Thursday, January 24, 2008

সময়টা আমাদেরই থাকুক, প্লিজ

[দৈনিক আমাদের সময়ে পাঠানো চিঠি। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে। আদৌ কেউ এটি দেখবেন কিনা জানি না, তাই নিজের ব্লগেই লিখে রাখলাম মতটুকু।]

আমি আমাদের সময়ের। অধিকারের সাথেই ভাবি এমনটা। অধিকারটা অর্থ বা অর্জনের অধিকার না, আন্তরিকতার। ছুটির দিনেও প্রকাশিত হয় এবং সবার আগে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয় দেখেই প্রবাস থেকে আমাদের সময় পড়া শুরু আমার। মৌলিক কিছু গুণাবলি ভাল লাগতো দেখে দিন কয়েকের মধ্যেই আমি আমাদের সময়ের নিয়মিত পাঠক হয়ে উঠি। চটুল নিরপেক্ষতার নামে পাঠকের সাথে এক্কাদোক্কা খেলার চেষ্টা ছিল না, নিজেদের ভুল বুঝতে পারার সাথে সাথে অনুকরণীয় রকম নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা ছিল, পত্রিকার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও সমালোচনাগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা ছিল। কে কী ভাবলো তা নিয়ে ভীত না হয়ে বিবিধ রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির কথা আগাম জানাতো পত্রিকাটি। পর্দার অন্তরালের হিসেব-নিকাশগুলো জেনে আমার মত সাধারণ পাঠক আলোকিত হতে পারতো। সেই বিশ্বাসে বড় একটা ধাক্কা লাগলো পহেলা সেপ্টেমরের প্রধান প্রতিবেদন দুটোয়। ‘যে সভার খবর মিডিয়ায় আসেনি’ শীর্ষক অবমূল্য প্রতিবেদন এবং তার সাথে সাথে সম্পাদকের আন্দাজনির্ভর লেখা পড়ে দুঃখ পেলাম খুব। মেলাতে পারছি না আমাদের সময়ের সাথে।

উক্ত প্রধান প্রতিবেদনের মূল সুর এটাই ছিল যে, একটি সম্মেলনে কিছু শিক্ষক বিদ্যমান সামরিক শাসন নিয়ে বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছেন। ইঙ্গিত করা হয়েছে যে এমনতর মতপ্রকাশের কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারা দেশে ছাত্র-জনতা বিস্ফোরিত হয়েছে প্রতিবাদে। চর্বিমুক্ত বিশ্লেষন এটুকুই বলছে আমাকে। উক্ত শিক্ষকেরা দায়ী, কারণ তারা প্রকাশ্যে সেনাশাসন নিয়ে তাদের অসন্তোষ ও বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছেন। এটি কি কোন রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল? ‘ছাত্র রাজনীতি, সিভিল মিলিটারি রিলেশন ও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যা’ নিয়ে হচ্ছিল আলোচনা। উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন জেনারেলরা। মত রাখলেন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিনিয়র শিক্ষকেরা। এখানেও বলা যাবে না যে এই দেশের জন্য সেনাশাসন ভাল নয়? বলা যাবে না যে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সাধারণ মানুষ ভাল ভাবে নেয় না? এখানেও বলা যাবে না যে সরকার ও সেনাবাহিনী নগ্ন রকম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে? বলা যাবে না যে উর্দি পরে যুদ্ধ করার অধিকার থাকলেও রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবার অধিকার নেই সেনাপ্রধানের? কাকে বলবো এই কথাগুলো? কোথায় বলবো? এটা যদি উষ্কানি হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিবাদ বা সমালোচনা কী?

সেই সভার কথাগুলো তো মাঠ কাঁপানোর জন্য বলা হয়নি। মিডিয়াতেও আসেনি এই কথা। যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের ভূমিকা আলোচনা-সমালোচনার দাওয়াতে এসেও ভুল ধরিয়ে দেওয়া যাবে না? কী ভাষায় বর্ণনা দিলেন এই সমালোচনার? পর্দার অন্তরালে টাকা ঢেলে কে কী করলো তা আমি জানতেও চাই না। আমি শুধু এটুকু বুঝি যে দেশ নিয়ে আমারো সমধর্মী কিছু সমালোচনা আছে। আমি বুঝি যে সাধারণ্যে ক্ষোভ না থাকলে টাকা ঢেলেও আন্দোলন তৈরি করা যায় না।

সভ্য সমাজের সদস্য হিসেবে আমি আমার মত প্রকাশের কথা ভাবি কোন ফোরামে বলবার সুযোগ এলে। আপনাদেরই ডিসেম্বরের প্রবাসী বাঙ্গালিদের সম্মেলনে যদি মুখ ফস্কে বলে বসি এরকম কিছু? এই কথাগুলো তো বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায়। উপেক্ষিত অসন্তোষগুলো সম্পর্কে সজাগ করে দিলে কি আমার মান-সম্মান ধরেও এভাবেই টান মারবে আমাদের সময়? পদে পদে সেনাবাহিনীর ‘ব্লাডি সিভিলিয়ান’ গালি খেয়ে আমি কার কাছে অভিযোগ করবো? আমার দেশের সেনাবাহিনী যখন দেশরক্ষা বাদ দিয়ে নিজের ওয়েবসাইটে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের বিষোদ্গার করবে তখন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? আমি সেনাশাসন বিরোধী হলেও ভুলেও প্রবাসে দেশের সমালোচনা করি না পাছে কেউ শুনে ফেলে ভেবে। ওদিকে আমারই বিদেশী বন্ধুরা সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইট দেখিয়ে বলে, তোমাদের আর্মি নিজের দেশের শিক্ষকদের নিয়ে এগুলো কী ছেপেছে? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?

যে সভার কথা মিডিয়ায় আসেনি, তেমনি আরেকটি সভার কথা বলি। ব্যারিস্টার মঈনুল ভান ধরেছিলেন জামাতে ইসলামীর সেক্রেটারিকে না চেনার। অথচ কিয়ৎকাল পরই তার মিথ্যাচারের প্রমাণ বেরিয়েছে। তিনি ছাত্র শিবিরের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে হাজির হয়েছিলেন, এমন ভিডিও বেরিয়েছে। তাঁর বামের তিনটি চেয়ারে যথাক্রমে উপবিষ্ট ছিলেন মীর্জা আব্বাস, মতিউর রহমান নিজামী, এবং আলী আহসাম মোঃ মুজাহিদ। দেশের একটি মাত্র পত্রিকা ছোট্ট করে এর কথা লিখেছে। আমাদের সময় কি পারবে এই সভার কথাও প্রথম পাতায় প্রকাশ করতে? পাঠক হিসেবে আদরের পত্রিকার এই পরীক্ষা নিতে চাইতেই পারি আমি। যাচাই করে দেখার জন্য দেখুন এখানে -- http://www.esnips.com/web/ishtiaqrouf/

সময়টা সততা এবং সত্য উন্মোচনের। আমাদের সময় কি এই সময়ের থাকতে পারবে? পারবে নিজেকে সেনাসরকারের মুখপাত্র হওয়া থেকে বিরত রাখতে?

প্রবাসের কথোপকথন ১০

“সুপ্রভাত। তুমিই কি আমাদের নতুন ছাত্র?”
জ্বী, আজকে ইন্টারভিউ দিতে আসলাম মাত্র। অথম্যান (উসমান) আমাকে জেরা করছে এই মুহূর্তে।

“ব্যাপার না। আশা করি চাকরিটা পেয়ে যাবে তুমি। আমার নাম ডন ডেভিস। আমি এই অফিসের ডিরেক্টর। চাকরি পেয়ে গেলে আমার সাথেই কাজ করতে হবে তোমাকে। অথম্যান মাইক্রোসফটে চলে যাচ্ছে, জানোই তো মনে হয়। একদম ক্যাডিলাক জেতার মত ব্যাপার। তা তোমার নাম কী? ইশ? ওয়েইট, আমি পুরোটা ঠিক মত উচ্চারণ করবই। ইশ-ঠি-আক। কাছাকাছি যেতে পেরেছি? যাক, ইশ থাকুক আপাতত।”
হ্যাঁ, ইশ থাকুক। আমি এবার সফোমোর ইয়ারে উঠলাম। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি। এসেছি বাংলাদেশ থেকে। হ্যাঁ, আমার একটু একটু শীত লাগছে। আবহাওয়াটা নিজের দেশের মত হলেও ঠান্ডা একটু বেশি লাগছে। আমিও আশা করছি গা সয়ে যাবে কিছুদিন পরে। নট দ্যাট ইট ইজ অ্যান অপশন, এনিওয়ে।

“আমি তোমার শিক্ষাগত কোন ব্যাপার নিয়ে কোন প্রশ্ন করবো না। উই অল লার্ন অন-দ্য-জব। তুমিও শিখে যাবে, আমি নিশ্চিত। আমি শুধু তোমাকে খুব মৌলিক কিছু ব্যাপারে বলবো। সব সময় এগুলো মনে রেখে চলবে, তাহলে তোমার সাথে আমার কোন রকম ঝামেলা হওয়ার কারণ নেই।”
অবশ্যই। বলে যাও, আই অ্যাম অল ইয়ারস।

“এই যে যন্ত্রটা দেখছো, এটা একটা টেলিফোন। এটায় দূর থেকে কথা বলা যায়, চাইলে চোখের অনেক আড়াল থেকেও যোগাযোগ করা যায়। আর এই যে আমার ডেস্কের উপর বিশাল কাগজটা দেখছো, এটা আমার প্ল্যানার। এটার খুব হাবিজাবি অবস্থা, কারণ আমি খুব ব্যস্ত মানুষ। তুমি যদি আমাকে বল তুমি সকাল সাড়ে নয়টায় আসবে, তাহলে আমি তোমার জন্য নয়টা পয়ত্রিশ পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। তুমি দশটায় আসলে আমাকে পাবে না, কারণ দশটায় আমি আরেকজনকে সময় দেবো। তুমি যদি যেকোন কারণে আটকে যাও, আমাকে প্রথম সুযোগে জানাবে।”
অবশ্যই। এটা তো সাধারণ ভদ্রতা। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করবো। কী বল, আর্মির ছাত্রকে নিয়ে সমস্যা হয়েছিল? তাও পাঙ্কচুয়ালিটি নিয়ে? না না, আমার উপর রাগ হয়ে ফোন ভাঙার মত কিছু হবে না, আশা করি। দেরি হলে আমি জানাবো আগেই। তবে আমি যেমন কাছাঢিলা মানুষ, তাতে অনেক কিছুই ভাঙার মত অবস্থা হতে পারে।

“এর চেয়েও জরুরী হল দ্বিতীয় ব্যাপারটা। তুমি পাশের ঘরের মেয়েটাকে দেখেছো? ও আমাদের সাথে আছে আজকে পাঁচ বছরের বেশি। প্রথম যখন এসেছিলো, তখন কম্পিউটারের কিছুই জানতো না। ওকে কাজের শেষে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসবে। এটাই তোমার একমাত্র কাজ। এই কাজটা নিয়মিত ঠিক মত করতে পারলে তোমার আর কোন চিন্তা নেই। আমি এক জোড়া মেয়ে পেলে বড় করেছি। টাইমস আর নট দ্য সেইম এনিমোর।”
অবশ্যই মনে থাকবে। হ্যাঁ, ও মানা করলেও জোর করে দিয়ে আসবো গাড়ি পর্যন্ত। কোন ভয় নেই, ভুল হবে না এই ব্যাপারে আমার। আমার বিপদচেতনার মাত্রা আরেকটু বেশি হলেও আমি ব্যাপারটা খেয়াল রাখবো।

“ভেরি ওয়েল, দেন। তুমি প্রথম মাস ছয়েক এখানেই কাজ কর, তারপর বাসা থেকেই কাজ করতে পারো চাইলে। কাজের সময় নিয়ে চিন্তা কোর না। তুমি চাইলে রাতে রাতেও কাজ করতে পারো। অথম্যান আর আমার তো ভোর চারটায় দেখা হয়। ও বাড়ি ফেরে, আমি কাজে ঢুকি।”

...

“কী ব্যাপার, মন খারাপ কেন?”
আমার প্রথম ইলেকট্রনিক্স পরীক্ষার খাতা দিল। বীভৎস অবস্থা।

“আরে এগুলো কোন ব্যাপার না। কত পরীক্ষা আসবে যাবে। আমি জানি তুমি ভালই করবে। তোমার মাথা ভাল।”
লক্ষণে তো তেমন বলছে না। আমি আসলে এই প্রথম অনলাইনে গ্রেড পোস্ট হতে দেখলাম। শুরুতে স্রেফ শূন্য দেখাচ্ছিলো। পরীক্ষা খুব খারাপ দিয়েছিলাম। কোন প্রশ্নেরই পুরো উত্তর ঠিক করতে পারিনি। পার্শিয়াল মার্কের ভরসায় ছিলাম। জীবনে কখনো শূন্য পাইনি। কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছিল আমার। একটু পরে দেখি ৬৯ হল সেটাই।

“হাহ হাহ, তুমি তাহলে গ্রেড পোস্টিং শেষ হওয়ার আগেই সিমেস্টার বুক দেখছিলে? একই সাথে তুমি আর ইন্সট্রাক্টর। মজাই। আমাদের কালেই ভাল ছিল। আমি পড়ানোর সময় খাতা নিজের হাতে দিলাম, ওল্ড স্কুল, ওল্ড ডেইজ। তখন এসব ঝামেলা ছিল না। অযথা তোমার কত্ত টেনশন গেল। অন্তত খাতা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ছাত্ররা শান্তিতে ঘুমাতে পারতো।”
শূন্য পাইনি, এটা বিরাট একটা সান্ত্বনা, কিন্তু তবুও সি দিয়ে শুরু করলাম অযথা। নিজের উপর মেজাজটা খুব খারাপ হয়ে আছে।

“আমি কীভাবে গ্রেডিং করতাম সেই গল্প বলি তোমাকে। ধর একজন ছাত্র তিন পরীক্ষায় ডি, সি, এ পেল। ফাইনালেও এ পেলো। সিমেস্টার গ্রেডে আমি তাকে এ দিতাম। কারণ, শুরুতে কিছুটা কম বুঝলেও শেষতক সবটা বুঝে নিয়েছে, এমন কাউকে আমি কেন প্রথম পরীক্ষার জন্য বি দেবো, বল?”
আহা, আমাদের টিচাররা যদি এমন হত! এখন তো একটা বাজে পরীক্ষা দিলেই হিসেব করতে বসি আদৌ কোর্স রাখবো, নাকি ড্রপ করে দেবো।

“নাহ, এভাবে ভেবো না। আমার এক শিক্ষক আমাকে একবার বলেছিলেন, দ্য ডিফরেন্স বিটউইন অ্যান এ অ্যান্ড এ বি ক্যান বি ইওর মেন্টাল হেলথ।”
ওয়াও! খুবই ওজনদার কথা। একটু ভাল লাগছে তোমার কথা শুনে। থ্যাংক্স, ডন। আমি কাজে ফেরত যাই এবার।

“উহু, একটু দাঁড়াও। এই যে দুই টাকা। ছোট বেলার কথা মনে আছে? যখন বাসার পাশ দিয়ে টুংটাং আওয়াজ করে আইসক্রিমের গাড়ি যেতো, বাবা আইসক্রিম কিনে দিলে খুশিতে লাফাতে? মানুষের ভেতর থেকে এই ব্যাপারগুলো কোনদিন যায় না। গো হ্যাভ সাম আইসক্রিম। ভাল লাগবে।”
না না, এটার কোন দরকার নেই। মেন্টাল সাপোর্টটার জন্য অনেক ধন্যবাদ। নিজের মত হজম করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে আর না বলে পারলাম না।

“বলে খুব ভাল করেছো। ব্যাথাগুলো কখনো বুকে চেপে রাখতে নেই। তুমি ক্যাম্পাসে একটু হাঁটাহাঁটি কর আর কিছু আইসক্রিম খাও গিয়ে। না, আমি কোন কথা শুনবো না। তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছো যে আমি তোমার বস। আই অ্যাম অর্ডারিং ইয়ু টু গো অ্যান্ড টেক এ ওয়াক অ্যারাউন্ড দ্য ক্যাম্পাস। ডোন্ট বদার অ্যাবাউট দ্য ক্লক। আইল পে ইয়ু ফর ইট।”
আরে! ৮৯! কার্ভ! জীবনে এই প্রথম অন্যের দুঃখে সুখী হলাম।

“হ্যাঁ, দেখবে অনেক কিছুই এরকম। তুমি মনে হয় কার্ভ পাওনি তোমাদের ওখানে। এনিওয়ে, টাইম ফর সাম আইসক্রিম।”

...

“তুমি দেখলাম এই সপ্তাহে কম ঘন্টা কাজ করেছো। শরীর খারাপ নাকি?”
না, টাইমশিটে প্রতি মিনিটের হিসাব ঠিক রাখার চেষ্টা করেছি। শেষ দিকে এসে ঘন্টাগুলো পোষাতে পারিনি।

“ডোন্ট বদার। শুধু এখানে কাজ করা সময়টুকু ধরবে না। আমার মতে, তুমি যেই সময়টায় কাজ নিয়ে ভাবছো, সেই সময়ের জন্যও পয়সা পাওয়া উচিত। কাজের সময় যদি নিজের কাজ করা দোষের হয়, তাহলে নিজের সময়ে কাজ করলে কেন স্যালারি পাবে না, বলো?”
পৃথিবীর সব বস যদি তোমার মত করে চিন্তা করতো!

“জীবন নিয়ে কিছু মৌলিক ব্যাপার বলি। দু’তিনটা অভ্যাস কষ্ট করে হলেও করবে। প্রথমটা হল, লার্ন টু লিভ ইয়োর ওয়ার্ক ইন দি অফিস। আমি এই টেবিল থেকে ওঠার পরে কাজ নিয়ে কিচ্ছু ভাবি না। আমি অনেক ভোরে উঠি। বয়স তো কালে কালে বাহাত্তর হয়ে গেলো। কিছু জগিং করি, গোসল করি, তারপর কাজে চলে আসি সকাল সাতটার আগে। চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে উঠি, এবং এরপর আগামী দিনের আগে কাজ নিয়ে কিচ্ছু ভাবি না।”
এই ব্যাপারটা আমার জন্য কষ্টের। করতে পারলে খুব ভালো হত। আমার জীবনটা বিভিন্ন রকম কারণে খুব জট পাকিয়ে আছে। সবদিকের নিজের সবটুকু দিচ্ছি, কিন্তু অহেতুক অনেক ঝামেলা এসে জড় হয় বারবার। ছাত্রজীবন এমনিতেও এভাবে কাজ ছেড়ে দেবার মত না।

“তা ঠিক। সে-কারণেই আমরা আমাদের অফিসের নিয়মগুলো এভাবে ঠিক করেছি। তোমার লেখাপড়া সবার আগে। কাজগুলো এমন জরুরী কিছু না যে সেটা তৎক্ষণাৎ করতে হবে। ঘন্টা পুরো করার চেয়ে কাজ সমাধা হওয়া জরুরী বেশি। যখন খুশি, যেখানে খুশি, যেভাবে খুশি কাজ করবে। কাজ হবে আনন্দের।”
চেষ্টা করে দেখতে হবে। এটার সুফল হিসাবে জীবনটাও হালকা হওয়া উচিত, আশা করি। পেপার লেখার চাপ এসে পড়লে একটু বেশিই এলোমেলো হয়ে যায় আর কি সব। না, বল নি তোমার ডিসারটেশন লেখার গল্প। ক্লজেটে ঘুমাতে? কোথায়? ডিপার্টমেন্টের ক্লজেটে হয়ে থাকলে তো ঝাড়ুদারের সাথে ভালো খাতির ছিল তোমার। এসি ছিল না? এটাও নাহয় সহ্য করা যায়। আমি তো গরম দেশ থেকেই এসেছি। না, শেষটা বিশ্বাস করতে পারলাম না। এক রাতে পুরো ডিসারটেশন? রাত নয়টা থেকে ভোর চারটার মধ্যে ডিসারটেশন লেখাটা মোটামুটি ইনসেইন একটা ব্যাপার।

“ইউ গটা ডু হোয়াট ইউ গটা ডু।”

...

“অসংখ্য ধন্যবাদ আমার বাসায় আসার জন্য। আমার নিজেকে খুব বেকুবের মত লাগছে। এত সাধারণ ব্যাপারে তোমাকে ডেকে আনলাম।”
উহু, এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার একদমই কারণ নেই, ডন। আমার কাছে এগুলো খুব একটা ট্রিকি কিছু না। উই অল হ্যাভ আওয়ার পেট প্যাশনস। এটা সেরকমই। তোমার নাতি-নাতনির ছবিগুলো খুব সুন্দর। দাঁড়াও, পিকাসা ইনস্টল করে দেই। খুবই গোছালো অ্যাপ্লিকেশন। আরে এত উচ্ছসিত হওয়ার কিছু নাই। ক্রেডিট আমার না, গুগুলের।

“তুমি জানো না আমার কাছে এটার মূল্য কতটুকু। এই ছবিগুলো আমি অনেক দিন ধরে খুঁজছিলাম। এরকম সফটওয়্যার খুঁজলে অনেক মিলবে। তবে এটা ব্যাবহারের চিন্তাটুকু তোমার মাথায় আসাটা একটা লাইফ-সেভিং ব্যাপার আমার জন্য।”
দ্য প্লেজার ইজ অল মাইন।

“এই নাও, এটা রাখো।”
আরে এ কী? ইউ আর ফ্যামিলি, ডন। আমি এই সামান্য কাজের জন্য তোমার কাছে টাকা নেবো কেন? আমি তো মলের দিকে আসছিলাম এমনিতেই। আমার মায়ের কাজ শেষ, তুলে নিয়ে যেতে আসতাম।

“তুমি কি আমাকে মৃত দেখতে চাও? আমার বৌ আমাকে স্রেফ মেরে ফেলবে। শি ক্যান বি প্রিটি মিন সামটাইমস।”
তোমার মত দুর্ধর্ষ মানুষও এরকম করে বলছে, শুনে মজা লাগছে খুব।

“হিয়ার ইজ এ সিক্রেট ফর ইউ। তুমি সেদিন বুঝবে তুমি বড় হয়েছো, যেদিন তুমি মুখ বন্ধ করে মনে মনে এক থেকে বিশ পর্যন্ত গুনতে পারবে।”
এটা আবার এমন কী?

“এটা বিশাল ব্যাপার। এটা সংসারে শান্তির প্রথম শর্ত। আমি খুব রাগী মানুষ। আমার মুখের একদম আগায় সব আগ্রাসী কথাবার্তা বাসা বেঁধে বসে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো আমি জিভ কামড়ে মনে মনে চুপ করে থাকি, গুনতে থাকি এক থেকে। এগারো-বারো আসলে দেখবে রক্তগুলো মাথা থেকে একটু একটু করে নামছে, পনেরর দিকে এসে শরীর একটু ঠান্ডা লাগে, আঠারোর দিকে আসলে দেখবে পৃথিবী আসলে খুব সুন্দর একটা জায়গা।”
আমি বহু চেষ্টা করলেও হয়তো সাত পর্যন্ত যেতে পারবো। সাইলেন্স ইজ ব্লিস। বোবার কোন শত্রু নাই। এমনি এমনি তো আর বলে না।

“দেন কিপ ওয়ার্কিং অন ইট।”

আমি ছাত্র, তাই

মাঝে মধ্যে মনে হয় স্রেফ বসে থাকি। কিচ্ছু না করে, কোন দিকে না তাকিয়ে, কোন চিন্তায় না ভেসে। স্রেফ বসে থাকি। অলস, অচল, অসার সময় কাটাই কিছু। জানি ভুল, তবু সময় নষ্ট করি হেলায়। আবার কখনো খুব বেশি ইচ্ছা করে কিছু করতে। ‘কিছু’। কী, জানি না। তবে ‘কিছু একটা’। খুব অস্থির লাগে। কখনো উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে বেড়াই, কখনো পথের পাড়ে অচেনা কারো সাথে আড্ডায় মশগুল হয়ে যাই, কখনো ঘাসের পালঙ্কে শুয়ে আকাশ দেখি।

কোন কোন দিন এক রিকশায় চার-পাঁচ জন চড়ে বসি। জান্তব ফোঁসফোঁস আওয়াজে দম নিতে নিতে এগিয়ে চলে রিকশা। আমরা তখন হুডখোলা রিকশায় নগরদর্শনে ব্যস্ত। উঁচু দালানগুলোর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হই, গল্প করি দূর ভবিষ্যতে কে কেমন দালান বানাবো তা নিয়ে। রিকশাওয়ালার পিঠবেয়ে নেমে আসা ঘামের রেখাগুলো ধীরে ধীরে মূর্ত হয়ে ওঠে চিত্রকল্পের মত। এই চিত্র কিছু পরেই বদলে যায়, চোখে পড়ে না আমাদের। এই আমিই কখনো বিকেল কাটাই তাদের সাথে। বুড়ো চাচাকে বলি আমার পাশে সিটে বসতে, জিজ্ঞেস করি কোথায় ঘুমান উনি, কত টাকা জোটে দিনে, কোনদিন পকেট উলটে শেষ পয়সাটাও দিয়ে দেই।

একেকদিন মেয়ে-ছেলে দেখে লোলুপ চোখে তাকাই। চোখ দিয়ে চেটে দেই যেন। পাশের বন্ধুকে বলি বিশ্রী সব চিন্তার কথা। শিশ বাজাই, চোখ মারি, কামাতুর হয়ে ঠোঁট কামড়াই। এই আমিই বাসে গর্জে উঠি মেয়েদের গায়ে কেউ হাত লাগালে। আমারই সামনে অন্য কেউ শিশ বাজালে এই আমারই কেন যেন গা জ্বালা করে।

বাজারে গেলে হাত নিশপিশ করে যা পাই তা কিনতে। কিনতে না পারি তো মনে হয় স্রেফ আলগোছে মেরে দেই। খুব উশখুশ লাগে। নিষিদ্ধ রোমাঞ্চে কেমন যেন হাল্কা লাগে পা জোড়া। স্বপ্নে ভেসে যাই। এই আমিই আদ্ধেকটা খেয়ে খাবার দিয়ে দেই পাশের নাকশি ভেজা, পেটফোলা, ছেঁড়া হাফপ্যান্ট পড়া কৌতূহলী জীবটাকে।

আয়না সামনে পেলেই কেমন যেন পালোয়ান হয়ে যাই। কখনো ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন তো কখনো মাসুদ রানা। আলতো শ্যাডোর সাথে উড়ে যায় ম্যাচজয়ী ছক্কাগুলো, মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে সোহানা চৌধুরীরা। ওয়েস্টার্ন মুভি মনে পড়ে। ঘোড়া ছুটিয়ে যাই ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মত। হাইয়ো সিল্ভার, আওয়ে! সামান্য ঝগড়া থেকে বন্ধুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি প্রায় বিকেলেই। এক বেলা জিতি তো আরেক বেলা হারি। গতরে না পারলে বচনে পুষিয়ে দেই। কখনো বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে বীর, কখনো ছায়ার সাথে। তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর ঘটনায়ও আমি হাতা গুটিয়ে এগিয়ে যাই দু’কদম। আবার এই আমিই কখনো পিঠ পেতে ঠেকাই নিপীড়িত বন্ধুকে। একটুও ফিরে তাকাই না, একবারের জন্যও প্রত্যাঘাত করি না। আঘাত করতে যাবার ফাঁকে যদি আমার আশ্রিত বন্ধুর গায়ে লাঠি পড়ে, সেই ভয়ে পরম স্নেহের বাতাবরনে ঢেকে রাখি তাকে।

ঘরে বাবার চেয়েও আমার দাপট বেশি। বাবা যতই উপার্জন করুক, আমার ভাগের খাবারটাই সময় মত আসা চাই। আমার ভাগের রুটিটাই গোল হতে হবে, আমার রুটিটাই পোড়া হতে পারবে না। কোনবেলায় আমিষ না থাকলে আমার মুখ ভার হয়ে থাকে। সবজি মানুষে খায় কিনা, এই নিয়ে আমি ক্ষিপ্ত মত রাখি। এই আমিই বাঁকা-ত্যাঁরা রুটি বানাই বন্যার্তের জন্য। পঁচা পানি ভেঙে মিশে যাই বানভাসির সাথে। এই আমিই সব অহম জলাঞ্জলি দিয়ে প্রবাসের পথে বসে ভিক্ষা করি দেশের জন্য দুটো টাকা জোগাড় করতে।

পড়ার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াই সবান্ধব। ক্লাস বাদ দিয়ে টুয়েন্টি-নাইন খেলি ক্যাফে কাঁপিয়ে। ক্লাসে যাই তো নাক ডেকে ঘুমাই। জেগে থাকলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করি কল্পনাযোগ্য সব রকম নষ্টামি করে। বিকেল হলে দল বেঁধে মাঠে যাই খেলতে। সন্ধ্যা হলে আড্ডায় জমে যাই চা-বিস্কুট সমেত। রাত বাড়লে কোনদিন তেহারি তো কোনদিন বিরিয়ানি। খেলা দেখবো বলে ক্লাস ফাঁকি দেই। বড় কিছু হলে হল্লা-হুল্লোড় করে সব বন্ধ করে দেই। এই আমিই রাত জাগি সমীকরণ সমাধান করতে। গন্ডা খানেক টিউশনি আর পানসে ডালে ভর করে এই আমিই একটি একটি করে দিন অতিপাত করি নতুন দিনের আশায়। জীবনের গতির সাথে তাল রাখতে না পারলেও জীবনের গভীরতা চিনতে চাই কেন যেন।

একটু চাপ আসলেই আমি ঝোপ খুঁজে বসে পড়ি। দেওয়াল দেখলে চতুষ্পদের মত নিজের উপস্থিতির চিহ্ন রেখে যাই। কেউ গাছের ছেলা বাকল দেখে আমাকে মনে করে, কেউ দেওয়ালপাড়ের গন্ধে বাধ্য হয় আমাকে মনে করতে। আমি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলি ইমারতের প্লাস্টার। আবার পুরনো দালানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমিই গর্বিত হই এর ঐতিহ্যের অংশ হতে পেরে। আমিই দেওয়াল দাগাই, আমিই দেওয়ালে চড়ি, আমিই দেওয়াল ভাঙি, আমিই দেওয়াল হয়ে দাঁড়াই।

একটু চোখ রাঙালেই আমি চুপ হয়ে যাই, আবার ট্রাক-ট্যাঙ্কের সামনে আমি দাঁড়িয়ে যাই জগতের সবটুকু প্রতিবাদের মূর্তি হয়ে। আমি পথে ধাক্কা দিয়ে চলে যাই, বাসে সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমি শাহরুখের মত বুকফাড়া জামা পড়ি, আবার রাতজেগে বসে থাকি নববর্ষ বরণ করতে।

আমি পানির মত ভাসমান কখনো। বাঁধনগুলো আমি বাতাসের মত এড়িয়ে যাই কখনো। ধরিত্রীর মত সহিষ্ণু এই আমিই আগুনের মত জ্বলে উঠি অপমানের বদলা নিতে। নিজে না খেয়ে যাকে খাওয়াই, তাকেই প্রতিরোধ করতে আমি দেহের প্রতিটি উপশিরাকে মেরুদণ্ডে পরিণত করি কখনো। অনেক দুর্নীতি দেখেও আমি নিথর, আবার সামান্য অপনীতি দেখেও আমার চামড়ার ভেতরে-বাইরে জ্বলে ওঠে একসাথে।

অনেক দ্বন্দ্ব আমার। আমি ছাত্র, তাই।

প্রবাসের কথোপকথন ৯

“ইয়া, গিম্মি আ ডা’ খৌক উইথ দ্যাট প্লিজ।”
ডা’... আহ, কম্বো অ্যান্ড ডায়েট কোক, দ্যাট’ল বি সিক্স ফিফটি সেভেন ফর ইয়ু, ম্যাম।

“আ’ল লাভ ইয়ু ফর লাইফ ইফ ইয়ু কুড অ্যাড সাম রুট বিয়ার টু ইট।”
কোন ব্যাপার না। আপনার জন্য সব সই। পারি তো খাবারটাও মুফতে দিতাম। ছয় টাকা সাতান্ন পয়সা। অশেষ মেহেরবানি আপনার, হ্যাভ আ নাইস ওয়ান!

“ওহ, দ্যাটস সো সুইট অফ ইয়ু। ইয়ু হ্যাভ আ নাইস ওয়ান ঠু, হানি।”
(আহ, আই লাভ দ্য সাউথ! ধরায় কোথায় এমন চপলা, হেলিয়া দুলিয়া, হাসিয়া ঢুলিয়া, কহিবে অধমে প্রেম জাগাইয়া, শুধাইছো আমায় এত যতনিয়া!)

“আই বাইট!”
(ডাকু মেয়ে! বুকে লিখে ঘোষণা দিয়ে কামড়ায়! তাকাতে দেখে ফেললো না তো? আমার দোষ কী? আমি তো মাথা উঁচু করেই আছি! আমার মাথা অতটুকু যাওয়া তো আমার দোষ না। নাহ, ছয়ফুটিদের দেশে সাড়ে পাঁচ হওয়ার মত কিছু নাই।)

“স্টেয়ার অ্যাট ইওর ওউন রিস্ক!”
(মজার মেসেজ। নাহ, এর পরেরটার দিকে আর তাকানো যাবে না। বেশি খেতে গিয়ে না শেষে ঝামেলায় পড়ি।)

“ঐ লাল সসটা আছে? ঐ যে, মিষ্টি মিষ্টি সস একটা। লাল রঙ।”
সুইট অ্যান্ড সাওয়ার সস। আছে, এই যে নাও। আর কিছু?

“ওহ, আই লাভ ইট। এগ রোল খুবই মজা এটার সাথে।”
কী জানি, আমার তো ভাল লাগে না অত। ঝাল খাও? ঝাল খেলে চিলি সস নিয়ে দেখতে পারো। ওটা বেশি মজা ভাজি কিছুর সাথে।

“ওরে বাবা। নাহ, আমি ঝাল খেতে পারি না তেমন একটা।”
কোন ব্যাপার না। এখানে সবাই খুব মাইল্ড খাবার খায়। তোমরা যেটাকে স্পাইসি বল, সেটা আমাদের কাছে কিছুই না।

“ও বৌ, কী নিবা তোমার খাবারের সাথে? একটা বড় মিস্টার পিব আমাদের জন্য? এই যে দেখ, এই ছেলেটা এখনই টাকা চাবে। এরা শুদ্ধু আমার টাকা চায়। শুনো, এই যে বললো...”
ইয়ু হ্যাড আ নাইস ডে, স্যার?

“হাহ, হাহ, হাহ...”
ইটস স্টিল থার্টিন ফিফটিন, দো!

“হে, হোল্ড দি আইস, ম্যান।”
জ্বী, বুঝলাম না, স্যার। বরফগুলো তো ঠান্ডাই আছে। বিশেষ কিছু করতে হবে? না, মানে আর কী করতে হবে বুঝলাম না।

“হি মিনস নো আইস, প্লিজ।”
ওহ! থুক্কু। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, ম্যাম। বেকুবের মত একটা প্রশ্ন করে ফেলেছিলাম। বাঁচালেন।

“অয় মাইট, অ্যাভিং আ গ্র্যান্ড ডে দেয়ার? বিজি? লুকস লাইক বিজনেস ইজ গুড টুডে।”
হ্যাঁ, চলে যায়। লোক ভালই। লম্বা দিন। আমাদের জন্য তো একই রকম, তবে ম্যানেজার খুবই খুশি। ডগমগ করছে, দেখছো না? আমাদের তো আর শনিবারে কোন কমিশন নেই। বরং ভাল কাজ করলে যেন শাস্তি হিসাবে শনিবারে ডেকে আনা হয়।

“রিফিল প্লিজ, স্যার।”
ফিফটি সেন্টস, প্লিজ।

“হোয়াট? হাউ মাচ?”
ফিফটি সেন্টস। ফিফটি সেন্টস। এর... ফিট্টি সেন’স, স্যার। কোন ধরনের ড্রিঙ্ক দিবো?

“আহ, ফিট্টি সেন’স। রু বিয়াহ, প্লিজ।”
এই যে আপনার রুট বিয়ার।

“আই মে নট বি পারফেক্ট, বাট পার্টস অফ মি আর প্রিটি অসাম।”
(সুন্দরী, তোমার মত পুতুলও যদি এরকম বলে, তাহলে যাই কোথায়?)

“তোমাদের এখানে কোন ভেজিটেরিয়ান মিল আছে?”
ভাত আছে, লোমেইন নুডুলস আছে, এবং কিছু মিক্সড ভেজিটেবল আছে। এতে হবে? না, এগ রোলেও কিছু চিকেন আছে। ভেজিটেবল এগ রোল করে দিতে পারি কিছু। স্যার, ইয়ে, কিছু ক্র্যাব র্যা ঙ্গুন নিতে পারেন। দুঃখিত। আমি শুনেছি যে আপনি সবজি খাবেন শুধু। ওটায় কোন কাঁকড়া নেই। শুধু ক্রিম চিজ। আমি তো নাম দেই নাই এরকম। ম্যানেজার বলতে পারবে হয়তো।

“আই অ্যাম ব্যাড উইথ নেমস, ক্যান আই জাস্ট কল ইয়ু ব্যাডঅ্যাস?”
না, মিষ্টি আলু ঠিক চাইনিজ খাবার না। সকালে বিক্রি করি নাস্তার জন্য। জানি, জানি। আমারও বেশ মজা লেগেছিল প্রথমে। তবে খেতে খুব মজা। চেখে দেখবেন একটা? মজা না? জানতাম পছন্দ হবে। দিয়ে দেই কিছু? মাত্র এক ডলার বেশি লাগবে মাত্র। পছন্দ হবে তোমার। নাও তো। পঞ্চাশ পয়সা দিয়ো নাহয়।

“গিম্মি ব্যাঁক?”
এক্সকিউজ মি! দিলাম তো তোমার খুচরা পয়সা। এই যে, তিন টাকা তেতাল্লিশ পয়সা।

“নোঁ, ইয়ু গিঁভ মি ব্যাঁক টুঁ ক্যাঁরি?”
আহ, ব্যাগ! স্যরি অ্যাবাইট ইট, ম্যাম। হিয়ার ইয়ু গো।

“ইয়ু ওঁয়ার্ক ছাইনিজ, ইয়ু নোঁ আন্ডাস্ট্যাঁ?”
ভুল হয়ে গেছে। আসলে, লোকজন বেশি তো, একটূ অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম। আগের জনের সাথে মিলিয়ে ফেলেছিলাম। কিউট ড্রেস, বাই দ্য ওয়ে!

“আই অ্যাম নট অ্যাজ ইয়ু ড্রাঙ্ক অ্যাজ থিঙ্ক আই অ্যাম।”
মজার লেখা। হ্যাঁ, টি-টা সুন্দর। নাহ, দিন ভালই। তা একটু ব্যস্ত, তবে আরো ব্যস্ত দিন যায়। অবশ্য সেটা শপিং মলে না। ক্যাম্পাসের পাশে। খেলার সময়। ওহ, ম্যান। এই সিজন পুরা ঝাকানাকা হবে। জামার্কাস কি ড্রাফটে নাম্বার ওয়ান হবে বলে মনে হয় তোমার? আমারো মনে হয় ওর হওয়া উচিত। তবে ভয় একটাই। ওকল্যান্ডে যে যাবে তারই ক্যারিয়ার নষ্ট, এইটাই সমস্যা। এক দিকে প্রেস্টিজ, আরেক দিকে প্রতিভার অপচয়। এক্সাক্টলি! আমিও তাই বলি...

“হে আমিগো, ...”
জ্বী, আমি স্প্যানিশ বুঝি না। কী ড্রিঙ্ক নেবেন? জ্বী, বুঝলাম না ঠিক।

“হাবলা এস্পানিওল?”
না। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ। ঐ যে, ইন্ডিয়ার পাশে। আমি স্প্যানিশ বলি না। আমি স্বজাতবিদ্রোহী না। সত্যি বলছি। কী ড্রিঙ্ক নেবেন, প্লিজ?

“কক! কক ফর মাই ফ্রেন্দ তু।”
হোয়াট? ওহ, ইয়েস। আপনার জন্যও কোক? আপনিও। জ্বী, আপনার জন্যও। এই যে চার গ্লাস কোক। না, না। কোন ব্যাপার না। আমি কিছুই মনে করি নাই। আমার আসলে কিছু স্প্যানিশ শেখা দরকার চাইনিজে কাজ করার জন্য।

“কী, ভাই, বেচাকিনি কেমন? রাইন্ধা কুলাইতে পারতেসি না, বোজলেন নি?”
এই তো চলে। কিচেনে কী অবস্থা? ভীড় তো ভালই মনে হচ্ছে। স্যাম্পল এই হারে দিলে আরো লোক আসবে। আপনি তো ভিতরে আছেন, ঝামেলা বেশি হবে আপনার। অন্যভাবে দেখলে, একটু হলেও তো বসতে পারেন। আমার তো একটানা দিতে দিতে জান শেষ। এত করে বলি একটা লোক নিতে, তবু খাটাশের মত খাটাবে আমাকে একাই। কিপটার জাত সব। আমারও মাজায় ব্যাথা রে ভাই। এই একবেলায় পনের বালতি বরফ টানলাম।

“হে ম্যান, আমাকে কিছু বাড়তি দাও না। খাস দিলে দোয়া করবো। আরে ম্যানেজার আছে তো কী হয়েছে? দাও তো আরেকটু। ঐটাই ম্যানেজার? হোক। দাও তো একটু বেশি। নাহ, তুমি মানুষ ভাল না। ড্রিঙ্কের জন্যও টাকা দিতে হবে? ডাকাত নাকি তোমরা?”
মিডিয়াম কুলেইড, রাইট, স্যার? হাউ ডু আই নো? ডোন্ট ওয়োরি অ্যাবাইট ইট। জাস্ট এনজয় দ্য মিল। কীভাবে জানি? তিন ঘন্টা ড্রিঙ্ক ঢাললেই বুঝে যাবেন আপনিও। উহু, তেমন কিছু না। নেক্সট ইন লাইন, প্লিজ।

“কেমনে বোজলেন কী নিবো? আপনে তো দেহি কওনের আগেই ঢাইলা ফেলেন।”
গায়ের রঙ। কালোরা সোডা খায় না। সবার আগে নিবে কুলেইড বা ফ্রুট পাঞ্চ। না থাকলে লেমোনেড অথবা অন্য যেকোন রঙ্গিন পানীয়। তাতেও না হলে স্প্রাইট। এর বাইরে কখনই না। সাদা মেয়েরা নিবে ডক্টর পেপার। অখাদ্য, কিন্তু তবু ওটাই নিবে। বয়স্ক মহিলারা নিবে পানি নয়তো ডায়েট কোক। পেট দেখা গেলে ডায়েট কোক, দেখা না গেলে আইস ওয়াটার। ছেলেরা নিবে কোক। আমেরিকান বাদে যেকেউ শুধুই কোক নিবে। সবজিরা বরফ ছাড়া, বড়সড় মহিলারা বেশি বরফ দিয়ে, কালো লোকেরা কম বরফ দিয়ে। ভারতীয় আর মেক্সিকান হলে আলাদা করে চিলি সস নিবে, সাদা মেয়ে হলে সুইট অ্যান্ড সাওয়ার সস চাবে।

“সেইভ দ্য ড্রামা ফর ইয়োর মামা।”
কী ড্রিঙ্ক নেবেন বুঝতে পারছেন না? ইয়ু ওয়ান্ট আ মিস্টার পিব, ম্যাম। ইয়া, ইটস দ্য সেম অ্যাজ ডক্টর পেপার। হাউ ডু আই নো? হাহ, হাহ। না, আপনার বয়ফ্রেন্ড তো বয়ফ্রেন্ড বলেই জানে না। আমি ড্রিঙ্ক সার্ভ করি বলেই আমি জানি আপনি এটা নেবেন। এগ রোল দেই একটা সাথে? মাত্র ভেজে আনলো। বেশি না, মাত্র নাইন্টি নাইন সেন্টস। সাথে কিছু ট্যাক্স, অফ কোর্স। ক্যাশ অর ক্রেডিট? আমরা পঁচিশ পয়সা চার্জ করি ক্রেডিট কার্ডের জন্য। গোস্যা করবেন না তো এটায়? সাকুল্যে সাত টাকা সাতাত্তর পয়সা। না, ফোর নাইন্টি নাইন তো ড্রিঙ্ক ছাড়া। সাথে বাড়তি এগ রোল আর কার্ড প্রোসেসিং ফি। দাম বেশি? ওয়াও, জামাটা কার জন্য কিনলেন? বয়ফ্রেন্ড? আমারো একটা ছিল এমন।

“মাস্তি মে হো, সাহাব?”
মাস্তি? নট অন দিস সাইড অফ দ্য কাউন্টার, ব্রাদার! এ কী, এই মাংস নিলে কেন? হ্যাঁ, এটা চিকেন, কিন্তু এটাতে তো কুকিং ওয়াইন দেয়। ভেজি এগ রোল তো ভাজে পর্ক এগ রোলের তেলেই। পর্ক এগ রোল? ওহ, ঐ যে চিকেন বলে বিক্রি করছে, ওটাই পর্ক। ভাত বা নুডুলস নিয়ে সস দিয়ে খাও। এই দোকানের ভাত কিন্তু ভাল। বাঙ্গালি ভাই রান্না করেন পিছনে। আরে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নাই। ব্রাদার হারাম খেলে তো আমিই জাহান্নামে যাবো।

“নামাসঠে! আপ খ্যায়সে হো?”
বাহ, ভাল হিন্দি জানেন তো আপনি। ছিলেন নাকি ওখানে? ইয়া, নামাস্তে টু ইয়ু ঠু।

“আপ হিন্ডি বোলটে হো?”
আমি টুকটাক বুঝি, তবে বলি না। না, বুঝলেও বলি না। আই ॥মেক আ ফুল অফ মাইসেলফ ইনাফ টাইমস আ ডে। হোয়াই বদার ডুইং ইট ওয়ান্স টু মেনি?

“আই উইশ মাই বয়ফ্রেন্ড’স ওয়ালেট ওয়াজ অ্যাজ বিগ অ্যাজ হিজ বাকল।”
না, ফর্চুন কুকি ফ্রি না। মাফ করে দেন, ম্যাম। আমি আসলেই জানি না কেন ফ্রি না। টেক্সাসে ফ্রি হলে আমি কী করবো, বলেন? আমি তো ছাপোষা লোক। আচ্ছা ঠিক আছে, এই যে নেন। না, দাম দিতে হবে না। আমি টিপ জার থেকে কিছু রেখে দিচ্ছি এখানে। বেস্ট অফ লাক!

“হৈ! কিয়ারলেন এইডা? আপনের বাশক থেইক্কা নিয়া রাখলেন ক্যান?”
এমনি। কী দরকার ঝামেলা করে, বলেন? আর, কয়টাই বা পয়সা। অযথা দোকানের বদনাম। না দিলে নাই। আমি তো বাড়তি টাকা চাই না এটার জন্য। মামুলি কয়টা পয়সার জন্য লোকগুলো অযথা আমাকে গালি দিবে সারাজীবন। আমাকে দিলেও ঝামেলা ছিল না, দিবে তো আমাদের পুরা জাতকেই। বাকিরা কী করে জেনে কী লাভ, বলেন? আমার মন চাইলো, দিয়ে দিলাম।

“এই, কী কর এগুলো? আমার গায়ে গরম মাংস ফেললে কেন?”
আমি তো শুধু ফ্রেশ মাংসের ট্রে বসালাম, ম্যাডাম। এখান থেকে তো আপনার গায়ে মাংস পড়ার কথা না।

“আ পিস অফ হট মিট ফেল অন মি!”
পড়ে থাকলে আমি খুবই দুঃখিত, ম্যাডাম। আমি সাবধানেই রাখছিলাম। রাখার আগে তো আপনাকে একটু পেছনে সরে যেতেও বললাম, যাতে কিছু না লাগে।

“আমার গায়ে গরম মাংস পড়েছে! আমার জিন্সের উপর পড়েছে এটা। পুড়ে গেছে ভেতরে। আমাকে বেশি করে মাংস দাও, আর সাথে একটা ফ্রি এগ রোল দাও। ম্যানেজারকে ডাকবো আমি নয়তো। সিকিউরিটি কোথায়?”
(কপাল ভাল তোকে আমি কোন দিন আরামবাগের চিপায় পাবো না। ছাল তুলে ফেলতাম, বেটি। জামায় দাগ নাই, ফ্লোরে মাংস নাই, আসছেন উনি একটা সোরগোল তুলে আমার চাকরি খেতে। সাধে লোকে দেখতে পারে না তোদের? ঠিকই করে ম্যানেজার। এমনই করা দরকার তোদের সাথে। ধ্যাৎ, মুডটাই মেরে দিলো। ভাল্লাগে না আর এই সব। আমার পাখিশাস্ত্র নিয়ে থাকাই ভাল ছিল। আউচ, দুর্ধর্ষ পাখি আসছে একটা।)

“গেট আ লাইফ!”

প্রবাসের কথোপকথন ৮

“ঈদ মুবারক, দুবলা!”
ঈদ মোবারক, ভাইয়া। এই নিয়ে ছয়বার হল একদিনে।

“কী করবো বল? প্যাদরা নাই, ঘটি নাই, তাই তোমাকেই বলি বারবার।”
সেটাই। আপনি আর আমি ছাড়া এই ঘরে কেউ নাই।

“এই ব্যাটা, ভাগ! কী সব অশ্লীল কথাবার্তা বলিস।”
মন বড়ই উতলা, ভাইয়া। আর কাউকে তো কিছু বলার নাই। তাই আপনার সাথেই ঈদের দিনের আন্তরিক সময় কাটাই।

“হ্যাঁ, কেউ নাই আসলে এই ঈদে।”
মন খারাপ, হানি? ব্যাপার না। আসেন আপনি আর আমি মিলেই ঈদাঈদি করি।

“এই, তোর সমস্যাটা কী বল তো? আজকে এমন আমেরিকান হয়ে গেছিস যে? বিয়ার-টিয়ার খেয়ে আসছিস নাকি বাইরে থেকে?”
নাহ, বাইরে আর গেলাম কখন। মন ভাল না আসলে, ভাইয়া। সেই জন্যই ইয়ার্কি-তামাশা করছিলাম। দেশের বাইরে ঈদ, অল্প কয়টা মানুষ আমরা, তবুও আমরা দুইজন একা বসে আছি। কতক্ষণ আর অন্য কথা বলে আসল ব্যাপার এড়াবো, বলেন? সবাই মিলে ঈদে ঘুরতে গেল, আমাদের একবার বললোও না।

“তা ঠিক। এই ভাবে দেখার কিছু নাই। আফটার অল, এটা ওদের চয়েস।”
তা তো অবশ্যই। কিন্তু তবুও তো মনটা একটু কেমন কেমন লাগে, তাই না? আমি নাহয় অল্প দিন হয় এসেছি, আপনি তো আজকে সাড়ে চার বছর ধরে এদের সাথেই আছেন। আপনাকেও বললো না?

“নাহ, আমার এসব আর গায়ে লাগে না। অভ্যাস হয়ে গেছে। আমার ভালোও লাগে না এত হইচই।”
উপেক্ষিতের আত্মপ্রবোধ। সত্যিটা আপনি-আমি দুই জনেই জানি। আর সবার সাথে তফাৎ এখানেই যে, আমাদের দুই জনের গাড়ি নাই। সকালে ঈদের জামাতের জন্য জাগিয়ে দিতে হবে দেখেই যেন সাথে করে নিয়ে গেল। আর এই বেলায় একই আসর থেকে সবাই উঠে দাওয়াতে গেল এমন কায়দা করে যাতে আমরা দুই জনেই আলাদা থেকে যাই। কালকেই আবার শুনাবে আমরা গেলাম না কেন, আমাদের দাম বেড়ে গেছে নাকি, ওদেরকে ভাল লাগে না নাকি। বিরক্ত এসব দেখে দেখে।

“উহু, এই ভাবে চিন্তা করতে নাই। আল্লাহ ওদের দিয়েছে, ওরা এনজয় করছে। এগুলা আমি পাত্তা দেই না। আমার যেটুকু আছে সেটা নিয়েই আমি খুশি।”
তবুও তো খারাপ একটু লাগেই। প্রথম ঈদের কথা মনে পড়ছে, জানেন? বড় বেশি দোটানার ছিল ঈদটা। জীবনে প্রথম শার্ট-প্যান্ট-সোয়েটার পড়ে ঈদের নামাজ পরলাম সেবার। নামাজ সেরে ঘরে এসেই ক্লাসে দৌঁড়ানো। বিকালে ছাত্ররা মিলে জমায়েতটা ভাল ছিল, কিন্তু দেশের তুলনায় কিছুই না। মা ফোন করে খুব কাঁদছিল। বকেছিলাম খুব। কিন্তু ফোনটা রাখার পর বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা মোচড় দিলো। অথচ আগের রাতেই অনেক রোমাঞ্চিত ছিলাম। একা ঈদ করবো। নিজের মত ঘুরে বেড়াবো। কেউ ডাকবে না, কেউ বকবে না। সেটাই বিকাল নাগাদ আফসোস হয়ে ফেরত আসলো। কেউ ডাকলো না, কেউ বকলো না!

“আরে তুমি তো অনেক খুশি ছিলা সেই ঈদে। আমরা বলাবলি করছিলাম তুমি একা ঈদ করেও এমন খুশি, ব্যাপারটা কী। নতুন ছাত্ররা আরেকটু মনমরা থাকে।”
সিদ্ধি, সিদ্ধি। সাধনার সিদ্ধি।

“সিদ্ধি? এটা তো জিআরই বাংলা বললা। আমি তো বাইরে বড় হওয়া মানুষ, এত কঠিন বাংলা বুঝি না।”
হাহ, হাহ। আমি বাচ্চা কাল থেকে একটা মেয়েকে পছন্দ করি। পাত্তা না পেয়ে মনের দুঃখে বাইরে চলে আসলাম। সেই ঈদের দিন সকালে দেখি ইমেইল করে প্রেমের কথা বলছে।

“ওয়াও! ছক্কা! এই কথা আগে বললা না কেন? আমরাও মজা করতাম। লাভ-লেটার লিখছিলা তাহলে বসে বসে ঈদের দিনে।”
উহু। বলেছিলাম, ভাল মত ঈদ কর। আমিও ঈদটা ঠিক মত করে নেই। তারপরে জবাব দিবো।

“বল কী? রাগ করে নাই?”
করে নাই মানে? এই যে দাগটা দেখছেন না? দেশে গিয়ে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম যে। এইটা হল ওনাকে এক দিন অপেক্ষা করানোর শাস্তি।

“প্যাদরারটার মত তাহলে। ব্যাটার বৌ আসার পরপর দেখি মুখে কাটাছাটা দাগ। জিজ্ঞেস করলাম, কী রে ব্যাটা, বেশ সুখে আছিস মনে হয়? বলে, না না, দরজায় বাড়ি খেয়েছি!”
হ্যাঁ, মনে আছে। তবে আরো মজার ছিল ভাবি আসার আগে ওনার সাঁতার কাটা বেড়ে যাওয়া। সপ্তাহে নিয়ম করে বারো বার সাঁতার কাটতে যেতেন। দেখেও না দেখে থাকতাম আর কী। এখন তো আর চিনেই না আমাদের। আচ্ছা, কোথায় কোথায় বেড়াচ্ছে এখন মনে হয়?

“লেটস নট টক অ্যাবাউট ইট। আজকে বৌ নাই ইন্টারনেটে? কথা হয় নাই আজকে?”
ছিল কিছুক্ষণ। ঘুরতে বের হয়ে গেছে বন্ধুদের সাথে। উনি আমার জন্য আর কোন কিছু তুলে রাখতে নারাজ।

“দেন লেটস নট টক অ্যাবাউট দ্যাট অ্যাজ ওয়েল। ঢাকায় কেমন কাটতো ঈদের দিন তোমাদের? আমি তো আফ্রিকায় বেবুনের সাথে উগাবুগা করে করে দিন কাটাতাম।”
দেশে থাকতে কত মজার ছিল ঈদের দিনগুলো। একা বের হতে দিত না, তবে আত্মীয়দের বাড়ি ঘুরতে যাওয়া হত। ঈদের সকালে স্পেশাল চটপটি বানাতো মা। নানার বাসায় কোর্মা করতো শুধু আমার জন্য আলাদা করে। বেশি মিষ্টি দিয়ে জর্দা-সেমাই বানাতো।

“এই ব্যাটা, ক্ষুধা লেগে যায় তো। চুপ থাক। খাওয়ার কথা বলবি না।”
দুই বাড়িতে ছাত্রদের জন্য দাওয়াত জোগাড় করেছিলাম। সবাইকে ফোন করে জানালাম, অথচ নিজেই বসে আছি এখন একা একা। ধ্যাৎ।

“বললাম না এসব মাথায় আনতে না? গ্রো আপ। লাইফে এরকম অনেক কিছুই হয়।”
আমার বেলায়ই এরকম বিব্রতকর ব্যাপারগুলো হয় শুধু। উফ, ক্ষুধায় পেটে বোমা ফুটছে।

“আরে আস্তে বল, ব্যাটা। দেখা যাবে ধরে নিয়ে যাবে শেষে। তখন মামুর বাড়ির মিষ্টি খেয়ো বসে বসে।”
খারাপ না আইডিয়াটা। কেমন না এই অতিসাবধানতা? এই যে সাধারণ কথাবার্তার সময়ও চোরের মত থাকা। মাঝেমধ্যে মনে হয় আসলেই কিছু একটা করে ফেলি। ভুগবো যখন, দোষ করেই ভুগি।

“এসব ভেবে লাভ নেই। এটুকু ঝামেলা মেনে নিতেই হবে এখন। ঘটি তো নিজের নামের সামনে থেকে মুহাম্মদই সরিয়ে ফেললো ভয়ে। ভীতু একটা। আমাদের আরেক বড় ভাই ছিল। সিটিজেন এই দেশের। তবুও ব্যাটা ভয়ে বের হত না ঘর থেকে প্রথম প্রথম।”
মেনে নিতেই হয় এখন। তবুও ভালো আমাদের দেখে ইন্ডিয়ান বলে, মুসলিম না। এই একটা দিকে সবজিদের কাছে আমাদের ঋণ শোধ হবার না। নাহলে খবরই ছিল। আরবগুলো তো বদমাইশি করলেও ওদের ব্যাকিং আছে অনেক। ধরপাকড়ের সময় তো আমাদের উপর দিয়েই যায় সব।

“আমার তো এক সিমেস্টারের টিউশন ফি আটকে দিয়েছিল। আমার বাবার নামে এক লোকের নাম আছে বলে ওয়াচলিস্টে। আর যায় কই। এই দিকে আমাকে তো টাকার জন্য বের করার অবস্থা। শেষে ক্রেডিট কার্ডে কাজ সারলাম। পরে টাকা রিলিজ হল ছয় মাস পর।”
আহারে বেচারা। আমাকে তো পাঠানোর সময় এক সিমেস্টারের টাকা দিয়ে বলেছিল যে এটাই শেষ। বাকিটা নিজেরই যোগাড় করতে হয়েছে। আমেরিকা দেখেই পেরেছি। যত যাই বলেন, ছাত্রদের জন্য এরচেয়ে ভালো জায়গা নাই আর কোন।

“বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। ভালই। ঘুম দিবো নে একটা। ক্ষুধাটাই সমস্যা। গান গাও তো দেখি একটা।”
আমি? গান? বের করে দেবে বাসা থেকে তাহলে। এখন কে অশ্লীল কথা বলছে? এর পরে কী বলবেন? বাইজির মত নাচবো? আপনি বরং গিটার খেলেন।

“লজ্জা দাও, না?”
লজ্জা পেলেই লজ্জা। আমি তো শুধু আপনার কথা আপনাকে মনে করিয়ে দিলাম।

“আমার কী দোষ? ইংলিশে বলে প্লেয়িং দ্য গিটার, আমি তাই বাংলায় গিটার খেলা বলে ফেলেছিলাম। পরে বুঝলাম যে এটা ভুল। বাংলা অনেক কঠিন ভাষা।”
তা ঠিক। তবে, আপনাদের ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা শুনে অসম্ভব মজা লাগতো। সাতার কথা মনে আছে? ঐ যে, দাওয়াতে গিয়ে বলেছিলেন, সাতা আসে? এইটা মনে থাকবে কেন, বলেন? ছাতা চাইলেন আর ট্র্যাশ ধরিয়ে দিল, এমন দৃশ্য বিরল।

“হ্যাঁ, দ্যাট ওয়াজ ভেরি এমব্যারাসিং। জন্ম বাংলাদেশে, বড় হয়েছি আফ্রিকায়, পড়ি আমেরিকায়, এর উপর আবার আরবি শিখতে হয়েছে। ছ উচ্চারণ করা খুবই কঠিন। আমার চেয়ে ভাল জানে না এটা কেউ। বহু কষ্টে এখন ছ বলি।”
তা আর আমি জানি না? যাক, পেট ডাকছে। বার্গার কিং বন্ধ হয়ে যাবে। সলেন!

“হ্যাঁ, সলো! কিন্তু টাকা আছে তো? আমার হাত একদম ফাঁকা।”
আমার কাছে সাড়ে পাঁচ টাকা আছে সাকুল্যে। বার্গার হবে একটা, ড্রিংক ভাগ করে খাবো নে। তবে এই দফায় আপনার সানডে পাই হচ্ছে না।

“ইশ, বৃষ্টি নেমে গেলো। একটু বসে যাই।”
আর দেরি করা যাবে না। পিছনের মাঠটা দিয়ে শর্টকাট মারলেও বন্ধ হওয়ার পাঁচ মিনিট মত আগে ঢুকতে পারবো।

“তাহলে কী আর করা। এ কী, ব্যাটারা ছাতাগুলোও নিয়ে গেছে?”

প্রবাসের কথোপকথন ৭

“...তো সেই দাওয়াতে উনি বলছিলেন আমেরিকা এসে কত জায়গায় থেকেছেন, কী কী কাজ করেছেন, কতগুলো ডিগ্রি নিয়েছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।”
হ্যাঁ, উনি তো মনে হয় কয়েকটা করে মাস্টার্স আর পিএইচডি করেছেন। একটা মানুষ যে কত পড়াশুনা করতে পারে! আমার তো একটা ব্যাচেলরর্স করতেই তেল বের হয়ে যাচ্ছে।

“আরে কারণ আছে। ঐ দাওয়াতের কিছুদিন পরেই আরেক দাওয়াতে সেই কথা তুলে এক ভাই বলছিলেন এত সাফল্যের উৎস কী।”
তাই নাকি? কেমন? জানা দরকার। আমার মত লোকেদের যদি অবশেষে সিদ্ধিলাভ হয় শুনে, মন্দ কী?

“ওনাদের বাড়ি তো যমুনা নদীর পাড়ে। বন্যায় ভেসে যায় প্রতি বছর। বলছিলেন যে ওনার বাবা নাকি ওনাকে ছোটবেলায় নদীর পাড়ে নিয়ে ঘাড় ধরে পানির উপর ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। বলেছিলেন, ঠিক মত লেখাপড়া করবি, নয়তো এই নদীতে মাঝিগিরি করতে হবে। এরপর বাকি জীবন শুধু পড়াশুনার উপরেই আছেন উনি। এমন শিক্ষা কি সহজে ভুলা যায়?”
অসাধারণ ব্যাখ্যা। আমার এক বন্ধু আছে এই রকম। খুবই পড়ুয়া। ব্যাটা কিছুদিন আগে জিআরইতে ৮০০ স্কোর করলো ভার্বালে।

“বল কী? জিআরই-তে ৮০০? তাও ভার্বালে? পাগল নাকি? আমাকে তো সিপাই-বন্দুক দিয়ে পাহারা দিয়ে পড়ালেও আমি এমন কিছু করতে পারবো না!”
আর বলবেন না। পাগলই ব্যাটা। মাত্র তিন সপ্তাহের পড়ায় এমন স্কোর, বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে আমার। আমার জানা মতে আর কোন খাস বাঙ্গালি প্রোডাক্ট এত স্কোর করে নাই।

“তা ওকে কোন নদীর পাড়ে ঝুলিয়ে রেখেছিল ওর বাপ?”
কী জানি। নারায়নগঞ্জ বাড়ি। শীতলক্ষ্যার উপর হবে হয়তো।

“এটা তো পত্রিকায় দেওয়ার মত অর্জন। সবাইকে বলা দরকার এটা নিয়ে।”
হ্যাঁ, সেটাই। বেশি বিনয়ী, তাই বলে না। হবেই না কেন? এটুকু না থাকলে তো আমার-আপনার সাথে তফাৎ থাকতো না। জাত লাগে আসলে।

“সেটাই। সবার জন্য সব না। এরকম বড় বড় কিছু করতে হলে জাত লাগে অন্য রকম। যাক, খুব ভাল লাগলো শুনে। আমাদের জন্য তো এই দেশে এটাই আছে শুধু। লেখাপড়া দিয়ে কিছু অর্জন করা, একটু নাম কামানো। লেগে থাকতে বল, বড় কিছু হলে আমরা বলতে পারবো।”
এই জায়গাটায়ই খারাপ লাগে। এই দেশে যতদিনই থাকি, যতকিছুই করি, কোনদিন পলিসিমেকার জাতীয় কিছু হতে পারবো না। আমাদের সুযোগ আর সবার সমান, রেজাল্ট আর সবার চেয়ে ভাল, সবাই নামও করে অনেক। কিন্তু তবু যেন কেমন কেমন লাগে একটু।

“সব সময় না। সুযোগ যে কখন এসে পরে, তা কেউ বলতে পারে না। এই যে বাঁধ ভাঙ্গলো, এটা বানিয়েছিলো আর্মির ইঞ্জিনিয়াররা। এক রিটায়ার্ড অফিসার পত্রিকায় লিখেছিলেন যে উনি আগেই প্রেডিক্ট করেছিলেন এমন একটা সমস্যার কারণে বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ঐটা আমার রিসার্চের মধ্যেই পড়ে। লোকটার কথা পুরা ভুল ছিল। আমি পত্রিকায় চিঠি লিখলাম। প্রথমে তো আমার কথা কেউ পাত্তাই দিতে চায় না। আমি বাইরের দেশের এক প্রোফেসর, আমি কী জানি, বলো? পরে অনেক রিপোর্ট হল এটা নিয়ে, শেষ পর্যন্ত সেই আর্মি অফিসার মেনে নিলেন যে ভুল তাঁরই ছিল।”
একই ব্যাপার তো এলএসইউ হারিকেন সেন্টারের ডঃ ভ্যান হিয়েরডেনকে নিয়ে হয়েছিল শুনেছিলাম। উনি বলেছিলেন যে বড় হারিকেন আসবে, তাই যেন আগে কিছু তাঁবু কিনে রাখে সরকার। ওনার সাউথ আফ্রিকান অ্যাক্সেন্ট শুনে ফিমার অপারেটর বলেছিলো, আমেরিকানরা তাঁবুতে ঘুমায় না। এই ব্যাপারগুলোই খারাপ লাগে। যত কিছুই করেন না কেন, সারা জীবন সেকেন্ডক্লাস সিটিজেনের তকমা গায়ে লেগে থাকবে।

“ঠিক কথা। এই যে আমি এই এলাকায় আছি, তবু কেমন যেন লাগে। এই শহরের এটা সবচেয়ে দামী এলাকা। আমার রিসার্চ নিয়ে মিডিয়ায় অনেক রকম রিপোর্ট হচ্ছে, তবুও আমি ঘর থেকে বের হলেই মনে হয় যে পাড়াভর্তি সাদার মধ্যে আমি একটা কালো চামড়ার লোক।”
এই কথাই আমি বাইরে আসার কিছুদিন পর আমার হিন্দু বন্ধুদের বলছিলাম। সংখ্যালঘু জীবন কী জিনিস, সেটা বাইরে এসে বুঝেছি আমি। সংখ্যালঘু জীবনের দহনগুলো চামড়ার নিচে। উপর থেকে মনে হয় যেন সবই ভাল, সবাই সমান, সবই ঠিক। কিন্তু ভেতরের জ্বালাটা কাউকে ভাষায় বোঝানোর না। আমেরিকায় এত সমতা, আইনে এত নিরপেক্ষতা, তবুও এটা মনে হয়। আমাদের দেশে কী করতে বাকি রেখেছি আমরা সংখ্যালঘুদের উপর!

“কী বলে শুনে তারা?”
কী আর বলবে। শুকনা একটা হাসি দিয়ে বলে, বুঝলা তাহলে এতদিন পরে। আমি এই জন্যও বলি যে আমাদের দেশের মানুষের কিছুদিন বাইরে ঘুরে আসা উচিত। তাতে যদি স্বভাব একটু ঠিক হয় বাঙ্গালির।

“নাহ, সেটা হওয়ার না। বাঙ্গালি উলটা যেখানে যায়, সেই জায়গাই নষ্ট করে দেয়। দুইটা বাঙ্গালি এক হলেই শুরু হয়ে যায় হিংসা আর দলাদলি। চরিত্র বদলাবে না বাঙ্গালির কোনদিন।”
সেটা খুব একটা ভুল বলেন নাই। আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আমাদের শুধু আরো বেশি করে ধার্মিক করে দেয় বাইরে আসলে। দেশে মানুষ মোল্লা হয়ে যায় আইডি প্রকাশ পেয়ে গেলে, আর বাইরে এসে মোল্লা হয়ে যায় আইডি খুঁজে না পেলে।

“দেশে আইডি প্রকাশ পেয়ে যায় কীভাবে?”
জেলে গেলে! পত্রিকা খুললেই দেখেন না, এক সপ্তাহ রিমান্ডে গেলেই কেমন নূরানী দাড়ি নিয়ে বের হয় সব।

“ঠিক, ঠিক। তবে আইডি ক্রাইসিস আছে বলেই মাইনরিটিরা লেখাপড়ায় মনোযোগী হয় অনেক। ছেলেমেয়েদের অনেক যত্ন করে পড়ায়। এটা এই দেশের লোকেরা করে না। করার দরকারও নাই তেমন। দেশ তো এদেরই। এত্ত সম্পদ। ঝুট-ঝামেলার কাজ করে দেওয়ার জন্য তো আমরা আছিই।”
হ্যাঁ, তবে আমরাও মাইনরিটি, কালোরাও মাইনরিটি, হিসপ্যানিকরাও মাইনরিটি, ঐদিকে আবার ইহুদিরাও মাইনরিটি। অথচ তফাৎটা কেমন আকাশ-পাতাল।

“ইহুদিদের কথা আলাদা। ওরা পাঁচ হাজার বছর ধরে মাইনরিটি। সার্ভাইভাল স্কিল ওদের চেয়ে ভাল জানে না কেউ। ওরা যেখানে যেতে হয় যাবে, যা করতে হয় করবে। ওদের পা-ধোয়া পানি খাওয়ার যোগ্যতাও নাই আমাদের।”
এটা ঠিক বলেছেন। আমরা কথায় কথায় গালি দেই ওদের ঠিকই। কিন্তু নিজেরটা কীভাবে আদায় করে নিতে হয়, সেটা ওদের কাছ থেকে শেখার আছে আমাদের। আর, ওদের কেউ কোন কিছু হাতে তুলে দেয় নাই। কখনও জোর করে, কখনও পরিশ্রম দিয়ে, কখনও কৌশলে ওরা নিজেদেরটা ঠিকই আদায় করে নিয়েছে।

“আমি আর সব মুসলমানের মত ইহুদিদের কথায় কথায় গালি দেই না। আমি তো বরং বলি যে আমাকে দশটা ইহুদির সাথে বোতলে ভরে ঝাঁকায় না কেন? তাহলে যদি আমি ওদের কাছে কিছু শিখতে পারতাম। এরা যে কী পরিমাণ পরিশ্রম করে, আর কত আন্তরিকতা নিয়ে কোন কাজ করে, সেটা না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না।”
মুসলমানদের চেয়ে তো ওদের ক্রিশ্চিয়ানদের সাথে ঝামেলা বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু কীভাবে ঘাড়ে চড়ে গেছে সব ক্রিশ্চিয়ান দেশের। ওদের হয়ে আমেরিকা যুদ্ধ করে পথে বসে, ওদিকে ওরা আরো জাঁকিয়ে বসে নিজের দেশে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের যেই একটা মাত্র জায়গায় তেল নাই, সেখানে বসে পুরা আরব শাসন করছে। স্টেটসম্যানশিপ শেখার আছে অনেক ওদের কাছে।

“আমি তো অ্যাকাডেমিক লাইনে দেখছি। সব উঁচু ইউনিভার্সিটির প্রোফেসররা ইহুদি। নোবেল পুরষ্কার এরাই পায় সব। সেই রকম কাজগুলো এরাই করছে। আমরা শুধু পাশের মানুষটার দোষ খুঁজি আর ফালতু সব ব্যাপারে দুনিয়া মাথায় তুলে ফেলি। এসব করি, আবার দাবি করি আমরাই নাকি শ্রেষ্ঠ জাতি।”
কাজে আর কথায় ফারাকটা তো নতুন কিছু না। আমার সেই বন্ধুই বলছিলো যে ৬২% এর বেশি নোবেল লরেট নাকি ইহুদি।

“খুবই স্বাভাবিক। আমার সাথের এক প্রোফেসরের কথা বলি। ইরান থেকে এসেছে এই লোক। আমি দেখি তার কাছে-ধারে যায় না ডিপার্টমেন্টের কেউ। কারণ জানতে চাইলাম এক আমেরিকান প্রোফেসরের কাছে। বলে যে তাদের মনে হয় ঐ লোকের মাথায় দোষ আছে একটু। একবার নাকি টয়লেটে ওযু করার সময় সিঙ্কে পা তুলে দিয়ে পা ধুচ্ছিলেন। চিন্তা কর, একটা লোক সিঙ্কে পা ধুচ্ছে, আবার পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে বলছে, আমি তোমার চেয়ে উত্তম, আমি বেহেশতে যাবো। একই কাজ যে কত বাঙ্গালিকেও করতে দেখেছি, তার কোন হিসাব নাই।”
আমাদের দেশে হবে সেই মুমিন কবে, কথায় না বড় হয়ে নিচে পা ধুবে!

“এই দেশের মানুষ ইহুদিদের দেখতে পারে, তা না। সেই জন্যই ক্ষমতায় ওরা উঠতে পারে না, কিন্তু সবকিছুর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ঠিকই রেখেছে ওরা। শেখার আছে আমাদের অনেক এই দিকে।”
আমার চোখে ইহুদিদের একটা বড় গুণ হল, তাদের নিয়ে কেউ কিছু বললেও ওরা সেটা গায়ে মাখে না। নিজের কাজ করে যায়। বরং নিজেরাই নিজেদের নিয়ে এত ঠাট্টা করে, যে আর কারও কিছু বলার নাই। আর আমরা মুসলমানরা সামান্য কিছুতেই অযথা লাফ দিয়ে উঠি। এত্ত বেশি হুজুগে আমরা সবাইই যে বলার মত না।

“সার্ভাইভাল মেকানিজম। ঐ যে বললাম, পাঁচ হাজার বছরের মাইনরিটি। ওরা জানে যে এসব নিয়ে পড়ে থাকলে ওদেরই ক্ষতি। এই জন্যই এত বেশি কাজের মধ্যে থাকে ওরা।”
আরেকটা ব্যাপার হল ইসরায়েলের প্রতি এদের ডিভোশন। পৃথিবীর যেই প্রান্তেই থাকুক না কেন, এরা এদের আয়ের একটা অংশ ইসরায়েলকে দেয় প্রতি বছর। স্যাবাটিকাল লিভ কাটায় ইসরায়েলি ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়ে। এমন কি ভারতীয়রাও এটা করে। করি না শুধু আমরা।

“আমাদের সমস্যা তো গোড়াতেই। আমরা আমাদের সব ব্যার্থতার জন্যই অন্য কাউকে দোষারোপ করে অভ্যস্ত। এজন্যই আমরা এত পিছনে।”
এটা নিয়ে আমার সেই বন্ধু একটা মজার কথা বলেছিল। ফ্যামিলি গাই-তে নাকি একবার স্টুয়ি ইহুদি হওয়ার জন্য গিয়ে দেখে অপ্টিমাস প্রাইম স্কালক্যাপ পরে বসে আছে।

“ফ্যামিলি গাই? অপ্টিমাস প্রাইম? এগুলা আবার কী?”

প্রতি-ইতিহাসঃ প্রথম ইরাক যুদ্ধ

কিছুদিন হয় রবার্ট ফিস্কের ‘দ্য গ্রেট ওয়ার ফর সিভিলাইজেশন – দ্য কঙ্কার অফ দ্য মিডল ইস্ট’ পড়ছি। পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ঘটনাবহুল এক জীবনের বিভিন্ন বিবরণ। ১ম বিশ্বযুদ্ধের এক আহত সৈনিকের ছেলের মূল্যবোধের কথা। ২য় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার ছায়ায় গড়ে ওঠা এক বালকের বেদনার কথা। মধ্যপ্রাচ্যের তুমুল ডামাডোলের মাঝে দিনাতিপাত করা এক সাংবাদিকের অভিজ্ঞতার কথা।

প্রাথমিক পর্যায়ের অনেকটা জুরে আছে ওসামা বিন লাদেনের সাথে ফিস্কের সাক্ষাৎ ও সাক্ষাৎকার। ইতিহাস কত রহস্যময়, আর মানুষ কত অর্বাচীন, সেকথা ঘুরে-ফিরে মনে আসছে বারবার। প্রথম ইরাক যুদ্ধের কথা আমরা জানি সবাই। জর্জ বুশ সিনিয়র ইরাকে তাঁর সৈন্য পাঠিয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করতে। সেই যুদ্ধে সাদ্দাম পরাজিত হন, নিজ দেশের সীমানার মধ্যে অন্তরীণ হন, আফগানিস্তানে তালেবান ছত্রচ্ছায়ায় ওসামা বিন লাদেন তাঁর সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, আমেরিকায় আক্রমণ হয়, আফগানিস্তান নিরস্ত হয়, ইরাক দখল ও সাদ্দামের ফাঁসি কার্যকর হয়।

আজকে পশ্চিমা বিশ্বের মাথাব্যাথা ইরাক ও আল-কায়েদার সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস অন্য ভাবেও রচিত হতে পারতো। বিন লাদেন সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় নেন সুদানে। অথচ এই সুদান ছিল তাঁর অপছন্দের তালিকার রাষ্ট্র। সাদ্দাম কুয়েত দখলের পর মুখ্য ভয় ছিল সৌদি আরব দখলের দিকে এগিয়ে যাবার। সেই সময় বিন লাদেন তার মুজাহেদিনদের নিয়ে সাদ্দামের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন। সৌদি বাদশা মার্কিন সৈন্য প্রবেশ করতে দেওয়ার কথা বিবেচনা করলে এই বিন লাদেনই সাবধান করেছিলেন, মার্কিন সেনা কোনদিন পারস্য উপত্যকা ছাড়বে না। প্রেসিডেন্ট বুশের লিখিত প্রতিজ্ঞার উপর ভরসা করে সৌদি বাদশা মার্কিনি সাহায্য নিলেন, দেশছাড়া করলেন বিন লাদেনকে। যুদ্ধ হল, প্রতিজ্ঞা রইলো না।

ইতিহাস যদি অন্যভাবে রচিত হত, তাহলে কেমন হত আজকের মধ্যপ্রাচ্য? বিন লাদেন তাঁর উগ্র মৌলবাদ বজায় রাখতেন, এটা নিয়ে সন্দেহ নেই আমার। কিন্তু রাজনীতির বাকি চেহারা আদতে কতটা ভিন্ন হত? বিন লাদেনের জেহাদের সূচনা এবং মুখ্য লক্ষ্য তো মার্কিনমুক্ত আরব বিশ্ব। এই পালে কি আদৌ হাওয়া পড়তো সাদ্দাম বনাম বিন লাদেন যুদ্ধ হলে? বিন লাদেনকে কি আফগানিস্তানে আশ্রয় নিতে হত? তালেবানরা তো বিন লাদেনের পছন্দের তুলনায়ও কট্টর ছিল!

কুয়েত ক্রস-ড্রিলিং করছিল ইরাকে, তাই সাদ্দাম নাকি জর্জ বুশের দেওয়া অস্ত্র ও অনুমতি নিয়েই আক্রমণ করেছিলেন। এরকমটা শুনেছি এক কালে। সাদ্দামকে ঝুলানো হল ১৯৮৮এর আগের অন্যায়ের দায়ে। খুব আশায় ছিলাম সাদ্দামের বিচারকার্যের মধ্যে দিয়ে সেই সময়ের রাজনীতি পরিষ্কার হবে। হল না। তাহলে কি আরব বিশ্বে ঘাঁটি গড়বার মাস্টার প্ল্যান থেকেই সাদ্দামকে অস্ত্র দেওয়া, অনুমতি দেওয়া, যুদ্ধে হারানো, এবং তাঁর মুখ বন্ধ করে রাখা?

যাক, অত্যাচার হোক যথা তথা, মৃত্যু হোক ঝুলে।

প্রবাসের কথোপকথন ৬

“এলে অবশেষে?”
কাজ থেকে বের হতে হতে সোয়া নয়টা বেজে গেলো। এরপর বাসে আরো চল্লিশ মিনিট।

“কোন ব্যাপার না। খাওয়া সব ঠান্ডা হয়ে গেছে। গরম দেবো? সবাই খেয়ে নিয়েছে। নিজের মনে করে নিয়ে খেয়ো কিন্তু।”
উহু। নিজের মনে করে খেয়ে ঠকবো নাকি? নিজের মনে করে খেলে তো এক প্লেট ভাত তিন দিন ঘুরবে। পরের মনে করে গোগ্রাসে গিলবো। দাওয়াত দেখে দুই বেলা না খেয়ে বসে আছি!

“আহা রে। ছাত্রজীবনে একটু কষ্ট করতেই হবে। আমাদেরও বেশ কষ্টের সময় গেছে। তোমার আংকেল তো ছাত্র অবস্থায় বিবাহিত ছিল। দেশে বুড়ো বাপ-মার দেখভাল করতে হয়েছে। চাকরি পাওয়ার পরও আমরা ছাত্রদের মত ফার্নিচার কুড়িয়ে চলতাম। বিত্তবৈভব করতে পারতাম, কিন্তু সামান্য একটু বিলাসিতার মোহ ত্যাগ করতে পারলে কতগুলো মানুষের উপকার করা যায়।”
সেটাই। এই ভাবনাটা শিক্ষিত প্রবাসীদের মধ্যে খুব বিরল। যদিও হওয়ার কথা ছিল উল্টাটা। যেই মানুষগুলো কামলা খেটে টাকা কামায়, তারাই দেশে টাকা পাঠায়। তাদের তুলনায় তো পেশাজীবিদের সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু তারা দেশে কিছুই পাঠায় না।

“ছেলেপুলে বড় করার ব্যাপার আছে তো, তাই অনেকেই এখানে থিতু হয়ে যায়।”
সেটাই। তবে তার পরেও করা যায়। সবজিরা করে, হালাপিনোরা করে, ব্রকলিরা করে। করি না বলতে আমরা বাঙ্গালিরাই।

“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ...”
ওহ, গান শুরু হয়ে গেলো? আমি খাওয়া সেরে আসরে আসি, আপনি গলা মেলান গিয়ে।

“মা তোর মুখের বাণী আমার কানে বাজে সুখার মত। মরি হায়, হায়রে ও মা হুহু হুহু...”
(জাতীয় সঙ্গীতের জন্য দাঁড়িয়ে ভাত খাচ্ছি, এর মধ্যে গানের কথা ভুলে যেতে হল? কেউ ধরে দেয় না কেন? আমার কানে লাগে, বাজে না। মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি।)

“আমরা বড়রা তো গান গাইই। আজকে নতুক কিছু করা হোক। বাচ্চারা গান করুক আগে।”
এটা ভাল বলেছেন। ইস, রেকর্ড করে রাখা গেলে ভাল হত।

“ফুরযাপতি, ফুরযাপতি, কোতায় পেলে বাই এমনো রঙ্গিন পাখা।”
খুব ভাল গেয়েছো, ভাইয়া। গানটার মানে জানো তুমি? এটা বাটারফ্লাই নিয়ে লেখা খুব সুন্দর একটা গান।

“হ্যাঁ, জানি।”
বলতো পাখা মানে কী?

“এটা তো সহজ। ইট দ্য লেগ!”
ইয়ে... আসো আমরা পরের গানটা শুনি। আমার কোলে বসে শুনবে? ওকি! কোথায় যাচ্ছো? পোকিমন? ঠিক আছে, দেখ গিয়ে।

“ভাবী, আকাশের ঐ মিটিমিটি তারা গান।”
(এহ, দিলো মুডটা নষ্ট করে। আর গান পাওয়া গেল না? কী যেন নাম এই গানের শিল্পী নায়িকার? যাক, চেহারা মনে করেই কেমন কেমন লাগছে। নাম মনে না পড়াই ভাল।)

“বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, করেছো দান।”
(গানগুলো সব এমন কেন? বেছে বেছে আজকেই বৃষ্টিতে পেতে হল সবাইকে?)

“আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে। এই নিরালায়...”
(আহা, এতক্ষণে মনের মত গান একটা। যাব না এই মাতাল সমীরণে আজ...)

“আচ্ছা, এবার কিছু নজরুল গীতি হোক। এই সুজন, গাও তো কিছু গান। না, না। আমরা কিছু শুনবো না। গাইতেই হবে গান।”
আরে পড়বে। গাইলেই গান মনে পড়বে। আমরা তো আছিই। লাইন মনে করিয়ে দিবো। না, শ্মশানে জাগিছে মনে নাই আমার। থাক, নজরুল ভুলে গেলে ঠাকুরই মারো এই বেলা।

“একটা কাগজ আর কলম দেন তো। গানটা লিখে নেই।”
কী গান লেখো? রবীন্দ্রসঙ্গীত? আইয়ূবের আমলে তোমার মত প্রতিভা যে কোথায় লুকিয়ে ছিল!

“এসো শ্যামল সুন্দর, আনো তব... পরের লাইন যেন কী?”
বকুল মুকুল রেখেছে গাঁথিয়া...

“ও হ্যাঁ। আচ্ছা, লিখে রাখি এটুকু।”
রবীন্দ্রনাথ এখানে থাকলে বলতো, ধরিত্রী দ্বিধা হও, তোমার মাঝে আমি হান্দায়া যাই! মতিন ভাই, আপনি শুরু করেন আপনার ব্যান্ডের গান।

“আরে না, না। আমি কি আর গান পারি?”
না পারলে আর কী করার আছে, ভাইয়া? সুজনের কাছে শুনতাম আপনি টয়লেট কাঁপিয়ে ফেলেন আজম খানের গানে। যাক, আমরা নাহয় আবৃত্তি শুনি কারও গলায়।

“ঠিক আছে, তোমরা যখন এত সাধাসাধি করছো, গেয়েই শুনাই কিছু গান।”
কিছু? কিছু তো একটু বেশি হয়ে যায়। না, ভাইয়া। থাকুক না। পরে কখনও হবে নাহয়।

“আমি যেই গানটা গাবো, সেটা যিনি গেয়েছেন, তাঁকে বাংলাদেশের অনেকেই গুরু বলে ডাকেন...”
এদিকে আসেন সবাই! মতিন ভাই গান গাবে!

“তিনি গান শুরু করেন সত্তরের দশকে। তখনও বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীত তেমন জনপ্রিয় হয়নি।”
ভাইয়া, আমরা তো আজম খানকে চিনি। শানে নুযূলটা বাদ দেওয়া যায় না?

“ঐ পোলা, আমাগো আজম খান চিনাস? প্যাঁচাল না পাইরা গান ধর!”
(এইবার ঠিক আছে। একেই বলে ওপার বাংলার মুখে এপার বাংলার গালি।)

“রেল লাইনের ঐ বস্তিতে, জন্মেছিল একটি ছেলে। মা তার কাঁদে।”
(পকেটের রুমালটা শক্ত করে কামড়ে অন্য দিকে চেয়ে থাকা।)

“সে যে ব্যথিত হৃদয় আছে বিছায়ে...”
এটা কোত্থেকে আসলো?

“এই সুজন, তুমি গানে মাজখানে কী শুরু করলা? কিছু বুজো না!”
(চিড়িয়াখানা হয়ে গেল ঘরটা। হায়রে গৃহদাহ!)

“কত আশা ছিল তার জীবনে। ছেলেটি মরে গেল। তার সব আশা শেষ হয়ে গেল। মা তার কাঁদে!”
জ্বী, আমরা এবার অন্য গানে যাই। পাপ্পু ভাই, আপনি কী যেন গাবেন বলছিলেন।

“চল আমরা জেমস গাই। দাদা, আপনি গান ধরেন, আমি টান লাগাই।”
হ্যাঁ, সেভেনটিস থেকে আমরা নাইনটিসে আসি এবার।

“দুঃখিনী দুঃখ কোর না...”
সবাই এত দুঃখের গান কেন গাচ্ছে আজকে?

“আমরা এবার একটু ওয়ারফেজ গাই।”
হাহ হাহ, আরো কয়েক বছর সামনে গেলাম, তাই না?

“আচ্ছা, এখন দেশে কারা হট?”
জানি না। আমি আসার আগে তো অর্থহীন খুব চলছিল। আমি ত্রিমাত্রিক নিয়ে এসেছিলাম সাথে করে। এর পরে বাংলার কিছু গান শুনলাম। মাঝে ব্ল্যাক সহ আরো কিছু বেশ উঠে গেছে শুনলাম। সেটাও তো বছর তিনেক আগের কথা।

“আমি দেশ ছেড়ে আসার আগে সিলসিলা বের হয়েছিল, বুঝলে? আমরা সবাই দেখা এক খোয়াব তো গেয়ে গেয়ে ভার্সিটির মেয়েদের বিরক্ত করে ফেলেছিলাম। তোমরা কত আধুনিক, দেশ সম্পর্কে কত জানো, কত যোগাযোগ তোমাদের।”
এটা ঠিক যে আমাদের ইন্টারনেট আছে, ফোন আছে। কিন্তু দেশের খবর ওগুলোয় পাওয়া গেলেও দেশের জোশটা পাওয়া যায় না। এই জন্যই আমরা গানগুলো পেলেও বুঝি না কোন গান কোথায় এবং কতটা জনপ্রিয়।

“ফেরদৌসির একটা গান আছে। কী যেন নাম ছায়াছবিটার? এই নীল নীল নির্জন নিরজনে...”