Thursday, January 24, 2008

প্রবাসের কথোপকথন ৫

“তুমি কি এই ক্লাসে?”
জ্বী, আমি ইংলিশ ১০০৫ এর রুম খুঁজছি।

“হ্যাঁ, এটাই। কিন্তু তুমি ১০ মিনিট লেট।”
দুঃখিত। আমি ১০০৪ এর ক্লাসে চলে গিয়েছিলাম ভুলে।

“তুমি কি একটা সিট নেবে?”
ধন্যবাদ।

“ক্লাস, আমরা এখন একটা খেলা খেলবো। খেলায় খেলায় আমরা পরিচিত হব সবার সাথে। সবাই ডেস্কগুলো একপাশে সরিয়ে গোল হয়ে দাঁড়াই আমরা।”
(এ কোন নতুন কুঁড়ির পাল্লায় পড়া গেল!)

“আমি শুরু করছি। আমি মিস কার্নি।”
(উফ! সুন্দরীরা কেন জোড়ায় জোড়ায় ঘোরে? ক্লাসের পিছনে আসলাম সুন্দরীর গন্ধ শুঁকে শুঁকে, তবু লাভ নাই।)

“এবার তোমরা যার যার নাম, কোন দেশ থেকে এসেছো, এবং কী পড়তে চাও বল। কেউ চাইলে অন্য কোন গল্পও বলতে পারো।”
(এত্ত সুন্দরী মহিলা, বয়স মনে হচ্ছে ৩০ এর একটু ওদিকে হবে। কোরিয়ান চেহারা। কী সুন্দর! হাতে আংটি নাই কেন? ধুর, সম্ভাবনার কী নিদারুণ অপচয়!)

“আমার নাম ঝঁন। আমি সাউত খোইয়া থেকে এসেছি। পিএইচডি করতে এসেছি। আমার একটা বৌ আর একটা বাবু আছে দেশে। আই রাইক আমেলিকা।”
(ঝঁন? ওহ, জন! যাক, উচ্চারণ নিয়ে আমাকে না ভাবলেও হবে। এত হাসছে? আশ্চর্য। আমারই লজ্জা লাগছে বুড়া বয়সে এই শিশুতোষ ক্লাস করতে। যাক, শিক্ষনীয়।)

“আমি ম্যাগি। আমি বুলগেরিয়া থেকে। ক্রিমিনোলজি পড়বো। আর নয়তো সাইকোলজি। নয়তো বায়োলজি। আমি সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্বস ১২ বার পড়েছি। আমি ধনু রাশির জাতিকা।”
(ওয়াও! একে দিয়েই হবে। ডার্ক টেইস্ট, খুল্লামখুল্লা রূপ, চোখেমুখে পূর্ব ইউরোপের সপ্রতিভ চঞ্চলতা। রাশিও এক।)

“আমি ডিনা। কোলোম্বিয়া থেকে এসেছি। লাইফ সায়েন্সে পিএইচডি করতে। আমার বরও এখানে পড়ে।”
(আমরা সবাই কত্ত বুড়া। এই দেশিগুলো কত অল্প বয়সের। আমরা সব আদুভাই এসে জুটেছি। ধ্যাৎ!)

“আমি সাইফ। আমি স্কেটবোর্ডিং করি। আমি ১৩ বছর বয়সে হাইস্কুল পাশ করেছি। আর... আই লাভ স্কেটবোর্ডিং।”
(১৩ বছর বয়সে আমি সেভেনে পড়ি। মর শালা! মেয়েগুলা যাও বা একটু তাকাচ্ছিল, এই বাচ্চা এখন সব নিয়ে গেল।)

“এবার তোমার নাম বল।”
আমার নাম ইশতিয়াক রউফ।

“ওয়ো! আস্তে, আস্তে। আবার বল।”
ইশ...তি...আক রো...উফ।

“ইটঠাক?”
ইশশশ...তি...আক।

“তোমার নাম অনেক ডিফিকাল্ট।”
বুঝতে পারছি। ছোট ছোট অংশে ভেঙ্গে চেষ্টা করে দেখতে পারো। আমার বন্ধুরা আমাকে ইশতি ডাকে। তোমরাও তাই ডেকো।

“ইত্থি?”
ইশশশ...তি!

“ইশঠি?”
আই এস এইচ টি আই।

“আইশঠি, রাইট?”
ইউ নো হোয়াট, এত কষ্ট করতে হবে না। আমাকে স্রেফ ইশ ডেকো তোমরা।

“আই এস এইচ। ওহ, এটা অনেক সহজ। আইশ, অর ইশ?”
(রক্ষা কর মাবুদ। বাপ-মা যে কেন আমার নাম জন ডো রাখলো না?)

“ইসশ, ওকে? এটাই ডাকবো তোমাকে।”
এখানেই এক বড় ভাই থাকেন। ওনার নামও ইশতিয়াক। উনি ফিশ লেখা একটা বেল্ট পড়ে ঘুরেন। এখন বুঝতে পারছি কারণটা।

“আমরা খুবই দুঃখিত। তোমার নামটা বুচার করছি আমরা। আসলে, নামটা একটু আনকমন তো।”
ব্যাপার না। সহজ করে দিচ্ছি। আমাকে শুধু আই ডেকো। নামের বাকি সব ভুলে যাও।

“এটা বেশ মজার। আই! আমি তাহলে মিস সি এখন থেকে।”
সেটাই। খারাপ না। এই ক্লাসটাকে চিরজীবন মনে রাখার মত একটা কাহিনী পেয়ে গেলাম প্রথম দিনেই।

“আর! এই আর! তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো বললে না?”
তা মিস সি, আপনি কতদিন এই দেশে?

“ম্যাগি একটা প্রশ্ন করেছিল তোমাকে, আই।”
ওহ, ওটা আমাকে বলেছিল?

“ওহ। আই! ধুর! ভুল করে ফেলেছিলাম।”
কোন ব্যাপার না। তুমি আমাকে যা খুশি ডাকতে পারো। চাইলে ‘হে!’ বলে ডেকো। চাই কি হাতের কাছে যা পাও ছুঁড়ে মেরো।

“বাট হে ইজ ফর হর্সেস!”
(তোমার মত সুন্দরীর জন্য শুধু ঘোড়া কেন, খচ্চরও সই!)

“তোমার জামায় কি ওটা তোমার দেশের নাম লেখা? লম্বা নাম। ব্যাং... লা...”

একটি জাতির পরিচয় কিসে?

একটি জাতির পরিচয় কিসে? আমরা কতটুকু ছাড় দিতে পারি সেটায়, নাকি আমরা কতটা ছাড় দেই না সেটায়? কেমন জাতি আমরা? আজ থেকে শত বছর পর কী দিয়ে চেনা যাবে আমাদের? জবাব হয়ত ইতিহাসেই সুলভ। প্রশ্ন হল, আমরা কি ইতিহাসসুলভ?

ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামের কথা জানি সবাই। ফুটবলপাগল এই জাতি তার সমস্ত সঞ্চয় উজার করে ১৯৫০ এর বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করেছিল এই স্টেডিয়াম। কোন মান্যগণ্য ব্যক্তি নয়, নামকরণ হয়েছিল পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটির নামে। বহতা নদী, ইতিহাসের সাক্ষী নদী, সমালোচনার ঊর্ধ্বে নদী, প্রাণের নদী, প্রাণদায়ী নদী। পেছনে ছিল রাফায়েল গাল্ভাও আর পেদ্রো বেরনার্দেস বাস্তোসের স্বপ্নের স্থাপত্য আর সাড়ে নয় কোটি হতদরিদ্র মানুষের ভালবাসা।

দুই লক্ষ দর্শক দিনান্তে দুঃখ ভুলে মেতে উঠতো এখানে, প্রিয় স্বদেশ হেরে গেলে নিস্তব্ধ হয়ে যেত একসাথেই। কেউ পতাকা জড়িয়ে কাঁদতো, কেউ পতাকা পোড়াতো, কেউ স্রষ্টাকে দুষতো, কেউ মদের বোতল ছুঁড়ে ফেলতো, বাঙ্গালি ঘরানার দু-চারজন থেকে থাকলে হয়তো বোতলে মূত্রত্যাগ করে নিচে ছুঁড়ে ফেলতো। এভাবেই গড়ে উঠে অন্য রকম এক দেশাত্ববোধ, ব্রাজিলিয় দেশাত্ববোধ। এখানেই বেড়ে ওঠে রোনাল্ডো, রোমারিও, সক্রেটিস, কার্লোস আলবার্তো, কাফু, রবার্তো কার্লোস, ফ্যালকাও, পেলে, রিভালদো, জিকো। কেমন অদ্ভুত না?

আমরা কিসের জন্য এত দাম দিয়েছি? দেশটাকে পাবার জন্য দিয়েছি, হ্যাঁ, কিন্তু সে তো ৩৬ বছর আগের কথা। দেশকে গড়বার জন্য কী করেছি? পরিচয় তৈরি করবার মত কী করেছি? কী দেখে যেকেউ বুঝবে এখানে বাংলা এসেছিলো, বাঙ্গালি এসেছিলো?

পরিচয় বদলাবো, উপদেশ চাই

এক বান্দার কথা শুনেছি বন্ধুমুখে। দেশের বাইরে গিয়ে ডকুমেন্টস হারানোতে আমেরিকা আসতে ঝামেলা হচ্ছিল তার। লোকটা ঢুকতে সুবিধার জন্য নিজেকে ইহুদি বলে পরিচয় দিল। কোন প্রকার কাগজ, বাক্স, সরঞ্জাম লাগলো না। উলটো বিশেষ আপ্যায়ন করে আমেরিকা আনা হল তাকে। আমেরিকা আসার পরেও দেখে তার যত্নআত্তির শেষ নেই। সেই লোক এখনও ক্যাথলিক, তবে মাথায় একটা স্কাল ক্যাপ পড়ে ঘুরে শুধু ইহুদি হিসেবে সুবিধা পাবার জন্য।

দাঁড়ি রাখি না আমি। ইচ্ছা ছিল, চেষ্টা ছিল। কিন্তু মোঁচ আর দাঁড়ির মাঝের সাঁকোটা অনেক কষ্টেও তৈরি করতে পারলাম না। তদানিন্তন বৌন্ধবীর হুঙ্কার, ম্যানেজারের ভ্রুকুটি, এবং বিরক্তিকর ঘ্যাসঘ্যাস চুলকানিরও ভূমিকা ছিল। টুপি পড়লে মাথা চুলকায়, যেটুকু চুল আছে তাও লেপটে যায়। মোঁচেও কোন রকম নূরানি আমেজ নেই। আলখাল্লা পড়াটা কষ্টকর, কিন্তু সেটা নিজের গায়ের গন্ধেরই ভয়ে। তবু জামাতি হওয়ার আবেদনটুকু অনস্বীকার্য। দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নেও মোল্লাদের কেউ ঘাঁটায় না। এমন কি এই আমেরিকাতেও না। যাদের দাঁড়ি আছে, তারা সাচ্চা মুসলিম, তারা কোন সাতে-পাঁচে নেই। ঝামেলা তো করে যত ক্লিন-শেভড মুসলিমগুলো।

কী দেশ, কী বিদেশ, কট্টরেরাই ভাল আছে। মইত্তা রাজাকার ভাল আছে, কমান্ডার নিজামি ভাল আছে, হুজুরেরা ভাল আছে, আলেমেরা ভাল আছে, র‌্যাবাইরা ভাল আছে, প্যাস্টরেরা ভাল আছে। ভাবছি আমিও পরিচয় বদলাবো। কোন বেশ ধরা যায় বলতে পারেন কেউ?

লুইস, হায় লুইস

গত সাড়ে তিন বছর ধরে বসবাস আমার লুইজিয়ানায়। দেশ থেকে দূরে, তবু যেন দেশেই ছিলাম। গরম, গরীব, গতানুগতিক। বরফ পড়েনি এখানে কখনও। চামড়া পোড়ানো গরম। আর্দ্রতা কম বলে ঘাম কিছু কম হয়, এটাই পার্থক্য। আরও একটা পার্থক্য আছে। শীতল বাতাস দেহ জুড়ায় যেকোন দালানে ঢুকলেই, এটা বড় সুবিধা। আমি খুব সাধারণ, ভেতো বাঙ্গালি। শীতের চেয়ে গরম সয় বেশি। আমার হতাশা অন্য।

এখানেও পথহারা পথিক পথে বসে থাকে। জীবনযুদ্ধে শ্রান্ত, পরাজিত মানুষ খুব একটা দুর্লভ না এখানে। বিদেশে একটা দেশ-দেশ ভাব থাকা ভাল। প্রাথমিক ধাক্কাটা সইতে সহজ হয়। আমার জন্যও ব্যাপারটা সেরকম ছিল। ব্যাটন রুজে আছি শুনে লোকে ঠাট্টা করে বলতো, গ্রামে আছি। তেমন কোন হাই-রাইজ নেই। স্কাই-স্ক্রেপার নেই। সাবওয়ে তো দূরের কথা, ইজ্জতসম্পন্ন একটা বাস সার্ভিসও নেই। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজ নেই। বিনোদন নেই। হোটেল নেই। পার্ক নেই। স্থাপত্য নেই। যাদুঘর নেই। টুকটাক বার আছে, তবে একটা স্ট্রিপ ক্লাবও নেই! নেই বলেই লুইজিয়ানাকে ঘিরে আমার এত স্বপ্ন। কারণ এই নেইগুলোর জন্যই লুইজিয়ানা আমার কাছে বাংলাদেশের প্রতিভূ। এখানে যা সম্ভব, তা বাংলাদেশেও সম্ভব। আকার এক রকম, পরিবেশ এক রকম, সামর্থ্য এক রকম, মানুষ এক রকম। দুঃখের কথা, রাজনীতিকগুলোও এক রকম। এই চাঁড়ালগোত্রীয়দেরই কিছু কথা জানাই।

টেক্সাস আর লুইজিয়ানা পাশাপাশি অঙ্গরাজ্য। আকারে দুটোই বেশ বড়। লুইজিয়ানাকে ফ্রান্সের কাছ থেকে কেনা হয় ১৮০৩ সালে। এই ক্রয়ের প্রধান কারণ ছিল নিউ অর্লিয়েন্সের নৌবন্দর। মিসিসিপি নদী এদেশের অর্থনীতির প্রাণ। তাই সেই নদীর উপর নিয়ন্ত্রণ পেতে নিউ অর্লিয়েন্সকে নিয়ন্ত্রণে আনা। আজও এই বন্দর ভৌগোলিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবু কত মলিন, কত অযন্তলালিত এই শহর, তা সবাই দেখেছেন হারিকেন ক্যাটরিনার পর। কারণ, অব্যাবস্থাপনা। অপরপক্ষে পাশেই গ্যাল্ভাস্টোন বন্দর কাজে লাগিয়ে টেক্সাস এগিয়ে গেল।

টেক্সাস ও লুইজিয়ানায় একই সময়ে বিপুল পরিমাণ তেলের সন্ধান মেলে। টেক্সাস সেই তেলের টাকায় বিশাল সব রাস্তা বানায়, ট্রান্সপোর্টেশন ইন্সটিটিউট তৈরি করে, পাবলিক এজুকেশন রিফর্ম করে, এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। তাকিয়ে দেখুন ফলাফল টুকু। পাশেই লুইজিয়ানা সেই টাকা খাটায় একের পর এক ক্যাসিনো বসিয়ে। কারণ, অদূরদর্শিতা।

পুরো আমেরিকায় লুইজিয়ানার খ্যাতি আছে এর জোচ্চোর রাজনীতিবিদদের জন্য। টেক্সানরাও বেশ খ্যাত, তবে গোঁয়ার ও মাথামোটা হিসাবে। কিছুদিন আগে লুইজিয়ানার ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসম্যান জেফারসনের অফিসের ফ্রিজ থেকে এক লাখ ডলার পাওয়া গেছে। তদন্ত চলছে। এর মাঝে নির্বাচন হয়েছে। তিনি পুনর্বার জয়ীও হয়েছেন। টাকা কোথা থেকে এসেছে তিনি জানেন না, তবে এটুকু জানেন যে টাকাগুলো পবিত্র। লুইজিয়ানাকে আজ বাকি আমেরিকা টাকা দিতে চায় না দুর্নীতির ভয়ে। কারণ, রাজনীতিকের অস্বচ্ছতা।

পরের ঘটনা এই সেদিনের। ধর্মান্ধ রিপাবলিকানদের দল থেকে সমকামীতাবিরোধী ও গর্ভপাতবিরোধী এক কট্টর সিনেটর ডেভিড ভিটার ফেঁসে গেছেন নেগোশিয়েবল ভালবাসায় গা ভাসানোর দায়ে। তিনি নির্বাচনের সময় নিজেকে আর দশজন মানুষের চেয়ে অতি উচ্চ মূল্যবোধের বলে দাবি করে অপদস্থ করেছেন অনেককে। সেই তাঁরই নাম ফাঁস করে দিয়েছে ল্যারি ফ্লিন্টের হাসলার ম্যাগাজিন। ভিটার ১৯৯৯-২০০০ সালে নিউ অর্লিন্সের এক বিশেষ শ্রেণীর সমাজকর্মীনীদের নিয়মিত সেবা করতেন, নিতেন। তিনি এতই উঁচু মাপের সমাজঅন্তপ্রাণ ছিলেন যে তাঁকে ব্যাক্তিগত সেবা দিতে সমাজকর্মীনির দল প্রায়ই লটবহর সহ চলে আসতেন গাড়ি করে। এই খবর বের হবার পর তিনি বলেন, এই পাপের জন্য তিনি তাঁর স্ত্রী এবং ইশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, এবং দুজনের কাছেই ক্ষমা পেয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমি এমনিতেই নাফারমান। ভাবছি ইশ্বরের সাথে এই সুবাদে আমিও একটু সাক্ষাৎ করে ফেলি। লুইজিয়ানাকে কেউ গুরুত্বের সাথে দেখে না। কারন, ভণ্ডামি।

এক কালে বন্ধুমহলে বলেছিলাম, নারীমাত্রই দেবী, দেবীমাত্রই আরাধ্য, আরাধ্যমাত্রই দ্রষ্টব্য, আর দ্রষ্টব্যমাত্রই ধর্তব্য। সেই আমিই ভাগ্যের ফেরে লুইজিয়ানায় এলাম কিছুকাল পর। এখানকার রাজনীতি দেখে বন্ধুদের বলা কথাটাই আমিও বললাম সেদিন মনে মনে। লুইস, হায় লুইস।

এই হল আমার আবাস। আমেরিকার মধ্যেও ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশ। এত কিছুর পরও জায়গাটা ভাল, এখানকার জীবনটা ভাল, সাধারণ মানুষগুলো ভাল। এখানেই লুইজিয়ানায় বসে আমার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা। বাংলাদেশ যদি অন্তত লুইজিয়ানা হত!

দ্বিতীয় দৃষ্টি

বরাবরের মত বাস আজকেও সময় মত এল না। আজকে মিনিট দশেক দেরি। শহরটা ছোট, সীমিত, সবুজ। মূলধারার আমেরিকান শহর। হলিউডি চমক-জমক নেই এখানে। ঘামের শহর, নামের নয়। লোকসংখ্যা খুব একটা বেশি না। লাখ তিনেকের মত হবে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এখানে খুবই দীন। তবে কারণটা মানুষের সংখ্যা নয়, মানুষের ধরন। সাদা আর কালো। বেশি বেশি কালো, কম কম সাদা। কারও হাতে বেশি বেশি সম্পদ, কারও হাতে একেবারেই কম। সম্পদশালীরা শুধুই সাদা। দুস্থরা শুধুই কালো। পাবলিক তাই কালো। পাবলিক ট্রান্সপোর্টও তাই। বাসগুলো যেন সভ্যতার চিড়িয়াখানা। দারিদ্র্যের ভ্রাম্যমান যাদুঘর। যারা চড়ে তারা আমার মত। ঠিক যেমন আমিও আর সবার মত।

ডিপ সাউথের শহর। দুর্বলতম অঙ্গরাজ্য। দুই মহা-হারিকেনের দ্বৈত দাপটে অধুনা তারকাখ্যাতি পাওয়ার পরও বদলায়নি লুইজিয়ানার কোন কিছুই। এর রাজধানিতে রাজা আছে, ধন নেই। তবু পাথরের বুক চিরে পানি আনার কড়কড়ে সবুজ নেশায় আমিও চড়লাম বাসে। বরাবরের মত শেষের এক কোণায়। নিরাপদ দূরত্বে বসে মানব দেখে মানস চেনার অক্ষম চেষ্টা। সংখ্যালঘুর অবসর। ঘন্টাখানেক অনেক সময়। একে একে বাসে চড়লো অনেকে। কেউ বানর, কেউ বিড়াল, কেউ বেজি। মানুষের পূর্বপুরুষ সবাই, কিন্তু কেউ মানুষ না।

বানরটা ব্যাস্ত বেশ। ঝুলে পড়া জিন্সের হাফপ্যান্ট এক হাতে মুঠ করে ধরা। গায়ে হাতাকাটা গেঞ্জি। মাথায় বারান্দাওয়ালা টুপি। মুখে ললিপপ। হাঁটুর নিচের পকেটে ঝুনঝুন করছে খুচরা পয়সা। পায়ে দুধের মত সাদা কেডস। ঝুলছে অনেক। দুর্বোধ্য হিপহপের সাথে সাথে আওয়াজ দিচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ। পাশের লোকটার দিকে ফিরে কিছু বললো। ইবনিক্স। ভাষার দাস্ত থেকে জন্মানো দুর্বোধ্য কিছু ধ্বনিমালা। আলাপন শেষে বিশেষ অঙ্গভঙ্গি ছাড়া এর অর্থ পূর্ণ হয় না। উল্টা দিকে বসা বাচ্চা ছেলেটার সাথে জমেছে মনে হয় বেশ। বাচ্চাটা বাসের ফ্লোরে গড়াচ্ছে, বানর উৎসাহ দিচ্ছে, বাচ্চার বাপ গর্বিত চোখে ছেলের কীর্তি দেখছে।

বিড়ালটার সাজ অনেক। রাঙ্গানো নখ, বাঁধানো দাঁত, পাঁকানো চুল। নকল নখের উপর টকটকে লাল পলিশ। দাঁতে পিতলের আচ্ছাদন। চুলগুলো লালচে, রুক্ষ। জিভে আংটি। হাতে ছয়টা। একেক কানে চারটে করে ছিদ্র অলংকৃত হয়ে আছে বিবিধ আকারের ধাতুতে। এর উপরই ঠেসে ধরে আছে মোবাইলটা। তারস্বরে বকছে কাউকে। ঐ প্রান্তের হতভাগা কী পাপ করেছিলেন বোঝার জো নেই। তবে এটুকু জানা গেল যে ঐ প্রান্তে পুরুষ কেউ এবং তার জন্মপরিচয় কিছুটা ধোঁয়াশা। লোকটার মা তেমন সুবিধার মহিলা নন। কয়েদি ও নাবিকদের লোকটার সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। পরবর্তী দেখায় লোকটার তোবরানো গাড়িটা তার পশ্চাৎদেশ দিয়ে প্রবেশ করানো হবে। এহেন আরো অনেক অনাহূত তথ্যে ভেসে গেলাম চোখের পলকে। বড় জাঁদরেল বিড়াল।

বেজির হাতে একটা ব্যাগ। তাতে দুটো গোলাপি টুপি, কয়েক ফাইল মাথাব্যাথার ওষুধ, চার হাত লম্বা কিছু টি-শার্ট, মাছের আঁশের মত ডিজাইনের একটা হাতব্যাগ, ডজন খানেক সিগারেটের প্যাকেট। লজেন্সও আছে কিছু। সাধছে এক মহিলাকে। মানা করায় ক্ষেপে গেল খুব। যেন সাধিবামাত্র কিনিতে বাধ্য থাকিবে। না, মহিলা তবু কিনছে না। নিজেই সাবার করে দিল এবার লজেন্সটা। খোসাটার ঠিকানা হল পাশের সিট, আর মুখের গামটা লেগে গেল সিটের নিচে। উঠে গিয়ে আরেক জনের পাশে বসলো। এবারে সফল। এক শিশি টাইলানল। দামটা বেশি মনে হল একটু। কে জানে, শিশিতে কী বেঁচলো। দাওয়াই, নাকি রোগ।

আমার দিকেই আসছে। কিছু বলবে মনে হয়। কিছু বললো মনে হয়। কিছু শুনবার অপেক্ষায় মনে হয়। প্রথম নিয়ম খাটে না এরকম অবস্থায়। চলন্ত বাসের ভেতর আটকা। দুঃখিত বলে দ্রুত হেঁটে চলে যাবার পথ নেই। দ্বিতীয় নিয়মও অচল। জনসমাবেশে নিরাপত্তা খোঁজার অবস্থা নেই এখানে। সেফটি ইন নাম্বারস কথাটা খাটে না এই চিড়িয়াখানায়। অগত্যা তৃতীয় নিয়ম। ফেস ইওর ফিয়ার উইথ এ গ্রেশাস স্মাইল। স্থিরদৃষ্টে চেয়ে রইলাম বেজির চোখের দিকে। আলতো করে মাথা দুলিয়ে বললাম, নো থ্যাংকিউ। আরেক পশলা ইবনিক্স। আমার ভাণ্ডার থেকে বেজির জন্য আরও কিছু স্মিত হাসি। হাত মেলাতে চায়। যাক, নিরীহ বেজি। কিছু উপদেশ দিয়ে গেল। ইউ বি গুড ছাড়া কিছু উদ্ধার করতে পারলাম না। দূর থেকে ইশারা করছে। জবাবের ভঙ্গি জানা নেই। হাসিই সই।

বিদীর্ণ ঘরবাড়ি, সতের ইঞ্চি সাইজের কাস্টম হুইল, আর বুক কাঁপানো বেজ। কাল্লুপাড়ায় এসে গেছি। ভরে গেল বাসের সবটা। আমার পাশের সিটটা খালি থাকলেই হয়। সবার গায়ে কাজের পোশাক। সবার হাতে ফোন। সবার আলগা নখ। সবার নিম্নার্ধ্ব কুশ্রী রকম মোটা। প্রতি তিনজনে একজন হাসলে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে পিতলের সূর্যে। ছেলেগুলো সবাই যেন বিড়ালটার প্রতিবিম্ব। কারও হাতে ওয়েলফেয়ারের টাকায় কেনা ঘড়ি। কেউ বাস্কেটবল খেলছে ছায়ার সাথে।

মেয়েটার রং বেশ সুন্দর। কিছু কালোর গায়ের রং সাদাদের মত হয়। তাই বলে এতটা? নাহ, সাদাই তো। চুল পরিপাটি করে বাঁধা। জুতার ফিতে বাঁধা। জামাটা প্যান্টে গোঁজা। কিন্তু এই মেয়ে এখানে কেন? বুঝলাম ফ্রি কান্ট্রি, তাই বলে এই এলাকায় সাদা মেয়ে কেন? ব্যাগটা দেখে মনে হচ্ছে না তেমন অবস্থাসম্পন্য। ভাড়া কম দেখে এখানে থাকে হয়তো। এভাবে দেখা ঠিক না। বাইরের দিকে চেয়ে সুর ভাজি কোন কিছুক্ষণ। মেয়েটার চুলে সিঁথি ছিল। ক্লিপ দিয়ে আটকানো ছিল। প্যান্টটা কি পরিষ্কার ছিল, নাকি ময়লা? ময়লা হলে এপাড়ায় বিবাহিত, পরিষ্কার হলে ভাগ্যাহত। টিকেট কি প্রিপেইড কার্ডে পাঞ্চ করলো, নাকি কয়েনে দিল? কার্ডে দিলে এখানেই থাকে, কয়েনে হলে কোন কাজে এসেছিল।

পাশে গিয়ে বসলেই পারি। আড়চোখে দেখে নেওয়া যাবে। চাই কি বৃত্তান্ত জেনে নেওয়াও যেতে পারে। পুরো বাস ভরা হলেও মেয়েটার পাশের সিটটাও খালি।

আমেরিকা, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, এবং কিছু প্রাসঙ্গিক মন্তব্য

বর্তমানে পৃথিবীতে দ্রুততম প্রসারী ধর্মটির নাম সম্ভবত অ্যান্টি-আমেরিকানিজ্‌ম্‌। দুই মহাসাগরের মাঝের প্রচণ্ড ধনী একটি দেশ বাদে সবার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা, আমেরিকান পাওয়ামাত্র ‘ধর তক্তা, মার পেরেক!’ অন্যদিকে আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থপর, নির্বিকার এই দেশটির লোকেরাও যেন উষ্কে দিচ্ছে সব বিরোধের আগুন। আসলেই কি তাই?

ব্যক্তিগতভাবে আমার রাজনৈতিক মত যেমনই হোক না কেন, আমার যাবতীয় কথা ও কাজের প্রকার ও উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, কিছু মানুষ ঠিকই এই লেখার ভেতর কিছু ষড়যন্ত্র খুঁজে পাবেন। আমির থেকে ফকির পর্যন্ত সবাই একমত হবেন যে পুঁজিবাদের দলে দালালের সংখ্যা আরও একটি বাড়ল। পৃথিবী নামের একটি গ্রহ যে ঐক্যের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসেছে, এই মহাসত্য ক্ষণিকের জন্য হলেও আড়াল হয়ে যাবে। ধারণাতাড়িত বিশ্বাস, আর বিশ্বাসতাড়িত এই ‘সত্য’ শুধু দূরত্বই বাড়াবে। মেরুকরণের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষগুলোর জীবন থেকে যুক্তির বিচ্ছেদ শুধুই বাড়াবে। সাথে অপঘাতে মৃত্যুর আধুনিক সংস্কৃতির কথা নাহয় উহ্যই থাকল। তর্কের রাজ্যে এই পরিস্থিতি যতই খোরাক যোগাক, সাধারণ্যে শুধু দুর্ভোগই আনবে। এই লেখায় তাই খুব সরল, সাধারণ কিছু ‘নাগরিক মন্তব্য’কে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। আশা করি অতিসাধারণ কোন বিশ্লেষণ জুড়ে দেওয়া হবে না এর সাথে।

রাজনীতি নীতিহীনদের রাজ্য, তাই ও-পথে আগাবো না। আমার শুধু একটাই প্রশ্ন, আমরা এত পেছনে কেন? একযোগে সবাই এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমেরিকা’। ভাবতে অবাক লাগে। মনের কোণে এক ধরণের অধম হিংসাও সুরসুর করে। আবার মুদ্রার অপর পিঠটাও উপেক্ষা করতে পারি না। ‘চাহিবামাত্র ১৪ কোটি মানুষের দণ্ডমুণ্ড অধিকার করিতে বাধ্য থাকিবে’ কথাটা অনেক খুঁজেও কোন মার্কিন ডলারে পাইনি। যেমনটা পাইনি প্রকাশ্য অন্ধ বিদ্বেষ। তবে আমি কেন মেনে নেবো প্রচলিত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব? কী করে মেনে নেবো যে বিধাতা বুদ্ধি দিয়েছেন বিশ্বাসের জন্য, বিবেচনার জন্য নয়?

বাংলাদেশ ডুবছে, এটা এখন সবাই জানেন। তবে কেউ জানেন না এই ডুবে যাওয়া কিসের জলে। পলিকাতর বঙ্গোপসাগরের, উন্নয়নের জোয়ারের, নাকি আর্তের কান্নার? এ-প্রশ্নের জবাব রাজনীতিতে নেই, আছে ব্যক্তির উপলব্ধিতে। ঘাটতি আমাদের ওখানেই। আমাদের বিশ্বাস আছে, ভক্তি আছে, আবেগ আছে, আক্রোশ আছে। নেই শুধু উদ্যোগ আর উপলব্ধি। বোধ করি আমাদের অসহায়ত্ব আর অসহিষ্ণুতার উৎসও তা-ই। দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘যত ব্যস্তই থাকো না কেন, নিজেকে স্বেচ্ছায় অজ্ঞতার কাছে সমর্পণ কোর।’ উদ্দেশ্যটা একেবারেই সরল। আত্মোপলব্ধি। আজকে আমাদের জীবনে এই একটি দিকে বড়ই দৈন্য। অস্থির জীবনে তাই একটাই সান্তনা, “সব দোষ আমেরিকার”!

দয়া করে কেউ ভেবে বসবেন না যে আমি নগ্ন আগ্রাসনের সাফাই গাইছি। আমি শুধু এই বিশ্বাসটুকুই প্রকাশ করতে চাইছি যে আমাদের বৃহৎ ও বিশদ উন্নয়নগুলো আমাদেরই দোষে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর পিছনে কোন জাতীয় বা আন-র্জাতিক অপশক্তির চেয়ে ব্যক্তিগত ঔদাসিন্য দায়ি বেশি। আমরা যতই নির্ধন হই না কেন, আমাদের সত্যিকার দুর্বলতাগুলো অনুভূতির রাজ্যে। নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করা এক আনুষ্ঠানিক অস্তিত্বে সীমিত হয়ে বেঁচে আছি আমরা আজকে। পরের আগ্রাসন নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত, নিজের ঔদাসিন্য নিয়ে আমরা ঠিক ততটাই নির্বিকার।

দূর প্রবাসে এই মার্কিন মুল্লুকে দিন কেমন কাটে, এটা জানতে চান অনেকেই। সবার প্রশ্নগুলোই একটু আগ্রাসী। কেউ সরাসরি প্রশ্ন করেন, বাদামী চামড়ার জন্য পথ-ঘাটে কী ধরণের ‘বিশেষ যত্ন’ পেতে হয়। কেউ আরেক কাঠি সরেস। প্রথম সুযোগেই ঢালাও ভাবে বিবিধ স্রষ্টা, ধর্ম, আর জাতি তুলে বিষোদগার শুরু করেন। তবে অধমের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে যে এই ধরণের সাধারণীকরণ নিজেকে সীমায়নেরই নামান্তর।

প্রতিটি রাষ্ট্রের চরিত্রেই কিছু দ্বিত্য আছে। কারণ রাষ্ট্র একাধারে অনেক রকম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়। রাষ্ট্রের কার্যকলাপ তাই সমগ্র জনগণের মানসিকতার প্রতিফলক হিসেবে সব ক্ষেত্রে সঠিক না। জাতির সাথে রাষ্ট্রের পার্থক্য শুধু কাঠামোতে নয়, চেতনায়ও। এই সহজ সত্যটি অনেক সমালোচকই ভুলে যান। কারও অপকর্মের সাফাই গাওয়া নয়, এই লেখার উদ্দেশ্য নিজেদের এই পথভ্রান্তিকে যথাসম্ভব সীমিত করা। যেকোন যন্ত্রের মত মানবজীবনও সময় ও সুযোগে সীমিত। যে-ধরণের সমস্যা নিয়ে আমরা অন্যকে শাপ দিয়ে নিজের সময় নষ্ট করছি, সেই সময় ও তার সুযোগ-ব্যায়ের দায় পর-প্রজন্ম মিটাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই কারও।

আমাদের মুখ্য সমস্যাগুলো নিহিত এই সামগ্রিক উন্নাসিকতা আর অযৌক্তিক সাধারণীকরণেই। বঙ্গের ইতিহাস যেমন তৃণমূল থেকে নেতৃত্বের জন্ম দেওয়ার, তেমনি ব্যক্তির অনুসরণে গোষ্ঠির উন্মেষেরও। আজ সময়টা শুধু অসাধারণের অপেক্ষায় থাকার না, অসাধারণের জন্ম দেওয়ারও। এই মহাযোগের প্রথম পদক্ষেপই সাধারণ সচেতনতা। কিন্তু সাধারণ তো দূরে থাক, আমরা কি আদৌ ব্যক্তিগত পর্যায়েও এর চর্চা করছি? শুধু দোষারোপ আর অভিসম্পাতের সংস্কৃতি এক দিকে যেমন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বিশ্লিষ্ট করছে, তেমনি ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে উগ্র, ধর্মীয় অর্থোডক্সির প্রসারের। ভেদাভেদ ভুলে এদেশের অসামপ্রদায়িক মানুষগুলো হঠাৎ এক হয়ে যাবে, এমনটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। একারণেই আজকে ব্যক্তিগতভাবে সরব হওয়ার গুরুত্ব এত বেশি।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এ-যুগে আমাদের অর্জনগুলো প্রসারিত করে দেবার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ কতটুকু? জ্ঞানভিত্তিক শ্রেণিবিভাজনের নব্য বাস্তবতায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর কথা বাদ দিলাম। শিক্ষিত বাঙালির দেশাত্মবোধ আজ কতটা জাগ্রত? ঘটে যাওয়া অগণন অপকর্মের প্রতি নির্বাক সমর্থনের দায় কি অন্যের ঘাড়ে চাপানোর জো আছে? মার্কিন ‘ষড়যন্ত্র’ যদি থেকেও থাকে আমাদের বিপর্যয়ের জন্য, তাকে কি সর্বতোভাবে দায়ী করা যায় আমাদের ঔদাসিন্য আর বিফলতার জন্য? রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের জন্য সমগ্র জাতিকে দায়ী করাই বা কতটা ন্যায্য?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ সভ্য ও বুদ্ধিমান প্রতিরোধের অনেক উদাহরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘ষড়যন্ত্র’ গুলো তাদের ক্ষেত্রে কিছুমাত্র নমনীয় নয়, যেমন নমনীয় নয় তাদের প্রতিযোগী মনোভাব। শত্রুতা আর প্রতিদ্বন্দ্বিার গুণগত পার্থক্য এখানেই। শত্রুকে শুধু ঘৃণাই করা যায়, কিন্তু যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বড় প্রশিক্ষক দুর্লভ। তাই সময়টা প্রতিহিংসাকে প্রত্যয়ে রূপান্তরের। পরের আদর্শ থেকে পরিশ্রম আর নিয়মানুবর্তিতা ধার নেবার, নিজের আদর্শ থেকে সহনশীলতা আর সততা তুলে ধরার। ওতেই মন, ওতেই মানুষ।

ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০০৫

বন্ধ হৃদয়, অন্ধ আবেগ

উগ্র জাতীয়তাবাদ নিঃসন্দেহে অপরাধীর আবেগ। মহাবিতর্কিত এই মহাসত্য আবারও প্রকাশ পেল উন্নত অথচ কলহমান দুটি এশীয় মহাশক্তির সাম্প্রতিক কার্যকলাপে। সম্প্রতি জাপানের পাঠ্যপুস্তকে চীনের সাথে তার ঐতিহাসিক বিরোধ ও সংঘাত গুলো নিয়ে আপত্তিকর ও অসত্য বক্তব্য সংযুক্ত করার প্রেক্ষিতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে অনেক রকম পুরনো জঞ্জাল। শুধু জঞ্জালই নয়, নাড়া পড়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদের লাল সালুতেও।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলেও চীন ও জাপানের বিরোধ পুরনো। সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে পরষ্পরের উপর প্রভাব বিস্তাার ও আঞ্চলিক আধিপত্য লাভের জন্য এই দেশ দুটো অনেকবার মুখোমুখি হয়েছে। সর্বশেষ প্রধান সংঘাত ছিল ২য় মহাযুদ্ধের সময়। সে সময় জাপান ছিল নাৎসি জার্মানির অন্যতম তাবেদার। তাবেদার হবারই কথা। তাদের দাবিও ছিল অভিন্ন। উন্নততর জাতি হিসেবে তাদের আরও জমি ও সম্পদ চাই। অনুন্নত জাতিগুলো চাহিবামাত্র তা যোগাতে বাধ্য। তাদের সম্রাট হলেন ঐশী আশির্বাদে পুষ্ট এক নেতা, যার ইচ্ছাপূরণের কাছে প্রচলিত শিষ্টাচার কিংবা মানবতা নগণ্য। যুদ্ধের সময় তারা দখল করে নিয়েছিল চীনের অর্ধেকেরও বেশি জমি। আর সব দখলকৃত দেশের মত চীনকেও সইতে হয় বর্ণনাতীত নির্যাতন। অত্যাচারের মাধ্যম হিসেবে বিশেষ পছন্দনীয় ছিল খুন ও ধর্ষণ, যেমনটা জাতীয়তাবাদী সব অপশক্তিই মোটামুটি প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত করার মধ্যে এক প্রকার বিকৃত তৃপ্তি লাভ করে থাকে।

যুদ্ধের জঘন্যতম অধ্যায়গুলোর একটি ছিল নানজিঙ্গের গণহত্যা। ১৯৩৭-এর ডিসেম্বরে এই শহরটি দখল করে নেবার পর জাপানি সেনারা খোলা রাস্তায় ইচ্ছেমত গুলি চালায়। নারী ও শিশু নির্বিশেষে খুন করে আনুমানিক আড়াই লক্ষ নিরস্ত্র চীনা নাগরিককে। অনেককেই জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। বহুকাল পর স্থানবিশেষে গণকবরে পাওয়া যায় ১০,০০০ এরও বেশি লাশ। সাথে ধর্ষিতা হন ২০,০০০ এরও বেশি নারী। ধর্ষণের পর কারও স্তন কেটে নেওয়া হয়, কারও যোনিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ধারালো তলোয়ার। ব্যক্তিগত বিনোদনের জন্য অনেক সেনাই ছবি তুলে রাখেন এই নির্যাতনের। আজও বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরি আর ওয়েবসাইটে এই ছবিগুলো ঝুলছে মানুষের নীচতা আর বর্বতার প্রতীক হয়ে। জাতি হিসেবে চীনা আর জাপানিরা বাঙালিদের তুলনায় অনেক উন্মুক্ত। ছবিগুলোকে তারা অশ্লীল বলে গাল দেয়নি, বরং প্রামান্য দলিলের মর্যাদা দিয়েছে। তাই এই বর্বতার আলোকচিত্রগুলো আজও মিথ্যাচারী আর সংশোধনবাদীদের টুঁটি চেপে ধরে। যেমন ধরছে এখন জাপানের নব্য রচয়িতাদের।

জাপানের পাঠ্যপুস্তকগুলোয় ইতিহাস এখন নতুন করে লেখা হচ্ছে। তাইওয়ান, মানবাধিকার, নিরাপত্তা পরিষদে জাপানের স্থায়ী সদস্যপদ দাবী, ইত্যাদি বিষয়ে দেশ দুটোর মধ্যে দূরত্ব ক্রমবর্ধমান। বিরোধের বারুদে আগুন লাগালো ইতিহাসবিকৃতি আর জাতীয়তাবাদী শুদ্ধি অভিযান। ফলাফলটাও প্রত্যাশিত। বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে পুরো চীন। বিশ্বের নজরও সেদিকে। যথারীতি, প্রতিবাদের কারণের চেয়ে মাত্রার দিকেই সবার নজর বেশি। সমাজতান্ত্রিক চীনের এই প্রতিবাদের ঝড় পশ্চিমের কারও চোখেই ভাল ঠেকছে না। এর পেছনে সরকারের প্রত্যক্ষ মদদ খুঁজে পাচ্ছেন তারা। চীনা সরকার তার যা করার করছে বলেই নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মত। জাপানি দূতাবাস থেকে শুরু করে দোকান-পাট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

জাপান এই উত্তপ্ত সময়ে বিতর্কিত পূর্ব চীনা সাগরে তেল-গ্যাস সন্ধানের অনুসন্ধানের অনুমতি দিচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানিকে। শুধু তাই নয়, জাপান তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চীনে পাঠিয়েছে চীনা সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা দাবি করে। স্বাভাবিকভাবেই এই আবেদনে কান দেয়নি চীন। ওদিকে থেমে নেই জাপানের জাতীয়তাবাদী সংশোধনও। তাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোয় অত্যাচারের ইতিহাসকে আলোকিত অধ্যায় বলে অভিহিত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মাত্রানির্বিশেষে চীনাদের উপর নির্যাতন উপযুক্ত ছিল, নানজিঙ্গের হতাহতের সংখ্যা অতিরঞ্জন, যুদ্ধের সময় এমন ঘটনা হতেই পারে, ইত্যাদি। প্রতিবাদের বিপরীতে জাপান সরকারের ব্যাখ্যাগুলোও যথেষ্ট হাস্যকর। পুস্তক গুলোর রচয়িতা সরকার কর্তৃক নিয়োজিত নন। এই পাঠ্যপুস্তকগুলো নির্বাচন করছে স্কুলগুলো, এর পেছনে সরকারের হাত নেই। খুব বেশি স্কুলে এগুলো পড়ানো হবে না। এই ধরণের কিছু খোঁড়া বক্তব্য। একটি জাতির অভিভাবক হিসেবে তাকে সত্য ও সুন্দরের পথে রাখার দায়িত্ব কোন সরকারের পক্ষেই এড়ানো সম্ভব না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্পর্শকাতর কোন বিষয়ে কেউ মিথ্যা বা আক্রমণাত্মক কিছু করে বসলে তার দায়ও এড়ানোর উপায় নেই।

বিবাদমান এই দুটি দেশকে নিয়ে অনেক কিছুই বলার আছে। অনেকে বলছেনও। কেউ কেউ জাপানের হয়ে বলছেন, দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার জন্য এমন বক্তব্য সংযোজন করতেই হয়। কেউ বা তাইওয়ান বা তিব্বতের উদাহরণ টেনে বলছেন চীনের অসঙ্গতিপূর্ণ মনোভাব ও কার্যকলাপের কথা। কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে দেখাচ্ছেন যে একই জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে যথাক্রমে হিরো ও ভিলেন রূপে চিহ্নিত। বিগত ৬০ বছরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন তাদের অতীতের জন্য। যুদ্ধের পর শান্তি আর কঠোর পরিশ্রমের প্রতি জাপানিরাই সবচেয়ে বেশি মনোনিবেশ করেছে, ইত্যাদি। কিন্তু সবকিছুই যেন শুন্য দিয়ে গুণ হয়ে গেল মুহূর্তের এই উন্মাদনায়।

জাতীয়তাবাদের অপশক্তির এটাই সবচেয়ে ভীতিকর দিক। নিমেষেই এটি মানুষকে প্ররোচিত করতে পারে তার স্বভাববিরুদ্ধ উগ্র আচরণ করতে। সব রকম প্রযুক্তিতে নেতৃত্বদানকারী দেশ হয়েও যারা আণবিক বোমার দিকে হাত বাড়ায়নি, কর্মময়তায় ব্যাঘাত ঘটবে বলে যারা অলিম্পিক আয়োজনেও নাখোশ ছিল, সেই দেশেই এমনটা হচ্ছে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হবারই কথা। জাতীয়তাবাদের অনেক রকম গুণের কথা বলে থাকেন অনেকেই। নিজের দেশ ও জাতিকে শ্রেষ্ঠ বলে জানা ও তার সেই শ্রেষ্ঠত্ব অন্যের ওপর আরোপ করা, নিজের দেশের অন্যায়কেও প্রশ্রয়ের চোখে দেখা, ইত্যাদি জাতীয়তাবাদেরই অনূষদ। ভয়ের বিষয় হল, এক পর্যায়ে জাতীয়তাবাদীর কাছে যুক্তি আর বিবেকের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় অহংকার আর আত্মম্ভরিতা; যার প্রত্যক্ষ্য ফল রূপে সমাজ আর রাষ্ট্র আক্রান্ত হয় নানাবিধ অসুখে।

প্রশ্ন আসতে পারে, জনগণ কেন কিছু করছেন না। ভিন্‌ দেশের ভিন্‌ বাসিন্দাদের সমালোচনায় এটুকু বলাই যায়। আমরা বলিও। জাতি হিসেবে আমরা ছোট ও বাচাল। এহেন প্রশ্ন আমাদের চেয়ে ভাল তাই কাউকে মানায় না। এর জবাবে আমার শুধু ছোট্ট একটি প্রশ্ন। কেউ কি আয়নার নিজের দিকে দেখেছেন? একই কাজ আরও অনেক গুণে বেশি চলছে বাংলাদেশে! দেশের ভেতরেই চলছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেশদ্রোহিতা । কী বলছি আমরা? আমাদের নানজিং নেই, কিন্তু মনে রাখবার মত ’৭১ আছে। পরাজিত শক্তি আর তাদের তাবেদার দেশীয় আগাছারা আজ দেশটা ছাড়খার করলেও আমরা কিছু বলছি না, অন্যকে দোষ দেব কী? আমরাও তো আজ আকাশে-বাতাসে শুনছি নিজামীদের বলা “হো সাক্‌তা হ্যায়” জাতীয় উক্তি! নানজিংকে তাই মনে পড়ে সংবাদপত্রে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে খুন-ধর্ষণের খবর অতিরঞ্জন’ কিংবা পাঠ্যে ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপের দায়ে ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়’ পড়লে। নানজিংকে মনে পড়ে নিজামীরা যুদ্ধকালে তাদের ভূমিকার সাফাই গাইলে। নানজিংকে মনে পড়ে স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার শপথ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদেরই পুষতে-পালতে দেখলে। নানজিংকে মনে পড়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে মাহফিল করতে দেখলে। তবে বিধাতাকে মনে পড়ে শুধু একবার - যখন কোন সন্তানহারা মা কিংবা বীরাঙ্গনা বোন নিভৃতে অশ্রু মোছেন। বিধাতা ছুটিতে ছিলেন তাঁরা সব হারানোর সময়। বিধাতা যেন আজও ছুটিতে আছেন তাঁরা আরেক প্রস্থ অপমানিত হবার সময়।

এত রক্ত, এত কষ্ট, এত ত্যাগ, সবই যেন তাই শুধু এক আপেক্ষিকতা। সবই বন্ধ হৃদয়ের অন্ধ আবেগ।

এপ্রিল ১৯, ২০০৫

শুভ জন্মদিন, স্বদেশ

আমার বাবার নাম আব্দুর রউফ। সরল, সাধারণ, জৌলুসহীন একটি ইসলামিক নাম। অর্থটাও বেশ সরল, আল্লাহর বান্দা। আজকাল নামের বাজারে নতুন নতুন পণ্যের ভীড়ে কিছুটা বেমানান। বাঙালির নামকরণের অভিধানে বাজার-চলতি প্রায় সব শব্দই ঢুকে গেছে। ধর্মীয় নাম গেছে, প্রাকৃতিক নাম গেছে, বাঙালি নাম গেছে, বাঙালি নামকে হিন্দুয়ানি বলে দাবি করে বিবিধ ভাষা ও ধর্ম থেকে ধারে নেওয়া নাম গেছে। বিন-লাদেন, সাদ্দাম থেকে শুরু করে আরাফাত-অমর্ত্য পর্যন্ত সব নাম গেছে। এত নামের ভীড়ে আমার বাবার নামটা একটু সাদামাটাই।

কথাটা এক যুগ আগের। তখনও শহীদ বলতে মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করা মহান যোদ্ধাদের বোঝাতো। তখনও বাংলাদেশে বীরশ্রেষ্ঠের সংখ্যা মাত্র সাত জন ছিল। তারচেয়েও বড় কথা, সংখ্যাটা সাতেই সীমিত ছিল। এমনকি ক্ষমতার রাজনীতির প্রয়োজনেও এর অন্যথা করার কথা কেউ বলত না। ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞানটুকু বালক থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রী পর্যন্ত সবার মধ্যেই ছিল। সীমান্তে গোলাগুলিতে নিহত বিডিআর সেনাদের কেউ ক্ষমতায় গেলে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দিত না, দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে তাদের কথা বেমালুম ভুলে যেত না। দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার জুজুর ভয় তখনও ছিল, ছিল না ইতিহাসের রাস্তায় উল্টোযাত্রা।

আরও অনেক কিছুই ছিল না সেই সময়। যত বিরোধই থাকুক না কেন, কেউ দালালদের দালালি করতেন না। কেউ করলেও দেশের বাকি জনগণ চেয়ে চেয়ে দেখতেন না। চাপা ক্ষোভটুকু হলেও প্রকাশ করতেন। গণমাধ্যমে তখন নিরপেক্ষতা নামে কোন ভূত ছিল না। ভাল আর খারাপের মাঝের স্পষ্ট তফাৎটুকু ব্যবসার খাতিরে ঘোলা করার মিশনে নামেনি তখনও গণমাধ্যমগুলো। মানুষ নিরপেক্ষ বলে কোন শব্দ জানতো না, তবে ভাল আর মন্দ বুঝতো, মন্দকে পরিহার করতো, আর গ্রহনযোগ্য সকল পক্ষকে সমান চোখে দেখতো, নিরপেক্ষভাবে সামলাতো। বাংলাদেশ তখনও কৃষক-মজুরের ঘামে গড়া, আর রক্তচোষা দেশপ্রেমিকদের লুটপাটে রিক্ত একটি দেশ ছিল। তখনও এদেশ দারিদ্র্য বেচে চলতো, ঋণ করে ঘি খেতো, ছাত্রদের অর্ধেক জীবন বিশ্ববিদ্যালয় নামক কারাগারে আটকে রাখতো, উৎসনির্বিশেষে সকল অর্থের উপাসনা করতো। তবুও কেন যেন মনে হয়, সেই দিনগুলোই উত্তরপ্রজন্মকে গর্ব করে শোনাতে পারবো। আমাদের আমলে ৭ বছরে বিএ পাশ করতাম আমরা! আমরা বিনা বোমায় স্বোপার্জিত স্বাধীনতার তলায় সন্ধ্যা কাটাতাম! আমাদের কালে বছরে মাত্র ৭০ দিন হরতাল হত! একদিন বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ছাড়াই মানুষ পথ চলতে পারতো!

গোটা সমাজের মত আমাদের প্রজন্মের উঠতি শিশুদেরও অন্য রকম একটা আবেগ ছিল দেশকে ঘিরে। বীরশ্রেষ্ঠদের নাম শুনলেই নত লোমগুলো গর্বে উঠে দাঁড়াতো, চিরশান্ত রক্তে উন্মাদ আনন্দের মাদক ছোটাছুটি করত। সেরকমই এক দুপুরে পড়ছিলাম বিজয়ী বীরদের আত্মত্যাগের কথা। তখনও শিক্ষকরা পাঠ্যবহির্ভূতভাবে হলেও বীরশ্রেষ্ঠদের গল্প করতে পারতেন। আমরাও শুনতাম। একদিন বীরশ্রেষ্ঠদের নাম বলতে গিয়ে শ্রদ্ধেয়া শিক্ষিকা ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রবকে ভুলে আব্দুর রউফ বলেছিলেন। মুহূর্তে আমার দিকে ঘুরে তাকানো পুরো ক্লাসের সেই দৃষ্টি আমি আজও ভুলতে পারি না। না, সেই বীরশ্রেষ্ঠের নাম আব্দুর রউফ না। আমার বাবাও নিহত নন। কিন্তু তাতে কার কী আসে যায়! শতবার বলার পরও সবার এক কথা। নাম একই নাহোক, ক্ষতি নেই। মিল তো আছে! ১০ বছরের এক ঝাঁক বালকের সেই ভুল যে আজ এতদিন পরও শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের এত বড় উৎস হবে, তা কি তখনও জানতাম? হয়তো এমন মন্তব্য করাটা বেশ বড় মাপের ধৃষ্টতা হয়ে যাবে, তবু না বলে পারছি না। মনে হয় শত শত পৃষ্ঠার ক্রোড়পত্র, দিবসভিত্তিক সরকারি বার্তা, কিংবা বেলুন-ওড়ানো দেশপ্রেমের চেয়ে মুহূর্তের সেই ভুলই বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রবকে গভীরতর শান্তি দিয়ে থাকবে। ব্রিটিশবিরোধী এক ভাষণে নেতাজি সুভাষ বসু একবার বলেছিলেন, স্বাধীনতা হল ভুল করার অধিকার। আমাদের সেই ভুলের অধিকারের জন্যই তো শহীদদের প্রাণ দেওয়া।

সামনেই স্বদেশের ৩৪তম জন্মদিন। হতাশা আর বেকারত্বে জর্জরিত যুবকের বেশে আরো একটি বছর পার করে দেবে সে। মানুষের অসাম্প্রদায়িকতা আর অহিংসার কাছে তার আর কোন আবেদন নেই। যান্ত্রিকতা, ষড়যন্ত্র, আর দুর্নীতিতে তার দেহ-মন ক্ষয়ে যাচ্ছে প্রতি পলে। ধর্মের নামে নিজের ভাইদের কণ্ঠরোধ করে করে তার হৃদয় আজ শতখণ্ডে খণ্ডিত। ধর্মেরই দোহাই দিয়ে নিজের বোনদের সম্ভ্রমহানিও আজ তাকে বিব্রত করে না। অন্যায় হত্যাকাণ্ড, অন্ধ বিদ্বেষ, কিংবা ভেদবুদ্ধি এখন তার কাছে ভাত-মাছের মতই। তবুও নিজেকে হারিয়ে খোঁজা এই যুবক আজও হয়তো স্বপ্ন দেখে। আজও হয়তো সে অতীতকে স্মরণ করে অহংকার আর আত্মপরিচয়ের তাগিদে। হয়তো এমন দিনগুলোয় একবার হলেও কৃতকর্মের জন্য তার মনে রাজ্যের লজ্জা ভীড় করে। হয়তো এখনও তার একটি অংশ রাত জেগে বসে থাকে সূর্য দেখবে বলে। এখনও হয়তো সেই যুবক যুদ্ধ করে, একটি ফুলকে বাঁচাবে বলে।

আজ জন্মদিনের শুভেচ্ছা সেই যুবককে, আর বাকি সকলের কাছে একই সাথে গর্বিত আর লজ্জিত হওয়ার আহ্বান। আজ যে আমাদের সবকটা জানালা খোলার অধিকার আছে, কিন্তু ওরা আসলে, দেবার মত কিছু নেই!

শুভ জন্মদিন, স্বদেশ!