিলেন এমিরেটস’এর টয়লেটের কথা। ঢুকেই নাকি বিশাল এক সাইনবোর্ড। বড় বড় হরফে একেক ভাষায় আকুতি জানানো হয়েছে, ব্যবহার শেষে যেন কোন এক গোল বোতাম টিপে দেওয়া হয়। ইংরেজি তো আন্তর্জাতিক ভাষা, তাই ক্ষমা করে দেওয়া যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশ, তাই তাকেও কিঞ্চিৎ ক্ষমা করা গেল। তাই বলে বাংলা, হিন্দি, বা থাই ভাষাকে ক্ষমা করি কীভাবে? শুভ্র, সুন্দর একটা জায়গা বিশ্রী রকম ময়লা আর দুর্গন্ধযুক্ত করে আসার পর কারো যদি পানি ঢালার কথা খেয়াল না থাকে, তাদের জন্য কীই বা করার আছে বেচারা এয়ারলাইন্সের? ভাই সাহেব বলছিলেন, কোন জাতি কতটা সভ্য, বা সভ্য বলে পরিগণিত, তা জানার উপায় এমিরেটসের টয়লেট ঘুরে আসা। সাইনবোর্ডের ভাষাই যা বলার বলে দেবে।

৭. জান, জানু, জান্টু, জানেমান
আমার মা আদরে-আবদারে বাবাকে ডাকে ‘এই’। নাটকে দেখতাম ঝন্টুর বাবা জাতীয় কিছু, আর সিনেমায় লক্ষ্মী। স্থান-কাল-পাত্রান্তরে ওগো, হ্যাগো, সোনা, জাদু, হানি, ডিয়ার, সুইটি, লাভলির চলও প্রচুর। আমি কোনদিনই তাল খুঁজে পেতাম না এই সম্বোধনযুদ্ধে। নিতান্তই দৈবদুর্বিপাকে একটা বান্ধবী জুটেছিল জীবনে। পাখি আসতে আসতেই ফুরুৎ করে উড়ে চলে গেছে আরেক গাছে। তার এক বিশাল অভিযোগ ছিল তাকে জান বলে না ডাকায়। আমি বলেছিলাম গোপাল ভাঁড়ের ছেলের গল্প। বাজারের কোণায় দাঁড়িয়ে যেই সুপুত্র ‘গোপাল বাবা, গোপাল বাবা’ বলে চিৎকার করে গোপালের গাট্টা খেয়েছিল। ছেলের যুক্তি ছিল, বাবাকে যেমন নাম ধরে ডাকা যায় না, তেমনি ভরা মজলিশে স্রেফ বাবা বলে ডাকা যায় না। অতঃপর গোপাল বাবা ও গোপালের গাট্টা। না, পোষালো না। ভালবাসা তর্কের উর্ধ্বে হলেও আগ্রাসনের উর্ধ্বে নয়। বলেছিলাম আজকাল যে-সে জান ডাকে, কোন স্যাঙ্কটিটি নাই এধরনের গণসম্বোধনের। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আমার এককালীন পাখি এখন বেশ জানময় হয়ে আছে। ওহ, জানের সাথে আই লাভ ইউ’ও যুক্ত করে দিতে হয়। নাহয় আম-ছালা সব যাবে। অন্তত এই লাইনে আর খ্যাৎ নই, যদিও একটু বেশিই ক্ষতি হয়ে গেছে শিখতে শিখতে।

৮. খুউউঅল
না, শব্দটা কুল না। ক্যুল, কিউল, এবং কুঅল এর মাঝামাঝি উচ্চারণ হবে, আর ক-কে খ করে দিতে হবে। বহুমূল্য এই শিক্ষাকে পথের পাথেয় হিসেবে বিবেচনা না করলে এযুগে অযথা খ্যাৎ বলে গণ্য হবেন। যেকোন প্রকার সুন্দর ও সমর্থনযোগ্য ঘটনার পরেই এই শব্দ উচ্চারণ করতে হয়। সম্ভব হলে একই সাথে হাত মেলাতে হয় কিংবা পিঠ চাপড়ে দিতে হয়। ভালকে ভাল, সুন্দরকে সুন্দর, বা সুস্বাদুকে সুস্বাদু বলবার দিন আর নেই। সকল প্রকার ধনাত্মক বিশেষণের প্রতিস্থাপনের জন্য তৈরি শব্দ। আরেকটু জাতে উঠতে চাইলে বাক্যের আগে-পিছে-মাঝে-ভাজে লাইক যোগ করে বাক্যটি পরিবেশন করুন। কাজে না লাগলে পয়সা ফেরত।

৯. বোতলে বোতলে সুখ
আমি কোকাকোলার এক অন্ধ ভক্ত। প্রেমে পড়ার সময়টুকু বাদ দিলে আমার পঁচিশ বছরের জীবনে একমাত্র আসক্তি হল কোক। নানার বাড়ি বেড়াতে গেলে আমাকে দেখেই পাড়ার মুদির দোকানদার দুই বোতল কোক বের করে ফেলতো। ছয় টাকা বোতল দিয়ে শুরু, আজ এই প্রবাসে পঁয়ষট্টি সেন্ট ক্যান পর্যন্ত গিলে চলছি। চাবি নিয়ে ঘুরবার মত হিম্মত হবার পর থেকেই একটা বটল-ওপেনার থাকতো রিঙে। নেহায়েত আমার মত কুদ্দুস হয়ে না থাকলে কখনো বিয়ারের ক্যান এই ধরনের ওপেনার দিয়ে খুলতে যাবেন না। বিয়ার বস্তুটাই বেহুঁশ করার জন্য। সমুদ্র সৈকতে লোকে জামা-কাপড় ফেলে গেলেও বিয়ারের বোতল নিয়ে যায়। আমি বুঝে পেতাম না, যারা কাপড় ছাড়া সমুদ্রের পাড়ে যায়, তারা কীভাবে খেয়াল করে ওপেনার নিয়ে যায় সাথে করে? কালে জানলাম, বিয়ারের ছিপি খালি হাতে মোচড় দিলেই খুলে যায়। পকেটের ওপেনার বের করে রেখেছি তার পর থেকে। দারু না খেয়েও খেতুর গাল যে কত খেয়েছি, তাই ভাবি। খ্যাৎ, খুব খ্যাৎ।

১০. খেতু খ্যাদাও, দেশ বাঁচাও
যাক, এমনি করে এগুলে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে যাবে। থাকুক নাহয় এটুকুই। যুগের সাথে সাথে দর্শনের পরিবর্তন দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাওয়া অনেক খেতুর একজন হয়েই নাহয় থেকে গেলাম। সব মানুষ আধুনিক হলে কি আধুনিকের মর্যাদা থাকে? নাহয় আমাকে দেখেই সবাই জানলো খেতু হবার জ্বালা কত। কীই বা ক্ষতি শখের বশে জগাখিচুড়ি গিটারিস্ট না হলে? কীই বা আসে-যায় ব্রেসিঙের যন্ত্রণায় যাবার বদলে দুটো বাঁকা দাঁত নিয়ে বসবাস করলে? জগতের তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না আমি স্রেফ একটা মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে। আমি নাহয় শাহরুখের মত বুক-ফারা জামা না-ই পড়লাম। সাম্প্রতিক ইন্ডিয়ান আইডলের চেয়ে নাহয় সিএনএন-এর অ্যান্ডারসন কুপারকেই বেশি চিনলাম। কে বলেছে বাক্যপ্রতি গোটা চারেক ইংরেজি শব্দ না বলে বাঙ্গালি হওয়া যায় না? আমি শার্ট প্যান্টে গুঁজে পড়লে কার কী?

অপঘাত ও কিছু বানরের কীর্ত্তন

১.
সাদ্দামের দুই পুত্রকে মনে আছে? উদে ও কুসে। আনাড়ি হাতের কসমেটিক সার্জারির পর মোটামুটি ভদ্রস্থ চেহারার এই দুই পশুর মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়েছিল মিডিয়াকে। এক ভাইয়ের বুকে লোহিত সাগর তো আরেক ভাইয়ের মুখের উপর দিয়ে রাজধানী এক্সপ্রেস। কাফনের কাপড় পড়ানো অবস্থায়ও মানচিত্রসুলভ বিভিন্ন আঁকিবুকি ছিল তাদের দেহে। একেকটি ক্ষত দেখে নিশ্চিত ভাবে বলে দেওয়া যায় তাদের আহত হবার ধরন ও কারণ।

পত্রিকার রিপোর্টের এক কোণায় ছোট্ট করে লেখা ছিল মৃত্যুর সময় তাদের সাথে থাকা বিভিন্ন জিনিসের তালিকা। একটি করে বন্দুক, সুগন্ধী, ব্যবহৃত কন্ডম, বাড়তি মোজা। জ্বী, আমিও ঝাকি খেয়েছিলাম। কোথায় যেন পড়েছিলাম, একজন মানুষ মৃত্যুকালে তার সাথে কী কী পাওয়া যায়, তা দিয়ে তার সারা জীবনের মানচিত্র খুব সহজে এঁকে ফেলা যায়। অব্যর্থ প্রমাণ পেয়ে গেলাম যেন।

২.
অপঘাতের ক্যাম্পাস হিসেবে ভার্জিনিয়া টেকের বেশ সুনাম হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। এই শরৎ পর্যন্ত পরপর তিন সিমেস্টার ধরে ক্যাম্পাসে কোন না কোন অপঘাতের ঘটনা ঘটলো। আমেরিকার সবচেয়ে নিরাপদ দশটি শহরের একটি হিসেবে বিশেষ গর্ব ব্ল্যাক্সবার্গের। সেখানে আচমকা এমন শনি লাগার কারণ কী কে জানে।

শুরুটা ছিল ২০০৬’এর শরতে। এক পাগলা খুনি জেল ভেঙে পালিয়ে গেল। মনে তার অসীম অশান্তি। শান্তি আর জ্ঞানের আলোর টানেই সম্ভবত সেই ব্যক্তি এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকলো ক্যাম্পাসে। একাকিত্ব ঘোচানোর চেষ্টায় আরো কিছু মানুষকে জড়িয়ে ফেললো তার এই প্রয়াসের সাথে। ফলাফল, ক্যাম্পাস লকডাউন করে এই উন্মত্ত সিরিয়াল-কিলারকে খুঁজে বেরানো।

এর পরের ঘটনা জগৎ-বিখ্যাত। সাং-হুই চো নামে এক বিপ্লবী ব্যক্তি সাম্যের বাণিতে আদিষ্ট হয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিলেন। বড়লোক বাপের বখে যাওয়া ছেলেপুলের বাড়াবাড়ি নিয়ে আমাদের সবার চাপা ক্ষোভ ও হিংসাকে অসামান্য নৈপুন্যের সাথে চো সামনে নিয়ে এলেন। শুইয়ে দিলেন ৩১ জনকে। কিছু সুন্দরীর ছবি দেখে মনে হচ্ছিল, বেকুবটা শোয়াতেও জানে না! হয়তো বাচ্চা মেয়েদের দিকে ব্যারেল-বুলেট তাক করার খুব আক্ষরিক অর্থ করে ফেলেছিল বেচারা। রাগলেও কিছু করার নেই। আমার অচল মস্তিষ্ক এগুলোই করে দিনভর। পরেরটুকুর জন্য নাহয় শক্তি জমিয়ে রাখুন।

৩.
তৃতীয় ঘটনা এই শরতেরই। আমার দুইটা হোমওয়ার্ক এক সপ্তাহের ওভারডিউ। দুশ্চিন্তায় কাতর হয়ে ফিফা ২০০৮ খেলছিলাম তুমুল উৎসাহে। এরই মধ্যে আমার রুমমেট ফোন করলো। ব্রাদার, সুইসাইড কেইস। লাফ দিসে নাকি লাউঞ্জ থেকে। চ্যাটকায় গেসে কিনা জানি না। দেখতে যাবা?

মুহূর্তের মধ্যে ঘরের সবাই যে যেই অবস্থায় আছি দৌঁড়ে বের হলাম। সাকুল্যে ৫ জন। তাজ্জব ব্যাপার হল, প্রত্যেকেই কোন না কোন কারণে দরজা থেকে ফিরে ঘরে গিয়েছিলাম। মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ বলে কথা। জরুরী কিছু কি ফেলে গেলে চলে? আমরা পঞ্চ-বান্দর আমাদের যক্ষের ধন সমেত সেই ডর্মের কাছে গেলাম মিনিট পাঁচেকের মাঝেই। জানতে পারলাম যে মৃত্যুর পেছনে আত্মহত্যা, নাকি অসাবধানতা দায়ী তা নিশ্চিত করে জানার উপায় নেই এই মুহূর্তে। তবে বিশেষ কসরত ছাড়া ঐ লাউঞ্জ দিয়ে বের হওয়া দুষ্কর। জানলাম যে ১৯৯০’এর দশকে এরকম বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। সম্ভবত একটি বছরে তিন জন ছাত্র এক কাতারে না হলেও কাছাকাছি সময়ে ঝাপ দিয়েছিল।

৪.
মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে পরের দিনগুলোয় পত্রিকা মারফত জেনেছিলাম কিছু। অপঘাতের হ্যাটট্রিক নিয়ে বেশ গর্বিত ছিলাম সবাই। এর মাঝেই খেয়াল হল বানরকূলের শেষ লাফগুলোর কথা। যদি ঠিক সেই অবস্থায় মারা যেতাম আমরা, তাহলে অচেনা কারো চোখে আমাদের জীবনের মানচিত্র কেমন হত?

দামাল ক্রিকেটার হাইব্যা মৃত্যুর পূর্বে বান্ধবীর কাছে তিন হাত ঘুরিয়ে একটি সাংকেতিক বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ঘরে ফিরে সাপ্লাই-ডিমান্ডের অন্যায্য স্থিতির কারণে বঞ্চিত হবার ভয়ে তিনি ভনেজের একটি ফোন সেট হাতে নিয়ে বের হয়ে আসেন। তার পরণে ছিল থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও স্যান্ডো গেঞ্জি। ইয়ো! লাশদর্শনের পর আড়ষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে তিনি কিছু ব্যাক্তিগত কাজ দ্রুত সেরে নেন।

কুদ্দুস বের হবার আগে বক্সিং গ্লাভস না নিলেও চুল আঁচড়াতে ভোলেননি। উপরে উপরে কোলেস্টরেলের দোহাই দিলেও তিনি সম্ভবত ভিন্নতর কোন কারণে মাত্র চার মাসে ৫০ পাউন্ড ওজন কমানোর মত মহাযজ্ঞে মেতেছিলেন। বহুকাল পর ডর্মের সামনে যাওয়া এবং সেখানে ভেকেটেড অবস্থায় অপ্রস্তুত বসনে সজ্জিতা নারী হয়তো তার এই শেষ প্রসাধনে উপসর্গের ভূমিকা পালন করে থাকবে। স্বাভাবিক অবস্থায় স্যান্ডেলনির্ভর কুদ্দুসকে এদিন কেডস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।

অ্যাজমারোগী মোখলেছ প্রথমাবস্থায় উৎসাহের আতিসজ্যে জুতা-স্যান্ডেল ছাড়াই রওনা দিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে তাকে স্তূপ থেকে জুতা ও জ্যাকেট বের করতে দেখা যায়। এসময় তার কাছে ইনহেলার না থাকলেও একটি ফোন সেট ছিল। ধারণা করা যায় যে তিনিও বিশেষ কারণে দেশের সাথে প্রচুর যোগাযোগ বহাল রাখেন। তার হাতে একটি লাঠি পাওয়া গেলেও কোন উল্লেখযোগ্য পূর্ব-বেদনা দেখা যায়নি।

গাঞ্জুট্টির সাথে গাড়ির চাবি থাকলেও মোবাইল ফোন কিংবা ওয়ালেট ছিল না। তার ঊর্ধাঙ্গে ছিল একটি সাদা গেঞ্জি, আর নিম্নাঙ্গে ছিল একটি লাল বক্সার। গালে অনিঃশেষ দাড়ি থাকলেও তার পায়ে ছিল লেডিস চপ্পল। গাড়ির চাবির সাথে রিট্র্যাক্টেবল লাইটার থেকে ধারণা করা যায় তিনি বায়ুর পূজারি। তার হাতে একটি হ্যান্ডিক্যাম ছিল যাতে বিভিন্ন পার্টিতে তোলা নিরুদ্দেশ ভিডিওর সম্ভার মেলে।

বিল্লাল তাঁর লাল-নীল স্কোয়্যারবিশিষ্ট শার্টটি পরিধান করে সারতে পারেননি। রান্নার গন্ধের কাছে আস্ত একটি জ্যাকেট সঁপে দিলেও তিনি এই শার্টটিকে আগলে রেখেছিলেন। বাম পায়ে সজোরে বেঁধে রাখা পট্টি বিশেষ ইঙ্গিত করে যে তিনি মৃত্যুর কিছুকাল আগে পায়ে আহত হয়েছিলেন। খাবার সময় তিনি প্রচুর পানি পান করতেন, নয়তো পাহারাদার পুলিশ-কন্যা তাঁকে ব্যাপক মাত্রায় আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করেছিলেন। তার পকেটে অস্বাভাবিক পরিমাণ কিটক্যাট পাওয়া যায়। তাঁর ডান হাতের কিছু আঙুল অতিব্যবহারে বেঁকে থাকলেও বাম হাতে একটি পাঠ্যবই ও একটি কলম ছিল। মৃত্যুকালে তিনি ছোট ডায়েরি, কলম, চ্যাপস্টিক, রুমাল, ওয়ালেট, ফোন, চশমা, নকল দাঁত সহ অনেক হাবিজাবি বহন করলেও কোন টাকাপয়সা বহন করছিলেন না।

চ্যাটকানো মগজের অনুপস্থিতি, লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, এবং ঘটনাস্থলের বেশ অনেক গজের মধ্যে কাউকে ঢুকতে না দেওয়া সহ বিবিধ কারণে প্রাথমিক উদ্যোক্তা লিয়াকত তাঁর বান্ধবীর হোমওয়ার্কে পুনরায় মনোনিবেশ করাই উত্তম বলে বিবেচনা করেন।

ওওওওওবামা!

ইতিহাসটা শেষ পর্যন্ত হয়েই গেল।

স্বপ্নের রাজনীতি পৃথিবীতে বিরল না। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান বিখ্যাত 'মর্নিং ইন অ্যামেরিকা'য় স্বপ্ন দেখেছেন ছোট্ট পাহাড়ের উপর সুন্দর সূর্যোদয়ের। অন্য প্রান্তে বাংলাদেশের পতিত স্বৈরাচার স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে পীরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। বিপরীতে আশার রাজনীতি বিরল। প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থাকলেও আশার রাজনীতি ছিল না।

পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজনীতিকই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আদর্শের কথা বলে গেছেন। প্রতিরোধ ছিল, প্ররোচনা ছিল, প্রলোভন ছিল। রাজনীতির প্রান্তরে বহু রাজনীতিক সত্ত্বা বিসর্জন দিয়ে গেছেন। এব্রাহাম লিংকনের মত একজন মানুষ বদলে দিতে পেরেছিলেন একটা প্রজন্ম। বহুকাল পর ইলিনয় আবারো পৃথিবীর রাষ্ট্রপতির আসনের জন্য কাউকে পাঠাল। প্রথম ঝাড়ুদারের মত করেই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ জিতলেন প্রাইমারি ইলেকশন।

যুদ্ধবাজি, টাকার খেলা, আর হুমকি-ধামকির মুখে আদর্শ আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা যায় আজও। তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষগুলোর নগণ্য অনুদানের টাকায় গড়ে তোলা ক্যাম্পেইনে সঙ্গী ছিল শুধু আদর্শটুকুই। ভাবতে অবাক লাগে। এযুগেও সম্ভব?

২০০২ সালে ইরাক যুদ্ধে যাবার বিপক্ষে পথে নামা একজন রাজনীতিক আজকে প্রাইমারি জিতেছেন।

বিনা প্রশ্নে শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে ইরান-কিউবা-উত্তর কোরিয়া সহ সব দেশের সাথে খোলা মনে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবার কাছে নিন্দিত হবার পরেও নিজের মতে অটল থেকেও বারাক ওবামা প্রাইমারি জিতেছেন।

মাঝের নাম 'হুসেইন', বাবা মুসলিম, শেষনাম ওসামা'র কাছাকাছি, ইন্দোনেশিয়ায় শৈশব কাটানো, হাওয়াইয়ে জন্ম নেওয়া একজন ব্যক্তি ফক্স নিউজের নিরন্তর টিটকারি উতরে এগিয়ে চলা রাজনীতিক প্রাইমারি জিতেছেন।

সবদিক থেকে নীতিবান ও সহিষ্ণু থাকার পরও ডেমোক্রেটিক পার্টির সমগ্র এস্টাবলিশমেন্টের বিষোদ্গার সহ্য করে শীর্ষে বারাক ওবামা। বিল ক্লিনটনের মত কাল্ট নেতার কটাক্ষও পারেনি সাধারন মানুষের পছন্দকে নাড়াতে। কৈশরে গাঁজা খাওয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করার পরেও না।

পৃথিবীর মানুষের সমালোচনাগুলো অবশেষে পথ খুঁজে পাচ্ছে আমেরিকার শাসনকেন্দ্রে। বলা হচ্ছে বারাক ওবামা আমেরিকাকে পৃথিবীর উপহার। বলা হচ্ছে সাম্প্রতিক ইতিহাসে পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন তোলার মত সবচেয়ে বড় ঘটনা এই প্রাইমারি ইলেকশন।

২০০৪ সালে জন কেরির ইলেকশনের সময় দেওয়া বিখ্যাত ভাষনে বলা 'দেয়ার ইজ নো রেড আমেরিকা, দেয়ার ইজ নো ব্লু আমেরিকা, দেয়ার ইজ ওনলি পার্পল আমেরিকা'র আহবান নিয়েও জেতা যায়।

অবিশ্বাস্য। অকল্পনীয়। লোমহর্ষক। আশাতীত।

মৌনচিত্র ৪

‘বি দাউ মাই ভিশন, ও লর্ড অফ মাই হার্ট, বি অল এলস বাট নট টু মি, সেইভ দ্যাট দাউ আর্ট...’

আলোটা সুন্দর। কেমন যেন অনধিকার চর্চা হয়ে যাচ্ছে না? কিছু না ভাবলেই হল। হোক দুপুর, তবু রবিবার তো। লোক থাকতে পারে। এত বেশি পাগল হওয়াও কি ঠিক? একদল দসাসই মুসলমান এভাবে গীর্জায় ঢুকে পড়লে পুলিশ ডাকে যদি? গানটা বাড়াবাড়ি রকম সুন্দর। পথ থেকে এমন গান শোনা গেলে যে-কেউ একটু থামতে বাধ্য। যাক, আসলাম যখন, শুনেই যাই আরেকটু। ভেতরে যাব কোন দিক দিয়ে? এতই কি বিধর্মী হয়ে গেলাম যে ভিন্ন বিধাতার অতিথি হয়েও ঢুকতে পারবো না? ওহ, এইতো দরজা!

‘বি দাউ মাই বেস্ট থট, বাই ডে অর বাই নাইট, বোথ ওয়েইকিং অর স্লিপিং, দাই প্রেসেন্স মাই লাইট...’

গানটা চেনা চেনা লাগছে কেমন যেন। হিম্‌ন তো কোনদিন শুনেছি বলে মনে পড়ে না। ছোটবেলায়? নাহ্‌। বাইরে এসেও তো শুনেছি বলে মনে পড়ে না। এক্সাম উইকে মাঝেমধ্যে মুফতে খেতে যেতাম চার্চে, কিন্তু সেখানে তো ডিয়ার লর্ড অ্যান্ড সেভিয়ার জিসাস ক্রাইস্ট ছাড়া কিছু শুনিনি। এটা আইরিশ হিম্‌ন। এটাও তো আমার জানার কথা না। বিদেশি কারো গাড়িতে? কোন রেস্তোঁরায়? কোন ফিউনেরালে? আহ্‌, ডায়ানার ফিউনেরালে। না, ওটায় তো এল্টন জনের গান ছাড়া তেমন কিছু ছিল না। দশ বছর পূর্তিতে! বি দাউ মাই ভিশন! আইরিশ হিম্‌ন!

‘বি দাউ মাই গ্রেট ফাদার, অ্যান্ড আই দাই ট্রু সান, বি দাউ ইন মি ডুয়েলিং, অ্যান্ড আই উইথ দি ওয়ান...’

কুফরি হয়ে যাচ্ছে নাতো? পরের ঘরে গিয়ে কিছু ভাল লেগে যাওয়া কি অন্যায়? উপাসনা করছি না, কিন্তু ভাল লাগছে। কেমন যেন শান্তি। কোন অস্থিরতা নেই, কোন দুশ্চিন্তা নেই। মন চাইছে শুধু শুয়ে থাকি লম্বা বেঞ্চগুলোয়। মুক্তি কি অনুশাসনে, নাকি অনুরণনে? কে জানে। হবে কিছু একটা। গীর্জায় এই প্রথম। এর আগে কখনো নাটকে দেখেছি কাঁটার মুকুট মাথায় যীশুর ছবি, কখনো স্থাপত্যকৌশলের বইয়ে চেয়ে দেখেছি বিভিন্ন যুগের নির্মাণশৈলী, কখনো ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি পেটের দায়ে মহামনীষীদের ভ্যাটিকানের ফরমায়েশমত শিল্প তৈরির কথা। কেন নিজে থেকে ঘুরে দেখলাম না কখনো? সব স্রষ্টাই তো ব্যাপক, মহান। মন ভুলে যাবার ভয়ে কেন মন ভরাবো না?

‘রিচেস আই হিড নট, নর ম্যান’স এম্পটি প্রেইজ, বি দাউ মাইন ইনহেরিটেন্স, নাউ অ্যান্ড অলওয়েইজ...’

বিয়ের মন্ত্রগুলো এত অদ্ভূত সুন্দর হয় কেন? কেন যেন মনে হচ্ছে, মন্ত্রের সৌন্দর্য আনন্দে, বাণিতে না। এত খুশি কীভাবে হয় মানুষ? সাথে তো ক্যামেরা আছে, ছবি তোলা যাবে কিনা কে জানে। কিছু মনে করবে না হয়তো। আচ্ছা, গীর্জায় কি জুতা নিয়ে ঢোকা যায়? দেখে নিলাম নাতো। অজান্তে অবমাননা হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। অসম্ভব উষ্ণ হলদে আলো। লাল-নীল কাঁচের মধ্যে দিয়ে কেমন করে যেন ঠিকরে আসছে রশ্মিগুলো। পরিপাটি করে গোছানো, ছবির মত সুন্দর। ইচ্ছে করছে না কেন যেন ছবি তুলতে। এই স্পর্শ, এই হাসি, এই বিশ্বাস, এই আশার কাছে সব সৌন্দর্য মলিন। কোন জাগতিক শক্তির সাধ্য নেই এই মুহূর্তকে ফ্রেমে বেঁধে রাখে। শুধু মনেই গেঁথে থাকুক। পবিত্র, স্নিগ্ধ, প্রাঞ্জল, জীবন্ত, মৌন।

‘হাই কিং অফ হেভেন, দাউ হেভেন’স ব্রাইট সান, ও গ্রান্ট মি ইটস জয়জ আফটার ভিকট্রি ইজ ওয়ান, গ্রেট হার্ট অফ মাই ওউন হার্ট, হোয়াটেভার বিফল, স্টিল বি দাউ মাই ভিশন ও রুলার অফ অল।’

জুম্মার নামায ও অখন্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলি

বহুদিন পর জুম্মায় যাওয়া হল আজকে। জীবনকে সুন্দর, স্বাভাবিক, ও নির্ভার রাখতে বিশ্বাসের ভূমিকা আমি কিঞ্চিত অনিচ্ছার সাথে হলেও মেনে নেই। আঘাত, হতাশা, আর ব্যর্থতাগুলো অন্যের মর্জির উপর চাপিয়ে নিজের মত জীবন চালাতে পারা নিঃসন্দেহে যেকোন সচেতন মানুষের পরম আরাধ্য। ধর্ম যার যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি মানুষই ধার্মিক। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লে দুষবার মত কাউকে খুঁজে বেরানোতে ধর্ম মিশে আছে। বিয়ান রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বিরক্তির ঝাপটা কারো উপর দিয়ে চালাতে চাওয়া ধর্মের শিক্ষা। অন্ধকারে হাতরে পথ চলতে গেলে প্রতিটি অবয়বের মাঝে সুরাসুরের প্রতিভূ তৈরি করে নেওয়াও ধর্মেরই উপজাত অনুভূতি। জীবনের স্তরে স্তরে তাই সব মানুষই ধার্মিকভাবে কোন না কোন কাজ করে নিজের ক্ষুদ্রতাগুলো ভুলে থাকতে। আমিও ব্যাতিক্রম নই। কেউ হরেক রঙের তিলক দেয়, কেউ সেজদা দিতে দিতে কপালে তিলক এঁকে ফেলে, কেউ হুমায়ূনীয় কায়দায় কাগজ ছেড়ে, কেউ বৌ পেটায়, কেউ গাছের সাথে কথা বলে, কেউ গুনগুন করে। আমি ঘুমাই।

শীবের গীত ছেড়ে এবার ধান ভানায় ফিরি। ক্লাস, কাজ, ঘুম, ইত্যাদির আবেদন অগ্রাহ্য করে সপ্তাহ তিনেক পর আবারো জুম্মায় সামিল হলাম। শীতের ছুটিতে অনেকেই শহরে নেই। মেক-শিফট খতিবের খুতবা শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে ঝিমাচ্ছিলাম। চলছিল কথা ধর্ম নিয়ে। কীভাবে যেন মাঝে ঢুকে গেল ভারতে গরু-পূজা। এর মাঝেই গোবরের ইংরেজি ভুলে ‘আউটকাম অফ দ্য কাউ’ বলে নৌকা ভাসালেন খতিব সাহেব। এমন সময় পাশ থেকে এক বড় ভাই এগিয়ে দিলেন একটি বই। আমেরিকার মসজিদে বাংলা বই দেখে অবাক এবং খুশি হলাম বেশ। লেখক জি, ডব্লিউ, চৌধুরী নামক এক ব্যক্তি। কভার ফ্ল্যাপের ভেতরে প্রথম বাক্যেই পুরো বইটির মেজাজ বর্ণিত -- ‘কেন পাকিস্তান একটি জাতীয় সত্ত্বা অর্জনে ব্যর্থ হল?’ এই ঘরানার বই নিয়ে আমার আগ্রহে কমতি নেই কোনদিন। ইতিহাসের সুদীর্ঘ পরিসরে মানবমনের ভাল-মন্দ সব রকম প্রবৃত্তিই প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের মত এত কম সময়ে নয়। শুরু করলাম পড়া।

সামনের ফ্ল্যাপে সরাসরিই দাবি করা হয়েছে যে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও আধুনিক যুগে এই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি শেখ মুজিব ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর সন্দেহজনক ভূমিকার জন্য। পড়ে অবাক বা আহত হইনি। সামরিক সরকারের সাবেক মন্ত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে দাবিটা অযৌক্তিক নয় মোটেও। কিন্তু কিছু পরেই বের হতে থাকলো আসল রূপ। আইয়ুবীয় গণতন্ত্রের বুনিয়াদ গঠনে বাঙালিদের কোন ভূমিকা না থাকার কারণেই এই বিভাজন। কৌতূহল থেকে পড়ার গতি বেড়ে গেল অনেক।

বক্তব্যগুলো খুব প্রচলিত প্রোপাগান্ডা। শেখ মুজিবকে সরাসরি দেশদ্রোহী, দালাল, আর বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে ডাকা হয়েছে। না, এতেও আমার কোন খেদ নেই। শেষের ফ্ল্যাপের একটি বাক্যে বইটির সারমর্মও নিহিত ছিল -- ‘ইহা কি বাংগালীদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী-দাওয়া মেটাতে অপর্যাপ্ত ছিল, নাকি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংগালীরা ইতিমধ্যেই স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল?’। খুনে, বর্বর, মনুষ্যকূলে-অপাঙ্কতেয় জানোয়ারদের সাথে আলাপচারিতার দায়ে আমি এত ত্যাগের পরও শেখ মুজিবের উপর অভিমান করি। বুকটা বরং হালকা হচ্ছিল। বহু আগে থেকেই ভারতের সাথে যোগাযোগ, চীন-পাকিস্তান-আমেরিকা আঁতাত সম্পর্কে সজাগ করে দেওয়া, বাড়াবাড়ি রকম দেরি ও ঝামেলা হবার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য প্রত্যাশা না করা, ইত্যাদি ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতিগুলো অনেকটাই মুছে দিল সেই জ্বালা।

খতিব সাহেব গরুর পিন্ডি চটকাতে একটু বেশিই ব্যস্ত ছিলেন। ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে নামাযের সময় পেরিয়ে এগিয়ে চলছে। ঢুকে পড়লাম বইয়ের ভেতর। হাইলাইটার দিয়ে দাগিয়ে দাগিয়ে পড়া। দেখে ভালই লাগলো। ভিন্ন মতের বইগুলো খুঁটিয়েই পড়া উচিত। এই ঘি বেশিক্ষণ সইলো না। ভেবেছিলাম কোন পাগলা জেনারেলের সিএসপি সাগরেদের আত্মজীবনী স্রেফ অনুবাদ করেছেন কেউ। ভেতরে অনুবাদকের কথা পড়ে সেই ভুলের পাহাড় ধূলায় মিশে গেল। শুরুতে বলা হল পাকিস্তান সৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তানী তথা বাঙালি মুসলমানদের অধিকতর ভূমিকা রাখার কথা। তারপর শুরু হল ধোলাই। একজন ‘সাধারণ বাংলাদেশী’ নাকি প্রোপাগান্ডার চাতুরিতে এটুকুই জানেন যে ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া এবং ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চের ‘পৈশাচিক আক্রমণের ফলেই’ বাংলাদেশের জনগণকে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হয়েছিল। মূল বইটি পড়ে অনুবাদকের উপলব্ধি হয়েছে যে ‘বর্তমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্বন্ধে যে লেখকই যাই লিখুন না কেন তা ভরপুর থাকে প্রবল ভাবাবেগ রসে’। আরো কিছুদূর এগিয়ে তিনি খোশমেজাজে জানান দিলেন যে ‘লেখকের এ বইটি পড়ে [তাঁর] মনের অনেক প্রশ্নেরই সমাধান হয়েছে’। আমিও তৎক্ষণাৎ নিজের মনে গোলাম ওয়াহিদ চৌধুরী সাহেবের কোন এক নিকটাত্মীয়ার উপপতি থেকে খুশি মনে সিদ্দীক সালাম সাহেবের অন্ত্র-বিশেষ আলোকিত করতে লেগে গেলাম।

শেষ পর্যন্ত অনুবাদক সবক দিলেন যে ‘ঐতিহাসিক ঘটনাকে সত্যতার সাথেই জানতে হয় তা তিক্ত হলেও’। আরো জানালেন যে তিনি পাঠক হিসেবে তাঁর ‘তৃষ্ণা’ নিবৃত্ত করতে সক্ষম হয়েছেন এই বই পড়ে। শেষ ডিসেম্বরে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে আমি মনে মনে বললাম শুধু, তোর তৃষ্ণা কীসে মিটেছে তা গলা থেকে বের করে দেখ্‌, ছাগল।

বইটি ১৯৮৯ সালে লিখিত। ‘হক কথা প্রকাশনী’ নামক কোন এক আস্তাকূড় থেকে প্রকাশিত ১৯৯১ এর জানুয়ারিতে। কোন এক সচেতন বাঙালি কালের প্ররোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এক সাজানো গৃহযুদ্ধের ইতিহাস উন্মোচিত করেছেন। হাজার রঙে দাগিয়ে এই বই পড়েছেন আরেক সহৃদয় বাঙালি। বিশ্বাসের গতি-জড়তায় যদি এর কিছুমাত্রও গিলে ফেলি, সেই আশায় পাঠ শেষে অত্যন্ত উদার ভাবে তা গছিয়ে রেখে গেছেন মসজিদের লাইব্রেরিতে।

বইটি জ্যাকেটের ভেতরে করে নিয়ে এসেছি। খোদার ঘরে মনে মনে বলাৎকার করেছি। তাও আবার বেগানা পুরুষ মানুষকে ভেবে। দেবার জায়গা থেকে চুরি করে ভেগেছি। বিনিময়ে যেই নরক-যন্ত্রণা কপালে জুটালাম, তা অমৃত-সমান হবে; যদি পরবর্তীবার কোন বুকশেলফের সামনে গেলে আপনারাও খুঁজে দেখেন এমনি করে ঘাপটি মেরে থাকা কোন বই আছে কিনা।

প্রবাসের কথোপকথন ১১

“এত দেরি যে? ফোন পাসনি নাকি?”
- পেয়েছিলাম, কিন্তু একেক জন একেক জায়গায় ছিলাম। এক গাড়িতে আসলাম দেখে একটু সময় লেগে গেল। তার উপর ডাউনটাউনে ফায়ার সার্ভিসের দুইটা ট্রাক রাস্তা বন্ধ করে গান গাচ্ছে। ঘুরে আসতে হল অনেকটা পথ। এখনো কি ওটি-তে আছেন, নাকি বের হয়েছেন?

“ভাই-ভাবি দু’জনাই কেবিনে এখন। ভাইয়ের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, আর ভাবি খুব শকড মনে হচ্ছে।”
- স্বাভাবিক। অ্যাক্সিডেন্ট জিনিসটা একটু আপসেটিং এমনিতেই। তার উপর এটাই তো বোধহয় প্রথমবার। ড্রাইভিং শিখতে গিয়ে হয়েছে শুনলাম অ্যাক্সিডেন্ট?

“হ্যাঁ। ভাবি টার্ন নেওয়ার সময় নাকি ভাই বকছিলেন। ওতে নার্ভাস হয়ে গ্যাসে পা পড়ে গেছে। গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা খেয়েছে একটা গাছে। দু’জনের কারোই জ্ঞান ছিল না। পুলিশের গাড়ি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখে ৯-১-১ কল করেছে।”
- আউচ। আগলি অ্যাক্সিডেন্ট। তো আপনারা খবর পেলেন কীভাবে?

“পুলিশ ওনাদের বাড়ি গিয়েছিল। বাচ্চারা আমাদের ফোন করে দিলো, তখন পুলিশের কাছে শুনলাম।”
- বাসায় বড় কেউ ছিল না? সে কী কথা, ভাইকে কাজ থেকে আনতে ভাবি যাবেন, ভাল কথা, কিন্তু বাচ্চাদের ঘরে রেখে যাবেন কেন? আপনার বাচ্চাও ছিল? আপনিও কীভাবে রেখে গেলেন গিয়ে?

“আমি তো জানি না যে উনি বাইরে যাবেন। আমি নিজেই ছিলাম হাসপাতালে। ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম। ডাক্তার আমার অবস্থা দেখে ধরে-বেঁধে ভর্তি করিয়ে দিল। এর মধ্যে এই হাঙ্গামা। এই যে দেখো, স্যালাইন ধরে ধরে ঘুরছি। পুলিশ নাকি জিজ্ঞেস করেছিল বাসায় বড় কেউ নেই নাকি। তখন একজন বলে ফেলেছিল যে প্রায়ই এভাবে রেখে চলে যায় বাইরে।”
- পুলিশ এটা নোট করে নিয়ে গেছে? তাহলে তো সমস্যা হবে পরে অনেক। না, শেরিফের মর্জির উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কিছু করার নেই এই মুহূর্তে। কোন যুক্তি দিয়েই এটা মানানো যাবে না। তের বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের একা রেখে গেলে বাচ্চার কাস্টডিই তো নিয়ে নেবে পুলিশ। সবচেয়ে বড়টা তো মনে হয় নয় বছরের ছিল। ঝামেলা হয়ে গেল। চিকিৎসার ধকল কাটলেই এই ধাক্কাটা আসবে। ওনাদের কিছু বলেননি তো এখনো, নাকি?

“নাহ, মাথা খারাপ? এমনিতেই তো বেশ নাজুক অবস্থা। অ্যাক্সিডেন্ট তেমন মেজর ছিল না। গাছে বাড়ি খেলেও মূল সমস্যা হয়েছে এয়ারব্যাগে। ওটার প্রেশারে মুখের বিভিন্ন জায়গায় ফেটে গেছে। ভাইয়ের তো মুখ-ঠোঁট ফেটে গেছে অনেকটা। ভাবির চেহারা দেখেও চেনার উপায় নেই। অয়েন্টমেন্ট দিয়ে রেখেছে। ভাই একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, তবে ভাবি বেডে।”
- একটু শেকেন-আপ হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। পুরো শহরই তো দেখি চলে এসেছে দেখতে। কী অদ্ভুত না এই ব্যাপারটা? দেশে একবার রাস্তার পাড়ে একটা লোককে খুলি-ফাটা অবস্থা পরে থাকতে দেখেছিলাম। নির্বিকার ভাবে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেছিলাম। অথচ সাপের খেলা দেখতে দাঁড়িয়ে যেতাম যত্রতত্র।

“বিদেশের বাড়িতে তো স্বদেশী মানেই আত্মীয়। আমরা একজন আরেকজনের দুঃখ-কষ্টে পাশে না দাঁড়ালে তো চলে না। না রে, ভাবি তো বেশ কিছুদিন ধরেই চালান। খুব একটা আনাড়ি ড্রাইভার না। নতুন শিখছিলেন আর কি। এখনো ফুল লাইসেন্স নেননি। কিছুদিনের মধ্যেই নিতে যাবার কথা। এখন তো আর মনে হয় না ও’পথে পা বাড়াবেন।”
- ভাই বকছিলেন বললেন। কী নিয়ে বকছিলেন?

“টার্ন নেওয়ার সময় এক হাতের উপর দিয়ে আরেক হাত আনা না কী নিয়ে যেন বকছিলেন। আচ্ছা গাড়িটা ঘুরলেই তো হল, নাকি? এর মধ্যে এত ঝক্কি করা কেন?”
- এবার বুঝেছি। ভাইয়ের জায়গায় আমি থাকলে আমিও বলতাম ওটা নিয়ে। মেয়েদের শেখাতে গেলে এই সমস্যাটা হয় প্রায়ই। টার্ন করার সময় এক হাতে হুইলটা ঘুরিয়ে অন্য হাতে ওটা টেনে আনলে কন্ট্রোল বেশি থাকে। বিশেষ করে হাইস্পিডে। ছেলেরা এক টানে এই কাজটা করে, মেয়েরা বেবি-স্টেপস নিয়ে একটু একটু করে হুইল ঘোরায়। রাস্তার সব গাড়ি তো আর এক তালে চলে না। আচমকা হর্ন খেলে তখন নার্ভাস হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। এই গলদটা গোড়ায় না শুধরালে পরে সমস্যা হয়।

“তুইও? তোদের সমস্যাটা কী বলতো? ড্রাইভিংয়ের সময় এভাবে একটা মানুষকে ধমকের উপর রাখলে সে চালাবে কীভাবে?”
- ধমক আলাদা ব্যাপার। আমি টেকনিকের কথা বলছিলাম। ধমকাধমকি হয় বরের কাছে ড্রাইভিং শিখতে গেলে। এজন্য আজকাল মেয়েরা অন্য কারো কাছে শেখে ড্রাইভিং। এক আন্টির কথা জানি যিনি রাস্তার মাঝে নেমে গিয়ে বলেছিলেন যে ড্রাইভিং শিখলে সংসার টিকবে না, এর চেয়ে উনি টাকা দিয়ে শিখে নেবেন বরং। শেষতক তাই করলেন।

“একদম ঠিক কাজ। এইটাই দরকার। হাসব্যান্ডের কাছে কিছু শেখা মানেই ঘরে অশান্তি। কত আশা নিয়ে শিখতে যাই, কিন্তু বকাঝকার চোটে পুরো দিনটাই মাটি হয়ে যায়। সবটাতেই শুধু ভুল ধরা আর বকা দেওয়া। আরে বাবা, আমরা ড্রাইভিং জানি না দেখেই তো শিখতে চেয়েছি, নাকি? এর মধ্যে এত তুলকালাম করার কী দরকার?”
- আপনার রাগের কারণটা বুঝতে পারছি, কিন্তু আমার বৌয়ের সাথে আমিও হয়তো একই কাজ করে বসবো। ব্যাপারটা এত খারাপ ভাবে না দেখলেও চলে। সব বরই চায় তার বৌ সব দিক থেকে পারফেক্ট হোক। এই চিন্তাটা এপ্রিশিয়েট করলে পারেন। তবে হ্যাঁ, আমি নিজেও এখন বলি যেন ভাবি-বৌদিরা বরের বদলে আমাদের কাছে শেখেন। লাভের মধ্যে আমরা কিছু বাড়তি খানা-পিনা পাই, আপনাদেরও বকাঝকা শুনতে হয় না।

“এই দিকে আজমীর সবচেয়ে ভাল। ওর গাড়িতে শেখার সময় অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেলেও ও খুব শান্ত থাকে। একবার তো এক বৌদি রাস্তা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আরেকজন তো পার্কিং লটেই আরেক গাড়িতে মেরে দিলেন। তবুও ও একদম শান্ত ছিল।”
- শয়তানের নাম নিতেই হাজির! জ্বী, পরে কথা হবে। আমি ওদিকে যাই। কী হে বান্দা, তুমি তো দেখি বেশ পপুলার ইন্সট্রাক্টর। সবাই তোমার শেখানোর নাম করে এত। তিন তিনটা রেকলেস ড্রাইভিংয়ের টিকেটের কথা জানে না নাকি কেউ?

“আরে জানে, জানে। আমি তো বলেই দেই, আই ডোন্ট ড্রাইভ ফাস্ট, আই ফ্লাই লো। প্রথম দিকে পুলিশ কোথায় থাকে সেটা না বুঝেই টানতে গিয়ে টিকেট খাইলাম এত্তগুলা। এখন আর ভুল হয় না। শুনবা আমার ড্রাইভিংয়ের গল্প? শুনো তাহলে...”

আয়না

১.
প্রবাস জীবনটা যেন আয়নায় ভরা। দেশে থাকতে কোনদিন খুব একটা আয়না দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাইরে আসা অবধি তাই ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন আয়নায় নিজেকে দেখার বিব্রতকর অভিজ্ঞতার সাথে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করে চলেছি। দেশের আয়নাগুলোর ধরন ও অবস্থান আগেই জানা থাকতো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালে বেহায়া সিঁথি, টয়লেটে গেলে উঠতি ব্রন, টার্মের পর হাতে পাওয়া রিপোর্ট কার্ড, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পর বাবার ‘শান্তি হয়েছে?’, শুক্রবার দুপুরে মাংসের বদলে সবজি দেখে উঠে যাওয়ার সময় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা মায়ের চোখ, তুচ্ছ কারণে গায়ে হাত তোলার পরও কুঁকড়ে থাকা কাজের ছেলেটার পিঠের কুঁজ, তিন টাকা ভাড়ার পথের রিকশা ধরার সময় পাশে দাঁড়ানো দারোয়ান চাচার নিঃশব্দে সরে যাওয়া, এরকম কিছু সহজে-উপেক্ষ আয়না ছিল আশে-পাশে।

প্রতিফলক হরদম মিলতো, আয়না ছিল এরকম অল্প কিছু। সব প্রতিফলনকে মানুষ ‘জাজমেন্টাল’ দৃষ্টিতে দেখে না, সেজন্যই সব প্রতিফলক আয়না না।কে জানে, খেয়াল করলে হয়তো অনেক কিছুই দেখা যেত এই চোখে। প্রবাসে এসে জীবন সীমিত হয়ে গেছে। যাবার জায়গা কম। কথা বলার লোক কম। বাসে চড়লে মন খুলে কথা বলা যায় না, রেস্টুরেন্টে বসলে বেশরমের মত খাওয়া যায় না। অনেক ঝক্কি। অনেক ভেবে চলতে হয়। অনুভূতিগুলো অনেক বেশি তীক্ষ্ণ যেন। নিজেকে উজার করে দেওয়া এত বেশি কঠিন বলে এই চূড়ান্ত বহির্মুখী আমিও আর সবার মত অন্তর্মুখী জীবন যাপন করে চলি। এর উপজাত হিসেবেই যেন চারপাশে এত আয়নার আধিক্য। যে-হারে নিজে অন্যকে বিচার করি, সে-হারে অন্যরা আমাকে বিচার করে হয়তো। হয়তো প্রতিটা দৃষ্টিবিনিময়ই একবার করে আয়না-দর্শন।

মনে পড়ে ২০০৫এর শীতে দেশে যাবার কথা। কুয়েত এয়ারওয়েজে গিয়েছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রাবিরতি মানেই স্বজাতি ভাইদের কুলিগিরি করতে দেখা, বিমানবন্দর ঝাড়ামোছা করতে দেখা। অনেকেই সুপারভাইজরের চোখ এড়িয়ে এসে দু’কথা বলে যেতেন। কারো মুখে রাজনীতির কথা, কারো মুখে শোষিত জীবনের যন্ত্রনার কথা, আবার কেউ শুধুই পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন।আমিও এমনি শান্তিতে বসেছিলাম। দেশ সবাইকেই টানে। দেশের মানুষও অনেক বেশি টানে। কেন টানে, তার একটা কারণ সেদিন বুঝেছিলাম। নিজের আলো-হাওয়া-মানুষে কেউ আমার দিকে অনভ্যস্ত চোখে তাকাবে না, ঠিক মত চেনার আগেই আমাকে উপসংহারে পর্যবসিত করবে না। কী অদ্ভুত আরামের ছিল সেই অনুভূতি।

২.
সেই সফরেই আয়না-মুদ্রার অন্য পিঠও দেখেছিলাম। আটলান্টিকের এপার থেকে যাওয়া সব যাত্রীই কমবেশি বিরক্ত হই মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্লেন ভরে ফেলা ‘ফরেনার’ ভাইদের পানি-কম্বল-রশি-বাক্স দেখে। কেমন যেন একটা আভিজাত্য নিয়ে থাকি, চেনা-অচেনার মাঝামাঝি একটা দূরত্ব রেখে মিশি, আদেখলাপনা আর হ্যাংলামোর ভান্ডার থেকে দূরে সরে সরে থাকি। আমরা শিক্ষিত, মার্জিত, শোভন। আমরা গোল্ডের বার আর মোবাইল ফোন কিনি। এভাবেই চলছিল আমারো। উচ্চতর অবস্থান পেলে যা হয় আর কী, একটু পর আমার মনও অতি আরামে জাত্যাভিমানী হয়ে উঠলো। অস্ফুট স্বরে পাশের এক নীল পাসপোর্টধারী সহযাত্রীকে বললাম কিছু লোকের বিচিত্র পোশাকের কথা। চামড়ার প্যান্ট, মেরুন কোট, বেগুনী শার্ট, পাঞ্জাবির সাথে কেডস, কী নেই ডিপার্চার লাউঞ্জে। বড় ভাই নিজেও উচ্চতর মানসিকতার। হু হু করে সায় দিলেন। বাৎচিৎ সেরে কিছু পরে আমরাও হুড়মুড় করে ধাক্কিয়ে প্লেনে উঠলাম। আগে প্লেনে চড়ার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করে সাধ্যি কার, বলুন?

হুশ ফিরলো প্লেনে খাবার দেওয়ার সময়। শ্রমিক শ্রেণির এক সহযাত্রী কোমল পানীয় চাইলেন। চকচকে ত্বক, টুকটুকে লাল ঠোঁট, আর মাখনের মত পেট দেখিয়ে হেঁটে বেড়ানো এক বিমানবালা এক শ্রমিককে প্রকাশ্যেই কটাক্ষ করলো ‘ফ্যান্টা’কে ‘পান্টা’ বলায়। না, শুধরে বলার পরও বেচারার গলা ভেজানোর উপায় হয়নি। মুহূর্তে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। পরে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিতও হলাম। সেই সাইকেডেলিক রঙের পোশাক ছিল জীবনের উচ্ছিষ্টসম এই মানুষগুলোর শেষ রক্ষণব্যুহ। জামায় জাত প্রকাশ পেয়ে গেলে কুকুরের মত ব্যবহার করে এদের সাথে আরবগুলো। আমার সামনেই মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে দিয়ে যাবার আগে জুতা খুলতে ভুলে যাওয়ায় এক যাত্রীকে চড় মারতে হাত তুলে ফেলেছিল এক আরব পেয়াদা। যৎসামান্য সঞ্চয়ের টাকা উজাড় করে তাই এদের বেশি দামের পোশাক পরা। যেকোন ছুতায় সমাজের আয়নায় সম্মানীয় হওয়ার অক্ষম প্রয়াস।

রাগের আতিশয্যে পরবর্তী কিছুক্ষণ ধরে সবধরনের সৌন্দর্যের পিপাসু-চিবাসু-লেহসু এই আমি মনের ভেতর অনেক রকম উষ্ণ-আন্তরিক বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললাম সেই বিমানবালাকে। তাকে পূর্ণ করে দিলাম আমার সকল শূন্য করে। চোখ খুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেশের লাল আকাশ বিশাল এক আয়না হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল চোখের সামনে। প্রখর আলোয় বুক চিতিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেশকে কুর্ণিশ করছিল শুধু সেই পান্টা ভাইয়েরাই, যারা দশ টাকা আয় করলে সাড়ে নয় টাকা দেশে পাঠিয়ে দেশকে বাঁচায়। অধোবদন হয়ে চোখ ঢাকছিলাম আমরা বাকি সব উচ্চমার্গীয় মীর জাফরেরা।

বিমানবালাকে দেখলাম না কোথাও। মনে হয় গোঙাচ্ছিল কোন কোণায়। কল্পনার দেশপ্রেম যদি আমাকে এত অধিকার দেয় দেশ ও তার মানুষকে বিচার করার, তাহলে আমার ঘাম-ঝরানো প্রতিবাদে বিমানবালা একটু তো ব্যাথা পেতেই পারে। নাহয় সে-ঘাম কল্পনায়ই ঝরল।

মৌনচিত্র ৩

‘অনেক জোরে বাতাস। বানে ভাসায় নিয়া যাইতেসিলো সব। ছোট বইন আমার কোলে আসিলো। আর এই ভাইটা মায়ের কোলে…’

ভাল লাগে না এসব। খবরে দেখার কীই বা আছে আর। ঝড়ে ভাসা মানুষগুলোকে না দেখলে কী এমন ক্ষতি হয়? দেখে কষ্ট বাড়বে অযথা। থাকুক না। ত্রাণের টাকা জোগাড় করতে লেগে গেলেই হল। সকাল থেকে জ্বর, মাথা ব্যাথা। তাড়াতাড়ি কাজের কাজ সারি, খবর তো কতই দেখা যাবে।

‘টাকা কি এখনই যাবে, নাকি কোন ফান্ডে জমা পরে থাকবে? কেয়ারের এমনিতেই ১৫ মিলিয়ন ডলার আছে, এর মধ্যে আমাদের পাঁচ হাজার ডলার শুধু জমা পড়বে। খরচ হতে হতে মানুষ না খেয়েই মরবে আরো কয়েক হাজার। আগে ভোটাভুটি হোক, টাকা কি এখনই পাঠাবো, নাকি আরো টাকা জমিয়ে তারপর।’

যাক, খুঁটিনাটির ফয়সালা হল তাহলে। খাওয়ার পর টাকা তোলা যাবে। ইমেইলে কিছু খোঁজ নেওয়া দরকার আরো। আইডিয়া মন্দ না। জনপ্রতি কত টাকা করে লাগে সেই রকম একটা হিসাব ফ্লাইয়ারে দিতে পারলে ভাল হয়। সাথে ঘর তুলবার টিনের টাকা। সবার তো মাছের ব্যবসা ঐ দিকে। কত করে লাগে জানতে পারলে হত।

‘থ্যাংক ইউ ফর ইওর কোয়েরিজ। লিটল লেস দ্যান ফরটি ল্যাক পিপল আর অ্যাফেকটেড। ফর আ ফ্যামিলি অফ ফাইভ, উই নিড ফিফটিন থাউজ্যান্ড টাকা টু বিল্ড টিন-শেড শ্যাকস। এভরি ফিশারম্যান নিডস অ্যাট লিস্ট ফাইভ থাউজ্যান্ড টাকা টু বিগিন দেয়ার ফিশিং।’

কাল বাদে পরশু ব্ল্যাক ফ্রাইডে। ঘরে ফিরে কী কী কিনবো তার ফর্দ করা দরকার। বেস্ট বাইয়ের ডেস্কটপটা গত দুই বছর ধরতে পারিনি। কেন যে সেবার পেয়েও নিলাম না। কঞ্জুসী না করলেও পারতাম একবারের জন্য। থাক, আফসোস করে লাভ নাই। কপালে না থাকলে ঘি, ঠকঠকাইয়া হবে কী? এবার আগে গিয়ে দাঁড়াবো। আবহাওয়াও বেশ ভাল কিছুদিন ধরে। ঠান্ডা হবে বলছে, একটু কম করে হলেই হয়। এবার সার্কিট সিটিতে অল্প একটু বেশি টাকায় আরো ভাল কম্পিউটার দিচ্ছে। দুই শ’র বদলে দুই শ’ তিরিশ, সেলেরনের বদলে পেন্টিয়াম। ফেলি কী করে? শ’ তিনেকে ল্যাপটপ দিচ্ছে সব মিলিয়ে চারটা।

‘সাঁতরায় উইঠা দেখি বইনডা নাই আমার। খুঁজি অনেক, বইনরে দেখি না…’

এক ঘর মানুষ আমরা, মাত্র এই কয়টা টাকা তুললাম? এত সামর্থ্য আমাদের। এত এত টাকা দিয়ে একেক জন দুইটা-তিনটা করে কিনছি, আর চল্লিশ লাখ নিঃস্ব মানুষের জন্য লিখছি পঁচিশ-ত্রিশ টাকার চেক। কিছু একটা ভুল হচ্ছে কোথাও। কেন দেখতে হল এই নিউজ? কষ্ট দেখতে পাওয়ার কষ্ট তবু সহ্য হত। কষ্ট দেখেও বিকার না হওয়ার কষ্ট কি বিবেকে সয়?

‘মায় কইলো, তুই আমার মাইয়াডারে ফালাইয়া দিলি? আমি কইলাম আমি ফালাই নাই। ধইরা রাখসি, শক্ত কইরা। ঝড়ে লইয়া গেসে। আমার ছোড বইনডারে ঝড়ে লইয়া গেসে আমার হাত থেইকা…’

দেখতে চাই না বোনের মুখ। মুছে না কেন চোখ থেকে? থ্যাংকসগিভিঙের সেলের বদলে দুর্গতদের দিলেও কি এই ময়লা বিবেক পরিষ্কার হবে? কেন প্রথমেই মনে হল না এই কথা? দেখতে চাই না সেই মুখ। সরে না কেন এই ছবি আমার চোখের সামনে থেকে? ধুর…