Thursday, January 24, 2008

জুম্মার নামায ও অখন্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলি

বহুদিন পর জুম্মায় যাওয়া হল আজকে। জীবনকে সুন্দর, স্বাভাবিক, ও নির্ভার রাখতে বিশ্বাসের ভূমিকা আমি কিঞ্চিত অনিচ্ছার সাথে হলেও মেনে নেই। আঘাত, হতাশা, আর ব্যর্থতাগুলো অন্যের মর্জির উপর চাপিয়ে নিজের মত জীবন চালাতে পারা নিঃসন্দেহে যেকোন সচেতন মানুষের পরম আরাধ্য। ধর্ম যার যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি মানুষই ধার্মিক। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লে দুষবার মত কাউকে খুঁজে বেরানোতে ধর্ম মিশে আছে। বিয়ান রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বিরক্তির ঝাপটা কারো উপর দিয়ে চালাতে চাওয়া ধর্মের শিক্ষা। অন্ধকারে হাতরে পথ চলতে গেলে প্রতিটি অবয়বের মাঝে সুরাসুরের প্রতিভূ তৈরি করে নেওয়াও ধর্মেরই উপজাত অনুভূতি। জীবনের স্তরে স্তরে তাই সব মানুষই ধার্মিকভাবে কোন না কোন কাজ করে নিজের ক্ষুদ্রতাগুলো ভুলে থাকতে। আমিও ব্যাতিক্রম নই। কেউ হরেক রঙের তিলক দেয়, কেউ সেজদা দিতে দিতে কপালে তিলক এঁকে ফেলে, কেউ হুমায়ূনীয় কায়দায় কাগজ ছেড়ে, কেউ বৌ পেটায়, কেউ গাছের সাথে কথা বলে, কেউ গুনগুন করে। আমি ঘুমাই।

শীবের গীত ছেড়ে এবার ধান ভানায় ফিরি। ক্লাস, কাজ, ঘুম, ইত্যাদির আবেদন অগ্রাহ্য করে সপ্তাহ তিনেক পর আবারো জুম্মায় সামিল হলাম। শীতের ছুটিতে অনেকেই শহরে নেই। মেক-শিফট খতিবের খুতবা শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে ঝিমাচ্ছিলাম। চলছিল কথা ধর্ম নিয়ে। কীভাবে যেন মাঝে ঢুকে গেল ভারতে গরু-পূজা। এর মাঝেই গোবরের ইংরেজি ভুলে ‘আউটকাম অফ দ্য কাউ’ বলে নৌকা ভাসালেন খতিব সাহেব। এমন সময় পাশ থেকে এক বড় ভাই এগিয়ে দিলেন একটি বই। আমেরিকার মসজিদে বাংলা বই দেখে অবাক এবং খুশি হলাম বেশ। লেখক জি, ডব্লিউ, চৌধুরী নামক এক ব্যক্তি। কভার ফ্ল্যাপের ভেতরে প্রথম বাক্যেই পুরো বইটির মেজাজ বর্ণিত -- ‘কেন পাকিস্তান একটি জাতীয় সত্ত্বা অর্জনে ব্যর্থ হল?’ এই ঘরানার বই নিয়ে আমার আগ্রহে কমতি নেই কোনদিন। ইতিহাসের সুদীর্ঘ পরিসরে মানবমনের ভাল-মন্দ সব রকম প্রবৃত্তিই প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের মত এত কম সময়ে নয়। শুরু করলাম পড়া।

সামনের ফ্ল্যাপে সরাসরিই দাবি করা হয়েছে যে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও আধুনিক যুগে এই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি শেখ মুজিব ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর সন্দেহজনক ভূমিকার জন্য। পড়ে অবাক বা আহত হইনি। সামরিক সরকারের সাবেক মন্ত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে দাবিটা অযৌক্তিক নয় মোটেও। কিন্তু কিছু পরেই বের হতে থাকলো আসল রূপ। আইয়ুবীয় গণতন্ত্রের বুনিয়াদ গঠনে বাঙালিদের কোন ভূমিকা না থাকার কারণেই এই বিভাজন। কৌতূহল থেকে পড়ার গতি বেড়ে গেল অনেক।

বক্তব্যগুলো খুব প্রচলিত প্রোপাগান্ডা। শেখ মুজিবকে সরাসরি দেশদ্রোহী, দালাল, আর বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে ডাকা হয়েছে। না, এতেও আমার কোন খেদ নেই। শেষের ফ্ল্যাপের একটি বাক্যে বইটির সারমর্মও নিহিত ছিল -- ‘ইহা কি বাংগালীদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী-দাওয়া মেটাতে অপর্যাপ্ত ছিল, নাকি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংগালীরা ইতিমধ্যেই স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল?’। খুনে, বর্বর, মনুষ্যকূলে-অপাঙ্কতেয় জানোয়ারদের সাথে আলাপচারিতার দায়ে আমি এত ত্যাগের পরও শেখ মুজিবের উপর অভিমান করি। বুকটা বরং হালকা হচ্ছিল। বহু আগে থেকেই ভারতের সাথে যোগাযোগ, চীন-পাকিস্তান-আমেরিকা আঁতাত সম্পর্কে সজাগ করে দেওয়া, বাড়াবাড়ি রকম দেরি ও ঝামেলা হবার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য প্রত্যাশা না করা, ইত্যাদি ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতিগুলো অনেকটাই মুছে দিল সেই জ্বালা।

খতিব সাহেব গরুর পিন্ডি চটকাতে একটু বেশিই ব্যস্ত ছিলেন। ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে নামাযের সময় পেরিয়ে এগিয়ে চলছে। ঢুকে পড়লাম বইয়ের ভেতর। হাইলাইটার দিয়ে দাগিয়ে দাগিয়ে পড়া। দেখে ভালই লাগলো। ভিন্ন মতের বইগুলো খুঁটিয়েই পড়া উচিত। এই ঘি বেশিক্ষণ সইলো না। ভেবেছিলাম কোন পাগলা জেনারেলের সিএসপি সাগরেদের আত্মজীবনী স্রেফ অনুবাদ করেছেন কেউ। ভেতরে অনুবাদকের কথা পড়ে সেই ভুলের পাহাড় ধূলায় মিশে গেল। শুরুতে বলা হল পাকিস্তান সৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তানী তথা বাঙালি মুসলমানদের অধিকতর ভূমিকা রাখার কথা। তারপর শুরু হল ধোলাই। একজন ‘সাধারণ বাংলাদেশী’ নাকি প্রোপাগান্ডার চাতুরিতে এটুকুই জানেন যে ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া এবং ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চের ‘পৈশাচিক আক্রমণের ফলেই’ বাংলাদেশের জনগণকে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হয়েছিল। মূল বইটি পড়ে অনুবাদকের উপলব্ধি হয়েছে যে ‘বর্তমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্বন্ধে যে লেখকই যাই লিখুন না কেন তা ভরপুর থাকে প্রবল ভাবাবেগ রসে’। আরো কিছুদূর এগিয়ে তিনি খোশমেজাজে জানান দিলেন যে ‘লেখকের এ বইটি পড়ে [তাঁর] মনের অনেক প্রশ্নেরই সমাধান হয়েছে’। আমিও তৎক্ষণাৎ নিজের মনে গোলাম ওয়াহিদ চৌধুরী সাহেবের কোন এক নিকটাত্মীয়ার উপপতি থেকে খুশি মনে সিদ্দীক সালাম সাহেবের অন্ত্র-বিশেষ আলোকিত করতে লেগে গেলাম।

শেষ পর্যন্ত অনুবাদক সবক দিলেন যে ‘ঐতিহাসিক ঘটনাকে সত্যতার সাথেই জানতে হয় তা তিক্ত হলেও’। আরো জানালেন যে তিনি পাঠক হিসেবে তাঁর ‘তৃষ্ণা’ নিবৃত্ত করতে সক্ষম হয়েছেন এই বই পড়ে। শেষ ডিসেম্বরে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে আমি মনে মনে বললাম শুধু, তোর তৃষ্ণা কীসে মিটেছে তা গলা থেকে বের করে দেখ্‌, ছাগল।

বইটি ১৯৮৯ সালে লিখিত। ‘হক কথা প্রকাশনী’ নামক কোন এক আস্তাকূড় থেকে প্রকাশিত ১৯৯১ এর জানুয়ারিতে। কোন এক সচেতন বাঙালি কালের প্ররোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এক সাজানো গৃহযুদ্ধের ইতিহাস উন্মোচিত করেছেন। হাজার রঙে দাগিয়ে এই বই পড়েছেন আরেক সহৃদয় বাঙালি। বিশ্বাসের গতি-জড়তায় যদি এর কিছুমাত্রও গিলে ফেলি, সেই আশায় পাঠ শেষে অত্যন্ত উদার ভাবে তা গছিয়ে রেখে গেছেন মসজিদের লাইব্রেরিতে।

বইটি জ্যাকেটের ভেতরে করে নিয়ে এসেছি। খোদার ঘরে মনে মনে বলাৎকার করেছি। তাও আবার বেগানা পুরুষ মানুষকে ভেবে। দেবার জায়গা থেকে চুরি করে ভেগেছি। বিনিময়ে যেই নরক-যন্ত্রণা কপালে জুটালাম, তা অমৃত-সমান হবে; যদি পরবর্তীবার কোন বুকশেলফের সামনে গেলে আপনারাও খুঁজে দেখেন এমনি করে ঘাপটি মেরে থাকা কোন বই আছে কিনা।

প্রবাসের কথোপকথন ১১

“এত দেরি যে? ফোন পাসনি নাকি?”
- পেয়েছিলাম, কিন্তু একেক জন একেক জায়গায় ছিলাম। এক গাড়িতে আসলাম দেখে একটু সময় লেগে গেল। তার উপর ডাউনটাউনে ফায়ার সার্ভিসের দুইটা ট্রাক রাস্তা বন্ধ করে গান গাচ্ছে। ঘুরে আসতে হল অনেকটা পথ। এখনো কি ওটি-তে আছেন, নাকি বের হয়েছেন?

“ভাই-ভাবি দু’জনাই কেবিনে এখন। ভাইয়ের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, আর ভাবি খুব শকড মনে হচ্ছে।”
- স্বাভাবিক। অ্যাক্সিডেন্ট জিনিসটা একটু আপসেটিং এমনিতেই। তার উপর এটাই তো বোধহয় প্রথমবার। ড্রাইভিং শিখতে গিয়ে হয়েছে শুনলাম অ্যাক্সিডেন্ট?

“হ্যাঁ। ভাবি টার্ন নেওয়ার সময় নাকি ভাই বকছিলেন। ওতে নার্ভাস হয়ে গ্যাসে পা পড়ে গেছে। গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা খেয়েছে একটা গাছে। দু’জনের কারোই জ্ঞান ছিল না। পুলিশের গাড়ি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখে ৯-১-১ কল করেছে।”
- আউচ। আগলি অ্যাক্সিডেন্ট। তো আপনারা খবর পেলেন কীভাবে?

“পুলিশ ওনাদের বাড়ি গিয়েছিল। বাচ্চারা আমাদের ফোন করে দিলো, তখন পুলিশের কাছে শুনলাম।”
- বাসায় বড় কেউ ছিল না? সে কী কথা, ভাইকে কাজ থেকে আনতে ভাবি যাবেন, ভাল কথা, কিন্তু বাচ্চাদের ঘরে রেখে যাবেন কেন? আপনার বাচ্চাও ছিল? আপনিও কীভাবে রেখে গেলেন গিয়ে?

“আমি তো জানি না যে উনি বাইরে যাবেন। আমি নিজেই ছিলাম হাসপাতালে। ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম। ডাক্তার আমার অবস্থা দেখে ধরে-বেঁধে ভর্তি করিয়ে দিল। এর মধ্যে এই হাঙ্গামা। এই যে দেখো, স্যালাইন ধরে ধরে ঘুরছি। পুলিশ নাকি জিজ্ঞেস করেছিল বাসায় বড় কেউ নেই নাকি। তখন একজন বলে ফেলেছিল যে প্রায়ই এভাবে রেখে চলে যায় বাইরে।”
- পুলিশ এটা নোট করে নিয়ে গেছে? তাহলে তো সমস্যা হবে পরে অনেক। না, শেরিফের মর্জির উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কিছু করার নেই এই মুহূর্তে। কোন যুক্তি দিয়েই এটা মানানো যাবে না। তের বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের একা রেখে গেলে বাচ্চার কাস্টডিই তো নিয়ে নেবে পুলিশ। সবচেয়ে বড়টা তো মনে হয় নয় বছরের ছিল। ঝামেলা হয়ে গেল। চিকিৎসার ধকল কাটলেই এই ধাক্কাটা আসবে। ওনাদের কিছু বলেননি তো এখনো, নাকি?

“নাহ, মাথা খারাপ? এমনিতেই তো বেশ নাজুক অবস্থা। অ্যাক্সিডেন্ট তেমন মেজর ছিল না। গাছে বাড়ি খেলেও মূল সমস্যা হয়েছে এয়ারব্যাগে। ওটার প্রেশারে মুখের বিভিন্ন জায়গায় ফেটে গেছে। ভাইয়ের তো মুখ-ঠোঁট ফেটে গেছে অনেকটা। ভাবির চেহারা দেখেও চেনার উপায় নেই। অয়েন্টমেন্ট দিয়ে রেখেছে। ভাই একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, তবে ভাবি বেডে।”
- একটু শেকেন-আপ হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। পুরো শহরই তো দেখি চলে এসেছে দেখতে। কী অদ্ভুত না এই ব্যাপারটা? দেশে একবার রাস্তার পাড়ে একটা লোককে খুলি-ফাটা অবস্থা পরে থাকতে দেখেছিলাম। নির্বিকার ভাবে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেছিলাম। অথচ সাপের খেলা দেখতে দাঁড়িয়ে যেতাম যত্রতত্র।

“বিদেশের বাড়িতে তো স্বদেশী মানেই আত্মীয়। আমরা একজন আরেকজনের দুঃখ-কষ্টে পাশে না দাঁড়ালে তো চলে না। না রে, ভাবি তো বেশ কিছুদিন ধরেই চালান। খুব একটা আনাড়ি ড্রাইভার না। নতুন শিখছিলেন আর কি। এখনো ফুল লাইসেন্স নেননি। কিছুদিনের মধ্যেই নিতে যাবার কথা। এখন তো আর মনে হয় না ও’পথে পা বাড়াবেন।”
- ভাই বকছিলেন বললেন। কী নিয়ে বকছিলেন?

“টার্ন নেওয়ার সময় এক হাতের উপর দিয়ে আরেক হাত আনা না কী নিয়ে যেন বকছিলেন। আচ্ছা গাড়িটা ঘুরলেই তো হল, নাকি? এর মধ্যে এত ঝক্কি করা কেন?”
- এবার বুঝেছি। ভাইয়ের জায়গায় আমি থাকলে আমিও বলতাম ওটা নিয়ে। মেয়েদের শেখাতে গেলে এই সমস্যাটা হয় প্রায়ই। টার্ন করার সময় এক হাতে হুইলটা ঘুরিয়ে অন্য হাতে ওটা টেনে আনলে কন্ট্রোল বেশি থাকে। বিশেষ করে হাইস্পিডে। ছেলেরা এক টানে এই কাজটা করে, মেয়েরা বেবি-স্টেপস নিয়ে একটু একটু করে হুইল ঘোরায়। রাস্তার সব গাড়ি তো আর এক তালে চলে না। আচমকা হর্ন খেলে তখন নার্ভাস হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। এই গলদটা গোড়ায় না শুধরালে পরে সমস্যা হয়।

“তুইও? তোদের সমস্যাটা কী বলতো? ড্রাইভিংয়ের সময় এভাবে একটা মানুষকে ধমকের উপর রাখলে সে চালাবে কীভাবে?”
- ধমক আলাদা ব্যাপার। আমি টেকনিকের কথা বলছিলাম। ধমকাধমকি হয় বরের কাছে ড্রাইভিং শিখতে গেলে। এজন্য আজকাল মেয়েরা অন্য কারো কাছে শেখে ড্রাইভিং। এক আন্টির কথা জানি যিনি রাস্তার মাঝে নেমে গিয়ে বলেছিলেন যে ড্রাইভিং শিখলে সংসার টিকবে না, এর চেয়ে উনি টাকা দিয়ে শিখে নেবেন বরং। শেষতক তাই করলেন।

“একদম ঠিক কাজ। এইটাই দরকার। হাসব্যান্ডের কাছে কিছু শেখা মানেই ঘরে অশান্তি। কত আশা নিয়ে শিখতে যাই, কিন্তু বকাঝকার চোটে পুরো দিনটাই মাটি হয়ে যায়। সবটাতেই শুধু ভুল ধরা আর বকা দেওয়া। আরে বাবা, আমরা ড্রাইভিং জানি না দেখেই তো শিখতে চেয়েছি, নাকি? এর মধ্যে এত তুলকালাম করার কী দরকার?”
- আপনার রাগের কারণটা বুঝতে পারছি, কিন্তু আমার বৌয়ের সাথে আমিও হয়তো একই কাজ করে বসবো। ব্যাপারটা এত খারাপ ভাবে না দেখলেও চলে। সব বরই চায় তার বৌ সব দিক থেকে পারফেক্ট হোক। এই চিন্তাটা এপ্রিশিয়েট করলে পারেন। তবে হ্যাঁ, আমি নিজেও এখন বলি যেন ভাবি-বৌদিরা বরের বদলে আমাদের কাছে শেখেন। লাভের মধ্যে আমরা কিছু বাড়তি খানা-পিনা পাই, আপনাদেরও বকাঝকা শুনতে হয় না।

“এই দিকে আজমীর সবচেয়ে ভাল। ওর গাড়িতে শেখার সময় অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেলেও ও খুব শান্ত থাকে। একবার তো এক বৌদি রাস্তা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আরেকজন তো পার্কিং লটেই আরেক গাড়িতে মেরে দিলেন। তবুও ও একদম শান্ত ছিল।”
- শয়তানের নাম নিতেই হাজির! জ্বী, পরে কথা হবে। আমি ওদিকে যাই। কী হে বান্দা, তুমি তো দেখি বেশ পপুলার ইন্সট্রাক্টর। সবাই তোমার শেখানোর নাম করে এত। তিন তিনটা রেকলেস ড্রাইভিংয়ের টিকেটের কথা জানে না নাকি কেউ?

“আরে জানে, জানে। আমি তো বলেই দেই, আই ডোন্ট ড্রাইভ ফাস্ট, আই ফ্লাই লো। প্রথম দিকে পুলিশ কোথায় থাকে সেটা না বুঝেই টানতে গিয়ে টিকেট খাইলাম এত্তগুলা। এখন আর ভুল হয় না। শুনবা আমার ড্রাইভিংয়ের গল্প? শুনো তাহলে...”

আয়না

১.
প্রবাস জীবনটা যেন আয়নায় ভরা। দেশে থাকতে কোনদিন খুব একটা আয়না দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাইরে আসা অবধি তাই ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন আয়নায় নিজেকে দেখার বিব্রতকর অভিজ্ঞতার সাথে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করে চলেছি। দেশের আয়নাগুলোর ধরন ও অবস্থান আগেই জানা থাকতো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালে বেহায়া সিঁথি, টয়লেটে গেলে উঠতি ব্রন, টার্মের পর হাতে পাওয়া রিপোর্ট কার্ড, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পর বাবার ‘শান্তি হয়েছে?’, শুক্রবার দুপুরে মাংসের বদলে সবজি দেখে উঠে যাওয়ার সময় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা মায়ের চোখ, তুচ্ছ কারণে গায়ে হাত তোলার পরও কুঁকড়ে থাকা কাজের ছেলেটার পিঠের কুঁজ, তিন টাকা ভাড়ার পথের রিকশা ধরার সময় পাশে দাঁড়ানো দারোয়ান চাচার নিঃশব্দে সরে যাওয়া, এরকম কিছু সহজে-উপেক্ষ আয়না ছিল আশে-পাশে।

প্রতিফলক হরদম মিলতো, আয়না ছিল এরকম অল্প কিছু। সব প্রতিফলনকে মানুষ ‘জাজমেন্টাল’ দৃষ্টিতে দেখে না, সেজন্যই সব প্রতিফলক আয়না না।কে জানে, খেয়াল করলে হয়তো অনেক কিছুই দেখা যেত এই চোখে। প্রবাসে এসে জীবন সীমিত হয়ে গেছে। যাবার জায়গা কম। কথা বলার লোক কম। বাসে চড়লে মন খুলে কথা বলা যায় না, রেস্টুরেন্টে বসলে বেশরমের মত খাওয়া যায় না। অনেক ঝক্কি। অনেক ভেবে চলতে হয়। অনুভূতিগুলো অনেক বেশি তীক্ষ্ণ যেন। নিজেকে উজার করে দেওয়া এত বেশি কঠিন বলে এই চূড়ান্ত বহির্মুখী আমিও আর সবার মত অন্তর্মুখী জীবন যাপন করে চলি। এর উপজাত হিসেবেই যেন চারপাশে এত আয়নার আধিক্য। যে-হারে নিজে অন্যকে বিচার করি, সে-হারে অন্যরা আমাকে বিচার করে হয়তো। হয়তো প্রতিটা দৃষ্টিবিনিময়ই একবার করে আয়না-দর্শন।

মনে পড়ে ২০০৫এর শীতে দেশে যাবার কথা। কুয়েত এয়ারওয়েজে গিয়েছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রাবিরতি মানেই স্বজাতি ভাইদের কুলিগিরি করতে দেখা, বিমানবন্দর ঝাড়ামোছা করতে দেখা। অনেকেই সুপারভাইজরের চোখ এড়িয়ে এসে দু’কথা বলে যেতেন। কারো মুখে রাজনীতির কথা, কারো মুখে শোষিত জীবনের যন্ত্রনার কথা, আবার কেউ শুধুই পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন।আমিও এমনি শান্তিতে বসেছিলাম। দেশ সবাইকেই টানে। দেশের মানুষও অনেক বেশি টানে। কেন টানে, তার একটা কারণ সেদিন বুঝেছিলাম। নিজের আলো-হাওয়া-মানুষে কেউ আমার দিকে অনভ্যস্ত চোখে তাকাবে না, ঠিক মত চেনার আগেই আমাকে উপসংহারে পর্যবসিত করবে না। কী অদ্ভুত আরামের ছিল সেই অনুভূতি।

২.
সেই সফরেই আয়না-মুদ্রার অন্য পিঠও দেখেছিলাম। আটলান্টিকের এপার থেকে যাওয়া সব যাত্রীই কমবেশি বিরক্ত হই মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্লেন ভরে ফেলা ‘ফরেনার’ ভাইদের পানি-কম্বল-রশি-বাক্স দেখে। কেমন যেন একটা আভিজাত্য নিয়ে থাকি, চেনা-অচেনার মাঝামাঝি একটা দূরত্ব রেখে মিশি, আদেখলাপনা আর হ্যাংলামোর ভান্ডার থেকে দূরে সরে সরে থাকি। আমরা শিক্ষিত, মার্জিত, শোভন। আমরা গোল্ডের বার আর মোবাইল ফোন কিনি। এভাবেই চলছিল আমারো। উচ্চতর অবস্থান পেলে যা হয় আর কী, একটু পর আমার মনও অতি আরামে জাত্যাভিমানী হয়ে উঠলো। অস্ফুট স্বরে পাশের এক নীল পাসপোর্টধারী সহযাত্রীকে বললাম কিছু লোকের বিচিত্র পোশাকের কথা। চামড়ার প্যান্ট, মেরুন কোট, বেগুনী শার্ট, পাঞ্জাবির সাথে কেডস, কী নেই ডিপার্চার লাউঞ্জে। বড় ভাই নিজেও উচ্চতর মানসিকতার। হু হু করে সায় দিলেন। বাৎচিৎ সেরে কিছু পরে আমরাও হুড়মুড় করে ধাক্কিয়ে প্লেনে উঠলাম। আগে প্লেনে চড়ার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করে সাধ্যি কার, বলুন?

হুশ ফিরলো প্লেনে খাবার দেওয়ার সময়। শ্রমিক শ্রেণির এক সহযাত্রী কোমল পানীয় চাইলেন। চকচকে ত্বক, টুকটুকে লাল ঠোঁট, আর মাখনের মত পেট দেখিয়ে হেঁটে বেড়ানো এক বিমানবালা এক শ্রমিককে প্রকাশ্যেই কটাক্ষ করলো ‘ফ্যান্টা’কে ‘পান্টা’ বলায়। না, শুধরে বলার পরও বেচারার গলা ভেজানোর উপায় হয়নি। মুহূর্তে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। পরে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিতও হলাম। সেই সাইকেডেলিক রঙের পোশাক ছিল জীবনের উচ্ছিষ্টসম এই মানুষগুলোর শেষ রক্ষণব্যুহ। জামায় জাত প্রকাশ পেয়ে গেলে কুকুরের মত ব্যবহার করে এদের সাথে আরবগুলো। আমার সামনেই মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে দিয়ে যাবার আগে জুতা খুলতে ভুলে যাওয়ায় এক যাত্রীকে চড় মারতে হাত তুলে ফেলেছিল এক আরব পেয়াদা। যৎসামান্য সঞ্চয়ের টাকা উজাড় করে তাই এদের বেশি দামের পোশাক পরা। যেকোন ছুতায় সমাজের আয়নায় সম্মানীয় হওয়ার অক্ষম প্রয়াস।

রাগের আতিশয্যে পরবর্তী কিছুক্ষণ ধরে সবধরনের সৌন্দর্যের পিপাসু-চিবাসু-লেহসু এই আমি মনের ভেতর অনেক রকম উষ্ণ-আন্তরিক বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললাম সেই বিমানবালাকে। তাকে পূর্ণ করে দিলাম আমার সকল শূন্য করে। চোখ খুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেশের লাল আকাশ বিশাল এক আয়না হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল চোখের সামনে। প্রখর আলোয় বুক চিতিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেশকে কুর্ণিশ করছিল শুধু সেই পান্টা ভাইয়েরাই, যারা দশ টাকা আয় করলে সাড়ে নয় টাকা দেশে পাঠিয়ে দেশকে বাঁচায়। অধোবদন হয়ে চোখ ঢাকছিলাম আমরা বাকি সব উচ্চমার্গীয় মীর জাফরেরা।

বিমানবালাকে দেখলাম না কোথাও। মনে হয় গোঙাচ্ছিল কোন কোণায়। কল্পনার দেশপ্রেম যদি আমাকে এত অধিকার দেয় দেশ ও তার মানুষকে বিচার করার, তাহলে আমার ঘাম-ঝরানো প্রতিবাদে বিমানবালা একটু তো ব্যাথা পেতেই পারে। নাহয় সে-ঘাম কল্পনায়ই ঝরল।

মৌনচিত্র ৩

‘অনেক জোরে বাতাস। বানে ভাসায় নিয়া যাইতেসিলো সব। ছোট বইন আমার কোলে আসিলো। আর এই ভাইটা মায়ের কোলে…’

ভাল লাগে না এসব। খবরে দেখার কীই বা আছে আর। ঝড়ে ভাসা মানুষগুলোকে না দেখলে কী এমন ক্ষতি হয়? দেখে কষ্ট বাড়বে অযথা। থাকুক না। ত্রাণের টাকা জোগাড় করতে লেগে গেলেই হল। সকাল থেকে জ্বর, মাথা ব্যাথা। তাড়াতাড়ি কাজের কাজ সারি, খবর তো কতই দেখা যাবে।

‘টাকা কি এখনই যাবে, নাকি কোন ফান্ডে জমা পরে থাকবে? কেয়ারের এমনিতেই ১৫ মিলিয়ন ডলার আছে, এর মধ্যে আমাদের পাঁচ হাজার ডলার শুধু জমা পড়বে। খরচ হতে হতে মানুষ না খেয়েই মরবে আরো কয়েক হাজার। আগে ভোটাভুটি হোক, টাকা কি এখনই পাঠাবো, নাকি আরো টাকা জমিয়ে তারপর।’

যাক, খুঁটিনাটির ফয়সালা হল তাহলে। খাওয়ার পর টাকা তোলা যাবে। ইমেইলে কিছু খোঁজ নেওয়া দরকার আরো। আইডিয়া মন্দ না। জনপ্রতি কত টাকা করে লাগে সেই রকম একটা হিসাব ফ্লাইয়ারে দিতে পারলে ভাল হয়। সাথে ঘর তুলবার টিনের টাকা। সবার তো মাছের ব্যবসা ঐ দিকে। কত করে লাগে জানতে পারলে হত।

‘থ্যাংক ইউ ফর ইওর কোয়েরিজ। লিটল লেস দ্যান ফরটি ল্যাক পিপল আর অ্যাফেকটেড। ফর আ ফ্যামিলি অফ ফাইভ, উই নিড ফিফটিন থাউজ্যান্ড টাকা টু বিল্ড টিন-শেড শ্যাকস। এভরি ফিশারম্যান নিডস অ্যাট লিস্ট ফাইভ থাউজ্যান্ড টাকা টু বিগিন দেয়ার ফিশিং।’

কাল বাদে পরশু ব্ল্যাক ফ্রাইডে। ঘরে ফিরে কী কী কিনবো তার ফর্দ করা দরকার। বেস্ট বাইয়ের ডেস্কটপটা গত দুই বছর ধরতে পারিনি। কেন যে সেবার পেয়েও নিলাম না। কঞ্জুসী না করলেও পারতাম একবারের জন্য। থাক, আফসোস করে লাভ নাই। কপালে না থাকলে ঘি, ঠকঠকাইয়া হবে কী? এবার আগে গিয়ে দাঁড়াবো। আবহাওয়াও বেশ ভাল কিছুদিন ধরে। ঠান্ডা হবে বলছে, একটু কম করে হলেই হয়। এবার সার্কিট সিটিতে অল্প একটু বেশি টাকায় আরো ভাল কম্পিউটার দিচ্ছে। দুই শ’র বদলে দুই শ’ তিরিশ, সেলেরনের বদলে পেন্টিয়াম। ফেলি কী করে? শ’ তিনেকে ল্যাপটপ দিচ্ছে সব মিলিয়ে চারটা।

‘সাঁতরায় উইঠা দেখি বইনডা নাই আমার। খুঁজি অনেক, বইনরে দেখি না…’

এক ঘর মানুষ আমরা, মাত্র এই কয়টা টাকা তুললাম? এত সামর্থ্য আমাদের। এত এত টাকা দিয়ে একেক জন দুইটা-তিনটা করে কিনছি, আর চল্লিশ লাখ নিঃস্ব মানুষের জন্য লিখছি পঁচিশ-ত্রিশ টাকার চেক। কিছু একটা ভুল হচ্ছে কোথাও। কেন দেখতে হল এই নিউজ? কষ্ট দেখতে পাওয়ার কষ্ট তবু সহ্য হত। কষ্ট দেখেও বিকার না হওয়ার কষ্ট কি বিবেকে সয়?

‘মায় কইলো, তুই আমার মাইয়াডারে ফালাইয়া দিলি? আমি কইলাম আমি ফালাই নাই। ধইরা রাখসি, শক্ত কইরা। ঝড়ে লইয়া গেসে। আমার ছোড বইনডারে ঝড়ে লইয়া গেসে আমার হাত থেইকা…’

দেখতে চাই না বোনের মুখ। মুছে না কেন চোখ থেকে? থ্যাংকসগিভিঙের সেলের বদলে দুর্গতদের দিলেও কি এই ময়লা বিবেক পরিষ্কার হবে? কেন প্রথমেই মনে হল না এই কথা? দেখতে চাই না সেই মুখ। সরে না কেন এই ছবি আমার চোখের সামনে থেকে? ধুর…

হারিকেন সিডর -- আর্থিক সাহায্য পাঠানোর লিংক

প্রবাসী অনেক বাঙালি বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে দেশের এই দুর্যোগমুহূর্তে সাহায্য পাঠানোর উপায় জানতে চাইছেন। প্রতিবছর ভার্জিনিয়া টেকের ছাত্রদের উদ্যোগে দেশে আর্থিক ও সামাজিক সাহায্য দেওয়া হয়। টাকা পাঠানোর জন্য এই লিংক অনুসরন করুন।

http://www.bang.org.vt.edu/makhan.html

এই ওয়েবসাইটে PayPal-এ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে টাকা দেবার সুযোগ আছে। টাকা জমা হবে Association for Bangladeshi Students at Virginia Tech-এর অ্যাকাউন্টে। বিশ্বস্ততার প্রশ্নে দ্বিধা না থাকলে টাকা পাঠাতে পারেন।

আন্তর্জাতিক অনেক সাহায্য-সংস্থা থেকেও টাকা নেওয়া হচ্ছে। সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছি নিজ নিজ পছন্দের চ্যারিটিতে টাকা জমা দেবার। দেশে টাকা পাঠানোই মুখ্য। আমরা আমাদের সঞ্চিত ফান্ডের টাকা এই মুহূর্তে পাঠাচ্ছি। বাকি টাকা নিয়ে এখানকার ছাত্ররা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই দেশে যাচ্ছে।

PayPal-এর খাবলে খাওয়া ন্যূনতম ফাইন্যান্স চার্জ বাদ দিয়ে পুরো টাকাই আর্তদের সাহায্যে যাবে। বড় সংস্থার মত জৌলুস বা ওভারহেড খরচ থাকবে না আমাদের কার্যকলাপে। অনুগ্রহ করে এই লিংকটির কথা ছড়িয়ে দিন চেনা মহলে।

জিজ্ঞাস্য থাকলে মন্তব্যে প্রশ্ন রাখুন। সকলকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ধন্যবাদান্তে,

ইশতিয়াক রউফ
প্রেসিডেন্ট, এবিএস-ভিটি

মৌনচিত্র ২

আমি যেন এই সবুজ জামাটা বিকেলে না দেখি তোমার গায়ে। না, খবরদার কমলা গেঞ্জিটা পড়বা না তাই বলে। নীল শার্ট দিলাম যে, কালো চেক-চেক…’

না, ভাববো না। ঘুমাবো আমি! বাজুক আড়াইটা। জ্বলুক বাতি। উঠবো না। কোন চিন্তা আসতে দেবো না মাথায়। তোমার চিন্তাও না। ছেড়ে দাও, প্লিজ। চলে যাও। আমি অ্যাক্যুস্টিকের টুং-টাং শুনতে শুনতে ঘুমাই। নাম কী এটার? শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না। সত্তরের ঘরের হতেই হবে। আহ, কমিউনিকে। নিউজ? নাহ, শুনি নি আগে। না, ঘুমাবো আমি। দেখবো না কিছু। খুলবো না চোখ। খুঁজবো না লিরিক।

‘শি টেল হিম দ্যাট হি’জ ক্রেইজি। ইয়েস শি’জ সেয়িং লিসেন, বেবি। আই’ম ইয়োর ওয়াইফ। ইয়াহ শি টেল হিম দ্যাট হি’জ ক্রেইজি ফর গ্যাম্বলিং উইথ হিজ লাইফ…’

কিছু শুনছি না আমি। কোন খুঁত ধরছি না। আর ধরি না খুঁত। আর বলে না কেউ স্থির হতে। আর কেউ ভ্রুকূটি করে না শিশুতোষ দুরন্তপনায়। না, আমি কোন মুখ ভেসে আসতে দেবো না। ঘুমাবো আমি। কত রাত ঘুমাই না! না, দেখবো না আমি । উহু, হাসলেও দেখবো না। আমার জন্য হাসলেও না।

‘হি স্টিকস টু হিজ গানস। হি টেকস দ্য রোড অ্যাজ ইট কামস। ইট টেকস দ্য শাইন অফ হিজ শুজ। হি সে ইটস এ শেম…’

আমার জন্য হাসলেও দেখবো না? সেই যে হাসিটা, কত্তদিন দেখি না। না! হাসি থাকুক! রাগ দেখবো না। বদলায় না কেন চেহারাটা? এটা দেখবো না। আমি যেমন চাই, তেমনটাই কেন হয় না?

‘না, সব শেষ। আরো অনেক আগেই।’

না, এসব কেন? আমি ঘুমাবো। প্লিজ! চাইনা ভাবতে। কোন কিছুই না। না, দেখতে চাই না। না, এই চেহারা না। কান্না দেখবো না। না, রাগও না। হাসিটা চলে গেল কোথায় যেন। ধুর, কী সব ভাবছি এসব। ঘুমাবো আমি। আমি কিছু দেখছি না। দেখতে পারি না। আমার চোখ বন্ধ। সব অন্ধকার। না, কেউ নেই। আমি একা এখানে। বেড়ার ভেতর একশ’ ভেড়া। একটা ছুটলো। ঐ যে আরেকটা।

‘ঘর থেকে বের হবার আগে আয়নার দিকে একবার তাকাতে এত কষ্ট কেন তোমার? গালের অবস্থা শুকিয়ে কাঠ, একটা ক্রিমও নাই ঘরে? দাঁড়াও! দেখুক যে দেখার! ’

দরকারের সময় ভেড়াগুলো কোথায় গেল সব? না, আমি দেখবো না। আমি কিছু দেখবো না। ঘুমাবো। আলো জ্বললে তো প্রেত কাছে আসার কথা না। না, আমি নিজের মনেও কিছু দেখছি না। অন্ধকার, সব অন্ধকার। আর সব মনের ভুল। ভুল কি শুধুই মনের? উফ, নাহ, সব মনের ভুল। চুপ! সব চুপ! ঐ যে ভেড়া! সাতানব্বই… পঁয়ষট্টি… আটাশ…

মৌনচিত্র ১

উহু, থামবে না মনে হয়। থামতেও পারে। হয়তো চেনা মুখ ছিল, তাই এগিয়ে গিয়ে গিয়ে হাত মেলাচ্ছিল। আমার দিকে আসার কোন কারণ নেই।

‘ব্রাদারস অ্যান্ড সিস্টারস ইন ইসলাম, অলদো মেনি অফ দ্য মুসলিমস ওয়্যার অ্যাংরি ওভার দ্য অ্যাপারেন্টলি লুজিং ট্রিটি অফ হুদায়বিয়া, আওয়ার প্রফেট-পিস-বি-আপন-হিম কল্ড ফর পেশেন্স…’

নাহ, এই লোককে তো চেনা হতেই পারে না। এটা কম করে দুই মহাদেশ ওপাড়ের লোক। কী সুন্দর হাসি! যেন কত দিনের চেনা। আহ্লাদে আটখানা হয়ে হাত মিলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। বয়স আর বছর ত্রিশেক বেশি হলে বলতাম রাজনীতিতে নামবে। নাহ, এই রকম করে কেউ হাত মেলালে তাকে বিনা চিন্তায় ভোট দিয়ে দিতাম। আহা, আসে না কেন আমার দিকে? আয় না রে! কোলে নিবো, গাল টিপে দেবো।

‘আমিন! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ-অর-রাসূলল্লাহ। আকিমুস-সালাত…’

থাক, বাবুটা হয়তো নামাযের সময় হয়ে না গেলে আসতো আমার কাছেও। অর্ধেক মসজিদের সাথে একা হাত মেলালো, আর আমি বুড়া ব্যাটা কোণায় বসে ঝিমালাম, ছি! কেন যে সামনে বসলাম না। আরেক দিন ওর সামনে গিয়ে বসবো। দেখে রাখলাম।

‘লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর…’

এ কী আমার কাছে দৌঁড়ে চলে এলি নামাযের মধ্যে? ওরে গুলটুশটা রে। আহারে, ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ফেরত যা! বাবা বকবে নইলে নামায শেষে। যা! নাহ, নামাযে মন দেওয়া উচিত। প্রে অ্যাজ ইফ ইট ইজ ইওর লাস্ট প্রেয়ার। হোক। শেষ দেখা এমন একটা মুখকেই দেখে যাই না। আড়চোখে একটা ছবি তুলে রাখি মনের অ্যালবামের জন্য।

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে (The Over-Trump)

আচমকা মাথা-চাড়া দেওয়া অসংখ্য বদ-চিন্তার একটির সমাপ্ত রূপ। ঈদের অনুষ্ঠানে ছাত্রদের পরিবেশনা।